নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৪
নাজনীন নেছা নাবিলা
মিহালের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট রবিন শেষমেশ দোলনা নিয়ে হাজির হলো। দোলনাটি বারান্দায় ঠিকঠাক জায়গামতো সেটিং করে দেওয়ার জন্য সে সাথে করে একজন মিস্ত্রিকেও নিয়ে এসেছে। বারান্দায় লোক আসায় নীলা আর মিহাল তাদের কাজ করার জায়গা ছেড়ে দিয়ে ঘরের ভেতরে ফিরে এল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ইকরা আর মুনাভি এসে দাঁড়াল তাদের ঘরের দরজায়। মৃদু নক করে দুজনে একসাথে ঘরের ভেতর পা রাখল।
তারা ঘরে ঢুকতেই নীলার তীক্ষ্ণ নজর সর্বপ্রথম গিয়ে ঠেকল মুনাভির হাতে ছিল তার পার্সোনাল ল্যাপটপ সেখানে। এই ল্যাপটপের ভেতরেই পরম যত্নে লক করে রাখা আছে মিহাল কিডন্যাপ হওয়ার সেই নির্দিষ্ট দিনটির সম্পূর্ণ সিসিটিভি ফুটেজ, যা এখন এই রহস্যের জট খোলার মূল চাবিকাঠি। মুনভি মিহালের একদম কাছাকাছি গিয়ে বেশ গম্ভীর গলায় বলল__
“মিহাল, তোর সাথে খুব জরুরি কথা আছে। সেদিন যখন তোকে খোঁজার জন্য আমি আর ইকরা হন্যে হয়ে বের হয়েছিলাম, তখন ইউনিভার্সিটির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়েই আমি ওখানকার সিসিটিভি ফুটেজটা নিজের জিম্মায় নিয়ে নিই। আর সেই ফুটেজেই এমন কিছু একটা ধরা পড়েছে, যা আমাদের জন্য মস্ত বড় একটা প্রমাণ যে এই কিডন্যাপিংয়ের পেছনে আসলে কার হাত ছিল।”
মুনাভি নিজের কথাটুকু শেষ করতে না করতেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নীলা অত্যন্ত অবলীলায় বলে উঠল__
“নিঃসন্দেহে এই কিডন্যাপিং লিসা স্বয়ং নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করিয়েছে।”
নীলার মুখে এমন সরাসরি লিসার নাম শুনে ইকরা আর মুনভি দুজনেই একেবারে আকাশ থেকে পড়ল। তাদের চোখে-মুখে চরম বিস্ময়। কারণ, সিসিটিভি ফুটেজে কী আছে না আছে, তা নিয়ে তারা এখনো নীলা কিংবা মিহাল কাউকেই একটি সত্য কথাও বলেনি। তাহলে নীলা কোনো প্রমাণ দেখা ছাড়াই এতটা নিশ্চিতভাবে কীভাবে লিসার নাম বলে দিতে পারল? তবে নীলার এই চটজলদি মন্তব্য শুনে মিহাল কিন্তু বিন্দুমাত্র অবাক হলো না। কারণ, বিগত দিনের অভিজ্ঞতা থেকে সে খুব ভালো করেই জানে নীলা যতবার যার নামে কোনো অভিযোগ এনেছে বা দোষ দিয়েছে, শেষমেশ সে-ই আসল দোষী প্রমাণিত হয়েছে। নীলা মির্জা আর যাই হোক, জীবনে কখনো আন্দাজে বা কোনো ভিত্তি ছাড়া কারও নামে দোষ দেয় না। এই ধ্রুব সত্যটা মিহাল এখন খুব ভালো করেই বুঝে গেছে।
মিহাল মুনভির দিকে তাকিয়ে ধীরস্বরে বলল__
“আমরা সবাই মিলে ছাদে গিয়ে এই বিষয়ে কথা বলি।”
নীলা একঝলক ইকরার দিকে তাকাল। তারপর মিহালদের উদ্দেশ্য করে বলল__
“আপনারা দুজন যেতে থাকেন, আমরা আসছি।”
