Home প্রণয়ের নব্য সূচনা প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩২

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩২

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩২
insia isha chowdhury

রাত এখন প্রায় এগারোটা। মধ্যরাতের খুব বেশি দেরি নেই। দীর্ঘ সময় ধরে ড্রয়িংরুমে বসে আছেন নিলুফা। শুধু ছেলের অপেক্ষায়। আজ পুরোটা দিনই রাফি বাড়িতে ছিল না। দিন দিন ছেলেটা কেমন যেন বেপরোয়া আর বাউণ্ডুলে হয়ে যাচ্ছে। নিলুফার চোখের সামনে রাফির জীবনটা ধীরে ধীরে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, অথচ কিছুতেই তাকে সামলাতে পারছেন না নিলুফা। বেশ কয়েকবার ফোনও করেছেন, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া আসেনি।
আজ নিজেকে ভীষণ অসহায় আর হতাশ লাগছে তার। তিনি তো ভেবেছিলেন, তার ছেলের জীবনটা সুন্দর করে গুছিয়ে দেবেন। অথচ বাস্তবতা তার সমস্ত চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। বরং তার ছেলে দিন দিন আরও বেশি বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছে। তবুও মনের ভেতরের দৃঢ়তা হারালেন না নিলুফা। নিজের মনেই স্থির করে বললেন,
“জীবনে একজন সঠিক মানুষের খুবই প্রয়োজন। যে আমার ছেলেকে সত্যিকারের সুখী রাখতে পারবে, তাকে আমি এই খান বাড়ির বউ হিসেবে মেনে নেব।”

নিজের ভাবনায় ডুবে ছিলেন তিনি। ঠিক তখনই বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল রাফি। রাফিকে দেখামাত্রই নিলুফা মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেল। ছেলের কপালে ব্যান্ডেজ, ঠোঁটের ক্ষত শুকিয়ে গেলেও সেখানে আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন। পুরো মুখটাই যেন বলে দিচ্ছে, তার ছেলেটা কতটা ভয়াবহ কিছুর মধ্য দিয়ে এসেছে। নিলুফার বুকটা ধক করে উঠল। নিশ্বাস আটকে ছেলের কাছে ছুটে গেলেন তিনি। অস্থির হাতে ছেলের মুখ স্পর্শ করে কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“এসব কী? কীভাবে হয়েছে? কে করেছে এসব?”
রাফি এক ঝটকায় মায়ের হাত নিজের মুখ থেকে সরিয়ে দিল। চোখেমুখে তীব্র বিরক্তি নিয়ে বলল,
“এই সবকিছু আপনার কৃতিত্বের ফল। জিজ্ঞেস করছেন কীভাবে হয়েছে? আপনি যা যা করেছেন, তার ফলেই আজ আমার এই অবস্থা!”
নিলুফার চোখেমুখে এবার ক্ষোভ ফুটে উঠল।

“মানে কী বলতে চাইছিস তুই? আমি কি কোনোদিন চাইব আমার ছেলের এমন অবস্থা হোক?”
রাফি এবার অদ্ভুতভাবে হেসে উঠল। সেই হাসিতে আনন্দের লেশমাত্র নেই, বরং জমে থাকা অভিমান আর যন্ত্রণার তীব্রতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।জোরে জোরে হাসতে হাসতেই বলল,
“আচ্ছা, আমার এই বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে আপনার কষ্ট হচ্ছে? কিন্তু আপনি যে আমার হৃদয়ে কষ্ট দিয়েছেন, সেটার জন্য যে আমি ভেতর থেকে পুরোপুরি ভেঙে চুরমার হয়ে গেছি, সেটা কি আপনার চোখে পড়ছে না? আমি ভেতর থেকে ধ্বংস হয়ে গেলেও যদি বাইরে থেকে ঠিকঠাক থাকি, তাহলেই তো আপনার কাছে সব ঠিক আছে, তাই না?”
কথাগুলো বলেই আবারও হেসে উঠল রাফি। নিলুফা ছেলের কথাগুলো যেন গায়েই মাখলেন না। বরং তার আঘাতের কথাই মাথায় নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,
“তোর এই অবস্থা কে করেছে? কে তোকে মেরেছে? ওকে আমি খু’ন করে ফেলব! কার এত বড় সাহস যে আমার ছেলের গায়ে হাত দেয়?”
রাফি এবার মায়ের সামনে সামান্য মাথা নুইয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।

“আপনি বেশ ভালো অভিনয় করতে পারেন। প্লিজ, যাত্রাপালায় অংশগ্রহণ করুন। নিজের জীবনে আরও ভালো কিছু করতে পারবেন। যদিও এই জীবনে ভালো কিছু করতে পারেননি, তবে অভিনয়ে আপনি সেরা। যাত্রাপালায় অন্তত কিছু একটা করতে পারবেন।”
কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে রাফি সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। নিলুফা আবারও ছেলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। কিছু বলার আগেই রাফি পাশের টেবিল থেকে ফুলদানিটা তুলে নিয়ে সজোরে মেঝেতে ছুড়ে ফেলল। ঝনঝন শব্দে ফুলদানিটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
রাফি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“খবরদার! আমার কাছে আসবেন না। আমার ওপর থেকে আপনি আপনার সমস্ত অধিকার হারিয়ে ফেলেছেন।”
কথাটা বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না রাফি। দ্রুত পায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
নিলুফা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ছেলের চলে যাওয়ার পথের দিকে। নিলুফার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই কেমন শূন্য হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তেই নিলুফার ফোনে কল এল তাঁর ভাই ফিরোজের। ফোনটি রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ফিরোজ জিজ্ঞেস করলেন, “রাফি কি বাড়িতে এসেছে?”
নিলুফা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

“হ্যাঁ, কিছুক্ষণ আগেই এসেছে। এখন নিজের ঘরে গেছে। আমি যে কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। ছেলেটাকে কীভাবে আবার ঠিক করব, সেটাই বুঝতে পারছি না।”
ফিরোজ সাহেব যেন তাঁর বোনের এই কথাটিরই অপেক্ষায় ছিলেন। শান্ত গলায় তাঁকে বোঝাতে শুরু করলেন,
“শোন, আমি তোকে একটা কথা বলি। রাফি এখন যে অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাতে ওর বিয়ে দিয়ে দেওয়াই উচিত। ঘরে বউ থাকলে মনটা সংসারে টিকবে, ধীরে ধীরে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।”
নিলুফা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,
“কিন্তু আমি তো চেয়েছিলাম, রাফি আর টিনা একে অপরের সঙ্গে আরও কিছুটা সময় কাটাক। নিজেদের ভালোভাবে বুঝুক, একে অপরকে জানুক। তারপর না হয় বিয়ে দিতাম।”
“শোন, এখন এত বোঝাপড়ার জন্য সময় নেই। তুই তো চাস, তোর ছেলে ভালো থাকুক তাই না?”
ফিরোজের কথায় নিলুফা চুপ করে রইলেন। সুযোগ বুঝে ফিরোজ আবার বললেন,
“আর একটা কথা মনে রাখিস, রাফি আর টিনার বিয়ের পর যদি ওদের সন্তান আসে, তাহলে দেখবি রাফি এমনিতেই অনেকটা বদলে যাবে। তোর কাজে রাফি কষ্ট পেয়েছে, সেটা ঠিক। কিন্তু ভবিষ্যতে যখন ও দেখবে, টিনার সঙ্গে ও ভালো আছে, সংসার করছে, তখন আর তোর ওপর আগের মতো রাগ করে থাকতে পারবে না।”
নিলুফার কণ্ঠে এবার দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
“কিন্তু রাফি তো এত সহজে টিনাকে বিয়ে করতে রাজি হবে না।”
ফিরোজ সাহেবের কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসের সুর,
“সেই পরিকল্পনাও আমার করা আছে। তুই শুধু আমার কথা অনুযায়ী কাজ করে যা। বাকিটা আমি সামলে নেব।”

নিস্তব্ধ রাত গভীর অন্ধকার সবকিছু আশেপাশে শান্ত হয়ে আছে। কোথাও কেউ নেই। প্রণয় বুঝতে পারলো অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। সে কখনো এতো দেরি করে না। কিন্তু নিজের অশান্ত মন কে
শান্ত করার প্রচেষ্টায় একলা বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু প্রণয় কি নিজের অশান্ত মন কে শান্ত করতে পেরেছে? তার উওর একদম না। বরং নিজেকে আরো অস্থির করে সে ফিরেছে। তবে রুমে প্রবেশ করেই প্রণয় হকচকিয়ে গেল। ঘরে সূচনা নেই। এত রাতে মেয়েটা কোথায় গেল? প্রণয় বাথরুম চেক করলো তারপর করিডর এসে দেখলো কোথায় নেই। মূহুর্তেই প্রণয় অস্থির হয়ে পড়ল। তারপর সোজা ঋতুর ঘরে চলে গেল প্রণয়। ঋতু কে ডাকতেই মূহুর্তেই ঋতু দরজা খুলে দিল। ঋতু কে দেখেই প্রণয় একনাগাড়ে অস্থির হয়ে বলতে শুরু করল,
“তোর ভাবি কোথায়? ওকে আমি কোথাও পেলাম না। ও কি তোর রূমে আছে? সূচনা।”
কথাটা বলেই প্রণয় রুমে প্রবেশ করল। কিন্তু রুমে আছে সুপ্তি। ঠিক তখনি পেছন থেকে ঋতু বলল,
“ভাইয়া তুমি কোথায় ছিলে?”
প্রণয় একরোখা হয়ে ঋতু কে বলল,
“আমি যেখানেই থাকি। তোর ভাবি কোথায়?”
তারপর ঋতু বলতে শুরু করলো,

“আসলে ভাইয়া সূচনার বাবা মানে আঙ্কেল উনি একটু অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। হৃদয় ভাইয়া ফোন দেওয়ার পর ভাবি অনেক চিন্তিত হয়ে পড়েছিল এবং কান্নাকাটি করছিল। তারপর আমি আর সুপ্তি বাসায় ছিলাম বড় ভাইয়া আর মা ভাবিকে নিয়ে ও বাড়িতে গিয়েছে। আঙ্কেল এখন সুস্থ আছেন। ভাইয়া আর মা বাড়িতে এসেছে কিন্তু ভাবি ওই বাড়িতে আছে। তুমি তো বাড়িতে ছিলে না সবাই তোমাকে অনেকবার ফোনও দিয়েছে কিন্তু তুমি তো ফোন রিসিভ করো নি।”
প্রণয় চোখ বন্ধ করে বিরক্তিকর এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“রিসিভ করব কিভাবে? ফোনটা বাড়িতে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলাম।”
সুপ্তি প্র্যাকটিক্যাল খাতাগুলো পাশে রেখে প্রণয়কে বললো,
“এখন তো অনেক রাত হয়ে গেছে প্রণয় তোমার উচিত এখন খাবার খাওয়া। তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো আমি আর ঋতু তোমাকে খাবার সার্ভ করে দিচ্ছি।”
প্রণয় সুপ্তির কথার জবাব না দিয়ে বরং জিজ্ঞাসা করল,
“সূচনা কখন গিয়েছিল? ও কী খাবার খেয়েছে?”
ঋতু ঠোঁট উল্টে বলল,
“বোধহয় না। আমি আসলে সঠিক জানিনা।”
প্রণয় তাৎক্ষণিক বলল,

“আমি সিকদার বাড়িতে যাচ্ছি। ঋতু সকালে মাকে বলে দিস।”
আর কোন কথা না বলে প্রণয় নিজের রুমে গিয়ে ওর ফোনটা নিয়ে নিল পকেটে। আর বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। প্রণয়কে এমন ভাবে যেতে দেখে সুপ্তি ভীষণ বিরক্ত বোধ করল। এত রাতে যাওয়ার কী খুব প্রয়োজন? তাৎক্ষণিক ও ঋতু কে বলল,
“এত রাতে প্রণয়ের যাওয়া কী খুব প্রয়োজন?”
সুপ্তি কথায় ঋতু কিছুটা অবাক হয়ে শুধালো,
“এটা আবার কি ধরনের প্রশ্ন? অবশ্যই যাওয়া উচিত। আর তুই যে এই প্র্যাকটিকেলের চক্করে আমাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বি তা ঠিকই বুঝতে পারছি।”

ঋতুর কথায় সুপ্তি প্র্যাকটিক্যালের দিকে নজর দিল। যদিও এই প্র্যাকটিক্যাল জমা দেওয়ার বেশ খানিক সময় আছে তবুও এই প্র্যাকটিক্যাল কমপ্লিট করার জন্য সুপ্তি ঋতুর সাহায্য নিচ্ছে। কেননা সন্ধ্যার পর পরই ঋতু সুপ্তি কে জিজ্ঞাসা করেছিল, “যে কি হয়েছে? তুই কি বলতে চাস এখন আমাকে বল।”
তখন সোহেলের সাথে বিয়ের এই প্রস্তাব এই সকল ধরনের বিষয় থেকে ঋতুকে দূরে রাখার জন্য সুপ্তি ওকে মিথ্যা কথা বলেছে যে ওর প্র্যাকটিক্যাল কমপ্লিট করার জন্য ঋতুর সাহায্য প্রয়োজন।‌ আর ঋতু সেটা মেনে নিয়ে ওকে সাহায্য করছে।
সূচনা মেয়েটা রাত জাগলেও আজকের একের পর এক ঘটনার ধাক্কায় ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। রাফিকে এভাবে মার খেতে দেখে ওর ভীষণ কষ্ট হয়েছে। তার ওপর প্রণয়ও ওকে ভুল বুঝে রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। সব মিলিয়ে দিনটা সূচনার জন্য মানসিকভাবে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। ছোট্ট একটা বিষয়েও কেঁদে ফেললে সূচনার চোখ ফুলে যায়, গাল লাল হয়ে ওঠে, এমনকি ঠান্ডাও লেগে যায়। আর আজ তো একসঙ্গে এতগুলো ঘটনা ঘটে গেছে! এরপর হৃদয় ফোন করে যখন বলল, বাবা একটু অসুস্থ, তখন আর নিজের অনুভূতিগুলো সামলে রাখতে পারেনি সূচনা। বাড়ির সবার সামনেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিল।

তখন সবাই ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে, “এমন কিছু হয়নি যে এতটা ভেঙে পড়তে হবে। নিজেকে সামলাও।”
কিন্তু কেউ কি আর বুঝতে পারবে, একদিনে এতগুলো ধাক্কা সামলাতে না পেরে মেয়েটা ভেতর থেকে কতটা ভেঙে পড়েছে? কতটা অসহায় হয়ে জমে থাকা কষ্টগুলো চোখের জলে বের করে দিচ্ছে? ছোটবেলা থেকেই নাফিম সিকদার তাঁর মেয়েকে ভীষণ আদর-আহ্লাদে বড় করেছেন।
বাবার কাছে সূচনা যেন আজও সেই ছোট্ট মেয়েটাই। তাই বাড়িতে ফিরেই সূচনা ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদেছে। মেয়ের এমন অবস্থা দেখে নাফিম সিকদারও নিজেকে সামলাতে পারেননি। বরং হৃদয়ের ওপর ভীষণ রাগ হয়েছে তাঁর। তার অসুস্থতার কথা সূচনাকে বলার কি দরকার ছিল? কোনোরকমে কিছুক্ষণ আগে নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে সূচনা।
সারাদিনের ক্লান্তি আর মানসিক অস্থিরতা মিলিয়ে ঘুম যেন ওকে জোর করেই টেনে নিয়ে গেছে।
তবে রাতে কেউই সূচনাকে খাওয়াতে পারেনি। বারবার খাবার নিয়ে গিয়েও লাভ হয়নি। মেয়েটা কিছুতেই মুখে খাবার তোলেনি।
সূচনা নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করে ঘুমের শহরে পাড়ি দিয়েছিল। সারাদিনের ক্লান্তি নরম বিছানা আর বালিশে মাথা রাখতেই মুহূর্তের মধ্যে ওকে ঘুমের গভীর রাজ্যে টেনে নিয়েছিল। চারপাশের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে শান্তির ঘুমে ডুবে ছিল সূচনা। কিন্তু কেউ একজন যেন তার এই নিশ্চিন্ত ঘুমটুকুও সহ্য করতে পারল না!
হঠাৎ ঘুমের ঘোরে নিজের উদরের ওপর দুটো হাতের স্পর্শ আর ঘাড়ের কাছে উষ্ণ নিঃশ্বাসের অনুভূতি পেতেই সূচনা ভয়ে তটস্থ হয়ে উঠল। মুহূর্তেই ওর ঘুম উধাও। অন্ধকার ঘরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বুকের ভেতরটা ধকধক করতে শুরু করল। ভয়ে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কে?”

কোনো উত্তর না পেয়ে এবার একটু জোরে চিৎকার করে উঠল, “আম্মু!”
সঙ্গে সঙ্গে উদরের ওপর থেকে হাত সরিয়ে প্রণয় ওর মুখ চেপে ধরল। নিচু স্বরে বিরক্ত হয়ে বলল,
“ইডিয়েট! ইটস মি, ইওর হাজবেন্ড।”
পরিচিত কণ্ঠস্বর কানে যেতেই সূচনার ভয়টা ধীরে ধীরে কেটে গেল। সামনে থাকা মানুষটা প্রণয় বুঝতে পেরেই বুকের ওপর চেপে থাকা ভয়টাও কিছুটা হালকা হলো সূচনার। তবু প্রণয়ের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত বিছানার পাশে থাকা লাইটটা জ্বালিয়ে দিল। মুহূর্তেই ঘরের অন্ধকার সরে গিয়ে চারপাশ আলোয় ভরে উঠল।
সূচনা বিছানার পাশে পড়ে থাকা ওড়নাটা তুলে নিয়ে সুন্দর করে নিজের শরীরের ওপর জড়িয়ে নিল। তারপর দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখল, রাত প্রায় একটা বাজে। কিছুটা অবাক হয়েই ও জিজ্ঞেস করল,
“আপনি এত রাতে?”
প্রণয় কোনো উত্তর না দিয়ে সটান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“বউ যদি রাগ করে বাপের বাড়ি চলে আসে, তাহলে যত রাতই হোক, শ্বশুরবাড়িতে তো আসতেই হবে।”
সূচনা সঙ্গে সঙ্গে বুকে দুহাত জড়িয়ে দাঁড়াল। কণ্ঠে অভিমান স্পষ্ট।
“প্রথমত, আমি রাগ করে বাপের বাড়িতে আসিনি। আর দ্বিতীয়ত, আমার রাগ করায় আপনার আদৌ কোনো কিছু যায় আসে?”

সূচনার কথাগুলোর মধ্যে এমন গভীর অভিমান ছিল, যা প্রণয়কে আর স্বাভাবিক থাকতে দিল না।
সে দ্রুত উঠে বসে সূচনার দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। তারপর অত্যন্ত কোমলভাবে ওর কপালে এবং গালে চুমু এঁকে নিচু স্বরে বলল,
“অবশ্যই যায় আসে। তুমি আমার কাছে সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যখন থেকে আমি বাড়ি থেকে বের হয়েছি, এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি পাইনি। আমার জীবনে কোথাও শান্তি নেই, তুমি ব্যতীত।”
প্রণয়ের কণ্ঠে এবার কোনো রাগ নেই। বরং ছিল কোমল অকপট স্বীকারোক্তি। সূচনার চোখে মুহূর্তেই নরম একটা অনুভূতি ফুটে উঠল। তবু অভিমানটা পুরোপুরি কাটল না। তাই ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“তার মানে আপনি অনুতপ্ত?”
প্রণয় এক মুহূর্তও দেরি করল না।
“হ্যাঁ। তোমাকে হার্ট করা আমার উচিত হয়নি। আই অ্যাম সরি, সুইটহার্ট।”
সূচনার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠতে গিয়েও থেমে গেল। পরক্ষণেই মনে পড়ে গেল দিনের সেই ঘটনা। তাই আবার প্রশ্ন করল,

“আর আপনি যে ভাইয়াকে মারলেন, তার জন্য কি একটুও অনুতপ্ত হয়েছেন?”
প্রশ্নটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রণয়ের মুখের কোমলতা মিলিয়ে গেল। তাৎক্ষণিক উত্তর এলো,
“না। এই বিষয়ে আমি একটুও অনুতপ্ত নই। আমার কাছে মনে হয়েছে, আমি যা করেছি ঠিকই করেছি।”
রাফির প্রসঙ্গ উঠতেই প্রণয়ের মেজাজ আবার বদলে গেল। রাফির নামটুকুই তার ভেতরের সমস্ত রাগকে আবার উসকে দিল। রাফিকে সে একদমই সহ্য করতে পারছে না। সূচনা যতদিন প্রণয়ের সঙ্গে থেকেছে, কোনোদিনই তাকে এভাবে হঠাৎ, আকস্মিকভাবে রেগে যেতে দেখেনি। প্রণয়ের এই রূপটা তাই ওর কাছে অচেনা, অবিশ্বাস্য লাগছিল।
কিছুটা অসহায় হয়েই বলল,
“প্রণয়, রাফি ভাইয়া যদি পাগলের মতো আচরণ করে, তাহলে আমার দোষ কোথায়? আপনি কেন আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করছেন?”
প্রণয় এবার একরোখা স্বরে উত্তর দিল,

“রাফি যদি পাগল হয়, তাহলে তুমি আমার কথাটাও শুনে রাখো আমি ওর থেকেও বেশি পাগল। কেউ আমার জিনিসে হাত দেওয়ার চেষ্টা করবে, আর আমি তাকে আস্ত রাখব এটা তোমার ভুল ধারণা। আর তুমি শুধু আমার। আমাদের মাঝে কোনো থার্ড পারসনকে অ্যালাও করা তো দূরের কথা, তার কথা পর্যন্ত আমি শুনতে পারব না।”
প্রণয়ের কথার দৃঢ়তা শুনে সূচনা বুঝতে পারল, রাফিকে নিয়ে আর কথা বাড়ালে ঝামেলা কমবে না, বরং আরও বাড়বে। তাই ও প্রণয়কে শান্ত করার চেষ্টা করে ধীর স্বরে বলল,
“প্রণয়, আমি তো আপনারই…”
সূচনা কথাটা শেষ করার আগেই প্রণয় ওর দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠল,
“হ্যাঁ, তুমি সম্পূর্ণ আমার।”
প্রণয়ের কথার পর সূচনা আর কিছু বলল না। নীরবে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর কিছু না বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হতেই প্রণয় দ্রুত ওর বাহু ধরে ফেলল।
“কোথায় যাচ্ছ?”

সূচনার কণ্ঠে তখনও অভিমানের রেশ।
“আপনার জন্য খাবার আনতে যাচ্ছি। হয়তো একটু দেরি হবে, খাবার গরম করতে হবে।”
কথাটা বলে সূচনা নিজের বাহুটা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই প্রণয় শান্ত স্বরে বলল,
“তার কোনো প্রয়োজন নেই। ঘরে খাবার আছে।”
কথাটা শুনে সূচনা থেমে গেল। তারপর ধীরে ধীরে পেছন ফিরে ঘরের টেবিলটার দিকে তাকাল। সত্যিই সেখানে পরিপাটি করে খাবার সাজানো রয়েছে। সূচনার বিস্মিত দৃষ্টি এবার প্রণয়ের দিকে উঠতেই প্রণয় বলল,
“বাড়িতে এসে সবার সঙ্গে কথা হয়েছে। মা খাবার দিয়ে গেছে।”
সূচনার কণ্ঠে এবার ক্ষীণ অভিমান ফুটে উঠল।
“তাহলে আমাকে আগে কেন ডাকেননি?”
প্রণয় কিছুক্ষণ সূচনার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে নরম স্বরে বলল,
“কারণ তুমি ঘুমিয়েছিলে। আমি চাইনি আমার জন্য তোমার ঘুমটা ভেঙে যাক। কিন্তু দেখো, তবুও তুমি জেগে গেলে।”
কথাগুলো শুনে সূচনার অভিমানটা একটু নরম হলো। সে আর কিছু না বলে বলল,
“ঠিক আছে। তাহলে আপনি ফ্রেশ হয়ে এসে খাবার খেয়ে নিন।”

প্রণয় কোনো কথা না বলে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। এদিকে সূচনা চুপচাপ টেবিলের কাছে গিয়ে প্লেটে খাবার পরিবেশন করতে শুরু করল। রুটি, তরকারি, সঙ্গে অন্যান্য খাবার সবকিছু যত্ন করে প্লেটে সাজিয়ে রাখল। কাজ শেষ করে সে কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়াতেই প্রণয় ফ্রেশ হয়ে ফিরে এল।
প্রণয় চেয়ারে বসতেই সূচনা গোমড়া মুখে বলল,
“আপনি খাবার খেয়ে নিন। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।”
কথাটা বলেই সূচনা ঘুরে চলে যেতে উদ্যত হলো।
কিন্তু প্রণয় তাকে এত সহজে যেতে দিল না।
হঠাৎ ওর হাত ধরে এক ঝটকায় নিজের দিকে টেনে নিল। আকস্মিক টানে ভারসাম্য হারিয়ে সূচনা প্রণয়ের কোলে এসে পড়ল। পড়ে যাওয়ার ভয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই দুহাত দিয়ে প্রণয়ের গলা জড়িয়ে ধরল। কিছু একটা বলার আগেই প্রণয় ওর চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

“শুধু ঘুমালেই চলবে ওয়াইফি?”
সূচনার ভ্রু কুঁচকে গেল।
“মানে?”
প্রণয় নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“মানে, আমাকে এখন খাইয়ে দাও।”
সূচনার চোখেমুখে এবার বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল।
“কেন? আপনার হাত নেই?”
প্রণয় নিজের হাত দুটির দিকে একবার তাকিয়ে আবার সূচনার দিকে তাকাল।
“হাত আছে। তবে বউয়ের হাতে খেতে মন চাইছে। তাহলে খাবারের স্বাদ দ্বিগুণ হয়ে যাবে।”

সূচনার ঠোঁটের কোণে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল। পরক্ষণেই সেটা লুকিয়ে নিয়ে বলল,
‘আচ্ছা? আর আপনাকে এই কথা কে বলেছে যে বউয়ের হাতে খেলে খাবারের স্বাদ দ্বিগুণ হয়ে যায়?”
কথাটা বলতে বলতে সূচনা রুটির এক টুকরো ছিঁড়ে তাতে তরকারি মাখিয়ে প্রণয়ের মুখের সামনে ধরল। প্রণয় এক মুহূর্তও দেরি না করে সেটা খেয়ে নিল। তারপর সূচনা একটু নড়েচড়ে বসে বলল,
“আমাকে ছেড়ে দিন। আমি পাশে বসে আপনাকে খাইয়ে দিচ্ছি।”
প্রণয় কথাটার কোনো গুরুত্বই দিল না।
“কোনো প্রয়োজন নেই। এভাবেই খাইয়ে দাও।”
সূচনার এবার সত্যিই বিরক্ত লাগল।
“আপনি কিন্তু এবার বাড়াবাড়ি করছেন!”
প্রণয়ের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।

“হ্যাঁ, করবই তো। তোমার কাছে বাড়াবাড়ি করব না তো কি প্রতিবেশীর কাছে করব?”
মুহূর্তেই সূচনার দুটো ভ্রু কুঁচকে গেল। ওর কথাটাই প্রণয় ঘুরিয়ে ওর দিকেই ছুড়ে দিল! সূচনার সেই গোমড়া মুখ দেখে প্রণয়ের হাসিটা আরও গভীর হলো। তবে পরক্ষণেই সে নিজেই খাবারের একটু অংশ তুলে নিল। তারপর হাত বাড়িয়ে খাবারটা সূচনার মুখের সামনে ধরে বলল,
“খেয়ে নাও।”
সূচনার উত্তর এল সঙ্গে সঙ্গেই।
“আমার খিদে নেই। আমি খেয়েছি।”
প্রণয়ের মুখের হাসি এবার মিলিয়ে গেল। দৃষ্টিতে ফুটে উঠল মায়া আর উদ্বেগ।

“তোমাকে দেখে তো মোটেও মনে হচ্ছে না যে তুমি কিছু খেয়েছ। এখন না খেলে অসুস্থ হয়ে পড়বে। তাই প্লিজ, খেয়ে নাও।”
সূচনার চোখ দুটো অজান্তেই থেমে গেল প্রণয়ের মুখের ওপর। আর সেই মুহূর্তে সূচনার মনে হলো এই মানুষটার ওপর যতই অভিমান থাকুক, তার যত্নের কাছে সেই অভিমান বড্ড অসহায়।
কিছুক্ষণ পর সূচনা নীরবে বিছানায় শুয়ে পড়তেই প্রণয়ও পাশে এসে শুয়ে পড়ল। পরম যত্নে তাকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিল। সূচনার মাথাটা নিজের বুকের ওপর রেখে আঙুলগুলো আলতো করে ওর চুলের ভেতর বুলিয়ে দিতে লাগল।
নিস্তব্ধ রাতের নরম আবহে প্রণয়ের আঙুলের মায়াময় স্পর্শে সূচনার চোখের পাতায় আবারও ঘুম নেমে আসতে শুরু করল। আর ঠিক তখনই প্রণয় খুব আস্তে, যেন ঘুমন্ত মানুষটাকে জাগিয়ে না দিয়ে, প্রণয় গুনগুন করে গেয়ে উঠল,

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩১

“Jo Tum Na Meri Baahon Main.
Main To So Nahi Sakta.
Khuda Ne Tujhko Diya Mujhe.
Tujhe Main Kho Nahi Sakta.”

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৩