প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৯
রাত্রি মনি
ল্যাবরেটরির ভেতরে বিশাল এক কাঁচের ঘর। চারপাশে হালকা নীল আলো, কিন্তু সেই আলো যেন মৃত্যু-ঘন অন্ধকারকে আরও প্রকট করে তুলেছে। ঘরের মাঝখানে বিশাল কাঁচের বক্স। ভেতরে আটকে আছে এক দানবসদৃশ মানুষ, ন্যারো।
উচ্চতায় সাত ফুট ছুঁই ছুঁই। বুকটা যেন পাথরের দেয়াল, শিরা-উপশিরায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তার চোখের মণি দুটো রক্তাভ কোনো মানুষ নয়, শিকারি পশুর থেকেও ভয়ংকর। দাঁতগুলো লম্বা, ধারালো চাকুর মতো, সামান্য নড়লেই হিংস্র ঝিলিক বেরোয়। সারা দেহজুড়ে অজস্র বাঘের ট্যাটু। যেন দেহ আর চামড়া মিলেমিশে এক অদ্ভুত শিকারির খাঁচা। তার হাতের নখ গুলো লম্বা ব্লেডের মতো, প্রতিটি শ্বাসের সাথে কাঁচের দেয়ালে ঘষে হালকা খসখসে শব্দ তুলছে। একটা শিকারি পাখির ডানার কক কক আওয়াজের মতো ভয়ের স্রোত নামিয়ে আনছে।
তার সামনে বড় আসনে হেলান দিয়ে বসে আছে আলেসান্দ্রো। ঠান্ডা, নির্লিপ্ত চোখ। পায়ের উপর পা তুলে হাতে ধরে রেখেছে একটা চকচকে চাপাটি। চাপাটিটা সে ধীরে ধীরে আঙুলে ঘোরাচ্ছে, যেন কোনো খেলনা। কিন্তু প্রতিটি ঘূর্ণনের সাথে আলোয় ছায়া খেলে যাচ্ছে তার মুখে, ভয়ংকর, শিকারি ছায়া।
ঠিক তার সামনে, হাঁটু মুড়ে, মাথা ঝুঁকিয়ে বসে আছে এক সাধারণ বিজ্ঞানী। পরনে সাদা এপ্রোন, হাত পেছনে বাঁধা। তার কাঁধ কাঁপছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, কিন্তু কথা বেরোচ্ছে না। ভয়ে তার চোখে প্রতিটি ছায়া ভৌতিক মনে হচ্ছে।
ঘরের অন্য প্রান্তে, সিলিং থেকে হাত বাঁধা অবস্থায় ঝুলছে এক লোক। তার চোখ দুটো সাদা হয়ে এসেছে, ঠোঁটে শুকনো রক্ত জমে আছে। প্রতিটি শ্বাস তার জন্য যন্ত্রণার মতো, বুকের ভেতর কেবল হাহাকার জমে উঠছে।
হঠাৎ, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই আলেসান্দ্রো চাপাটি তুলে ধরে এক ঝটকায় গলাকাটা কোপ বসিয়ে দিল বিজ্ঞানীর ঘাড়ে।
কোনো চিৎকারের সুযোগ পেল না মানুষটা। তার শরীর এক মুহূর্তে লাফিয়ে উঠলো, তারপর নিস্তেজ হয়ে গেল। উষ্ণ, টগবগে রক্ত ছিটকে এসে পড়লো আলেসান্দ্রোর মুখে। সে চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে শ্বাস নেয়। তার কাছে রক্তের ঘ্রাণ যেন আফিমের চেয়েও নেশালো।
মুহূর্তের জন্য চারপাশ স্তব্ধ। কাঁচের ভেতর থেকে ন্যারোর ঘোঁৎ ঘোঁৎ গর্জন শোনা যাচ্ছে সে রক্তের গন্ধে পাগল হয়ে খাঁচার দেয়ালে আছড়ে পড়ছে। আলেসান্দ্রো চোখ মেলে তাকায়। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে এক কুটিল হাসি।
