প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২১ (২)
ইনান হাওলাদার
সেই বিকালে তূর্যের রুম থেকে ফিরে নিজেকে ঘর বন্দি করেছে আহি, আর বাইরে বের হয়নি।তূর্য ভাই যে লেভেলের হি’টলার নিশ্চই সবাইকে সবটা বলে দিবেন । সামনা সামনি ফাঁস করলে বেশি লজ্জায় পড়তে হবে।তাই তূর্য ভাই সবাইকে বলে – টলে যাক ,তারপর না হয় পিঠ পেতে মায়ের হাতের মা’র খেয়ে নেবে।তবে আরেকটা বার সে তূর্যকে অনুরোধ করে দেখবে।যদি এই যাত্রায় কোনো ভাবে মান সম্মানটা রক্ষা করা যায়।
তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো তূর্যও এখনো পর্যন্ত রুম থেকে বের হয়নি। সে তখন থেকে দরজার দিকে চেয়ে আছে।তূর্য বেরোলেই গিয়ে পা জড়িয়ে ধরবে।কয়েকবার অ’নুরোধ করবে।তারপরও যদি না শুনে , না শুনবে! সে অত নিচে নামতে পারবে না !
খালি তো রূপই আছে।তাছাড়া আর কিই বা আছে! তার চেহারা কি কম নাকি ? সে কেনো এত নিচে নামতে যাবে? এসব হাবিজাবি ভাবনার মাঝে আহি খ’ট করে দরজা খোলার আওয়াজ পেলো।মুহুর্তেই বুঝতে পারলো তূর্য দরজা খুলেছে।কোনো রকমে গায়ের ওড়নাটা ঠিকঠাক করে এক দৌঁড়ে গিয়ে পিছন থেকে তূর্যের পা জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করে বলল,
“আর জীবনেও এসব উল্টাপাল্টা কথা বলতাম না,তূর্য ভাই । এইবারের মতো মা’ফ করে দেন ,প্লীজ ! আম্মুর কানে গেলে খুব মা’রবে ”
” কানে তো চলে এসেছে ! কী করেছেরে তূর্য? খালি একবার বল !বড় হচ্ছে আর গাধা হচ্ছে। ” ছাদ থেকে শুকনো জামাকাপড় নিয়ে আসছিলের মারুফা বেগম।মাঝপথে এমন কাহিনী দেখে কথাটা বললেন তিনি।
মায়ের কন্ঠ শুনে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালো আহি। জামা ঝাড়তে ঝাড়তে আল্লাহর দরবারে ফ’রিয়াদ করতে লাগলো সে।আল্লাহ বোধ হয় তার ডাক শুনলেন।তূর্য বলল,
” মেজো চাচ্চু কোথায়? ফিরেছেন ?”
” নাহ,এখনো ফিরেনি।কী হয়েছে ,আমাকে বল।”
” তেমন কিছু না ! একটা জিনিস চাওয়ার আছে ” আহির দিকে বাঁকা চোখে তাঁকিয়ে থেকে কথাটা বলল তূর্য।
” আচ্ছা।আসলে তোকে জানাবো “বলে আহির জামা কাপড়গুলো ওর হাতে আর তূর্যের টি শার্ট দুটি তূর্যের হাতে দিয়ে চলে গেলেন তিনি। মা জায়গা ত্যাগ করতেই আহি মুখ কাচুমাচু করে জিজ্ঞেস করলো,
“আব্বুর কাছে কী চাইবেন ,তূর্য ভাই?”
” তোর বা’পের কাছে কিছু চাইতে হলে তোর কাছে আগে টিকিট কাটতে হবে নাকি?”কপালে কয়েকটি ভাঁজ ফেলে বলল তূর্য।
” বুঝেছি ! আমার জা’নটাকে চাইবেন ! তাই না?”
