প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩১
আরাফাত আদনান সামি
খাবার টেবিলের সেই গমগমে ভাবটা কাটার পর সারা বাড়িতে এখন একটা ঝিমধরা দুপুর নেমে এসেছে। আশরাফ চৌধুরী আর আসিফ চৌধুরী জরুরি ব্যবসায়িক কাজে দুপুরের আগেই ফ্যাক্টরির দিকে বের হয়ে গেছেন। মাহিমা চৌধুরী আর সায়েরা চৌধুরী রান্নাঘরের তদারকি শেষ করে নিজেদের ঘরে একটু বিশ্রামের জন্য গিয়েছেন। তিয়াশা নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে হয়তো ফোনে ব্যস্ত, আর রোহিতকে তার বন্ধুরা জোর করে আড্ডায় ডেকে নিয়ে গেছে। বিশাল চৌধুরী ভিলার দোতলার শেষ প্রান্তের ঘরটিতে এখন এক অদ্ভুত নীরবতা। জানালার ভারী পর্দাগুলো অর্ধেক টেনে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে ঘরের ভেতর একটা মায়াবী আলো-আঁধারির খেলা চলছে।
জানালার ফাঁক দিয়ে আসছে মৃদু বাতাস আর ঘরের কোণায় রাখা ফ্রেশ রজনীগন্ধার সুবাস মিলে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে।
মায়া বিছানার এক কোণায় পা গুটিয়ে বসে ছিল। তার পরনে এখনো সেই হালকা গোলাপি রঙের জামদানি শাড়িটা জড়ানো। চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়ানো, চিরুনি দিয়ে আলতো করে আঁচড়ানো হলেও পুরোপুরি শুকায়নি। সে নিজের হাতের লাল কাঁচের চুড়িগুলো একটা একটা করে ঘোরাচ্ছিল আর গভীর কোনো ভাবনায় ডুবে ছিল। সকালের খাবার টেবিলে তিয়াশার সেই তীক্ষ্ণ কথাগুলো তার মনে বারবার কাটার মতো বিঁধছিল। চৌধুরী বাড়ির আভিজাত্য আর তার নিজের মধ্যবিত্ত জীবনের সরলতা এই দুটোর মাঝে সে নিজেকে কতটা খাপ খাওয়াতে পারবে, সেই চিন্তাই তাকে গ্রাস করছিল। ঠিক তখনই ঘরের দরজাটা খোলার মৃদু শব্দ হলো। মায়া চমকে তাকাল। দেখল কৌশিক ঘরে ঢুকছে। ল্যাপটপ ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে সে নিজের গায়ের সাদা শার্টের ওপরের দুটো বোতাম আলতো করে খুলে দিল। তার চোখে-মুখে কিছুটা ক্লান্তির ছাপ থাকলেও মায়াকে দেখামাত্রই সেই ক্লান্তি যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
কৌশিক ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বিছানার ওপর বসল। মায়ার খুব কাছে, একদম মুখোমুখি। খাটটা কৌশিকের শরীরের ভারে একটু দেবে যেতেই মায়া কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে পেছনের দিকে সরতে চাইল। কিন্তু কৌশিক তার আগেই মায়ার একটা হাত নিজের বলিষ্ঠ হাতের মুঠোয় পুরে নিল।
কৌশিক নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কী হলো মায়াবতী? দুপুর হতেই একা একা বসে কী এত ভাবা হচ্ছে? আর মুখটা এত ছোট হয়ে আছে কেন?”
মায়া নিজের হাতটা ছাড়ানোর মৃদু চেষ্টা করে বলল,
“ক-কই, কিছু না তো। এমনিই বসে আছি।”
কৌশিক মায়ার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“এমনিই? আমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া এত সহজ নয় মায়া। সকালের টেবিলের ওই ঘটনার পর থেকেই তোর মনটা খারাপ, তাই না? তিয়াশার কথাগুলোয় তোর খুব খারাপ লেগেছে?”
মায়া এবার আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। সে নিচের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“তিয়াশা তো ভুল কিছু বলেনি। আমাদের মাঝখানের ব্যবধানটা তো সত্যি। আমি যতই সম্পর্কে আপনাদের ফুফাতো বোন হই না কেনো বা এখন আপনার বউ কিন্তু তার আগে আমি তো একটা সাধারণ পরিবারের মেয়ে, আর আপনারা… এত বড় লোক, এত বড় চৌধুরী বাড়ি। আমার খুব ভয় করে কৌশিক ভাই। মনে হয়, আমি হয়তো এই বাড়ির যোগ্য নই। আমি হয়তো আপনাদের এই আভিজাত্যের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারব না।”
মায়ার কথা শেষ হতেই কৌশিক মায়ার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। তার অন্য হাতটা চলে গেল মায়ার চিবুকে। মায়ার মুখটা আলতো করে ওপরে তুলে ধরে কৌশিক গম্ভীর কিন্তু অত্যন্ত তীব্র গলায় বলল,
“যোগ্যতা? তুই নিজেকে এই চৌধুরী বাড়ির অযোগ্য ভাবছিস মায়া? এই বাড়ি, এই আভিজাত্য, এই চৌধুরী নাম,সবকিছু একদিকে, আর আমার মায়ার ওই একটা পলকের চাহনি একদিকে। তোর চেয়ে মূল্যবান আমার কাছে এই পৃথিবীতে আর কিছু নেই। আর ওই ফাজিল তিয়াশার কথা ছাড়। আর ব্যবধানের কথা বলছিস? ভালোবাসার মাঝে কোনো ব্যবধান থাকে না মায়া। তোকে পাওয়ার জন্য আমি কতটা বেপরোয়া ছিলাম, তা কি তুই জানিস না?”
মায়া ছলছল চোখে তাকাল।
“জানি। কিন্তু সমাজ তো আর আপনার মতো ভাববে না।”
“সমাজের মুখে কীভাবে আমি তালা মেরে দেই,সেটা তুই খুব ভালো করেই জানিস। আর সমাজ কেনই বা কোন কথা বলবে? তুই আগে আমার ফুফাতো বোন ছিলি এখন আমার বউ বাহিরের তো আর কেউ ছিলি না তাই না? তাহলে এত ভয় কিসের?”
কৌশিক তার বুড়ো আঙুল দিয়ে মায়ার চোখের কোণের এক ফোঁটা জল মুছে দিয়ে আবার বলল,
“আর রইল কথা তিয়াশার? ও একটা ফাজিল আর অহংকারী, অপরিণত মেয়ে। ও যদি আর কোনোদিন তোর দিকে আঙুল তোলার সাহস করে, তবে এই বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে আমি ওকে এমন শিক্ষা দেব যা ও সারা জীবনেও ভুলবে না। তুই এই বাড়ির বড় বউ মায়া। তোকে কেউ কথা শুনাবে বা অবহেলা করবে, সেটা এই কৌশিক বেঁচে থাকতে অসম্ভব।”
কৌশিকের কথার দৃঢ়তা মায়ার বুকের ভেতরের সব ভয় এক পলকে দূর করে দিল। সে এক অদ্ভুত পরম স্বস্তি অনুভব করল। কৌশিক মায়ার দিকে একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,
“তা ছাড়া, যোগ্যতা মাপার আসল জায়গা তো অন্যখানে সুইটহার্ট। কাল রাতে তো তুই প্রমাণ করে দিলি যে তুই আমার জন্য কতটা পারফেক্ট। নাকি এখন আবার পরীক্ষা দিতে চাস?”
কৌশিকের এই আকস্মিক ফ্লার্টেশনে মায়ার ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তের মধ্যে আবার লাল হয়ে উঠল। সে লজ্জায় কৌশিকের বুকে একটা কিল মেরে বলল,
“আপনি না সত্যি একটা অসভ্য লোক! কখন যে কী সিরিয়াস কথা থেকে কোথায় চলে যান, আপনার কথার কোনো ঠিক ঠিকানাই নেই।”
“আমি তো সবসময়ই অসভ্য মায়া, বিশেষ করে তোর সামনে আসলে আমার ভদ্রতার মুখোশটা আপনাআপনি খুলে যায়।”
কৌশিক মায়ার ভেজা চুলের এক গোছা টেনে নিয়ে তাতে নিজের নাক ডুবিয়ে দিল।
“উমম… কী মিষ্টি ঘ্রাণ! শ্যাম্পুর সুবাস নাকি আমার মায়ার শরীরের নিজস্ব গন্ধ?”
“ছাড়ুন না কৌশিক ভাই! দুপুর বেলা কেউ চলে আসবে ঘরে।” মায়া ছটফট করে ওঠার চেষ্টা করল।
“আসুক। কেউ দরজা না নক করে এই ঘরে ঢোকার সাহস করবে না।”
কৌশিক মায়ার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল।
“তা ছাড়া, এখন তো আমরা সরকারি-বেসরকারি সবভাবেই বৈধ। নিজের বউকে একটু আদর করলে এখানে আর কে কী বলবে?”
“আপনি কিন্তু দিন দিন আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছেন।” কথাটা বলে মায়া কৌশিকের চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
“বেপরোয়া তো আমি তোর জন্য অনেক আগে থেকেই মায়া। এখন তো শুধু তার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।”
কৌশিক মায়ার ঠোঁটের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গেল। তার তপ্ত নিশ্বাস মায়ার ঠোঁটে আছড়ে পড়ছিল।
“কী যেন বলেছিলি সকালে? ব্রাশ করিসনি বলে কিস করিসনি। এখন তো দুপুর। এখন তো আর কোনো বাহানা চলবে না, হানিহ্।”
মায়া আর কোনো কথা বলার সুযোগ পেল না। কৌশিকের ঠোঁট জোড়া অত্যন্ত নিবিড়ভাবে মায়ার ঠোঁটের ওপর বসে গেল। মায়া প্রথমে একটু আড়ষ্ট হলেও আস্তে আস্তে সে নিজেকে সঁপে দিল তার এই উন্মাদের মতো ভালোবাসা উজাড় করে দেওয়া স্বামীর কাছে। বেশকিছু সময় পর কৌশিক মায়ার ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে দুইজনেই জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল।
দুপুরের সেই দীর্ঘ ও মধুর মুহূর্তগুলোর পর ঘড়ির কাঁটা যখন চারটে ছুঁইছুঁই, তখন মায়ার ঘুম ভাঙল। কৌশিক তার পাশেই শুয়ে ছিল, এক হাত মায়ার কোমরের ওপর রাখা। মায়া আলতো করে কৌশিকের হাতটা সরিয়ে বিছানা থেকে নামল। আজ বিকেলে তাদের বাইরে যাওয়ার কথা। মহিমা চৌধুরী নিজেই কৌশিককে বলে দিয়েছেন মায়াকে নিয়ে একটু বাহির থেকে ঘুরে আসতে।
মায়া আলমারি খুলে একটা গাঢ় নীল রঙের শিফন শাড়ি বের করল। শাড়ির পাড় জুড়ে হালকা রুপোলি সুতোর কাজ। মায়া ওয়াশরুমে গিয়ে দ্রুত তৈরি হয়ে নিল। চুলগুলো এবার আর ছেড়ে রাখল না, একটা সুন্দর খোঁপা করে তাতে একটা ছোট রুপোলি কাঁটা গুঁজে দিল। চোখে হালকা কাজল আর ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক। সে যখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ির কুঁচিগুলো ঠিক করছিল, তখন কৌশিক ঘুম থেকে উঠে বসল। চোখের ওপর হাত রেখে সে কিছুক্ষণ মায়ার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। নীল শাড়িতে মায়াকে যেন আকাশের এক টুকরো নীল পরীর মতো লাগছিল। কৌশিক বিছানা থেকে নেমে ধীর পায়ে মায়ার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নায় মায়া কৌশিকের প্রতিচ্ছবি দেখল। কৌশিক পেছন থেকে মায়ার দু কাঁধে হাত রাখল এবং তার ঘাড়ের কাছে নিজের চিবুকটা ঠেকাল।
“নীল রঙটা তোকে বড্ড মানায় মায়া। তোকে দেখলে আমার ভেতরের কবিসত্তা জেগে ওঠে।”
কৌশিক আয়নায় মায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল। মায়া মিষ্টি হেসে বলল,
“তাই নাকি? তা আমার কবি সাহেব কি আমার জন্য কোনো কবিতা লিখেছে নাকি?”
কৌশিক হাঁটু গেড়ে বসে মায়ার শাড়ির কুঁচি গুলো হাত দিয়ে ঠিক করে দিতে দিতে বলল,
“কবিতা আমি লিখতে পারি না মায়া, তবে তোকে নিয়ে একটা আস্ত বই লিখে দিতে পারি। যার প্রতিটা পাতায় থাকবে শুধু তোর আর আমার ভালোবাসার গল্প।”
মায়া স্থির দাঁড়িয়ে শাড়ির আচলটা ঠিক করতে করতে বলল,
“অনেক হয়েছে। এবার আপনি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিন। বেলা পড়ে আসছে, নিচে সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে হয়তো।”
“আচ্ছা বাবা যাচ্ছি। আমার বউয়ের হুকুম বলে কথা না মেনে কি উপায় আছে? দুই মিনিট অপেক্ষা করো এই গেলাম এই আসলাম।”
এই বলে কৌশিক মায়ার কপালে একটা আলতো চুমু খেয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল। কৌশিক তৈরি হতে হতে মায়া ঘরের জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে নিল। সে যখন ড্রেসিং টেবিলের ওপর নিজের পার্সটা নিচ্ছিল, তখন তার মনে এক অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করছিল। যে মানুষটাকে সে একসময় দূর থেকে ভয় পেত, আজ সেই মানুষটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। কৌশিক একটা হালকা ধূসর রঙের শার্ট আর কালো প্যান্ট পরে তৈরি হয়ে নিল। শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো, যার কারণে তাকে আরও বেশি আকর্ষক লাগছিল। দুজন যখন একসাথে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল, তখন লিভিং রুমে পুরো পরিবার চা খাচ্ছিল। রোহিত এক কোনায় সোফায় বসে ফোন ঘাটছিল। মায়াকে নীল শাড়িতে আর কৌশিককে এত হ্যান্ডসাম লুকে দেখে সে ফিসফিস করে একটা শিস দিয়ে উঠল।
“ওয়াও ব্রো! তোমাদের দুজনকে একসাথে জাস্ট রাজযোটক লাগছে। মনে হচ্ছে কোনো সিনেমার নায়ক-নায়িকা শুটিং করতে যাচ্ছে।”
মাহিমা চৌধুরী হেসে উঠলেন।
“ঠিক বলেছিস রোহিত। আমার ছেলে আর বউমাকে সত্যি খুব সুন্দর লাগছে। কারো নজর না লাগুক আমার বাচ্চাদের উপর।”
তিনি উঠে এসে মায়ার গালে হাত দিয়ে আলতো করে চুমু খেলেন। সায়েরা চৌধুরী বললেন, “কৌশিক, মায়াকে ভালো কোনো রেস্তোরাঁয় নিয়ে যাবি। আর শোন, মায়ার জন্য কিছু কেনাকাটাও করে দিস। নতুন বউ বলে কথা।”
কৌশিক সোফায় বসতে বসতে বলল,
“হ্যাঁ কাকিমা, ওর যা যা লাগবে সব কিনে দিব।”
ঠিক তখনই তিয়াশা সেখানে এসে বসল। তার হাতে একটা দামি ক্যাটালগ। সে মায়ার দিকে তাকিয়ে কৃত্রিম এক হাসি দিয়ে বলল, “তা বড় ভাবি, নীল শাড়িটা তো বেশ সুন্দর। তবে আমার মনে হয়, আমাদের চৌধুরী বাড়ির স্টেটাসের সাথে এই শাড়িটা ঠিক যায় না। এটা একটু বেশিই সিম্পল। তুমি যদি চাও, আমি আমার ডিজাইনারের ঠিকানা দিতে পারি। ওখান থেকে তুমি কিছু ভালো শাড়ি বানিয়ে নিতে পারো। অবশ্য, ওখানকার শাড়ির দামগুলো তোমার আগের লাইফস্টাইলের বাজেটের বাইরে হতে পারে।”
তিয়াশার এই পরোক্ষ কটূক্তিতে আবারও লিভিং রুমের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। মাহিমা চৌধুরী কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই রোহিত তিয়াশাকে ধমকের সুরে বলল,
“তোর কী হয়েছে তিয়াশা? আগে মায়া বাড়িতে আসলে আপু আপু বলে বাড়িটা মাথায় তুলো রাখতি সব সময় পিছে পিছে দৌড়াতি। আর এখন এই ব্যবহার কেনো? আর তিয়াশা, তুই কি তোর ওই ডিজাইনার ব্রান্ডের অহংকারটা একটু বন্ধ করবি? মায়া এই নীল শাড়িতে কতটা এলিজেন্ট লাগছে, তা তোর ওই সস্তা ক্যাটালগের শাড়িতেও লাগবে না। রূপ মানুষের মনে থাকে, পোশাকে নয়। যা রুমে গিয়ে পড়তে বস।”
তিয়াশা রেগে গিয়ে বলল,
“তুমি সবসময় এইসব মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্টের পক্ষ নিবেই ভাইয়া! আমি তো শুধু মায়া আপুর ভালোর জন্যই বলছিলাম। আমাদের সার্কেলে সবাই এত হাই-ফাই, ভাবি যদি এরকম সস্তা শাড়ি পরে বাহিরে যায়, তবে লোকে ভাইয়াকে নিয়ে হাসাহাসি করবে।”
কৌশিক এতক্ষণ শান্তভাবে চা খাচ্ছিল। তিয়াশার শেষ কথাটা শুনতেই সে চায়ের কাপটা পিরিচের ওপর রাখল। কাপ-পিরিচের ঠোকাঠুকির শব্দে তিয়াশা চমকে উঠল। কৌশিক অত্যন্ত ঠাণ্ডা, গম্ভীর এবং ধারালো চোখে তিয়াশার দিকে তাকাল।
“তিয়াশা..”
কৌশিকের কণ্ঠস্বর যেন পুরো লিভিং রুমে কাঁপন ধরিয়ে দিল।
“তুই হয়তো ভুলে যাচ্ছিস তুই কাকে নিয়ে কথা বলছিস। লোকে আমাকে নিয়ে হাসবে কি না, তা দেখার দায়িত্ব আমার তোর না। আর মায়ার শাড়ি সস্তা না দামি, তা বিচার করার যোগ্যতা তোর নেই। মায়া যা পরে, তাতেই তাকে আমার কাছে এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী লাগে। তোর ওই ব্রান্ডের জামাকাপড় পরে অহংকার করা ছাড়া আর কোনো গুণ নেই। এরপর যদি তুই মায়ার লাইফস্টাইল বা তার ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে একটাও কথা বলিস, তবে আমি তোর সব ক্রেডিট কার্ড ব্লক করে দেব এবং তোকে এই বাড়ি থেকে বের করে হোস্টেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করব। তখন কাকা-কাকিও তোকে বাঁচাতে পারবে না।”
কৌশিকের এই চরম হুমকিতে তিয়াশার মুখ রাগে ফুলে ফেঁপে উঠল। সাথে একটু ভয়ও পেলো। সে জানে কৌশিক যা বলে, তা কাজেও করে দেখায়। তাই সে আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে রাগে পা দাপাতে দাপাতে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। আসিফ চৌধুরী লজ্জিত হয়ে বললেন, “কৌশিক বাবা, মেয়েটা বড্ড বেশি মাথায় চড়ে গেছে। তুই কিছু মনে করিস না।”
কৌশিক শান্ত গলায় বলল,
“কাকা, আমি কিছু মনে করিনি। তবে মায়ার সম্মানহানি আমি এই বাড়িতে কাউকেই করতে দেব না, সে যেই হোক না কেন।”
কৌশিক মায়াে হাতটা আলতো করে চেপে ধরল। মায়ার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। কৌশিক মায়ার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় তাকে শান্ত হতে বলল। মাহিমা চৌধুরী বললেন, “আচ্ছা, অনেক হয়েছে। এবার তোমরা বের হও। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। ঘুরে এসো আনন্দ করে।”
কৌশিক সেখানে আর কোন কথা বাড়ালো না। সবার থাছ থেকে বিদায় নিয়ে মায়াকে সাথে করে সে বেরিয়ে পড়ল। কৌশিক নিজের কালো রঙের এসইউভি গাড়িটা ড্রাইভ করছিল। মায়া তার পাশের সিটে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। ঢাকা শহরের চিরচেনা জ্যাম আর বিকেলের হালকা আলো মিলে এক অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি করেছে। গাড়ির ভেতরে মৃদু ভলিউমে একটা রোমান্টিক গান বাজছিল। কৌশিক এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতটা বাড়িয়ে মায়ার কোলের ওপর রাখা হাতটা চেপে ধরল।
কৌশিক নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী হলো আমার মায়াবতী হুম? এখনো সেই তিয়াশার কথা ভেবে মন খারাপ করে আছিস?”
মায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কৌশিকের দিকে তাকাল।
“শুধু তিয়াশার কথা নয় কৌশিক ভাই। আমি ভাবছি, আপনি আমার জন্য নিজের পরিবারের সাথে এতটা রুক্ষ আচরণ করছেন, এতে কি সবার মনে আমার প্রতি কোনো ক্ষোভ তৈরি হবে না? আমি চাই না আমার কারণে এই পরিবারে কোনো অশান্তি হোক।”
কৌশিক একটা হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“অশান্তি? মায়া, তুই এখনো আমাকে পুরোপুরি চিনতে পারিসনি। আমি অন্যায় সহ্য করি না, সে আমার নিজের চাচাতো বোন হোক বা অন্য কেউ। আর রুক্ষ আচরণ? ওটা রুক্ষতা নয় মায়া, ওটা শাসন। তিয়াশাকে যদি এখন না থামানো যায়, তবে ও ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো ভুল করবে। আর ক্ষোভের কথা বলছিস? মা, কাকি, কাকা সবাই তোকে কতটা ভালোবাসে, তা তো তুই নিজেই দেখলি। শুধু তিয়াশার কথার জন্য তুই নিজেকে কেন গুটিয়ে নিচ্ছিস?”
মায়া কৌশিকের হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি আমার জন্য এতটা ভাবেন কেন কৌশিক ভাই?”
কৌশিক গাড়িটা একটা রেড লাইটে থামাল। সে পুরোপুরি মায়ার দিকে ঘুরে বসল। মায়ার দু হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে সে অত্যন্ত গভীর ও নেশাময় কণ্ঠে বলল,
“কারণ তুই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ মায়া। তোকে পাওয়ার জন্য আমি যে রাতগুলো না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি, তোকে অন্য কারও সাথে দেখার ভয়ে আমি যেভাবে ছটফট করেছি, তা শুধু আমি আর আমার ওপরওয়ালা জানেন। তুই যখন আমার সামনে থাকিস না, মনে হয় আমার শরীরের একটা অংশ নেই। আর তুই যখন আমার পাশে থাকিস, তখন মনে হয় আমি এই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ আমি এবার সম্পূর্ণ। তোকে আগলে রাখাটা আমার কর্তব্য নয় মায়া, ওটা আমার আসক্তি।”
কৌশিকের এই গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ মায়ার মনের সব জট এক নিমেষে খুলে দিল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। কৌশিকের কাঁধে নিজের মাথাটা রাখল। কৌশিকের কানের কাছে মায়া ফিসফিস করে বলল,
“আমিও আপনাকে খুব ভালোবাসি কৌশিক ভাই। হয়তো আপনার মতো এতটা বেপরোয়াভাবে প্রকাশ করতে পারি না, কিন্তু আমার এই মনের ভেতর শুধু আপনিই আছেন।”
কৌশিক মায়ার চুলে একটা চুমু খেল।
“আমি জানি সুইটহার্ট। তোর ওই লাজুক চোখ আর তোর ওই আমতা আমতা করা কথাগুলোই আমাকে তোর প্রতি আরও বেশি পাগল করে তোলে।”
গ্রিন লাইট জ্বলতেই কৌশিক আবার গাড়ি চালানো শুরু করল। তাদের গাড়িটা এগিয়ে চলল শহরের এক অভিজাত রেস্তোরাঁর দিকে। কৌশিক মায়াকে নিয়ে শহরের সবচেয়ে নামী এক রুফটাপ রেস্তোরাঁয় এল। সেখান থেকে পুরো ঢাকা শহরের রাতের আলো ঝলমলে দৃশ্য সব দেখা যায়। চারিদিকের মৃদু আলো আর লাইভ মিউজিকের সুর এক মোহময় পরিবেশ তৈরি করেছিল।
তারা একটা কোণার টেবিল বেছে নিল, যেখান থেকে শহরের ভিউটা সবচেয়ে সুন্দর দেখায়। কৌশিক মায়ার পছন্দের সব খাবার অর্ডার করল। খাবার খেতে খেতে তাদের মধ্যে অনেক কথা হলো। তাদের অতীত জীবনের ভুল বোঝাবুঝি, কৌশিকের মায়াকে পাওয়ার সেই পাগলামি আর মায়ার কৌশিকের প্রতি সেই গোপন ভালোলাগা সবকিছুই যেন আজ নতুন করে প্রাণ পেল।
মায়া জুসের গ্লাসে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা কৌশিক ভাই, একটা কথা সত্যি করে বলবে?”
কৌশিক ছুরি-কাঁটা দিয়ে স্টেক কাটতে কাটতে বলল,
“হুম বল,আমি আমার মায়াবতীর সব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি রাজি আর বাধ্যও বটে।”
“আপনি যখন প্রথম জানতে পারলেন যে আমার বিয়ে অন্য কোথাও ঠিক হচ্ছে, তখন আপনার কেমন লেগেছিল?” এই বলে মায়া কৌতূহলী চোখে তাকাল কৌশিকের পানে।
(এই ঘটনাটা কাল্পনিক কাহিনি ছিল। যেটা আমি গল্পে কাল্পনিক কাহিনি হিসাবে তাদের এক টুকরো অতিত তুলে ধরতে ছেয়েছিলাম। যেটা আরো আগে কোন একটা পর্বে দেওয়ার কথা ছিল বাট আমি ভুলে গেছিলাম দিতে সেটাই আস্তে আস্তে এখানে প্রকাশ করবো তাই কেন বিভ্রান্ত হবেন না।)
কৌশিকের হাতের মুষ্টিটা এক মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল। তার চোখের মনিতে এক তীব্র আদিম হিংস্রতা ফুটে উঠল, যা দেখে মায়া একটু ভয় পেয়ে গেল। কৌশিক স্টেকটা প্লেটে রেখে মায়ার দিকে তাকাল।
“কেমন লেগেছিল?”
কৌশিকের গলাটা হঠাৎ খুব গম্ভীর হয়ে গেল।
“মনে হয়েছিল ওই ছেলেটাকে আমি নিজের হাতে শেষ করে দিই। তুই অন্য কারও হয়ে যাবি ভাবলেই আমার মাথা ঠিক থাকত না মায়া। আমি তোকে নিয়ে এতটাই পজেসিভ যে, তোর দিকে কেউ অন্য নজরে তাকালে আমি তার চোখ উপড়ে নিতে পারি। সেদিন যদি ফুফা-ফুফি আমার কথা না শুনতেন, তবে আমি তোকে জোর করে তুলে নিয়ে এসে বিয়ে করতাম। আমি তোকে হারাতে পারতাম না মায়া, কোনোভাবেই না।”
কৌশিকের এই তীব্র রূপ দেখে মায়া শুকনো ঢোক গিলল। সে বুঝল, এই মানুষটা তাকে কতটা অন্ধের মতো ভালোবাসে। তার এই পজেসিভনেস হয়তো কারও কাছে ভয়ংকর মনে হতে পারে, কিন্তু মায়ার কাছে এটা এক অদ্ভুত সুরক্ষার অনুভূতি দিল। খাবার শেষ করে তারা যখন রেস্তোরাঁ থেকে বের হলো, তখন রাত প্রায় দশটা।
কৌশিক গাড়ির লক খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করল,
“বাড়ি ফিরবি নাকি একটু লং ড্রাইভে যাবি সুইটহার্ট?”
মায়া একটু ইতস্তত করে বলল,
“এত রাতে লং ড্রাইভ? আম্মু কিছু বলবেন না?”
“আমি মাকে ফোন করে বলে দিয়েছি আমাদের ফিরতে একটু দেরি হবে। সো, নো টেনশন হানিহ্।”
এই বলে কৌশিক দুষ্টু হেসে গাড়ি স্টার্ট দিল।
গাড়িটি হাইওয়ের দিকে এগিয়ে চলল। রাতের ফাঁকা রাস্তায় গাড়ির গতি বেশ বেশি ছিল। জানালার কাঁচটা একটু নামিয়ে দিতেই ঠাণ্ডা হাওয়া মায়ার মুখে এসে লাগল। তার খোঁপাটা আলতো করে খুলে গেল আর চুলগুলো বাতাসে উড়তে লাগল। কৌশিক এক নজরে মায়ার এই উন্মুত্ত রূপ দেখল। সে গাড়িটা রাস্তার এক কোণায়, একটা অন্ধকার গাছের ছায়ায় থামাল।
মায়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“গাড়ি থামালে কেন?”
কৌশিক কোনো উত্তর দিল না। সে নিজের সিট বেল্টটা খুলে মায়ার দিকে ঝুঁকে এল। মায়ার সিটটা এক ঝটকায় পেছনের দিকে হেলিয়ে দিল। মায়া কিছু বোঝার আগেই কৌশিক তার ওপর নিজের শরীরের ভর ছেড়ে দিল। মায়া আমতা আমতা করে বলল,
“ক-কৌশিক ভাই! এটা রাস্তা… কেউ দেখে ফেলবে।”
“কাউকে তো দেখছি না আমি। আর দেখলেও আমার কিছু যায় আসে না। সো, নো এক্সকিউজেস। তালে তাল মিলা, মজা পাবি।”
এই বলে মায়াকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে কৌশিক মায়ার ঠোঁট জোড়া নিজের ঠোঁটের ভেতর বন্দি করে নিল। রাতের সেই নির্জন হাইওয়ের পাশে, গাড়ির ভেতরের সেই অন্ধকার ও উষ্ণ পরিবেশে তাদের ভালোবাসার আরও একটি অধ্যায় রচিত হলো। কৌশিকের হাত মায়ার শাড়ির আঁচল গলে মায়ার সর্বাঙ্গে বিচরণ করতে লাগল, আর মায়া গভীর তৃপ্তিতে নিজের স্বামীকে নিজের মাঝে ধারণ করল। মায়া পুরোপুরি ভাবে নিজেকে কৌশিকের কাছে সঁপে দিল।
যখন তারা চৌধুরী ভিলার সামনে পৌঁছাল, তখন রাত প্রায় একটা। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ। শুধু সিকিউরিটি গার্ড মেইন গেটটা খুলে দিল।
কৌশিক আর মায়া খুব সাবধানে, পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে দোতলার নিজেদের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। তাদের এই চোরের মতো বাড়ি ফেরা নিয়ে দুজনেই মনে মনে খুব হাসছিল।
ঘরের ভেতর ঢুকে কৌশিক দরজাটা লক করে দিল। মায়া ক্লান্তিতে বিছানায় ধপাস করে বসে পড়ল। তার শাড়ি কিছুটা এলোমেলো, চোখে কাজল লেপ্টে গেছে, আর ঠোঁটের লিপস্টিক পুরোপুরি উধাও। কৌশিক মায়ার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। সে মায়ার দু হাত ধরে বলল,
“আজকের দিনটা কেমন কাটল সুইটহার্ট?”
কৌশিকের কথায় মায়া লজ্জা পেলো। কৌশিক আবারও বলল,
“কী হলো বল।”
মায়া সাহস জুগিয়ে কৌশিকের কপালে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“আজকের দিনটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা একটা দিন ছিল কৌশিক ভাই। আপনার পাশে থাকলে আমার আর কোনো ভয় থাকে না।”
কৌশিক মায়ার কোলে মাথা রাখল।
প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩০
“আমিও তোকে সারাজীবন এভাবেই ডার্ক ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখব মায়া। আমাদের মধ্যের এই প্রণয়ের ঘোর’কে আমি কখনো কোনোদিন কাটতে দিব না।”
বাইরে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর রাতের নিস্তব্ধতা। ঘরের মৃদু আলোয় দুই ক্লান্ত, তৃপ্ত আত্মা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