পাশে ঝুলে থাকা লোকটার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্তের মতো অশ্রু। চোখের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে, যেন কোনো ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের ভেতর আটকে আছে সে। সে ছটফট করছে কখনো শরীর কাঁপিয়ে নিচে নামতে চাইছে, কখনো শিকল ছিঁড়ে পালাতে চাইছে। কিন্তু তার ঠোঁট শক্ত টেপে আটকানো। মুখ ফাটাতে চাইছে, চিৎকার করতে চাইছে কিন্তু বের হচ্ছে কেবল দমবন্ধ করা চাপা গোঙানির শব্দ। সেই গোঙানির ভেতর লুকিয়ে আছে নিঃশব্দ মৃত্যু-প্রার্থনা।
অন্যদিকে, কাঁচের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা ন্যারো যেন আরও উন্মত্ত হয়ে উঠছে। চারপাশে রক্তের গন্ধ তাকে পাগল করে তুলেছে। তার রক্তাভ চোখে এখন শুধু ক্ষুধা অপরিসীম, অমানবিক ক্ষুধা। জিভ লকলক করছে, মুখ দিয়ে আঠালো লালচে লালা গড়িয়ে পড়ছে কাঁচের মেঝেতে। তার দাঁতগুলো, সেই চাকুর মতো ধারালো দাঁত, ভয়ংকরভাবে বেরিয়ে আছে ঠোঁটের আড়াল থেকে। একের পর এক প্রচণ্ড ধাক্কা মারছে কাঁচের বক্সে। প্রতিটি আঘাতে ধাতব গর্জন ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে, যেন পুরো ল্যাব কেঁপে উঠছে।
আলেসান্দ্রো সেদিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে মুচকি হাসে। তার চোখে ভয়ের বিন্দুমাত্র ছাপ নেই—বরং দানবীয় আনন্দের এক তীব্র ঝিলিক। সে চাপাটি তুলে ধরে নিখুঁত কসাইয়ের মতো লাশের শরীরে কাজ শুরু করে। একেকটা কোপ চপ! হাত আলাদা। চপ! পা আলাদা।
চপ! চপ! চপ! শরীরের প্রতিটি অঙ্গ ধীরে ধীরে খণ্ডিত হতে থাকে।
তাজা উষ্ণ রক্তের স্রোত মেঝের সাদা ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে। সাদা মেঝেটা ধীরে ধীরে লাল সমুদ্রে পরিণত হচ্ছে। রক্তের ছিটা ছিটকে এসে দেয়ালে ছাপ ফেলছে, আলোতে তা যেন রক্তিম ছোপে নাচছে।
আলেসান্দ্রো প্রতিটি টুকরো আলাদা করার সময় এক অদ্ভুত ধ্যানস্থ অবস্থায় চলে যায়। তার ঠোঁটে একরাশ শান্তির রেখা। চোখের ভেতর প্রশান্তির আলো। যেন মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খণ্ড খণ্ড করা কোনো ভয়ংকর শাস্তি নয় বরং তার কাছে এটাই শিল্প। এটাই আনন্দ।
ন্যারো রক্ত দেখছে, গর্জন করছে, ধাক্কাচ্ছে আর আলেসান্দ্রো প্রতিটি অঙ্গ নিখুঁত কসাইয়ের মতো কাটছে। যেন দু’জনেরই ভিন্ন ভিন্ন ক্ষুধা ন্যারোর ক্ষুধা মাংসের জন্য আর আলেসান্দ্রোর ক্ষুধা রক্তের দৃশ্য আর নৃশংসতার জন্য।
তারপর আলেসান্দ্রো মাথার কাটা অংশটি তুলে ধরে। নিখুঁত দক্ষতার সঙ্গে সে মগজ বের করে আনে। হাতের তালুতে এখনও ভিজে থাকা মগজ কেঁপে যাচ্ছে প্রতিটি অতি সূক্ষ্ম স্পর্শে। আলেসান্দ্রোর ঠোঁটে ফুটে ওঠে রহস্যময়ী হাসি, যেন এটি কোনো মৃত্যুর দৃশ্য নয়, বরং তার কাছে এক ধরণের আনন্দের খেলা।
