প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৮ (২)
মুন্নি আক্তার প্রিয়া
সকাল সকাল বাড়িতে এসে হাজির হয়েছে রাধিকা। খুব বেশি যে সকাল, ঠিক তাও নয় আবার। দশটা বাজে। আটটার দিকে একবার উঠেছিল গুনগুন। বলা ভালো, প্রণয় জোর করে তুলেছিল। ওকে খাইয়ে দিয়ে টিউশন করাতে চলে গেছে। প্রণয় যাওয়ার পর গুনগুন আবার ঘুমিয়েছিল। আজ ক্লাস ছিল। যাবে ভেবেছিল, কিন্তু গতকালকের ঘটনার পর থেকে শরীর, মন কোনোটাই ভালো না। গুনগুন ক্লাসে যাবে না বলে রাধিকাও আজ যায়নি। ভার্সিটিতে না গিয়ে গুনগুনের বাসায় এসেছে। ওর সাজানো-গুছানো সংসার দেখে বলল,
“তোদের টোনাটুনির সংসার দেখছি দারুণ সাজিয়েছিস।”
“আমি সাজাইনি। সব প্রণয় করেছে।”
“ভাইয়া তোকে কত ভালোবাসে!”
গুনগুন প্রত্যুত্তরে হাসল। বলল,
“বোস, আমি চা বানিয়ে আনি।”
রাধিকা গুনগুনের হাত ধরে বলল,
“না। চা খাব না। আমি বাইরে থেকে খাবার নিয়ে এসেছি।”
“কী এনেছিস?”
“দাঁড়া।”
রাধিকা ব্যাগ থেকে চিপস্, মোজো আর স্যান্ডউইচ বের করে বলল,
“তোর বাসায় আসব তাই নিয়ে এসেছি।”
“কেন রে? আমার বাসায় কি খাবার নেই?”
“আছে। তাও আনলাম। এগুলো তো তোর পছন্দ।”
গুনগুন এবারও হাসল। আল্লাহ্ তাকে দেয়নি দেয়নি করে আবার অনেক কিছুই দিয়েছে। এই যেমন রাধিকা একজন। গুনগুন রান্নাঘরে করে আপেল, কমলা নিয়ে এলো। দুজনে খেতে খেতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্প করছে। হঠাৎ রাধিকা চোখে-মুখে দুষ্টুমি ফুটিয়ে বলল,
“সব হয়ে গেছে?”
গুনগুন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“সব হয়ে গেছে বলতে?”
“মানে…ঐতো। আরে বা’ল বুঝিস নাই?”
“অর্ধেক কথা বললে বুঝব কী করে? বলবি তো কী হয়েছে?”
“আরে ভাইয়ার সাথে তোর সব হয়ে গেছে?”
সঙ্গে সঙ্গে গলায় খাবার আটকে গেল গুনগুনের। রাধিকা তড়িঘড়ি করে পানি এগিয়ে দিয়ে, গুনগুনের পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। পানি পান করে কিছুটা স্থির হলো গুনগুন। চোখে পানি চলে এসেছে ওর। রাধিকা মুখটা ফ্যাকাশে করে বলল,
“লজ্জা না পেয়ে বিষম খেলি কেন?”
“লজ্জা পাব কেন? আমাদের মধ্যে কিছুই হয়নি।”
“ইশ! হয়েছে, হয়েছে। থাম। বলতে না চাইলে বলিস না। তবুও আমাকে মিথ্যা কথা বলিস না বুঝলি।”
“কী আশ্চর্য! মিথ্যা কথা কেন বলব? সত্যিই কিছু হয়নি।”
“এখন এটাও আমায় বিশ্বাস করতে হবে? যার ঘরে এত সুন্দর একটা বউ থাকে, সে কিছু না করে থাকে কীভাবে?”
গুনগুন চোখ-মুখ শক্ত করে বলল,
“আমার পিরিয়ড হয়েছে!”
রাধিকার মুখ বিস্ময়ে হা হয়ে গেল। চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে বলল,
“বিয়ের দিনই?”
“উঁহু! পরেরদিন।”
“তাহলে প্রথমদিন কেন কিছু হলো না?”
“ঐদিন আমি ঘুমের ভান ধরে ছিলাম।”
“কেন?”
“কেন কী আবার? এমনি।”
“এমনি মানে কী? তুই তো ভাইয়ার সাথে অন্যায় করছিস। এসব তো ঠিক না।”
“তোর এখন ঠিক-বেঠিকের হিসাব করতে হবে না রে।”
“কেন করব না? আলবৎ করব। তোদের বাসর রাতের গল্প শুনব বলেই তো এসেছি।”
“তুই নিজেই বিয়ে করে বাসর কর না! আমাকে নিয়ে কেন পড়লি ভাই?”
রাধিকা মনটা খারাপ করে বলল,
“আমার কপালে বিয়ে নাই মনে হয়!”
