প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১৩
আরাফাত আদনান সামি
মায়া ধীরে ধীরে কান্না থামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এইভাবে আর কতদিন, কৌশিক ভাই?”
কৌশিক বিস্মিত হয়ে বলল,
“কী কতদিন?”
“এইভাবে প্রতিনিয়ত আমি হারাম ভাবে আপনার কাছাকাছি আসতে চাই না। আমি চাই আপনি আমাকে সম্পূর্ণ অধিকারের সাথে, হালাল উপায়ে আপন করে নিন।”
“এখন আমাকে কী করতে হবে সেটা বল..”
“শুনেন না কৌশিক ভাই।”
“হ্যাঁ আমি শুনছি তো,বলনা আমার মায়াবতী।”
“বললে রাগ করবেন না তো?”
“না করবো না, বল..”
“সত্যিই বলবো?”
“হ্যাঁ বল।”
মায়া কান্না থামিয়ে কৌশিককে আরো শক্ত করে চেপে ধরে কিছুটা লাজুক স্বরে বলল,
“চলেন না কৌশিক ভাই আমরা বিয়ে করে ফেলি। পরে না হয় সম্পূর্ণ অধিকারের সাথে আমাকে ভালোবাসবেন।”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
মায়ার কথা শুনে কৌশিকের ভেতরটা আনন্দে ভরে গেলেও, তা সে মায়ার সামনে প্রকাশ করল না। নিজেকে সংযত রেখে মায়াকে সোজা করে বসিয়ে, দুই কাঁধে হাত রেখে গম্ভীর মুখে বলল,
“হোপ বেয়াদব, তোর বয়স কত? আর কয়েক মাস পরেই তো তোর HSC পরীক্ষা। আগে পরীক্ষা দে।”
মায়া মুখ ফুলিয়ে বলল,
“কেনো? বিয়ের পর পরীক্ষা দেওয়া যাবে না নাকি?”
কৌশিক দাঁড়িয়ে উল্টো দিকে ঘুরে বুকে হাত গুঁজে বলল,
“না না, একদমই না! এত ধৈর্য আমার নাই।”
মায়া কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“ধৈর্য নাই মানে?”
কৌশিক একটু হেসে বলল,
“সব বুঝিস তাহলে এটার মানেটা তুই বুঝিস না?”
“না, বুঝি না।”
কৌশিক গভীর নিশ্বাস ফেলে বলল,
“এখন আমি তোকে বিয়ে করি আর মরি নাকি?”
মায়া অবাক হয়ে বলল,
“মানে?”
“মানে ধর,আমি এখন তোকে গরম গরম এক কেজি গুড়ের জিলাপি এনে সামনে রেখে বললাম…”
কৌশিকের কথাটা টান দিয়ে মায়া বলল,
“কই দেন নাই তো?”
“আরে গাধী ধরতে বলছি।”
“আমাকে কেন গাধী বলছেন? আমি মোটেও গাধী না আপনি গাধা। আপনিই তো বললেন জিলাপি ধরতে?”
“হ্যাঁ তো?”
“তাহলে জিলাপি না থাকলে আমি ধরবো কেমনে শুনি?”
মায়ার কথা শুনে সাথে সাথে কৌশিক কপালে হাত দিয়ে বলল,
“হায় আল্লাহ এ কার পাল্লায় ফালাইছো আমারে।”
“কেন আমার পাল্লায়।”
“আরে শালি তোরে মনে মনে ধরতে বলছি।”
“তাহলে এটা বুঝিয়ে বলবেন না? আপনি তো ভালো করে বুঝাইতেও পারেন না দেখছি। কালকে থেকে আমার কাছে প্রাইভেট পড়তে আসবেন মিস্টার চৌধুরী সাহেব।”
কৌশিক এবার একটু ধমকের স্বরেই বলল,
“তোর প্রাইভেটের নিকুচি মারি শালি,চুপ একদম চুপ।”
কৌশিকের ধমক খেয়ে মায়া ভয়ের চোটে নড়েচড়ে উঠল।কৌশিক আবার বলল,
“ধর,এক প্লেট জিলাপি আমি তোরে দিলাম।”
মায়া তখনি বাচ্চাসুলভ স্বরে আবার বলে উঠল,
“কই দেন নাই…”
“মায়ার বাচ্চা মায়া…।”
“ভুল বলেছেন আমি মায়ার বাচ্চা মায়া নই আমি অমিতাভ পাটোয়ারী এবং তার স্ত্রী রুবিনা পাটোয়ারীর একমাত্র মেয়ে মায়া পাটোয়ারী।”
“মায়াাাাাা…..”
“আমি তো আপনার সামনেই বসে আছি। তাহলে এমন দামড়া ষাঁড়ের মতো চিক্কার পারছেন কেন? আমি আপনার মতো বয়রা নই আস্তে বলে আমি শুনছি।”
কৌশিক এবার বেশ রেগে গেল। রাগান্বিত ও ধমকের স্বরে বলল,
“একদম চুপ এর পরে যদি আর একটা কথা বলেছিস তো..”
“তো কী?”
“এখানে যে একটা মেলা চলছে আর আমরা যে মেলাতে আছি এটা কিন্তু ভুলে যাবো বলে দিলাম।”
কৌশিকের কথা শুনে মায়া সাথে সাথে নিজের ঠোঁটের উপর আঙুল রেখে দিল । কৌশিক নিজেকে কিছুটা শান্ত করে আবার শান্তি সলুভ স্বরে বলল,
“ধর,আমি তোরে এক প্লেট গরম গরম গুড়ের রসে চুবানো মিষ্টি জিলাপি দিলাম খাওয়ার জন্য কিন্তু তুই এখনই খেতে পারবি না, ঠান্ডা হলে তারপর খাবি। এখন তুই কি আমার কথা মতো জিলাপি ঠান্ডা হওয়ার পর্যন্ত অপেক্ষা করবি?”
কৌশিক কথাটা বলল বেশকিছু সময় হয়ে গেল কিন্তু মায়া কোন উত্তর দিল না। সে ঠোঁটে উপর সেই কখন থেকে আঙুল দিয়ে রেখেছে। কৌশিক বেশ কিছুক্ষণ আড়চোখে দেখছে মায়াকে। অতপর কৌশিক সব নিরবতা ভেঙে কপালে ভাজ ফেলে বিরক্তিকর স্বরে বলল,
“কী হলো উত্তর দিচ্ছিস না কেন?”
মায়া কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে বললে ভুল হবে কিছু একটা বলছে তবে গুনগুনিয়ে। কিন্তু কৌশিক মায়ার গুনগুনানির ছিটেফোঁটাও বুঝতে পারল না।কৌশিক ফের বলল,
“তুই এমন বোবার মতো করছিস কেন? ঠোঁটের উপর আঙুল দিয়ে রেখেছিস কেন? কী হলো কথা বল!”
একে জিলাপির নাম শুনে মায়ার তর সইছিল না তার উপর কৌশিকের ধমক।জিলাপির নাম শুনেই মায়ার মুখে পানি সেই কখন চলে এসে গেছিল। কৌশিক যেই কথাটা বলল ওমনি মায়া তার ঠোঁটের উপর থেকে আঙুল সরাল। ঠোঁট থেকে আঙুল সরানোর পর জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে এক দমে বলতে শুরু করল,
“মোটেও না!একদমি না! একটুও না!গুড়ের জিলাপি ঠান্ডা হলে খেতে মজা লাগে নাকি? হালকা গরম গরম জিলাপিই তো খেতে মজা। একদমি আমি ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবো না।”
এই বলে সে আবার জিভ দিয়ে নিজের ঠোঁটটা ভিজিয়ে নিল।
কৌশিক মায়ার সেই ভঙ্গি লক্ষ্য করে মুচকি হেসে বলল,
“তাহলে বুঝ তুই সামান্য জিলাপি ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবি না, আর বিয়ের পর তোর পরীক্ষার সময় আমি তোকে…”
মায়া কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“তোকে? কী তোকে..?”
“না মানে আমি তখন নিজেকে কীভাবে সামলাবো?”
“কী সামলাবেন?”
কৌশিক ভ্রকুচকে বলল,
“এখনো বুঝিস নি?”
“না, বুঝিয়ে বলেন।”
কৌশিক যেই কিছু বলতে ওমনি মায়া আবার ভ্রু কুঁচকে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“এই, এই আপনি টপিক থেকে সরে যাচ্ছেন কিন্তু!উত্তর দেন না কেনো?”
কৌশিক মায়ার দিকে তাকিয়ে হাসল, তারপর শান্ত গলায় বলল,
“উত্তর তো আমি অনেক আগেই দিয়ে দিয়েছি।”
“কই?”
“তোর পরীক্ষা শেষ হোক, তারপর।”
“পাক্কা?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, একশো শতাংশ পাক্কা!”
এই বলে কৌশিক মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
“তোর পরীক্ষা একবার শেষ হোক না, মায়াবতী। ততদিন নিজেকে না হয় দমিয়ে রাখলাম। বিয়ের পর সব হাড়ে হাড়ে বুঝাবো। সবটুকু সুধে আসলে আদায় করে নেবো তোকে দিয়ে, দেখিস।”
মায়া কৌশিকের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
“কী বিড়বিড় করছেন, কৌশিক ভাই?”
“না, কিছু না।”
এরপর দু’জনেই চুপচাপ হয়ে গেল। তাদের মাঝে নেমে এল এক অদ্ভুত নীরবতা। সেই নীরবতা যেন কথা বলছিল তাদের না বলা হাজারো অনুভূতির ভাষায়।হঠাৎ মায়া যেন কিছু মনে পড়তেই ব্যাগে হাত ঢুকাল। হাতে ফোন পেতেই স্ক্রিন অন করল। সময় দেখে চমকে উঠল সে রাত দশটা বাজতে আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি!
তড়িঘড়ি করে ফোনটা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কৌশিক ভাই, অনেক রাত হয়ে গেছে! এখন আমাকে দিয়ে আসেন, প্লিজ। আব্বু-আম্মু নিশ্চয়ই বাড়িতে ফিরে এসেছে। আজকে আমার কপালে শনি আছে মনে হচ্ছে!”
কৌশিক হেসে শান্ত গলায় বলল,
“আরে, কিছু হবে না চিল!”
মায়া চোখ কুঁচকে বলল,
“চিল? বাসায় গেলে আম্মু ঝাড়ু দিয়ে এমন চিল দেবে, মনে থাকবে সারাজীবন!”
কৌশিক হেসে বলল,
“এত তাড়াহুড়ো করছিস কেন? আরেকটু বস, তোর জন্য একটা গিফট আছে।”
‘গিফট’ শব্দটা শুনেই মায়া যেন উচ্ছ্বাসে ভরে উঠল। ভেতরে ভেতরে আনন্দে নেচে উঠল তার মন। চোখে মুখে ফুটে উঠল উজ্জ্বল হাসি।
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
“কই দেখি?”
কৌশিক মুচকি হেসে বলল,
“আগে তোর হাতটা বাড়া।”
মায়া কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ডান হাত দেব?”
“না, বা হাতটা দে।”
“ঠিক আছে।”
বলেই মায়া তার বা হাতটা বাড়িয়ে দিল। কৌশিক আবার বলল,
“চোখ বন্ধ কর।”
“কেনো?”
“বন্ধ কর না, সারপ্রাইজ আছে।”
মায়া মুচকি হেসে বলল,
“ঠিক আছে, করলাম।”
কৌশিক একটু দুষ্টু ভঙ্গিতে বলল,
“চিটিং করবি কিন্তু না!”
“আরে করব না! দেখুন, আমি চোখ বন্ধ করলাম।”
বলেই মায়া তার ডান হাত দিয়ে চোখ ঢেকে নিল। কৌশিক পকেট থেকে একটা ছোট ব্যাগ বের করল। ব্যাগটা খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল টকটকে লাল কাচের চুড়ি।
চুড়িগুলো হাতে নিয়ে কৌশিক একে একে মায়ার হাতে পরাতে শুরু করল। মায়া বুঝতেই পারছিল না, আনন্দে তার শরীরটা কেমন কেঁপে উঠছে। ঠিক তখনই মায়া চোখের উপর থেকে হাত সরিয়ে নিল। আর মুহূর্তেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল লাল কাচের চুড়ি তার হাতে কী অপূর্ব মানিয়েছে!
সে প্রায় আনন্দে চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল, এমন সময় কৌশিক তার হাতটা টেনে ধরে বলল,
“এই! চিটিং করলি কেন? আমি তো বলেছিলাম চোখ বন্ধ রাখতে! আচ্ছা সমস্যা নেই, আর দুইটা বাকি আছে হাতটা সোজা কর।”
মায়া আর কোনো কথা না বাড়িয়ে হাতটা সোজা করে রাখল। কৌশিক বাকি চুড়িগুলোও তার হাতে পরিয়ে দিল।
চুড়ি পড়ানো শেষ হতেই কৌশিক মাথা তুলে তাকাল দেখল, মায়া স্থির চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। কৌশিক মুচকি হেসে বলল,
“ওই হ্যালো? কী হয়েছে? এমন করে দেখছিস কেন? দেখে মনে হচ্ছে চোখ দিয়েই খেয়ে ফেলবি আমাকে!”
মায়া যেন তখনও স্বপ্নের ঘোরে ছিল। কৌশিকের কথা শুনে সে বাস্তবে ফিরে এল। মুখে ফুটে উঠল লজ্জার লাল আভা। মাথা নিচু করে নরম গলায় বলল,
“থ্যাংক ইউ।”
কৌশিক দুষ্টু হাসিতে বলল,
“শুধু ‘থ্যাংক ইউ’? আর কিছু দিবি না?”
“আর কী দেব?”
“একটা কিসি দিবি।”
“এই! একদম না!”
কৌশিক হেসে বলল,
“ঠিক আছে, আজ যেহেতু একটা কিসি অলরেডি নিয়েই ফেলেছি, তাই আর জোর করলাম না। না হলে কিন্তু আজ তুই মাফ পেতি না, মেয়ে।”
মায়া হেসে গাল ফুলিয়ে বলল,
প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১২ (২)
“অসভ্য!”
কৌশিক হেসে উত্তর দিল,
“নামসহ পুরোটা বল না, তোর মুখ থেকে ‘অসভ্য’ শব্দটা শুনলে আমার ভীষণ ভালো লাগে… এমনকি আরো অসভ্য হতে ইচ্ছে করে।”
মায়া মুখটা লজ্জায় লাল করে ফেলল। মুচকি হেসে মাথা নিচু করে বলল,
“আপনি আসলেই একটা ‘অসভ্য নীর চৌধুরী’।”
