Home না চাইলেও তুমি শুধু আমারই না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪০

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪০

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪০
মাইশা জান্নাত নূরা

রাত প্রায় গভীর হয়ে এসেছে। নির্ঝর গাড়ি নিয়ে গ্রামের রাস্তা দিয়ে ঢুকেছে প্রায় ১৫ মিনিট হলো। যতো ভিতরের দিকে আসছে ওরা গ্রামের শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশ যেনো ওদের একটু একটু করে গিলে নিচ্ছে নিজের গহ্বরে। নির্ঝর বিরবিরিয়ে বললো…..
—”অনুর বিয়ে ওর বাবা ঠিক করেছিলেন এই গ্রামেরই চেয়ারম্যানের ছেলের সাথে। তাহলে কি অনুকে কি*ড*ন্যাপ করার পিছনেও ঐ লোকই দায়ী? আমার কি এখন সরাসরি চেয়ারম্যানের বাড়িতে যাওয়া উচিত! কিন্তু এই চেয়ারম্যানের বাড়িটা কোনদিকে! একা একা খুঁজতে নিলে লম্বা সময় লেগে যাবে। কোথাও থেমে কাউকে জিজ্ঞেস করে নিলেই বোধহয় ভালো হবে।”
ভাবতে ভাবতেই ওদের গাড়িটা আরেকটু সামনে এগোলে সেখানে একটা টঙ-চায়ের দোকান দেখতে পেলো ওরা। ড্রাইভারটি বললেন….

—”ছোট স্যার! এভাবে আর কতোসময় ঘোরাঘুরি করবেন? কোথায় যাবেন যদি না চিনে থাকেন তাহলে ঐ চায়ের দোকানদারকে একবার জিজ্ঞেস করে নেওয়া যেতো!”
নির্ঝর বললো….
—”হুম দোকানের সামনে গাড়িটা থামাও। আমি জিজ্ঞেস করতেছি।”
ড্রাইভার তেমনই করলেন। হঠাৎ একটা বিশালকার উন্নত জাতের চার চাকার গাড়ি দেখে চায়ের দোকানদার খানিক ভরকে গেলেন। পরপরই নিজেকে সামলে নিয়ে হাতে থাকা হারিকেনটা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে নির্ঝরের চেহারা স্পষ্ট ভাবে দেখার চেষ্টা করে বললেন….
—”কেডা আপনেরা? এত্তো বড় গাড়ি লইয়া এই গেরামে আইছেন! কার ঘরে যাইবার চান বাহে?”
নির্ঝর নম্রস্বরে বললো….

—”আমরা শহর থেকে এসেছি চাচা। এই গ্রামের জন্য এখনও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি জন্য সেই বিষয়ে চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলতে চাই। কিন্তু চেয়ারম্যানের বাড়িটা কোনদিকে তা খুঁজে পাচ্ছি না।”
একটা উপযুক্ত বাহানা দেওয়ায় নির্ঝরকে সন্দেহ করলেন না বোধহয় দোকানদার। তিনি সরল হাসি দিয়ে ঠিকানাটা বলে দিলেন ওদের। নির্ঝরও হাসিমুখে বিদায় নিয়ে এগোলেন সেই পথ ধরেই৷ আরো প্রায় মিনিট ১০ সময় নিয়ে মাটির এলোমেলো রাস্তা পার করার পর প্রায় ৩০ হাত দূরে বিশাল এড়িয়া নিয়ে দাঁড়ানো ৩ তলা বিশিষ্ট আদিমকালের মডেলে তৈরি একপ্রকার ছোট খাটো রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি ওদের নজরে পড়লে নির্ঝর গাড়ি এখানেই থামাতে বলে বললো….
—”ঐযে, ঐ বাড়িটাই মনে হয় চেয়ারম্যানের বাড়ি। বাড়িটার চারপাশ দেখছি মোটামুটি উঁচু করেই প্রাচীর তোলা রয়েছে। গেইটের সামনে পাহারাদারও দাড়িয়ে আছে। আন্দাজ করা যায় ভিতরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ঢিলেঢালা নয়।”
ড্রাইভারটি বললেন….

