Home পৌষপার্বণ পৌষপার্বণ পর্ব ৭ (২)

পৌষপার্বণ পর্ব ৭ (২)

পৌষপার্বণ পর্ব ৭ (২)
Irfa Mahnaj

পৌষের অনবরত নড়াচড়া করার জন্য শেষে বাধ্য হয়ে বাস রোমান্সে ইতি ঘটাতে হয়েছে পার্বণকে।
এতে বেশ বেজার পার্বণ। তার মুখটা এইটুকুন হয়ে গেছে। যা দেখে সিটের আরেক মাথায় বসা পৌষ মিটিমিটি হাসছে।
পার্বণকে একটু থামাতে পেরেই তৎক্ষণাৎ লাফিয়ে সিটের অন্যপ্রান্তে চলে যায় পৌষ। আর রিস্ক নেয়নি।
কিছু একটা ভেবে সিট থেকে উঠে যেতে ধরলে মোবাইল দেখায় মনোযোগ পার্বণ থমথমে গলায় বলে,
— কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। কিছু করবো না। আমি আবার মুড চলে গেলে কিছু করিনা।
মুখ মোচড় দেয় পৌষ। ঢং যতসব। সে উঠবে। এই সিটে আর একমুহুর্তও না। তবে তার সেই আশায় গুড়ে বালি।
যখনই উঠতে গিয়েছে ওর হাত টেনে ওকে সিটে বসিয়ে দেয়। এবারে আর পৌষ দূরে বসতে পারেনি।
ওর কাঁধ জড়িয়ে ওকে টেনে নিজের পাশে একদম শরীর ঘেঁষে বসিয়ে দিয়েছে। পৌষের চোখের দিকে শান্ত নজরে তাকিয়ে থেকে পার্বণ বলে উঠে,
— বেশি করবি তো যা করতে আটকেছিস সেটাই এখন করবো।
ব্যস আর কিছু বলতে পারেনি পৌষ। সেভাবেই ভোঁতা মুখে বসে ছিলো।

বাস নির্দিষ্ট সময়েই গন্তব্যে পৌঁছেছিল যার কারণে তাদের সকালের সূর্যদয় ও দেখা হয়েছিলো।
কক্সবাজারে তারা কোনো হোটেল বা রিসোর্টে থাকবে না বরং চৈত্রের ফ্রেন্ডের বাসায় থাকবে।
হ্যাঁ চৈত্রের ভার্সিটি ফ্রেন্ড এর বাসা এখানে। ফ্রেন্ড বর্তমানে এখানে নেই কিন্তু তারা ট্যুরে আরো একবার এসেছিল বলে ফ্রেন্ডের মা তাকে চিনে।
তাই কোনরূপ অসুবিধে ছাড়াই তারা চৈত্রের ফ্রেন্ডের বাড়ি উঠেছে। প্রথমে মানা করলেও চৈত্রের বান্ধবী রূপচাঁদা সেই কথা মানতে নারাজ।শেষে রাজি হয় চৈত্র।

চৈত্রের বান্ধবীর নাম রূপচাঁদা। রূপচাঁদাদের বাড়ির সদস্য সংখ্যা তিন জন। রূপচাঁদার মা পুঁটি। আর তার একটা ছোট ভাই শুঁটকি।
রূপচাঁদার বাবা মারা গিয়েছেন সমুদ্রের মধ্যে মাছ ধরতে গিয়ে। ঝড়ের সময় ঢেউয়ের কবলে পড়েছিল।
পুঁটি দুই ছেলে মেয়েকে মানুষ করতে অনেক কষ্ট করেছিলেন। এখনো করে যাচ্ছেন। রূপচাঁদা শহরে যাওয়ার পর তাদের অবস্থার উন্নতি হয় কিছুটা।