মিহাল আর মুনভি মাথা নেড়ে সায় দিয়ে ছাদের দিকে পা বাড়াল। তারা চোখের আড়াল হতেই ইকরা দুজন মিলে একসাথে নিচে নেমে এল। নিচের ড্রয়িংরুমে তখন নীলার ফুফু মিনা মির্জা এবং মিনু চৌধুরী পাশাপাশি বসে জমিয়ে গল্প করছিলেন। মুনভির বাবা অবশ্য একটা জরুরি কাজে একটু আগেই বাইরে চলে গেছেন। নীলা আর ইকরা কথা বলতে বলতে ঠিক তাদের সামনে গিয়ে থামল। নীলা নিজের ফুফুর দিকে তাকিয়ে অনুমতি নেওয়ার ভঙ্গিতে বলল__
“ফুফু, আমরা সবাই মিলে ছাদে একটু আড্ডা দিতে যাচ্ছি।”
মিনা মির্জা এবং মিনু চৌধুরী নিজেদের কথা থামিয়ে হাসিমুখে তাদের দুজনের দিকে তাকালেন। মিনা মির্জা স্নেহের স্বরে মুচকি হেসে বললেন__
“এখানে অনুমতি নেওয়ার কিছু নেই রে মা। তোরা ছাদে গিয়ে প্রাণখুলে আড্ডা দে, আমি সার্ভেন্টকে দিয়ে ওখানে কিছু স্ন্যাক্স আর ড্রিঙ্কস পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
নীলা আর ইকরা মাথা নেড়ে সায় দিয়ে সোজা ছাদের দিকে চলে গেল। ছাদে পা রাখতেই এক মনোরম পরিবেশ তাদের চোখ জুড়িয়ে দিল। ছাদের এক কোণে আড্ডা দেওয়ার জন্য চমৎকার একটা ছাউনি তৈরি করা আছে। সেখানে বসার জন্য রয়েছে গোল গোল কিছু আরামদায়ক চেয়ার, আর ঠিক মাঝখানে পাতা একটা ছোট টেবিল। মুনভি আর মিহাল ইতিমধ্যেই সেখানে বসে এক মনে ল্যাপটপের স্ক্রিনে কিছু একটা দেখছিল। নীলা আর ইকরা ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে তাদের পাশের চেয়ারগুলোতে বসল। তারা বসামাত্রই মিনা মির্জার কথামতো দুজন গৃহকর্মী সেখানে হাজির হলো। তারা সবার জন্য কিছু হালকা স্ন্যাক্স ও ফলের জুস টেবিলে সাজিয়ে দিল, আর মিহালের জন্য নিয়ে এল এক মগ ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফি। গৃহকর্মীরা খাবার পরিবেশন করে চলে যেতেই নীলা চটপটে হাতে সবার দিকে জুসের গ্লাসগুলো বাড়িয়ে দিল। সবাই থিতু হতেই মুনভি ল্যাপটপের স্ক্রিনটা ঘুরিয়ে দিল নীলার দিকে। নীলা গভীর মনোযোগ দিয়ে সম্পূর্ণ ভিডিওটি দেখল। সিসিটিভি ফুটেজে লিসার কাণ্ডকারখানা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই রাগে নীলার পুরো শরীর রি রি করে উঠল। সে কিছুতেই তার মাথায় ঢুকতে পারছে না যে এই মেয়েটার আসলে সমস্যাটা কোথায়। কেন সে হাত ধুয়ে এভাবে তাদের পেছনে পড়ে আছে। পাশে বসা মিহালের অবস্থাও তখন একই রকম। রাগে তার মাথার রগগুলো দপদপ করছে। এই মেয়েকে সে নিজে একবার কঠিন হুমকি দিয়ে এসেছিল, বড়সড় সতর্কবার্তা দিয়েছিল, তাও মেয়েটার নূন্যতম শিক্ষা হয়নি। এবার আর শুধু মুখে মুখে হুমকি দিয়ে ক্ষান্ত হওয়া যাবে না, লিসাকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য এখন বড় কোনো পদক্ষেপ নিতেই হবে। নীলা সবার দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল__
“আমি কি ভিডিওটি আমার ফোনে নিতে পারি?”