—”ছোট স্যার! এখন আমার করণীয় কি? আমরা কি আর সামনে আগাবো?”
নির্ঝর ভাবুক স্বরে বললো….
—”না, আর আগানো যাবে না৷ তুমি এখানেই থাকো, আমি একাই ভিতরে যাবো। আমার কাজটা সাবধানে সেরে আবার তোমার কাছে ফিরে আসবো৷”
—”স্যার, একা যাবেন না।”
—”আমি একাই যথেষ্ট।”
কথাটা বলেই নির্ঝর গাড়ি থেকে নেমে সামনের আন্ধকারে যেনো মিলিয়েই গেলো। চেয়ারম্যান বাড়ির ঠিক পেছনের দেয়ালটা চারপাশের থেকে তুলনামূলক খুব উঁচু কম হওয়ায় নির্ঝর দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ড। অতঃপর ‘ইয়া আল্লাহ জান বাঁচানোর মালিক একমাত্র আপনিই’ বলে কয়েক কদম পিছিয়ে একটানে দৌড়ে এসে লাফ দিয়ে উপরে উঠে পড়লো৷ ফলস্বরূপ দেওয়ালের উপরি অংশ দিয়ে ঘন করে গেঁথে রাখা ছোট ছোট লোহাগুলো থেকে কিছু লোহার তুরতুরে মাথা নির্ঝরের হাতের তালু ও আঙুলগুলোতে লেগে খানিকটা গর্ত গর্ত হয়ে গেলো৷ যা দ্বারা গল গল করে র*ক্ত ঝড়তে শুরু হলো। নির্ঝর দাঁতে দাঁত চেপে সেই ব্য*থা সহ্য করার চেষ্টা করছে। এরপর আর দেড়ি না করে ওপাশের ঘাসের উপর সাবধানে ঝাঁ*প দিলো সে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কয়েক সেকেন্ড কোমর হালকা হালানো অবস্থায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে নির্ঝর অপেক্ষা করলো ওর ঝাঁ*প দেওয়ার শব্দ শুনে কেউ সেখানে চলে আসে নাকি! তাহলে সেই অনুযায়ীই ব্যবস্থা নিতে হবে ওকে। কিন্তু কেউ আসলো না দেখে নির্ঝর সঙ্গে সঙ্গে ওর দু’হাত হালকা ভাবে ঝাড়া দিলো। জ্বা*লা করছে দু’হাতের তালু ও আঙুলে গর্ত হয়ে যাওয়া জায়গাগুলোতে। এইমূহূর্তে ক্ষ*ত স্থানের র*ক্ত বন্ধ করারও কোনো উপায় নির্ঝরের কাছে নেই। নির্ঝর ওর পকেট থেকে সাদা রঙের রুমালটা বের করে তা মাঝখান দিয়ে ফেঁড়ে দাঁতের সাহায্যে দুই হাতেই কোনো রকম ভাবে ব্যন্ডেজ করে নিলো। মনে মনে বললো…..
—”এই পথ পেরিয়ে ভিতরে তো চলে এলাম, আপনার দেখা এরপর পেয়ে গেলে কিভাবে এখান থেকে অক্ষত অবস্থায় আপনাকে উদ্ধার করবো আমি অনু! বুকের বা’পাশটায় কেমন যেনো করছে আজ৷ এতো ভিষণ অস্থিরতা এর আগে কখনও অনুভব করি নি আমি।”

