Home প্রফেসর উজান চৌধুরী প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩০

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩০

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩০
বন্যা সিকদার

“প্রফেসর সাহেব লাভ ইউ!
​উজান হাতে একটা সরু বেত নিয়ে চরম কটমট দৃষ্টিতে মৌ’য়ের দিকে তাকিয়ে রইল। রাত পোহালেই পরীক্ষা‚ আর সেই কারণেই আজ ঘরে এই বিশেষ শাসন ব্যবস্থার আয়োজন করা হয়েছে। পড়ালেখা থেকে নিজের পিঠ বাঁচানোর জন্য মৌ গত আধঘণ্টা ধরে নানা উপায়ে উজান’কে ইমপ্রেস করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু কোনোভাবেই পারছে না। লোকটা কেমন যেন পাষাণ! ​মৌ পড়ার টেবিলে গালে হাত দিয়ে বসে কাঁদো কাঁদো মুখে উজানে’র দিকে তাকাল। ভেবেছিল তার এই করুণ মুখ দেখে হয়তো উজান এবার অন্তত একটু গলবে; কিন্তু ঠিক তখনই প্রফেসরের ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

​“ইডিয়েট ভণ্ডামি রেখে চুপচাপ পড়ো‚ নয়তো আজ একটা বেতের বাড়িও মাটিতে পড়বে না।
​মৌ ঠোঁট উল্টে তাকিয়ে রইল। কিন্তু তাতেও উজানে’র শক্ত মন বিন্দুমাত্র গলল না। সে আবারও ধমকে উঠল‚ “ফাজিল মেয়ে তাকিয়ে আছে কেমন করে দেখো। বইয়ের দিকে চোখ দাও।
​মৌ এবার টেবিলের ওপর একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল‚ “একটা কিসস করি আপনাকে?
​উজান এবার চমকে উঠল। একটা মেয়ে কী পরিমাণ ফাজিল হলে পড়াশোনা থেকে বাঁচার জন্য নিজের টিউটর বর’কে কিস করার ঘুষ দেয়! উজান বড় বড় চোখ করে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারছে এই মেয়ে জীবনেও সোজা পথে হাঁটবে না। সে নিজের রক্তচক্ষু নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল‚
​“এমন বেহায়াপনা কবে থেকে শিখলে‚ শুনি? লজ্জা করে না একটা মেয়ে হয়ে এমন অশ্লীল কথাবার্তা বলতে?
​”ভালোবাসি আপনাকে সেই জন্য তো কিস করতে চাইছি! তাতে এত বকাঝকা করার কী আছে, হুহ! —মৌ মুখ বাঁকাল।

​“লাগবে না আপনার ভালোবাসা! আমাকে ভালোবাসার মানুষের অভাব নেই‚ এমনকি আমিও একজনকে মনে-প্রাণে ভালোবাসি বুঝলেন?
উজান একটু ভাব নিয়ে বলল। ​মৌ’য়ের চোখ এবার কপালে। সে সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে “কীহহহহহ? আপনি ওই শিরিন ডাইনিকে ভালোবাসেন?
​উজান এবার চোখ রাঙাল। পৃথিবীতে কি নারীর এতই অভাব পড়েছে যে‚চট করে এমন একজনের নাম নেওয়া হলো যাকে উজান সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে! উজান চরম বিরক্তি নিয়ে মুখ বাঁকাল‚ “ছেহ্! উজান চৌধুরী কখনো কারো এঁটো জিনিস খায় না বুঝলে?
“তাহলে আমাকে খান!
​কথাটা মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই মৌ লজ্জায় নিজের জিভে কামড় দিল। সে কথার কথায় একী আজেবাজে কথা বলে ফেলল। উজান মৌ’য়ের এমন অবুঝ কাণ্ড দেখে ভেতরে ভেতরে নিঃশব্দে হাসল। মন চাইছে এই পিচ্চি মেয়েটাকে এখনই শক্ত করে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে দুনিয়ার সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে দিতে। কিন্তু নিজের মনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা মনের ভেতর চেপে রেখে সে খানিকটা গম্ভীর গলায় আওড়াল‚
“এমন ছেঁচড়া কথাবার্তা তোমাকে কে শিখিয়েছে হুম? মেয়েদের নিজের ভালোবাসা নিয়ে এতটা নির্লজ্জ হতে নেই‚ বুঝছো?