মুনভি এবং মিহাল দুজনেই মাথা নাড়িয়ে সায় জানাল। নীলা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে মিহালের দিকে নিজের ফোনটা বাড়িয়ে দিল। মিহাল ল্যাপটপ থেকে ভিডিওটি নীলার ফোনে ট্রান্সফার করতে শুরু করল।
এদিকে নীলা চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ দুটো বুজে ফেলল। তার মনের ভেতর একটা প্রশ্নই বারবার পাক খাচ্ছে। লিসার যদি কোনো ক্ষতি বা কিডন্যাপ করতেই হতো, তবে সে নীলাকে টার্গেট করতে পারত। কিন্তু সে নীলাকে বাদ দিয়ে মিহালকে কেন নিজের নিশানা বানাল? এর পেছনে আসল উদ্দেশ্যটা কী? কিছুক্ষণের মধ্যেই নীলার ফোনে ভিডিও নেওয়ার কাজ শেষ হলো। মিহাল ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে নীলার দিকে তাকাতেই দেখল, মেয়েটা চোখ বন্ধ করে গভীর কোনো চিন্তায় ডুবে আছে। সে নিজের ব্ল্যাক কফির কাপে একটা আলতো চুমুক দিয়ে নীলাকে উদ্দেশ্য করে বলল__
“কী ভাবছ?”
মিহালের চেনা কণ্ঠস্বর কানে আসতেই নীলা ধীর পায়ে নিজের চোখের পাতা মেলল। ল্যাপটপ থেকে মুখ সরিয়ে মুনভি আর ইকরাও তখন কৌতূহলী দৃষ্টিতে নীলার দিকেই তাকিয়ে রইল। নীলা কিছুটা সময় নিয়ে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল__
“লিসার যত ক্ষোভ বা রাগ, সব তো আমার ওপর থাকার কথা। কারণ ওকে আমি বারবার সবার সামনে হেনস্তা করেছি, ওর অন্যায়ের শাস্তি দিয়েছি। তাহলে প্রতিশোধ নিতে হলে ওর তো আমাকে কিডন্যাপ করার কথা ছিল, তাই না? কিন্তু তা না করে লিসা কেন ওনাকে কিডন্যাপ করালো?”
নীলার এই যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন শুনে সবাই বেশ কৌতূহলী হয়ে উঠল এবং পুরো বিষয়টা নিয়ে নতুন করে ভাবতে লাগল। সবার এই ভাবনার মাঝেই নীলা আবার বলে উঠল__
“যদি ইউনিভার্সিটির ভেতরের সেদিনের সিসিটিভি ফুটেজটা পাওয়া যেত, তাহলে হয়তো এর আসল কারণটা জানা যেত।”
নীলার কথা শুনে বাকি তিনজন এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। মিহাল কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করল। সে দ্রুত কাউকে একটা ফোন লাগিয়ে বেশ গম্ভীর গলায় অর্ডার দিল, যেন ইউনিভার্সিটিতে গতকালের তার লাস্ট ক্লাসের পরের সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ আধা ঘণ্টার ভেতর তার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সে পুরো ইউনিভার্সিটির ফুটেজটাই চাচ্ছিল। ঠিক তখনই নীলা তাকে থামিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল__