আইজিপির স্পেশাল গাড়িটা দ্রুত গতিতে গ্রামের রাস্তা পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে। গাড়ির সামনে-পিছনে নিরাপত্তা বাহিনীর আরও কয়েকটা গাড়ি রয়েছে। সারফারাজের স্পেশাল ট্রেনিং প্রাপ্ত গার্ডসদের গাড়িও তাদের মধ্যে রয়েছে। গাড়ির ভিতরের পরিবেশটা হালকা থমথমে রূপ নিয়ে আছে। পিছনের সিটে গম্ভীর মুখে বসে আছে সারফারাজ। ওর পাশেই আছেন আইজিপি। আর সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে বসে আছে তেজ।
আইজিপি তার হাতে থাকা ভাঁজ করা একটা কাগজ মেলে ধরলেন সারফারাজের সামনে। তেজ ঘাড় বেঁকে দেখছে পুরো বিষয়টা। মেলে ধরা কাগজটা হলো অনুর গ্রামের হাতে আঁকা ম্যাপ। আইজিপি বললেন….
—”এই গ্রামে এতোগুলো বড় বড় গাড়ি নিয়ে ভিতরে ঢোকাটা সহজ হবে না। কারণ রাস্তাটা অনেক সরু। আর চেয়ারম্যানের বাড়িটাও গ্রামটার প্রায় শেষ দিকে। চেয়ারম্যান নিজের কু-কি*র্তী পুরো গ্রামের মানুষদের থেকে আড়াল করে রাখার জন্য নিরাপত্তায় ত্রুটি হতে দেন না। ২০+ গার্ডস তার বাড়ির চারপাশে থাকে সবসময়।”
সারফারাজ নিচু চোখে ম্যাপটার দিকে তাকিয়ে রইলো।
ওর মুখশ্রী জুড়ে স্থিরতার ছাপ ফুটে থাকলেও ভেতরে ভেতরে কাজ করছে ভয়ংকর কোনো চাপ। আইজিপি আবারও বললেন….

—”আমার ধারণা, মেয়েটাকে চেয়ারম্যান নিজের বাড়িতেই রেখেছেন। কারণ গ্রামের ভিতরে আর কোথাও ওকে লুকানোর চেষ্টা করা হলে সেই খবর পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ার ভয় থাকবে চেয়ারম্যানের।”
সারফারাজ ধীর স্বরে বললো….
—”লোকটা খুব চালাক। বহু বছর ধরে এই এলাকায় ক্ষমতা ধরে রেখেছেন। তাই নিজের এলাকায় সে কখনো বাইরের কাউকে প্রবেশ করতে দিয়ে তার গোপনীয় কাজগুলোতে সন্দেহ প্রকাশ করার মতো সুযোগ দিবেন না।”
তেজ বললো….
—”ভাইয়া, আমরা কি সরাসরি চেয়ারম্যানের বাড়িতে আক্র*মণ করবো?”
সারফারাজ কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিলো….
—”না। আগে পরিস্থিতি বুঝতে হবে। অনু ভিতরে থাকলে ওর ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। চেয়ারম্যান কোণঠাসা হয়ে গেলে মেয়েটাকে ব্যবহার করতেও পারে।”
আইজিপি মাথা নেড়ে বললেন….
—”ঠিক বলেছো। তাই আমি স্পেশাল ফোর্সকে আগেই নির্দেশ দিয়েছি, আমার অর্ডার ছাড়া কেউ ভিতরে ঢুকবে না।”
পরপরই সারফারাজ হালকা ভ্রু কুঁচকে বললো….

—”এক মিনিট…!”
তেজ বললো….
—”কি হয়েছে ভাইয়া?”
সারফারাজ নিজের ফোন বের করে সময় দেখে বললো….
—”নির্ঝর বাসায় পৌঁছালে পিহুকে ফোন করে আমায় জানাতে বলেছিলাম। এখনও ফোন করে নি ও, তারমানে নির্ঝর এখনও বাসায় পৌঁছায় নি।”
কথাটা শুনে তেজ চমকে উঠে বললো….
—”কি!”
আইজিপি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন সারফারাজের দিকে। সারফারাজ তৎক্ষনাৎ পিহুকে কল করলো। দুইবার রিং হওয়ার পর পিহু কল রিসিভ করলো….
—”হ্যালো?”
—”নির্ঝর বাসায় ফিরেছে?”
—”না তো। এখনও আসে নি।”
সারফারাজের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো….

—”তুমি ওকে ফোন করেছিলে?”
—”নীরা করেছিলো কিছুক্ষণ আগে। কিন্তু ফোন বন্ধ বলছে।”
মুহূর্তেই গাড়ির ভেতরের পরিবেশ যেনো আরও থমথমে হয়ে গেলো। সারফারাজ কলটা কেটে দিলো। তেজ উৎকণ্ঠিত স্বরে বললো….
—”ভাইয়া, নির্ঝর কি তাহলে…!”
সারফারাজ গর্জে উঠে বললো….
—”ড্যামিট!”
সারফারাজের কণ্ঠের তীব্রতায় গাড়ির ভিতরের সবাই খানিক থমকালো। সারফারাজ এক হাত দিয়ে ওর কপাল চেপে ধরলো। চোখেমুখে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে রাগ আর চাপা ভয়ের ছাপ। কয়েক সেকেন্ড পর সারফারাজ ভয়ংকর ঠান্ডা স্বরে বললো….
—”আমি জানতাম, এই ছেলেটা কিছু একটা করবে।”
তেজ উদ্বিগ্ন হয়ে বললো….
—”ভাইয়া, নির্ঝর কি একাই গ্রামের দিকে চলে গিয়েছে?”
সারফারাজ ধীরে চোখ বন্ধ করলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য।
নির্ঝরের কান্নাভেজা মুখটা বারবার ওর চোখের সামনে ভেসে উঠছে। অনুকে নিজের কাছে পুনরায় ফিরে চাওয়ার আকুতি গুলো যেনো ওর কানে বাজছে। পরপরই সারফারাজ চোখ খুলে সোজা হয়ে বসে বললো…
—”ড্রাইভার, স্পিড বাড়ান।”
ড্রাইভার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিলো। সারফারাজ এবার আইজিপির দিকে তাকিয়ে বললো….
—”আমরা দেরি করে ফেলেছি।”
—”মানে?”
—”নির্ঝর ইতিমধ্যেই ওদের এলাকায় ঢুকে গেছে সম্ভবত।”
তেজের বুক ধক করে উঠলো। সে “ইয়া আল্লাহ…” বলে উঠলো। সারফারাজ ঠান্ডা স্বরেই বললো….
—”চেয়ারম্যানের লোকেরা যদি নির্ঝরকে পেয়ে যায় তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।”
গাড়ির গতি আরও বেড়ে গেলো। মনে হচ্ছে রাতের অন্ধকার চিঁরে একের পর এক গাড়িগুলো ছুটে চলছে চেয়ারম্যানের বাড়ির দিকে।

নির্ঝর ধীরপায়ে একটু সামনে আগাতেই ওর চোখ পড়লো দোতলায়। ভিতর থেকে কোনো নারী কন্ঠে, ‘দরজা খুলে দে, খুলে দে বলছি, নয়তো তোদের সব ক’টাকে আমি রা দাঁ দিয়ে কুঁ*পি*য়ে মা*রবো, খুলে দে দরজা’ এমন শক্তিশালী শব্দগুলো ভেসে আসতে শুনে নির্ঝর মনে মনে বললো…..
—”এটা তো মনে হচ্ছে অনুর কন্ঠ। তবে কি ওরা অনুকে দোতলার ঐ ঘরে বন্দী করে রেখেছে! কিন্তু আমি অনুর কাছে পৌঁছাবো কিভাবে!”

ভাবতে ভাবতেই নির্ঝর অনুর রুমের সাইডের চারপাশটাতে নজর বুলালো। আরেকটু এগিয়ে এসে প্রায় বিল্ডিং এর দেওয়াল ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার বটগাছটার সাথে হেলান দিয়ে একবার ক্লান্তির শ্বাস ছাড়লো। গাছটার চারপাশ দিয়ে মোটা ও শক্তপোক্ত লতা গুলো ঝুলছিলো। নির্ঝর কি বুঝে একেবারে সন্নিকটে থাকা লম্বায় প্রায় মাটি ছুঁয়ে নিয়েছে মোটা ও শক্ত-পোক্ত একটি লতা ধরে নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে আরো নিচের দিকে টানলো কয়েকবার। হয়তো পরীক্ষা করলো এই লতা ওর ভর সইতে পারবে কিনা! নির্ঝর এবার মনে মনে একটু আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলো। পরপরই আল্লাহর নাম নিয়ে নির্ঝর শব্দ করে একবার নিঃশ্বাস ফেলে লতাটা নিজের কোমরে বেঁধে নিলো। এরপর দু’হাত দিয়ে শক্ত করে পেঁচে ধরে গাছের সাথে পা ঠেকিয়ে কায়দা করে একটু একটু করে উপরের দিকে উঠতে শুরু করলো। মনে মনে আল্লাহর নাম জপছে। একবারের জন্যও নিচের দিকে তাকাচ্ছে না নির্ঝর। যখন কারোর ইচ্ছাশক্তি দৃঢ় হয় তখন আল্লাহর রহমতে নিশ্চয়ই সে তার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। নির্ঝরের ক্ষেত্রেও হয়তো তেমনটাই হলো। ২য় তলার কাছাকাছি যে ডালটা সেই ডালের উপর উঠে বসলো নির্ঝর। জোড়ে জোড়ে শ্বাস ফেলতে শুরু করেছে সে। রিস্ক নিতে সর্বদা ভ*য় পাওয়া ছেলেটা আজ একের পর এক রিস্কি কাজ করে চলেছে। তেজটা এখানে থাকলে নিশ্চিত অজ্ঞান হতো তার গুনধর ভিতু ভাইটার কাজ ও সার্প মাইন্ড দেখে।
নির্ঝরের শরীর ঘামে ভিজে গিয়েছে ইতিমধ্যেই। মনে মনে ভ*য়ও কাজ করছে কিছুটা৷ এখান থেকে ওকে এক দফায় নিজ লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে। নয়তো ধরা পড়া নিশ্চিত। আর ধরা পড়লে অনুর জীবনের রিস্ক আরো বেড়ে যাবে। নির্ঝর ওর নিজের জীবন নিয়ে কোনো প্রকার চিন্তা করছে না এইমূহূর্তে। করতে গেলেই হয়তো মনোবল হারাবে, দূর্বল হয়ে পড়বে, লক্ষ্য থেকে বিভ্রান্ত হবে। নির্ঝর আর দেড়ি না করে নিজের স্থান থেকে অনুর রুমের বেলকনি পর্যন্ত দূরত্বটাকে চোখের মাপে মেপে নিলো।

অনু ওর ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে মেঝের উপর বসে আছে। দরজার সাথে ঠেকিয়ে রেখেছে পিঠটা৷ অনবরত ভাবে কাঁদছিলো অনু। সপিং মলে যখন ও চেয়ারম্যানের লোকদের মুখোমুখি হয়েছিলো তখন ওর খানিক ভরকে গিয়েছিলো। চিনেও না চেনার ভান ধরে পাশ কাটাতে নিলে তাদের মধ্যে একজন লোক বলেছিলো…..
“তোর মা এখনও বেঁচে আছে। সেই রাতে তাঁকে পুরোপুরি ভাবে মে*রে ফেলা হয় নি। কিন্তু তোর বাপ-টা ঐ দাঁ*য়ের এক কোঁ*প খেয়েই কুঁ*পো কাঁত হয়ে গিয়েছে। পটল তুলেছে যাকে বলে। যদি চাস ওর মা বেঁচে থাকুক তাহলে কোনো প্রকার ঝামেলা না করে আমাদের সাথে চল।”
অনু তৎক্ষনাৎ পিছন ঘুরে তাকালো লোক গুলোর দিকে। প্রত্যেকের মুখেই লোগে আছে পৈ*শা*চিক হাসির রেখা। অনু জোড়ালো কন্ঠে বললো….
—”মিথ্যে বলছেন আপনারা। আমার মা বেঁচে নেই আমি জানি। মে*রে ফেলেছেন সেই রাতেই আপনারা আমার মা’কে। আর এখন মিথ্যে বলে আমাকে ফাঁ*দে ফেলে নিজেদের সাথে নিয়ে যাওয়ার নোং*রা পরিকল্পনা করেছেন।”

—”তোকে উঠানোর জন্য এতো শতো পরিকল্পনা করার প্রয়োজন আমাদের চেয়ারম্যান সাহেবের পড়বে না। তার যে ক্ষমতা ও পরিচিত খুব সহজেই তোকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু তোর মা’টা সারাদিন রাত খালি বিলাপের মতো তোর নাম নেয়, তোরে একবার দেখতে চায় তা দেইখা চেয়ারম্যান সাহেবের মায়া হইছিলো তাই আমাদের শহরে পাঠাইছিলেন তন্ন তন্ন করে খুঁজে হলেও তোকে বের করতে। এরপর সম্মানের সহিত তোকে গ্রামে আনতে। যা হওয়ার ছিলো তা তো হয়েই গিয়েছে। তোর মা যেই মাই*র গুলো খাইছিলো সেই রাতে এতেই তাঁর শা*স্তির ঘড়া পূর্ণ হইছে। তাই তারে এখনও বাঁচাইয়া রাখছে। ধুঁ*কে ধুঁ*কে ম*রণের দিকে যাচ্ছে তোর মা তার শেষ ইচ্ছাটা তুই পূরণ করবি নাকি না এবার তোর ইচ্ছে সেটা।”
অনু যেনো পাথরের ন্যায় স্থির হয়ে গিয়েছে কথাগুলো শুনে। কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর অনু বললো…
—”আমি যাবো। যাবো আমার মায়ের কাছে।”

