Home নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৭

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৭

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৭
নাজনীন নেছা নাবিলা

নীলা দরজা খুলতেই থমকে গেল। দেখতে পেল কেবল তার ফুফু না বরং বাংলাদেশ থেকে তার পরিবার,ইকরার পরিবারও এসেছে।
নীলা কে আসতে না দেখে মিহাল রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলছে,
“সুইটি তুমি কেন দরজা খুলতে গেলে?‌ আমি ফোনের জন্য বারান্দায় ছিলাম আমাকে বললেই পারতে।”

কথাগুলো বলতে বলতে ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো মিহাল। কিন্তু প্রধান দরজার কিছুটা কাছাকাছি আসতেই আচমকা তার পা দুটো থমকে গেল। ব্যাপারটা এমন নয় যে, নীলার পরিবারের সবার প্যারিসে আসার খবরটা সে জানত না। তবে তার হিসাব অনুযায়ী, আজ তো কেবল নীলা আর ইকরার পরিবারের সবার প্যারিস অভিমুখে রওনা দেওয়ার কথা। পৌঁছাতে পৌঁছাতে অন্তত আরও একটা দিন কেটে যাওয়ার কথা ছিল। অথচ নির্ধারিত সময়ের আগেই সবাইকে এভাবে সশরীরে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মিহালের বুকের ভেতর বিস্ময়ের এক মৃদু ঢেউ খেলে গেল।
অন্যদিকে, নীলার প্রতি মিহালের এমন নিখাদ আর দায়িত্বশীল, যত্ন দেখে উপস্থিত সবার মন ভরে উঠল। নীলার বাবা, চাচা, জ্যাঠা প্রত্যেকের চোখেই তখন এক অদ্ভুত তৃপ্তির ছোঁয়া। সবচেয়ে বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন নীলার মা। নিজের ভেতরের মাতৃত্বের সেই তীব্র আকুলতা তিনি আর কোনোভাবেই চেপে রাখতে পারলেন না। সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে একরকম দৌড়ে গিয়ে আগলে নিলেন নিজের কলিজার টুকরো মেয়েকে। বুকের গভীরে টেনে নিয়ে তাঁর চোখ থেকে ঝরে পড়তে লাগল আনন্দ আর স্বস্তির অশ্রুধারা। পরম নির্ভরতায় মাকে জড়িয়ে ধরে নীলাও যেন খুঁজে পেল তার চিরচেনা সেই নিরাপদ আশ্রয়। সেখানকার সেই আবেগঘন মুহূর্তটুকুর মাঝে নিজেকে আর জড়িয়ে রাখতে চাইল না মিহাল। সে আলতো পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মামা ও মামীমাদের বিনম্র শ্রদ্ধায় সালাম জানাল। ঠিক তখনই ইমরান মির্জা দুহাত বাড়িয়ে মিহালকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। পরম স্নেহে তার পিঠে হাত রেখে আবেগজড়িত কণ্ঠে বললেন,

“আমি জানতাম তুমি পারবে বাবা। তুমি আমার বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছো।”
মিহাল ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল। তারপর বাকি দুই মামার কাছে এগিয়ে গিয়ে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে কুশল বিনিময় করল। বাইরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সে সবাইকে সাথে নিয়ে ড্রয়িংরুমের ভেতরে চলে এলো। তবে নীলা তখনও দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে। মিহাল আলতো পায়ে নীলার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল। অত্যন্ত নরম গলায় বলল,
“মাকে নিয়ে ভেতরে এসো নীলা।”
মিহালের কণ্ঠস্বরে নীলা কিছুটা প্রকৃতিস্থ হলো। নিজেকে সামলে নিয়ে সে মায়ের চোখের জল মুছে দিল, তারপর নিজের গাল বেয়ে পড়া অশ্রুটুকু আলতো করে মুছে মাকে সাথে নিয়ে ভেতরের দিকে পা বাড়াল। ঘরের ভেতরে পা রাখতেই নীলার চোখ গিয়ে পড়ল তার বাবার ওপর। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না সে। এক ছুটে গিয়ে বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নিলয় মির্জা পরম মমতায় মেয়ের কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে আবেগঘন কণ্ঠে বললেন,

“আমার মা! কত দিন পর তোকে চোখে দেখলাম রে!”
নীলা তখন বাবার বুক থেকে মুখ তুলে কিছুটা অভিমানী কণ্ঠে বলল,
“তোমরা এত বড় একটা সারপ্রাইজ রেডি করলে, অথচ আমাকে একটা বারও জানালে না যে তোমরা আমার সাথে দেখা করতে আসছ?”
মেয়ের মিষ্টি অভিমানে নিলয় মির্জা মৃদু হাসলেন। ঠিক তখনই ঘরের অন্য প্রান্ত থেকে ইমরান মির্জা স্নেহমাখা গলায় ডাকলেন,
“মা, এদিকে আয়।”

নীলা বাধ্য মেয়ের মতো উনার কাছে এগিয়ে গেল। ইমরান মির্জা পরম স্নেহে নীলার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। ঠিক একইভাবে আকাশ মির্জাও নীলার মাথায় হাত রেখে দোয়া করে দিলেন। এরপর নীলা এগিয়ে গেল তার দুই বড় আম্মু আর ছোট আম্মুর দিকে। দুজনে মিলে নীলাকে মাঝে বসিয়ে জড়িয়ে ধরলেন, যেন কতকাল পর তাদের হারিয়ে যাওয়া ধন ফিরে পেয়েছেন। কপালে, গালে চুমু এঁকে দিয়ে আদর করতে লাগলেন। সেই আদর মাখা পর্ব শেষ করে নীলা তার চাচাতো ভাই আবিরের দিকে তাকাল। দুই ভাই-বোনে মিলে আর টুকটাক কথায় বেশ কিছুক্ষণ খুনসুটি আর আলাপ জমিয়ে তুলল। কথা বলতে বলতেই নীলার নজর গেল ঘরের এক কোণে বসে থাকা ইকরার বাবা-মায়ের ওপর। সে সৌজন্যতাবশত তাঁদের কাছে গেল, অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে কুশল বিনিময় করল। কুশল বিনিময় শেষ করে নীলা আবার এসে মিহালের ঠিক পাশে দাঁড়াল। নীলা সম্পূর্ণ সচেতনভাবে ইরফান এবং আরশির উপস্থিতি এড়িয়ে গেল। তাদের সাথে কথা বলা তো দূরের কথা, একটা সাধারণ চাউনি পর্যন্ত দিল না। সে এমন এক নির্বিকার ভাব দেখাল, যেন ওই দুজন মানুষ এই ঘরে উপস্থিতই নেই। নীলার এই প্রকাশ্য অবহেলা আর উদাসীনতা আরশির বুকে তীরের মতো বিঁধল। না চাইতেও এক তীব্র অপরাধবোধ আর আঘাত তার ভেতরে দলা পাকিয়ে উঠল। অন্যদিকে, ইরফানের অবস্থা তখন আরও শোচনীয়। সে বুকের ভেতর একরাশ ভয় আর কুঁকড়ে থাকা আতঙ্ক নিয়ে মিহালের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছিল। প্রতিনিয়ত তার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি মিহাল সবার সামনে তার অতীতের সমস্ত কালো কর্মকাণ্ড আর সত্যটা ফাঁস করে দিল।

ঘরের এই গুমোট আবহাওয়াকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে নীলা এবার ঘুরে দাঁড়াল ইকরার দিকে। চোখ দুটো সরু করে, কিছুটা কৃত্রিম রাগের ভান করে জিজ্ঞেস করল,
“বাড়ির বড়রা না হয় সারপ্রাইজ দেবে বলে আমাকে কিছু জানায়নি, সেটা মানলাম। কিন্তু ইকরা, অন্তত তুই তো আমাকে বলতে পারতি যে আমার আর তোর বাড়ির সব মানুষ একসাথে এখানে আসছে? তুইও এত বড় সত্যটা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে গেলি?”
ইকরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের দুই হাত উল্টে বলল,
“আরে বইন, তুই তো ভাবছিস আমি সবকিছু জানি। সত্যি বলতে, আমি নিজেই এই ব্যাপারে বিন্দুবিসর্গ কিছু জানতাম না। আমাকে তো উনার আর উনার মায়ের নাকি মারাত্মক জ্বর,এই মিথ্যে উছিলা দিয়ে ফুফু হুট করে তাদের বাড়ি নিয়ে গেলেন। ওখানে গিয়ে তো আমার চোখ ছানাবড়া। দেখলাম সবাই একদম চাঙ্গা, সুস্থ-সবল ঘুরে বেড়াচ্ছে। যখনই কৌতূহল সামলাতে না পেরে কিছু জিজ্ঞেস করতে গেলাম, তখনই আমাকে ধমক দিয়ে বলা হলো আমি যেন একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করি। অগত্যা আর কী করার, কৌতূহল চেপে চুপচাপ অপেক্ষা করতে থাকলাম। তারপর রাতে যখন ড্রয়িংরুমে বসে আছি, তখন হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল। একজন সার্ভেন্ট গিয়ে দরজা খুলতেই দেখি তোর আর আমার পরিবারের সবাই লাইন ধরে ভেতরে ঢুকছে। আমি যেমন খুশি হলাম, তেমনি অবাক। কিন্তু উনারা সবাই মিলে হুট করে কীভাবে, কেন এখানে চলে এলেন তার কিছুই আমি জানি না। উনাদের কাছে জানতে চাইলেই বললেন, তোকে আর আমাকে নাকি একসাথে মূল রহস্যটা বলবেন। তাই আমিও এখনো সেই কাঙ্ক্ষিত সত্যটা শোনার অপেক্ষায় চাতক পাখির মতো বসে আছি।”