একটা টিনের দোচালা ঘরের সামনে এসে দাড়ায় ভাদ্র, চৈত্র, পৌষ, পার্বণ। ঘরের চারিদিকে ছিটকে আছে মাছ ধরার জালসহ আরো কিসব হাবিজাবি।
কয়েকটা বাড়ি একসাথে মিলে জায়গাটা একটা বসত পল্লীতে পরিণত হয়েছে। মোটামুটি সবকিছুই আছে দেখা যায়।
এই যেমন, মাছের আঁশ টাস ছড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। তারপর কিছু মুরগি, হাস, কবুতর। খড়কুটো ও আছে এক সাইডে। দুটো গরু ও আছে।
এটুকু সময়ের মাঝেই এসব কিছু খেয়াল করা হয়ে গেছে পার্বণের। সে এসেই ভিতরে না গিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখেছে।
এখন ফ্রেশ হয়ে পৌষের কানে সব ঢালছে। মাঝে মাঝে উৎসাহ দেখাচ্ছে তো মাঝে মাঝে নাক সিটকাচ্ছে।
পার্বণের পুরো কথাটা পিঠা খেতে খেতে শুনছে মনোযোগের সহিত পৌষ। কখনো পিঞ্চ মারছে তো কখনও জিজ্ঞেস করছে ডিটেইলস।
কথায় কথায় পার্বণ পৌষকে বলে উঠে,

— পিছনে বন টাইপের কিরকম একটা জায়গা আছে। সুন্দর তোকে ঘুরিয়ে আনবোনে।
ঘোরার কথা শুনতেই চোখ চক চক করে উঠে পৌষের। খুশি মনে রাজি হয়ে যায়। জানতে চাইলো,
— কখন যাবি?
— বিকালের দিকে বীচ ঘুরে তারপর ওদিক ঘুরে একসাথে আসবো। ভূতুড়ে একটা ব্যাপারও হবে। যদি ভূত টুত কিছু দেখা যায় তাহলে তো সেই হবে।
— কেনো? ওখানে কি ভূত থাকে নাকি?
— আরে সে আমি কি জানি। শুনেছি এরকম জায়গায় নাকি থাকে। আর থাকলেও একটা এডভেঞ্চার হয়ে যাবে।
তাদের কথার মাঝেই উপস্থিত হলো শুঁটকি। ছেলেটার নামের সাথে শরীর আর চেহারার ভীষণ মিল।
একদম শুঁটকির মতোই চিকন। কালো গায়ের রং। হয়তো শ্যামলাই ছিলো রোদে পুড়ে কালো হয়ে গেছে।
গায়ে আকাশি রঙের একটা হাফ হাতা গেঞ্জি যেটায় আবার ময়লা লেগে আছে। পরনে হাঁটু অব্দি হাফ প্যান্ট।
বয়স বড়জোর ১১ কি ১২ বছর। হঠাৎ ছেলেটার বয়স জানতে কৌতুহল জন্মালো। দমিয়ে না রেখে জিজ্ঞেসই করে ফেললো পৌষ,

— এই যে ছেলে তোমার বয়স কত?
হাসি মুখে ছেলেটা জবাব দিলো,
— ১৩ চলে আফা। সামনের মাস আইলে ১৪ হইবো।
তব্দা খেয়ে গেলো পৌষ। ছেলেকে দেখে বুঝার উপায় নেই ছেলের বয়স।
শুঁটকি নামের ছেলেটি এবার তার হাতে থাকা পিঠের বাটিটা পার্বণের দিকে এগিয়ে দেয়। বলে,
— নেন ভাই পিঠা খান। আম্মায় বানাইছে। খুব মজা।
—- তাই নাকি তাহলে দে।
— হ লন ভাই।
কথাটি বলার সময় ছেলেটিকে ভীষণ উৎফুল্ল আর খুশি দেখাচ্ছিল। পার্বণ এবার ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করে,
— তা তোর নাম কিরে?
— জে ভাই শুঁটকি।
— কি!
অবাক হলো পৌষ পার্বণ। এতোদিন জানতো তাদের নামগুলোই অদ্ভুদ এখন দেখছে তাদের থেকেও অদ্ভুদ নামের লোক আছে।
পার্বণ খেতে খেতেই বলল,

— নামের সাথে দেখছি তোর চেহারার ও মিল আছে।
পার্বণের কথা শুনে শুঁটকি নামের ছেলেটা কিছুটা লজ্জা পেয়ে গেলো। লাজুক হেসে মাথা চুলকাতেই তা দেখে শব্দ করে হেসে উঠলো পার্বণ।
আর পৌষ দিলো লাগিয়ে ওরে পিঠে এক কিল সেই সুযোগে। শুরু হয়ে গেলো তাদের মারামারি।
[মারামারি করতে গিয়ে না আবার রোমান্স করে ফেলে বেটা পার্বণ 🌝🙂]

পৌষপার্বণ না থাকায় বনচাঁপা আজ একাই কলেজে এসেছে। সারাক্ষণ মেয়েটার বোরিং সময় কেটেছে।
পূর্ণাও আসেনি তার নানু অসুস্থ সেখানে গিয়েছে। এই বেয়াদব মেয়ে সেটা আগে বলবে না। তাহলে তো বনচাঁপাও যেতো না।
এসব ভাবতে ভাবতে উদাস মনে বাসায় ফিরছিলো সে। তখনই তার রাস্তা আটকে ধরে দুটো ছেলে।
ছেলে দুটোকে চেনে বনচাঁপা। ওরই কলেজে পড়ে ওর সাথের। অন্য শাখায়। এদের দুজনের মধ্যে একটা আছে যে বনচাঁপা কে ভীষণ বিরক্ত করছে।
মানা করলেও পিছু ছাড়ে না। পার্বণ থাকলে তখন কাছে ঘেষার সাহস পায়না। পার্বণ ওদের তিনজনকে সুরক্ষিত রাখে সর্বদা।
আজ একা পেয়েই বজ্জাতটা সুযোগ লুটেছে। আগে সাহস পেলেও বর্তমানে একলা সাহসে কুলাচ্ছে না। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না।
তবুও শক্ত কণ্ঠে তেজ দেখিয়ে বলে ,

— কি চাই? বলেছি না আমাকে বিরক্ত করবে না।
— চাই তো তোমাকে। কিন্তু তুমি তো রাজি নও। তাই আজ আর ছাড়বো না।
— মানে?
বুঝতে পারলেও জিজ্ঞেস করলো বনচাঁপা। ওর এমন অবুজপনা দেখেও হাসলো ছেলেটা।বনচাঁপার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
— গেলেই বুঝবে।
আতঙ্কে চিৎকার দিয়ে উঠে বনচাঁপা। ছেড়ে দিতে বলে,
— কি করছো কি? ছাড়ো আমায়। আমি কিন্ত চেচাবো।
— চিৎকারই তো করছো। কিন্তু কেউই আসবে না তোমার চিৎকার শুনে।
আজ কেনো যে আসতে গেলো তাই নিয়ে আফসোস হচ্ছে বনচাঁপার। তবে কি তার ইজ্জত শেষ। ধ*র্ষি*তার খাতায় এবার বুঝি তারও নাম লেখার পালা এসে গেছে।
যখনই বনচাঁপা ভাবলো আশার আলো নিভে গেছে তখনই সেই আলো ধপ করে জ্বলে উঠে।
কোথা থেকে যেন হেমন্ত আসে। এসেই হিংস্র শিকারির মতো আক্রমণ করে বসে ছেলে দুটোর উপর।
এলোপাথাড়ি মারতে লাগে ছেলে দুটোকে। প্রায় আধমরা বানিয়ে ফেলে তবুও খেন্ত হয় না। শেষে অবস্থা বেগতিক দেখে বনচাঁপা এসে আটকায়।

বসন্তের জাউ*রামিতে অতিষ্ট হয়ে গেছেন মাঘ। কই হেমন্ত তো এমন নয়। এই ছেলেকে নিয়ে আর পারে না সে।
রোজ রোজ বিচার আসবে এই ছেলের নামে। এর এইটা চুরি করেছে তো, এর এইটা ভেঙ্গে ফেলেছে। করো কাচ ভাঙ্গে তো কারো মাথার টাক।
বাচ্চাদের পর্যন্তও ও রেহাই দিচ্ছে না। ওর জালায় মাঘ বুঝি এবার পাগলা গারদেই চলে যাবে।
সেই কারণেই আজ বসন্তের ক্লাস নিচ্ছে মাঘ। মারার এক পর্যায়ে যখনই জুতা খুলে মারতে নিবে সদর দরজার সামনে থাকা বসন্ত নুইয়ে যায়।
ব্যস জুতা গিয়ে সোজা লাগে হিমসাগরের মুখে। মুহুর্তেই স্তব্ধ হয়ে যান মাঘ। এই ছেলের জন্য আরেক ঝামেলা এখন।
পিছনে ঘুরে কার গায়ে জুতাটা লাগছে দেখতে গেলেই ৩৮০ ভোল্টের ঝটকা খায় বসন্ত। দুনিয়ায় এতো লোক থাকতে এর গায়েই পড়তে হলো!
তাও আবার আজকেই দরজা খোলা থাকার দরকার ছিলো? আশ্চর্য বাশ কি শুধু বসন্তকেই দেখে!
এমনিতেই বসন্তের পায়ের ঘাম মাথায় উঠে যায়। বসন্তের হবু শশুরকে কিনা বসন্তের মা জুতা মারলো!
হিমসাগর এসেছিলেন একটা কাজে। কাজটা মূলত জৈষ্ঠ্য এর সাথে। ডক্টর বিষয়ক ব্যাপার।
কিন্তু এখানে এসে যে এই অবস্থার শিকার হবেন তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। মাঘ এর দিকে তাকাতেই দেখলেন ভদ্রমহিলা কাচুমাচু ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছেন।

পৌষকে নিয়ে সেই জঙ্গলে এসেছে পার্বণ। কিছুটা সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এদিকে মানুষজন নেই বললেই চলে।
তাছাড়া সবাই সবার কাজে ব্যস্ত। এদিকে এতো খেয়াল রাখবে কে? ভাদ্র আর চৈত্রকে ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে এসেছে।
ফোনের ফ্লাশ জালিয়ে দুজনে এখন হাঁটছে। উদ্দেশ্য ভূতের সাথে সাক্ষাৎ। এভাবেই কিছুক্ষণ হাঁটার পর হঠাৎ ঝোপের মধ্যে কিছু একটার আওয়াজ পেতে থেমে যায় দুজনে।
কিছুটা আশ্লীল আওয়াজ। দুজনের বুঝতে মোটেও অসুবিধা হয়না এখানে যে অসংযত কিছু ঘটছে।
বিব্রত বোধ করে দুজনে। পৌষের একটু বেশিই অস্বস্তি হচ্ছে। পার্বণ এলোমেলো গলায় বলে,
— চল এখান থেকে। ভূত দেখার দরকার নেই।
পৌষের হাতের কব্জি শক্ত করে ধরে দ্রুত সেখান থেকে যেতে নিলেই হঠাৎ কয়েকজন তাদের সামনে এসে পড়ে।
এভাবে হঠাৎ আসায় ঘাবড়ে যায় পৌষ। দুই পা পিছিয়ে যেতেই ওকে নিজের আড়াল করে দাড়ায় পার্বণ।
তখনই একজন বলে উঠে,
— এই এরা বুঝি এখানে খারাপ কিছু করতে এসেছে।
বিরক্ত হয় পার্বণ। বয়সে বড় হয়েও এরকম নির্বোধ! কাজ করছে ঝোঁপের আড়ালে আর ধরছে তাদের।
সে এবার জবাব দেয়,

— আজ্ঞে না আংকেল। আপনার ধারণার খারাপ কাজটি আমরা নই বরং ওই ঝোঁপের আড়ালে করছে।
আঙ্গুল উঁচিয়ে ঝোপটা দেখিয়ে দিলে সেখান যায় সকলে ।এবং দেখে আসলেই তাই।
শেষে সেই দুজনকে ধরে বাঁধা হয়। অবস্থা যে খুব বেশি ভালো না তাও বুঝতে বাকি রয়না পার্বণের।
পৌষের হাত ধরে বেরিয়ে যেতে চাইলে লোকগুলো ওদেরকে আটকে ধরে। একজন জিজ্ঞেস করে,
— এই ছেলে তোমরা কোথায় যাচ্ছো?
— বাসায়।
— কিসের বাসা কোথাও যেতে পারবে না।
— আরে আশ্চর্য যারা করেছে অসামাজিকতা তাদের তো ধরেছেনই আমরা এখানে থেকে কি করবো তাহলে?
— ওরা করেছে তোমরা যে করোনি তার প্রমাণ কি?
— ওদের ড্রেসের অবস্থা দেখুন আর আমাদের ড্রেসের বুঝে যাবেন।

পৌষপার্বণ পর্ব ৭

এতেও মানতে চাইলো না লোকগুলো। তাদের কথা তোমরা যেহেতু এই বনে এসেছো তার মানে খারাপ কাজ করতেই এসেছো।
ধরা পড়ে এখন বাজে বকছে। লোকগুলোর কমনসেন্সর এতো খারাপ দশা দেখে পার্বণের মাথা গরম হয়ে গেলো।
কিন্তু ওদের এইসব পাত্তা না দিয়ে লোকগুলো এবার বাকি দুইজনের সাথে পৌষ পার্বণের বিয়ের ব্যবস্থা করে।
বিয়ের কথা শুনতেই মাথায় বাজ পড়ে পৌষের। ভুত দেখার সাধ জন্মের মতো ঘুচে গেছে।

পৌষপার্বণ পর্ব ৮