Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৭

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৭

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৭
ইনান হাওলাদার

শান্ত প্রান্ত আর তাহি দোতলার করিডোর দিয়ে পায়চারি করছে। তাদের মাথায়ও টে’নশন।হাসি খুশি চৌধুরী পরিবারটা আজ দুপুর থেকে কেমন দম মে’রে বসে আছে।কেউ কারো সাথে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলছে না। যে যার মতো কাজ করে যাচ্ছে।
আর আহি ,সে তো সেই তখন রুমে ঢুকেছে তো আর বের হচ্ছে না। এতক্ষণ ধরে দরজাও ভিতর থেকে লক করে রেখেছিল, কিছুতেই খুলছিলো না।কিছুক্ষণ আগে আকবর চৌধুরী এসে ডাকার পর খুলেছে।তারপর মারুফা বেগম ক’ড়া গলায় বলে গেছেন আর লক না করতে। মানুষের ক’ষ্ট আর রা’গের মাথায়ই শ’য়তান বেশি সুযোগ পায়। শ’য়তান কখন কোন প্র’রোচনায় ফেলে দেয় বলা মুশকিল।

এইযে শান্ত প্রান্ত সারাক্ষণ আহির বিরুদ্ধে ছক ক’ষে বেড়ালেও এখন তাদের খুব খারাপ লাগছে আহিপুর জন্যে। তারাও চাইছে তূর্য ভাইয়া আর আহিপুর বিয়ে হোক।তারা খুব আনন্দ-মজা করবে। তারপর আহিপুকে ভাবিপু বলে ডাকবে আর তূর্য ভাইয়াকে জিজুভাইয়া বলে ডাকবে।কত মজা হবে।তাহলে বাড়ির সবাই… না ! শুধু মেজো বাবা কেন এমন করছে? আর বড় বাবা তো কিছুই বলছেন না।চুপচাপ শুধু সকলের কথা শুনছেন।উনি ধ’মকে কিছু বললে তো সবাই মানতে বাধ্য । নাকি বড় বাবাও চান না আহিপু আর তূর্য ভাইয়ার বিয়ে হোক।যেখানে সবসময় বাড়ির সকলে ওনার কথা চুপ করে শুনে ,আর আজ উনি সবার কথা শুনছেন।
আকবর চৌধুরী,আসলাম চৌধুরী আর আসিফ চৌধুরী — তিন ভাই চিন্তিত মস্তিষ্কে বসে আছেন ড্রয়িং রুমের সোফায়। আর তাদের সহধর্মিনীরা তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। ছোটদের ড্রয়িং রুমে আসতে নিষেধ করেছেন।আকবর চৌধুরী বাড়ি ফিরলে তাকে সবটা খুলে বলেন পারভিন বেগম।সবার সব কথা শুনে আকবর চৌধুরী শান্ত কন্ঠে বললেন,

” আহি বাচ্চা মানুষ, কিছুদিন গেলে মাথা থেকে এসব ভুত নেমে যাবে।আর ,তূর্য বুঝদার ! বুঝিয়ে বললে বুঝবে । এসব নিয়ে আর কথা বাড়াবাড়ি করিস না তোরা। এতে বাড়ির বাকি ছোট বাচ্চাদের উপর প্রভাব পড়বে ”
” তূর্য-ই বেশি অবুঝের মতো আচরণ করছে, ভাইজান। দুপুরে কি করেছে তুমি জানো না।অতিরিক্ত বেপ’রোয়া আচরণ করেছে ” আসলাম চৌধুরীর কথার বিপরীতে পারভিন বেগম গম্ভীর গলায় বললেন,
” বাড়াবাড়ি তো তুমি করছো ভাই।যারা সংসার করবে তাদের সমস্যা না থাকলে তোমার সমস্যা কোথায়? ”
” ভাবি তুমি থামো। সেই দুপুর থেকে একই গান গেয়ে যাচ্ছ। আশা আর লায়েকের বিয়ের পর মানুষ কত ক’টূক্তি করেছিল তুমি ভুলে গেছো? লায়েক আসিফের বন্ধু ছিল ।আর ওদের মধ্যে কোনো প্রেমের সম্পর্কও ছিল না।তাতেই মানুষ স’মালোচনা করতে ছাড়েনি।আর এরা একই বাড়িতে থাকে। চাচাতো ভাই-বোন। মানুষজন আরো জঘন্য কথা বলবে না তার কি গ্যারেন্টি আছে?আপন আর চাচাতো’র মধ্যে তফাৎ কী ? ”
স্বামীর কথার বিপরীতে মারুফা বেগম মিনমিন করে বললেন,

” মানুষের কথায় কি যায় আসে? আমরা মানুষের কাছে খেতে যাই নাকি পরতে যাই! ”
” সমাজে বাস করতে হলে সমাজের মানুষের কথাও ভাবতে হয়।মানুষের কাছে খেতে-পরতে যাওয়া লাগে না।
মানুষের সাথে চলা-ফেরা আমাদের করতে হয়।আমাদের মানুষের সাথে ওঠা-বসা করতে হয়।তোমাদের না ! তাদের বি’শ্রী কথাবার্তা আমাদের কানে আসে।তোমরা তো থাকো পড়ে বাড়ির মধ্যে।আর বাড়ি থেকেই বা কি করেছ ! মেয়েকে খেয়ালে রাখতে পারনি? তোমাদের চোখের সামনেই সবটা ঘটেছে । কিছু বুঝতে পারনি তোমরা? নাকি সবটা বুঝে-শুনে ,দেখেও না দেখে চলেছ ? ” আসলাম চৌধুরীর গলা আস্তে আস্তে উঁচু হচ্ছে দেখে আকবর চৌধুরী ধ’মকে উঠলেন,

” আহ্, আসলাম !বাড়ির বউয়ের সাথে এসব কি ব্যবহার ? ”
” দেখো ,তাহলে ভাইজান। সামান্য এই ব্যবহার তুমি মানতে পারছো না। আর বিয়ের পর যদি তূর্য-আহি সবসময় এমন ব্যবহার করতে থাকে তখন তুমি কিভাবে মানবে? ”
” এখানে বিয়ে কোথা থেকে আসছে? এসব মাথা থেকে ঝাড় ! এবারে জোর করে হলেও তূর্যের বিয়ে দিবো আমি। তখন সবটা ঠিক হয়ে যাবে ”
বি’রোধিতা করলেন আসলাম চৌধুরী।বললেন,
” না,ভাইজান।ছেলে ক্যারিয়ার গড়ছে গড়ুক। আহি তো মেয়ে মানুষ আজ না হোক কাল বিয়ে দিতেই হবে। আর , চারিপাশ দিয়ে শুধু সম্বন্ধ এসেই যাচ্ছে।পরিবেশটা একটু স্বাভাবিক হোক ,ভালো ছেলে দেখে একটা ব্যবস্থা করা যাবে ”

” মেয়ে তোর ,তুই যা ভালো বুঝিস কর ”
বলে উঠে গেলেন আকবর চৌধুরী। তার পিছন পিছন পারভিন বেগমও চলে গেলেন। ভাইয়ের কথায় কষ্ট পেলেন আসলাম চৌধুরী। ‘ তোর মেয়ে ‘ যে বাড়িতে ‘ আমার – তোমার ‘ বলে কোনো বিভেদ ছিল না। সর্বোপরি ,যে নিজে এরকম মন-মানসিকতা কারো মধ্যে আসতে দেয়নি সে নিজেই আজ ‘ তোর – আমার ‘ বিভেদ করে ফেললো ? কেউ কখনো ভেবেছিল চৌধুরী বাড়িতে এমন দিনও দেখতে হবে । চোখ ছলছল করে উঠলো আসলাম চৌধুরীর। চোখে আঙুল চেপে চোখের জল আটকালেন।আসিফ চৌধুরী ভাইয়ের পাশে এসে বসলেন। কিছু বলার উদ্দেশ্যে নরম কন্ঠে ডাক দিলেন,
” মেজো ভাইজান …..”
শুনলেন না আসলাম চৌধুরী। চোখ মুছতে মুছতে বাড়ির বাইরে চলে গেলেন।

নির্জন ,নিরিবিলি রাস্তা।দিনভর মানুষজনের চলাফেরা চললেও সন্ধ্যার পর আস্তে আস্তে কমে আসে। এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে একটা চায়ের টং আছে। বাইক স্ট্যান্ড করিয়ে সেই রাস্তার এক পাশে পিজের উপর বসে আছে তূর্য।রাস্তার কিনারা ঘেঁষে একটা বিশাল পুকুর।এক হাতে সি’গারেট ফুঁকছে ।আর অন্য হাতে রাস্তার পাশ থেকে ছোট ছোট টুকরো ইট, ডাল – পালা যেটা হাতের নাগালে পাচ্ছে সেটা ধরে ধরে ছুঁড়ে মারছে সেই পুকুরে। একেকটা সিগারেট শেষ হলে সিগারেটের বাট গুলোও সেখানে ফেলছে। চৌধুরী বাড়ি থেকে এই জায়গাটার দূরত্ব প্রায় তিন ঘন্টার। সেই দুপুরে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে ধরে একাধারে ঠোঁটে সিগারেট গুজে রেখেছে।কোনো কালেই নিয়মিত ধূমপান করার অভ্যাস নেই তার। মাঝে মাঝে তাসিনের সাথে খাওয়া হয় ।আর কোনো কারণে অস্থিরতা বোধ করলে বা কোনো কারণে অতিরিক্ত রে’গে গেলে রা’গ নিয়ন্ত্রণের জন্য খায়।তবে কখনো আস্ত একটা সিগারেট শেষ করতে পারেনি।আর এখন তার চারিপাশ সিগারেটের প্যাকেটে ভরে আছে। যে কেউ দেখলে ভাববে নে’শাখোর,ব’খাটে ছেলে রাস্তায় বলে নে’শা করছে।হাতের সিগারেটে শেষ টান দিয়ে সেটাকে একবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে ছুঁড়ে মারল অদৃশ্যে। ভা’ঙা ভা’ঙা গলায় সুর তুলল,

প্রিয়ারে প্রিয়ারে প্রিয়া
কেন দিলি আমায় ভাঙ্গিয়া
প্রিয়ারে প্রিয়ারে প্রিয়া
মন আমার দিলি আমায় ভাঙ্গিয়া
দূর থেকে মাগরিবের আযান ভেসে আসছে দেখে থেমে গেল তূর্য।জীবনের প্রথম এতো বেসুরো,জঘন্য কন্ঠে গান গেল সে। গান শেষ করে আবার একটা সিগারেট ধরালো।
এরইমধ্যে সাঁই সাঁই করতে করতে একটা বাইক এসে হঠাৎ ব্রেক কষলো তূর্যের থেকে কিছুটা দূরে।দুইটা ছেলে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ওর পাশে এসে বসলো।খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে তাদের। ওদের দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে তল্লাশি চালাচ্ছে। তূর্যকে দেখে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো তারা। মনে মনে উপরওয়ালাকে ধন্যবাদ দিলো।দুই জনেই এক সাথে বলে উঠলো,

” ভাই ফোন বন্ধ করছিস কেন? কখন থেকে খুঁজছি ”
” খুঁজছিস কেন?” বেশ খানিকক্ষণ পার অন্যমনস্কতার সাথে বললো তূর্য।
” বাড়ির সবাই কত চিন্তা করতাসে তুই জানস? আন্টি…..”
নাবিলকে কথা শেষ করতে না দিয়ে তাসিন তার কথা যোগ করল,
” আন্টি তোকে কলে না পেয়ে কান্না কাটি শুরু করে দিয়েছে। কাল ভোর সাত টায় নাকি তোর অপারেশন আছে? এখন একটু রেস্ট নিবি না ? এত টেন্সড থাকলে ওটি কিভাবে করবি ভাই? ”
মুখ দিয়ে ধোঁয়া উড়াতে উড়াতে উত্তর দিলো তূর্য,
” প্রবলেম হবে না ”
” নিজের কি হাল করছোস ,তূর্য ? তোর কাকার জায়গা নিজেরে বসাইয়া দেখ। আর আহির জায়গা তুই থাকলে কি করতি? একটু সময় দে সবটা ঠিক হইয়া যাইবো । ”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৬

” আমি চাই না ঠিক হোক। বাই দ্যা ওয়ে,নে’শা করলে নাকি কোনো স্যাডনেস থাকে না ? কই? কিছুই তো হচ্ছে না ”
” সিগারেট খাইলে বা’ড়া হইবো তোমার ”
” তাহলে কি ? ড্রিংক করতে হবে ? চল ! ”
বলে আর এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে উঠে পড়লো তূর্য। হাতের সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে ফেলে দিলো। তাড়াহুড়ো করে দুই হাত ঝেড়ে গায়ের ময়লা পরিষ্কার করে নিলো।তারপর বাইক স্টার্ট দিলো। তাসিন নাবিলকে ব’কতে ব’কতে নিজেদের বাইকে উঠলো,
” শা’লা তোর বুদ্ধি হবে কবে ? এখন ওই লাগাম বিহীন ষাঁড়কে ড্রিংক করা থেকে কেউ আটকাতে পারবে না। ব্রেন পুটকিতে নিয়ে ঘোরোস ?”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৭ (২)