“সম্পূর্ণ ইউনিভার্সিটির সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে শুধু শুধু সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। তার চেয়ে বরং আপনার ক্লাস থেকে বের হওয়ার পর আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলেছিলাম সেখানকার, আশেপাশের করিডোর আর পেছনের গেট দেখা যায়, এমন নির্দিষ্ট কিছু জায়গার ফুটেজ নিন।”
মিহাল নীলার বুদ্ধিমত্তার তারিফ না করে পারল না। সে নীলার কথা মতো ক্যামেরার জায়গাগুলো ফোনে উল্লেখ করে ওপাশের মানুষটিকে বলল, এই নির্দিষ্ট ফুটেজগুলো যেন এক্ষুনি তার ল্যাপটপে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মিহাল ওপাশের মানুষের সাথে কথা শেষ করে ফোনটা কেটে দিল। ছাদের ওপরে তখন এক থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে। সবার মনেই টানটান উত্তেজনা।
কিছুক্ষণের মাঝেই মিহালের ফোনে পরপর কয়েকটি নোটিফিকেশনের শব্দ হলো। সম্ভবত কাঙ্ক্ষিত সেই সিসিটিভি ফুটেজগুলো চলে এসেছে। যেহেতু নীলার ফোনটা আগে থেকেই ল্যাপটপের সাথে কানেক্ট করা ছিল, তাই মিহাল এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে নিজের ফোন থেকে ফুটেজগুলো সরাসরি নীলার ফোনে ট্রান্সফার করে নিল। ল্যাপটপের বড় স্ক্রিনে ভিডিওগুলো চালু করলে সবাই একসাথে খুব স্পষ্ট করে দেখতে পাবে। এই মুহূর্তে চারজোড়া চোখ স্থির হয়ে রইল ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে। নীলা মিহালের দিকে তাকিয়ে বেশ শান্ত গলায় বলল__
“সবার আগে করিডোরের সেই সিসিটিভি ফুটেজটা চেক করেন, যেখানে আমরা দাঁড়িয়ে কথা বলেছিলাম। তবে একটা বিষয় মনে রাখবেন, আমরা সেখান থেকে চলে যাওয়ার ঠিক পরের সময়টুকুর ফুটেজ আগে ভালো করে দেখতে হবে।”
মিহাল নীলার কথামতো ঠিক তা-ই করল। তারা দুজন কথা বলতে বলতে করিডোর পেরিয়ে যখন মেইন গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তার পরের কয়েক মিনিটের ভিডিও সে স্ক্রিনে অন করল। এবার সবাই যার যার জুসের গ্লাস টেবিলের ওপর রেখে অত্যন্ত গভীর মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপের দিকে ঝুঁকে বসল।
ভিডিওটা কিছুক্ষণ একনাগাড়ে চলতে থাকল। হঠাৎ দেখা গেল, সেই ফাঁকা করিডোরে হনহন করে এসে দাঁড়াল লিসা। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তখন মেইন গেটের দিকে নিবদ্ধ, যেদিকটায় মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে নীলা আর মিহাল হেঁটে গেছে। ঠিক তার পরেই দেখা গেল, লিসা হাতের ইশারায় কাউকে আড়ালে ডেকে নিল এবং সাথে সাথে একটা লোক এসে তার সামনে দাঁড়াল। ল্যাপটপের স্ক্রিনে সেই লোকটার অবয়ব স্পষ্ট হতেই নীলা আর মিহাল এক নিমিষে