প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২১
insia isha chowdhury
সূচনা ঘরের ভেতর ঢুকতেই ড্রয়িংরুমে বসে থাকা ঋতু আর সুপ্তিকে দেখতে পেল। ওদের দেখে মুখে হাসি ফুটে উঠল সূচনার। ঠিক তখনই সূচনা শুনতে পেল, ঋতু বিরক্তি মিশ্রিত উদ্বেগ নিয়ে সুপ্তিকে বলছে,
“আসলে তোর হয়েছে কী, বল তো? অন্তত আমার সঙ্গে তো শেয়ার করতে পারিস!”
সুপ্তি এবারও মাথা নিচু করে রইল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে মৃদু স্বরে বলল,
“কী আর হবে! তুই অযথাই বেশি বেশি ভাবছিস।”
ঋতু হালকা বিরক্ত বোধ করে মাথা নাড়ল।
“আমি বেশি ভাবছি? তোর আচরণ দেখেই তো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, কিছু একটা হয়েছে। না হলে এমন গুম হয়ে আছিস কেন? কোনো একটা বিষয় নিয়ে তুই ভীষণ মন খারাপ করে আছিস। দেখ, আমাকে চাইলে বলতে পারিস। আসলে তোর কী হয়েছে?”
সূচনা হাতে থাকা গিফটগুলো সামলে নিয়ে ওদের দিকে এগিয়ে গেল। আর বলল, “হ্যালো” ঋতু হাসিমুখে জবাব দিল। তবে সুপ্তি শুধু মাথা নেড়ে উত্তর দিল। সুপ্তিকে কেমন যেন অস্বাভাবিক চুপচাপ লাগছে। সূচনার হাতে বেশ কয়েকটা গিফট দেখে ঋতু মুচকি হেসে বলল,
“বাহ! ভাইয়া তো দেখছি তোকে দারুণ গিফট কিনে দিয়েছে।”
সূচনা সঙ্গে সঙ্গে হেসে বলল,
“না, এগুলো তোর ভাই না, আমার ভাইয়া কিনে দিয়েছে।”
“ও আচ্ছা! হৃদয় ভাইয়া?”
“না, আসলে…রাফির নামটা মুখে আনতে গিয়েও থেমে গেল সূচনা। প্রণয় যে নামটা শুনতে পছন্দ করে না, সেটা সে জানে। তাই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“আমার এক কাজিন ভাইয়া। কানাডায় থাকত। আমার বিয়েতে আসতে পারেনি তো, তাই দেশে এসে বাসায় দেখা করতে এসেছিল। তখন আমার জন্য এগুলো নিয়ে এসেছে।”
“ও আচ্ছা।”
“হুম, ভাইয়া অনেক ভালো।”
ঋতু মাথা নেড়ে বলল,
“ঠিক আছে, কিন্তু তুই তো চলে এলি। আমার ভাই কোথায়?”
উনি এখন বাড়ির বাইরে আছেন। এখনই চলে আসবেন হয়তো। আচ্ছা, তোরা বস। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। কথাটা বলেই সূচনা নিজের রুমের দিকে চলে গেল। এতক্ষণ সুপ্তি চুপচাপ বসে সূচনাকে দেখছিল। মেয়েটা এমনিতেই ভীষণ সুন্দরী। কিন্তু এই কয়দিনে যেন সূচনার সৌন্দর্যে অন্যরকম এক দীপ্তি যোগ হয়েছে। চোখেমুখে সুখের আভা, ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মিষ্টি হাসি মনে হচ্ছে ভালোবাসা তাকে আরও বেশি উজ্জ্বল করে তুলেছে। অজান্তেই সুপ্তির বুকের ভেতর হালকা একটা ব্যথা অনুভূত হলো। সূচনাকে এতটা হাসিখুশি আর প্রাণবন্ত দেখে হঠাৎই সুপ্তির চোখ দুটো ভিজে উঠল। সে তো নিজেকে অনেকবার বুঝিয়েছে, নিজের মনকে শক্ত করার চেষ্টা করেছে। তাহলে কেন এখনও বুকের ভেতরটা এভাবে মোচড় দিয়ে ওঠে? কেন এত কষ্ট হয়? এইসব ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খেতেই আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। দ্রুত চোখের কোণে জমে থাকা জল আড়াল করে ঋতুর দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“তুই থাক, আমি আসছি।”
কথাটা বলেই সুপ্তি তাড়াহুড়ো করে সেখান থেকে চলে গেল। সুপ্তির এমন আচরণে অবশ্য ঋতু একটুও অবাক হলো না। দেশে ফেরার পর থেকেই সে লক্ষ্য করছে, সুপ্তি আগের সেই প্রাণচঞ্চল মানুষটা নেই। কোনো কিছুতেই তার আগ্রহ নেই, কারও সঙ্গে ঠিকমতো মিশছে না। সবসময় কেমন যেন চুপচাপ, অন্যমনস্ক আর মনমরা হয়ে থাকে। ঋতুর মনে বহুবার প্রশ্ন জেগেছে, আসলে কী হয়েছে সুপ্তির? কোনো সম্পর্কের জটিলতা? নাকি অন্য কোনো গভীর কষ্ট? নিশ্চয়ই এমন কিছু ঘটেছে, যা তাকে ভেতর থেকে বদলে দিয়েছে। কিন্তু যতবারই সে জানতে চেয়েছে, সুপ্তি ততবারই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। এসব ভাবতে ভাবতে ঋতু অসহায় দৃষ্টিতে সুপ্তির চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর এক দীর্ঘ, হতাশ নিঃশ্বাস ফেলল।
প্রণয় নিজের রুমে ঢুকতেই দেখল সূচনা কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছিল। তাকে দেখেই সে কলটা কেটে দিল। প্রণয় কিছু বলার আগেই সূচনা বলল, “আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে।”
“হ্যাঁ, বলো। কী বলতে চাও?”
সূচনা কিছুক্ষণ ইতস্তত করল। তারপর আঙুল তুলে বিছানার পাশে রাখা গিফটগুলোর দিকে ইশারা করে বলল,
“এগুলো যিনি দিয়েছেন, সেই কাজিন ভাইয়া আমাদের বাসায় আসতে চেয়েছেন।”
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে বলল,
“মানে?”
সঙ্গে সঙ্গে সূচনা বিরক্ত হয়ে উঠল।
“আরে ধুর! আপনি এতটুকু বুঝতে পারছেন না? আপনি কীভাবে প্রফেসর হয়েছেন বলুন তো!”
প্রণয় এবার বলল, “আচ্ছা, কি হয়েছে সেটা বল।”
“একটু আগে ফোন দিয়েছিল। যেহেতু আমার বিয়েতে আসতে পারেনি, তাই নিজেই বলল আমাদের বাসায় আসবে।”
“আর তুমি কী বলেছ?”
“আশ্চর্য! একজন মানুষ আসতে চাইলে তাকে কি মানা করা যায়? আমি অবশ্যই বলেছি, ভাইয়া তুমি এসো।”
প্রণয় মাথা নেড়ে বলল,
“বাহ! খুব ভালো করেছ। তাহলে আমাকে কেন বলছ?”
কথাটা শুনে সূচনার মুখটা গোমড়া হয়ে গেল।
“আপনি এমন আচরণ কেন করেন, আমি সত্যিই বুঝতে পারি না।”
সূচনার মন খারাপ হয়ে গেছে বুঝতে পেরে প্রণয়েরও খারাপ লাগল। হঠাৎই তার মনে পড়ল, রাতে তার বন্ধুদের আসার কথা। তাই সে বলল,
“ঠিক আছে, কোনো সমস্যা নেই। রাফি আসুক। তবে আমারও কয়েকজন বন্ধু আসবে। আর সেটাই আমার চিন্তার কারণ।”
কথাটা শুনে সূচনা আগ্রহ নিয়ে একটু সামনে এগিয়ে এলো। আর জিজ্ঞাসা করল,
“কী চিন্তা?”
“আমার বন্ধুরা আবদার করছে তারা তাদের ভাবীর হাতের রান্না খাবে। মানে, তারা তোমার হাতে রান্না খেতে চায়।”
সূচনা অবাক হয়ে বলল,
“হ্যাঁ তো! এতে চিন্তার কী আছে?”
“ওরা তিন-চারজন আসবে। তুমি ওদের জন্য রান্না করতে পারবে?”
“কেন পারব না? অবশ্যই পারব। ইউটিউব কি মরে গেছে?”
প্রণয় হেসে ফেলল।
“আমি চাই না তুমি ঝামেলায় পড়ো। তাছাড়া ভাবি আর আম্মু বাসায় নেই। থাকলে বলতাম তোমাকে সাহায্য করতে।”
“তাহলে আপনি কী করতে বলছেন?”
প্রণয় একটু এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বলল,
“আমি বলতে চাইছি, আমি তোমাকে সাহায্য করব। আমরা দুজনে মিলে রান্না করে নেব।”
কথাটা শুনে সূচনার মুখে মিষ্টি একটা হাসি ফুটে উঠল।
“আচ্ছা, ঠিক আছে।”
কিন্তু সূচনার মুখের হাসিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। তার আগেই প্রণয় গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
“কিন্তু রাফি তোমাকে কেন ফোন দিয়েছিল? আমি তো তোমাকে মানা করেছি তুমি ওর সঙ্গে কথা বলবে না।”
প্রণয়ের কণ্ঠে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।
সূচনা জিজ্ঞাস করল,
“কথা বললে কী হবে?”
“তোমার এত কিছু জানার দরকার নেই। আমি মানা করেছি, তার মানে তুমি ওর সঙ্গে কথা বলবে না। আর ও যদি বাড়িতেও আসে, তাহলে ওর থেকে দূরে থাকবে। আমি কিন্তু বলে দিলাম। কাজিন যেন কাজিনের মতোই থাকে।”
সূচনা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল।
“আশ্চর্য! কাজিনের মতোই তো আছে।”
কথাটা বলেই সূচনা রাফির দেওয়া উপহারগুলো সুন্দর করে তুলে রাখলো। কাজ শেষ হতেই আর দাঁড়াল না। ফ্রেশ হওয়ার জন্য ক্লোজেট থেকে পোশাক বের করে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে প্রণয় সূচনার ফোন থেকে রাফির নাম্বারটা ব্লক করে দিল। এই ছেলের আচরণ তার কাছে একদমই ভালো লাগছে না। আবার নাকি বাড়িতে আসবে। সূচনা ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুতেই প্রণয়ের কথাগুলো আবার কানে বাজতে লাগল। আর সেই সঙ্গে মনে পড়ে গেল কিছুক্ষণ আগের ঘটনাটা~
ঘরে ফিরেই ব্যাগটা নামিয়ে রেখেছিল সূচনা। ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল রাফির নাম। কয়েক সেকেন্ড ফোনের দিকে তাকিয়ে থেকে অবশেষে কল রিসিভ করল সূচনা।
কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো রাফির উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর,
“তুই কোথায়, সুজি?”
সূচনা হেসে বলল,
“কোথায় আবার থাকব? আমার শ্বশুরবাড়িতে আছি।”
“শ্বশুরবাড়ি” শব্দটা শুনেই রাফির বুকের ভেতর যেন কেউ অদৃশ্য ধারালো কিছু বসিয়ে দিল। অসহ্য এক যন্ত্রণা তাকে গ্রাস করল। পায়ের কাছে থাকা চেয়ারটায় সে এত জোরে লাথি মারল যে সেটা শব্দ করে উল্টে পড়ে গেল। শব্দটা শুনে সূচনা চমকে উঠল। আর জিজ্ঞাসা করল,
“কী হয়েছে ভাইয়া? ওটা কিসের আওয়াজ?”
রাফি গভীর একটা শ্বাস নিল। নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে বলল,
“কিছু না।”
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে আবার বলল,
“তুই আমাকে বল, তুই এখন যেখানে আছিস, সেই জায়গার এক্সাক্ট লোকেশনটা কোথায়?”
সূচনা স্বাভাবিকভাবেই বলল,
“ও… আমার শ্বশুরবাড়ির?”
এবার রাফির ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। বেশ জোরে চিৎকার করে বলল,
“আমি বুঝতে পারছি তোর বিয়ে হয়েছে, তুই শ্বশুরবাড়িতে আছিস! বারবার সেটা বলতে হবে না।”
হঠাৎ এমন ধমক খেয়ে সূচনা চুপ করে গেল।
মুহূর্তের মধ্যেই রাফি নিজের ভুল বুঝতে পারল। তারপর কণ্ঠস্বর নরম হয়ে এলো।
“সরি, সুজি। আসলে… আমি তো তোর বিয়েতে আসতে পারিনি। তাই ভাবছিলাম তোকে দেখে আসি তুই কোথায় থাকিস।”
কথাগুলো বলার সময় রাফির ভীষণ কষ্ট হলো।
সূচনা ভাবতে শুরু করলো। একজন এতটা আন্তরিকভাবে দেখতে আসতে চাইছে, তাকে তো আর না বলা যায় না। তাই মৃদু হেসে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে ভাইয়া। আমি তোমাকে লোকেশন টা বলছি।”
সূচনা রাফির সাথে কথা শেষ করে ফোনটা নামিয়ে রাখতেই দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকেছিল প্রণয়।
তারপর সূচনা ওয়াশরুম থেকে বের হতেই প্রণয়ের দৃষ্টি গিয়ে আটকে রইল তার ওপর। মেরুন রঙের একটি গোল জামা পরে ছিল সে। ব্যক্তিগতভাবে এই রঙটা কখনোই প্রণয়ের পছন্দের তালিকায় ছিল না, কিন্তু আজ সূচনার গায়ে এই রঙটাকেই অসাধারণ লাগছিল। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সূচনার দিকে। সূচনা তাড়াহুড়ো করে প্রনয়ের কাছে এসে বলল,
“অনেক দেরি হয়ে গেছে। সবকিছুর প্রস্তুতি নিতে হবে। আমি ভাবছি আজ আমরা বিরিয়ানি রান্না করব।”
প্রণয় কোনো উত্তর দিল না। তাকে চুপচাপ নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সূচনার ভ্রু কুঁচকে গেল। দু’হাত বুকের কাছে গুটিয়ে সে বলল,
“কিছু বলছেন না কেন? এভাবে কী দেখছেন?”
প্রণয় মৃদু হেসে নিচু স্বরে বলল,
“তোমাকে দেখছি।”
উত্তরটা শুনে সূচনার ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি ফুটে উঠল। কপালের ওপর পড়ে থাকা চুলগুলো কানের পাশে সরিয়ে দিয়ে সে বলল,
“আমাকে পরে দেখবেন। আগে অতিথিরা আসবে, তাদের জন্য রান্নার প্রস্তুতি নিতে হবে।”
কথা শেষ করেই সে চলে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু হঠাৎই প্রণয় পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরল। অপ্রস্তুত হয়ে সূচনা থমকে গেল। প্রণয় তার ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে নরম কণ্ঠে বলল,
“জানো, এই মেরুন রঙটা আমার একদমই পছন্দ নয়।”
কথাটা শুনে সূচনার মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। তাহলে কি তাকে এই পোশাকে ভালো লাগছে না?
ঠিক তখনই আবার প্রণয়ের কণ্ঠ ভেসে এলো,
“কিন্তু তোমাকে এই রঙে দেখার পর মনে হচ্ছে, এটা এখন আমার সবচেয়ে প্রিয় রঙ হয়ে গেছে।”
মুহূর্তেই সূচনার মুখে হাসি ফিরে এলো। প্রণয় তাকে ছেড়ে দিতেই সে ঘুরে দাঁড়াল। আর ঘুরতেই প্রণয় আলতো করে তার গালে চুমু দিয়ে বলল,
“তুমি নিচে যাও, আমি একটু পরেই আসছি।”
লজ্জায় রাঙা মুখে আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না সূচনা। দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।
সূচনা চলে যেতেই প্রণয় আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খুলে রাফির দেওয়া উপহারগুলো একে একে হাতে তুলে নিল। তারপর সেগুলো নিয়ে সোজা স্টোররুমের দিকে চলে গেল। সেখানে সবকিছু রেখে বেরিয়ে আসতেই সামনে পড়ল ঋতু।
ঋতু প্রণয়কে স্টোররুম থেকে বের হতে দেখে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়া, তুমি এখানে কী করছিলে?”
প্রণয় স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
“ওই, আর কী! কিছু জিনিসপত্র রাখতে এসেছিলাম। তা মা আর ভাবি কবে বাসায় ফিরবে? আর আঙ্কেল এখন কেমন আছেন?”
ঋতু মৃদু হাসল আর বলল,
“আম্মু আর ভাবি কাল সকালেই চলে আসবে। আর বড় ভাইয়া হয়তো কাজের চাপে একটু দেরিতে আসবে। আঙ্কেলও এখন অনেকটাই ভালো আছেন। আসলে হঠাৎ করেই তাঁর প্রেসার ফল করেছিল। ভাবি বিষয়টা নিয়ে বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিল।”
প্রণয় কিছুক্ষণ নীরব থেকে গম্ভীর স্বরে বলল,
“ভয় পাওয়ারই কথা। পৃথিবীর কোনো সন্তানই তো নিজের মা-বাবাকে হারানোর কথা ভাবতে পারে না। তাদের সামান্য অসুস্থতাও সন্তানের মনে অজানা আতঙ্কের জন্ম দেয়।”
প্রণয় রান্নাঘরে গিয়ে দেখল, সূচনা ইতোমধ্যেই রান্নার সমস্ত প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। গরুর মাংস ধুয়ে মশলা মাখিয়ে রাখা হয়েছে, আর সে এখন ব্যস্ত বিভিন্ন মশলা আলাদা করতে আর চাউল গুলো গুছিয়ে রাখতে। প্রণয় একটি টমেটো হাতে নিয়ে কাটতে শুরু করতেই সূচনা দ্রুত এগিয়ে এসে তার হাত থেকে টমেটোটা নিয়ে নিল। মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আমি যখন বাসায় গিয়েছিলাম, আম্মু আমাকে বিশেষভাবে বলে দিয়েছে যেন নিজের জামাইকে মজার মজার রান্না করে খাওয়াই। আর রান্নার অনেক পদ্ধতি ও বলে দিয়েছে। তার সাথে শিখিয়ে
দিয়েছে। আর এখানে দেখছি উল্টো আপনিই আমাকে সাহায্য করছেন! দেখুন, আমি যেহেতু মেয়ে, সেহেতু আমি মাল্টি-ট্যালেন্টেড। এসব রান্নাবান্না আমার জন্য তেমন কঠিন কিছু না। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে রেসিপিও দেখেছি। আশা করি রান্নাটা ভালোই হবে। তবে আপনি সাহায্য করলে অবশ্য আমার আপত্তি নেই।”
প্রণয়ের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
“আচ্ছা, যদি সাহায্য করি, তাহলে আমি কী পারিশ্রমিক পাব, ওয়াইফি?”
কথাটা শুনে সূচনা মিটিমিটি হেসে আঙুল তুলে প্রণয় কে ডানদিকে তাকাতে ইশারা করল। প্রণয় অবাক হলেও তার কথামতো ঘুরে তাকাল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই সূচনা দ্রুত এগিয়ে এসে তার গালে টুক করে একটি চুমু খেয়ে আবার আগের জায়গায় সরে গেল। ঘটনাটা এতটাই আকস্মিক ছিল যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য প্রণয় স্থির হয়ে গেল। শরীরের ভেতর অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে গেল তার। কিন্তু সেই মুহূর্তের আবেশ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দে দুজনেই চমকে দরজার দিকে তাকাল। দেখল, দরজার কাছে কাঠের পুতুলের মতো নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুপ্তি। তার হাত থেকে পানির বোতল মেঝেতে পড়ে গেছে। সম্ভবত পানি নিতে এসেছিল। কিন্তু সামনে দেখা দৃশ্যটি তাকে মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ করে দিয়েছে।
পরক্ষণেই সুপ্তি কোনো কথা না বলে দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল। বোতলটা মেঝেতেই পড়ে রইল।
আর এদিকে সূচনার অবস্থা লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার মতো। মুখমণ্ডল রক্তিম হয়ে উঠেছে। লজ্জায় টমেটোর মতো লাল হয়ে সূচনা দুহাতে নিজের গাল চেপে ধরে বলল,
“আল্লাহ! আমি এবার সুপ্তি আপুর মুখোমুখি হব কীভাবে?”
প্রণয় নির্বিকার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“যে মুখ নিয়ে এতক্ষণ ছিলে, সেই মুখ নিয়েই হবে। নতুন মুখ তো আর বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না!”
সূচনা চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই প্রণয় আবার বলল,
“আরে, এত লজ্জা পাওয়ার কী আছে? তুমি তো আমার প্রাপ্য পারিশ্রমিকই দিয়েছ!”
প্রণয়ের কথা শুনে সূচনার মুখ আরও লাল হয়ে গেল। সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“আপনি একদম অসভ্য! চুপ করুন তো! আপনার জন্যই এসব হয়েছে!”
প্রণয় সঙ্গে সঙ্গে বুকের ওপর হাত রেখে আহত হওয়ার ভান করে বলল,
“বাহ! চুমু খেলে তুমি, অথচ শেষে অসভ্য উপাধিটা আমার কপালেই জুটল! পৃথিবীতে স্বামীদের প্রতি এমন অবিচার আর কতদিন চলবে বলো তো?”
সূচনা রাগী চোখে তাকাতেই পরিস্থিতির অস্বস্তি কাটাতে প্রণয় হালকা গলাখাঁকারি দিয়ে বলল,
“সূচনা, চলো তাড়াতাড়ি রান্নাটা শেষ করি। তারপর তোমাকে পড়তেও বসতে হবে।”
পড়াশোনার কথা শুনতেই সূচনা মুহূর্তের মধ্যে আগের চেনা রূপে ফিরে এল। ভ্রু কুঁচকে প্রতিবাদ করল,
“দেখছেন! আমি এখানে এত মন দিয়ে রান্না করছি আর আপনার মাথায় শুধু পড়াশোনা!”
প্রণয় নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
“রান্না করা হবে, ঘর-সংসারও করা হবে। কিন্তু পড়াশোনা বন্ধ করা যাবে না।”
কথাটা বলে সে আবার কাজে মন দিল। অন্যদিকে রান্নাঘরের দেয়ালের আড়াল থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সব শুনছিল সুপ্তি। তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ভীষণ ভারী হয়ে উঠল। সারা জীবন সে সব পুরুষকেই নিজের বাবার মতো ভেবেছে। কখনো কাউকে নিয়ে আলাদা করে ভাবেনি। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা হয়তো সে নিজেই করেছে। যদি একবার… মাত্র একবার সাহস করে নিজের মনের কথাগুলো প্রণয়কে জানাত! যদি নিজের অনুভূতিগুলোকে এতদিন বুকের ভেতর চাপা না রাখত! তাহলে হয়তো আজ দৃশ্যটা অন্যরকম হতে পারত।
হয়তো সূচনার জায়গায় আজ সে দাঁড়িয়ে থাকত।
হয়তো এই হাসি-খুশি সংসারটা তার হতো।
হয়তো প্রণয়ের মতো একজন যত্নশীল, শিক্ষিত এবং দায়িত্ববান পুরুষের পাশে থেকে নিজের স্বপ্নগুলোও পূরণ করতে পারত। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছিল একটি বিষয় ভেবে। সে সবসময় ভেবেছিল, বিয়ে মানেই মেয়েদের স্বপ্নের সমাপ্তি। বিয়ে হলে হয়তো আর পড়াশোনা করা হবে না, নিজের পরিচয় গড়ে তোলাও সম্ভব হবে না।
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২০
এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটাই হয়। কয়টা পুরুষই বা নিজের বিয়ে করা বউকে পড়াশোনা করাতে চাই? কিন্তু একটু আগেই সে নিজের কানে শুনেছে প্রণয় রান্নার মাঝেও সূচনাকে পড়াশোনার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সেই মুহূর্তে সুপ্তির মনে হলো, সে হয়তো প্রণয়কে কখনো ঠিকমতো বুঝতেই পারেনি। চোখ দুটো জলে ঝাপসা হয়ে এলো। সুপ্তি দ্রুততম পায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