ইকরার এমন মুখ ফুলিয়ে বলা অভিমানী কথাগুলো শুনে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত বাড়ির বড়দের সবার মুখে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল।
পুরো ঘরের পরিবেশ যখন এই মিষ্টি খুনসুটিতে মুখর, তখন এক কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আরশি পলকহীন চোখে নীলা আর ইকরার এই অটুট বন্ধুত্বের রসায়ন দেখছিল। বুকটা তার এক অজানা হাহাকারে মোচড় দিয়ে উঠল। অথচ একটা সময় ছিল, যখন নীলার সাথে তার সম্পর্কটাও ঠিক এমনই কিংবা হয়তো এর চেয়েও ঢের বেশি গভীর আর নিবিড় ছিল। কিন্তু নিজের অহংকার, লোভ আর ভুলের তাড়নায় সেই অমূল্য সম্পর্কটা সে নিজ হাতে ভেঙে গুঁড়ো করে দিয়েছে। নীলাকে ধোঁকা দিয়ে, তার বিশ্বাস ভেঙে সে নিজেও আজ সুখে নেই। নিজের সাজানো সুুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তীব্র শূন্যতা এখন কেবলই তার ভেতর থেকে তপ্ত দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল। নীলা ইকরার কথার পিঠে আর কিছু না বলে সোজা গিয়ে তার ফুফুর পাশে বসল। মিনা মির্জা পরম মমতায় নীলাকে নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর ঘরের মাঝখানে বসে থাকা ভাইদের উদ্দেশ্যে কৃত্রিম ধমকের সুরে বললেন,

“ভাইজান তোমরা আমার এই দুটো লক্ষ্মী মেয়েকে আর এভাবে কনফিউজড করে রেখো না তো বাপু! এবার আসল ব্যাপারটা কী, তা একটু খোলসা করে বলে দাও।”
মিনা মির্জার কথা শুনে ড্রয়িংরুমের সবাই একসঙ্গে হেসে উঠলেন। চারপাশের এই হাসির রোলের মাঝেও মিহাল কিন্তু পুরোপুরি নির্লিপ্ত রইল। সে এক কোণে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ নজরে ইরফানের প্রতিটি নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। এর আগে কখনো সে ইরফানকে এভাবে পরখ করে দেখেনি, আজই প্রথম। অতীত সমীকরণ যা-ই হোক না কেন, একটা তেতো সত্য তো অস্বীকার করার উপায় নেই এই ‘ইঁদুর’ টাকেই একসময় তার বর্তমান স্ত্রী মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত। একজন পুরুষ হিসেবে এই ভাবনায় মিহালের কিছুটা হিংসা বা জেলাস ফিল করাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মিহাল খুব ভালো করেই জানে, এখন তার নিজের জ্বলেপুড়ে মরার সময় নয়, বরং ইরফানকে তপ্ত কয়লার ওপর দাঁড় করিয়ে দেওয়ার মোক্ষম সুযোগ। মিহাল খেয়াল করল, ইরফানের চোরকুঠুরির মতো চোখ দুটোও আড়ালে-আবডালে তারই দিকে নিবদ্ধ হয়ে আছে। মোক্ষম সুযোগ বুঝে মিহাল ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে অত্যন্ত ধীরলয়ে নিজের ডান হাতটা ওপরে তুলল, তারপর চোখের দৃষ্টি ইরফানের ওপর স্থির রেখেই শার্টের কলারটা কিছুটা আলগা করে ফাঁক করল। মিহাল ঠিক যা দেখাতে চেয়েছিল, ইরফানের চোখের পলকহীন ও কুঁচকে যাওয়া চাউনি দেখে সে নিশ্চিত হলো তীর একদম নিশানা মতোই বিধেছে।

