প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৭
বন্যা সিকদার
মৌ গুটি গুটি পায়ে বাগানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা জোরালো‚ শক্ত হাত এসে আচমকা তার হাতটা আঁকড়ে ধরল। মৌ ঝটকা মেরে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাতেই দেখতে পেল রোহান’কে। রোহান’কে দেখামাত্রই মুহূর্তের মধ্যে মৌ’য়ের মুখের সমস্ত রঙ পাল্টে গেল। সে তীব্র ঘৃণায় আর বিরক্তিতে এক ঝামটা দিয়ে রোহানে’র হাতটা নিজের গা থেকে সরিয়ে দিল। মৌ’য়ের এই রূঢ় আচরণ দেখেও রোহান কিন্তু বিন্দুমাত্র ঘাবড়ালো না। বরং সে এক অদ্ভুত শান্ত ও তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নিজের সেই ‘ফুল’-এর দিকে। তার মনের ভেতরের সেই ছোট্ট ফুলটি আজ অনেক বড় হয়ে গেছে। ঠিক যতটা বড় হলে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে অন্য সবার থেকে আগলে রাখা যায়‚ সে আজ ততটাই মোহনীয় হয়ে উঠেছে। তবে মেয়েটার চোখের সেই রক্তিম ও জ্বলন্ত দৃষ্টি দেখে মুহূর্তের মধ্যে রোহান নিজের মাথাটা কিছুটা নিচু করে নিল।
ঠিক তখনই যেন আকাশ ভেঙে এক প্রলয়ংকরী গর্জন ভেসে এলো। আজ শ্রাবণ মাসের দ্বিতীয় দিন। আষাঢ় আর শ্রাবণ এই দুই বর্ষা ঋতুর মাস অন্য সব মাসের তুলনায় বড্ড খামখেয়ালি। কখন যে আসমান ফুঁড়ে মুষলধারে বৃষ্টি নামবে‚আর কখন তপ্ত রোদ উঠবে‚ তা বোঝা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে। এখন ঠিক তেমনই হচ্ছে‚ আকাশ কালো করে মেঘের ঘন ঘন ডাক শুরু হয়ে গেছে আর চারদিকের গাছপালা উত্তাল বাতাসে পাগলপারা হয়ে দোলা দিয়ে উঠছে। ঝড়ের সেই মাতাল হাওয়াকে সাক্ষী রেখে রোহান আবার চোখ তুলে মৌ’য়ের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে এক তীব্র‚ বুকফাটা অসহায়ত্ব ফুটিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।
“একটু ভালোবাসবি ফুল?
রোহানে’র এই কাতর আর আর্ত কণ্ঠস্বর শুনে মৌ নিজের ভেতরের উপচে পড়া রাগটাকে কোনোমতে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনল। মৌ’কে চুপ থাকতে দেখে রোহান আবারও ব্যাকুল হয়ে বলে উঠল‚ “ফুল কথা বলছিস না কেন? একটু ভালোবাসবি আমায়? সত্যি করে বলছি‚ তোকে ছাড়া আমার এই জীবনটা একেবারে শূন্য হয়ে গেছে। ভালো লাগে না কিছু‚ চারপাশের সবকিছু কেমন দম বন্ধ করা জেলের মতো লাগে আমার। তুই শুধু একবার আমার হয়ে যা না,ফুল! তোকে আমি পৃথিবীর বুক উজাড় করা ভালোবাসা দেবো‚ কখনো কোনোদিন একটা অভিযোগ করার সুযোগও তোকে দেবো না। এই এতিম ছেলেটাকে তোর ভালোবাসার একটুখানি ভিক্ষা দে না‚ প্লিজ!
মৌ আর সহ্য করতে না পেরে কড়া গলায় বলে উঠল‚ “রোহান ভাইয়া! আল্লাহর দোহাই লাগে‚ এবার অন্তত থামো প্লিজ। কেন দিনের পর দিন এমন পাগলামি করছো তুমি?
রোহান এক তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে আনমনে মৌ’য়ের দিকে তাকিয়ে আওড়াল‚ “তুই তো আমার না‚ তবুও কেন তোর জন্য এত মায়া হয়? তুই তো আমার হবি না‚ তাহলে কেন এই হৃদয় তোকে পাওয়ার জন্য ছটফট করে?
