প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২৫
insia isha chowdhury
রাফি হতাশ ভঙ্গিতে বাড়ির সামনে গাড়ি থামিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। গায়ে থাকা কোটটা অনেক আগেই খুলে ফেলেছে। উশখুশ চুলগুলো বাতাসে আরও এলোমেলো হয়ে উঠেছে।
ভীষণ ক্লান্ত শরীর নিয়ে গাড়ির দরজায় হেলান দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল রাফি। আজ অমাবস্যা। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঠিক তেমনি তার মনটাও অন্ধকারে ঢেকে গেছে। রাফির অনুভূতিগুলো আজ ভীষণ কষ্টদায়ক। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার এতটা কষ্ট পাওয়ার পরও তার চোখ থেকে একফোঁটা পানিও ঝরছে না।
অবশ্য এরও একটা কারণ ছিল—অ্যালেক্সিথাইমিয়া। ছোটবেলা থেকেই রাফি নিজের অনুভূতিগুলো ঠিকমতো বুঝতে বা ভাষায় প্রকাশ করতে পারত না। খুব বেশি কাঁদত না, আবার আনন্দ পেলেও তা প্রকাশ করত না। মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে পারত না; বেশিরভাগ সময় নিজের মধ্যেই গুটিয়ে থাকত। মা-বাবা তাকে সবসময় আগলে রেখেছেন, তার চাওয়া-পাওয়া পূরণ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু রাফি নিজের ইচ্ছার কথাও খুব কমই মুখ ফুটে বলত। পড়াশোনায় অবশ্য সে ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ মেধাবী ছিল।
তারপর জন্ম হলো ছোট্ট সূচনার। প্রথম দিকে রাফি ভয়ে ভয়ে কখনোই সূচনার খুব কাছে যেত না। দূর থেকে দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে থাকত। কিন্তু যখন সূচনা হামাগুড়ি দিতে শিখল, তখন একদিন রাফি আর হৃদয় একসঙ্গে খেলছিল। পাশে মেঝেতে বসে থাকা ছোট্ট সূচনাও ওদের দেখে হামাগুড়ি দিয়ে কাছে চলে এলো। সেদিনই প্রথমবারের মতো রাফি আলতো করে সূচনার গালে হাত রেখেছিল। আর সূচনার সেই নিষ্পাপ হাসি দেখে রাফিও প্রাণ খুলে হেসেছিল। তখন থেকে রাফি একটু স্বাভাবিক আচরণ করতো।
যখন রাফির বয়স ষোলো, তখন সে কানাডায় চলে যায়। সেখানেও সবার চেয়ে বেশি মিস করত সূচনাকেই। এরপর পড়াশোনার একপর্যায়ে, বাইশ বছর বয়সে ছুটি পেয়ে দেশে ফিরেছিল। সূচনার জন্য কত চকলেট নিয়ে এসেছিল রাফি!
এই তো সেদিনের কথা মনে হচ্ছে। ভরা বিকেল। তখন সূচনার বয়স বারো। কী সুন্দর মিষ্টি করে হেসে চকলেট খেতে খেতে বলেছিল, “ভাইয়া, আমি বড় হয়ে তোমাকেই বিয়ে করব।”
কিন্তু সে কি নিজের কথা রেখেছে? না। বরং রাফিকে ভুলে গিয়ে অন্য একজনকে বিয়ে করে নিয়েছে। তখন সূচনা ছোট ছিল, বুঝত না এ কথা রাফি নিজেকেই হাজারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছে। তবুও, যদি তার মা একবারও তার অনুভূতির মূল্য দিত, যদি একবারও তার ভালোবাসাটুকু বুঝত, তাহলে হয়তো আজ সূচনা তারই হতো।
তবু আশ্চর্যের বিষয়, বুকভরা এই অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়েও রাফির চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রুও ঝরল না। বুকটা কষ্টে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে, অথচ তার চোয়াল শক্ত, মুখটা পাথরের মতো নিরাবেগ।
সূচনা টেবিলে বসে প্রণয়ের বানিয়ে দেওয়া পড়ার রুটিনটা মনোযোগ দিয়ে দেখছিল। পরীক্ষার তারিখ অনুযায়ী এমন সুন্দরভাবে সিলেবাস ভাগ করে দিয়েছে প্রণয় যে, পরীক্ষার বেশ কয়েক দিন আগেই পুরো সিলেবাস শেষ হয়ে যাবে। এখন থেকে প্রতিদিন কতক্ষণ পড়তে হবে, কোন বিষয় কতটা সময় দিতে হবে সবকিছুই নিখুঁতভাবে সাজিয়ে দিয়েছে প্রণয়। কাল আবার কলেজও আছে। তাই রুটিনটা আরও মন দিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল সূচনা।
এমন সময় ঘরের দরজা খুলে প্রণয় ভেতরে প্রবেশ করল। সূচনা কিছু বলতে যাবে, তার আগেই প্রণয় কোনো কথা না শুনে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল। অনেকক্ষণ আগেই বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়েছিল। এইমাত্র বাড়ি ফিরেছে। সূচনা মনে মনে ভেবে নিল, হয়তো রাফির আজকের কর্মকাণ্ডের কারণে প্রণয় তার ওপর রাগ করে আছে। কেননা প্রণয় বন্ধুদের সাথে বের হওয়ার আগেও কিছুটা সূচনা কে ইগনোর করে গেছে। অবশ্য এতে অবাক হওয়ারও কিছু নেই। যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে রেগে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সূচনা নিজের নোট খাতাগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে রাখল। তারপর নীরবে বসে প্রণয়ের ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসার অপেক্ষা করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর প্রণয় ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসতেই সূচনা বিছানায় বসে পা নাড়িয়ে বলল,
“আপনাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে আপনি অনেক রেগে আছেন!”
প্রণয় তাৎক্ষণিক সূচনার দিকে তাকালো। সূচনা
প্রনয়ের তাকানো দেখে মিন মিন করে বলল,
“আপনি কি ভাইয়ার জন্য এখনো আমার উপর রেগে আছেন?”
কথাটা শুনে বিদ্যুৎ বেগে প্রণয় সূচনার পাশে বসে পড়ে সূচনার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“হ্যাঁ আমি রেগে আছি। আর আমি রেগে থাকলে তুমি আমাকে চুমু দিবে। আর তুমি রাগ করবে আমি তোমাকে কামড় দেবো।”
কথাটা বলেই প্রণয় সূচনার কাঁধে হালকা করে কামড় দিল। সূচনা হালকা ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো আর রাগী কণ্ঠে বললো,
“এসব কি ধরনের অসভ্য মার্কা কথা! আর কি ধরনের ব্যবহার? আমি রাগ করলে আপনি আমাকে কামড় দেবেন কেন? আর সব থেকে বড় কথা আমি কি এখন রাগ করেছি? যে আপনি এমন করলেন? আমি কত ব্যথা পেলাম।”
প্রণয় সটান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। আর সূচনার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমিও তো ব্যথা পেয়েছি।”
প্রণয় কথাটা বলার সাথে সাথেই সুচনা প্রনয়ের দিকে এগিয়ে এসে বসে প্রণয়ের দিকে ঝুকে গিয়ে প্রণয়ের বুকে হাত রেখে বলল,
“কোথায় ব্যথা পেয়েছেন আপনি?”
প্রণয় এবার দুহাত দিয়ে সূচনাকে ঝাপটে ধরে নিল। সূচনার মাথাটা প্রণয়ের বুকের কাছে গিয়ে ঠেকলো। এতে অবশ্য সূচনা কিছুটা হকচকিয়ে গেল। প্রণয়ের হৃদস্পন্দন নিজের কানেও শুনতে পেল। আশ্চর্য লোকটা এত অস্থির হয়ে আছে কেন? তখনই প্রণয় কিছুটা অভিমানী গলায় বলল,
“তোমার মাথা এখন যেখানে আমি সেখানে ব্যথা পেয়েছি?”
সূচনা প্রণয়ের বুক থেকে মাথা উঠাতে চেয়েছিল কিন্তু প্রণয় তাকে উঠতে দিল না। তাই সূচনা ওভাবেই জিজ্ঞাসা করল, “মানে কি হয়েছে?”
প্রনয় বলল,
“তুমি আর রাফির সাথে কথা বলবে না।”
প্রণয়ের এমন কথাতে সূচনা অবাক হয়ে বলল,
“মানে আপনি কি বলতে চাইছেন?”
এবার প্রণয় সূচনাকে বুক থেকে উঠিয়ে নিজে উঠে বসে সূচনাকে তার কোলের উপর বসিয়ে নিল আর বলল,
“যতবার ও তোমাকে সুজি বলে ডাকে আমার মনে হয় ওকে আমি মেরে ভর্তা বানিয়ে দি।”
সূচনা অবাক কণ্ঠে বললো,
“এসব কি বলছেন? উনি আমার কাজিন হয়। সে যদি কথা বলতে আসে দেখা করতে আসে আমি তাহলে তাকে কিভাবে মানা করবো? আর ভাইয়া অনেক ছোট থেকে আমাকে সুজি বলে ডাকত এই কারণে আপনি কেন ভাইয়াকে মারতে চাইবেন?”
প্রণয় সূচনার কাঁধে মুখ গুঁজে বলল,
“কারণ তুমি আমার কষ্টটা বুঝতে পারছ না যদি বুঝতে তাহলে এই কথা জিজ্ঞাসা করতে না। আমি যা বলেছি শুধু তাই করো।”
সূচনা এবার প্রনয়ের দিকে ঘুরে বলল,
“কি যাতা ছোট মানুষের মতো কথা বলছেন?
আমি আপনাকে কিভাবে কষ্ট দিচ্ছি? মানে এগুলো আমি কিছুই বুঝতে পারছি না! রাফি আমার ভাই হয়। আপনি এসব কি বলছেন?”
“আমি এইসব বলছি তার কারণ হলো রাফির মনে তোমার জন্য ফিলিংস আছে। এমনি এমনি বলছি না। আর তুমি যদি বল আমি জেলাস ফিল করছি তাহলে এটা সত্য আমি জেলাস। কারণ আমার কোন কথা ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে ভালো লাগে না।যা বলব স্ট্রেট ফরওয়ার্ড।
প্রণয়ের কথা শেষ হতেই সূচনা হেসে ফেলল আর হাসতে হাসতে বলল,
“আপনিও পারেন যত সব উল্টাপাল্টা কথা। আমার তো ঠিকমতো মনেই নেই আমি রাফি ভাইয়ের সাথে ঠিকভাবে কবে কথা বলেছি। আর বিশেষ করে আপনি যে কথাটা বলেছেন এই কথাটা যদি আমার মামি শুনতো তাহলে আপনাকে একদম মেরে ফেলত।”
“সূচনা আমি মজা করছি না। আমি সত্যি কথা বলছি। আর এই কথা শুনলে তোমার মামি আমাকে মেরে ফেলবে! মানে?”
সূচনা এখনো হেসে যাচ্ছে ও হাসতে হাসতে বলল,
“কারণ রাফি ভাইয়ের সাথে আমার মেলামেশা আমার মামি মানে রাফি ভাইয়ের মা ঠিকমতো পছন্দ করেনা। আর যেখানে মা পছন্দ করেনা সেখানে তার ছেলে কিভাবে পছন্দ করবে?”
“মানে?”
প্রনয়ের কথায় সূচনা এবার প্রণয়ের কোলে মাথা দিয়ে বলল,
“মানে আমি ছোট হলেও সব কিছু বুঝতে পারতাম। যেমন মামি আমার আর রাফি ভাইয়ার খেলাধুলা একসাথে তেমন একটা পছন্দ করতেন না এটা অবশ্য আমি বড় হওয়ার পর আরো ভালোমতো বুঝতে পেরেছি। তাই আমার হাসি পাচ্ছে আপনার কথা শুনে। আপনি বলছেন ভাইয়ার মনে আমার জন্য ফিলিংস আছে। মানে এটা কিভাবে সম্ভব?”
প্রণয় কিছু বলবে তার আগে সূচনা প্রনয়ের কোল থেকে মাথা উঠিয়ে নিজের কোলে একটা বালিশ রেখে বলল,
“এইসব কথা বাদ দিন আগে বলুন আপনি কিভাবে জানেন যে আমার জুলিয়েট রোজ পছন্দ?”
প্রণয় গম্ভীর গলায় বলল,
“বলবো না।”
সূচনা বলল,
“কেন বলবেন না আপনাকে বলতেই হবে যেখানে আমি আজ পর্যন্ত কখনো কাউকে বলিনি যে আমার জুলিয়েট রোজ পছন্দ। এমন কি আমার
মা-বাবা কেউ না তাহলে আপনি কিভাবে জানলেন যে আমার জুলিয়েট রোজ পছন্দ? আর আপনাকে এখনই বলতে হবে এই মুহূর্তে বলতে হবে আপনি কিভাবে জানেন যে আমার জুলিয়েট রোজ পছন্দ?”
প্রণয় কিছু বলছে না দেখে সূচনা ইনোসেন্ট মুখ করে বলল,
“প্লিজ প্লিজ প্লিজ বলুন না আপনি কিভাবে জানেন? আমার রাতে একদমই ঘুম হবে না যদি আপনি না বলেন।”
সূচনাকে এতবার জিজ্ঞাসা করতে দেখে অবশেষে প্রণয় বলল,
“তোমার ড্রয়িং খাতায় দেখেছিলাম বেশ অনেকবার তুমি জুলিয়েট রোজ এঁকেছ। এজন্য
আমি বুঝেছিলাম ওটা তোমার পছন্দ তুমি ওখানে মাই ফেভারিটও লিখে রেখেছিলে।”
“ও আচ্ছা আচ্ছা।”
“আচ্ছা তুমি ছোটবেলায় কেন রাফির কোলে উঠেছিলে?”
সূচনা অসহ্যকর কন্ঠে বলল,
“আশ্চর্য আপনি এখনো এইসব নিয়ে পড়ে আছেন।”
প্রণয় মহাছন্ন হয়ে সূচনার কপালে থাকা চুলগুলো কানের পিছে গুজে দিয়ে আস্তে করে বললো,
“আমি এসব বিষয় নিয়ে পড়ে থাকবো না তো কে পড়ে থাকবে বলো?”
কথাটা বলেই প্রণয় নিজের নাক দ্বারা সূচনার নাকে টোকা দিল। সূচনা এবার হামি তুলে বলল,
“আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে আজকে আমি অনেক কাজ করেছি। কালকে আবার কলেজেও আছে। এখন আমি ঘুমাবো।”
কথাটা বলে সূচনা বালিশে মাথা দিতেই প্রণয় তাকে ঘুমোতে দিল না বরং দুহাত দ্বারা ধরে রাখলো। সূচনা বললো, “প্লিজ এখন আমাকে ঘুমাতে দিন।”
প্রণয় সূচনার মাথার কাছের বালিশটা ফেলে দিল। সাথে কোল বালিশটাও ফেলে দিল। সূচনা চোখ বড় বড় করে প্রণয়ের কান্ড কারখানা দেখল। পরের মুহূর্তেই প্রণয় লাইট অফ করে দিয়ে ডিম লাইট দিয়ে দিল। তারপর সূচনাকে নিজের বুকে নিয়ে বলল,
“কি বলেছিলাম আমি যে এই বিছানায় শুধু একটি বালিশ থাকবে যে বালিশে শুধু আমি মাথা রাখবো আর তুমি আমার বুকে মাথা রাখবে তোমার জন্য কোন বালিশ থাকবে না।”
প্রণয়ের এমন কথাই সূচনা মুচকি হেসে প্রনয়ের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। গভীর রাত হতেই প্রণয় আলতো করে সূচনাকে নিজের বুক থেকে নামিয়ে বালিশে শুইয়ে দিল। তারপর নিঃশব্দে দরজা খুলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সোজা চলে গেল স্টোররুমে। রাফির সূচনাকে দেওয়া ফুলগুলোর মাঝখানে একটি ছোট্ট চিরকুট ছিল।
যেগুলো রাফি সূচনাকে বাড়িতে দিয়েছিল উপহার হিসেবে। সেই ফুলগুলোর মধ্যে একটি চিঠি আছে।
সেটি আগেই প্রণয়ের চোখে পড়েছিল, তবে তখন কেবল অল্প কিছু অংশ পড়তে পেরেছিল। এবার চিরকুটটি হাতে নিয়ে সম্পূর্ণটা পড়তে শুরু করল–
হ্যালো সুজি,
কেমন আছিস তুই?
জানিস, আমি তোকে ভীষণ মিস করি। সব সময়ই তোর কথাই মনে পড়ে। তুই এখন অনেক বড় হয়ে গেছিস। আগের সেই ছোট্ট সুজি আর নেই।
কেউ না জানলেও তুই তো জানিস, আমি নিজের মনের কথা ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারি না। সব সময় কেমন যেন সংকোচ বোধ হয়। তাই আজ অনেক সাহস করে তোকে একটা কথা বলতে চাই।
আমি তোকে ভালোবাসি। শুধু ভালোবাসি না, আমি তোকে বিয়েও করতে চাই।
আমি জানি, এসব শুনে তুই হয়তো খুব অপ্রস্তুত হয়ে গেছিস। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমার মনে তোর জন্য এই অনুভূতিটা আজকের নয়। আজ প্রায় ছয় বছর ধরে আমি তোকে নিঃশব্দে ভালোবেসে আসছি। সুজি, আমি তোকে খুব ভালোবাসব।
ইতি,
রাফি
চিরকুটটি পড়া শেষ করে প্রণয় সেটি মুঠোর ভেতর শক্ত করে চেপে ধরল। ধীরে চোখ বন্ধ করে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“সরি, রাফি… ইউ আর টু লেট। সূচনা এখন আমার স্ত্রী। আমার অর্ধাঙ্গিনী। তাই ওর ওপর সবচেয়ে বেশি অধিকার আজ আমারই। হয়তো তুমি ওকে সত্যিই ভালোবেসেছ। কিন্তু ভাগ্য ওকে আমার করে দিয়েছে। নসিব বলে একটা কথা আছে, তাই না? আমি জানি, তোমার উদ্দেশ্য কখনো খারাপ ছিল না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সূচনা এখন বিবাহিতা। ও আমার জান… আমি ওকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি। তোমার জন্য আমি আর কিছুই করতে পারব না। তবে একটা দোয়া অবশ্যই করতে পারি। আল্লাহ যেন তোমার জীবনেও এমন একজন মানুষ পাঠান, যে তোমাকে ঠিক তোমার মতো করেই ভালোবাসবে।”
রাফি নিঃশব্দে বাড়িতে ঢুকতেই থমকে দাঁড়াল। অবাক হয়ে দেখল, ড্রয়িংরুমে বাড়ির সবাই বসে আছে। তার মা-বাবা ছাড়াও উপস্থিত রয়েছেন আরও কয়েকজন আত্মীয়। রাফিকে দেখামাত্র নিলুফা খাতুন ছুটে এসে ছেলের সামনে দাঁড়ালেন। দু’হাত দিয়ে ওর মুখ ছুঁয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন,
“রাফি, কীভাবে নিজের মাকে এতটা কষ্ট দিতে পারলি? সারাদিন তোর কোনো খোঁজ ছিল না। বাড়ির সবাই দুশ্চিন্তায় পাগল হয়ে গেছে। কোথায় কোথায় যে তোকে খুঁজেছি, সেটা শুধু আমরাই জানি। এমনকি তোর মামাও সব কাজ ফেলে তোকে খুঁজে বেড়িয়েছে।”
রাফির বাবা শান্ত গলায় বললেন,
“নিলুফা, ছেলেটা তো সবে বাড়ি ফিরেছে। আগে ওকে একটু বসতে দাও। পরে সবকিছু জিজ্ঞেস করা যাবে।”
ঠিক তখনই রাফির মামা, সাবেক চেয়ারম্যান ফিরোজ সাহেব, এগিয়ে এসে বললেন,
“কী ব্যাপার, ভাতিজা? তুই তো পুরো বাড়ির মানুষগুলো কে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিস।”
রাফি কোনো উত্তর দিল না। নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এমন সময় ফিরোজ সাহেবের মেয়ে, টিনা রাফির মামাতো বোন ওর কাছে এসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
“রাফি, তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? তুমি কি অসুস্থ?”
এতগুলো প্রশ্নের জবাবে রাফি শুধু সংক্ষিপ্তভাবে বলল,
“আমি খুব ক্লান্ত। আপাতত বিশ্রাম নিতে চাই।”
ছেলের অস্বাভাবিক শান্ত স্বভাব দেখে নিলুফা খাতুন নরম গলায় বললেন,
“ঠিক আছে, সবার সঙ্গে পরে কথা হবে। তুই আগে নিজের ঘরে যা। আমি তোর জন্য খাবার নিয়ে আসছি। আজ তোকে নিজের হাতে খাইয়ে দেব।”
রাফি শক্ত কণ্ঠে বলল,
“তার কোনো প্রয়োজন নেই। এমনিতেই আপনি আমার জন্য যথেষ্ট করেছেন। আপাতত আমার থেকে একটু দূরত্ব বজায় রাখুন। এটাই আমার প্রতি আপনার সবচেয়ে বড় মেহেরবানি হবে।”
কথাগুলো বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না সে। সোজা সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
ছেলের এমন আচরণ দেখে নাজমুল সাহেবের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। কিন্তু কিছু না বলে তিনিও নীরবে সেখান থেকে চলে গেলেন।
রাফির এমন ব্যবহার দেখে টিনা ধীরে ধীরে বলল, “ফুপি… রাফি কি এখনো সূচনাকে ভুলতে পারেনি?”
সূচনার নাম শুনতেই নিলুফা খাতুনের মুখ বিরক্তিতে কঠিন হয়ে উঠল। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন,
“প্লিজ, টিনা। আমার সামনে ওই মেয়ের নাম আর কখনো নিও না। ওর নাম শুনলেই আমার বিরক্ত লাগে। কিছুদিন যেতে দাও, রাফি এমনিতেই সব ভুলে যাবে।”
টিনা হতাশ স্বরে বলল,
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২৪
“কিন্তু রাফি তো আমাকে একদমই পছন্দ করল না।”
নিলুফা খাতুন দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“অবশ্যই করবে। আর বিয়েও তোমাকেই করবে। এসব নিয়ে তোমার একদম ভাবতে হবে না। বাকি সব আমি সামলে নেব। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।”
