Home প্রণয়ের ঘোর রাত প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩০

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩০

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩০
আরাফাত আদনান সামি

(#নোট: প্রথম পরিচ্ছেদে কৌশিককে একটু শান্ত-শিষ্ট স্বভাবের দেখা গেলেও, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে তার আচরণ, ব্যবহার আর ব্যাকগ্রাউন্ড, সবকিছুতেই আসবে বড় পরিবর্তন। শান্ত-শিষ্ট কৌশিককে দেখা যাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপে, যেখানে তার চরিত্রে থাকবে ভিলেনসুলভ এক রহস্যময় ছোঁয়া। অন্যদিকে, মায়ার আচরণ ও ব্যবহার প্রথম পরিচ্ছেদের মতোই থাকবে, তবে দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে তার চরিত্রে সাহসী আর দৃঢ় দিকটা আরও বেশি ফুটে উঠবে। তাই প্রথম পরিচ্ছেদের সঙ্গে দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের খুব বেশি মিল খুঁজে নাও পেতে পারেন। আর হ্যাঁ দ্বিতীয় পরিচ্ছদ অবশ্যই অধিক রোমান্টিক হবে।)

​জানালার হালকা আকাশি রঙের সিল্কের পর্দা ভেদ করে ভোরের এক চিলতে সোনালী রোদ এসে পড়েছে ঘরের ভেতর। রজনীগন্ধার সুবাসটা এখন কিছুটা স্তিমিত, তবে দামি পারফিউম আর ভালোবাসার এক তীব্র মিশ্র ঘ্রাণ পুরো বাসর ঘরটাতে এখনো মায়াবী হয়ে জড়িয়ে আছে। বিছানাময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লাল-সাদা গোলাপের পাপড়িগুলো রাতের প্রণয় ঘোরের নীরব সাক্ষী দিচ্ছে। ​মায়ার ঘুম জড়ানো চোখ দুটো আস্তে আস্তে খুলল। শরীরে এক অদ্ভুত ক্লান্তি আর একরাশ আলসেমি জড়িয়ে আছে। সে নড়াচড়া করতে গিয়ে বুঝল, সে এক জোড়া বলিষ্ঠ বাহুর বন্ধনে শক্ত করে বন্দি হয়ে আছে। মায়া আলতো করে চোখ মেলে তাকাল। সে দেখল, কৌশিকের চওড়া আর উন্মুক্ত বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়ে আছে। কৌশিক তাকে একদম নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে জড়িয়ে ধরে গভীর ঘুমে মগ্ন।
​মায়া অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার এই অসভ্য স্বামীটার দিকে। ঘুমের ঘোরে কৌশিককে কতটা শান্ত আর নিষ্পাপ লাগছে! কপালের ওপর কয়েক গোছা চুল এলোমেলো হয়ে চিলতে রোদে চকচক করছে। ধারালো চোয়াল, নিখুঁত নাক আর সেই ঠোঁট জোড়া যা রাতে তাকে একটুও শান্তিতে ঘুমাতে দেয়নি। মায়ার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। সে মনে মনে ভাবল,

