Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৯ (২)

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৯ (২)

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৯ (২)
ইনান হাওলাদার

রাত ঠিক বারোটা পেরিয়েছে। চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা। দূর হতে ঝিঁঝিঁ পোকার ক্ষীণ আওয়াজ ভেসে আসছে। আকাশে এক চিলতে রূপালী চাঁদ ঝুলে আছে। তূর্য উঠে গিয়ে দক্ষিণের জানালাটার উপর থেকে পর্দা সরিয়ে কাঁচ টেনে দিলো। সাথে সাথে চাঁদের ম্লান আলো ঘরের মেঝেতে এসে পড়লো — সাথে এক ঝাঁক বাতাস। দৃশ্যমান হলো প্রেয়সীর খুশিতে চকচকে আদলখানা। দেওয়ালের একপাশে ঝুলিয়ে রাখা গিটারখানা নামিয়ে আনলো তূর্য। সেই কলেজে থাকতে কিনেছিল তখন টুকটাক গান গাওয়া হলেও ডাক্তারি পড়তে গিয়ে আর সেসব হয়ে ওঠেনি। এমনকি একটা গান ঠিকঠাক মুখস্থও নেই তার। ও গিটার হাতে নিয়ে জানালার কাছে এগিয়ে গেল। চাঁদের দিকে দৃষ্টি মেলে গিটারে আওয়াজ তুললো। গলায় সুর তুলতে তুলতে এগিয়ে এলো প্রেয়সীর সামনে — যে মুগ্ধ নয়নে স্বামীর দিকে চেয়ে আছে।দুজনের চোখাচোখি হলো।প্রেয়সীর চোখে চোখ রেখেই গানের লাইনগুলো আউড়ালো সে —

খোলাখুলি বলতে গেলে পড়ে গেছি তোর কবলে
তলিয়েছে মন ভীষণ রকম অথৈ জলে
খোলাখুলি বলতে গেলে পড়ে গেছি তোর কবলে
তলিয়েছে মন ভীষণ রকম অথৈ জলে
সাঁতার কেটেছি, ঘুমিয়ে হেঁটেছি
এতটা ডুবেছি তোরই তো কারণে
তোকে ভালোবাসতে গিয়ে
কন্ঠে নেই কোনো পেশাদারিত্বের ছাপ।তবুও কি মধুর শোনাচ্ছে। প্রতিটি শব্দে উষ্ণতায় ভরে উঠছে নারীর কোমল মন।গাইতে গাইতে ওর নিকট এগিয়ে এলো তূর্য।দুই হাত বাড়িয়ে দিল প্রেয়সীর দিকে । আহিও ধীরে ধীরে হাত রাখলো স্বামীর বাড়িয়ে দেওয়া হাতের উপর। খুব সাবধানে হাতের উপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তূর্য সযত্নে প্রেয়সীর এক হাত নিজের কাঁধের উপর তুলে নিল।আরেক হাতের আঙুলের ভাঁজে নিজের হাত গলিয়ে দিল।নিজের অপর হাতে কোমর জড়িয়ে ধরে একদম কাছে টেনে নিল তাকে। একবার ডানে আরেকবার বামে কদম ফেলে পুরো মেঝে ঘুরতে ঘুরতে আহি অপরিপক্ক গলায় গাইলো,

কপাল গুণে পেয়েছি তোকে সেসব দিনে
যখন খালি বৃষ্টি ছাড়া ছিল না উপায়
ব্যস ! এই দুই লাইন গেয়ে থেমে গেল সে।এর পরের লাইনগুলো জানা নেই তার।বলাবাহুল্য তূর্যও জানে না। সে গানের লাইন ধরে ভ্রু জোড়া কপালে উঠিয়ে বলল,
” আপনার কপালের তো খুব জোর দেখছি ”
” উঁহু..আপনার ভালোবাসার জোর ” বলে লাজুক হাসলো মেয়েটা।তূর্য এখনো একই কায়দায় এখনো চেয়ে আছে ওর দিকে।আহি বলল,
” গানের কথাগুলো কি আমার উদ্দেশ্যে?হুমম? ”
” একটু-আধটু ”
ঠোঁট উল্টালো আহি ।বলল,

” একটু-আধটু?”
” জ্বি । কয ঘুমিয়ে হাটার অভ্যাস নেই আমার। বাই দ্যা ওয়ে, তুই কি তাহলে ঐ লাইনগুলো আমাকে ডেডিকেট করে গেয়েছিস? ”
” হুম ”
উপর-নিচ মাথা দোলাতে দোলাতে বলল তূর্য,
” বুঝলাম ! ”
” কি বুঝলেন? ”
” সুযোগে তুই-তুকারি করে নিলেন ”
মুখ তুললো মেয়েটা। দুষ্টুমিরত মানবের চোখে চোখ রেখে আহ্লাদী গলায় বলল,
” গানের মধ্যে ‘ তুই ‘ বলে সম্বোধন করলে আমি কি করবো? ”
” নাথিং! এখন আমি করব ? “বলে মেয়েটাকে আরো খানিকটা নিজের সাথে চেপে ধরলো সে। আহি হাত জোড়া ওর বুকে ঠেকালো।প্রশ্ন করল,
” কি করবেন? ”
তূর্য প্রেয়সীর কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে বলল,

” পেয়ার দু তুঝকো ইস কাদার রেহ যায়ে মেরে নিশান ”
” তূর্য ভাই!!! ” মৃদু চিৎকার দিয়ে পুনরায় তূর্যের বুকে মুখ লুকালো আহি।তূর্য ওকে পাজকোলা করে তুলে নিল।বিছানার দিকে এগোতে এগোতে বলল,
” বাবাহ্! হিন্দিও বুঝে গেছিস? ”
মেয়েটা এখনো শার্ট খামচে বুকে মুখ লুকিয়ে আছে।তূর্য ঠোঁট কা’মড়ে হাসলো।ওকে আরো খানিকটা লজ্জায় ফেলতে বলল,
” এত তাঁড়া? এখনই শার্টের বাটন খুলতে শুরু করে দিয়েছিস ? ”
” আপনি অনেক খারাপ হয়ে গিয়েছেন ”
” তাহলে আজ তুই খারাপ হ ” বলে বিছানার নরম গদিতে শুইয়ে দিল মেয়েটাকে।নিজে ওর উপর আধ শোয়া হয়ে লো ভয়েসে গাইলো,

” জারা পাস তু আ মেরে, ধীরে সে ছুঁ জা মুঝে
খো জাউঁ তেরে পেয়ার মে, বাহোঁ মে ভার লে মুঝে ”
” উফফ থামুন তো ” দুই কান চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলো মেয়েটা । তূর্য ওর কান্ডে ঠোঁট চেপে হাসলো। বলল,
” হোয়াই? তুই-ই তো গান শুনতে চাইলি ”
” লজ্জা থাকলে আর জীবনেও শুনতে চাইবো না ”
” বাট আমি শুনাবো। আপাতত একটু আদর খাও পরে আবার গান শুনো।ওকেই জা’ন? ”
নির্লজ্জ লোকের এসব কথা শোনার চেয়ে চুপচাপ যা করবে সবটা সহ্য করেও নেওয়া-ই সুবিধার ঠেকলো আহির কাছে। তূর্য প্রেয়সীর মাঝে ডুব দিতে দিতে সাবধান করলো,
” বেশি ডিস্টার্ব করলে মে’রে ফেলব একদম। ” পরপর আবার নরম কণ্ঠে বলল,
” অল্প একটু করলে প্রবলেইম নেই ”

তূর্যের রোগী দেখা শেষ হয়েছে আরো বিশ মিনিট পূর্বে।সে এখনো চেম্বারে বসে আছে।পুরো রুম ঘুটঘুটে অন্ধকার। সামনের টেবিলে দুই হাতের কনুই ঠেকিয়ে লাগাতার কপাল ডলছে সে। টেবিলের উপর কফির মগ রাখা— যেটা আরো পনেরো মিনিট আগে আনিয়েছে।অথচ একটাবার চুমুক দিয়েও দেখেনি। এতক্ষণে ঠান্ডা বরফ হয়ে গিয়েছে নিশ্চিত তবুও একটা চুমুক দিল সে। গালে নিয়েই চোখ মুখ কুঁচকে ফেলল।কোনো রকমে মুখের টুকু গিলল শুধু। এরমধ্যে আলিয়ার কল এল। খানিক আগেই ওর মা কল করেছিলেন।যার কারণে এতটা চিন্তিত দেখাচ্ছে তূর্যকে। ও আলিয়ার কল রিসিভ করে কানে ধরলো । কিন্তু কোনো কথা বলল না।আলিয়া গম্ভীর গলায় বলল,
” মা তোকে কি কি বলল ? ”
সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তূর্য শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল ,
” এখনো বিয়ে করছিস না কেন? আর কত ? ”
” তোকে মা এসব বলেছে তাই তো? ” উত্তর জানা সত্ত্বেও প্রশ্ন করলো আলিয়া।অতঃপর গম্ভীর গলায় বলল,
” আমার সময় হলে করবো। ”
কিছুক্ষণের নীরবতা।তূর্য উঠে গিয়ে লাইট অন করে আবারো চেয়ারে এসে বসলো। বলল,

” এখনো সময় হচ্ছে না কেন তোর?”
” ওসব চিন্তা তোকে কেউ করতে বলেনি তূর্য ”
” আমারও এসব ভাবতে জাস্ট অসহ্য লাগে। বাট কোথাও না কোথাও নিজেকেই কালপ্রিট মনে হয়। ”
” তোর কি অপরাধ? “আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো মেয়েটা।
তূর্য বলল,
” একবার হলেও তোর ফিলিংস সম্পর্কে আমাকে জানানো উচিত ছিল ”
” জানালে কি করতিস? ভালোবাসতিস আমায়? ”
সেকেন্ডের মধ্যে কাটকাট কন্ঠের উত্তর ভেসে এলো,
” নাহ ! ”
মেয়েটা মোটেও আশ্চর্য হয়নি।সে মলিন হেসে বলল,
” তাহলে? ”
” আন্টি যা বলছেন মেনে নে ”
” তোর প্রতি এখন আমার আর কোনো ফিলিংস নেই। সো তোর টেনশন করারও কোনো দরকার নেই।”
” তাহলে আন্টির কথা শোন । বিয়ে করে নে ।”
” ওকেই।বিয়ে করবো আমি ”
বলে কল কেটে দিল মেয়েটা।পুক করে শব্দ হতেই কান থেকে মোবাইল নামালো তূর্য।কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে রইলো।অতঃপর যেই কথাটা আলিয়ার মুখের উপর বলতে পারেনি সেটা বলল,
” তোর ফিলিংস সম্পর্কে জানলে আমাদের ফ্রেন্ডশিপ এত দূর আসতো না আলিয়া। এটা কোনো অস্বস্তি বা বিরক্তির জন্যে নয়, তোর ভালোর জন্যে।মেলামেশা না থাকলে হয়তো তোর ফিলিংস এতটা গ্রোথ করত না। অনেক আগেই সবটা শেষ হয়ে যেত ”

আরো বেশ কিছুক্ষণ সময় চেম্বারে কাটিয়ে বাড়ি ফিরলো তূর্য।ড্রয়িং রুমের কোলাহল পেরিয়ে সোজা নিজের রুমে গেল। ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শরীর ছাড়লো।পরপর আহিও রুমে এলো। দেখলো কপালে— দুই ভ্রুর মাঝখানে কয়েকটা ভাঁজ পড়ে আছে লোকটার।নিশ্চয় মাথা ব্যথা করছে। সে স্বামীর কপালে হাত রেখে আলতো করে ডলতে আরম্ভ করলো।তূর্য ধীর কন্ঠে শুধালো,
” পা ঠিক হয়ে গিয়েছে ? ” বলে চোখ খুলল।আহি নিজের কাজ অব্যাহত রেখে বলল,
” প্রায় ! একটু ব্যথা আছে। আপনার কি মুড অফ ? ”
” না ,কেন? ” বলে প্রেয়সীর চোখে চোখ রাখার চেষ্টা করলো। ফলস্বরূপ ভ্রু কপালে ঠেকেছে আর কপালের ভাঁজগুলো এবার লম্বালম্বি থেকে আড়াআড়ি হয়েছে। আহি বলল,
” তাহলে আজকে আমাকে ডাকলেন না যে ”
” সব সময় ডাকতে হবে কেন? নিজে থেকে আসা যায় না? ”
” এজন্যেই তো এলাম ”
” এসেছিস ভালো কথা। এখন স্বামীর সেবা কর ” বলে প্রেয়সীর কোমল হাত জোড়া নিজের চুলের ভাঁজে রাখলো। আহি পুরো মাথায় আঙুল বিচরণ করতে করতে ডাকলো,

” শুনছেন ? ”
চোখ বন্ধ করলো তূর্য।বলল,
” বুঝতে তো পারছি কিছু বলবি।বল ”
” ছোট বাবা আপনার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলেন।বলেছেন আপনি ? ”
” হুম ” ছোট্ট করে জবাব দিল তূর্য।
” কি বললেন ? ” জানা সত্ত্বেও ফের জানতে চাইল আহি।
” মধুচন্দ্রিমা ”
” মানে? ”
” হানিমুন ই’ডিয়ট ”
” যাবেন না ” প্রশ্ন করলো আহি।
তূর্য এবার উঠে বসল। বলল,
” না ”
” কেন? ” মন মরা হলো মেয়েটা।তূর্য দুই হাতে ওর মুখ আজলা করে ধরে নমনীয় কন্ঠে বলল,
” পরে যাব ”
” কেন? ”
এইমুহূর্তে প্রয়সীর ‘কেন’ এর উত্তর নেই তার কাছে।সে অজুহাত খুঁজতে লাগলো।পেয়েও গেল।বলল,
” পাসপোর্ট আছে তোর?”
” ছোট বাবার কাছে সবকিছু দিয়ে দিয়েছি।উনি খুব তাড়াতাড়ি বানিয়ে আনবেন বলেছেন ” খুশি খুশি মুখ করে বলল আহি।তূর্য ওর গাল থেকে হাত নামিয়ে বলল,

” আচ্ছা ”
” তাহলে কবে যাবেন? ” উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো মেয়েটা।তূর্য ওকে হতাশ করে বলল,
” আর তিন বছর পরে যাই? এ্যাট লিস্ট তোর গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট হোক ”
” হানিমুনে যাওয়ার সাথে গ্র্যাজুয়েশনের কি সম্পর্ক তূর্য ভা…না মানে কিছু না ”
” আছে বলেই বলছি । দেখতে দেখতে তিন বছর কেঁটে যাবে।”
” হুম,তিন বছর পর বাচ্চা-কাচ্চা সাথে নিয়ে হানিমুনে যাব ”
” বাচ্চা কোথায় পাচ্ছিস তুই? ” ভ্রু কুঁচকে আশ্চর্য জিজ্ঞেস করলো তূর্য। মেয়েটা এবার লজ্জায় চোখ সরিয়ে নিল।নতজানু হয়ে লাজুক ভঙ্গিতে বলল,
” এখন নাহয় নেই।আল্লাহ যদি চান তিন বছরের মধ্যে হয়ে যাবে তো নাকি? ”
” গ্র্যাজুয়েশনের আগে বাচ্চার নাম মুখে আনবি না ” শক্ত কন্ঠে বলল তূর্য।
” আমার বাচ্চা ভালো লাগে তূর্য ভাই ”
” লাগুক ” গম্ভীর গলায় বলল তূর্য।
আহি বলল,

” এখন বাচ্চা চাইছি নাকি আমি? আপনি ঘুরতে চলুন না তূর্য ভাই ”
” ভাই ডাকছিস আবার তার সাথে হানিমুনে যাবি ? লজ্জা করবে না তোর ?”
” এখন তো ডাকি না।ভুলে ডেকে ফেলেছি।আর ডাকব না প্রমিজ।তাহলে যাবেন ? ” গরগর করে এক দমে বলল মেয়েটা।
তূর্য ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলো।বলল,
” আচ্ছা শোন, হানিমুনে মানুষ যায় কেন?”
” ঘুরতে !”
” উঁহু, পার্সোনাল টাইম স্পেন্ট করতে।ভরপুর রো’মান্স করতে। তুই চাইলে আমরা এখানেই …..” কথা অসম্পূর্ণ রেখেই এক চোখ টিপলো তূর্য।
” যাওয়া লাগবে না আপনার। যান তো ! ”
বলে দেমাগ দেখিয়ে উঠে যেতে চাইলো আহি।তূর্য ওকে আটকালো।পিছন থেকে আগলে ধরলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশ কন্ঠে বলল,

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৯

” এত রাগ দেখাস কেন? ”
” আপনি ছাড়ুন তো ” বলে লোকটার বাঁধন হতে ছোটার চেষ্টা করলো আহি।তূর্য ওর চুলের উপর ছোট্ট একটা চু’মু খেয়ে বলল,
” ওকে যাব। এত রাগ দেখাতে হবে না আপনার ”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৭০