Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪২

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪২

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪২
ইনান হাওলাদার

দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে আরো কয়েকটা দিন।গতকাল পিংকি – নাবিলের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান ছিল।চৌধুরী বাড়ির সবার সেখানে দাওয়াত ছিল।কিন্তু তূর্য বাড়িতে সেটা জানায়নি।শুধু বিয়ের অনুষ্ঠানের দাওয়াতের কথা বলেছে।ভেবেছিল গায়ে হলুদে শুধু আহিকে নিয়ে যাবে।কিন্তু আহি যায়নি। এই কয়দিন আহি খুব অদ্ভুদ বিহেভ করেছে।এই আহিকে তূর্য কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না। না ওর রুমে আসছে আর না উৎসাহ নিয়ে ওর কোনো কাজ করছে। এদিকে রে’গে আছে কিনা সেটাও বুঝতে দিচ্ছে না। তূর্য কোনো কথা বললে ,কোনো কাজে ডাকলে স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলছে ,কাজ করছে। তার আহি তো এমন নয়! মেয়েটা কখনোই নিজের মধ্যের রা’গ -ক্ষো’ভ লুকিয়ে রাখতে পারে না। কাজে কর্মে সেটা প্রকাশ করেই ফেলে ।আর সেদিনের ওই ব্যাপারটা নিয়ে তো কথাও হয়েছে।সে তো বলেছিল মাথা গরম ছিল তাই মিসবিহেভ করে ফেলেছিল।তখন তো দেখে মনে হয়নি সে রে’গে ছিল। গতকাল গায়ে হলুদে যায়নি বলেই খটকা লাগছে।নাহলে তো আজও সে বুঝতে পারতো না। এদিকে নাকি বিয়েতেও যাবে না বলে গো ধরে বসে আছে। বাড়ির সবাই যাবে ,সে একা যাবে না।

রুমের এমাথা থেকে ওমাথা পায়চারি করছে আর এসব ভাবনা করছে তূর্য। ড্রয়িং রুমে চেঁ’চামেচিও হচ্ছে এই বিষয়টা নিয়ে।মারুফা বেগম একাধারে ব’কে যাচ্ছেন মেয়েকে। তূর্যের কানে সবটাই আসছে। কিন্তু সে রুম থেকে বের হচ্ছে না। ব’কুক ওকে, ও ব’কা খাওয়ারই যোগ্য। দাঁত চেপে ডিভানে বসে পড়লো সে। বসতে না বসতেই অজ্ঞাত নম্বর থেকে কল আসলো। পার্সোনাল সিমকার্ডে আননোন নম্বর দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললো তূর্য। কল রিসিভ করতেই ওপাশের ব্যক্তির কথা শুনে তূর্যের গ’ম্ভীর মুখ আস্তে আস্তে কঠোর হতে আরম্ভ হলো। প্রায় মিনিট পাঁচেক ধরে একটানা অজ্ঞাত ব্যক্তির কথাগুলো শুনলো সে।তারপর কল কা’টলো ।কল কা’টার পরপরই মোবাইলে টুংটাং করে শব্দ হলো। কথাগুলো শোনার সময় তাকে যতটা না অস্বাভাবিক লাগছিল এখন তার চেয়ে বেশি লাগছে। ইতোমধ্যে চোখ লাল হয়ে উঠেছে। মাথার রগগুলো রা’গে দপদপ করছে। সে নিজেকে যথেষ্ট শান্ত করে নিচে গেল।ভিতরের ক্ষো’ভ বাইরে আনলো না। নিচে নেমে দেখলো আহি ব্যতীত সবাই রেইডি। সে বলল,

” আম্মু ,তোমরা চলে যাও।আব্বু – চাচ্চুরা তো অফিস থেকে যাবে।ওকে নিয়ে আমি আসছি ”
” যাবো না ,আমি ” সাথে সাথে উত্তর করলো আহি।তূর্য মা-কে তাড়া দিয়ে ফের বললো,
” তোমরা যাও, আম্মু । অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে ”
” আমি কিন্তু যাবো না,বড় মা ” গো ধরে পড়ে রইলো আহি।
” তোর ডিসিশন কেউ জানতে চায়নি ” আহির দিকে না তাঁকিয়ে কঠোর গলায় বলল তূর্য।তারপর মাকে আবার তাড়া দিলো। সবাই যেহেতু রেইডিই ছিল, আধ ঘন্টার মধ্যে বেরিয়ে পড়লো। মারুফা বেগম যাওয়ার সময়ও মেয়েকে ব’কতে ব’কতে গেলেন।আশ্চর্যের বিষয় এত ব’কা সত্ত্বেও আহি একটুও কান্না করছে না। সবাই বেরিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তূর্য – আহি ড্রয়িং রুমেই দাঁড়িয়ে ছিল।কোনো রকমে গাড়ির শব্দ পেতেই তূর্য আহির হাতের কব্জি ধরে টানতে টানতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো।আর আহি সমানে চেঁ’চিয়ে যাচ্ছে,

” হাত ছাড়ুন আমার।যাব না আমি। যাব না বলেছি মানে, যাব না।হাত ছাড়ুন তূর্য ভাই ”
কোনো কিছুতেই কাজ হলো না। তূর্য ওকে টানতে টানতে নিজের রুমে নিয়ে বিছানায় ছুঁড়ে ফেললো। তারপর দরজা লক করে ও ডিভানে গিয়ে বসলো। আহি বিছানা থেকে উঠে দরজার দিকে যাওয়া ধরতেই তূর্য কঠিন কন্ঠে বলল,
” এক পা বাড়ালে তোর কি হাল হবে নিজেও বুঝতে পারছিস না ”
” কি করবেন আপনি? মে’রে ফেলবেন?” চেঁ’চিয়ে উঠলো আহি।
তূর্য স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

” মে’রে ফেললেও ঠিক হবি না তুই। এখন যা যা কোশ্চেন করি গুড গার্লের মতো সেগুলোর অ্যানসার করবি ”
” আমি না কারো সাথে বিয়েতে যাবো । আর না কারো প্রশ্নের উত্তর দিবো ”
” বিয়েতে তো তুই যাবিই।আর,অ্যানসার তোর বা’প এসে করবে ”
” বিয়েতে যাবো না,যাবো না, যাবো না!উত্তর করবো না,করবো না,করবো না ”
আহির কথার তোয়াক্কা করলো না তূর্য।সে শীতল কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো,
” হলুদে যাসনি কেনো ? ”
কোনো উত্তর আসলো না। তূর্য পুনরায় প্রশ্ন করলো,
” গতকাল বিকালে কোথায় গিয়েছিলি? কার সাথে গিয়েছিলি ? ”
এতক্ষণে আহির ভিতর জেদ কাজ করলেও এখন ভ’য়ও ঢুকলো। সে ভিতরের ভ’য় প্রকাশ না করে শ’ক্ত কন্ঠে বললো,

” যেখানে খুশি গিয়েছিলাম। সব কৈফিয়ত কেনো আপনাকে দিতে হবে? ”
সেকেন্ডের ব্যবধানে উঠে দাঁড়ালো তূর্য। আহির গাল চেপে ধরে ঠেলে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সাথে চেপে ধরলো।হুং’কার দিয়ে উঠলো,
” এই জা’নোয়ার,তোকে কতবার বলেছি ওই বা’স্টার্ডের সাথে দেখা না করতে? কতবার বলেছি বল? কেন আমার কথা শুনিনি? কি চাইছিস তুই? ”
” গাল ছাড়ুন তূর্য ভাই ” কোনো রকমে গোঙাতে গোঙাতে কথাটা বললো আহি।
তূর্য নিজ অবস্থানে থেকে ফের ঝং’কার তুলে বলল,
” ভালো লাগে মেহেদীকে? বিয়ে করবি ওকে? তোর বাপকে দিয়ে প্রস্তাব পাঠাবো ?”
” হ্যাঁ,ভালো লাগে । বিয়ে করবো ওনাকে । কি করবেন আপনি? ”
” দূর্বলতা পেয়ে গেছিস,নাহ? কি করব বুঝতে পারছিস না?”
” কিই বা করবেন ! আপনার তো ভালো হলো । শবনমকে বিয়ে করে নিয়েন।”
আহির কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না তূর্য।বা’করুদ্ধ হয়ে গিয়েছে সে । ওকে আরো সুযোগ দিলো,কতদূর যেতে পারে দেখবে আজ। আহি পুনরায় বলতে শুরু করল,

” আমি আপনাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললে অনেক প্রবলেম হয়ে যায়,শবনম ডাকলে কিচ্ছু হয় না। আমি দরজা নক করতে করতে ম’রে গেলেও একটা বার দরজা খুলতে মন চায় না।এদিকে শবনম একবার নক করতে না করতে দরজা খুলে দেন। তাকে শপিংয়ে নিয়ে যাওয়া হবে কিনা তার আগেই মনে করিয়ে দেন।অথচ,আমি জামা তো দূরে থাক একটা কানের দুল চাইলেও সেটা কিনে দিতে পারেন না।ওর কোথায় কি রোগ আছে সবটা জানা আপনার।একটু অসুস্থ হলেই বারবার খবর নেন,আমি অসুস্থ হয়ে ম’রে পড়ে থাকলেও খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে হয় না। ”
কথা গুলো বলে নিঃশ্বাস ফেলার আগেই একটা শ’ক্ত হাতের চ’ড় আঁচড়ে পড়লো তার মুখে।আহি তাল সামলাতে না পেরে ফ্লোরে উপুড় হয়ে পড়ে গেল। ইতোমধ্যে ঠোঁ’ট কেঁ’টে র’ক্ত বের হয়ে গিয়েছে। আহি তবুও স্বাভাবিক। চোখে জল ,তবুও মুখে হাসি। তূর্যের ইচ্ছে করছিল আরো কয়েকটা মা’রতে ।কিন্তু নিজেকে সামলে নিলো। আহির হাত ধরে টেনে তুলল। বললো,
” তোকে কোনো এক্সপ্লেশন আমি দিবো না। তুই এক্সপ্লেশন পাওয়ার যোগ্য নোস আহি। ফাইভ মিনিটস এর মধ্যে রেইডি হবি।আদারওয়াইজ এভাবে যাবি। যেতে তোকে হবেই ! ”
” কোনোদিন দিয়েছেন এক্সপ্লেশন ?যে আজ দিবেন! আদেও কোনো এক্সপ্লেশন আছে তো আপনার কাছে ? ”

সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার যে মেহেদী রাত – দিন কুম্ভকর্ণ হয়ে কাটায় সে না পেরেছে কালকের রাতটা ভালো করে ঘুমোতে আর না আজকের দিনটা পারবে বলে মনে হচ্ছে । টানা দুই ঘন্টা ডাইনিং রুমে পায়চারি করে করে বাসা ত্যাগ করেছে।
মেহেদী চলে গিয়েছে বুঝতে পেরে তারিন দরজা খুলছে। তারপর কিচেনে ঢুকেছে। সব কিছু খুঁজে খুঁজে রান্না করেছে।তারপর গোসল সেরে ডাইনিংয়ে খাবার সাজিয়ে নিয়ে বসলো। খাওয়া যখন মাঝপথে ঠিক তখন কলিং বেলের শব্দ হলো।তারিন ধীরে সুস্থে খাওয়া – দাওয়া করে দরজা খুললো। মেহেদীর ফর্সা মুখ রা’গে লাল হয়ে আছে।কিন্তু সম্পূর্ণ রা’গ সে প্রকাশ করলো না । কিছুটা ঝাঁ’ঝালো গলায় বললো,

” কখন থেকে নক করছি তারিনা।কোথায় ছিলে ? ” উত্তর করলো না তারিন।কোনরকম দায় সারা ভাবে দরজাটা খুলে আবার ভিতরে চলে আসলো।এসে ডাইনিংয়ের খাবার গোছাতে লাগলো। মেহেদী ভেবেছিল মেয়েটা বোধ হয় রান্না – বান্না কিছুই করবে না।কিন্তু ,ডাইনিংয়ে খাবার দেখে তার সম্পূর্ণ রা’গ পানি হয়ে গেল। সে পোশাক পাল্টে হাত মুখ ধুয়ে ডাইনিংয়ে বসলো।ততক্ষণে তারিন ফের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়েছে।মেহেদী জানে এই মেয়েকে ডাকলে সে আসবে না।তাছাড়া এতদিন তো নিজের খাবার নিজেই নিয়ে খেয়েছে আজও নাহয় নিয়েই খাবে। শুধু শুধু ডেকে ঝগ’ড়া করা। তবে সে সারা কিচেন উল্টে পাল্টে খুঁজেও কোনো খাবার পেল না।ফ্রিজে শুধু একটা ভাজি রাখা। সে কয়েক বার তারিনকে ডাকলো।কোনো সাড়া পেল না।তারপর রুমে গিয়ে বলল,

” খাবার কোথায় রেখেছ?”
” কি খাবার?” ভাবলেশহীন প্রশ্ন তারিনের।
” কি খাবার মানে? দুপুরে যা রান্না করেছ”
” শেষ !”
” কি শেষ ?”
” খাবার !”
” মানে কি ? খাবার শেষ মুখের কথা ? ”
” আমি শুধু আমার খাবার রান্না করেছিলাম।সেটা শেষ ”
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো মেহেদী।অ’গ্নি দৃষ্টিতে তারিনের দিকে তাঁকিয়ে রইলো। তারিনের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।সে মোবাইল স্ক্রল করে যাচ্ছে। মেহেদী ওর হাত থেকে ছোঁ মে’রে মোবাইলটা নিজের আয়ত্বে নিলো।তারপর শান্ত কন্ঠে বলল,

” তোমার মনে হচ্ছে না একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করছ?”
” আর আপনি?এতদিন আপনার মনে হয়নি ?”
” যেটা হওয়ার হয়ে গিয়েছে,সেটা এখন অতীত। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবো ”
” ভাবা আছে! আপনি আপনার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবুন ”
” তুমি মেয়েটা আস্ত এক বে’য়াদব। ”
” আপনার থেকে বেশি নই ”
আর ত’র্ক করলো না মেহেদী। এই মেয়ের মুখের সাথে কিছুতেই পেরে উঠবে না সে। ঝগ’ড়াতে পিএইচডি করেছে। আর এদিকে তার পেটে ক্ষুধা।মেজাজ এমনিতেই হাই টে’ম্পারেচারে আছে। এই মুহূর্তে ত’র্কাতর্কির কোনো মুড নেই।আছে শুধু ফা’ইটিংয়ের । আর মেয়ে মানুষ মে’রে হাত গন্ধ করে নারী নির্যাতনের মামলা কে খাবে!

আহির জিদের কাছে বরাবরই ব্যর্থ তূর্য। আজও ব্যর্থ হয়েছে। সে বিয়েতে নিতে পারেনি আহিকে। মে’জাজ হারিয়ে আরো দুইবার চ’ড় লাগিয়েছে। নাবিল,পিংকি,আলিয়া ,তাসিন নাহলেও হাজারবার কল করেছে ।বারবার ম্যাসেজ দিয়েছে। ও জাস্ট একটা রিপ্লাই দিয়েছে আসছে না।ব্যস,তারপর মোবাইল বন্ধ করে রেখে দিয়েছে। তাদের বাড়ির লোকও তাদের বারবার করে কল করেছে নাকি,এসব কিছু জানে না তূর্য।
ছাদের রেলিং ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে সে। আকাশ না,কুয়াশা! কুয়াশায় ভরে আছে পুরো আকাশ। আজ ঠান্ডাটাও প্রতিদিনের তুলনায় খুব বেশি। অথচ,তূর্যের শরীরে শুধু একটা হাফ হাতা টিশার্ট। অদ্ভুত ভাবে তার ঠান্ডা লাগছে না। আনমনা হয়ে বলে উঠলো তূর্য,

” আমি সারাটা জীবন ধরে ভেবে এসেছি তুই কবে আমাকে বুঝবি।কবে আমার সুপ্ত অনুভূতিগুলো বুঝে নিবি।এখন বুঝলি ঠিকই …” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে।তারপর পুনরায় বলল,
“নিজে থেকেই বা কই বুঝলি ! চোখে আঙুল দিয়ে বোঝাতে হলো।না বোঝাই ভালো ছিল! যখন বুঝতি না তখনই ভালো ছিলাম আমি। এত কাহিনী অন্তত করতে হতো না। মান – অভিমান পর্যন্ত ঠিক ছিল ।কিন্তু …কিন্তু তুই আমার ভালোবাসায় আঙুল তুললি আহি? কেনো? আর বোঝাবো না তোকে। আআআহ…! ” চিৎকার করে উঠে রেলিংয়ে সজোরে ঘু’ষি বসালো সে। হাত আগে থেকেই ক্ষত বিক্ষত ছিল । এখন সেখানে আবার আঘাত পেয়ে র’ক্ত গড়াতে আরম্ভ করলো। অথচ তূর্যের কোনো বোধ নেই। তার কি ব্যথা লাগছে না? অবশ্যই লাগছে,কিন্তু হৃদয়ের ব্য’থার চেয়ে বেশি নয়।
তূর্যকে রুমে খুঁজে না পেয়ে ছাদে আসলেন পারভিন বেগম।ছেলেকে সারা বিয়ে বাড়িতে দেখতে না পেয়েই তিনি বুঝেছিলেন কিছু একটা হয়েছে।আর এখন ছেলেকে আনমনা হয়ে ছাদে দাঁড়িয়ে দেখে সেটা সিউওর হলেন। তিনি এগিয়ে গিয়ে বললেন,

” এভাবে ঠান্ডার মধ্যে গায়ে কিছু না দিয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন আব্বা?”
সম্মতি ফিরলো তূর্যের ।পিছন ঘুরে অন্যমনস্কতায় বলল,
” হুমম? কি বললে ? ”
” শীত লাগছে না তোর ?”
” হ্যাঁ,লাগছে একটু ! কিছু বলবে ?”
” খেতে আয় । দুপুরেও তো কিছু খাসনি মনে হয় ”
” ক্ষুধা নেই আমার। তোমরা খেয়ে নেও ”
” আহিকে মে’রেছিস তুই? ”
” হ্যাঁ,কেন?”

” দুই গালে দাগ বসে আছে। তোর বেশি হাত চলে তূর্য। স্বভাব পরিবর্তন কর। মেজো নাহয় কিছু বলছে না ।কিন্তু ,ও তো বুঝেছে এটা কিসের দাগ। এভাবে সেয়ানা মেয়ের গায়ে হাত হাত তোলা তোর ঠিক হয়নি ”
” আমি ঠিক – ভুল বিবেচনা করে কিছু করিনি । ওর প্রাপ্য ছিল। ওকে জাস্ট মে’রে ফেলতে পারলে শান্তি লাগতো। ” শেষ কথাটা চিবিয়ে চিবিয়ে বলল তূর্য। পারভিন বেগম টিপ্পনী কেঁটে বললেন,
” ও তাই? মে’রে ফেলে শান্তি পেতি? তাহলে দুইটা চ’ড় মে’রেই ছাদে এসে দাঁড়িয়ে আছিস কেন আব্বা?”
এসব শুনতে ভালো লাগছে না তূর্যের।সে বলল,
” আমি খাবো না ,আম্মু।তুমি যাও”
পারভিন বেগম জানেন ছেলের সাথে পারবেন না । তিনি আরো কিছুক্ষণ ধরে নানান কথা বললেন। তূর্য শুধু চুপচাপ শুনে গেল।তারপর একটা দী’র্ঘশ্বাস ফেলে তিনি নেমে গেলেন ছাদ থেকে। তূর্য কখন নামলো জানা নেই।

রাত প্রায় সাড়ে দশটা পর্যন্ত খাবার সামনে নিয়ে বসে থেকে থেকে আর না পেরে শেষে খেয়ে নিয়েছে তারিন।আর মেহেদী ফিরলো এগারোটার পরে। এসেই শার্ট খুলে বিছানায় পাটপাট হয়েছে। সে আসার বেশ কিছুক্ষন বাদে তারিন রুমে আসলো।সে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল।মেহেদী এমন ভাবে শুয়ে আছে যেন এই শোয়াতেই রাত শেষ।আর ফজরের পরে উঠবে।তারিন ছোট্ট করে বলল,
” খাবেন না ? ”
” রান্না করেছ আমার জন্যে ? ”
” হুম ” দপ করে চোখ খুললো মেহেদী।
আশ্চর্য গলায় বলল,
” সূর্য এখন কোন দিক দিয়ে উঠেছে ? ”
” এখন রাত! সূর্য ওঠার কোনো চান্স নেই ”
মেহেদী আবার আরাম করে শুতে শুতে বলল,
” খেয়ে এসেছি আমি। দুপুরে একবার না খেয়ে কাটিয়েছি।এখন আবার রি’স্ক নিতে চাইনি ”
তারিন আর কথা না বলে ড্রয়িং রুমে চলে গেল। ডাইনিংয়ে ঢেকে রাখা খাবার গুলো তুলে রাখলো।শীতকাল হওয়ায় নষ্ট হওয়ার কোনো ভয় নেই।তাই খাবার গুলো আর ফ্রিজে রাখলো না।তারপর টুকি টাকি আরো কিছু কাজ সেরে বেড রুমে গেল। ভেবেছিল ভিতরে গিয়ে দেখবে মেহেদী ঘুমিয়ে গিয়েছে । কিন্তু সেটা হলো না। খাটের হেড বোর্ডে পিঠ ঠেকিয়ে মোবাইল স্ক্রল করছিল।তারিন আসতেই আবার শুয়ে পড়লো।তারিন একটু ইঃতস্তত করতে করতে বলল,

” আপনি প্যান্ট পরেই ঘুমাবেন?”
” তাহলে খুলে ঘুমাবো ?” সাথে সাথে উত্তর করলো মেহেদী।
” আশ্চর্য,এটা কখন বললাম ! আপনার ট্রাউজার নেই? আর, খালি গায়ে ঘুমাবেন? কিছু পরবেন না?”
” খালি গায়ে না শুলে আমার ঘুম আসে না । আর , ট্রাউজার সব নোং’রা হয়ে আছে।পরিষ্কার করতে হবে ,তারপর! বাই দ্যা ওয়ে,তখন কার সাথে কথা বলছিলে?”
” আপনাকে কেন বলবো? ”
মেহেদী কেমন করে যেন মুখ বি’কৃত করলো। অর্থাৎ ,না বললে না বলুক । তার কিছু আসে – যায় না।
তারিন আবার পরমুহুর্তে ছোট করে বললো,

” আহি, আহির সাথে কথা বলেছিলাম। বাড়ি থেকেও কল করেছিল।” তারিন মেহেদীর বি’কৃত মুখ দেখতে হয়তো কথাটা বলতো না।
আহির সাথে কথা বলেছে শুনে কম্বলের নিচ থেকে লাফ দিয়ে বের হলো মেহেদী। কিছু একটা বলবে তার আগেই তারিন বললো,
” কি হলো ? কথা বলতে পারেননি বলে আ’ফসোস হচ্ছে ? আবার কল দিবো ?”
মেহেদী বি’রক্তি নিয়ে বলল,
” সবসময় এক লাইন বেশি বুঝো কেন? কাল না পরশু যেন দেখা করিয়ে নিয়ে আসলাম ? তাছাড়া, কথা বলতে না পেরে একটু তো আ’ফসোস হচ্ছেই ” শেষ কথাটা গা ছাড়া ভঙ্গিতে বললো সে।
” সেটা তো আমি বুঝেছিই! ” তারপর একটু মন খারাপ করে তারিন বললো,

” আহির মনে হয় মন খারাপ, জানেন! কিভাবে যেন কথা বলছিল। মনে হয় তূর্য ভাইয়ার সাথে কিছু হয়েছে ”
” এদিকে এসে বসো, তারিনা।তোমাকে একটা সিক্রেট বলি । ” খাটের একপাশে দেখিয়ে বলল মেহেদী। তারিন দূরত্ব বজায় রেখে বসলো। উৎসুক দৃষ্টিতে মেহেদীর দিকে তাকিয়ে রইলো। মেহেদী একটু সময় নিয়ে বললো,
” তুমি তো জানো আহিকে আমার ভালো লাগতো।এখনো লাগে!গতকাল যখন আমরা ওর সাথে কথা বলছিলাম তখন দেখেছিলে ?ও তূর্য ভাইয়ার প্রতি বারবার অ’ভিযোগ দিচ্ছিলো ভাইয়া ওকে ভালোবাসি বলেন না,আবার জে’লাস ফিল করে সেটা স্বীকার করে না।ওর কথার ভাবে মনে হলো আমার সাথে দেখা করলেও ওকে ব’কে । আর তুমি জানো? তূর্য ভাইয়া আমাকে কয়েকবার হু’মকিও দিয়েছে।আমি প্রথমে ভাবতাম বড় ভাই হিসেবে দেয় তারপর….। আচ্ছা ওসব থাক। এখন কাহিনী হলো আমি দুপুরে ওনাকে একটা নাম্বার দিয়ে কল করেছিলাম নানান কথা বলেছি।আর রেস্টুরেন্টে আমরা যেসব পিকচারগুলো নিয়েছিলাম সেগুলো থেকে তোমাকে সরিয়ে সেসব ভাইয়াকে পাঠিয়েছি। আমি…. ”
সে বাকি কথা শেষ করার আগেই তারিন ক্ষো’ভ নিয়ে বলল,

” আপনি তো অনেক বড় রা’জাকার! ওইসব পিক দিয়েছেন কেন? আপনি চেনেন না তূর্য ভাইয়াকে। আপনি আস্ত একটা অসহ্য ! ”
” আরে সহ্য ,আমার কথা শুনো।আমি ভেবেছিলাম ভাইয়া রা’গে আহিকে মনের কথা জানিয়ে দিবে। এখন কি হয়েছে আল্লাহ জানেন ”
” আমি সিউওর এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি হয়েছে। আপনি অনেকগুলো বা’ল ”
মেহেদী বিস্ময় নিয়ে বলল,
” তুমি গালি দেও, তারিন ? ”
তারিন কথার তালে তালে মেহেদীর সামনে কথাটা বলে ফেলেছে। এতক্ষণ ধরে আহির সাথে কথা বলছিল তো ,সেই রেশ রয়ে গিয়েছে।তাছাড়া বা’ল কি গালির মধ্যে পরে নাকি? এটা তো ভাত – মাছ। সে প্রসঙ্গ পাল্টাতে বললো,

” আপনি আমাকে তারিনা থেকে তারিন বললেন ?”
” বললাম ! তারিনা কেমন মুরুব্বী মুরুব্বী লাগে।তারিনই ঠিক আছে ”
” মেহেদীও কেমন নাম যেন, শুনতে ,দেখতে,বলতে কেমন যেন।” দাঁত কি’ড়মিড় করে তারিন কথাটা বলেই আবার সুন্দর করে হেসে মাথা কাত করে বলল,
“আপনাকে আমি কিউট করে মোদি বলে ডাকি? ”
” হ্যাঁ,ডাকো !” তারিনের মতো ভঙ্গি করে বলল মেহেদী।সাথে সাথে তারিন ডেকে উঠলো,
” মোদিইইইই ”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪১

” ফা’জিল মেয়ে কোথাকার ” বিড়বিড় করে কথাটা বলে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো মেহেদী। আর তারিন খিলখিল করে হেসে দিলো। মেহেদীও কম্বলের নিচ দিয়ে মুচকি হাসছে। ম’ন্দ নয় মেয়েটা। এভাবে যদি কথা বার্তা বলে আর তিন বেলা একটু রান্না করে খাওয়া তাহলে গোটা একটা জীবন পার করাই যায়।মাঝে মাঝে একটু ঝ’গড়া করলে করুক ,সমস্যা নেই।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৩