তার এই প্রশ্নের পিঠে মৌ প্রথমে কোনো উত্তর খুঁজে পেল না। চারপাশের গাছের পাতার খসখসানি আর মেঘের গর্জনের মাঝে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা বিরাজ করল। রোহান আবারও অধৈর্য হয়ে বলে উঠল‚ “কী হলো ফুল? উত্তর দে। যখন তুই আমার হবিই না তাহলে কেন আমার বুকে ভালোবাসা জন্ম দিলি? কেন হৃদয় বুঝে না তুই সত্যি সত্যি অন্য কারো? বল আমায়।
ঠিক তখনই মৌ মৃদুস্বরে বলতে লাগলো ”ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড। একটু বোঝার চেষ্টা করো ভাইয়া। এটা কোনোদিনও সম্ভব নয়। আমি আমার প্রফেসর সাহেবকে ছেড়ে তোমার সাথে নতুন করে ঘর বাঁধতে পারব না। পারবো না আমি তোমার হতে। আমি শুধু তারই।
মৌ’য়ের মুখ থেকে উজানের নাম শোনামাত্রই রোহানে’র ভেতরের সুপ্ত শয়তানটা যেন এক লহমায় জেগে উঠল। সে এক হিংস্র ঝটকায় মৌ’য়ের দুই কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরে হুংকার দিয়ে উঠল‚
“কেন পারবি না? বল আমায়‚ কেন পারবি না? কীসের অভাব আছে আমার মাঝে? আমি তো উজানে’র থেকে কোনো অংশে কম নই। সব দিক দিয়ে আমি ওকে টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা রাখি‚ তবুও কেন তুই বারবার এভাবে আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছিস? কেন আমাকে গ্রাহণ করছিস না?
কথাটা শেষ হতে না হতেই এক থাপ্পড়ের শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। মৌ নিজের সম্পূর্ণ শক্তি দিয়ে রোহানে’র গালে এক সজোরে থাপ্পড় বসিয়ে দিল। রাগে মৌ’য়ের ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে টকটকে লাল হয়ে উঠল। চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠল এক প্রলয়ংকরী রূপ। সে আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে রোহানে’র শার্টের কলারটা নিজের দুই মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে এক বাঘিনীর মতো গর্জন করে উঠল‚
”কারণ তোমাকে আমার বিন্দুমাত্র ভালো লাগে না‚ রোহান ভাইয়। তোমাকে আমি চিরকাল শুধু নিজের বড় ভাই ভেবে সম্মান করে এসেছি। আর সবচেয়ে বড় কথা‚ তুমি একজন অত্যন্ত নোংরা ও খারাপ পুরুষ। তুমি মোটেও ভালো মানুষ নও‚ আর না তুমি আমার যোগ্য!
মৌ’য়ের মুখে নিজের এমন কুৎসিত রূপের বর্ণনা শুনে রোহান পুরো স্তব্ধ হয়ে গেল। সে অসহায় ও বিভ্রান্ত স্বরে শুধাল‚ “ত ত ত তুই কী বলতে চাচ্ছিস ফুল?
ঠিক তখনই আকাশের এক তীব্র বজ্রপাতের আলোর সাথে সাথে মৌ’য়ের কণ্ঠও বজ্রের মতো গর্জে উঠল‚ ”আজ থেকে ঠিক সাত বছর আগের কথা মনে পড়ে তোমার? তুমি তখন ইউএসে (USA) গিয়েছিলে। আর সেখানে যাওয়ার কিছুদিন পরই নাকি ‘কেউ একজন’ তোমার ভিসা আর পাসপোর্ট চুরি করেছিল। সে শুধু তোমার ভিসা চুরি করেই ক্ষান্ত হয়নি ভাইয়া তোমার নাম‚ পাসপোর্ট নম্বর এবং সমস্ত ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে আমেরিকার এক নামকরা ব্যাংকে ফেক অ্যাকাউন্ট খোলে এবং লাখ লাখ ডলারের ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি করে।
আর সেই জালিয়াতির অপরাধে ওখানকার পুলিশ তোমাকে গ্রেপ্তার করে এবং মার্কিন আইন অনুযায়ী তোমাকে পুরো পাঁচ বছরের জন্য কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আমার প্রশ্ন হলো কারাগার থেকে বের হওয়ার পর‚ বাকি মাত্র দুই বছরে তুমি আমেরিকার মাটিতে এমন কী আলাদিনের চেরাগ হাতে পেলে যে তুমি রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেলে‚ হুম? একটু বুঝিয়ে বলবে আমায় সেখানে কত বড় সৎ ও ভালো কাজ ছিল‚ যা করে একটা সদ্য জেলখাটা আসামি দুই বছরে কোটিপতি হয়ে দেশে ফেরে? আমি যদি সাপোজ ধরেও নিই যে তুমি মাসে দুই লাখ টাকা করে লিগ্যাল ইনকাম করতে‚ সেই হিসেবে দুই বছরে তোমার সর্বোচ্চ ৪৮ লাখ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু তোমার অ্যাকাউন্টে তো এখন কোটি কোটি টাকা। বলো আমায়‚ কীভাবে হলে তুমি এত টাকার মালিক?
মৌ’য়ের মুখ থেকে নিজের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার ও গোপন অধ্যায়ের নিখুঁত বিবরণ শুনে রোহান যেন জীবন্ত এক পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলো। তার পায়ের তলার মাটি যেন মুহূর্তে সরে গেল। সে নিজের স্বাভাবিক ভাব বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল‚
“ফু ফুল ফুল তুই এসব আজেবাজে কথা কীভাবে জানলি?
মৌ এবার তাচ্ছিল্যের অট্টহাসিতে মেতে উঠল। অতঃপর রোহানে’র কলারটা এক ঝটকায় ছেড়ে দিয়ে তার চোখের দিকে চেয়ে অত্যন্ত চিবিয়ে চিবিয়ে বলল‚ ”আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগের কথা। আমি যখন নিজের রুমে বসে ফেসবুক স্ক্রল করছিলাম‚ তখন হুট করেই আমার টাইমলাইনে পুরো দুই বছর আগের একটা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম নিউজ ভেসে আসে।
যেহেতু আমি সবসময় ইন্টারনেটে আমার প্রফেসর সাহেবকে নিয়ে এবং ওনার পোস্টিং সিটি নিউইয়র্ক নিয়ে বেশি মাতামাতি বা সার্চ করতাম‚ হয়তো সেই অ্যালগরিদমের কারণেই আমেরিকার ওই জালিয়াতির নিউজটা হুট করে আমার ওয়ালে এসে পড়েছিল। সেখানের সেই ক্রাইম নিউজে আমি তোমার একটা আবছা আবছা ছবি স্পষ্ট দেখেছি। আর সেটা দেখে তোমায় চিনতে পেরেছি আমি কিন্তু কাউকে বলিনি। এবার বলো কিভাবে কোটি টাকা ইনকাম করা পসিবল।
মৌয়ের মুখ থেকে নিজের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সত্যটি শোনার পর রোহানে’র মুখ দিয়ে আর কোনো কথা সরল না। তার সমস্ত যুক্তি যেন মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার এই নিশ্চুপ রূপ দেখে মৌ’য়ের চোখের সেই প্রলয়ংকরী হিংস্রতা কিছুটা স্তিমিত হলো। সে এক অদ্ভুত শান্ত ও কোমল গলায় বলল‚
”রোহান ভাইয়া অতীত যা-ই হোক‚ আমি চাই না তুমি যে খারাপ কাজই করেছো সেটা সবার সামনে এক্সপোজ হোক। আমি এখনো তোমাকে ভাই হিসেবে সম্মান করি। সো প্লিজ‚ তুমি নিজের জন্য নতুন কাউকে খুঁজে নাও এবং নতুন করে সুন্দর একটা জীবন শুরু করো। একটা লক্ষ্মী মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে তুলো৷
রোহান শূন্য দৃষ্টিতে মৌ’য়ের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে এক বুকফাটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সে অত্যন্ত ভারী ও ভাঙা গলায় আওড়াল‚ “ফুল‚ কখনো শুনেছিস প্রাণভোমরা ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব? কখনো শুনেছিস এক নারীতে আসক্ত হলে দ্বিতীয় কোনো নারীর সাথে সংসার বাঁধা যায়? কখনো শুনেছিস নিজের ভালোবাসাকে জীবন্ত কবর দিয়ে অন্য কাউকে আপন করে নেওয়া যায়?
কথাটা শেষ হতে না হতেই আকাশ ভেঙে ঝুমঝুম করে মুষলধারে বৃষ্টি নামতে শুরু করে দিল। শ্রাবণের সেই তীব্র বর্ষণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে মৌ আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে তড়িঘড়ি করে ছাঁট এড়াতে বাড়ির ভেতরের দিকে দৌড়ে চলে গেল। কিন্তু রোহান যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল‚ ঠিক সেখানেই একভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটি যাওয়ার সময় একবারের জন্যও পেছন ফিরে তার দিকে তাকাল না। রোহান সেই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে মৌ’য়ের চলে যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে আনমনে সুরে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল‚
“অথচ তুই কোনো কালেই জানতে পারবি না…..তোকে নিজের করে পাওয়ার জন্য কত নারীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছি আমি…!!
