নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২৮
রূপন্তী সরকার
ঋষভ এবার ইয়াশফার মায়ের দিকে তাকালো। তিনি ঠিক ইয়াশফার মতোই বড় বড় চোখ করে মেয়ের খাওয়া দেখছেন। এটা দেখে ঋষভের মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল। ও আর কথা না বাড়িয়ে ইয়াশফার হাতটা আলতো করে ধরে তাকে মাটি থেকে টেনে তুললো। তারপর খাবারগুলো হাতে নিয়ে ইয়াশফাকে বললো, “বাকিটা গাড়িতে বসে খেও। এখন চলো তো।”
ইয়াশফা মুখটা ভীষণ রকম বাঁকিয়ে বললো, “নাহ, আমি আপনার বাড়ি তে যাবো না। আপনিই যান। আমি আমার এই গ্রামেই বেশ ভালো আছি।”
ঋষভ এবার চোখ রাঙিয়ে তাকালো ইয়াশফার দিকে। তারপর গম্ভীর গলায় ধমকে উঠলো, “থাপ্পড় চিনিস? থাপ্পড়? এক থাপ্পড় দিয়ে তোর চেহারার মানচিত্র বদলে দেবো। তাড়াতাড়ি গিয়ে গাড়িতে বোস!”
ইয়াশফা রাগে আর কিছু না পেয়ে বা হাত দিয়ে ঋষভের হাতে একটা জোরসে খামচি বসিয়ে দিল।ঋষভ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ইয়াশফাকে টেনে নিয়ে চললো। আর ওদের পেছন পেছন কিসমিস, পিপাই, বাঘা, ম্যাও সবাই দৌড়ে এলো। ওদের প্রিয় বন্ধু আবারও ওদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে, এবার ওরা কিছুতেই তাকে যেতে দেবে না। ওরা গিয়ে ইয়াশফার পায়ের কাছে একদম ঘেঁষে দাঁড়ালো। ইয়াশফা যেখানে যাবে, ওরাও যেন তার সাথেই যাবে। ইয়াশফা ছলছল চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে মন খারাপ করা সুরে বললো, “তোরা থাক পাখিরা, আমি আবার আসবো।”
ঠিক তখন হরিণটা ইয়াশফার পায়ের কাছে এসে শিং দিয়ে আলতো করে গুঁতো দিতে লাগলো। তার মানে, সে কোনোভাবেই ইয়াশফাকে ছাড়বে না। ঋষভ বুঝলো এই দলবল ছাড়া ইয়াশফাকে নেওয়া যাবে না। ইয়ায়ফার সাথে ওরা কন্যাযাত্রী যাবে। ঋষভ তখন ইয়াশফাকে বললো, “ওদেরকেও সাথে নিয়ে নাও।”
একথা শুনে ইয়াশফার মনটা খুশিতে নেচে উঠলো। ওই মস্ত বড় বাড়িতে ও একদম একা থাকে, এরা সাথে থাকলে সময়টা কত সুন্দর কেটে যাবে! ও খুব খুশি হলো যে, আবেগে হরিণটাকে একটা চুমু খেয়ে বসলো।তা দেখে ঋষভ মুখ কুঁচকে বিড়বিড় করে উঠলো,
“বেয়াদব একটা কোনো ম্যানার্স নেই! নিয়ে যাওয়ার কথা বললাম আমি, আর উনি চুমু খাচ্ছেন হরিণকে!”
ঋষভ সামনে গাড়ি ড্রাইভ করছে, আর পেছনে ইয়াশফা তার পুরো সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে হিলহিল কিলকিল করছে। বেডিদের খুশি দেখে কে! মনে হচ্ছে একদল বিচ্ছু মিলে মহা আনন্দে কারো বিয়ে খেতে যাচ্ছে। ইয়াশফার গ্রামে তেমন বন্ধু নেই শুরু বাঘারা ছাড়া।
হঠাৎ ঋষভ কষে ব্রেক চাপলো। পেছনের দিকে ঘুরে ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে চরম গম্ভীর গলায় বললো, “গাড়ি থেকে যেন একদম বের হওয়া না হয়। আমি ফিরে এসে যদি দেখি বিচ্চুগিরি করতে করতে গাড়ি থেকে নেমে বাঁদরামি করছিস, তাহলে মেরে একদম বালি চাপা দিয়ে দেবো!”
ইয়াশফা পুরো ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে মুখটা বাঁকালো। হাবভাব এমন যেন ও ঋষভের কথাই শুনতে পায়নি। ও আপনমনে বসে বসে চিপস খাচ্ছে আর কিসমিস-বাঘাদের সাথে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। ওরাও খুব মনোযোগ দিয়ে ইয়াশফার কথা শুনছে। ইয়াশফা এবার ওদের কাছে দুঃখের নালিশ দিয়ে বললো
“আর বলিস না বইন, একটা জাওরার সাথে তোগো বুন্দুর বিয়া হইছে! জাওরাটা উঠতে বসতে খালি মারে। অবশ্য আমিও ছাডবার পাত্রী না মাঝে মাঝে খাবারে থুথু মিশাইয়া দিয়া মনের ঝাল মেটাই। বিষ মিশাতে পারলে ভালো হইতো কিন্তু বিষ মিশালে বেডা আবার টপকে যাবে।তখন আবার আরেক ঝামেলা! দুঃখের কথা আর কী কমু তোগো! তোরা কোনোদিন ভুলেও বিয়া শাদী করিস না, বিয়া করার অনেক চো*দন!”
অবলা প্রাণীগুলো আদৌ তার কথা বুঝলো কি না কে জানে! তবে ইয়াশফার কথা শুনে ওরা যেভাবে অনবরত লেজ নাড়াতে লাগলো, তাতে মনে হলো ওরা সব বুঝে গেছে। পিপাই তো আবার পিপপিপ করে ওর কথায় সায় দিচ্ছে। পিপাই মানে ইয়াশফার টিয়া পাখিটা।
ও মনে হয় কী যেন বলতে চাইলো। ইয়াশফা ওর দিকে তাকিয়ে মুখ ঝামটা দিয়ে বললো, “কী হইছে? পিপপিপ করিস ক্যান? বিয়া করার শখ জাগছে? করিস না বিয়া, মরবি! আমি তো পরিস্থিতির চরম চোদনে পইড়া এই ভুল করছি, তোরা অন্তত ওই ফাঁদে পা দিস না।”
ঠিক তখনই ঋষভ দুই হাত ভর্তি একগাদা খাবার নিয়ে গাড়ির দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে শান্ত হয়ে ইয়াশফার কথা শুনছিল। মেয়েটার মুখের কী মধুর ভাষা! শুনে তো ঋষভের নিজেরই হালুয়া টাইট হয়ে যাওয়ার জোগাড়। তবে ওরে বিয়ে করে ইয়াশফা মনে মনে এতোটা পস্তাচ্ছে ভেবে ঋষভের বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটু খচখচ করে উঠলো।
ঋষভ ধপ করে এসে ড্রাইভিং সিটে বসলো।
পেছন ফিরে ও ইয়াশফার কোলে তিনটি বিরিয়ানির প্যাকেট আর পানির বোতল ছুড়ে দিল। এরপর কোনো কথা না বলে গাড়ি স্টার্ট দিল। খাবারে থুথু মেশানোর অংশটুকু ঋষভ শুনতে পায়নি, তবে শেষের কথাগুলো ওর কানে ঠিকই গেছে। ও গাড়ির লুকিং গ্লাসে ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো, “মুখের ভাষা তো মাশাল্লাহ্! গাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা আর ভয়েস রেকর্ডার আছে, এটা হয়তো জানতে না? সমস্যা নেই, বাড়ি গিয়ে ফুটেজগুলো ভালো করে চেক করবো। তারপর রুমে নিয়ে গিয়ে তোমায় আচ্ছা মতো থেরাপি দেবো!”
কথাটা শুনে ইয়াশফা একদম থ মেরে গেল। এতক্ষণ সে মনের সুখে ঋষভকে কত কী বলেছে, কত গালিগালাজ করেছে, এমনকি খাবারে থুথু দিয়ে খাওয়ানোর কথাটাও স্বীকার করেছে! এখন সব জানাজানি হলে কী হবে?ঋষভ আয়নায় ইয়াশফাকে ওভাবে চুপ করে থাকতে দেখে আবার বললো, “কী হলো, হাত চলছে না কেন? তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও।”
ইয়াশফা বিরিয়ানির প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে রইলো। ভয়ে ওর গলা দিয়ে এখন আর খাবার নামছে না। ও আড়চোখে পিপাই, বাঘা আর কিসমিসের দিকে তাকালো। ওরাও কেমন যেন করুণ চোখে ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে আছে। অবলা প্রাণীগুলোও হয়তো বুঝতে পেরেছে যে ওদের বন্ধু এবার বেশ ভালোভাবেই ফেঁসে গেছে! ইয়াশফা ওদের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো, “ইশশ! কেন যে তোদের কাছে দুঃখের নালিশ গাইতে গেলাম! এখন লোকটা সব শুনবে আর আমাকে সত্যিই মেরে বালি চাপা দিয়ে দেবে। শুনলে শুনুক গা, আমার কী! আমি তো কমুই, মাগো…!”
অবশেষে গাড়ি এসে পৌঁছালো বাড়ির সদর দরজায়। ওরা ভেতরে ঢুকতেই ঋষভের মিহির চোখ তো চড়কগাছ! ঋষভ আর ইয়াশফা একসাথে? তার মানে ঋষভ কাল রাতে বাড়ি ফেরেনি কারণ ও ইয়াশফাকে আনতে ওর গ্রামে গিয়েছিল? এটা কীভাবে সম্ভব! তাও আবার ইয়াশফা একা আসেনি, সাথে একগাদা পশুপাখির দলবল!মিহি চরম অবাক হয়ে ঋষভকে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি ইয়াশফাকে আনতে গিয়েছিলে ঋষ?”
ঋষভ কোনো উত্তর না দিয়ে শক্ত করে ইয়াশফার হাত ধরলো। তাকে টেনে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে নিয়ে যেতে যেতে ছোট করে বললো, “হ্যাঁ মাম্মাহ।”
মিহি ওদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে পেছন থেকে বললো, “আচ্ছা, ইয়াশফাকে নিয়ে একটু পর নিচে এসো, সবাই একসাথে খাবার খাবো।”
ঋষভ সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতেই জবাব দিল, “আচ্ছা।”
মিহি আবারে ঋষভকে বললো “এই হরিণ পাখি বিড়াল কুকুর কোথায় থাকবে?”
ঋষভ শান্ত কন্ঠে বললো “আপাতত বাগানে থাকুক বিকালে খাঁচা নিয়ে আসবো”
ইয়াশফা ঋষভের হাত চেপে ধরে বললো “ওরা বন্দী থাকে না। বাগানে রাখলেই হবে। ওরা একটু ও জ্বালাবে না। আর হিশু টিশু বাহিরে করে আসবে”
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২৭
ঋষভ ইয়াশফার কথা শুনে হাসতে চেয়েও হাসলো না। মেয়েটা এমন এমন কথা বলে খুব হাসি পায়।
আজ ভাগ্য ভালো যে রিদ বাড়িতে নেই। ও থাকলে এতক্ষণে পুরো বাড়ি মাথায় তুলতো আর একটা তুমুল ফাটাফাটি কাণ্ড ঘটে যেত। আপাতত বাড়ির পরিবেশটা বেশ শান্ত। তবে কাল রাতে বউ তুলে নিয়ে আসার পর ঠিক কী কী ঘটেছিল, তা ঋষভ এখনো জানে না। আর ইয়াশফা ও জানেই না ওরা বউ চুরি করেছে

Oaw golpo ta ki je shundor,naxt part taratare