​মৌ এবার সোজা উজানে’র দিকে তাকাল। সে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে এক ঝটকায় গিয়ে বসল সোজা উজানে’র কোলের ওপর! মৌ হুট করে কোলে এসে বসায় উজান থতমত খেয়ে শুকনো ঢোক গিলল। মৌ ততক্ষণে উজানে’র গলাটা দু-হাতে জড়িয়ে ধরে আদুরে আর অভিমানী স্বরে আওড়াল‚ ​”ভালোবাসলে এমন নির্লজ্জের মতোই বাসতে হয় প্রফেসর সাহেব! যাতে একজন হাত ছেড়ে চলে যেতে চাইলেও অন্যজন যেন তাকে জোর করে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারে। আপনাকে নির্লজ্জের মতো ভালোবাসি বলেই তো আমার কোনো কদর নেই! যেদিন আমি সত্যি সত্যি আপনার জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে যাব‚ সেদিন ঠিকই আমার অভাবটা বুঝবেন।

​পরের কথাগুলো মৌ একরাশ তীব্র অভিযোগের সুরে বলল। মৌ’য়ের এই আকস্মিক অভিযোগ শুনে উজানে’র বুকটা কেঁপে উঠল। মেয়েটার মনের ভেতরের কষ্টটা তার সহ্য হচ্ছে না‚ তবে এই মুহূর্তে সে নিজের ভালোবাসার কথাও প্রকাশ করতে চায় না। তবে সে মনে মনে ঠিক করে নিয়েছে‚ খুব তাড়াতাড়ি এই পরীক্ষাটা শেষ হলেই মেয়েটিকে নিজের সবটুকু দিয়ে আপন করে নেবে। মেয়েটির মনের সকল অভিযোগ সে গভীর ভালোবাসা দিয়ে ভুলিয়ে দেবে। সেই কাঙ্ক্ষিত দিন আর খুব বেশি দূরে নয়।
​মৌ আবারও উজানে’র চোখের দিকে তাকাল। তারপর খুব মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল‚ “আমাকে কি সত্যি সত্যি একটুও ভালোবাসা যায় না প্রফেসর সাহেব?
​উজান খানিকটা ঝুঁকে মৌ’য়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে আওড়াল‚ “আপনাকে ভালোবাসলে এই উজান চৌধুরী বিনিময়ে কী পাবে‚ শুনি?
​মৌ এবার চরম লজ্জা মাখা দৃষ্টিতে তাকাল। সে লজ্জায় উজানে’র শার্ট খামচে ধরে ফিসফিস করে। “আপনি আমার কাছে যা চাইবেন‚ আমি আপনাকে তাই দেব।
​“তাই? তাহলে এরপর থেকে যতগুলো পরীক্ষা দেবে‚ সবগুলোতে গোল্ডেন এ-প্লাস পেয়ে দেখাও! তারপর…
​উজান কথা শেষ করার আগেই মৌ মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল‚ “থাক আমার আর আপনার ভালোবাসার দরকার নেই। এহ্ এসেছে আমার এ-প্লাস নিতে! নিজের এমনিতেই পড়তে ইচ্ছে করে না‚ ওনার আবার এ-প্লাস চাই!
​“চাইব না কেন? প্রফেসর উজান চৌধুরীর ওয়াইফ হয়ে যদি পরীক্ষায় ফেল করো‚ তবে আমার কোনো মান-সম্মান থাকবে?

​মৌ ওমনি মুখ ভেঙিয়ে বাঁকা গলায় বলে‚ “এহ্ বউয়ের রেজাল্ট দিয়ে নাকি আবার ওনার মান-সম্মান! এক কাজ করুন তাহলে‚ এই বারের পরীক্ষায় অন্তত কোনোমতে প্রশ্নটা আউট করে দিন। পাক্কা প্রমিস করছি নেক্সট টাইম থেকে আমি একদম মন দিয়ে পড়ব।
​উজান এবার কপালে হাত দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “শাশুড়ি আম্মা এ কেমন মেয়ে ডাউনলোড দিয়েছ মাবুদ! একটা মানুষ এমন লেভেলের পড়া-চোর হলে‚ আমার ভবিষ্যৎ বাচ্চা কাচ্চা গুলোও যে একটা পড়া-চোর হবে।
​বংশের ভবিষ্যৎ ও বাচ্চার কথা শুনতেই মুহূর্তের মধ্যে মৌ খুশিতে গদগদ হয়ে বলে উঠল‚ “তাহলে চলুন এখনই বাচ্চা কাচ্চা এনে ফেলি! আমার দ্বারা অন্তত এই জন্মে আর এসব পড়াশোনা-টড়াশোনা হবে না।
​কথাটা বলেই মৌ যেমনই উজানে’র দিকে তাকাল‚ ওমনি উজানে’র সেই ভয়ঙ্কর রুদ্রমূর্তি ও অগ্নিদৃষ্টি দেখে সে ভেতরে ভেতরে শুকনো ঢোক গিলল। লোকটা যেভাবে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে মনে হচ্ছে কাঁচাই চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে! ​মৌ ভয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল‚

“এ এ এ এমন করে তাকাচ্ছেন কেন? আমাকে বউ বলে মনে-প্রাণে নাই বা মানলেন‚ অন্তত শাশুড়ি আম্মার মুখের দিকে তাকিয়ে ওনাকে একটা নাতি-নাতনি তো উপহার দিতে হবে নাকি? উফফফ আচ্ছা বাবা ঠিক আছে! অমন রাক্ষসের মতো তাকাতে হবে না‚ লাগবে না আমার বাচ্চাকাচ্চা! সরুন এখান থেকে‚ আমি এখন ঘুমাব।
​মৌ তড়িঘড়ি করে উজানে’র কোল থেকে নেমে যেই না বিছানার দিকে এক পা বাড়াল‚ ওমনি উজান তার হাতের ওপর বেত দিয়ে ঠাসস করে একটা বাড়ি দিল। সামান্য আঘাতেই ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল মৌ। সে ছলছল নয়নে কাঁদো কাঁদো ফেস করে উজানে’র দিকে তাকাল।
​”আ আ আ আপনি আমাকে মারলেন?
​উজান বেতটা টেবিলে ঠক করে রেখে কড়া গলায় বলল‚ “তাড়াতাড়ি পড়ার টেবিলে এসে বসো নয়তো এর চেয়েও বড় পানিশমেন্ট দেব আজ!

​“পড়ব না আমি। কী করবেন আপনি? কী করবেন?
​“পিচ্চি আমার কিন্তু অবাধ্যতা একদম পছন্দ নয়। তাড়াতাড়ি পড়তে বসো বলছি!
​মৌ তবুও নিজের জেদ ধরে রেখে বুক ফুলিয়ে বলে‚ “বললাম তো আমি পড়ব না‚ মানে পড়ব না!
​“উজান চৌধুরী এক কথা বারবার রিপিট করতে পছন্দ করে না পিচ্চি।
​”আমিও তো বললাম পড়ব না! আমাকে যখন বউ বলে মানেনই না‚ তাহলে এখন কিসের এত অধিকার দেখাচ্ছেন শুনি?

​মৌ’য়ের এমন মুখে মুখে উত্তরে উজান চরম রাগান্বিত হলো। সে রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে‚ কোনো কিছু না ভেবেই মৌ’য়ের নরম হাতের তালুতে গুনে গুনে পাঁচটি বেতের আঘাত করল! ​হাতে বেতের বাড়ি পড়তেই মৌ চাতক পাখির মতো স্তব্ধ দৃষ্টিতে উজানে’র দিকে তাকিয়ে রইল। সে জাস্ট পড়তে চায়নি‚ এই সামান্য অপরাধে লোকটা তাকে এতটা নির্মমভাবে আঘাত করল? মানুষটা যদি তাকে সত্যি সত্যি একটুও ভালোবাসত‚ তবে কি তার প্রতি এতটা কঠোর হতে পারত? ক্ষোভে ও অভিমানে মৌ’য়ের দু-চোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। ​উজান নিজের ভেতরের অস্থিরতা ঢাকতে আবারও গর্জন তুলে আওড়াল‚
“ইডিয়েট আবারও তাকিয়ে আছে? পড়তে বসো।কোনো সাবজেক্টে যদি ফেল আসে‚ তবে এবার চ্যালা কাঠের বাড়ি পড়বে শরীরে! তবুও হা করে তাকিয়ে আছে! এদিকে এসো।

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ২৯

​মৌ কাঁদতে কাঁদতে এবার হেঁচকি তুলে ফেলল। তবুও পাষাণ উজানে’র মন বিন্দুমাত্র গলল না। মৌ অতঃপর চোখ মুছতে মুছতে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসল। উজান বইয়ের পাতা উল্টে কিছু কমন প্রশ্ন দাগিয়ে দিল‚ যাতে অন্তত মোটামুটি পাস নম্বরটুকু উঠে আসে। ​মৌ এবার একপ্রকার নিস্পৃহ ও নিরুপায় হয়ে সব পড়া মুখস্ত করে খাতায় লিখতে লাগল। উজান আগের মতোই কড়া দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলেও‚ মৌ এবার আর এক পলকের জন্যও উজানে’র চোখের দিকে তাকাল না। এক তীব্র অভিমান তার পুরো মনকে গ্রাস করে নিয়েছে।

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here