প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫৪
বন্যা সিকদার
গোধূলির বিকেল। আকাশ জুড়ে তখন রক্তিম আভা ছড়িয়ে সূর্যটা যেন ধীরে ধীরে হেলে পড়ছে পশ্চিমের দিগন্তে। রক্তিম আলোর শেষ রশ্মিটুকু তখন ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। এমন এক সময়ে মৌ বাসার ছাদে একা একা পায়চারি করছিল। দখিনা হাওয়া এসে বারবার তার নরম গা ছুঁয়ে যাচ্ছে‚ ওড়নার আঁচল আর কপালের এলোমেলো চুল গুলোকে উড়িয়ে দিচ্ছে অবাধ্যভাবে। হালকা এক শীতের পরশ জড়িয়ে ধরছে শরীরকে। উজান এখন বাসায় নেই‚ কোনো জরুরি কাজে বাইরে গেছে আর ঠিক সেই সুযোগেই এত সুন্দর একটা বিকেল একা একা উপভোগ করছিল সে। আগে মেহের’কে ডেকে আনতে তার রুমে গিয়েছিল মৌ কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখে ইফাত আর মেহের নিজেদের মাঝেই মিষ্টি কিছু মুহূর্তে হারিয়ে আছে। ইফাতে’র সেই অসহায় আর আকুল দৃষ্টি দেখে মৌ মুচকি হেসে নিজেই চুপচাপ ছাদ থেকে সরে এসেছে। মৌ তো ছোটবেলা থেকে জীবনে ঠিক এতটুকুই চেয়েছিল‚ তার প্রাণের মেহু যেন সবসময় পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটা হয়। তার মেহুর জীবনে এমন এক রাজপুত্র আসুক‚ যে পুরো দুনিয়া ভুলে শুধু মেহের’কেই আঁকড়ে ধরে বাঁচবে। পরম করুণাময় ওপরওয়ালা মৌ’য়ের সেই মনের গভীর প্রার্থনাটা আজ সত্যি সত্যি কবুল করেছেন। ভাবনার সাগরে ঠিক যখন ভেসে যাচ্ছিল মৌ। অমনি এক তীব্র ও ভারী আওয়াজে কানের কাছে আকস্মিক ভেসে এলো এক চেনা আহ্বান।
“ফুল…!!
কথাটা প্রলয়ংকরী বজ্রপাতের মতো এসে মৌ’য়ের কানে বাজল! কন্ঠস্বরটা বড্ড চেনা‚ বড্ড আতঙ্কের। মৌ অমনি তড়িৎ গতিতে পেছনে ফিরে তাকাল এবং শিউরে উঠল। রোহান তালুকদার দু-হাত বুকের ওপর শক্ত করে ভাঁজ করে ধীর পায়ে তার দিকেই হেঁটে আসছে। লোকটাকে এই সময় ছাদে দেখে মৌ’য়ের বুকের ভেতরটা ভয়ে মুহূর্তে হিম হয়ে গেল। রোহান এই বাড়ির এখানে কীভাবে ঢুকল‚ তা সে কোনোভাবেই ভেবে পাচ্ছে না। রোহান চওড়া ধাপে এগোতে শুরু করতেই মৌ আতঙ্কে পিছাতে লাগল। ভয়ে বারবার শুকনো ঢোক গিলে ব্যাকুল চোখে চারপাশটা দেখার চেষ্টা করছে সে। পিছাতে পিছাতে একসময় ছাদের এক পাশের ঠান্ডা দেয়ালে মৌ’য়ের পিঠ ঠেকে গেল। আর পিছানোর কোনো পথ নেই।
মৌ’কে দেয়ালে আটকে যেতে দেখে রোহানে’র ঠোঁটে এক বিষাক্ত ও তাচ্ছিল্যের হাঁসি ফুটে উঠল। মৌ কোনো মতে ভয়ার্ত ও মিনমিন স্বরে জিজ্ঞেস করল।
”ত ত তুমি এখানে কী করছো রোহান ভাইয়া? কী চাই তোমার?
রোহান মৌ’য়ের এক হাত দূরে এসে থমকে দাঁড়াল। ছায়া সূর্যালোকে তার ফ্যাকাশে মুখটা বড় ভয়ংকর দেখাচ্ছিল। সে এক বিষাদময় চোখে তাকিয়ে বলল‚
“আমার চাওয়া-পাওয়ার মাঝে কেবল একজনই ছিল‚ আর সেটা কেবল তুই। যাকে হাজার বার তাহাজ্জুদের নামাজে চেয়েও এই অভিশপ্ত রোহান তালুকদার শেষ পর্যন্ত পেল না!
মৌ বুকভরে একটা তপ্ত শ্বাস ফেলল। ব্যাকুল হয়ে ছাদের আশেপাশে তাকাল কোনো পরিচিত মানুষকে পাওয়ার আশায় কিন্তু পুরো ছাদ একদম নির্জন‚ নিস্তব্ধ। রোহান মৌ’য়ের এই ছটফটানি দেখে আবারও এক অদ্ভুত তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। বিষাদময় চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল‚ “যে মেয়ে মানুষকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন পর্যন্ত করতে পারে…সেই মেয়ে আজ এই রোহান তালুকদারকে দেখে এত ভয় পাচ্ছে? সিরিয়াসলি? ভাবতেও কেমন হাসির পাচ্ছে।
কথাটা যেন সত্যি সত্যি বজ্রপাতের মতো এসে মৌ’য়ের কান আর মাথায় আছড়ে পড়ল। তার ফর্সা মুখটা মুহূর্তে রক্তশূন্য হয়ে একবারে ফ্যাকাশে সাদাটে রূপ নিল। সে আতঙ্কে ছানাবড়া চোখে রোহানে’র দিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বলে উঠল‚
”এ এ এসব কী বলছো তুমি রোহান ভাইয়া?
“অভিনয়টা বেশ চমৎকারই আয়ত্ত করে ফেলেছিস ফুল। আচ্ছা‚ তুই আমাকে মনে মনে আসলে কী ভাবিস বল তো? কিছুই তো মাথায় ঢোকে না আমার। তবে শুনে রাখ…রোহান তালুকদারকে তুই যতটা গভীর জলের মাছ ভাবিস‚ তার থেকেও শত-সহস্র গুণ বেশি গভীর জলের মাছ হলো এই রোহান তালুকদার নিজে।
মৌ এবার পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। তার মুখের সমস্ত ভাষা‚ কথা বলার শক্তি যেন এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে এমন পরিস্থিতিতে তাকে কী বলা উচিত‚ তার কিছুই মাথায় আসছে না। হঠাৎই রোহান আর এক ধাপ এগিয়ে এলো মৌ’য়ের একদম গা-ঘেঁষে। ভয়ে দেয়ালে আরও বেশি গুটিয়ে গেল মৌ‚ চোখ দুটো আতঙ্কে বন্ধ করার উপক্রম। ঠিক তখনই রোহান মৌ’য়ের চোখের দিকে সরাসরি নিজের ধারালো চোখ রেখে‚ খানিকটা নিচু হয়ে পরম ব্যাকুলতা ও হাহাকার নিয়ে ফিসফিসিয়ে আওড়াল।
“কি বিশ্রী অনুভূতি। যে মরে যাওয়ার মতো কষ্ট দেয় তাকে’ই শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ভালোবাসতে মন চায়..!!
কথা কটি শোনামাত্রই মৌ’য়ের ভেতরের পুরো আত্মাটা শিউরে আর কেঁপে উঠল। রোহানে’র ওই ভারী কন্ঠস্বরের ভেতর লুকিয়ে থাকা দীর্ঘদিনের চাপা কান্নার প্রলয় আর তীব্র হাহাকারটা সে খুব ভালো করেই অনুভব করতে পারছে। কিন্তু আফসোস‚ এত কিছু জানার ও বোঝার পরেও মৌ’য়ের নিজের যে আর কিচ্ছু করার নেই। কারণ তার আত্মা‚ তার মন‚ তার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে তো কেবল একজনই রাজত্ব করে চলেছে— তার ভালোবাসার মানুষ প্রফেসর উজান চৌধুরী!
হঠাৎই মৌ মিনমিন গলায় প্রশ্ন করলো‚ ”রোহান ভাইয়া প্লিজ থামো। আর সহ্য হচ্ছে না এসব। কবে মুক্তি পাবো তোমার এই যন্ত্রণা থেকে?
