Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৯

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৯

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৯
ইনান হাওলাদার

বাড়িতে ফিরে আবার একই কাহিনী,একই অশান্তি। সাকিবের মা কল করে বিকালের সকল কাহিনী জানিয়ে নানানভাবে অপমান করেছে তারিনের বাবাকে। তিনি শুধু মুখ বুঝে শুনেছেন।কিছু বলার নেই তো।থাকতে পারে না।
যে মেয়েকে নিয়ে এতদিন গর্ব করে বেরিয়েছে সেই মেয়েকে নিয়েই এখন পদে পদে অপমানিত হতে হচ্ছে । তারিন মাথা নিচু করে সবার বলা কথা শুনছে, একবার মা কথা শোনাচ্ছে তো একবার বাবা ,আরেকবার চাচি। দু গাল বেয়ে অনর্গল অশ্রু ঝরে পড়ছে।

এমন কি অ’ন্যায় করেছে সে মেহেদীর সাথে? যার কারণে এতটা অ’পমানিত হতে হচ্ছে তার। কোনো দো’ষ না করেও সকলের কথা শুনতে হচ্ছে। আ’ত্ম’হ’ত্যা পা’প নাহলে এত কথা কে শুনত?
তারিনের দাদি ছেলে – বৌমাদের থামানোর অনেক চেষ্টা করলেন ।কিন্তু,বয়স হয়ে গেলে কি আর কথার কোনো দাম থাকে? তিনি তাদের থামাতে না পেরে তারিনের হাত ধরে নিজের কক্ষে নিয়ে গেলেন।তখনও তারিনের বাবার গলা ভেসে আসছে,

” ভেবেছিলাম যে অ’ন্যায় করেছে থাক। একটা ভালো সম্বন্ধ দেখে – শুনে বিয়ে দিবো।হাতের নাগালে রাখবো।এখন আর সেটা করব না।ময়মনসিংহের ওই পরিবারের সাথেই আতিথেয়তা করবো।আমি ওদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিচ্ছি। ওকে আর চোখের সামনে রাখতে চাই না আমি ”
তারিন রুমে ঢুকে দাদিকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দিলো। কান্না করতে করতে বলল,
” বিয়ে হয়ে গেলে আমি আর কোনোদিন এই বাড়িতে আসবো না দাদু। কোনোদিন না। ম’রে গেলেও না ”
তারিনের দাদিও তার কান্না সহ্য করতে পারলেন না। তারিনের চোখের পানি দুই হাতে মুছিয়ে নিজে কান্না জড়ানো গলায় বললেন,

” এ্যামনে কয় না বু।আব্বা – মা তোর খারাপ চাইবো না।এট্টু রা’ইগা গ্যাছে ,আবার ঠিক হইয়া যাইবো।তুই কাঁন্দিস না।”
” কেমন বাবা – মা ওরা? একটাবার আমার কথা বিশ্বাস করলো না। আর আমি যদি ঐ ছেলের সাথে সম্পর্ক করেও থাকি এগুলো নিয়ে এত বাড়াবাড়ি কেনো করছে? এসব বিষয় তো এখন স্বাভাবিক দাদু। তবুও আমি তো বলেছি তারা যেখানে বিয়ে দিবে আমি সেখানে বিয়ে করবো।তাহলে কেনো এসব ব্যবহার করছে আমার সাথে? ”
” একে তো অন্যায় করেছে তারউপর আবার গলা করছে ওই মেয়ে ” বাইরে থেকে তারিনের মায়ের ঝাঁ’ঝালো কন্ঠ ভেসে আসলো। তারিনের এখন বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে ,এরা সত্যিই ওর আপন মা – বাবা তো? এইযে এখন এত বি’ষাক্ত কথা যারা বলছে তারাই একসময় তাকে নিয়ে গর্ব করত? তারাই বুক ফুলিয়ে নিজের মেয়ে বলে পরিচয় দিত?
বেশ অনেক্ষণ ধরে কান্না কাটি করে শান্ত হয়েছে তারিন। আর কান্না করবে না।সৃষ্টিকর্তা কপালে যা লিখে রেখেছেন সেটাই হবে।
কিছুক্ষণ বাদে তারিনের মা একটা প্লেটে করে খাবার নিয়ে আসলেন। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে উঠতে বললেন। উঠলো না তারিন। এত ব’কে এখন এসেছে খাবার নিয়ে।খাবে না ও । মনে মনে আরো নানান কথা ভাবলেও বারবার করা মায়ের জোড়াজুড়িতে উঠে বসলো সে। অভিমানী গলায় বলল,

” তুমিও আমাকে বিশ্বাস করো না, মা ?”
” আমরা সকলে তোকে বিশ্বাস করি মা।কিন্তু বাকি যারা আছে তারা তো করবে না।
তুই আমাদের মেয়ে বলেই বিশ্বাস করলাম।অন্যের মেয়ে হলে আমিও করতাম না।একটা ছেলে খালি খালি এসব কেনো বলে বেড়াবে বল ? ভাত খা ,মা। তোর বাবা রা’গের মাথায় বলেছে । সে – ই আমাকে ভাত দিয়ে পাঠিয়েছে । দেখি হা কর ,আমি খাইয়ে দিচ্ছি ”

দুপুরের খাবার খেয়ে মন খারাপ করে ছাদের এক পাশে থাকা কাঠের বেঞ্চে বসে আছে আহি। মন খারাপের কারণ,ইদানিং তারিনের যেন কি হয়েছে।যে মেয়ে সবসময় তাকে ম্যাসেজ দিতো,কল করতো।সেই মেয়ে দুই – তিনদিন পার হয়ে যায় তবুও কোনো ম্যাসেজ দেয় না।সে দিলেও ঠিক মতো রিপ্লাই করে না।আহি বুঝতে পারে মেয়েটা হয়তো কোনো কারণে তার উপর অভিমান করেছে,কিন্তু প্রকাশ করে না।সে অনেকবার জিজ্ঞেস করেও কোনো লাভ হয়নি।
এদিকে শবনম সারা বাড়ি খুঁজে আহিকে না পেয়ে ছাদে এসেছে।ভর দুপুরে এভাবে বসে থাকতে দেখে বলল,

” এখানে তুমি? একা একা কি করছো?”
বলে কাঁধে হাত রেখে আহির পাশে বসলো সে।আহি আস্তে করে বলল,
” কিছু না।তুমি কোথায় ছিলে? তোমার রুমে গিয়ে না পেয়ে একা একা চলে এসেছি ”
” পাবে কিভাবে? তুমি যখন উঠে আসলে আমি তো খাচ্ছিলাম।তারপর ফুপি বললেন তূর্য ভাইয়াকে ডেকে দিতে।ওখানে আবার কিছুক্ষণ দেরি হলো।ফুপি না তোমাকে বলল ভাইয়াকে ডেকে দিতে? ডেকেছিলে?”
” ভাইয়া শুয়ে ছিলেন তাই একবার ডেকে আর ডাকিনি । ডাকলে ব’কতেন । তোমাকে ব’কেনি?”
” না তো! সুন্দর করেই তো বললেন ”
” ওওও! তা তূর্য ভাইকে ডাকতে গিয়ে তোমার দেরি হলো কেনো?”
” ওই একটু কথা বলছিলাম।ওসব ছাড়ো,শাড়ি কখন পরবে সেটা বলো ”
” শাড়ি পরার মুড নেই ”

” কেনো? আসলেই! তোমার মন খারাপ মনে হচ্ছে আহি। কিছু হয়েছে?”
” তেমন কিছু না।শবনম জানো? তারিনের কথা বলেছিলাম না তোমাকে? ওর কি যেন হয়েছে।কোনো কারণে আমার উপর রা’গ করেছে।কিন্তু প্রকাশ করে না।আমার খুব খারাপ লাগছে। ”
” তুমি ওর সাথে দেখা করে কথা বলো ।দেখো সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে ”
” ও নাকি ঢাকার বাইরে।কিন্তু আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।হয়তো দেখা করবে না, তাই মিথ্যা বলছে।ভার্সিটিতেও যায় না।আর,ব্যাচে তো আমিই যাই না ”
” আচ্ছা এখন কল করে দেখো তো ”
শবনমের কথা মতো তারিনকে কল করলো আহি।ভেবেছিল বরাবরের মতো হয়তো কল কেটে ম্যাসেজ দিবে।কিন্তু এইবার রিসিভ করলো তারিন।একদম স্বাভাবিক গলায়,অতীতের মতো করে উৎফুল্লতা সাথে সে বলল,
” কি খবর তোর? ভার্সিটি যাস ঠিকমতো? মনে করে নোটস গুলো দিয়ে রাখবি ”
তারিনের স্বাভাবিক স্বরে মুখে হাসি ফুটলো আহির।সে অভিমানী গলায় বলল,

” এই কয়দিন তোর কি হয়েছিল তারিন? আমার সাথে ওরকম ব্যবহার করেছিলি কেনো? রা’গ করেছি আমি ”
” আচ্ছা বাবা,স্যরি। ”
এর আগে তাদের মধ্যে কোনো মনোমালিন্য হলে আহি
‘ রা’গ করেছি ‘ বললে।তারিন উল্টে বলতো সেও রা’গ করেছে।তারপর দুইজন একসাথে একে অপরকে স্যরি বলে সবটা মিটমাট করতো। কিন্তু এখন তারিনের এভাবে হার মেনে নেওয়া মানতে পারলো না আহি।ফের সন্দেহ হলো তার।বলল,

” তারিন! কি হয়েছে তোর? একবারেই স্যরি বলে দিলি? আমি কিছু ভুল করেছি ?”
” তোরা আবার কি করবি?” তাচ্ছিল্য হাসলো তারিন।তারপর ফের বলল,
” সকল ভুল তো আমারই। ব্যাচে যাওয়াই আমার জন্যে কাল হয়েছে। আবার ভাবিস না তোর মেহেদী ভাইয়াকে দো’ষারোপ করছি।তার কোনো দো’ষ নেই। আমিই দো’ষী”
” মেহেদী ভাইয়া আবার কিছু করেছে তারিন ?”
” কেনো? তোর জেনে লাভ কি? ওও বুঝেছি! হাসাহাসি করবি?বিনোদন নিবি তাইনা? ”
” তারিন!”আর্তনাদ করে উঠলো আহি।
” পরে কথা বলবো রে,রাখি। একটু পর আমাকে দেখতে আসবে।খুব শিগগির বিয়ের নেমন্তন্ন পাচ্ছিস।শপিং করে রাখিস ” বলে কল কাটলো তারিন।আহির চোখ ভিজে উঠেছে। শবনম এতক্ষণ তারিনের সকল কথা শুনেছে। সে কৌতুহলী হয়ে বলল,

” আহি ? তারিন কোন মেহেদীর কথা বললো?”
” তোমার কাজিন। আমার মনে হয় মেহেদী ভাইয়া তারিনকে ভালোবাসেন,মনে হয় না আমি সিউওর ”
” একটা কথা বলি ,কিছু মনে করো না।আমি যতদূর জানি মেহেদী ভাইয়া তোমাকে পছন্দ করে।”
” পছন্দ করে! কিন্তু তারিনকে ভালোবাসে।একজন মানুষ অনেকজনকেই পছন্দ করতে পারে ,তবে ভালো একজনকেই বাসে শবনম ”
” কাহিনী কী, আমাকে খুলে বলবে আহি?”
আহি শুরু থেকে সবটা বলল শবনমকে। শবনমও ব্যাপারটা বুঝলো । এটা ভালোবাসা হলেও হতে পারে।সে আবার এসব বিষয়ে অত অভিজ্ঞ নয়। কিন্তু মেহেদীর এসব করা মোটেও ঠিক হয়নি।শুধু শুধু অনেক বাড়াবাড়ি করেছে।আর এদিকে তারিন বলে মেয়েটা আহির সাথে বাড়াবাড়ি করছে। সৃষ্টিকর্তা তো বলেই দিয়েছেন ‘ যে যেমন তার জীবনসঙ্গী ও তেমন হবে ‘ সেটাই!

তারিন – মেহেদী দুইজনেই বাড়াবাড়িতে মাস্টার।তবে এখন যেকোনো উপায়ে আহির মন ভালো করা দরকার।সবসময় হাসিখুশি থাকা,হইহই করে বেড়ানো মেয়েটাকে এভাবে মন ম’রা হয়ে থাকলে মানায় না। সবার আগে আহির মন ভালো করা দরকার।তারপর দুইজনে মিলে আলোচনা করে একটা উপায় বের করে সবার সাথে সবার সম্পর্ক ঠিক করে ফেলবে।সে বলল,
” আহি,আমরা একটা প্ল্যান করি।তুমি তো চাও মেহেদী ভাইয়ার সাথে তারিনের কিছু একটা হোক।আমিও চাই। চলো আমরা ভাইয়ার সাথে দেখা করি ,কথা বলে ওর ভাব বুঝি । ”
” আমি দেখা করতে পারবো না।তূর্য ভাই ব’কবেন। অন্যকিছু ভালো”
” মোবাইলে তো এতকিছু করা সম্ভব নয়। দেখা তো করতেই হবে।তূর্য ভাইয়া যেদিন বেশি বিজি থাকবেন ওইদিন দেখা করি?”

” টের পেলে মা’রবেন উনি ”
” আরে পাবে না । আমি দেখবো বিষয়টা। এইবার তুমি একটু হাসো তো ”
শবনমের মন রক্ষার্থে কষ্ট করে হলেও হাসলো আহি।তারপর আরো বেশ কিছুক্ষন ধরে কথা বললো তারা।প্রতিদিনের মতো সময় মেপে ছাদে আসলো তূর্য। তাকে দেখে শবনম আলগোছে ছাদ থেকে নেমে পড়লো। আহিরও দুষ্টুমি করার মুড নেই। সে চলে যেত নিলো।তূর্য পিছু ডেকে বলল,
” হোয়াট হ্যাপেন্ড ? মুড অফ কেনো ? ”
আহি হাসিহাসি মুখ করে বলল,
” কোথায় মুড অফ? ”
” তখন একবার ডেকেই চলে এলি কেনো?”
” কখন ?”
” তখন !”
” আপনি ঘুমিয়ে ছিলেন তাই।
সেধে সেধে কে ব’কা শুনবে!”
” কেনো ? তুই !”

” পারবো না! অনুভূতি চেপে রাখতে পারি না বলে সবাই সস্তা ভেবেছেন না?কোনো সম্মান নেই আমার? ”
আহির কথার কোনো আগা – মাথা না পেয়ে ধ’মকে উঠলো তূর্য,
” স্টপ ইট,ননসেন্স ! কি সস্তা সস্তা করছিস?”
” সস্তা মানে বুঝেন না? যার কোনো মূল্য নেই ! ” বলে চলে যায় আহি।
সবটা মাথার উপর দিয়ে গেল তূর্যের। আস্ত স্টু’পিড একটা। এমনি সময় ব’কলেও নড়ে না ,নির্লজ্জের মতো আরো বেশি করে পটর পটর করতে থাকে ।আর এখন দেখো! বিনা কারণে তেজ দেখিয়ে চলে গেল।
তবে তার কাছে সত্যিই আহির কোনো মূল্য নেই। অমূল্য! যাকে কোনো মূল্যে মূল্যায়ন করা যায় না।খুব দামি , অতি মূল্যবান !

জীবনের মোড় কিভাবে পাল্টে যায়! মেহেদী ছেলেটা বাড়ি ছাড়ল কার জন্যে,আর এখন কাকে ভালোবেসে বুদ হয়ে আছে। অথচ,নিজেও জানে না,বুঝে না।
এ কোন য’ন্ত্রণায় ভুগছে মেহেদী তা জানে না। ভিতরটা বারবার বলছে মেয়েটার সাথে তার এমন ব্যবহার করা উচিত না।তবুও কেনো নিজেকে সামলাতে পারছে না? কেনই বা বারবার ওর সাথেই দেখা হয়ে যাচ্ছে? কি চাইছেন সৃষ্টিকর্তা? এই কয়েকদিনে কতবার করে ভেবেছে এরপর তারিনের সাথে দেখা হলে অন্তত একবার হলেও সরি চেয়ে নিবে। দেখা তো হলো, কিন্তু সেটা আর হলো কই! সেই রুড বিহেভই করে ফেললো।
মেয়েটার ফ্যামিলিই বা কেমন! চেনা নেই, জানা নেই ,একটা ছেলের সাথে দেখা করতে পাঠিয়ে দিলো? সাকিব যে বিবাহিত সেটা কি তারা জানেন না?নাকি মেয়েকে ঘাড় থেকে নামাতে চান?
মেহেদী ফেইসবুক স্ক্রল করছে ঠিকই ,কিন্তু তার মাথায় এসব কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে। হঠাৎ নোটিফিকেশনে তার ধ্যান ভাঙলো। শবনম ম্যাসেজ দিয়েছে।আপাতত টাইপিং করার কোনো ইচ্ছা তার নেই। সে কল দিলো এবং সবসময়ের মতো স্বাভাবিক গলায় বলল,

” কি অবস্থা? ঢাকাতে আছিস শুনলাম ”
” হ্যাঁ ভাইয়া! তোর কি খবর?কাকি বললো বাড়ি ছেড়েছিস। ফিরবি কবে?”
” খবর তো ভালো।বাড়ি ফিরব রে,ফিরতে হবে।আব্বু একবার বললে ফিরতাম।বলে না তো তোর কাকা ”
” ভালো হয়েছে।এখন আ’ফসোস করে ম’র। শোন ,এসব ছিটকে রা’গ দেখানো বন্ধ কর। ”
” এই জীবনে আর হবে না রে বনু ” খানিকটা টেনে টেনে কথাটা বললো মেহেদী ।
” তোর সাথে একটা ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে।দেখা করতে হবে ”
” ওসব ইম্পর্ট্যান্ট কথা আমি জানি। তূর্য ভাইয়া আর তোর না হওয়া ভাবি একে অপরকে ভালোবাসে তাই তো ?তুই তো ওই বাড়িতে থাকিস ,ঘটনা কি সত্যি শবনম ? ” শেষ কথাটা সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললো মেহেদী

” ঘটনা সত্যি,কিন্তু তোকে অন্য কথা বলার আছে।আহিও থাকবে ”
” মাফ কর আমার মা! সেদিন তূর্য ভাইয়া আমাকে যে থ্রে’ট দিয়েছে!”
আহি পাশেই ছিল।মেহেদীর কথা শুনে মোবাইলটা নিয়ে কৌতূহলী গলায় বলল,
” আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।কেমন আছেন?
তূর্য ভাই কি বলেছেন আপনাকে ?”
প্রথম দুইটা প্রশ্ন ফর্মালিটি মাত্র।শেষ প্রশ্নের উত্তরটাই হলো মেইন।কিন্তু মেহেদীর মাথায় অন্যকিছু চলছে।সে যে একটু আগে শবনমকে বলল ,’ তোর না হওয়া ভাবি ‘ এই কথাটাও আহি নিশ্চিত শুনেছে । বলেছিল তো মজা করে ,আহি আবার কি ভাববে কে জানে! মেহেদীর ভাবনার মাঝে আহি ফের বললো,
” শোনা যায় না ,ভাইয়া ? ”
মেহেদী যেন সুযোগ পেলো।সে আস্তে করে মোবাইলের ওয়াইফাই বন্ধ করে রাখলো। এসব থ্রে’টের কথা বলতেও তো লজ্জা লাগে।

মাত্র অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়েছে তূর্য।বেরিয়েই দেখলো , মোবাইল ফোন একাধারে ভাইব্রেট হচ্ছে। স্ক্রিনে নাম জ্বলজ্বল করছে ‘ লিটল মাউস ‘ সাথে আহির আলখাল্লা একটা ছবি। এই নাম গত কালকের দেওয়া । কি সুন্দর করে কাল নিজেকে ইঁদুর বলে দাবি করলো।
এখন তার নাম চেইঞ্জ না করে উপায় আছে? সে কল কেটে ব্যাক করলো।লম্বা করে একটি সালাম দিলো,
” আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বরাকাতুহ্ ”
আহি সালামের উত্তর দিয়ে আস্তে করলে বললো,
” প্রতিদিন তো আমি আগে সালাম দেই”
ভ্রু যুগলকে আড়াআড়ি ভাবে ভাঁজ করলো তূর্য।সন্দিহান গলায় বলল,

” প্রতিদিন কল দিস আমাকে?”
” যেদিনই দেই !”
” সবাইকে সস্তা ভাবি,রেসপেক্ট দেই না। তাই ভাবলাম একটা সালাম দেওয়াই যাক ” বলে গলার সুর পরিবর্তন করলো তূর্য।বরাবরের মতো গম্ভীর গলায় বলল,
” কল দিয়েছিস কেনো? কি দরকার? ”
” এইতো এখন তূর্য ভাই,তূর্য ভাই লাগছে ” বলে ফোনের ওপাশে শব্দ না করে মিষ্টি করে হাসলো আহি।
তূর্য বললো,
” ইম্পর্ট্যান্ট কিছু বলার থাকলে বল।বিজি আছি ”

তূর্য ভাই কিভাবে রূপ বদলাতে পারেন ভাবা যায়? একটু আগে কি সুন্দর করে কথা বললেন।আর এখন দেখো । তবে এটা কোনো ব্যাপার না।সে তূর্যের এমন ব্যবহারেই অভ্যস্ত।একটি ভালো করে কথা বললেই তার কেমন যেন লাগে। আর প্রেমিকসুলভ আচরণ করলে তো মি’রগি ব্যারাম শুরু হয়ে যায়।আহি ভাবনার ইতি টেনে বললো,
” বাড়িতে কখন ফিরবেন ?”
” রাত হবে।আম্মুকে বলিস আমার জন্যে ওয়েট না করতে ”
” আপনার হাসপাতাল কয়টা পর্যন্ত খোলা থাকে তূর্য ভাই?”
” এখন থেকেই ইন’ভিস্টিকেশন শুরু করে দিয়েছিস? ”
” থাক বলা লাগবে না ”
” হসপিটাল থেকে তাসিনদের সাথে মিট করতে যাবো।অনেক লেইট হবে । আম্মু যেন ওয়েট না করে। গট ইট?”
” আচ্ছা ,আমি বড় মাকে বলবো ওয়েট না করতে।”
“ওকেই,রাখছি! ”

মুখের উপর হুট করে কল কাটা লোকটাও এখন বলে – কয়ে কল কাটে।ভালোবাসলে মানুষের কতটা পরিবর্তন হয়। যদিও তূর্য আগে থেকেই ভালোবাসতো।কিন্তু,এখন থেকে আস্তে আস্তে নিজের ভিতরটা তুলে ধরছে এই যা।
” আচ্ছা ” বলে আহি কান থেকে মোবাইল নামানোর আগেই আবার ওপাশের ব্যক্তির তাড়াহুড়ো কন্ঠস্বর ভেসে আসলো,
” শোন…”
” হু? ”
“বড় মার ছেলের লিটল মাউসও যেন না করে”
” আপনার লিটল মাউসটা আবার কে?”কৌতূহলী গলায় বলল আহি ।
” কাল যে কম্বলের নিচে শুয়ে শুয়ে জপছিল ,এখন আবার ভুলেও গেল?”
তূর্য তাকে লিটল মাউস বলেছে বুঝে লজ্জা পেল আহি। এই প্রথম প্রকাশ্যে তূর্য ভাই তাকে আহি ব্যতীত অন্য নামে সম্বোধন করলো। এর আগে একবার হা’র্ট – স্টিলার বলেছিল ,তবে জ্বরের ঘোরে। আর সেও স্পষ্ট শুনতে পেয়েছিল না। যার দরুন পরে তূর্য অস্বীকার গেলে সেও মেনে নিয়েছিল। আহি যখন নানান ভাবনার বিভোর তূর্য রাশভারী কন্ঠে ফের বলল,

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৮

” এগারোটার পর যেন অনলাইনে না দেখি ”
তারপর কল কাটলো।আহি মোবাইল বুকে জড়িয়ে ধপাস করে বিছানায় পড়লো। তারপর নিজেকে আর তূর্যকে নিয়ে নানান কল্পনা – জল্পনায় বুদ হলো।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪০