Home প্রণয়ের নব্য সূচনা প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৫

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৫

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৫
insia isha chowdhury

নিস্তব্ধ রাত। তবে আজকের রাতটা অন্যরকম পূর্ণিমার আলোয় চারপাশ কেমন মায়াবী হয়ে উঠেছে। আকাশের বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা চাঁদের মিষ্টি আলোয় অন্ধকারও তার স্বাভাবিক গাম্ভীর্য হারিয়ে কোমলতায় মিশে গেছে। রাতের খাবারের সময় হয়ে এসেছে। একে একে সবাই বসার ঘরে এসে জড়ো হতে শুরু করল। এরই মধ্যে সুপ্তি দুটি প্লেট হাতে নিয়ে ঋতুর জন্য খাবার বাড়তে শুরু করল। সুপ্তিকে খাবার নিতে দেখে শায়লা খাতুন কৌতূহলী দৃষ্টিতে প্রশ্ন করলেন,

“কী ব্যাপার? তুই খাবার কার জন্য নিচ্ছিস?”
সুপ্তি জানে, ইতিমধ্যেই পরিবারের অনেকেই জেনে গেছে ঋতু এই বিয়েতে রাজি। এখন ঋতু যদি খাবার খেতে আসে, তাহলে নিজের বিয়ের কথা সবার আগে তার কাছ থেকেই জেনে যাবে। সুপ্তি চায়, অন্য কেউ বলার আগেই সে নিজেই ঋতুকে বিয়ের বিষয়টি জানাবে। শুধু তাই নয়, কোনোভাবে ঋতুকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সোহেলকে বিয়ে করার জন্য রাজি করাতে পারলে তার জন্য আর ভালো কিছু হতে পারে না। একবার ঋতুকে নিজের কথায় রাজি করাতে পারলেই সবকিছু তার পরিকল্পনামতো হয়ে যাবে। নিজের মনের ভাব আড়াল করে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“আসলে ঋতু স্কিন কেয়ার করছে। তাই ওর জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছি। সঙ্গে আমারটাও নিয়ে যাচ্ছি। আমরা দু’জন রুমেই খেয়ে নেব।”
শায়লা খাতুন কিছু বলার আগেই মুনতাহা বললেন,

“ভাবী, ঋতু তো ঠিকই করছে। এখন ওর স্কিন কেয়ার করায় উচিত। সুপ্তি মা, তুই যা, ঋতুর কাছে যা।”
সুপ্তি কিছু বলার আগেই প্রণয়ও খাবার নেওয়ার জন্য এগিয়ে গেল। দুটি প্লেটে খাবার তুলতে দেখে শায়লা খাতুন আবারও ছেলেকে প্রশ্ন করলেন,
“কী ব্যাপার প্রণয়? তুই আবার খাবার নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?”
প্রণয় রান্নার ভেতর থেকে চিংড়ি মাছের পদটা একটু বেশি করে বাটিতে তুলে নিল। সূচনা এই পদটা ভীষণ পছন্দ করে। খাবার তুলতে তুলতেই মাকে বলল,
“আসলে আজ বিকেলে সুপ্তির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে সূচনার হাতে গরম দুধ পড়েছিল। হাতে এখনো ব্যথা আছে। ওই হাত দিয়ে ওর পক্ষে খাওয়া সম্ভব না। তাই ওকে খাইয়ে দিতে হবে। এজন্য ওর জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছি। আর সঙ্গে আমার জন্যও নিয়ে যাচ্ছি।”

প্রণয়ের কথা শুনে মুনতাহা হেসে এগিয়ে এসে মজা করে তার কান মলে দিলেন।
“বাহ! প্রণয় তো দেখছি বেশ বউয়ের খেয়াল রাখতে শিখেছে! যে ছেলেকে আমি কখনো এক গ্লাস পানি পর্যন্ত নিজ হাতে খেতে দেখি নি সেই ছেলে কিনা এখন বউয়ের জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছে। আবার নিজে হাতে খাইয়েও দেবে!”
মুনতাহার কথা শুনে সবাই হেসে উঠল। কিন্তু সুপ্তির মুখটা মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। হাতের প্লেটটা শক্ত করে ধরে সে বলে উঠল,
“সূচনাতো চামচ দিয়েও খাবার খেতে পারত।”
সুপ্তির কথায় মুহূর্তেই হাসির রেশ থেমে গেল। প্রণয়ের মুখও গম্ভীর হয়ে উঠল। কঠিন স্বরে বলল,
“প্রথমত, তুই দেখিসনি ওর হাতে কতটা ব্যথা লেগেছে। ওই হাত দিয়ে খাওয়া সম্ভব কি না, সেটা না জেনে উল্টাপাল্টা কথা বলবি না।”

প্রণয়ের ধমকে পরিবেশটা মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে রিমা হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“আরে ফুপু, আপনি কি জানেন, বিয়ের পরের দিন প্রণয় কী করেছিল?”
মুনতাহা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী করেছিল প্রণয়?”
রিমা হেসে বলল,
“বিয়ের পরের দিন সূচনাকে রান্না করতে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে প্রণয় নিজেই পুরো সময় ওকে রান্না করতে সাহায্য করেছিল। আপনি একটু আগেই বলছিলেন, প্রণয় নিজের জন্য কখনো এক গ্লাস পানিও ভরে খায়নি। অথচ সেই প্রণয়ই নিজের বউকে রান্না করতেও সাহায্য করেছে!”
রিমার কথায় আবারও পরিবেশটা হাসি-ঠাট্টায় ভরে উঠল। প্রণয় সেদিকে আর বেশি মনোযোগ না দিয়ে বলল,

“অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি খাবার নিয়ে যাই।”
প্রণয় খাবারের প্লেট হাতে এগিয়ে যেতেই সুপ্তিও নিজের প্লেট নিয়ে তার পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করল। কয়েক পা এগিয়ে নরম স্বরে বলল,
“প্রণয়, তুমি যদি চাও আমি সূচনাকে খাবারটা খাইয়ে দিতে পারি। ততক্ষণ তুমি তোমার অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে ফেলতে পারো।”
কথাটা কানে যেতেই প্রণয় থেমে গেল। সুপ্তির কথায় তার ভেতরটা মুহূর্তেই বিরক্তিতে ভরে উঠল।
‘সূচনাকে খাওয়ানোর সময়টাকে সে অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময়ের সঙ্গে তুলনা করছে?’
প্রণয়ের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। ফিরে তাকিয়ে কঠিন কণ্ঠে বলল,
“কেন? আমি কি মরে গেছি যে তুই আমার বউকে খাবার খাইয়ে দিবি?”
প্রণয়ের এমন কথায় সুপ্তি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।

“মানে?”
প্রণয় এবার স্পষ্ট স্বরে বলল,
“মানে, তুই বললি আমি সূচনাকে খাইয়ে দেব, আর সেই সময়ে আমি যেন অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করি। কিন্তু আমার কাছে কাজের চেয়ে সূচনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
কথাগুলো শুনে সুপ্তি নিশ্চুপ হয়ে গেল। প্রণয় আবার বলল,
“আর ইদানীং তোকে আমি তেমন একটা পড়ার টেবিলেও দেখি না। বেশিরভাগ সময়ই বাইরে ঘুরঘুর করিস। কেমন যেন পরিবর্তন হয়েছে তোর। আগে তোকে এমন দেখিনি।”
কথাগুলো বলেই প্রণয় আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে সোজা ঘরের দিকে চলে গেল। প্রণয়ের প্রতিটি শব্দ সুপ্তির বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত করল। এতক্ষণ শক্ত করে ধরে রাখা প্লেটটা কাঁপতে লাগল তার হাতে। চোখের কোণে জমে উঠল অশ্রু। প্রণয়ের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে ক্ষীন অভিমানভরা কণ্ঠে বলল,

“আমার ভেতরে পরিবর্তন আরও অনেক আগেই এসেছিল, প্রণয়। কিন্তু তুমি কোনোদিন সেটা দেখার চেষ্টাই করোনি। যদি করতে… তাহলে হয়তো আজ সূচনার জায়গায় আমি তোমার বউ হতাম।”
নিজের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভটুকু মুখের আড়ালে লুকিয়ে সুপ্তি ঋতুর ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল।
ভেতরে ঢুকেই দেখল, ঋতু ল্যাপটপের দিকে মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা দেখছে। সুপ্তিকে দেখতে পেয়ে একবার তাকালেও আবার নিজের কাজে মন দিল। সুপ্তি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কী করছিস?”
ঋতু এক পলক তার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“তেমন কিছু না। ই-মেইল চেক করছিলাম।”
ঠিক তখনই ঋতুর চোখ পড়ল সুপ্তির হাতে থাকা খাবারের প্লেটের দিকে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী ব্যাপার? তুই খাবার এনেছিস কেন?”
সুপ্তি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল,
“আসলে ভাবলাম, আজ রাতে তুই আর আমি গল্প করে কাটাব। তাই আমাদের দুজনের জন্য খাবার নিয়ে এলাম।”
কথাটা শুনে ঋতু মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। যে সুপ্তি কোনো রকমে খাবারটুকু খেয়েই নিজের ঘরে যাওয়ার সুযোগ খোঁজে, বাড়িতে পিকনিকের মতো আনন্দের আয়োজন চললেও পড়াশোনার অজুহাতে নিজের ঘরে বসে থাকে, সেই সুপ্তিই আজ তার সঙ্গে পুরো রাত গল্প করে কাটাতে চাইছে? বিষয়টা কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না ঋতুর।
ঋতু এগিয়ে এসে সুপ্তির গালে হাত রেখে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“ভাই, তুই ঠিক আছিস তো? মানে… তুই সুপ্তিই তো?”
সুপ্তি বিরক্ত হয়ে তার হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,

“কী যা-তা বলছিস? আমি সুপ্তিই।”
“হ্যাঁ, তাহলে তোর পড়াশোনা নেই? তুই এখানে এসে আমাকে বলছিস, আমার সঙ্গে গল্প করতে চাস?”
“তুই এমন ব্যবহার করছিস কেন? মনে হচ্ছে যেন আমরা কোনো দিন গল্পই করিনি।”
“হ্যাঁ, কিন্তু হঠাৎ করে বলছিস তো! তাই একটু অবাক হয়ে গেছি।”
সুপ্তি আর কথা বাড়াল না। খাবারের প্লেটটা টেবিলের ওপর রেখে বলল,
“এসব কথা থাক। চল, আগে আমরা খাবারটা খেয়ে নিই।”
অন্যদিকে, প্রণয় নিজের ঘরে ফিরে এসে টেবিলের ওপর খাবারের প্লেটগুলো রেখে দিল। ঘরে চোখ বুলিয়ে দেখল, সূচনা নেই। মুহূর্তেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামল বারান্দার দিকে। বারান্দায় গিয়ে দেখল, সূচনা রেলিংয়ের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে।

তার পরনে সাদা চুরিদার। কোমর ছাপিয়ে নেমে আসা ঘন কালো চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে পিঠজুড়ে। মৃদু বাতাসে চুলগুলো বারবার উড়ে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে তার মুখ। পূর্ণিমার চাঁদের মায়াবী আলো এসে পড়েছে সূচনার চাঁদবদন মুখশ্রীতে। সেই শুভ্র আলোয় তার মুখ আরও কোমল, আরও দীপ্তিময় হয়ে উঠেছে।
হাতে থাকা চুড়িগুলোতে আলতো করে হাত রাখতেই বেজে উঠল মৃদু ছমছম শব্দ।
দরজার আড়ালে দাঁড়িয়েই থমকে গেল প্রণয়।
কী অদ্ভুত এই মেয়েটা! কোনো রকম চেষ্টা ছাড়াই কীভাবে যেন প্রতিবার তাকে নিজের দিকে টেনে নেয়। প্রণয় মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সূচনা তখনও গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছে কালো আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করে থাকা পূর্ণিমার চাঁদের দিকে।
চারপাশে ছড়িয়ে আছে নীরবতা, মায়াবী জ্যোৎস্নার রাত সব মিলিয়ে মুহূর্তটি অপূর্ব।
সূচনার মনে তখন একটাই কথা আল্লাহর সৃষ্টি সত্যিই কত অপূর্ব! প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সূচনা, আর সেই সূচনার সৌন্দর্যেই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে প্রণয়। একজন মুগ্ধ প্রকৃতির রূপে, অন্যজন মুগ্ধ তার প্রিয়তমার রূপে।

হঠাৎই পেছন থেকে একজোড়া হাত এসে আলতো করে জড়িয়ে ধরল সূচনাকে। স্পর্শটা চিনতে সূচনার এক মুহূর্তও লাগল না। প্রণয় ছাড়া আর কে-ই বা এতটা অধিকার নিয়ে তাকে এভাবে জড়িয়ে ধরতে পারে! তবুও ঠোঁটের কোণে মিটমিটে হাসি ফুটিয়ে সূচনা মৃদু স্বরে বলল, “কে?”
প্রণয় হঠাৎই সূচনার কাঁধে আলতো করে কামড় বসিয়ে দিল। মুহূর্তেই সূচনার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো ছোট্ট এক আর্তনাদ। অবাক হয়ে পেছন ফিরে তাকাতেই কানে এলো প্রণয়ের দুষ্টু স্বর,
“এবার বুঝে যাও, কে!”
সূচনা ভ্রু কুঁচকে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি কি জীবনে কোনোদিন ভালো হবেন না?”
প্রণয় মুচকি হেসে বলল,
“ভালোই তো ছিলাম। কিন্তু তুমি আসার পর কেমন যেন হয়ে গেছি।”
সূচনা ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা, তাই? কেমন হয়ে গেছেন?”
কোনো উত্তর না দিয়ে প্রণয় হঠাৎই সূচনাকে কোলে তুলে নিল। সূচনা চমকে গিয়ে দুহাত দিয়ে প্রণয়ের কাঁধ আঁকড়ে ধরল। প্রণয় তার চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“আবরার প্রণয় মির্জা বউ-পাগল হয়ে গেছে।”
সূচনা হেসে ফেলল। তারপর মিষ্টি স্বরে বলল,

“আচ্ছা, তাই?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু বাইরের মানুষ যদি বলে, ‘মিস্টার আবরার প্রণয় মির্জা, আপনি বউ-পাগল হয়ে গেছেন’ তখন এটা শুনে আপনার কেমন লাগবে?”
প্রণয়ের ঠোঁটের হাসিটা আরও গাঢ় হলো। সূচনার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে ধীর স্বরে বলল,
“খুব ভালো লাগবে।”
“কেন?”
“কারণ পৃথিবীর সামনে নিজের ভালোবাসা স্বীকার করতে আমার একটুও লজ্জা নেই। বরং কেউ যদি আমাকে বউ-পাগল বলে, আমি গর্ব করে বলব, হ্যাঁ, আমি আমার বউয়ের প্রেমে পাগল।”
সূচনার চোখ দুটো মুহূর্তেই নরম হয়ে এলো।
প্রণয় সূচনার চোখের দিকে তাকাল আবার বলল,
“বউ তো এমনই হওয়া উচিত, যে তার ভালোবাসা দিয়ে স্বামীর পুরো পৃথিবীটাকে নিজের করে নেবে। আর আমার বউ…সে তো আমাকে এমনভাবে ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে দিয়েছে যে, এখন তোমাকে ছাড়া নিজেকে ভাবতেই পারি না।”

সূচনা লজ্জায় মুখটা প্রণয়ের বুকের কাছে লুকিয়ে ফেলল। প্রণয় মৃদু হেসে তার মাথায় আলতো করে চুমু দিয়ে বলল,
“জানো সূচনা, তোমাকে পাওয়ার পর একটা জিনিস বুঝেছি।”
“কী?”
“ভালোবাসা মানুষকে দুর্বল করে না। বরং প্রিয় মানুষটার কাছে নিজের সব অহংকার, সব অভিমান, সব শক্তি স্বেচ্ছায় সমর্পণ করতে শেখায়।”
সূচনা নীরবে তার বুকের কাছে আরও একটু গুটিয়ে এলো। প্রণয় ফিসফিস করে বলল,
“তাই সবাই যদি বলে আমি বউ-পাগল, বলতে দাও। যতদিন তুমি আমার পাশে থাকবে, ততদিন এই বদনামটা আমি হাসিমুখেই বয়ে বেড়াব।”
সূচনা মৃদু হেসে বলল,
“আপনি সত্যিই খুব পাগল।”
প্রণয় সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
“তোমার জন্য? নিঃসন্দেহে।”

এখন সকাল দশটা। নিলুফার খুশির আজ কোনো ঠিকানা নেই। আনন্দে আত্মহারা হয়ে সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে সবার কাজকর্ম দেখছেন, নিজেও হাতে হাতে কাজ করছেন। এমনকি তিনি কিছুটা অসুস্থ ছিলেন সেই কথাটাও যেন বেমালুম ভুলে গেছেন। কিশোরী মেয়ের মতোই আজ তার মনে উচ্ছ্বাস; মুখে লেগে আছে তৃপ্তির হাসি। নিজের ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিলুফা যে পরিকল্পনা করেছিলেন, সবকিছু যেন ঠিক সেভাবেই এগোচ্ছে। রাফি উচ্চশিক্ষিত হয়েছে এটাই তো ছিল তার সবচেয়ে বড় চাওয়া। নিলুফা সবকিছুর মধ্যেই পরিপূর্ণতা খোঁজেন। পুরো খান বাড়িতে এমন কিছু নেই, যা তার পছন্দের তালিকার বাইরে। কী রান্না হবে, কীভাবে বাড়ি সাজানো হবে, কোন জিনিস কোথায় থাকবে। সবকিছুর সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই নেন।
আর নিজের ছেলের ভবিষ্যৎটাও তিনি ঠিক তেমনভাবেই সাজিয়েছিলেন। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, একবার সূচনার বিয়ে হয়ে গেলে রাফি আর কিছুই করার থাকবে না। শেষ পর্যন্ত তাকে এই তিক্ত সত্যিটাই মেনে নিতে হবে। আর ঠিক সেটাই হয়েছে।

হ্যাঁ, এর মাঝখানে নিজের ক্ষতি করার মতো কঠিন পদক্ষেপও নিতে হয়েছে তাকে। কিন্তু নিলুফা জানতেন, তার কষ্ট দেখলে তার ছেলে শেষ পর্যন্ত মায়ের সব কথাই মেনে নেবে। আর আজ তিনি যা চেয়েছিলেন, ঠিক তাই হচ্ছে। বাড়িজুড়ে চলছে সাজসজ্জার ব্যস্ততা। কাল রাফি আর টিনার এনগেজমেন্ট। একমাত্র ছেলের বিয়েতে কোনো কমতি রাখবেন না নিলুফা। যতটা উল্লাস, যতটা আনন্দ সবকিছুই এই বিয়ের আয়োজনেই উজাড় করে দিতে চান তিনি। আর সেই সঙ্গে নিজের ছেলেকেও আবার আগের মতো করে নিতে চান।
রাফির এনগেজমেন্টের জন্য বানানো কাস্টমাইজ করা পাঞ্জাবিটা হাতে নিয়ে নিলুফা একবার ভালো করে দেখে সোজা চলে গেলেন রাফির ঘরে। রাফি তখন কিছু কাগজপত্র দেখছিল। মাকে ঘরে ঢুকতে দেখে সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো একপাশে রেখে দিল।
নিলুফা পাঞ্জাবিটা বের করলেন। হালকা পার্পল- রঙের পাঞ্জাবি। সেটি রাফির গায়ের সঙ্গে মিলিয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন,
“কী সুন্দর মানিয়েছে! আমার ছেলেকে পাঞ্জাবিটায় একদম রাজপুত্রের মতো লাগছে।”
রাফি বিরক্ত চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

“এসব আবার কী শুরু করেছেন?”
রাফির কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি। অথচ নিলুফা সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করলেন না। বরং হাসিমুখে বললেন,
“কী শুরু করেছি মানে? এটা তুই এনগেজমেন্টের দিন পরবি। আমার যে কী খুশি লাগছে, বাবা! আর কয়েকটা দিন পরই আমার ছেলের বিয়ে। আমি খুব খুশি।”
রাফি নিঃশব্দে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে জমে উঠল গভীর হতাশা। তার মা শুধু নিজের খুশিটুকুই দেখছেন। একবারও ভাবছেন না, এই বিয়েতে তার ছেলের আদৌ কোনো খুশি আছে কি না। সূচনার মধ্যে এমন কী কমতি ছিল, যে তার মা নিজের ছেলের সঙ্গেই এমন বিশ্বাসঘাতকতা করলেন? ভাবনাটা মাথায় আসতেই রাফির শরীরের ভেতর আবারও রাগের আগুন জ্বলে উঠল। নিজেকে সামলে নিয়ে বিরক্ত কণ্ঠে বলল,
“আপনার এসব করা হয়ে গেলে এখন এখান থেকে যান। আমার কিছু কাজ আছে।”
ছেলের রুক্ষ কথায় নিলুফা কিছুই মনে করলেন না। বরং ছেলের মাথাটা যেন আর গরম না হয়, সেই চিন্তাতেই দ্রুত নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলেন। তারপর স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন,
“হ্যাঁ, হ্যাঁ। ঠিক আছে। আমি এখনই চলে যাচ্ছি। পাঞ্জাবিটা তোর আলমারিতে রেখে দিই। তারপরই চলে যাব। তুই নিশ্চিন্তে তোর কাজ কর।”

আরিফুল মির্জা বাড়িতে ছিলেন না। গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজে বাড়ির বাইরে ছিলেন তিনি। তবে স্ত্রীর মুখে যখন শুনলেন, তাঁর মেয়ে বিয়েতে রাজি হয়েছে, তখন হঠাৎ করেই বাড়ির বাইরে আর মন টিকল না। মন ছুটে গেল বাড়ির দিকে এই মুহূর্তেই নিজের ছোট্ট মেয়েটার কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করল তাঁর। সময় কত দ্রুত চলে যায়, তাই না?
এই তো সেদিনও ঋতু ছিল ছোট্ট একটা শিশু। গুটিগুটি পায়ে হাঁটতে শিখেছে সবে, বাবার আঙুল আঁকড়ে ধরে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াত। অথচ আজ সেই মেয়েটাই বিয়ে হতে চলেছে! কথাটা ভাবতেই আরিফুল মির্জার বুকটা কেমন ভারী হয়ে উঠল। বাড়ি ফেরার আগে মেয়ের জন্য নিজের পছন্দে এক জোড়া কুর্তি কিনলেন। ঋতু বড় হয়ে গেলেও ছোট বাচ্চাদের মতো কিউট জুতা পরতে ভীষণ পছন্দ করে। তাই তেমনই এক জোড়া জুতা কিনলেন তিনি। সঙ্গে নিলেন মেয়ের পছন্দের চকলেট আর আইসক্রিম।
এদিকে প্রণয় আজ কলেজ ডিউটি শেষে অফিসে চলে গেছে। আজ তার আর রবিনের ভীষণ কাজের চাপ। সূচনা অবশ্য আজ কলেজে যায়নি, বাড়িতেই আছে। বসার ঘরের সোফায় বসে আছে সে। পাশে মুনতাহা বেগম, তাঁর ছেলে হিমেল আর সুপ্তি। আজ সুপ্তিও ভার্সিটিতে যায়নি। সবাই মিলে মুনতাহা বেগমের পুরোনো বিয়ের অ্যালবাম দেখছিল। হঠাৎ একটি পারিবারিক ছবিতে এসে থামলেন মুনতাহা বেগম। ছবিতে শায়লা খাতুন, আরিফুল মির্জা এবং তাঁদের তিন সন্তান রবিন, প্রণয় ও ঋতু।
ছবিটা সূচনার দিকে এগিয়ে দিয়ে মুনতাহা বেগম মুচকি হেসে বললেন,

“তা দেখি বৌমা, তুমি খুঁজে বের করতে পারো কি না! বলো তো, কোনটা প্রণয়?”
সূচনা মনোযোগ দিয়ে ছবিটার দিকে তাকাল। ছবিতে তিন ভাইবোনের মধ্যে একজন বেশ বড়, একজন তার চেয়ে একটু ছোট আর মেয়েটি একেবারেই ছোট। তাই সূচনা খুব সহজেই বুঝে গেল মাঝের ছেলেটিই নিশ্চয় প্রণয়। সে কিছু বলার আগেই সুপ্তি হঠাৎ অ্যালবামটা সূচনার হাত থেকে নিয়ে ছবির একটি ছেলেকে দেখিয়ে বলল,
“আরে, এটাতো প্রণয়! একটা জিনিসের কী মিল! প্রণয় এখনো যেমন গম্ভীর, ছোটবেলাতেও তেমনই গম্ভীর ছিল!”
হঠাৎ এভাবে অ্যালবামটা কেড়ে নেওয়ায় সূচনার ভীষণ বিরক্ত হলো। মুনতাহা বেগম প্রশ্নটা তাকে করেছিলেন, তাই উত্তরটাও তারই দেওয়ার কথা। তার ওপর সুপ্তি আবার কীসব উল্টোপাল্টা কথা বলছে! প্রণয় নাকি গম্ভীর! সূচনার মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে সুপ্তির দিকে তাকিয়ে বলল,

“সুপ্তি আপু, তোমাকে কে বলেছে উনি গম্ভীর?”
সুপ্তি ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এ আর নতুন কী? বাড়ির সবাই জানে প্রণয় কেমন!”
সূচনা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
“না, ভুল জানো। উনি যে গম্ভীর ভাবটা ধরে রাখেন, সেটা শুধু অন্যদের জন্য। আর আমার জন্য উনি একদমই গম্ভীর নন।”
সূচনার কথা শুনে সুপ্তি কয়েক মুহূর্ত কপালে ভাঁজ ফেলে তার দিকে তাকিয়ে রইল। মুনতাহা বেগম হেসে বললেন,
“আরে, স্বামীরা এমনই হয়। এদের দেখবি, সবার সামনে কেমন গম্ভীর ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়ায়! আর এদের আসল রূপ শুধু নিজের বউদের কাছেই প্রকাশ করে।”

কথাটা বলেই হেসে উঠলেন তিনি। ঠিক তখনই বসার ঘরে এসে ঢুকল ঋতু। গত কয়েকদিন ধরে নিজের কাজ নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে ঠিকমতো নিজের ঘর থেকেও বের হতে পারছিল না। ফুফুকে এভাবে হাসতে দেখে পাশে এসে বসে কৌতূহলী গলায় বলল,
“আরে, কী হয়েছে? তোমরা এত হাসাহাসি করছ কেন? আমাকেও বলো, আমিও হাসি!”
ঋতু কথা বলার মাঝেই রিমা আর শায়লা খাতুন নিজেদের ঘর থেকে তৈরি হয়ে বেরিয়ে এলেন। দুজনই শপিংয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। সবকিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামীকাল ঋতু আর সোহেলের কাবিন হবে। বড় কোনো অনুষ্ঠান নয়, ছোটখাটো আয়োজনেই কাবিনটা সম্পন্ন করা হবে। পরবর্তীতে ঋতুর পড়াশোনা শেষ হলে ধুমধাম করে বড় অনুষ্ঠান হবে। দ্রুত কাবিনের ব্যাপারে সোহেল কিংবা তার পরিবারেরও কোনো আপত্তি নেই। মুনতাহা বেগম শপিংয়ের ঝামেলায় যেতে চাননি। আর সূচনা তো প্রণয়ের আদেশে আজ বাড়িতেই বিশ্রাম নিচ্ছে। আর সুপ্তি ও কোন আগ্রহ দেখায়নি শপিংয়ে যাওয়ার জন্য। তাই রিমা আর শায়লা খাতুনই শপিংয়ে যাচ্ছেন।

ঠিক তখনই কলিংবেল বেজে উঠল। সুপ্তি দ্রুত উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল। দরজার ওপাশে আরিফুল মির্জা তিনি এসেছেন। সুপ্তি অস্থির পায়ে আবার বসার ঘরে ফিরে এল। সে জানে, এখন আর কিছুই লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ঋতু যখন নিজের বিয়ের কথা জানতে পারবে, তখন তাকে এক মুহূর্তও একা রাখা যাবে না। তাই মনে মনে ঠিক করে নিল, ঋতু কোন কিছু বলার আগেই তাকে নিয়ে একান্তে বসে সবটা বুঝিয়ে বলবে সুপ্তি।
নিজের মা আর ভাবিকে এভাবে তৈরি হতে দেখে ঋতু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল,
“আম্মু, ভাবি, তোমরা কোথায় যাচ্ছ?”
রিমা পাশে থাকা তামজিদের হাতে একটি খেলনা দিতে দিতে বলল,
“কী যে বলিস ঋতু! কাল কত রকমের কাজ, কত কিছু অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে হবে, আর তুই বলছিস কোথায় যাচ্ছি? কথাটা এমন হয়ে গেল না যে যার বিয়ে তার হুঁশ নেই, পাড়া-প্রতিবেশীর ঘুম নেই!”
ঋতু তার ভাবির কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারল না। বিস্মিত হয়ে বলল,
“মানে? কী বলতে চাইছ?”
রিমা কিছু বলার আগেই আরিফুল মির্জা মেয়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন। বাবাকে এভাবে নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঋতুও ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। পরম আবেগে আরিফুল মির্জা মেয়ের মাথায় আলতো করে চুমু দিয়ে বললেন,

“আমার মেয়েটা কত বড় হয়ে গেছে!”
কথাটা বলেই হাতে থাকা সবকিছু ঋতুর হাতে তুলে দিলেন তিনি। তারপর ভারী কণ্ঠে বললেন,
“এখন বুঝতে পারছি, বাবাদের কেন এত কষ্ট হয় মেয়ের বিয়ের সময়!”
ঋতু বিস্মিত চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
“বাবা, তুমি এসব কী বলছ?”
আরিফুল মির্জা আর কিছু বললেন না। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুটা আঙুলের ডগায় মুছে নিয়ে নীরবে সেখান থেকে চলে গেলেন। তাঁর চলে যাওয়ার দিকে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল ঋতু।
ঠিক তখনই শায়লা খাতুন মেয়ের কাছে এসে বললেন,
“তোর তো কাল শুধু কাবিন। তোকে তো কাল তুলে নিয়ে যাবে না! তাই তোর বাবার এই অবস্থা। আর যেদিন সত্যি সত্যি তোকে তুলে নিয়ে যাবে, সেদিন তোর বাবার কী অবস্থা হবে, সেটাই তো ভাবছি!”
ঋতুর মাথাটা মুহূর্তেই ঝিমঝিম করে উঠল। এতক্ষণ ধরে বলা কথাগুলোর একটাও ওর মাথায় ঢুকছে না। সে হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করল,

“কিসের কাবিন?”
রিমা মুচকি হেসে বলল,
“আমি কিন্তু তোর আর সোহেলের জন্য একটা জিনিস প্ল্যান করে রেখেছি। সেটা তুই কাল জানতে পারবি। তোর বিয়ে উপলক্ষে আমার কাছ থেকে কিন্তু দারুণ একটা সারপ্রাইজ পেতে চলেছিস তুই আর সোহেল। আর মা, তাড়াতাড়ি চলুন। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
রিমার কথা শুনে শায়লা খাতুনও বললেন,
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক। চল আম্মু।”

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৪

কথাটা বলেই রিমা আর শায়লা খাতুন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। আর বসার ঘরের মাঝখানে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল ঋতু। তার বিয়ে! তাও আবার সোহেলের সঙ্গে! আর আগামীকালই তাদের কাবিন! অথচ এসবের কিছুই সে জানে না। মুহূর্তের মধ্যে ঋতুর চারপাশটা যেন কেমন অচেনা হয়ে গেল। মাথার ভেতর একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল। এসব কীভাবে হচ্ছে? আর কেনই বা সবাই তার কাছ থেকে এত বড় একটা বিষয় লুকিয়ে রেখেছে?

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here