তক্ষণাৎ রোহান এগিয়ে গেল মৌ’য়ের দিকে। আকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। পাষাণ মৌ বুঝতে পারল না তার চোখের ভাষা। বুঝল না তার হৃদয়ের ক্ষতবিক্ষত হাহাকার। এই স্বার্থপর দুনিয়ার কেউ বুঝল না তার আত্মচিৎকার। রোহান নিভু নিভু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আকুতির স্বরে আওড়াল‚
“মুক্তি? আমার ভালোবাসাকে তোর যন্ত্রণা মনে হয় ফুল? যা‚ দিলাম তোকে মুক্তি। রোহান তালুকদার তার ভালোবাসার যন্ত্রণা থেকে তোকে চিরকালের জন্য মুক্তি দিল। কিন্তু তোকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত ভালোবেসে যাবে এই এতিম ছেলেটা।
কথাটা বলেই ধুপধাপ পা ফেলে ছাদ থেকে চলে গেল রোহান। কিছু সময় মৌ নিজেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে এল। ড্রয়িংরুমে আসতেই সে বুঝতে পারল‚ রোহান লুকিয়ে নয় বরং সকলের সঙ্গে ড্রয়িংরুমে বসে কুশল বিনিময় করে তার কাছে এসেছিল। এমনকি মৌ’য়ের জন্য সে তার সব পছন্দের জিনিসও কিনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এসবে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। সে রোহানে’র পিছু পিছু দৌড়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল। রোহান তখন গাড়ির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় শেষবারের মতো অশ্রুসিক্ত দৃষ্টিতে ফিরে তাকিয়ে আওড়াল‚
“ভালোবাসি ফুল! রোহান তালুকদার আজও তোকে অসম্ভব ভালোবাসে।
রোহানে’র কণ্ঠস্বরটি স্পষ্ট শুনতে পেল মৌ কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। সে কিছু বলতে পারল না। অতঃপর, চোখের পলকে রোহান চোখের আড়াল হয়ে গেল।
ঠিক দুদিন পর। মৌ তাড়াহুড়ো করে কলেজের জন্য রেডি হচ্ছে আর উজান যত্ন করে তার ব্যাগে সব বই-খাতা গুছিয়ে দিচ্ছে। মেয়েটা ইদানীং পড়াশোনায় বেশ মন দিয়েছে। ইদানীং তাকে আর পড়ার জন্য বলতেও হয় না। উজান’কে খুশি করার জন্য এবং চৌধুরী পরিবারের সম্মানে যাতে তার জন্য একফোঁটা আঘাতও না লাগে তাই যে মেয়েটার পড়াশোনা একদমই অপছন্দ ছিল‚ সে-ই এখন দিনরাত এক করে খাটছে ভালো রেজাল্টের আশায়। মৌ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রেডি হওয়ার মাঝেই উজান কয়েক লোকমা ভাত তার মুখে তুলে খাইয়ে দিয়েছে। মৌও লক্ষ্মী মেয়ের মতো না না করে খেয়ে নিল। এরপর আয়নার সামনে বসিয়ে পরম মমতায় তার লম্বা চুল গুলো সুন্দর করে বিনুনি করে দিচ্ছে উজান। আজ কলেজে আবার ক্লাস এক্সাম রয়েছে তাই মৌ’য়ের হাতে খোলা ইংরেজি বই। গতকাল রাতেও অনেক রাত অব্দি পড়েছে সে। হঠাৎই তার হাত থেকে বইটা কেড়ে নিল উজান। মৌ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একটু পেছনে তাকাল। উজান বইটা ব্যাগে রেখে এক হেঁচকা টানে মৌ’কে একদম নিজের শক্ত বুকে জড়িয়ে নিল।
হুট করে আকস্মিক এমন কাণ্ডে হালকা ঘাবড়ে গেল মৌ। তবে বিচলিত না হয়ে একদম স্বাভাবিক গলায় বলল‚
“প্রফেসর সাহেব এখন একটুও দুষ্টুমি করবেন না প্লিজ। কলেজে যেতে কিন্তু লেট হয়ে যাবে?
উজান মুহূর্তের মধ্যে মৌ’য়ের গলার ভাঁজে মুখ গুঁজে দিয়ে একদম নিচু ও মাদকতাময় স্বরে আওড়াল‚
“উঁহু! গতকাল রাতে তো এক ফোঁটাও দুষ্টুমি করতে দাওনি আমাকে‚ আবার এখনও বাধা দিচ্ছ? এটা কিন্তু একদমই ঠিক হচ্ছে না‚ জান।
”প্লিজ ছাড়ুন না। সত্যি সত্যি আজ লেট হয়ে যাবে কিন্তু। —মৌ ছাড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু উজান ছাড়লো না বরং আরো শক্ত করে বুকে জরিয়ে রাখলো।
“বেশি লেট হবে না জান….জাস্ট ফাইভ মিনিট‚ প্রমিজ।
উজানে’র ফাইভ মিনিটের বয়ান শুনে মৌ আর এক সেকেন্ডও সময় নিল না। সজোরে এক ধাক্কা দিয়ে উজান’কে সরিয়ে দিল। হুট করে বউয়ের ধাক্কা খেয়ে উজান সামলাতে না পেরে সোজা গিয়ে বিছানায় ধপাস করে পড়ে গেল। সে অসহায় করে তাকিয়ে রইল কিন্তু মৌ’য়ের সেদিকে বিন্দুমাত্র নজর নেই। সে উল্টো হাত উঁচিয়ে কড়া চেঁচিয়ে উঠল‚
”নষ্ট পুরুষ একটা। পাঁচ মিনিটে আপনার হয়? পাঁচ মিনিটের দোহাই দিয়ে শেষমেশ আমাকে আজ কলেজে যেতেই দেবেন না তো আপনি। সরুন তো এখান থেকে।
উজান বিছানা থেকে উঠে বসে মাথায় হাত দিয়ে বলে উঠল‚ “শাশুড়ির মেয়ে বলে কি? এমনি এমনি তোমাকে আমি নষ্ট মাথার কারখানা বলি না। শয়তান ছেমড়ি‚ তোমাকে জাস্ট কিউটি একটা ‘কিস’ করার কথা বলতে গেলাম আর তোমার ওই নষ্ট মাথা ভেতরে ভেতরে কীসব উল্টাপাল্টা ভেবে বসলে। ছিঃ এত অশ্লীল মেয়ে আমার বউ‚ ভাবা যায়?
মৌ দরজার কাছে গিয়ে ততক্ষণে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। উজানে’র মুখের এমন কথা শুনে লজ্জায় ও অপ্রস্তুত হয়ে নিজের জিভে সজোরে এক কামড় বসাল সে। তারপর একটু জোরপূর্বক হেসে ঘাড় বাঁকিয়ে বলল‚
“সরি সরি‚ দুলহা জান। আসছি আমি। আর হ্যাঁ‚ কলেজ থেকে ছুটির পর বাসায় ফিরে যেন আপনাকে একদম চোখের সামনে দেখতে পাই। কোথা থেকে আসবেন‚ কীভাবে আসবেন‚ আর কত দ্রুত আসবেন আই ডোন্ট কেয়ার। আমি কলেজ থেকে ফিরে আপনাকে রুমে দেখতে চাই‚ মানে চাই।
কথাটা শেষ করেই এক প্রকার দৌড়ে রুম থেকে পালিয়ে গেল মৌ। উজান বিছানায় বসে শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। অতঃপর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির মুচকি হাসি ফুটিয়ে নিজের কাজ গুছাতে মনোযোগ দিল।
এদিকে প্রায় ঘণ্টাখানেক পর মৌ‚ মেহের এবং ইফাত’কে নিয়ে গাড়ি এসে কলেজের মেইন গেটের সামনে থামল। গাড়ি থামা মাত্রই মৌ চটজলদি নেমে গেল। মেহেরে’র দিকে ফিরেও না তাকিয়ে সোজা ক্যাম্পাসের ভেতরের দিকে হেঁটে গেল সে। মেহের যখনই গাড়ি থেকে পা বাড়িয়ে নামতে যাবে‚ অমনি পেছন থেকে ইফাত তার নরম হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে টেনে রাখল। মেহের সাথে সাথে জোড়া ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
”কী হলো‚ যেতে দিন না। মৌ তো আমাকে ফেলে একাই চলে গেল।
ইফাত ঠোঁট উল্টে বলল‚ “তুমি এত আনরোমান্টিক কেন বল তো‚ বউ? ভাবি তো আমাদের একটু প্রাইভেসি দেওয়ার জন্যই একা একা কেটে পড়ল আর তুমি কী না কী ভেবে বসে আছো! আচ্ছা‚ বাদ দাও তো ওসব…কষে পাঁচটা মিষ্টি চুমু দাও তো দেখি।
”কিহহহহ? —মেহের চোখ ছানাবড়া করল।
“যাহ্ বাবা এভাবে চেঁচাচ্ছো কেন? ভুল কী বললাম হ্যাঁ? তুমি যত তাড়াতাড়ি আমাকে মিষ্টি মুখ করাতে পারবে‚ ঠিক তত তাড়াতাড়ি ভাবির কাছে যেতে পারবে নয়তো আজ এখানেই আটকে রাখব।
মেহের অসহায় মেশানো দৃষ্টিতে তাকাল। “প্লিজ ছেড়ে দিন না। এখন কলেজে এসে পৌঁছে গেছি‚ তবুও এভাবে জ্বালাবেন?
“কলেজে এসে গেছি তো কী হয়েছে? কলেজে আসছি বলে কি দুটো চুমুও খেতে পারব না? এটা কোন দেশের নিয়ম? প্লিজ বউ‚ ফাস্ট একটা চুমু দাও না…কেমন যেন খালি খালি লাগছে আমার।
মেহের এবার দুই চোখ বড় বড় করে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকাতেই ইফাত ঢোক গিলে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে চট করে গাড়ির দরজার লক খুলে দিল। সে খুব ভালো করেই বোঝে‚ এখন এর বেশি জোড়াজুড়ি করলে হিতে বিপরীত হবে আর কপালে ঝাটকা জুটবে।
মৌ আর মেহের দুজনে ধীর পায়ে কলেজের চত্বরে ঢুকতেই চারপাশের এক অদ্ভুত থমথমে পরিবেশ তাদের চোখে পড়ল। ক্যাম্পাসে উপস্থিত প্রায় প্রতিটি স্টুডেন্ট তাদের দিকে অত্যন্ত কটু ও বাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। ব্যাপারটা টের পেয়ে মৌ অস্বস্তি নিয়ে মেহেরে’র দিকে তাকাল। তারা যত সামনের দিকে এগিয়ে চলল‚ চারপাশের চোখ গুলো তত বেশি নোংরা আর তীক্ষ্ণ রূপ নিতে লাগল। ফিসফিসানি ছাপিয়ে হঠাৎই দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছেলের স্পষ্ট কটু কণ্ঠ ভেসে এলো।
“আরেহ টিচারদের সাথে এমন ফষ্টিনষ্টি না করলে আবার রেজাল্ট ভালো হয় নাকি? বেহায়া মেয়ে‚ অত বড় কেলেঙ্কারি ঘটিয়ে আবার কলেজে রূপ দেখাতে এসেছে। ছিঃ আমার ভেবেই লজ্জা লাগছে।
কথাটা একদম বিষাক্ত তীরের মতো এসে বিঁধল মৌ’য়ের বুকে। কারণ, বিশ্রীভাবে কথাটা সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে তাকে ইঙ্গিত করেই বলা হয়েছে। বুকের ভেতরটা অজানা আতঙ্কে ধক করে উঠল। আরেকটু সামনে এগোতেই থার্ড ইয়ারের এক সিনিয়র আপু হুট করে এসে মৌ’য়ের পথ আটকে দাঁড়াল। মুখের কদর্য ভঙ্গি করে বাঁকা সুরে বলে উঠল।
“ছিঃ মৌ। তোমার একটুও লাজ লজ্জা বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই? এত বড় একটা জঘন্য অপকর্ম করে আবার কোন মুখে কলেজে আসার সাহস করেছো? এতখানি বেহায়া আর চরিত্রহীন কবে থেকে হলে শুনি?
মৌ ভয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় কোনোমতে জিজ্ঞেস করল‚ “আ আ আপু কী করেছি আমি? সবাই এভাবে কেন কথা বলছেন আমার সাথে?
“চুপ কর‚ একদম মুখ বন্ধ রাখ বেয়াদব মেয়ে। এমন একটা নোংরা আর সস্তা মেয়ের মুখে কথা শুনতেও তো ঘেন্না লাগছে। ছিঃ এইটুকু মেয়ে হয়ে শেষে কিনা টিচারের সাথে।
কথাটা বলেই মেয়েটি মুখ ঘুরিয়ে হনহন করে চলে গেল। মৌ অসহায়‚ ছোট ছোট বিষণ্ণ চোখে মেহেরে’র দিকে তাকাল। মেহের ততক্ষণে মৌ’য়ের বরফশীতল হাত দুটো নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরেছে। মেহের তাকে আশ্বস্ত করে বলল‚ “বনু প্লিজ তুই মন খারাপ করিস না তো। এরা কেন কী কারণে এসব বাজে কথা বলছে‚ কিছুই তো বুঝতে পারছি না। চল‚ আগে ক্লাসে গিয়ে দেখি আসল ব্যাপারটা কী ঘটেছে।
মৌ আর মেহের বুকচাপা ভয় নিয়ে ক্লাস রুমের দিকে পা বাড়াল। ঠিক তখনই করিডোরের মোড়ে তাদের সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়াল ললিতা আর জিহাদ। মৌ’কে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দুজনের ঠোঁটের কোণেই ভেসে উঠল এক বিষাক্ত ও পৈশাচিক তৃপ্তির বাঁকা হাসি। মৌ সহ্য করতে না পেরে ললিতার দিকে তাকিয়ে ব্যাকুল গলায় জিজ্ঞেস করল।
“ললিতা তোরা এমন বিশ্রী আর নোংরা ভাবে হাসছিস কেন বল তো? আর ক্যাম্পাসের সবাই আমাকে দেখে এভাবে বাজে কথা বলছে কেন? কী হয়েছে আমাকে একটু বলবি প্লিজ?
ললিতা চোখ দুটো বড় বড় করে বলে উঠল‚ “হাউ সুইট। মৌ তুই বুঝি সত্যিই কিচ্ছু জানিস না যে কলেজের সবাই আজ তোর দিকে এভাবে থুথু ফেলছে কেন?
”এমন হেঁয়ালি না করে সোজা বল না কী হয়েছে?
জিহাদ পাশে দাঁড়িয়ে বাঁকা হেসে বলে উঠল‚ “ললিতা জানিস ভাবতেও গা ঘিনঘিন করছে যে‚ এমন একটা নষ্টা মেয়েকে আমি একসময় প্রপোজ করেছিলাম! ছিঃ মৌ‚ ছিঃ। তুমি শেষ পর্যন্ত এতটা নিচু আর এতটা খারাপ?
জিহাদে’র মুখ থেকে এমন অপবাদ শুনে মৌ’য়ের দুই চোখের কোণ বেয়ে অঝোর ধারায় দু-ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। সে ভয়ে ও অপমানে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে হাত জোড় করে বলল‚
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫৩
“জ জ জিহাদ এসব কী বলছো তুমি? আমি কী করেছি?
“সত্যিই কিছু বুঝতে পারছো না? চলো তাহলে‚ আজ নিজের চোখেই তোমার রঙ্গলীলা দেখবে।
এই বলে ললিতা আর জিহাদ তাদের আগে আগে ক্লাসরুমের দিকে হেঁটে গেল আর পেছনে পেছনে এক অজানা আশঙ্কায় মেহের’কে নিয়ে পা বাড়াল মৌ। ক্লাস রুমের দরজার সামনে পৌঁছে ভেতরে পা রাখতেই‚ মুহূর্তের মধ্যে মৌ’য়ের বুকের ভেতরের আত্মাটা যেন আতঙ্কে শিউরে উঠল। হাত-পা একদম অবশ হয়ে এলো তার‚ চোখের সামনে পুরো দুনিয়াটা এক লহমায় যেন ঘোর অমাবস্যার অন্ধকারে ঢেকে গেল। বিশাল সেই ক্লাসরুমের প্রতিটি দেয়ালে…..