চারপাশে তখন মেঘের ডাক আর বিদ্যুতের চমকানি আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। আলোর সেই তীব্র ঝলকানিতে চারদিকের অন্ধকার হয়ে উঠছে। রোহানে’র আর সেখানে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মতো ক্ষমতা রইল না। তার বুকের ভেতর এক অসহ্য‚ তীব্র যন্ত্রণা মোচড় দিয়ে উঠল। এই বুকে জ্বলতে থাকা দহনের আগুন নেভানোর কোনো রাস্তা তার জানা নেই। ঠিক এই অসহায় মুহূর্তে তার নিজের মৃত মা-বাবার কথা ভীষণ ভাবে মনে পড়ে গেল। চোখের জল আর বৃষ্টির জল একাকার করে সে ধুপধাপ পা ফেলে তালুকদার বাড়ি থেকে একপ্রকার উন্মাদীর মতো বেরিয়ে গেল। তার একমাত্র গন্তব্য গ্রামের এক কোণে থাকা তার বাবা-মায়ের কবরস্থান।
কিছুক্ষণ পর তীব্র ঝড়-বৃষ্টির মাঝে রোহান তার কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছেও গেল। সেখানে পৌঁছানো মাত্রই সে যেন তার শরীরের শেষ অবশিষ্ট শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলল। আচমকা নিজের শরীরের ভারসাম্য সামলাতে না পেরে সে ধপাস করে ভেজা মাটিতে গুটিয়ে পড়ল। শ্রাবণের কর্দমাক্ত পানিতে তার পোশাক‚ পুরো সুঠাম শরীর মাখামাখি হয়ে গেল কিন্তু সেসবে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। সে পাগলের মতো দু-হাতে নিজের মায়ের ভেজা কবরের মাটি জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। কিন্তু চারপাশের এই প্রলয়ংকরী ঝড় আর বৃষ্টির শব্দের নিচে তার সেই গগনবিদারী চিৎকারের শব্দটুকু ঢাকা পড়ে গেল। কোনো জীবিত মানুষ তার ভেতরের এই চরম হাহাকার দেখতে পেল না।
“মা গো ও মা‚ তোমরা কেন চলে গেলে আমায় ছেড়ে? তোমাদের সাথে আমাকেও নিয়ে গেলে কী হতো? তোমাদের ছেলে একদম ভালো নেই মা। আমি বেঁচে থেকেও জিন্দা লাশ হয়ে আছি। কেউ ভালোবাসে না এই এতিম ছেলেটাকে। আমাকে তোমাদের কাছে নিয়ে নাও না মা…আমি এই স্বার্থপর দুনিয়ায় আর থাকতে চাই না!
রোহানে’র এই বুকফাটা আর্তনাদ খোলা আকাশের বুকে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। সে কবরের ভেজা কাদা মাটিতে নিজের মুখটা ঘষতে ঘষতে আবারও তীব্র আক্ষেপের সুরে বলে উঠল‚
“মা ও মা ফিরে এসো না গো একবারের জন্য। তোমার ছেলের বুকে সত্যি খুব কষ্ট হচ্ছে মা‚ প্লিজ ফিরে এসো। জানো মা‚ তোমার এই আদরের ছেলেটা আর আগের মতো নেই। সে এখন মন খুলে হাসতে পর্যন্ত ভুলে গেছে। এখন তীব্র কষ্ট পেলেও কারো কোলে মাথা রেখে একটু শান্তিতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদার সুযোগ পাই না। কেউ এই দুনিয়ায় আমার খোঁজ নেয় না মা। বাইরের সব মানুষ ভাবে রোহান কত সুখী‚ কত বিত্তশালী‚ কত ভালো আছে সে। অথচ আমার ভেতরের এই নরক যন্ত্রণা কেউ দেখে না…কেউ ওপাশ থেকে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে না—
❝বাবা কষ্ট পাস না‚ সব ঠিক হয়ে যাবে❞
জানো মা‚ আমার সেই ফুল আর আমার নেই। সে আজ অন্য কারো বিবাহিতা স্ত্রী হয়ে গেছে। আমার ফুল আর আমাকে চায় না মা। সে আজ অন্য কোনো পুরুষের বুকে মাথা গুঁজে নিজের জীবনের পরম শান্তি খুঁজে নেয় অথচ আমাকে এই দহনের আগুনে প্রতিটা পল পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে।
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৬
বলতে বলতে হঠাৎ করেই রোহানে’র শরীরটা একদম নিস্তেজ হয়ে এল। বৃষ্টির তীব্র ঠান্ডায় আর মনের ভেতরের উপচে পড়া যন্ত্রণার ক্লান্তি লহমায় তার কথা বলার শেষ শক্তিটুকুও কেড়ে নিল। সে মায়ের কবরের ভেজা মাটিটুকু বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে একদম চুপ করে পড়ে রইল। চারপাশে তখন শুধু ঝুমঝুম বৃষ্টি পরতে লাগলো।