তাকে চিনে ফেলল। কারণ, এই লোকটাই সেদিন মিহালকে গাড়ি নিয়ে কিডন্যাপ করতে এসেছিল। সিসিটিভি ফুটেজে লিসা আর সেই লোকটার কথোপকথন শোনা গেল। লিসা মেইন গেটের দিকে আঙুল উঁচিয়ে ইশারা করে লোকটিকে খুব ঠাণ্ডা গলায় বলল__ “ফাস্ট ওয়ান।” কথাটি শেষ করেই সে আর সেখানে দাঁড়াল না, গটগট করে করিডোর ছেড়ে চলে গেল। লোকটিও তার নির্দেশ পেয়ে উল্টো পথে পা বাড়াল ।ভিডিওটা শেষ হতেই নীলা, মিহাল, মুনভি আর ইকরা সবাই চরম বিস্ময় নিয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। কারণ, লিসা এখানে স্পষ্ট করে কারও নাম মুখে নেয়নি যে কাকে তুলে নিয়ে যেতে হবে। সে শুধু বলেছিল সামনের জনকে লক্ষ্য করতে। নীলা নতুন এই জটিল চিন্তার গ্যাঁড়াকলে পড়ে ক্লান্ত হয়ে আবার চোখ দুটো বন্ধ করল। সে নিজের মনের ভেতর খুব গভীরভাবে চারিয়ে নিতে লাগল সেদিনের প্রতিটি মুহূর্তের দৃশ্য। হঠাৎ করেই মনের পর্দায় এক চিলতে আলো জ্বলে উঠতেই সে চট করে চোখ মেলে তাকাল। এক অদ্ভুত উত্তেজনা নিয়ে সে তাড়াহুড়ো করে বলে উঠল__
“সেদিন তো মেইন গেটের দিকে যাওয়ার সময়ে প্রথমে আপনি আমার পেছনে ছিলেন, আর আমি ছিলাম আপনার সামনে। কিন্তু কিডন্যাপ হওয়ার ঠিক কয়েক সেকেন্ড আগেই আপনি পা বাড়িয়ে আমার সামনে চলে এসেছিলেন, মনে আছে? তার মানে কি এমন হতে পারে যে, লিসা আসলে আমাকেই কিডন্যাপ করাতে চেয়েছিল? কিন্তু ওই লোকগুলো লিসার ‘ফাস্ট ওয়ান’ কথাটার সূত্র ধরে ভুল করে আপনাকে প্রথম জন ভেবে তুলে নিয়ে গেছে! কারণ আপনাকে কিডন্যাপ করার পেছনে লিসার তো কোনো জোরালো কারণ থাকার কথা নয়, কিন্তু আমাকে গায়েব করার পেছনে ওর হাজারটা ক্ষোভ আর কারণ লুকিয়ে আছে।”
নীলার মুখ থেকে এই নতুন সমীকরণ শোনার পর ছাদের ওপর বসা প্রতিটি মানুষের মাথা যেন সায় দিল। সবার কাছেই নীলার এই নিখুঁত বিশ্লেষণটা একদম যুক্তিসঙ্গত আর সত্যি বলে মনে হলো। মিহাল শক্ত চোয়ালে ল্যাপটপটা বন্ধ করতে করতে বলল__
“তোমার কথাই ঠিক নীলাঞ্জনা। এই অসভ্য মেয়েটা আসলে তোমাকেই কিডন্যাপ করতে চেয়েছিল, কিন্তু ওর ভাড়াটে গুণ্ডারা ভুল করে প্রথম জন ভেবে আমাকে তুলে নিয়ে গেছে। এই চরম স্পর্ধার দাম ওকে হাড়েনহারে দিতে হবে।”
মিহালের এমন ক্রুদ্ধ কথায় মুনভি আর ইকরাও একমত হয়ে মাথা নাড়ল। তবে নীলার মনের ভেতর তখন অন্য কোনো গভীর চাল কিংবা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল, যা সে মুখে প্রকাশ করল না। ছাদে আরও কিছুক্ষণ থমথমে আড্ডা চলার পর সবাই মিলে এক এক করে নিচে নেমে এল। মুনভিকে তার নিজের হাসপাতালে ফিরতে হবে, তাই সে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