“এই লোকটা ঘুমালে কত শান্ত থাকে অথচ জাগা মাত্রই একটা আস্ত উন্মাদের মতো আচরণ শুরু করে দিবে।”
​মায়া আলতো করে নিজের একটা আঙুল কৌশিকের গালের ওপর রাখল। তার দাড়িগুলোর খসখসে অনুভূতি মায়ার আঙুলে এক মিষ্টি শিহরণ জাগাল। ঠিক তখনই কৌশিকের বন্ধ চোখের পাতা দুট নড়ে উঠল। মায়া চট করে নিজের হাত সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু তার আগেই কৌশিক তার চোখ দুটো মেলল। ঘুম জড়ানো, কিছুটা লালচে আর তীব্র নেশাময় চোখ দুটো সরাসরি গিয়ে পড়ল মায়ার চোখের ওপর। চোখে চোখ পড়তেই মায়ার বুকের ভেতরটা আবার সেই চেনা ছন্দে ঢিপঢিপ করে উঠল। লজ্জায় তার ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তের মধ্যে টকটকে লাল হয়ে গেল। সে আর কৌশিকের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না। চট করে মুখটা লুকিয়ে ফেলল কৌশিকের লোমশ, চওড়া বুকের ঠিক মাঝখানে।
​কৌশিক মায়ার এই লজ্জাটুকু ভীষণ উপভোগ করল। তার বুকের ভেতর মায়ার ওম এবং তার উষ্ণ নিশ্বাস এক অন্যরকম প্রশান্তি দিচ্ছিল। কৌশিক তার জড়িয়ে ধরা হাত দুটো আরও কিছুটা শক্ত করে মায়াকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল। সকালের ভাঙা, ভারী আর গভীর কণ্ঠে সে ফিসফিস করে বলল,
“কী হলো, সুইটহার্ট? ঘুম ভাঙতেই আমার বুকে লুকানো হচ্ছে কেন? রাতে তো খুব বাঘিনী সেজে নখ ফোটানো হচ্ছিল পিঠে, এখন এত লজ্জা কোথা থেকে আসছে,ওয়াইফি?”
​মায়া কৌশিকের বুকের ভেতর থেকেই মৃদু স্বরে আমতা আমতা করে বলল,

“আপ-আপনি একটা আস্ত অসভ্য! সকাল সকাল এসব কী শুরু করলেন? ছাড়ুন আমাকে, বেলা হয়ে গেছে। নিচে যেতে হবে।”
​কৌশিক মৃদু হাসল। তার বুকের সেই কাঁপন মায়া স্পষ্ট অনুভব করতে পারল। কৌশিক মায়ার চিবুকটা ধরে মুখটা আলতো করে ওপরে তুলল। মায়া চোখ বন্ধ করে রইল।
​“চোখ খোল মায়া। নিজের স্বামীর দিকে তাকাতে এত লজ্জা কিসের?”
কৌশিক ধমকের সুরে কিন্তু অত্যন্ত আদুরে গলায় বলল।
​মায়া আস্তে আস্তে চোখ খুলল। কৌশিক তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“নিচে যাওয়ার এত তাড়া কিসের? আজ আমাদের জীবনের একটা নতুন সকাল। আজকের সকালটা শুধু আমার আর তোর। সারারাত জঙ্গলি বিড়ালের মতো আমার পিঠ খামচালি। রাতে তো একটুও ঘুমাতে দিলি না, আর এখন সকাল সকাল পালিয়ে যাওয়ার হচ্ছে?”
​মায়া চোখ কপালে তুলে বলল,
“আমি ঘুমাতে দিইনি? নাকি আপনি আমাকে এক ফোঁটা ঘুমাতে দেননি? আমার পুরো শরীরে ব্যথা ধরিয়ে দিয়েছেন, আবার এখন দোষ আমার ওপর দিচ্ছেন?”
​কৌশিক দুষ্টু হেসে বলল,

“আমি তো তোকে আদর করেছি হানিহ্। আর রাতে তুই তো নিজেই বললি, এই কয়েদখানা তোর ভালো লেগেছে। তো, কয়েদি যখন বন্দী হতেই চায়, তখন জেলারের তো কিছু দায়িত্ব থাকে তো, তাই না?”
​“রেখে দিন আপনার দায়িত্ব! এখন ছাড়ুন বলছি, আমি ফ্রেশ হব।”
মায়া কৌশিকের বুকে আলতো একটা কিল মেরে বলল।
​“ছাড়ব। তবে একটা শর্ত আছে।”
কৌশিক মায়ার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে বলল।
​“কী শর্ত?” মায়া সন্দিহান চোখে তাকাল।
​“একটা গুড মর্নিং কিস চাই। একদম এখানে।”
কৌশিক নিজের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে দেখাল।
​মায়া লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলল।
“ইশ আইছে। পারবো না আমি ছাড়ুন আমাকে।”
কৌশিকের কাছ থেকে বাঁচার জন্য মায়ার দুষ্টু ফন্দি এটে আবার বলল,
“এখনো দাঁত ব্রাশ করি নি মুখে অনেক দুর্গন্ধ আর আপনি তো চাইবেন না সকাল সকাল কোন দুর্গন্ধ কিসি খেতে তাই না? তাই প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন আমি ব্রাশ করে আসি কৌশিক ভাই?”
​“কৌশিক ভাই?”