আসলে নীলা ভালোবাসার চরম মুহূর্তে মিহালের গলায় আর ঘাড়ে বেশ জোরেসোরে কয়েকটি কামড় বসিয়ে দিয়েছিল। সেই গভীর আদরের লালচে-বেগুনি দাগগুলো এখন ত্বকের ওপর স্পষ্ট কালশিটের মতো জাজ্বল্যমান হয়ে আছে। মিহাল পরম তৃপ্তিতে ঠিক সেই ক্ষতচিহ্নগুলোই প্রদর্শন করল। নিজের সাবেক প্রেমিকার দেওয়া অন্য পুরুষের গায়ের এই ভালোবাসার দাগ দেখে ইরফানের মাথার ভেতর যেন রক্ত চড়ে গেল। এক তীব্র ঈর্ষা, পরাজয় আর অপমানের আগুনে তার ভেতরটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। রাগ আর ক্ষোভে তার শরীর কাঁপতে লাগল। সে আর এক মুহূর্তও এই ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে থাকার মতো মানসিক শক্তি ধরে রাখতে পারল না। পকেট থেকে কোনোমতে ফোনটা বের করে, ‘একটা ইম্পর্ট্যান্ট কল এসেছে’ এমন এক কাঁচা বাহানা দাঁড় করিয়ে ঝড়ের বেগে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। ইরফানের এই শোচনীয় পরাজয় আর পালিয়ে যাওয়া দেখে মিহালের ঠোঁটের সেই বাঁকা হাসিটা আরও চওড়া আর গভীর হলো। তার চোখের কোণে তখন এক চরম তৃপ্তির ঝলক।
ইমরান মির্জা গলা খাঁকারি দিয়ে আসল রহস্যটা নীলা এবং ইকরাকে বলতে শুরু করলেন,

“আসলে এই পুরো সারপ্রাইজের মাস্টারপ্ল্যানটা কিন্তু মিহাল আর মুনভির। আর আমরা বাড়ির বড়রা তো তুই এখানে আসার পর থেকেই ভাবছিলাম তোকে এক নজর দেখতে আসব। সেই কারণে হুট করে ইবাদের পাসপোর্ট করতে দেওয়া হলো, আর বাকি সবার পাসপোর্ট তো আগে থেকেই করা ছিল। আমরা তিন ভাই মিলে গোপনে বুদ্ধি করলাম, এবার সুযোগ বুঝে সপরিবারে প্যারিসে পাড়ি জমাব। এতে যেমন তোর সাথে দেখাও হবে, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা আমাদের মিনু কে খুঁজে বের করতে পারব। আর যারা এই প্ল্যান জানত না, তাদের আমরা চমকে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মাঝখান থেকে ইবাদের পাসপোর্টটা আসতে কিছুটা দেরি হয়ে গেল, যার কারণে আমাদের পুরো পরিকল্পনাটাই বারবার পিছিয়ে যাচ্ছিল। তবে এর ভেতরেই যে তোর সাথে মিহালের এভাবে বিয়ে হয়ে যাবে, আর তোদের দুজনের উসিলাতেই আমি বা আমরা আমাদের হারিয়ে যাওয়া বোনকে ফিরে পাব,সেটা ছিল আমাদের কল্পনাতীত। মিহাল সেই ছোটবেলায় কথা দিয়েছিল ও একদিন আমাদের দুই পরিবারকে এক সুতোয় বাঁধবে। কিন্তু আমাদের বাড়ির একমাত্র আদরের মেয়েকে নিজের ঘরণী বানিয়ে যে ও নিজের দেওয়া সেই কথা এত সুন্দর করে রাখবে, এটা আমরা কেউ কখনো ভাবতেও পারিনি।”

ইমরান মির্জার এই আবেগী এবং তৃপ্তিমাখা কথাগুলো শেষ হতেই নীলা এবং ইকরার কাছে সবটা পরিষ্কার হলো। তবুও বড়দের কাছ থেকে নিজের বিয়ের কথা শুনে নীলা কিছুটা লজ্জা পেলো। রাঙা হয়ে ওঠা মুখটা লুকাতে সে ঝটপট মাথা নিচু করে মিহালের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক তখনই মেয়ের দিকে তাকিয়ে নিলয় মির্জা অত্যন্ত গর্বিত গলায় বললেন,
“তোমরা যে যাই বলো না কেন, যেই ছেলে মাত্র দশ বছর বয়সে একটা কথা দিয়ে, জীবনের এতগুলো বছর পেরিয়েও সেই কথা হুবহু অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছে, সেই মিহাল যে আমার নীলাকে পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে সুখে আর ভালো রাখবে, তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।”
বাবার মুখে মিহালের এমন অকুণ্ঠ প্রশংসা শুনে নীলার ঠোঁটের কোণে আবারও এক চিলতে লাজুক ও পরম তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে আড়চোখে একবার মিহালের দিকে তাকাল, যেখানে মিহালও এক বুক গর্ব আর ভালোবাসা নিয়ে নিজের স্ত্রীর দিকেই তাকিয়ে আছে।

