Home পৌষপার্বণ পৌষপার্বণ পর্ব ৩৫

পৌষপার্বণ পর্ব ৩৫

পৌষপার্বণ পর্ব ৩৫
Irfa Mahnaj

অবশেষে শুধু হাঁটু অব্দি শর্ট প্যান্ট পড়ে খালি গায়ে হেলতে দুলতে নিজ বাবার জরুরি বৈঠকে এসে হাজির হয় পার্বণ। ইতমধ্যেই সে মাকে তার জন্য এক কাপ কড়া করে দুধ বেশি দিয়ে দুধ চা দিতে বলেছে।
— মাম্মা আমি আর বাবা খুবই ইম্পরট্যান্ট মিটিং এ বসবো। তাই আমার জন্য বেশি করে গুঁড়া দুধ দিয়ে ঘন করে এক কাপ চা দিও তো।
বাবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— এই বাবা তুমি খাবে?
বৈশাখ কিছু বলবে কি তাকে তো মুখ খোলারই সুযোগ দেওয়া হলো না। নিজেই প্রশ্ন করে আবার নিজেই সেই প্রশ্নের জবাব দিলো পার্বণ।

— থাক তোমার খেতে হবে না ডায়বেটিস বেড়ে যাবে।
— এই ছেলে তোকে বলেছি আমার ডায়বেটিস আছে?
— ওউ! নেই বলছো। সেসব যাকগে। এখন বলো কেনো এই ব্যাস্ত মানবকে ডেকেছো? আমি কাজে খুবই বিজি।
নাক কুচকালেন বৈশাখ। টিটকারি মেরে বললেন,
— বাপ হওয়া ছাড়া আর তো কোনো কাজ করতে দেখলাম না। করো তো সব অকাজ।
— উফ আব্বু! এটাই তো কত বড় কাজ। আমাকে আনলে, চৈত্র আপাকে আনলে তোমার তো জানার কথা কতটা পরিশ্রমের কাজ। তুমি তো তাও এডাল্ট ছিলে। আমি তো ১৮ এর গন্ডিও পার করিনি।
ছেলের অকপটে বলা ডাবল মিনিংএর কথা শুনে কাঁশি উঠে গেলো। খেঁকিয়ে উঠলেন তিনি।
— তো এতো অধৈর্য হতে কে বলেছিলো?
— আরে আর বলো না। তোমার নাতি নাতনি গুলো হয়েছে অধৈর্য। কেমন বাপের রোমান্স এর তেরোটা বাজিয়ে তেড়েফুরে হাজির। তাও একা না। বাই ওয়ান গেট ওয়ান এর মতো ডাবল!
জুতো খুলে ছুড়ে মারলেন বৈশাখ। পার্বণের হাসি হাসি মুখের উপর এসে জুতোটা খুব সুন্দর ভাবে ল্যান্ড করে। বৈশাখ বলে,

— বাদাইম্মা পোলা! তোরে আমি ডাকছি ভবিষ্যত এর কথা বলতে ও আসছে এসব কথা বলতে।
— আচ্ছা ঠিক আছে বলো আমি শুনি।
— তোর ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা নেই?
— আছে তো।
— তো পড়ালেখা না করে এমন টো টো করিস কেনো?
— বাচ্চা পয়দার সাথে পড়ালেখার কি সম্পর্ক!
অতি বিস্ময় নিয়ে কথাটা বলে পার্বণ। বৈশাখ নিজেও কিছু বুঝলেন না। তাই জিজ্ঞেস করলেন,
— মানে?
— মানে আমার ফিউচার প্ল্যান আমার বাচ্চা কাচ্চা দিয়ে তোমার এই বাড়ি ভরিয়ে ফেলা।
এমন উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো ভবিষতের কথা কেউ কখনো শুনেছে? না শুনলে সমস্যা নেই। পার্বণ আছে কি করতে। বৈশাখের ব্রহ্মতালু অব্দি গরম হয়ে গেলো। মাথার তালু ছেদ করে বুঝি গরম ধোয়া বের হচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করলেন,

— বাপ আমার তা তোমার বড় হয়ে কি হওয়ার ইচ্ছে?
হাসি হাসি জবাব পার্বণের,
— বাবা হওয়ার ইচ্ছে।
— আরে ধূর জীবনে কি করতে চাও?
— বাচ্চা পয়দা করে বাবা হতে চাই।
— তোর জীবনের লক্ষ্য কি?
— বউয়ের পেট কখনও খালি না রাখা। কারি কারি ছানা পোনার বাবা হওয়া।
ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলো বৈশাখের। উনি নিজের আরেকটা জুতো খুলে পার্বণের দিকে ছুড়ে মেরে বললেন,
— দূর হ তুই আমার চোখের সামনে থেকে। তোর আর ভবিষৎ নিয়ে ভাবতে হবে না। আমারই বাচ্চা প্লানিং এ ভুল হয়েছে যে তোরে জন্ম দিছি।

“বরিশালের পোলা মুই
মোরে চেনো না!
কল্লা ধইরা পাছার পারমু
মোরে চেনো না!”
সুর তুলতে তুলতে ফুটবল খেলে মাঠ থেকে বাড়ি ফিরছে পার্বণ। রুমে এসেই ঘামে ভিজা জার্সিটা খুলে ছুড়ে মারে।
ঠিক তখনই বারান্দা দিয়ে রুমে আসে পৌষ। এসেই ঘামের জার্সি খুলে বিছানায় দেখে নাক মুখ কুঁচকে ধমকে উঠলো পার্বণকে,
— এই তুই ঘামের টি শার্ট বিছানায় রেখেছিস কেনো?
দুস্টু হেসে পৌষের কাছে গিয়ে ঘাম সমেত ওকে জাপ্টে ধরে পার্বণ। ওর গলা জড়িয়ে নাকে নাক ঘষে। ঘাড়ে মুখ গুঁজে নাক ঘষে।
— মাই পিস!
ফিসফিস করে বলে ওঠে পার্বণ। তবে জোরে বলল,
— ইট’স কল্ড জার্সি বেব।
পার্বণকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে শুধায়,
— ছাড় পার্বণ আমাকে। আমার বমি আসছে।
অসহায় বোধকরলো পার্বণ। হাঁটু মুড়ে বসে পৌষের উঁচু পেটে মাথা ঠেকিয়ে শুধায়,

— আমার মুলা আর আমার কলা। আব্বাজান আর আম্মাজান বাপ মার কাছে যাবে সেটা ভালো লাগছে না? বাবা যদি মায়ের কাছে না যেতো তাহলে আপনারাও তো আসতে পারতেন না।
পেটের উপর থেকে পার্বণকে ঠেলে সরিয়ে বলে,
— খবরদার ভুলেও আমার ছেলে মেয়ের এমন উদ্ভট নাম রাখবি না।
অসুন্তুষ্ট হলো পার্বণ। পৌষের ড্রেসটা পেটের কাছ থেকে উঠিয়ে সেথায় নাক ঘষে। ঠোঁট দাবিয়ে সময় নিয়ে গাঢ় চুম্বন আঁকে।
— ওই বেডি চুপ থাক। আমি আমার ছেলে মেয়ের নাম যা ঠিক করেছি তাই হবে।
মাঠে খেলতে যাওয়ার আগে সবাইকে ডেকে পার্বণ বলে গেছে,
— শুনে রাখো সবাই কানের পর্দা খুলে। আমি আমার বেবিদের খুবই ইউনিক নাম ঠিক করেছি। ছেলে হলে নাম হবে কলা আর মেয়ে হলে নাম হবে মুলা।

বাসর রাতে মানুষ খাট ভেঙ্গে ফেলে মানা যায়। তাই বলে বাসর করতে গিয়ে নিজেরাই পঙ্গু হয়ে বসে থাকবে! নতুন বর – বউ নিজেদের হাত পা ভেঙ্গে মাথা ফাটিয়ে এখন সজ্জাশয়ী!
গতকাল রাতে কুত্তা বিলাইয়ের মতো মারামারি করতে গিয়ে পূর্ণা নিজের মাথা ফাটিয়ে ডান পা ভেঙ্গে বসে আছে।
অন্য দিকে কালমেঘ বাম হাত ভেঙ্গে গলায় ঝুঁলিয়ে,বসে আছে। ওদের সামনে দাড়ানো ওদের বাবা মা। বকুল বললেন,
— ভালো মানুষ আমি রুমে ঢুকালাম সকালে উঠে দেখি হাত পা ভাঙা! এই তোরা রুমের মধ্যে কুস্তি গিরি করছিলি?
— না তো মা।
কালমেঘের কথা শুনে গন্ধরাজ এবার মুখ খুলে।
— তো করছিলি কি?
পূর্ণা কালমেঘ দুজনেই দুজনের দিকে তাকিয়ে রাতের ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যায়।

ফ্ল্যাশব্যাক ~
পূর্ণার থেকে প্রতিশোধ নিতে রুমের দরজার সামনে তেল ঢেলে রাখে কালমেঘ। অপেক্ষা করতে থাকে পূর্ণার আসার। তবে ওই যে অধৈর্য্য ব্যাক্তি।
দরজার সামনে অনেক ক্ষণ পূর্ণার গলার স্বর শুনতে পেলেও ওকে রুমে আসতে না দেখে নিজেই হনহন করে হাঁটা দেয়। যাওয়ার সময় দেখে দরজা অব্দি গেলেও আসার সময় বাধে বিপত্তি।
রুমের দরজা দিয়ে মাথা বের করে,
— এই পূর্ণা রুমে আসিস না কেনো? আজব! ওখানেই দাড়িয়ে আছিস!
বলে যেই না ঘুরে কয়েকপা হাটে অমনি তেলের উপর পা দিয়ে ধপ করে মাটিতে। “ওমাগো” বলে চেঁচিয়ে উঠতেই সেই আওয়াজে পূর্ণাও তড়িঘড়ি করে আসে।
দরজার ধারে চিৎপটাং হওয়া কালমেঘের বডির সাথে উষ্ঠা খেয়ে ধুপ করে পড়ে। শুধুই পড়েনি একদম ল্যান্ড করে খাটের পায়ার সাথে।
খাটের সাথে বাড়ি খেয়ে হাত, মাথা ফাটিয়ে কালমেঘের উপরেই হ্যামবার্গারের মতো চিৎপটাং সে।

কেটে গেছে এক মাস। পৌষের উঁচু পেটটা আরো উঁচু হয়। হাত পা ফুলে যায়। পার্বণ ভীষণ যত্নবান হয়ে গেছে। পৌষের গোসলের পর ড্রেস ধুইয়ে দেওয়া, ওর চুলে তেল দিয়ে আঁচড়ে দেওয়া, রাতে ব্যথা উঠলে হাত, পা টিপে দেওয়া, তেল ম্যাসেজ করা সহ সব করে।
বর্ষা একবার বলেছিলো পৌষকে তার কাছে থাকার কথা তবে পার্বণ নাড়াজ। সে পৌষকে নিজের কাছেই রাখবে।
পৌষ যখন যেটা খেতে চায় সেটা যে করেই হোক হাজির করে। রাত বাড়লে পৌষের ক্ষিদে বাড়ে। রান্নাঘরের চৌকাঠ না মাড়ানো ছেলেটা এখন ইউটিউব দেখে প্রায় অনেক রান্নাই শিখে গেছে।
এই তো সেদিন পৌষ আমলকি খাবে। এ সময় আমলকি কোথায় পাবে সেটা না ভেবেই নিজের শখ ফুটবল খেলা ছেড়ে ছুটে আসে। ফুটবলের প্রতি আলাদাই ঝোক পার্বণের।
সেদিন বড় প্রতিযোগিতা হচ্ছিলো সেই খেলার মাঝ পথেই ছেড়ে দেয় শুধু পৌষের জন্য আমলকি আনবে বলে। বাকিরা যখন জিজ্ঞেস করে,

— তুই এভাবে খেলা ছেড়ে যেতে পারিস না। এরকম সুযোগ আর পাবি?
তখন পার্বণ হাসি মুখে জবাব দেয়,
— এরকম হাজারটা সুযোগ আসবে তবে আমার পৌষের উপর কিছুই নেই। আমার বাচ্চাদের উপর আর আমার স্ত্রীর উর্ধে আমার কোনো শখই বড় নয়।
ছেলেটা সেই রোদের মধ্যে কত জায়গা খুঁজে অবশেষে আমলকি এনে হাজির করে। গাছে উঠতে গিয়ে হাঁটুর ছালও উঠে গেছিলো।
পৌষকে এক মুহুর্তও কাছ ছাড়া করে না। পারলে কলিজার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখে। হাগতে গেলেও ফোন নিয়ে গিয়ে নাক চেপে বসে থাকবে। এতে অবশ্য পৌষ প্রচন্ড বিরক্ত। তবুও পার্বণ স্থির। ওর কোনো হেলদোল নেই।
এসব ভেবেই মুচকি মুচকি হাসে পৌষ। হটাৎ গলা শুকিয়ে গেলে পাশের টেবিল থেকে পানি নিতে যায়। উঁচু পেটের কারণে ঝুকেও যখন পারে না তখন উঠে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
পার্বণ বোধহয় খেতে গিয়েছে। পৌষকে বার বার বলে গেছে এক পাও খাট থেকে নিচে না দিতে। কিছু লাগলে ডাক দিতে। পৌষ ভাবলো এই তো শুধু নেমে দাঁড়াবে ব্যাস!

পৌষপার্বণ পর্ব ৩৪

কিন্তু এটাই যে ওর জন্য কাল হবে সেটা ভাবতেও পারেনি। অতিরিক্ত ভারি পেটের কারণে ভারসাম্য হারিয়ে স্লিপ খায়। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে বসে পেটে তীব্র আঘাত পেয়ে করুন সুরে আর্তনাদ করে উঠে “ওমাগোওওও !” বলে।
চিৎকার এতো জোরেই ছিলো সেটা নিচ পর্যন্ত যায়। পার্বণের লোকমা নেওয়া হাতটা মুখের কাছে এসেই থেমে যায়। সারাদিন কিচ্ছুটি পেটে পড়েনি। বড্ড খিদেয় এই সবে তিন লোকমা খেয়ে চতুর্থ লোকমা মুখে দিতে নিয়েছিলো।

পৌষপার্বণ পর্ব ৩৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here