কৌশিকের কণ্ঠস্বর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। সে মায়ার কোমরে হাত দিয়ে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল।
“কাল রাতের পর থেকে ভাই শব্দটা তোর ডিকশনারি থেকে চিরতরে ডিলিট হয়ে গেছে মায়া। এখন আমি তোর স্বামী। সো, কল মি বাই মাই নেম, অথবা অন্য কিছু… যা তোর পছন্দ। কিন্তু ওই শব্দটা আর মুখে আনবি না। আর দুর্গন্ধের কথা বলছিস? তোর মুখের ঘ্রাণ আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা সুবাস। সো, নো এক্সকিউজ।”
​কৌশিক মায়ার ঠোঁটের দিকে ঝুঁকতে লাগল। মায়া দেখল এবার আর রক্ষা নেই। সে চটজলদি বিছানার পাশে পড়ে থাকা নিজের লাল বেনারসি শাড়ির আঁচলটা টেনে কোনোমতে নিজের শরীরে পেঁচিয়ে নিল এবং কৌশিকের হাতের বাঁধন গলে এক ঝটকায় বিছানা থেকে নেমে পড়ল।
​“আমি চললাম ওয়াশরুমে!”
মায়া খিলখিল করে হেসে ওয়াশরুমের দিকে দৌড় দিল।

​কৌশিক বিছানায় কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে মায়ার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মুখে একটা তৃপ্তির হাসি। সে বিছানা থেকে উঠে একটা টাওয়েল কোমরে জড়িয়ে মায়ার পিছু পিছু ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
​মায়া ওয়াশরুমে ঢুকে দরজাটা লাগাতে যাবে, ঠিক তখনই একটা বলিষ্ঠ হাত দরজার পাল্লাটা আটকে দিল। মায়া চমকে উঠে দেখল কৌশিক ভেতরে ঢুকে পড়েছে এবং পেছন দিয়ে দরজাটা লক করে দিল। ওয়াশরুমের চারপাশটা কাঁচ এবং মার্বেল পাথরে সাজানো, ঠিক মাঝখানে একটা বিশাল বাথটাব। মায়া নিজেকে বেনারসি শাড়ির আঁচলে কোনোমতে জড়িয়ে এক কোণায় দাঁড়িয়ে গেল। তার বুকটা তখন দুলছে।
​“আপ-আপনি এখানে কেন এসেছেন? যান বাইরে যান! আমি আগে ফ্রেশ হব, তারপর আপনি আসবেন।”
মায়া আমতা আমতা করে বলল।
​কৌশিক ধীর পায়ে মায়ার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তার চোখ দুটোতে তখনো সেই রাতের নেশা কাটেনি। সে বলল,

“পানি অপচয় করা ঠিক নয় মায়া। একসাথে ফ্রেশ হলে সময় এবং পানি দুটোই বাঁচবে। তা ছাড়া, আমার বউকে শাড়ি পরা অবস্থায় যতটা সুন্দর লাগে, এই এলোমেলো আঁচলে তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি মোহময়ী লাগছে।”
​“প্লিজ দেখুন অসভ্যতামি করবেন না। কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে?”
​“কেউ দেখবে না মায়া। দরজা লক করা।”
কৌশিক মায়াকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল।
​কৌশিকের হাতের ছোঁয়া মায়ার খালি পিঠে লাগতেই সে শিউরে উঠল। কৌশিক মায়ার ঘাড়ের কাছে মুখ নামিয়ে আলতো করে কামড় দিল। মায়া চোখ জোড়া বন্ধ করে কৌশিকের কাঁধটা খামচে ধরল।
​“ক-কী করছেন? ছাড়েন না… প্লিজ…” মায়ার কণ্ঠস্বর বুজে এল।
​“আজ কোনো ছাড় নেই হানি। সকালের মুডটা নষ্ট করিস না।”
কৌশিক মায়ার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে দুই হৃদয়ের মাঝে আবারও এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র ভালোবাসার ঝড় বয়ে গেল। গরম পানির ঝরনার নিচে মায়ার সমস্ত ক্লান্তি যেন এক নিমেষেই ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল, রয়ে গেল শুধু কৌশিকের ভালোবাসার গভীর ছাপ।