” তোর জা’ন দিয়ে আমার কী হবে?” আহি মুখ গো’মড়া করে দাঁড়িয়ে রইলো শুধু।
তার জামা কাপড়ের সাথে মারুফা বেগম ভুল করে তূর্যের একটা শার্টও তার কাছে দিয়ে গিয়েছেন। তূর্য সেটা দেখে, আহির কাছে থাকা কাপড়ের দলা থেকে নিজের শার্টটি ধীর গতিতে টেনে নিতে নিতে খুব আস্তে ফিসফিস করে করে বলল ,
” আমার জা’নটাকে চাইবো ! ”
আহি বি’দ্যুৎ বেগে মাথা তুলল। চোখা চোখি তো দূরে থাক সে তূর্যের মুখটাও দেখতে পেল না। কথাটা বলে তূর্য আর এক সেকেন্ড অপেক্ষা করেনি।বড় বড় পা ফেলে জায়গা ত্যাগ করেছে । আহি এখনো তূর্যের যাওয়ার পানে তাঁকিয়ে আছে। তূর্য ভাই তাকে মা’রা তো দূরে থাক ব’কলেনও নাহ? আর আব্বুর কাছেও কিছু বলবেন নাহ। তার মানে কাউকে কিচ্ছু বলবেন না,এটা নিশ্চিত!তূর্য ভাই মনে হয় বুঝতে পেরেছেন, এতে তার কোনো দো’ষ নেই । সবটাই বয়সের দো’ষ!
সে কি তাহলে আরেকটা সুযোগ নিয়ে দেখবে ? যদি কোনো ভাবে পা’থরে ফুল ফোটানো যায়।
সন্ধ্যাটা তখন ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে উঠেছে।চৌধুরী বাড়িতে মুড়ি মাখানোর তোড়জোড় চলছে।যৌথ পরিবার হওয়ায় এইটুকুই যেন বাড়িতে উৎসবের আবহ সৃষ্টি করেছে। বাড়ির চার পুরুষ বাদে বাকিরা ড্রয়িং রুমে জরো হয়েছে। লতা বেগম মরিচ,পেঁয়াজ কেটে এনে মারুফা বেগমের হাতে দিলেন।এসব মাখামাখি বিষয়ে তিনি ওস্তাদ।পারভীন বেগম বললেন,
” বাচ্চারা খাবে মরিচটা একটু কমিয়ে দিস, মেজো”
” আচ্ছা,বুবু ”
মারুফা বেগম প্রথমে চানাচুর,মরিচ আর পেঁয়াজের মধ্যে মুড়ি মাখা তেল মিশিয়ে সেটাকে ভালো করে মাখিয়ে নিলেন।তারপর সেগুলোর মধ্যে মুড়ি ঢালতে ঢালতে আহির উদ্দেশ্যে বললেন,
” তূর্য খাবে কিনা শুনে আয় ”
আহি মুড়ির ভিতর থেকে একটা বাদাম তুলে মুখে দিয়ে বলল,
” তূর্য ভাই এসব খান নাকি? শোনা লাগবে না “আর মনে মনে বলল,” পাগল? প্যা’রেট খেতে সে তূর্যের রুমে যাবে?তার বুঝি জা’নের মায়া নেই?”
” তোকে যেতে বলেছি, যা! ” চ’ড়ে উঠলো মারুফা বেগমের গলা।
আহি মুখ বাঁকিয়ে বি’রক্তির সহিত বললো,
” ধুর ,আম্মু।তুমি বেশি বেশি করো। এই তাহি তুই যা তো ”
” এত বড় আ’লসে মেয়ে মানুষ দুইটা নেয় পৃথিবীতে।বিয়ের পর সংসার করে খাবি কিভাবে তুই,জা’নোয়ার ?”
” তোমরা থাকতে আমি কোন দুঃ’খে সংসার করতে যাব?”গাল ফুলিয়ে বলল আহি।
” তোর শ্বশুর বাড়ি গিয়েও রান্না করে খাইয়ে আসবো আমি?”
” তুমি কি রান্না করো নাকি ? আমার শাশুড়িই তো করেন”শেষ কথাটা আস্তে করে বলল আহি।বলেই মিটিমিটি হাসতে লাগলো।পারভিন বেগম বললেন,
” আহি তো ঠিকই বলেছে ।তূর্য এসব খাবে না। ”
নিজের পক্ষে একটা লোক পেয়ে আহি পারভিন বেগমের গা ঘেঁষে বসে আদুরে ভঙ্গিতে জড়িয়ে ধরলো।সেটা দেখে তাহিও গিয়ে মায়ের কোলের উপর বসে পড়লো।
রাত বেশি গভীর নয়, শহরের আকাশে নরম হলুদ আলোয় ঝলমল করছে উঁচু দালানগুলো। জানালার বাইরে থেকে দেখা যায়,নিচে সাইলেন্সড রোড, মাঝে মাঝে এক–দুটো গাড়ির হেডলাইট ছুঁয়ে যাচ্ছে অন্ধকারকে।
সাদা চাদরে ঢাকা বিছানায় একখানা ফোন কানে ধরে শুয়ে আছে আহি । কাউকে কল করছে। রিসিভ হতেই সে উ’ত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠলো,
” তারিন রে….! আমি তূর্য ভাইকে আই লাভ ইউ বলে দিয়েছি ”
আহির মুখে এহেন কথা শুনে তারিনের চোখ বড় বড় হয়ে গিয়েছে।লাস্ট এক মাস ধরে আহি শুধু বলছিল সে তূর্য ভাইয়াকে প্রপোজ করবে।সে ভেবেছে হয়তো দু’ষ্টুমি করছে আহি। তাই সেও রোজ খবর নিত প্রপোজ করেছে কিনা।এতদিন ভেবেছে আহি মজা করে এসব বলে।কিন্তু এই মেয়ে সত্যি সত্যি প্রপোজ করে দিয়েছে?তারিন চুলে ক্লিপ আটকাচ্ছিল, হাতে ধরা চুলের ক্লিপ মাঝ রাস্তায় থেমে গিয়েছে।সে আশ্চর্য হয়ে বলল,
” তারপর?”
“সেই বিকালে বলেছি। বলেই পালিয়ে এসেছি !তোর ফোন বন্ধ ছিল কেন? সেই কখন থেকে পেট গুড়গুড় করছে,কখন তোকে জানাবো!”
পালিয়েছে শুনে তারিন হো হো করে হেসে উঠে বলল,
” আরে ভাইয়া কি বলেছে সেটা আগে বল !”
” উনি আবার কি বলবেন?জা’নে বেঁচে আছি এই শুকরিয়া কর “মুখ ফুলিয়ে বলল আহি।
তারিন হাতের তালু দিয়ে নিজের কপালে আস্তে একটা চ’ড় দিয়ে বলল,
” আরে বুদ্ধু রে!কি বলে শুনে আসবি নাহ?”
” সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করলে আর জী’বন নিয়ে ফিরতে পারতাম না ”
” যাক!অতিশয় ব্যস্ত লোক দুইজনই উপস্থিত আছেন। শান্ত ,বাবা তোর মেজো বাবাকে নিচে আসতে বল। বলবি আমি ডাকছি ”
কথাটা বলতে বলতে সিঁড়ি বেঁয়ে নিচে নামলেন আকবর চৌধুরী।
প্রথম কথাটা যে তিনি তূর্য আর আসিফ চৌধুরীকে খোঁ’চা মে’রে বলেছেন সেটা তারা ভালো করেই বুঝেছে।ভাইয়ের ঠে’স মা’রা কথা শুনে হেসে উঠলেন আসিফ চৌধুরী।তবে তূর্যের মুখের কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। সে পূর্বের মতোই ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে কিবোর্ডে আঙুল চালিয়ে যাচ্ছে।মিনিট পাঁচেক পর শান্তসহ আসলাম চৌধুরী নিচে আসলেন।একে একে বাকিরাও উপস্থিত হলো। আকবর চৌধুরী মনোযোগ কাড়ার উদ্দেশ্যে গলা খাঁকারি দিলেন।সকলে এমনিতেই মনোযোগী ছিলেন।এখন আরেকটু বাড়তি খেয়াল দিলো।অথচ আকবর চৌধুরী যার মনোযোগ নেওয়ার উদ্দেশ্যে গলা খাঁকারি দিলেন সে এখনো নির্বিকার চিত্তে ল্যাপটপে মুখ গুজে বসে আছে। মেজাজ চ’ড়া হলো তার। তবু কিছু বললেন না।ছেলের দিকে রা’গী দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে থেকে বলতে আরম্ভ করলেন,
” আগামী পরশু বাবার মৃত্যু বার্ষিকী।প্রতিবারই তো সাধ্যমতো মিলাদ ও মাহফিলের আয়োজন করা হয়।এইবার একটু বড়সড় করে করতে চাইছিলাম । বাবা – মা দুজনেরটাই একসাথে করতে চাচ্ছি এইবারে। তোমাদের কি মত ?”
বাবার কথা শুনে তাহি আহির কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
” আপু প্রতিবার তো কত বড় করে করা হয়।এইবার নাকি আরো বড় হবে।তাহলে কি পুরো ঢাকা সিটির মানুষকে খাওয়াবে নাকি ?” আহিও তাহির মতো ফিসফিস করে বলল,
” চু’প কর! আগে শুনতে দে ”
আসলাম চৌধুরী আর আসিফ চৌধুরী দুই ভাই একই সাথে বলে উঠলেন,
” তুমি যেটা ভালো বুঝো সেটাই করো ভাইজান ”
বাড়ির তিন গিন্নিও তাতে সাঁই দিলেন।
” এত ঝামেলা না করে মসজিদ,মাদ্রাসায় দান সদকা করাটাই বেটার হবে আই থিঙ্ক।আর এইবার যখন একটু বড় করেই করার কথা ভাবা হচ্ছে তাহলে কয়েকটা এতিম খানায় খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করলেই হয়। ” ল্যাপটপে নিজের কাজ চলমান রেখেই বলল তূর্য। তার মতামত পেয়ে খুশি হলেন আকবর চৌধুরী।তবে সেটা নিজের মুখে প্রকাশ করলেন না।আর কাউকে বুঝতেও দিলেন না। আসলে যারা কম কথা বলে তারা যদি হুট করে কিছু বলে ওঠে তাহলে সবাই ই সেই কথায় মনোযোগ ও প্রাধান্য দুটোই দেয়। আর তূর্য কখনোই বাড়তি বা অপ্রয়োজনীয় কথা বলে না । যা ই বলুক সবটা যুৎসই হয়। তার এই প্রস্তাবটা সকলেরই পছন্দ হলো।কিন্তু কেউ কিছু বললো না।সবাই আকবর চৌধুরীর মুখের দিকে চেয়ে আছে।সেটা খেয়াল করলেন তিনি,গ’ম্ভীর গলায় বললেন,
” কী হয়েছে? আমার দিকে তাঁকিয়ে আছো কেন? নিজেদের মতামত জানাও ”
আসলাম চৌধুরী বললেন,
” তুর্যের ভাবনাটা মন্দ নয়,ভাইজান”
” সেটা বলবি তো।আমার মুখের দিকে চেয়ে আছিস কেন ? আচ্ছা ,তাহলে সেভাবেই আয়োজন করা হবে ”
” এবারের টোটাল খরচ আমি দেবো ” ল্যাপটপটা বন্ধ করে একপাশে রেখে কথাটা বলল তূর্য।
” কেন? তুমি একা কেন দেবে? প্রতিবার যেমন শরিক থাকো তেমনি থেকো।আমরা সবাই মিলে দিব ”
এভাবে সবাই মিলে আরো টুকিটাকি আলাপ আলোচনা করলো। কিন্তু আহি নিজের ভাবনায় বুদ হয়ে আছে।তূর্য ভাই মিলাদের সকল খরচ বহন করতে চাইলেন? তার মানে তার ধারণা ভুল? তূর্য ভাই কি’প্টা নন! যাক ,ভালো হলো। বিয়ের পর সে যা চাইবে তূর্য ভাই কিনে দিবেন।একটুও ছ্যাঁ’চড়ামি করবেন না।ইসস! কবে যে সে তূর্য ভাইকে পটাতে পারবে ! আজ থেকে তাহাজ্জুত নামাযও পড়তে হবে। তাহলে আল্লাহ তার মনোবাঞ্ছা দ্রুত পূরণ করবেন ইনশাআল্লাহ ।
এখন সে তাদের দাদুকে খুব বেশি মিস করছে।দাদু শুধু বলতেন ,” তোর আর তূর্যের বিয়ে দেবো ” তখন সে কতই না রা’গ দেখাতো।হাত – পা ছড়িয়ে কান্না – কাটিও করেছে কত।
এখন বুড়িটা বেঁচে থাকলে তাকে সবটা বলে – কয়ে একটা ব্যবস্থা করতে পারত।তূর্য ভাই তো দাদুর কথা খুব মানতেন। দুইজনে মিলে কিসব শলাপরামর্শও করতেন।সে গেলেই চুপ হয়ে যেত।খুব ভালো করে মনে আছে তার। তিনিও দাদুকে খুব ভালোবাসতেন ।দাদু কিছু বললে তার কথা নিশ্চয়ই ফেলতে পারতেন না । দাদু মা”রা যাওয়ার পর থেকে তূর্য ভাই আরো বেশি গ’ম্ভীর হয়ে গেছেন। কিন্তু একটা বিষয় খুব অদ্ভুত লেগেছিল তার,দাদু মা’রা গেলে তূর্য ভাই একটুও কান্না করেননি।তবে চোখ দুটো অদ্ভুদ রকমের লাল হয়ে ছিল।মনে পড়লেই ভ’য় লাগে তার। তিনি নাকি কান্না করতে পারেন না।সেও দেখবে ভবিষ্যতে কোনো দিন তূর্য ভাই কান্না করেন কিনা।
কাল কোচিংয়ে একটা পরীক্ষা নিয়েছিল।আজ সেটার রেজাল্ট দিয়েছে।খুব ভালো রেজাল্ট করেছে আহি।সেটাই বারবার দেখছে। কাল রাত থেকে আজ রাত পর্যন্ত সে নানান সুযোগ খুঁজেছে তূর্যের রুমে যাওয়ার জন্য।কিন্তু কোনো সুযোগ পায়নি।একটা বুদ্ধি বের করে যে তূর্যের রুমে যাবে সেটাও হচ্ছে না।মাথাটায় পুরো জং ধরে গেছে।কোনো বুদ্ধিই মাথায় আসছে না। একবার প্রপোজ করেই তো রাস্তার বখাটে ছেলেরা থেমে থাকে না।কতশত ভাবে পটানোর চেষ্টা করে যায়। তাহলে সে কেন একবার ‘ আই লাভ ইউ ‘ বলেই বসে থাকবে? তূর্য ভাইকে পটানোর নানান চেষ্টা চালাতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে তার মাথায় একটা আইডিয়া এলো , সে তো রেজাল্ট দেখানোর অজুহাত নিয়েও তূর্যের রুমে যেতে পারে।ভেবেই তড়িঘড়ি করে রেজাল্ট শিটটা হাতে নিয়ে বেরোলো।কোনো সংকেত ছাড়াই তূর্যের রুমে প্রবেশ করলো। রুমে নেয় তূর্য।সে এদিক সেদিক তাঁকিয়ে দেখলো ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ।সে আরাম করে খাটে বসলো। কিছুক্ষণ পর তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে তূর্য বের হলো।বেরিয়ে আহিকে দেখে অবাক হলো সে।তবে কিছু বললো না।পা চালিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আহি এক দৃষ্টিতে তূর্যের দিকে চেয়ে আছে। তূর্য ভাই তার স্বামী হলে মন্দ হবে না!
তুর্যের গায়ের টিশার্টটার অধিকাংশ জায়গাই ভেজা। কী আকর্ষণীয় লাগছে দেখতে।ইদানীং কেন যেন তূর্যকে বেশিই সুন্দর লাগে আহির কাছে।আচ্ছা ,তূর্য ভাই কি রূপচর্চা করা দিয়েছেন নাকি? নাহলে হুট করেই এত ভালো লাগার কারণ কী? সে তো আর তূর্যকে ভালোবাসে না,যে সেই কারণে ভালো লাগছে।নেহাত ফিকশন্যাল ম্যানের মতো দেখতে তাই এত কাঠখড় পো’ড়াচ্ছে।
” রাতের বেলা গোসল করলেন কেন ,তূর্য ভাই?” ভাবনা থেকে বেরিয়ে প্রশ্ন করলো আহি।
” সব কৈ’ফিয়ত তোকে দিতে হবে ?”
” বললে কি হয়? ” ক’পট অভিমানী সুরে বলল কথাটা আহি।
” বউয়ের কাছ থেকে এলাম তাই শাওয়ার নিয়েছি । কেন নিয়েছি বুঝেছিস তো? নাকি ব্যাখ্যা করতে হবে?”
“আপনার আবার বউ আছে নাকি ? ” বলে উচ্চস্বরে হাসতে লাগলো আহি।
” কী জন্য এসেছিস বল ” তূর্যের কথায় আহি হাসি থামিয়ে দিয়ে বলল,
” আমার রেজাল্ট দেখাতে এসেছি আপনাকে ।এই দেখুন !” বলে এগিয়ে গিয়ে রেজাল্ট শিটটা তূর্যের দিকে এগিয়ে ধরলো সে। তূর্য হাত বাড়িয়ে নিলও। সে কাগজটা নিয়ে ডিভানের উপর গিয়ে বসলো। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। আহি এগিয়ে গিয়ে বলল,
” আর…..” এইটুকু বলেই থেমে গেল সে। বাকি কথাটুকু বলতে ভয়ে বুক কাঁ’পছে তার। তূর্য কাগজটার দিকে নজর রেখেই প্রশ্ন ছুড়লো,
” আর কী ?”
” আর ,আই লাভ ইউ “আহি একটু সময় নিয়ে কথাটা বলেই তূর্যের হাত থেকে কাগজটা টান দিলো।ভেবেছিল খপ করে কাগজটা টেনে নিয়ে ভোঁ দৌঁড় দিবে সে।কিন্তু সেটা আর হলো কোথায়!কাগজটা টান দেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই তূর্য খপ করে ওর হাতের কব্জি ধরে ফেলেছে।তাল সামলাতে না পেরে আহি হুমড়ি খেয়ে তার গায়ের উপর পড়ে গিয়েছে।ঘটনার আ’কস্মিকতায় তূর্য বসা অবস্থায় ডিভানে হেলে পড়েছে। আপাতত আহি তার উপর উপুড় হয়ে চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে।আর সে নিজের দুই হাতে আহির দুই হাতের উপরিয়াংশ ধরে নিজের থেকে যথাসম্ভব দূরত্ব বজায় রেখেছে।আহির মুখ পানে তাঁকিয়ে থেকে তূর্য গ’ম্ভীর গলায় বলল,
“সারাক্ষণ ভাই, ভাই বলে মুখে ফ্যা’না তুলে ফেলিস।
আর এখন এসব বলতে ল’জ্জা লাগছে না তোর, বে’য়াদব?”
আহির হা’র্টবিট অ’স্বাভাবিক রকমে বেড়ে গিয়েছে। এভাবে কখনোই সে তূর্যের এতটা কাছাকাছি আসেনি।বড় জোর কয়েকবার তূর্য ভাই তার হাতখানা ধরেছে।সেটাও হাতে গোনা কয়েক বার।নিজের অনুভূতির তোয়াক্কা না করে সে বলল,
” আপনি জানেন না?হুমায়ুন আহমেদ বলেছেন,কাউকে ভালোবাসলে বলে দেও। কেননা,আ’ক্ষেপ,আপ’সোস নিয়ে দুনিয়া ছাড়তে নেয়।আর হ্যাঁ,পু’নর্জন্ম হবে না ”
” দ্বিতীয় বার তোর মুখে এই কথা শুনলে পু’নর্জন্ম তো দূরে থাক,এই জন্মও হারাবি।”
বলে নিজের গায়ের উপর থেকে আহিকে এক প্রকার ধা’ক্কা দিয়ে সরলো তূর্য। কেন জানি এবার খুব খারাপ লাগলো আহির।সে কি ইচ্ছা করে গায়ের উপর পড়েছে নাকি? হাত ধরে টান না দিলে তো আর পড়তো না।এত জোরে ধা’ক্কা মা’রার কি আছে? কিন্তু
সে হাল ছাড়ল না।
তূর্য কেন তাকে রি’জেক্ট করছে মনে মনে সেসব কারণ খুঁজে বের করে পুনরায় বলতে আরম্ভ করল,
” আমাকে রি’জেক্ট কেন করছেন,তূর্য ভাই? আপনি কি আমার হাইট দেখে না করে দিলেন? দেখুন আমি ৫’৪” আপনিই অযথা খাম্বার মতো লম্বা ।এইজন্যই আমাকে আপনার সামনে খাটো খাটো দেখায়।নাকি আপনার শ’রীর গ’ন্ডারের মতো চ্যা’প্টা ।আর এদিকে আমি তালপাতার সেপাই এইজন্য?নাকি আমি ফর্সা আর আপনার গায়ের রং অতটা ফর্সা না এইজন্য? দেখুন,তূর্য ভাই পুরুষ মানুষকে কিন্তু ডিপ কালারেই ভালো লাগে।আপনার গায়ের রং আরেকটু চাপা হলেও প্রবলেম ছিল না আমার।কি করবো বলুন? এগুলো তো আল্লাহই দিয়েছেন ।আমাদের তো আর হাত নেই ”
একনাগাড়ে কথা গুলো বলে থেমে গেলো আহি।তূর্য এতক্ষণ খুব মনোযোগ দিয়ে তার কথা গুলো শুনছিল। আহি ননস্টপ বকবক করে থেমে যাওয়ার পর সে চো’য়াল শ’ক্ত করে বললো,
” হুম ! তারপর ? থামলি কেন?”
” ওহ, হ্যাঁ! আপনি কি আমাদের এজ গ্যাপ নিয়ে ভয় পাচ্ছেন ? কোনো ব্যাপার না।তুম সে তুম তাক নাটকেও নায়িকার বয়স ১৯ আর নায়কের ৪৬! ”
তূর্য এবার উঠে দাঁড়ালো, দাঁতে দাঁত চে’পে বলল,
” তুই আমাকে কনভেন্স করতে এসেছিস ?নাকি অ’পমান করতে ? তোর কি মনে হয়? আমার বয়স ৪৬ ?
আর কি ? আমি খাম্বা ? গ’ণ্ডার? এক্ষনি দূর হ আমার রুম থেকে নাহলে…..” তূর্যকে এদিক – ওদিক তাঁকিয়ে কিছু খুঁজতে দেখে আহি একদৌঁড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।এবারের মতো জা’নে বাঁচুক ফের না হয় নতুন উদ্যমে আবার ফিরে আসবে। তবে নেক্সট টাইম আসার সময় আগে স্ক্রীপ্ট রেডি করে নেবে।সেগুলোকে সুন্দর করে খাতায় লিখবে।তারপর টানা মুখস্ত করবে।
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২১
সেইবার আর উল্টোপাল্টা প্রশংসা করবে না।সে এমন ভাবে কথাগুলো সাজাবে সরাসরি তূর্য ভাইয়ের হৃ’দরে এসে বি’ধবে।একেবারে তীরের ফলার মতো। তখন তিনি নিজে থেকেই বলবেন,” আহি বোন আমার! আমাকে বিয়ে কর প্লিজ !” ধুর! কিসব ভাবছে সে। তূর্য ভাই তাকে বোন কেন বলবে? সুন্দর একটা আদুরে নাম দেবে।এই যেমন, জা’ন,ক’লিজা,কি’ডনি,ফু’সফুস, আরো কত কি !