মিহাল ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় মুচকি হাসি ফুটিয়ে তুলল। সবার কাছ থেকে অত্যন্ত ভদ্রভাবে বিদায় নিয়ে সে ধীরপায়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। কারণ, তার মাথায় তখন অন্য হিসাব কাজ করছে। ইরফানের সাথে জীবনের একটা বড় হিসাব-নিকাশ চুকানো যে এখনো বাকি। এদিকে ড্রয়িংরুমে নীলা তখন নিজের পরিবারের মানুষদের পেয়ে পুরোপুরি আড্ডায় মশগুল। এরই মাঝে ছোট ভাই ইবাদ এসে নীলার পাশে বসল। সে হাত নেড়ে অত্যন্ত রসিয়ে রসিয়ে পুরো কাহিনী বলতে শুরু করল, কীভাবে দুই পরিবার প্রথমবার মুখোমুখি হলো, কীভাবে সেখানে আবেগের বন্যা বয়ে গেল আর কে কতটুকু কান্নাকাটি করল। ইবাদের সেই নাটকীয় আর মজার বর্ণনা শুনে ঘরের সবাই হোহো করে হেসে উঠল। পুরো বাড়ি তখন এক পরম উৎসবের আমেজে মুখরিত। কিছুক্ষণ পর, মিনা মির্জা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে এলেন। তিনি একা নন, দীর্ঘদিনের ব্যবধান ঘুচিয়ে উনার সাথে উনার ভাইয়ের বউরাও হাতে হাত মিলিয়ে সবার জন্য হরেক রকমের খাবার আর নাস্তা তৈরি করতে গিয়েছিলেন। গরম গরম ধোঁয়া ওঠা নাস্তার প্লেটগুলো ডাইনিং টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখতে রাখতে মিনা মির্জা চারদিকে চোখ বোলালেন। তারপর কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“আচ্ছা, মিহাল আর ইরফান কোথায় গেল? ওদের তো দেখছি না।”

ফুফুর এই আকস্মিক প্রশ্নে নীলা, ইকরা এবং মুনভি মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তারা নিঃশব্দে একে অপরের দিকে তাকাল। চোখের ইশারায় আর চাউনিতেই তাদের আর বুঝতে বাকি রইল না যে এই দুই চরম প্রতিদ্বন্দ্বী পুরুষ এখন ঠিক কোথায় থাকতে পারে। পরিস্থিতি বেশিদূর গড়ানোর আগেই নীলা সোফা ছেড়ে ঝটপট উঠে দাঁড়াল। মুখে স্বাভাবিকতা ফুটিয়ে তুলে বলল,
“তোমরা সবাই একটু হাত-মুখ ধুয়ে টেবিলে বসো। আমি, ইকরা আর মুনভি ভাইয়া গিয়ে উনাদের ডেকে নিয়ে আসছি।”

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৬

বড়রা সবাই নীলার কথায় সায় দিলেন। কিন্তু ঘরের এই হইচই আর আনন্দের মাঝেও আরশির বুকটা আবার হাহাকার করে উঠল। সে মনে মনে ভীষণ আশা করেছিল, অন্তত এই একটা বার হয়তো নীলা তাকেও সাথে যাওয়ার জন্য ডাকবে। কিন্তু নীলা তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে চলে গেল। আরশি চরম এক অপরাধবোধ আর লজ্জায় মাথা নিচু করে রইল। নিজের ভেতরে নিজেই দগ্ধ হতে হতে সে ভাবতে লাগল সে কোন মুখে আজ এই আশা করে? আজ সবকিছু তো তারই ভুলের কারণে ধ্বংস হয়েছে। তবে সে আজ কোন অধিকারে নীলার এতটুকু সহানুভূতি প্রত্যাশা করে। কিন্তু তাকে তো কিছু একটা করতেই হবে।

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here