ইকরাও কোনো উপায় না দেখে তার জন্য বরাদ্দ করা সেই ঘরটিতে ফিরে গেল। মন না চাইলেও আপাতত যে তাকে এই চার দেওয়ালে বন্দি হয়েই থাকতে হবে, তা সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে।
এদিকে নীলা আর মিহাল নিজেদের শোবার ঘরে ফিরে এল। রুমে পা রাখতেই নীলা আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে সরাসরি বারান্দার দিকে ছুটে গেল। কারণ, সে খুব ভালো করেই জানে যে এতক্ষণে তার সেই কাঙ্ক্ষিত দোলনা তৈরি হয়ে গেছে। আর বারান্দার থাই গ্লাস ঠেলে বাইরে আসতেই এক অদ্ভুত মুগ্ধতায় জড়িয়ে গেল তার চোখদুটো। সুইমিংপুলের ঠিক পাশেই, খোলা আকাশের নিচে সুন্দর করে সাজানো রয়েছে সম্পূর্ণ আধুনিক ও চমৎকার একটি দোলনা।
দোলনাটি সম্পূর্ণ ভারী মেটালের তৈরি এবং এর পুরো ফ্রেমে চমৎকার লতাপাতার নকশা খোদাই করা। এর পুরো ধাতব অবয়বটি গাঢ় নীল রঙে রাঙানো। এটি একটি সোফা-স্টাইলের চওড়া ও সমান্তরাল আসন। বসার মূল অংশটিতে একদম নরম ও আরামদায়ক নীল রঙের মখমলের গদি বিছানো রয়েছে। দোলনাটি ওপর থেকে ঝুলে থাকার জন্য দুই পাশে শক্ত চেইন বন্ধন রয়েছে, যা ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ঘন সবুজ পাতার কৃত্রিম লতা দিয়ে সম্পূর্ণ মোড়ানো। দুই পাশের সবুজ লতার মালা এবং দোলনার ব্যাকরেস্টের ওপর থরে থরে কৃত্রিম নীল রঙের জবা ফুল নিখুঁতভাবে সাজানো রয়েছে। নিজের মনের মতো এই সুন্দর ও পরিপাটি দোলনাটি দেখে নীলা খুশিতে একেবারে আত্মহারা হয়ে গেল।
নীলা একছুটে গিয়ে দোলনাটায় বসে পড়ল। সামনে আইফেল টাওয়ার, পাশে টলটলে জলের পুলের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। আর এমন মনের মতো দোলনা সব মিলিয়ে তার ভেতরের আনন্দটুকু আর বাঁধ মানছিল না। সে পরম শান্তিতে চোখ বুজে একা একাই দোল খেতে লাগল। কিন্তু হঠাৎ করেই এক জোড়া শক্ত হাত এসে দোলনার দুলুনিটা থামিয়ে দিল। আচমকা এই বাধায় নীলার মুখের চওড়া হাসিটা নিমেষেই মিলিয়ে গেল। কে এমন রসকষহীন মানুষ যে এসে তার আনন্দের মুহূর্তটা মাটি করল, তা দেখার জন্য সে একটু বিরক্ত হয়েই পেছনে তাকাল। পেছনে ফিরতেই দেখল, মিহাল দুহাতে দোলনার ফ্রেমটা ধরে তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। মিহালের সেই সুন্দর চাউনি দেখা মাত্রই নীলার ঠোঁটেও হারানো হাসিটা পুনরায় জোরালো হয়ে ফুটে উঠল। মিহাল এবার একটু ঝুঁকে নীলার কানের একদম কাছে নিজের মুখটা নামিয়ে এনে ফিসফিসিয়ে বলল__
“একা একা কষ্ট করে কেন ঝুলছেন আপনি নীলাঞ্জনা? আপনার প্যারালাল তো এখনো বেঁচে আছে, তাই না?”