অতঃপর অনুকে নিয়ে সপিং মল থেকে বাঁধাহীন ভাবে বাহিরে এসে নিজেদের আগে থেকে দাঁড় করানো গাড়িতে উঠে বসে গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা করলো চেয়ারম্যানের লোকগুলো। গাড়ি ছাড়া মাত্র পিছন থেকে একজন লোক অনুর মুখের উপর রুমাল রাখলো। পরপরই অনু ওর জ্ঞান হারিয়ে ফেললো। লোকটা বললো…..
—”বয়স কম তো তাই বুদ্ধির দৌড়ও কম। খুব সহজেই আমাদের পাতানো ফাঁ*দে তাই পা’টা দিয়েই দিলো। এবার যাবতীয় হিসাব এর উপর আমাদের সাহেব নিবে।”
এরপর অনুর যখন সেন্স ফিরে আসে তখন ও নিজেকে এই ঘরের ভিতরেই আবিষ্কার করে। তখন থেকেই অনু দরজাটা খোলার জন্য চিৎকার-চেঁচামেচি করছিলো। এতোএতো চিন্তার মাঝে অনু বেলকনির দিকে খেয়াল পর্যন্ত করে নি এখনও। যদি করতো তাহলে হয়তো কোনো উপায় সে পেয়ে যেতো অনেক আগেই।
নির্ঝর ডালের উপর উঠে দাঁড়িয়ে শক্ত করে ডালটা দু’হাতে আগের ন্যায় পেঁচিয়ে ধরে দিলো এক লাফ। আল্লাহর অশেষ রহমতে নির্ঝর এর লাফ দেওয়াটা সফল হলো। সে সরাসরি বেলকনির উপরে এসেছে পড়েছে। কিন্তু এমন কাজে ব্য*থাটা সে ভালোই পেয়েছে। নির্ঝরের ডান পা’টা হালকা বাঁকানো অবস্থায় পড়ায় ও দাঁতে-দাঁত পিষে নিজের শরীরের বাহ্যিক ব্যথাগুলো এইমূহূর্তে গি*লে নিলো। তবুও ওর দাঁতে ফাঁস দিয়ে ‘উফহহহ’ নাম চাপা শব্দ বের হলো।

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৯

সামনের সাইড থেকে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ হতেই অনুর হাতে থাকা ধাঁ*রা*লো ব্লেডটা মেঝের উপর পড়ে গেলো। অনু কোনোভাবেই যখন পালানোর রাস্তা আর খুঁজে পাচ্ছিলো না তখন ও মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলো এই ব্লেডটা দিয়ে ও নিজের হাতের শিরা কেঁ*টে ফেলবে। কারণ চেয়ারম্যান নিজে এসে হুঁ*মকি দিয়ে গিয়েছে যদি বাঁচার ইচ্ছে থাকে তাহলে তার চল্লিশোর্ধ্ব মানসিক ভারসাম্যহীন সেই পাগল ছেলেটাকে ওর বিয়ে করতে হবে। যেই ছেলের সাথক বিয়ে না দেওয়ার জন্য অনুর মা ওকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করতে গিয়ে হারিয়ে ছিলেন নিজের প্রাণ এই সেই ছেলে। অনু মনে মনে ঠিক করেছিলো, ‘চেয়ারম্যানের হাতেও মরবে না ও আর না ঐ ছেলেকে বিয়ে করবে। মৃ*ত্যুই যখন ওর সামনে খোলা একমাত্র পথ তখন ও ওর মায়ের মতোই হাসতে হাসতে নিজ হাতে নিজের প্রাণটা ত্যাগ করবে।’
ধপ করে হওয়া শব্দটা পেয়ে অনু চট করে উঠে দাঁড়িয়ে বললো….
—”কে? কে ওখানে?”

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪১