নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৮
জান্নাতুল ফেরদৌ
পাহাড়ের গা বেয়ে নিচে নামছে মেহেরুন্নেসা আর বাইজিদ। রাত অনেক গভীর। পাহাড়ের চূড়া পেরিয়ে তারা যখন ঢালু পথ ধরে নামছে। চারপাশে কেবল বাতাসের শব্দ। দূরে নদীর জল চাঁদের আলোয় রুপালি হয়ে ঝিকমিক করছে। মাঝে মাঝে রাতজাগা পাখির ডাক ভেসে আসছে জঙ্গল থেকে। মেহেরুন্নেসার মনটা এখনও অশান্ত। সব রহস্যের জটলা মিলিয়ে তার মাথার ভেতর প্রশ্নের ঝড় বইছে। হঠাৎ তার চোখ গেল নদীর দিকে। দূরে, নদীর মাঝখানে একটা আগুনের ফুলকি। মেহেরুন্নেসা প্রথমে বুঝতে পারলো না। কিন্তু পরমুহূর্তেই সেই ফুলকি বিশাল অগ্নিশিখায় পরিণত হলো।
“শাহজাদা!”
বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠলো সে। বাইজিদও থামলো। নদীর দিকে তাকালো। নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই জাহাজ, যেটাকে তারা একটু আগেও দেখে এসেছে। সেই জাহাজে এখন আগুনে জ্বলছে। দাউ দাউ করে জ্বলছে। কাঠের মাস্তুলে আগুন লেগেছে। পালগুলো জ্বলতে জ্বলতে ছাই হয়ে যাচ্ছে। কালো ধোঁয়া আকাশের দিকে উঠছে। মেহেরুন্নেসার বুক ধক করে উঠলো।
“আল্লাহ! এ…এই জাহাজে আগুন!”
সে কয়েক পা সামনে এগিয়ে গেল।
“শাহজাদা, শাহজাদা ওখানে অনেক লোকজন ছিল, লা” শ ও ছিল। এটা কি…কিকরে হলো?”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাইজিদের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো। মেহেরুন্নেসা অবিশ্বাস নিয়ে তার দিকে তাকালো। এই সময় এভাবে কেউ হাসতে পারে? যেন কোনো মজার জিনিস দেখছে।
“শাহজাদা…”
তার গলা কেঁপে উঠলো।
“আআআ…আপনি হাসছেন কেন?”
বাইজিদ কিছুক্ষণ জ্বলন্ত জাহাজটার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার চোখে আগুনের লাল আভা প্রতিফলিত হচ্ছিল। সে উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে বললো
“আজ আরেকটা শয়তানের অবসান হলো”
মেহেরুন্নেসা কিছুই বুঝলো না।
“কী বলছেন আপনি? দেখুন আর ভনিতা করবেন না। আমি কিন্তু আর নিতে পারছি না এসব বলে দিলাম!
বাইজিদ গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেললো।
“কি জানতে চায় আমার বেগম? বলুক”
মেহেরুন্নেসা ছঠফট করে বলল
“ওই লোক গুলো কারা? আর মৃতদেহ গুলোই কার কার? তারা এগুলো নিয়ে কোথায় যাচ্ছে? আর আগুন ই বা লাগালো কে?”
বাইজিদ মেহেরুন্নেসার বাহু আগলে হাঁটতে হাঁটতে বলল
“ওই লোকগুলো আমার পোষা কিছু সুবিধা বাদী। আর মমতদেহ গুলো নাসিরাবাদ এর জমিদার পরিবার এর। মানে অঙ্কুরের বাড়ির লোক”
মেহেরুন্নেসা এক ঝটকায় সরিয়ে দেয় বাইজিদ এর হাত।
“মশকরা হচ্ছে? তারা বহু বছর আগে মারা গেছে। সেই লা’শ এখনো থাকা অসম্ভব। আমি স্পষ্ট দেখেছি সব তরতাজা মৃতদেহ”
“তারা মারা যায়নি। তারা আমার জিম্মায় ছিল।
মুহূর্তের জন্য মেহেরুন্নেসার মনে হলো সে ভুল শুনেছে। নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছে না।
“কী? কী বললেন?”
“বললাম তারা আমার কাছে আমার জিম্মায় ছিল”
বাইজিদের কণ্ঠে কোনো আবেগ নেই। মেহেরুন্নেসা স্তব্ধ।
“আপনি… তাদের বন্দি করে রেখেছিলেন?”
“ হ্যাঁ।”
“কেন?”
বাইজিদ জ্বলন্ত জাহাজের দিকে তাকালো।
“আজ তাদের প্রয়োজন শেষ হয়েছে। তাই বিদেয় করে দিলাম।”
নদীর মাঝখানে মাস্তুল ভেঙে পড়ে বড় একটা শব্দ হলো। আগুন আরও ছড়িয়ে গেল। মেহেরুন্নেসার গা শিউরে উঠলো।
“তাদের… হত্যা করা হয়েছে?”
অনেকক্ষণ চুপ করে থপকে বাইজিদ বললো,
“কিছু পাপের বিচার আদালতে হয় না, মেহের।
ইতিহাসের অন্ধকারেই তার শেষ হয়।”
মেহেরুন্নেসার মুখ শুকিয়ে গেল। এত বছর ধরে যে মানুষটাকে সে চেনে, তার একটা অংশকেও হয়তো কখনোই চেনেনি। তার কাছে বাইজিদ ছিল একজন ভালো স্বামী। একজন স্নেহশীল পিতা। একজন সাহসী শাসক। কিন্তু এই মানুষটার আরেকটা রূপও আছে। ভয়ংকর নির্মম রুপ।
এতবছর ধরে এই ঘটনা গুলো সে গোপন রেখেছে?
“শাহজাদা…”
মেহেরুন্নেসার গলা কাঁপছিল।
“আপনাকে আজ আমার ভীষণ অচেনা লাগছে।”
বাইজিদ এগিয়ে এসে মেহেরুন্নেসার মাথায় হাত রাখলো।
“আমি অচেনা নই, মেহের। তুমি শুধু আমার এমন একটা রুপ দেখলে, যা দেখানোর প্রয়োজন আগে কখনো হয়নি। এছাড়া আমি তোমার সেই নিষ্ঠাবান শাহজাদা”
মেহেরুন্নেসা কিছু বললো না। নদীর দিকে তাকিয়ে রইলো। জাহাজটা ধীরে ধীরে আগুনে গ্রাস হয়ে যাচ্ছে। আগুনের লেলিহান শিখা রাতের আকাশকে লাল করে তুলছে।
কিছুক্ষণ আগে জাহাজের আগুম দেখে তার আতঙ্ক বেড়ে গেছিলো। এখন সেই দৃশ্যের চেয়েও বেশি তাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে পাশে হাঁটতে থাকা মানুষটা। দুজন আবার পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করলো। নিচে নামার পথটা একটু সমস্যা করে। বাইজিদ সাবধানে ধরে নামাচ্ছে মেহেরুন্নেসা কে। কিন্তু মেহেরুন্নেসার কৌতূহল কাটছে না কিছুতেই
“শাহজাদা…”
“হুম?”
“এতসব কীভাবে করলেন?”
বাইজিদ হেসে ফেললো।
“কোনটা?”
“এই অঙ্কুরের পরিবার এত বছর ধরে বন্দি রাখলেন। কেউ কিছু জানলো না সন্দেহও করলো না।”
বাইজিদ মেহেরকে ধরে হাঁটছে। তারপর বলতে শুরু করলো
“গল্পটা অনেক পুরোনো। নাসিরাবাদের সময়কার।”
মেহেরুন্নেসা থমকে গেল। নাসিরাবাদ নামটা শুনলেই তার মনে পড়ে সেই ভয়ংকর দিনগুলোর কথা। বাইজিদ বলতে লাগলো,
“তখন নাসিরাবাদ লোক জন সৈন্য সামন্তে গমগম করে। প্রাচুর্য আর জৌলুস ভরপু। তারপর টকদিন নাসিরাবাদ প্রাসাদে ডাকাতদের হামলা হয়েছিল।”
মেহেরুন্নেসার মুখ শক্ত হয়ে উঠলো। বাইজিদ ধীরে ধীরে বলতে লাগলো
“সবাই ভেবেছিল ওটা ডাকাতি। মরুভূমির ডাকাত রা তখন নগরে এসে এসে ডাকাতি শুরু করেছে।কিন্তু ওটা ওটা ছিল পরিকল্পিত আক্রমণ।”
মেহেরুন্নেসা বিস্ময়ে তাকালো।
“পরিকল্পিত?”
“হ্যাঁ। মারজানের পরিকল্পনা।”
“মারজান?”
বাইজিদের চোখে ঠান্ডা ঝিলিক ফুটে উঠলো।
“সে চেয়েছিল প্রত্যেক সদস্য কে অপহরণ করাতে। তারপর তাদের জিম্মি করে অঙ্কুরকে দিয়ে যা খুশি করাবে।”
মেহেরুন্নেসার গা শিউরে উঠলো। এত ভয়ংকর পরিকল্পনা! বাইজিদ বলতে লাগলো,
“হামলার পর ডাকাতরা তাদের নিয়ে জঙ্গলের ভেতরে যায়। একটা পুরোনো ভাঙাচোরা বাড়ি ছিল সেখানে। বহু বছরের পরিত্যক্ত। চারপাশে জঙ্গল। মানুষজন যেত না।”
“ তারপর?”
বাইজিদ মৃদু হেসে বললো।
“তারপর মারজান ভেবেছিলো তার গোপন অভিযান সম্পর্কে কেউ অবগত নয়। কিন্তু একটা ভুল মারজান করেছিল।”
“কী ভুল?”
“আমাকে হিসাবের বাইরে রেখেছিল। গোনায় ও ধরেনি। যদিও তা ধরার মধ্যে পরে না।”
মেহেরুন্নেসা চুপ করে শুনতে লাগলো।
“আমি তখনই খবর পেয়ে যাই। আর যখন ওই বাড়ির আশেপাশে লোক পাঠাই….সেদিন রাতেই আমি খেলা ঘুরিয়ে দিই। ডাকাতরা ওদের পাহারা দিচ্ছিল। আমার লোকেরা ডাকাত দের হত্যা করে। তারপর অঙ্কুরের পরিবারের সবাইকে আমার জিম্মায় নেওয়া হয়। মেরে দিই সব কটা ডাকাত সদস্য কে”
“তারপর?”
“তারপর গোটা রাজ্যে জানাজানি হয় তারা ডাকাতের আক্রমনে মারা গেছে। অথচ তারা আমার জিম্মায় উত্তরের প্রাসাদের নিচের সুরঙ্গে জীবন কাটালো এত বছর। হা হা হা”
মেহেরুন্নেসা বিস্ময়ে হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেল।
“এসব কেন করলেন শাহজাদা? ওরা আপনার কি ক্ষতি করেছিল? তাছাড়া আপনি এসব আমার কাছেও গোপন রেখেছিলেন?”
বাইজিদ হেসে বললো,
“কিছু গোপন কথা সময়ের আগে বলা যায় না।
আর কিছু সত্য এত ভারী হয় যে সবাইকে বহন করতে দেওয়া যায় না। তুমি কোমল ই থাকো। আর যদি বলো ক্ষতির কথা। আমার ভাই বোন মা সবাইকে হত্যা করেছে ওরা। অর্ষার দেহটা ওবদি গবেষণায় ব্যবহার করেছে”
তারা দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বললো না। রাতের অন্ধকার ভেদ করে প্রাসাদের দিকে হাঁটতে লাগলো। রাতের শেষ প্রহর পেরিয়ে যখন মেহেরুন্নেসা আর বাইজিদ প্রাসাদের প্রধান ফটকে পৌঁছালো, তখন পূর্ব আকাশে ফজরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। দীর্ঘ রাতের ক্লান্তি দুজনের চোখেমুখে স্পষ্ট। এক রাতেই যেন অনেক বছরের গোপন ইতিহাস জেনে ফেলেছে মেহেরুন্নেসা। প্রাসাদে ঢুকতেই একটা অস্বাভাবিক অস্থিরতা টের পেল তারা।
প্রহরীরা ছোটাছুটি করছে।বাইজিদ ভ্রু কুঁচকে বললো,
“কী হয়েছে সবাই এত উতলা কেন?”
একজন প্রহরী দ্রুত এগিয়ে এলো। মাথা নত করে বললো
“শাহজাদা… বন্দি চন্দ্রার অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে।”
“কী হয়েছে আবার?”
“তাকে আর নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না শাহজাদা”
মেহেরুন্নেসা আর বাইজিদ একে অপরের দিকে তাকালো। কোনো কথা না বলে কারাগারের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। কারাগারের করিডোরে ঢুকতেই একটা অদ্ভুত শব্দ কানে এলো। কে যেন প্যাচপ্যাচে গলায় হাসছে। বাইজিদ আরেকটু এগোতে না এগোতেই আবার কেঁদে উঠলো জোরে। কক্ষের সামনে পৌঁছে মেহেরুন্নেসার বুকটা কেমন করে উঠলো। এ কি সেই চন্দ্রা? গায়ে দামি পোশাক, চুলে সুগন্ধি তেল, চোখে কাজল। আর মুখে অহংকার নিয়ে বীরের বেশে ঘুরে বেড়াত। চুল এলোমেলো জট বেঁধে গেছে এ রাতেই। হাতে-মুখে ধুলো। ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরিয়েছে। মেঝেতে বসে বসে কাদছে। আবার হেসে উঠলো মেহেরুন্নেসা কে দেখে
“অরণ্য! তুমি এসেছো?”
উঠতে নিলে হঠাৎ ভয় পেয়ে দেয়ালের কোণে সরে গেল।
“না! কাছে আসো না!”
মেহেরুন্নেসার গা শিউরে উঠলো। এক রাতে কি হাল হয়েছে মেয়েটার। বাইজিদ নির্বাক দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখে বিশাল আফসোস। আজ ওকে দেখতে এসেছে এই যেন সাত কপালের ভাগ্য। ওকে নিজের বোনের মতোই দেখেছে বাইজিদ। রত্না চলে যাওয়ার পর ওকে দিয়েই রত্নার অভাব পূরণ করেছে। কিন্তু পর যে আপন হয় না। মেহেরুন্নেসা বাইজিদএর দিকে তাকালো।
বাইজিদের দৃষ্টি তখনও চন্দ্রার দিকে।
“ও যা চেয়েছে দিয়েছি। সম্মান দিয়েছি। নিরাপত্তা দিয়েছি রত্নার জায়গা দিয়েছি। কি দিই নি ওকে বলোতো মেহের। তবুও ও নাকি কিচ্ছু পায়নি।
তাই আমারই পিঠে ছুরি মেরেছে।”
চন্দ্রা নিজের জগতে ডুবে আছে। কিছুই শুনছে না। বাইজিদ ফিসফিস করে বললো,
“কত মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে এই ঘাতিনী। কত নিরপরাধ মানুষের জীবন নষ্ট করেছে। কত পরিবার ভেঙেছে। অথচ আজ তার নিজের শেষ পরিণতি…”
বাকিটা বললো না। মেহেরুন্নেসারও বুক ভার হয়ে এলো। এটা দেখে আনন্দ পাওয়ার কিছু নেই।
মানুষ নিজের ভুলের ভারে নিজেই ভেঙে পড়ে।
বাইজিদ মুখ ফিরিয়ে নিল।
“দরজা খোলো।”
প্রহরীরা হতভম্ব।
“শাহজাদা?”
“ওকে ছেড়ে দাও।”
“কিন্তু…”
“আমি যা বলেছি তাই করো।”
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে কারাগারের দরজা খুলে দেওয়া হলো। চন্দ্রা আগের মতই বসে আছে।
দরজা খোলা দেখে চারদিকে তাকালো। শিশুর মতো হাততালি দিতে শুরু করলো।
“আমি মুক্ত! আমি মুক্ত!”
হেসে উঠেই দৌড় দিল। প্রাসাদের সিঁড়ি পেরিয়ে
একেবারে বাইরে। দাসীরা ভয় পেয়ে সরে গেল।
প্রহরীরাও পথ ছেড়ে দিল। চন্দ্রা কখনো নাচতে নাচতে এগোচ্ছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে। হাসছে একা একাই। মেহেরুন্নেসার চোখের পানি বাধ মানে না। নারী অন্যের জীবন নষ্ট করতে গিয়ে সবার আগে নিজের জীবন নষ্ট করে বসে।
চন্দ্রা প্রাসাদের সিমানা পেরিয়ে লোকালয়ে চলে গেল। মানুষজন বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো। অনেকে চিনতে পারলো।
“ও তো শাহজাদি চন্দ্রপ্রভা। এ কী অবস্থা! আল্লাহ্…”
কিছু লোক করুণা নিয়ে দেখছে। কেউ দেখছে ঘৃণা নিয়ে। কেউ বা নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
বারন্দায় দাড়িয়ে দূর থেকে সবকিছু দেখছিল বাইজিদ। মেহেরুন্নেসা পাশে এসে দাঁড়ালো।
বাইজিদ নিচু স্বরে বললো
“কিছু মানুষ নিজেই নিজের ধ্বংস ডেকে আনে।”
সাদা কাপড়ে মোড়ানো দুটি মৃতদেহ পাশাপাশি রাখা হয়েছে। আবিদ আর মিরান। যদিও দুইজনের জীবন আলাদা ছিল। পথ আলাদা ছিল। কিন্তু মৃত্যু এসে তাদের পাশাপাশি শুইয়ে দিয়েছে। মেহেরুন্নেসা নিজেকে সামলাতে পারলো না। ধপ করে লাশ দুটির সামনে বসে পড়লো। চোখ বেয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। আবিদকে সে বহু বছর ধরে চিনতো। সাহাবাদের প্রতি তার আনুগত্য নিয়ে কোনোদিন প্রশ্ন ওঠেনি। কি পেলো ছেলেটা জীবনে? আবিদের মা মারা গেছে মাস খানক আগে। তারা প্রশিক্ষণ দুর্গে লুকিয়ে ছিল বলে গৃরাম বাসিরাই দাফন কার্য সম্পন্ন করেছে।
না পেলো স্ত্রীর ভালেবাসা, বা পেল সুন্দর একটা সাংসার। নিজের মেয়েটাকেও বড় করতে পারলো না। চন্দ্রার ওপর বড্ড ঘেন্না হয় মেহেরুন্নেসার।
মিরানের দিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মেয়েটা যেন জন্মই নিয়েছিল যুদ্ধ করার জন্য। কখনো নিজের কথা ভাবেনি, কখনো নিজের সুখ খুঁজেনি। যেখানে বিপদ, সেখানেই আগে ছুটে গেছে। যেখানে যুদ্ধ, সেখানেই তরবারি হাতে দাঁড়িয়েছে। রাজ্যের জন্য,মানুষের জন্য, সাহাবাদের জন্য। কতবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে সে। কিন্তু এবার আর ফিরে এলো না। মেহেরুন্নেসা ফুঁপিয়ে উঠলো।
পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল সাহারা। বতার সবুজাভ চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে মিরানের মুখের দিকে। ছোট্ট হাতটা নিজের গলার কাছে উঠে গেল। সেখানে ঝুলছে নীল রঙের সেই লকেট। আম্মা বলেছে এটা মিরানই দিয়েছিল তার ছোট বেলায়। সাহারা লকেটটা মুঠো করে ধরলো।
অবশেষে জানাজার প্রস্তুতি শুরু হলো। সাদা কাপড়ে মোড়ানো দুইটি দেহ কাঁধে তুলে নিল সৈন্যরা। শোকযাত্রা বের হলো প্রাসাদ থেকে।
সামনে ইমাম পেছনে বাইজিদ। তারপর সারি সারি সৈন্য। অল্প সময়েই তারা পৌঁছালো সাহাবাদের জমিদারদের কবরস্থানে। পুরোনো বিশাল বটগাছের ছায়া পড়ে আছে কবরগুলোর ওপর। সেখানে আগে থেকেই দুটি নতুন কবর প্রস্তুত করা হয়েছে। একটি আবিদের জন্য। আরেকটি মিরানের জন্য।বদাফনের কাজ সম্পন্ন হলো। মাটি পড়তে লাগলো। এক মুঠো, দুই মুঠো।
অবশেষে কবর দুটো সম্পূর্ণ ঢেকে গেল।
সব শেষ। সাহাবাদের কবরস্থানের মাটির নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত হলো দুই বিশ্বস্ত প্রাণ।
একজন কর্তব্যপরায়ণ কর্মচারী আর একজন লড়াকু বীর।
এতকিছুর মধ্যেও সুনেহেরার দেখা মিলল না। একটা উঁচু কালো পাথর নদীর অনেকটা ভেতর পর্যন্ত বেরিয়ে গেছে। পাথরটার মাথা সরু। নিচে ভয়ংকর গভীর জল। প্রচণ্ড স্রোত এসে বারবার আঘাত করছে পাথরের গায়ে। প্রতিটা আঘাতে সাদা ফেনা ছিটকে উঠছে অনেক ওপরে। মনে হচ্ছে যেন নদীটা ক্রুদ্ধ। কাউকে নিজের বুকে টেনে নিতে চাইছে। পাথরের একেবারে শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে সুনেহেরা। দূর থেকে দেখলে মনে হবে অসীম জলরাশির সামনে দাড়িয়ে থাকা একা এক সৈনিক। চারপাশে শুধু পানি আর পানি অন্ধকার পানিতে ঘূর্ণি উঠছে। দূরে কালো পাহাড়ের রেখা। মাথার ওপর ভারী মেঘ। বাতাস এত জোরে বইছে যে তার সোনালি চুলগুলো উন্মত্তের মতো উড়ছে চারদিকে। নীল ওড়নাটা বারবার পেছনে উড়ে যাচ্ছে।
পোশাকের প্রান্ত বাতাসে উড়ছে। কিন্তু সুনেহেরা নড়ছে না। যেন সে নিজেও পাথর হয়ে গেছে।
চোখ স্থির হয়ে আছে নদীর বুকে। তবুও সে বেইমান চোখ নদী দেখছে না। সে খুঁজছে একজন মানুষকে। সুনেহেরার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। মানুষ টা আদৌ বেঁচে আছে তো?
প্তার চোখের কোণ ভিজে উঠলো।বহঠাৎ মনে হলোবঝাঁপ দিয়ে দিক। এই পাথরের মাথা থেকে এক লাফ দিবে নিচের উত্তাল নদীতে। সব শেষ হয়ে যাক। এই অপেক্ষা,এই কষ্ট, এই অনিশ্চয়তা।
কিন্তু পরক্ষণেই তিক্ত একটা হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে। সে তো সাঁতার জানে। ভালো করেই জানে। নদীতে ঝাঁপ দিলেও মরবে না। দু-চারবার ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। তারপর আবার কোনো পাড়ে উঠে আসবে। মৃত্যুও যেন তাকে গ্রহণ করতে রাজি নয়। সুনেহেরা ধীরে ধীরে পাথরের ওপর বসে পড়লো। হাঁটু জড়িয়ে মাথা রাখলো।
বাতাসে তার চুল বারবার মুখে এসে পড়ছে।
সে সরানোর চেষ্টাও করলো না। চোখ বন্ধ করতেই ভেসে উঠলো মাহাদির মুখ। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৭
“আপনি কোথায়? কোথায় মাহাদি?”
নদীর গর্জনের ভেতরে কথাটা কেউ শুনলো না। এখন মনে হয় নরম মনের হলেই ভালো হতো। আবেগ দেখানো যেত। মন ভরে কান্না করা যেত। সে নিজেকে সামলাতে পারবে না ভেবে মাহাদিও ছেড়ে যেত না।