​ফ্রেশ হয়ে মায়া একটা হালকা গোলাপি রঙের জামদানি শাড়ি পরেছে। ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর মেলে দেওয়া। কৌশিক কালো একটা প্যান্ট পড়ল আর সাদা একটা শার্ট নিখুঁত ভাবে ইন করে পড়ে নিল। ​দুজন যখন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল, তখন ডাইনিং টেবিলে পুরো পরিবার উপস্থিত। ​কৌশিকের বাবা আশরাফ চৌধুরী খবরের কাগজ পড়ছেন। মা মাহিমা চৌধুরী এবং কাকি সায়েরা চৌধুরী টেবিলে খাবার সাজাচ্ছেন। কাকা আসিফ চৌধুরী চা খাচ্ছেন। আর টেবিলের এক কোণায় বসে আছে কৌশিকের চাচাতো ভাই রোহিত এবং তার ছোট বোন তিয়াশা।
​মায়াকে নিচে নামতে দেখে মাহিমা চৌধুরী এগিয়ে এলেন। তার মুখে এক মাতৃসুলভ মিষ্টি হাসি। তিনি মায়ার মাথায় হাত দিয়ে বললেন,
“মাশাআল্লাহ, আমার মায়াবতী মা-টাকে আজ কত সুন্দর লাগছে! রাতে ভালো ঘুম হয়েছে তো মা? কোনো অসুবিধা হয়নি তো এই বাড়িতে?”
​মায়া লজ্জায় মাথা নিচু করে বলল,

“না মা, কোনো অসুবিধা হয়নি।”
​কাকি সায়েরা চৌধুরী একটু গম্ভীর প্রকৃতির, তবে মনে কোনো প্যাঁচ নেই। তিনি এসে মায়ার হাতে একটা সোনার চুড়ি পরিয়ে দিয়ে বললেন,
“আমাদের চৌধুরী বাড়ির বড় বউ তুমি মায়া। কৌশিক ভীষণ জেদি আর রাগী ছেলে জানি আমরা তাই ও যদি কখনো কোনো অন্যায় করে বা তোমায় বকে, আমাকে বলবে। আমি ওর কান টেনে দেব।”
​কৌশিক চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,
“কাকিমা! তুমি সকাল সকালই আমার বউকে আমার বিরুদ্ধে উস্কে দিচ্ছ? আমি কত ভালো ছেলে, তা মায়া ভালো করেই জানে।”

​ঠিক তখনই টেবিলের ওপাশ থেকে তিয়াশা একটা অবজ্ঞার শব্দ করল। তিয়াশা মায়াকে একদম সহ্য করতে পারছে না। মায়ার সাধারণ মধ্যবিত্ত ব্যাকগ্রাউন্ড তিয়াশার আভিজাত্যের অহংকারে আঘাত করে। তিয়াশা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“ভালো ছেলে তো বটেই ভাইয়া! তবে কেউ কেউ তো আবার ভালো মানুষের মুখোশ পরে ফাঁদ পেতে বড় ঘরের ছেলেদের আটকে ফেলে। তা ভাবি, রান্নাঘরে কোনো সাহায্য করবে, নাকি সারাদিন এই নতুন বউয়ের সাজেই বসে থাকবে?”
​তিয়াশার এই খোঁচামূলক কথায় পুরো টেবিলটা মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেল। তিয়াশাকে মায়া তার নিজের বোনের মতো দেখতো। কখনো ওর সাথে এমন মানে কথা বলে নি আজ হঠাৎ? এইভেবে মায়ার মুখটা ছোট হয়ে গেল, তার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। ​আশরাফ চৌধুরী গম্ভীর গলায় বললেন,
“তিয়াশা! বড়দের সামনে কীভাবে কথা বলতে হয়, সেই শিক্ষা কি তুমি পাওনি? মায়া এই বাড়ির বড় বউ। ওর সাথে সম্মানের সাথে কথা বলবে।”