মিহালের এমন আদুরে কথায় নীলা মোটেও গলে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে বেশ একটু ভাব নিয়ে, ঘাড় উঁচিয়ে বলল__
“তা তো বটেই! আমিও আজ দেখতে চাই আমার প্যারালাল আমার জন্য কী করতে পারে।”
নীলার এই চটপটে চ্যালেঞ্জ শুনে মিহাল সোজা হয়ে দাঁড়াল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অহংকারের হাসি ফুটিয়ে সে খুব আয়েশ করে নিজের শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত ফোল্ড করে নিল। যেন মস্ত বড় কোনো যুদ্ধজয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারপর সে অত্যন্ত সাবধানে নীলার দোলনাটায় ধীরে ধীরে ধাক্কা দিতে শুরু করল। একটু সময় নিয়ে সে দোলনার গতিটা আরেকটু বাড়িয়ে দিল। দোলনাটা যখন দুলতে দুলতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন নীলার ঝুলন্ত পা দুটো সুইমিংপুলের শীতল জলকে বারবার আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে আসছে। এই অদ্ভুত সুন্দর অনুভূতিতে নীলা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। সে একদম ছোট বাচ্চাদের মতো হাততালি দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। তার সেই বাঁধভাঙা, পবিত্র হাসির সুরে মিহালের পুরো ঘর আর বারান্দা যেন এক অপার্থিব উৎসবে মেতে উঠল। মিহালের এই নিঝুম, গুমোট ঘরে কোনোদিন এমন আনন্দ কিংবা উল্লাসের জোয়ার আসেনি। আর সে নিজেও কখনো তার এই রূপসীকে এতখানি প্রাণখুলে হাসতে দেখেনি। এর আগে নীলা যতবারই হেসেছে, তা ছিল স্রেফ ঠোঁটের কোণের এক চিলতে মৃদু মুচকি হাসি। কিন্তু আজ, এই পড়ন্ত দুপুরে প্রথমবারের মতো সে তার হৃদয়ের রানী নীলাঞ্জনাকে সবটুকু জড়তা ভুলে এমন মন খুলে হাসতে দেখল। এই হাসির শব্দ যেন মিহালের বুকের ভেতর বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা সমস্ত ক্লান্তি এক নিমেষে ধুয়েমুছে সাফ করে দিল। নীলার সেই খিলখিল হাসির সুর কানে আসতেই মিহালের বুকের ভেতর কেমন যেন এক অদ্ভুত আলোড়ন সৃষ্টি হলো। তার মনে হতে লাগল, এই পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত সে যত সুর কিংবা আওয়াজ শুনেছে, তার মধ্যে এটিই বোধহয় সবচেয়ে মধুর ও সুন্দরতম ধ্বনি। দোলনায় দুলতে থাকা হাসিখুশি নীলার দিকে তাকিয়ে মিহাল এক মুহূর্তের জন্য পলক ফেলতে ভুলে গেল। তার মনে হলো, চোখের সামনে ভেসে থাকা এই রূপটুকুই তার জীবনের দেখা সেরা এবং সবচেয়ে নিখুঁত দৃশ্য। এই অপার্থিব হাসির মায়াময় রূপ দেখে মিহালের মনে হলো ঠিক যেন এক পশলা মেঘ কেটে গিয়ে বিস্তীর্ণ নীল আকাশে একঝাঁক তপ্ত সূর্য একযোগে মিষ্টি আলো ছড়িয়ে ঝিলমিল করছে।
লিসা নিজের ঘরের বিছানায় বসে এক মনে দাঁত দিয়ে নখ কাটছিল। তার চোখের ঘুম, মুখের অন্ন আর শরীরের আরাম সব যেন এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। মনের ভেতর এক ভয়ঙ্কর অস্থিরতা অনবরত মোচড় দিচ্ছে। সে চাইলে খুব সহজেই ইউনিভার্সিটির আইটি রুমে লোক পাঠিয়ে সেই নির্দিষ্ট দিনের সিসিটিভি ফুটেজটুকু চিরতরে ডিলিট করিয়ে দিতে পারত। কিন্তু আসল মস্ত বড় সমস্যাটা হলো অন্য জায়গায়। তার নিজের বাবাই হলেন সেই নামকরা ইউনিভার্সিটির প্রধান প্রিন্সিপাল। এখন সে যদি কোনো হ্যাকার বা বাইরের লোক দিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব করতে যায়, তবে সেই লোক যদি কোনোভাবে টাকার লোভে কিংবা ভয়ে তার বাবার কাছে সত্যটা ফাঁস করে দেয় তাহলে এক পলকেই তার সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। তাছাড়া হুট করে মাঝখান থেকে একটা নির্দিষ্ট দিনের ফুটেজ ডিলিট করার পেছনে বাবার কাছে দেখানোর মতো কোনো যৌক্তিক কারণও লিসার কাছে নেই। এদিকে নিজের অপরাধের মস্ত বড় প্রমাণটা সিসিটিভি ক্যামেরার মেমোরি কার্ডে অক্ষত রয়ে গেছে ভেবে তার বুকের ভেতরটা ভয়ে দপদপ করছে।
এক গভীর আশঙ্কা তাকে গ্রাস করে চলেছে একেবারে হাতেনাতে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। কারণ লিসা খুব ভালো করেই জানে, মিহালদের মতো প্রভাবশালী মানুষের কাছে একবার যদি তার আসল চেহারাটা ফাঁস হয়ে যায়, তবে তার জীবনের সব চ্যাপ্টার সেখানেই ক্লোজ। আর তার বাবা ও তাকে ছাড় দিবে না। কীভাবে এই ভয়ঙ্কর বিপদ থেকে নিজেকে বাঁচানো যায়, মাথায় হাত দিয়ে সে যখন সেসবেরই নানান কুৎসিত ছক কষছিল, ঠিক তখনই তার টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল তার এক বান্ধবীর পাঠানো একটি টেক্সট মেসেজ। প্রথমে তীব্র বিরক্তি নিয়ে মেসেজটি দেখবে কি দেখবে না করে দোটানায় ভুগলেও, শেষমেশ কৌতূহল সামলাতে না পেরে সে ফোনটা হাতে তুলেই নিল। চ্যাট বক্সটা ওপেন করতেই লিসা দেখল, তার সেই বান্ধবী তাকে কিছু ছবি পাঠিয়েছে। ছবিগুলোর দিকে চোখ পড়তেই লিসার পুরো শরীর যেন এক লহমায় হিংসার আগুনে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। রাগে-ক্ষোভে ইচ্ছে করতে লাগল নিজের হাতের ফোনটা আছাড় মেরে ভেঙে চুরমার করে দেয়, পুরো দুনিয়াটায় আগুন লাগিয়ে দেয়। ছোটবেলা থেকে লিসা যা কিছু চেয়েছে, যেভাবে চেয়েছে, সাম-দাম-দণ্ড-ভেদ খাটিয়ে তা-ই নিজের করে পেয়েছে। এই প্রথম জীবনে সে কোনো একটা জিনিস তীব্রভাবে নিজের করে চেয়েছিল, অথচ অন্য কেউ এসে সেটাকে তার চোখের সামনে থেকে ছিনতাই করে নিয়ে চলে গেল। নষ্ট ঠোঁটের কোণে এক ভয়ঙ্কর হিংস্র হাসি ফুটিয়ে লিসা মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল__
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৩
“এত সহজে তো সে মাঠ ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়!”
এই বান্ধবী পাঠানো ছবিগুলোই এখন তার হাতের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এই ছবিগুলোর মাধ্যমেই সে এবার নীলাকে এমনভাবে শায়েস্তা করবে যে মেয়েটা সারাজীবন মনে রাখবে। আর লিসার মতো রূপসীকে প্রত্যাখ্যান করে ওই সাধারণ নীলাকে নিজের রানীর আসনে বসানোর জন্য সে মিহালকেও এর চরম শাস্তি দেবে।