গুনগুন হাসছে। রাধিকা বলল,
“আচ্ছা ভাইয়া তোকে জোর করল না কেন?”
“জোর কেন করবে?”
“তোর কপাল ভালো, তাই প্রণয় ভাইয়ার মতো একটা স্বামী পেয়েছিস। আমি যদি ভাইয়ার জায়গায় থাকতাম তাহলে এত সুন্দর বউকে রেখে কোনোভাবেই একা থাকতাম না।”
প্লেটে অবশিষ্ট আপেলের টুকরা রাধিকার মুখে ঢুকিয়ে গুনগুন বলল,
“এজন্যই তুই প্রণয় না রে। আর এজন্যই তুই ছেলে না। মেয়ে। বোস, আমি প্লেটগুলো কিচেনে রেখে আসি।”
রাধিকা হেসে বলল,
“যা।”
গুনগুন রান্নাঘরে শুধু প্লেটগুলো রাখতে গেলেও, ভাবল যে একেবারে ধুয়েই রেখে দিক। না হলে প্রণয় এসে আবার নিজেই ধুয়ে ফেলবে। রাধিকা ঝড়ের গতিতে ফোন নিয়ে রান্নাঘরে এলো তখন। বিস্ময় নিয়ে ফোন এগিয়ে দিয়ে বলল,
“গুনগুন দেখ!”
গুনগুন দেখতে পেল, গতকালকে মা’রা’মা’রির ঘটনাটা কে যেন ভিডিয়ো করে ফেসবুকে ছেড়ে দিয়েছে। ক্যাপশন দিয়েছে ‘বউকে উত্যক্ত করায়, উত্যক্তকারীদের বেধড়ক পে’টা’ল স্বামী।’ গুনগুন হাত ধুয়ে ফোন নিয়ে ভিডিয়োটা দেখল। কমেন্ট চেইক করে দেখল, প্রায় সবগুলোই কমেন্ট পজিটিভ এসেছে। তাদের ভাষ্যমতে, দেশে যেহেতু আইন এতটা দুর্বল তখন নিজেদের বিচার নিজেদেরই আদায় করে নিতে হয়। কেউ কেউ মন্তব্য করেছে, এরকম স্বামী যেন প্রতিটা মেয়েরই হয়। ভিডিয়োটা রীতিমতো ভাইরাল হয়ে গিয়েছে।
রাধিকা বিস্ময় নিয়ে বলল,
“এগুলো কবে হয়েছে?”
“গতকাল।”
“কী এক আজব ব্যাপার দেখ তো! কিন্তু ভাইয়ার মা’ই’র দেখে আমি স্যাটিসফাইড।”
গুনগুন কোনো জবাব দিল না। রাধিকার সাথে ওর গল্প-গুজবও খুব বেশি আগায়নি আর। যতক্ষণ ছিল রাধিকা, শুধু প্রণয়ের প্রসংশাই করেছে। প্রণয় আসার কিছুক্ষণ আগ দিয়ে রাধিকা বাসায় চলে গিয়েছে। ও যাওয়ার পর এই ভিডিয়ো বারবার সামনে আসছিল গুনগুনের। একেকজন একেক ক্যাপশন দিয়ে ভিডিয়ো পোস্ট করছে। মেয়েরা শেয়ার দিচ্ছে এসব পোস্ট আবার। সবার আকাঙ্ক্ষা প্রণয়ের মতো স্বামীর।
মেয়েরা প্রণয়ের ওপর ক্রাশও খাচ্ছে। গর্ব করে ফেসবুকে ভিডিয়ো শেয়ার দিচ্ছে ক্যাপশন দিয়ে, ‘এমন একটা স্বামী যদি আমি পেতাম!’ এসব দেখে গুনগুনের কেন জানি ভীষণ হিংসা হচ্ছিল!
প্রণয় টিউশন শেষ করে দুপুরে বাড়িতে এসেছে। সকালে আজ রান্না করেছে বলে, বাইরে থেকে খাবার আনেনি। প্রণয় ফ্রেশ হয়ে এসে লক্ষ্য করল, গুনগুন কিছুটা আপসেট। পাশে বসে জিজ্ঞেস করল,
“আমার বউয়ের মন খারাপ কেন?”
“কই মন খারাপ?”
“মনে তো হচ্ছে।”
“না। আপনাকে একটা জিনিস দেখাই।”
বলে গুনগুন ফোন থেকে ভিডিয়োটা বের করে দেখাল। প্রণয় ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কোন শা’লায় এই আকামটা করল!”
গুনগুন প্রণয়কে পিঞ্চ মেরে বলল,
“আকাম বলছেন কেন? যে ভিডিয়ো করেছে ভালোই তো করেছে। আপনি তো এখন নায়ক হয়ে গেছেন। মেয়েদের ড্রিম হাজবেন্ড।”
“ধুর! যে এই ভিডিয়ো করে ভাইরাল করেছে তাকে যদি পেতাম তাহলে আগে ঘা’ড়া’ই’তা’ম।”
“হুম বুঝি! এগুলো সব মুখের কথা।”
প্রণয় হঠাৎ বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,
“আচ্ছা তোমার স্বামী যদি হিরো হয়, তোমার তো সবার আগে খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু তুমি কেন জেলাস হচ্ছো?”
“আমি কেন জেলাস হতে যাব? আমি মোটেও জেলাস নই।”
“কিন্তু আমি তো গন্ধ পাচ্ছি।”
“গন্ধ পাচ্ছেন মানে?”
“জেলাসির গন্ধ পাচ্ছি।”
গুনগুন রাগ করে উঠে যেতে চাইলে প্রণয় ওর হাত ধরে টেনে কোলে বসাল। কোমরে হাত রেখে বলল,
“অন্য মেয়েদের ড্রিম হাজবেন্ড, হিরো হয়ে কী হবে? আমি তো শুধু আমার বউয়ের চোখে হিরো হতে চাই।”
“আপনি আমার চোখে জিরো।”
“তোমার কি আমাকে একটুও কাছে পেতে ইচ্ছে করে না?”
“না।”
“সত্যিই ইচ্ছে করে না?”
“সত্যিই।”
গুনগুন উঠতে চাইলে প্রণয় আরো জোরে কোমরে চেপে ধরল। গুনগুন হেসে বলল,
“আমার সুড়সুড়ি লাগে।”
“আগে বলবে না তোমার সুড়সুড়ি আছে?”
প্রণয় এখন ইচ্ছে করে গুনগুনকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। হাসতে হাসতে গুনগুনের অবস্থা খারাপ। প্রণয়ের থেকে কোনোভাবেই নিজেকে ছাড়াতে পারছিল না। উপায়ন্তরহীন হয়ে গুনগুন প্রণয়ের ঘাড়ে কা’ম’ড় দেয় জোরে। প্রণয় থেমে গিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তুমি কি আমাকে লাভ বা’ই’ট দিলে?”
“ইশ না!”
“দিয়েছ। এখন আমিও দিব।”
প্রণয় গুনগুনকে বিছানায় রেখে ঘাড়ে কা’ম’ড় দিতে গেলে গুনগুন দুহাতে ঠেলে প্রণয়ের মুখটা সরিয়ে দিচ্ছিল। প্রণয় তখন বলল,
“কাবতাক জাওয়ানি ছুপাওগি রানি?”
গুনগুন চোখ পিটপিট করে বলল,
“জাব তাক হে জান।”
প্রণয় হেসে বলল,
“কিন্তু বউ, আমি তো আর ইন্তেজার করতে পারব না।”
প্রণয় গুনগুনের ঘাড়ে ঠোঁট ছোঁয়াতেই ফোনটা বেজে উঠল তখন। বালিশের পাশেই ছিল প্রণয়ের ফোন। ফোনের স্ক্রিনে মাসুদের নামটা ভেসে উঠেছে। প্রণয় বিরক্ত হয়ে বলল,
“এই শা’লার অভিশাপ আমাকে ছাড়ে না, এই শা’লাও আমাকে ছাড়ে না। কল দেওয়ার আর সময় পেল না।”
“কলটা ধরুন।”
“না, আগে বউ। পরে বাকি সব। কা’ম’ড় দিয়ে আমি ঋণ শোধ করি আগে।”
ফোনটা সাইলেন্ট করে আবার গুনগুনের দিকে মনোযোগ দিল প্রণয়। গুনগুন ভয় পেয়ে বলল,
“কা’ম’ড় দিয়েন না। ব্যথা পাব।”
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৮
“আমাকে যখন দিয়েছ? আমিও দেবো। কান্নাকাটি করে লাভ নেই।”
গুনগুন ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। প্রণয় গুনগুনের ঘাড়ে গভীরভাবে ঠোঁট ছুঁইয়ে চুমু খেল। গলায়ও একটা চুমু খেয়ে মাথা তুলে গুনগুনের দিকে তাকাল। গুনগুনও বিস্ময় নিয়ে চোখ মেলে তাকাতেই প্রণয় বলল,
“তোমাকে আদর দিয়ে কাবু করার মতো ক্ষ’ম’তা থাকতে, ব্যথা দেবো এটা ভাবলে কী করে?”
গুনগুন লজ্জায় উঠতে চাইলে, প্রণয় হাত চেপে ধরল। ফিসফিস করে বলল,
“উমম! আদর করা তো শেষ হয়নি আমার।”
এরপর ফের গুনগুনের ঘাড়ে ঠোঁট ছোঁয়াতেই লজ্জায়, আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলল গুনগুন।