​কৌশিকের চোখ দুটো ততক্ষণে রাগে লাল হয়ে উঠেছে। সে টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের গ্লাসটা জোরে নামিয়ে রাখল। একটা ঠাণ্ডা অথচ তীব্র গলায় তিয়াশার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তিয়াশা, দিস ইজ দ্য ফার্স্ট অ্যান্ড লাস্ট ওয়ার্নিং টু ইউ। মায়া আমার স্ত্রী। এই বাড়ির ওপর ওর যতটা অধিকার আছে, বোধহয় তোর চেয়ে বেশিই আছে। এরপর যদি তোর মুখ থেকে মায়াকে নিয়ে একটাও বাজে কথা বের হয়, তবে মনে রাখিস, কৌশিক ভাই হিসেবে যতটা ভালো, চটালে ততটাই খারাপ।”
​কৌশিকের ধমক খেয়ে তিয়াশা ভয়ে কেঁচো হয়ে গেল। সে আর কোনো কথা না বলে প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল। সায়েরা চৌধুরী নিজের মেয়ের ওপর বিরক্ত হয়ে বললেন,
“মেয়ের মুখে কোনো লাগাম নেই! মায়া মা, তুমি ওর কথায় কিছু মনে করো না। ও একটা পাগল।”
​মায়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য মৃদু হেসে বলল,
“না ছোট মামি, আমি কিছু মনে করিনি। তিয়াশা এখনো ছোট, ও বলতেই পারে।”
​মায়ার এই উদারতা দেখে আশরাফ চৌধুরী এবং আসিফ চৌধুরী মনে মনে খুব খুশি হলেন। মাহিমা চৌধুরী মায়ার প্লেটে খাবার বেড়ে দিতে দিতে বললেন,
“খেয়ে নাও মা। আজ তো তোমাদেরই দিন।”

​খাবার টেবিলের পরিবেশ আবার স্বাভাবিক হয়ে এল। বড়রা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে শুরু করলেন। ঠিক তখনই কৌশিকের পাশে বসা রোহিত কৌশিকের দিকে একটু ঝুঁকে এল। রোহিতের মুখে একটা চোর চোর দুষ্টু হাসি খেলে গেলো। রোহিত কৌশিকের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কী রে ব্রো? না মানে ইয়ে.. কাল রাতের প্রসেসিং কতদূর চলল? বাসর ঘরের যা ডেকোরেশন ছিল, আর সুবাস… ভাবছিলাম আমার বড় ভাই তো আজ সকালে উঠতেই পারবে না। কিন্তু তুমি তো দেখছি ভাবির সাথে সকাল সকাল একদম ফিটফাট হয়ে নেমে আসলে! তা আমাদের মায়া ভাবি কী…এহেম..এহেম… রাতে ছুতে দেয় নি? ব্যাপার টা কী হ্যাঁ হ্যাঁ?”
​কৌশিক এক লোকমা ভাত মুখে দিয়ে রোহিতের দিকে আড়চোখে তাকাল। তার মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। সে গম্ভীর স্বরে বলল,

“রোহিত, নিজের খাবারের দিকে নজর দে। অন্যের প্লেটে উঁকি দেওয়া ভালো স্বভাব নয়।”
​রোহিত দমবার পাত্র নয়। সে মায়ার দিকে একবার তাকিয়ে আবার কৌশিককে বলল,
“আরে ব্রো, আমি প্লেটের কথা বলছি না। আমি বলছি রাতের পারফরম্যান্সের কথা। ভাবি তো দেখছি লজ্জায় লাল হয়ে আছে। তার মানে তুই নির্ঘাত কোনো অসভ্যতামি করেছিস হে হে হে! একটু টিপস দেও না ভাই, আমারও তো বিয়ে করতে হবে সামনে।”
​রোহিতের কথা মায়ার কানেও একটু একটু পৌঁছাচ্ছিল। সে লজ্জায় মাথা আরও নিচু করে প্লেটে আঙুল চড়াতে লাগল। কৌশিক একবার মায়ার দিকে তাকালে দেখতে পেলো মায়া লজ্জায় ভাতের উপর আঙুল চড়াচ্ছে। অতঃপর তার লজ্জার কারণটা বুঝলো। কৌশিক রোহিতের দিকে তাকিয়ে একটু গম্ভীর হয়ে, বড় ভাইয়ের চেনা কায়দায় গলাটা একটু চড়িয়ে বলল,

“রোহিত! তুই কি এখনো ছোট আছিস? নাকি বুদ্ধিশুদ্ধি হাঁটুতে নেমে গেছে? খাবার টেবিলে বসে এসব ফাজলামি করছিস কেন? কাকা, তোমার ছেলেকে একটু বোঝাও। ইদানিং দেখছি ওর ব্যাবসা বানিজ্যে একটুও মন নেই, সারাদিন যতসব ফালতু চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘোরে।”
কৌশিকের প্যাঁচানো কথাটা ​আসিফ চৌধুরী চট করে বুঝে ফেলল। অতঃপর আসিফ চৌধুরী কৌশিকের কথা শুনে রোহিতের দিকে তাকালেন।
“কী রে রোহিত? সকাল সকাল কৌশিককে কী বলে বিরক্ত করছিস? ও তোর বড় ভাই, একটু সমীহ করে চল।”
​রোহিত ধরা খেয়ে গিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“আরে না বাবা! আমি তো জাস্ট ব্রো-কে জিজ্ঞেস করছিলাম যে আজ বিকেলে ওরা কোথাও ঘুরতে যাবে কি না। ব্রো তো দেখি এমনিতেই রেগে আগুন হয়ে আছে!”
​মাহিমা চৌধুরী হেসে বললেন,

“হ্যাঁ কৌশিক, আজ বিকেলে তোমরা দুজনে একটু ঘুরে এসো। মায়ারও একটু ভালো লাগবে।”
​কৌশিক মায়ার দিকে তাকাল। মায়াও আলতো করে মাথা তুলে কৌশিকের দিকে তাকাল। দুজনের চোখের ইশারায় এক মায়াবী সম্মতি প্রকাশ পেল। ​কৌশিক নরম গলায় বলল,
“ঠিক আছে মা। আমি বিকেলে মায়াকে নিয়ে বের হব।”
​রোহিত টেবিলের নিচে কৌশিকের পায়ে আলতো করে লাথি মেরে ফিসফিস করে বলল,
“বিকেলে ঘুরতে যাবা নাকি আবার ‘ঘোর’ বাড়াতে যাবা ব্রো? সাবধানে থাকো, ভাবিকে কিন্তু এমনিতেই খুব দুর্বল দেখাচ্ছে!”

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৯

​কৌশিক এবার টেবিলের নিচে রোহিতের পায়ে জোরে একটা চাপ দিল। রোহিত ব্যথায় ‘উহ্’ করে উঠল কিন্তু বাবার ভয়ে চিৎকার করতে পারল না। কৌশিক মিষ্টি হেসে রোহিতকে বলল,
“খেয়ে নে ছোট ভাই, বেশি কথা বললে হজমে সমস্যা হতে পারে।”
​খাবার টেবিলের এই খুনশুটি আর মিষ্টি তর্কের মাঝেই মায়া অনুভব করল, এই পরিবারটি তাকে কতটা আপন করে নিয়েছে। আর পাশে বসে থাকা এই গম্ভীর, রাগী অথচ তার জন্য জান লড়িয়ে দেওয়া মানুষটি তার কৌশিক ভাই তাকে কতটা আগলে রাখছে।

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩১