প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ২০
বন্যা সিকদার
ভোরের স্নিগ্ধ নরম আলো চোখের ওপর আছড়ে পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে চোখ-মুখ কুঁচকে নিল মৌ। সে আড়মোড়া ভেঙে অন্য পাশে মুখ ফিরিয়ে ঘুমাল কিন্তু সূর্যের আলো তখনও তার চোখের ওপর আঁচড় কাটছে। বেলা কতটা হয়েছে তার কোনো ধারণা নেই‚ তবে এখন বিছানা ছাড়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই তার। ঘুম তার বরাবরই খুব প্রিয়। হঠাৎ চিরচেনা সেই পারফিউমের মিষ্টি ঘ্রাণ নাকে এসে লাগল। ঠিক তখনই আপনা-আপনি মৌ’য়ের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। তার ঠোঁটের এই মিষ্টি হাসি দেখে উজান নিজেও হাসল। মেয়েটা তার উপস্থিতি আগে থেকেই টের পায়‚ হয়তো একেই বলে ভালোবাসা। উজান ধীরে ধীরে মৌ’য়ের কানের লতিতে হালকা ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে মৌ’য়ের শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। এই অনুভূতি ভিন্ন,‚ বড্ড অদ্ভুত। সে চোখ বন্ধ করেই রইল। ঠিক তখনই কানের কাছে ভেসে এল সেই পরিচিত ভারী কণ্ঠস্বর।
“মিসেস উজান চৌধুরী প্লিজ ওঠেন না এবার। আপনার অপেক্ষায় কেউ একজন না খেয়ে বসে আছে।
সঙ্গে সঙ্গে মৌ তড়িঘড়ি করে উঠে বসল। আর বসার সময়ই উজানে’র মাথার সঙ্গে তার কপালে জোরে টোকা লাগল। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল মৌ। ঠোঁট ফুলিয়ে উজানে’র দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল‚ “ব্যথা দিলেন কেন? আমার বুঝি কষ্ট হয় না?
তার এমন ইনোসেন্ট মুখের ভঙ্গি দেখে উজান এবার শব্দ করে হাসল। মেয়েটার এমন চাহনি‚ এমন মুগ্ধময় কথা আর পাগলামি তাকে বরাবরই ঘায়েল করে। মেয়েটা দিন দিন তার অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে। এই অভ্যাস কি আদৌ কোনোদিন থামবে? এর উত্তর জানা নেই উজানে’র। শুধু জানে‚ এই মেয়েটাকে তার বড্ড প্রয়োজন। হঠাৎ উজানের কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হলো‚ “এইটুকু ব্যথা সহ্য করতে পারেন না‚ তাহলে ভবিষ্যতে আমার দেওয়া ব্যথা গুলো কীভাবে সহ্য করবেন শুনি?
উজানে’র এই কথার আগাগোড়া কিছুই বুঝতে পারল না মৌ। তাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর নিরবতা ভেঙে বলে‚ “আপনি কেন আমায় ব্যথা দেবেন? আপনি না বলেন আমার কষ্ট আপনার সহ্য হয় না। তাহলে আপনি কেন আমাকে কষ্ট দেবেন?
তার এই অবুঝ প্রশ্নে উজান কী বলবে ভেবে পায় না। মেয়েটা কেন এত অবুঝ? এই অবুঝপনাই তো তাদের মাঝখানে অদৃশ্য এক দূরত্ব তৈরি করে রেখেছে। উজান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরবির করলো। “বুঝতে পারছি‚ আমার মিসেসের মধ্যে এখনও ম্যাচিউরিটি আসেনি। মাবুদ জানে আর কত অপেক্ষা করতে হবে আমাকে। মাবুদ এবার আমার মিসেসকে সঠিক বুদ্ধি দাও।
মৌ নিভু নিভু দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল‚ “কিছু বললেন?
উজান মাথা চুলকাতে চুলকাতে উত্তর দিল। “উঁহু কিছু না। চলেন এবার ব্রেকফাস্ট করে কলেজে যেতে হবে। দুদিন পর পরীক্ষা অথচ আপনার সিলেবাস নিয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। লোকে যদি শোনে প্রফেসর উজান চৌধুরীর ওয়াইফ ফেলটু‚ তখন আমার মান-সম্মান থাকবে? একটু তো পড়াশোনা করুন ম্যাডাম। অন্তত পাস নম্বর তো তুলবেন?
মৌ তবুও কিছুক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে রইল। তা দেখে উজান ধমক দিতেই সে তড়িঘড়ি করে ফ্রেশ হতে চলে গেল। প্রায় মিনিট বিশেক পর মৌ শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এল। তাকে এভাবে ঝটপট শাওয়ার নিয়ে বের হতে দেখে উজান খানিকটা অবাক হলো।কারণ মেয়েটার কাছে শাওয়ার নেওয়া মানেই চরম বিরক্তি। আজ না বলতেই সে নিজে থেকে শাওয়ার নিয়ে এসেছে। মৌ কলেজ ড্রেস পরেই বের হলো। ভেজা চুলগুলো নিয়ে উজানে’র সামনে দাঁড়িয়ে গেল সে। উজান তৃপ্তির হাসি হেসে মৌ’য়ের চুলগুলো হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে দিতে দিতে বিড়বিড় করে।
“মিসেস চৌধুরী রাতে আমাদের মধ্যে কি কিছু মিছু হয়েছিল? না মানে‚ এত সকাল সকাল শাওয়ার নিলেন যে তাই জিজ্ঞেস করছি।
তার কথায় মৌ লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। সেই লজ্জা রাঙা মুখের দিকে তাকিয়ে উজানে’র ঠোঁটের কোণেও এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। চুল বাঁধা শেষ হলে উজান নিজের ব্যাগ নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল, আর মৌ তার আগে আগে হাঁটতে লাগল। হঠাৎ মৌ দুদম এগিয়ে গিয়ে আবার পিছিয়ে এল। উজানে’র মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চোখ রাঙালো।
”এই যে ওয়েট। আপনি কাল রাতে কোথায় গিয়েছিলেন? রাতে ঘুম ভাঙার পর আপনাকে খুঁজে পেলাম না। আর ওয়াশরুমের ভেতর শার্টের ওপর রক্তের দাগ কেন ছিল? হুম?
মৌ’য়ের প্রশ্নে উজান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। মেয়েট রাতে জেগে ছিল অথচ সে টের পায়নি। আর ওয়াশরুমের ভেতর রক্তমাখা শার্টটি ফেলে দেওয়ার কথা ভুলে গিয়েছিল সে। এখন এই প্রশ্নের উত্তর কী দেবে? সে বড় বড় শ্বাস ফেলে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। “হোপ ইডিয়ট ওটা রক্তমাখা শার্ট ছিল না‚ রঙের দাগ ছিল। বেশি পাকনামো করতে এলে দাঁত ভেঙে ফেলব একদম। চলো!
মৌ মুখ ঘুরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল। ব্রেকফাস্ট শেষ করে দুজনেই কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। উজানে’র বাইকে বসে তাকে পেছন থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখল মৌ। কলেজ গেট থেকে কিছুটা দূরে নেমে সে অন্য পাশে গিয়ে দাঁড়াল। মৌ কলেজে প্রবেশের কিছুক্ষণ পর উজানও প্রবেশ করল।
অন্য দিকে—
মেহের গুটি গুটি পায়ে কলেজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আজ অনেকদিন পর কলেজে পা রাখা হচ্ছে। দুদিন পর পরীক্ষা‚ সেই নিয়ে তার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। এর মাঝেই হঠাৎ কারো শক্ত বুকের সাথে সজোরে ধাক্কা খেল সে। এত তাড়াহুড়োয় ছিল যে সামনে কে আছে খেয়ালই করেনি। ভীতু মুখে সামনের লোকটির দিকে তাকাতেই সে চমকে উঠল। সামনে বিধ্বস্ত অবস্থায় ইফাত দাঁড়িয়ে আছে। মানুষটার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ হয়ে গেছে। সেই আগের সৌন্দর্য আর নেই‚ ঠোঁট দুটোও কালো কুচকুচে হয়ে আছে। মেহেরে’র আর বুঝতে বাকি রইল না কেন তার এমন অবস্থা। তার মুখের দিকে তাকিয়ে মেহেরে’র বুক কেঁপে উঠল। একটা ছেলে যে সামান্য মেয়ের জন্য নিজের এমন বেহাল দশা করতে পারে‚ তা তার ধারণাতেও ছিল না। ইচ্ছে করছিল পাশ কাটিয়ে চলে যেতে কিন্তু পা যেন নড়ছেই না।
হঠাৎই ইফাত তার হাত ধরে নিজের হাতের ভাঁজে ঢুকিয়ে সামনের দিকে এগোতে লাগল। যেখানে তার হাত সরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল‚ সেখানে মেহেরে’র মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে‚ তা সে নিজেও জানে না। তবে মনে হচ্ছে বহু বছর পর কোনো আপন মানুষের সন্নিকটে এসেছে সে। ইফাত মেহেরে’র দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে আওড়াল‚
“কেমন আছো ফুলকন্যা?
”জ্বী ভালো আছি।
এইটুকু উত্তর দিয়েই মেহের চুপ হয়ে গেল। অতঃপর সে নিজেও ইফাতে‘র দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল‚ “আপনি কেমন আছেন মিস্টার?
ইফাত অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ইশ….কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে থাকা এই মেয়েটার মুখের দিকে তাকালে যেন তার সকল দুঃখ মুছে যায়। কিন্তু এই মেয়েকে নিজের করে পাওয়া কি আদৌ সম্ভব? সে তপ্ত শ্বাস ফেললো।
“যেহেতু বেঁচে আছি‚ সেহেতু ভালোই আছি। তাজমহলের সৌন্দর্য কখনো বুঝতেই দেয় না‚ সেটা আসলে একটা কবর!
কথাটা যেন মেহেরে’র মাথায় বজ্রপাত করল। মানুষটার চোখের দিকে তাকানোর আর সাহস হলো না। তাই সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নিল। কতটা কষ্ট পেলে মানুষ নিজেকে এভাবে উপস্থাপন করতে পারে? কিন্তু সেই বা এখন কী করবে? সে তো নিজের অন্ধকার অতীত ফেলে এসেছে‚এখন কীভাবে এই মানুষটার সঙ্গে নতুন ঘর বাঁধবে? এটা তো অসম্ভব।
মেহের’কে চুপ থাকতে দেখে ইফাত আবারও নিচু স্বরে আরজি জানাল। “ফুলকন্যা আজকের দিনটা কি আমাকে দেবে তুমি? প্লিজ আর কখনো এমন আবদার নিয়ে তোমার সামনে আসব না কথা দিচ্ছি।
মেহের এক পলক ইফাতে’র দিকে তাকাল। লোকটার চোখের কোণে স্পষ্ট অসহায় চাহুনি। মেহেরে’র তীব্র ইচ্ছে হচ্ছিল দূরে কোথাও পালিয়ে যাওয়ার কিন্তু আজ তার শরীর যেন আর সঙ্গ দিচ্ছে না। মন বলছে‚ এই মানুষটির কাছেই থেকে যাও; কিন্তু মস্তিস্ক বলছে এটা কোনোদিন সম্ভব নয়। মেহের না চাইতেও ইফাতে’র কথায় রাজি হলো। কেন রাজি হলো সেটা সে নিজেও জানে না; তবে এইটুকু বিশ্বাস তার আছে। এই মানুষটির সঙ্গে থাকলে অন্তত পৃথিবীর কোনো কিছুই তাকে আঘাত করতে পারবে না।
ইফাত মুচকি হেসে মেহের’কে নিজের বাইকের কাছে নিয়ে গেল। মেহের দ্বিধা নিয়ে বাইকের পেছনে বসল। তাকে ইতস্ততবোধ করতে দেখে ইফাত মৃদু হাসল।
“টেনশন নিও না কিছু হবে না। আর আমাকে ধরে বসো নয়তো পড়ে যাবে।
মেহেরে’র সাহস হলো না ইফাত’কে ধরার। তার এত কাছাকাছি আসতে ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল কিন্তু ইফাতে’র এইটুকু আবদার সে ফেলতে পারল না। মানুষ কখনো এত অসহায়ভাবে অনুরোধ করেনি তাকে। আচমকা ইফাত নিজেই মেহেরে’র হাত টেনে নিজের কোমরের ওপর রাখল। মেহের শুকনো ঢোক গিলল। ঠিক তখনই বাইক স্টার্ট দিতেই মেহের ভয়ে ইফাতে’র শার্ট শক্ত করে খামচে ধরল। ইফাত হাসল; মেয়েটা যে কেন এত অল্পতে ভয় পায়‚ তা সে বুঝতে পারে না। প্রায় আধঘণ্টা পর তারা দুজনে একটা নদীর ধারের লেকের পাড়ে এসে হাজির হলো। ইফাতে’র জায়গাটা ভীষণ পছন্দের। যদিও এখানে আসতে মাত্র দশ মিনিট লাগার কথা ছিল কিন্তু মেহের ভয় পাবে ভেবেই সে ধীরগতিতে চালিয়েছে। ইফাত হাত ধরে মেহের’কে বাইক থেকে নামাল। বাইকটা একপাশে রেখে লেকের পাড়ে বসল দুজন। ইফাত ক্ষণে ক্ষণে মেহেরে’র দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু মেহের মাথা নিচু করে আছে। এর মাঝেই তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ইফাত অস্ফুট স্বরে বলল‚ “ফুলকন্যা আমরা কি ঘর বাঁধতে পারি না?
মেহের চমকে তাকাল। লোকটার আদুরে ও করুণ স্বরে কথাগুলো শুনে সে নিভু নিভু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মানুষটার মুখের দিকে তাকালে মন চায় অনন্তকাল তাকিয়ে থাকি কিন্তু মস্তিস্ক বলে এটা পাপ। মেহের’কে চুপ থাকতে দেখে ইফাত আবারও নিচু স্বরে আওড়াল‚ “ফুলকন্যা আমার কথায় কি তুমি কষ্ট পেয়েছো? ট্রাস্ট মি আমি তোমাকে আঘাত করতে চাই না। তবে আমার যে একটা ঘর খুব প্রয়োজন। আমার এই সুখের সংসারে কি তুমি আমার সঙ্গিনী হবে না?
ততক্ষণে মেহের মাথা নিচু করে ফেলল। নিস্তেজ গলায় বলে‚ “এটা সম্ভব নয়।
“কেন সম্ভব নয়? তুমি শুধু একবার ‘হ্যাঁ’ বলো‚ আমি বাকি সব সামলে নেব। আচ্ছা তোমার কি আমার অতীতের বেপরোয়া জীবন নিয়ে সমস্যা? ট্রাস্ট মি‚ অনেক দিন ধরে আমি তুমি ছাড়া অন্য কোনো নারীর দিকে তাকাইনি। তোমার কথা শুনে আমি আমার সেই ধ্বংসাত্মক জীবন ছেড়ে দিয়েছি। এখন নিজে রোজগার করে নিজের মতো চলছি। তবুও কি আমাকে তোমার পাশে মানাবে না?
মেহের মৃদু হেসে উঠল। তার হাসির শব্দে ইফাত ভ্রু কুঁচকে তাকাল। মেহের কেন হাসছে‚ তা সে বুঝতে পারছে না। মেহের বলল‚ “আচ্ছা আপনার কি মনে হয় আপনার প্রেম কিংবা টাকার জন্য আমি আপনার বউ হতে চাই না? এমনটা নয়। আসলে আমি চাই না আপনার মতো চাঁদের গায়ে আমার কারণে কলঙ্ক লাগুক। আমি আপনাকে ঠকাতে পারব না। আপনি নতুন কাউকে নিয়ে ঘর বাঁধুন।
ইফাত আর্তনাদ করে বলল‚ “যে ঘরে তোমার ছোঁয়া নেই‚ সেই ঘর আমি কীভাবে বাঁধব বলো?
”আপনি অবুঝ বাচ্চার মতো কেন কথা বলছেন? আমি আগেই বলেছি‚ আমার অন্ধকার অতীত জানলে আপনি কখনোই চাইবেন না এমন কোনো নারী আপনার সঙ্গী হোক।
“আমি তোমার অতীত জানতে চাই না‚ আমি শুধু তোমাকে চাই।
মেহের একটি তপ্ত শ্বাস ফেলল। এবার মনে হচ্ছে এই লোকটার কাছে অতীত না বললেই নয়। সে আর মানুষটার কষ্ট দেখতে পারছে না। যদিও মেহের খুব ভালো করেই জানে‚ তার অতীত শুনলে ইফাত কখনোই তাকে বউ বানানোর কথা ভাববে না; তখন হয়তো সে তার পিছু ছাড়বে। ঠিক তখনই ইফাত তাকে একটা প্যাকেট দিল। মেহের অবাক হলো। ইফাত মুচকি হেসে প্যাকেটটা নিতে বলল কিন্তু মেহের হাত বাড়াল না। ইফাত নিজেই প্যাকেটটি তার হাতে গুঁজে দিল। মেহের বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল‚
“এটা কী?
“আমার প্রথম উপার্জনের টাকায় আমার ফুলকন্যার জন্য বিয়ের শাড়ি কিনেছি। যদিও তেমন দামি নয় কিন্তু এটা পরে তুমি আমার বউ হবে।
মেহের প্যাকেটটা আবার ইফাতে’র হাতে দিয়ে চোখে চোখ রেখে বলে‚ “শেষ পরীক্ষার দিন আমি আপনাদের বাসায় যাব। আমার মামনির সাথে দেখা করতে। সেই রাতটা সেখানে থাকব‚ তারপর আপনাকে আমার জীবনের সেই জঘন্য অতীত খুলে বলব। এরপরও যদি আপনার মনে হয় আপনি আমাকে চান‚ তবেই আমি এই শাড়িটা নেব। ততদিন এটা আপনার কাছেই রাখুন। আমি জানি‚ সেদিন শোনার পর আপনি বলবেন এটা সম্ভব নয়। তবুও আমি সেদিন আপনাকে সব বলব।
“আমি জানতে চাই না তোমার অতীত‚ আমি তোমাকে এমনভাবেই বউ বানাতে চাই। তবে তুমি যেহেতু আমাকে চ্যালেঞ্জ করছো‚ তাহলে আমিও তোমাকে দেখিয়ে দেব ইফাত চৌধুরী তোমার যে অতীতই থাক না কেন তোমাকে বউ বানিয়েই ছাড়বে!
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১৯ (৪)
মেহের ইফাতে’র চোখের দিকে তাকাল। আচমকা তার দুই চোখ বেয়ে দু-ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এই মানুষটা নিজের মুখে যতটা সহজভাবে‚ যতখানি জোর দিয়ে বলছে। বাস্তবতা কি আদৌ এতটা সহজ হবে? মেহেরে’র তা জানা নেই। তার ভেতরের অতীত যে বড় অন্ধকার‚ বড় ক্ষতবিক্ষত। মেহের’কে ওভাবে নীরবে কাঁদতে দেখে ইফাতে’র বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না; আচমকা মেহেরে’র কোমর জড়িয়ে ধরে এক ঝটকায় তাকে নিজের বুকের একদম কাছাকাছি টেনে নিল। মেহের মৃদু চমকে উঠলেও নিজেকে সরিয়ে নিল না। ইফাত নিজের হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে অত্যন্ত পরম মায়ায় মেহেরে’র গাল থেকে সেই অশ্রুবিন্দু মুছে দিল। তারপর এক বুক ভালোবাসা নিয়ে ফিসফিসিয়ে আওরাল‚
“ফুলকন্যা কেঁদো না প্লিজ। তোমার চোখের অশ্রু আমার বুকটা ঝাঁঝরা করে দেয়। সব ঠিক হয়ে যাবে দেখো। জাস্ট আর কয়েকটা দিন…তারপর তোমায় বউ করে নিয়ে যাবো।