সেই সাথে সব কলিজা, ফুসফুস, মগজ প্রতিটি অঙ্গ আলাদাভাবে, নিখুঁতভাবে সাজিয়ে পাশে রাখা হলো। যেন মৃত্যুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গও কোনো বিচক্ষণ শিল্পীর হাতে নিখুঁতভাবে সাজানো বস্তু।
কাঁচের বক্সের দিকে তাকিয়ে আলেসান্দ্রো দেখে, ন্যারো হিংস্র হয়ে ওঠে। তার রক্তাভ চোখের ভেতর ক্ষুধার আগুন আরও উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে। তার দেহ কাঁচের দেয়ালে ঠেস খেয়ে দম বন্ধ করে চিৎকার করতে চাইছে, কিন্তু আটকে আছে।
আলেসান্দ্রো ধীরে হাতে রিমোট তুলে ধরে। এক ক্লিকের সঙ্গে বক্সের দরজা খোলার সঙ্গেই ন্যারো বের হয়ে আসে। তার পা মাটিতে আছড়ে পড়ে, এবং প্রতিটি ধাপ যেন কেবল ভয় ছড়িয়ে দিচ্ছে।
আলেসান্দ্রো এক টুকরো মাংস ন্যারোর দিকে ছুঁড়ে মারে। মুহূর্তের মধ্যে ন্যারো লাফিয়ে ধরে তা মুখে। তার দাঁত চেপে ধরে, চাবাতে চাবাতে যেন ক্ষুধার আগুন আরও জ্বলছে। ছোট্ট টুকরো মাংস তার ক্ষুধাকে দ্বিগুণ করে দিয়েছে এখন সে আরও ছটফট করছে, আরও ভয়ংকরভাবে গর্জন করছে।
আলেসান্দ্রো, সে সব দেখেই মুচকি হাসে। তার চোখে অমানবিক সন্তুষ্টির ঝিলিক। তারপর আবার হাতে থাকা রিমোট চাপে। সাথে সাথেই ন্যারোর হাত-পা থেকে মোটা লোহার শিকল খুলে যায়। এখন, সম্পূর্ণ মুক্ত। খাঁচা নয়, বাঁধা নয়। তার ক্ষুধা, তার রাগ, তার হিংস্রতা সবই অবাধে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
চোখের পলকে ন্যারো হামলে পড়ে, যেন ক্ষুধার্ত জানোয়ার। পিছপিছ করে রাখা টুকরো মাংসের ওপর সে পরম আবেশে চিবিয়ে চিবিয়ে খেতে থাকে। তার দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে মাংস আটকে যায়, হাত আর মুখ রক্তে লাল হয়ে গেছে, আর মুখে ফুটে ওঠে এক অদ্ভুত প্রশান্তির রেখা । যেন বহু বছর পর endlich নিজের আহার পেয়েছে।
ঘরের মধ্যে এখন কাঁচা মাংসের টুকরো, ছিন্নভিন্ন অঙ্গ, আর তাজা রক্তের উটকো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। বাতাস ঘেঁষে রক্তের গন্ধ প্রবেশ করছে নখের মধ্যে, ন্যারোর ভেতর দিয়ে, যেন প্রতিটি সেল তার ক্ষুধাকে আরও জ্বালিয়ে তুলছে।
এতক্ষণে ঝুলে থাকা লোকটি বেহুঁশ হয়ে গেছে। তার চোখ বন্ধ, মুখে টেপে আটকে থাকা চিৎকার আর শারীরিক সংকট সব মিলিয়ে নিস্তব্ধতা। কেবল ন্যারোর হিংস্র, ধ্বংসাত্মক কামনা আর আলেসান্দ্রোর নিখুঁত নৃশংস খেলা চারপাশে ছড়িয়ে আছে, যেন পুরো ল্যাবরেটরি এক জীবন্ত দানবের অভিসার।
আলেসান্দ্রো হাত তুলে কলিজা, ফুসফুস এবং মগজ হাতে নিয়ে ল্যাব থেকে বেরিয়ে যায়। কিচেনে ঢুকে প্রতিটি অঙ্গকে এক অদ্ভুত যত্ন এবং নিখুঁত ধারাবাহিকতায় ধুয়ে পরিষ্কার করতে থাকে যেন এগুলো কোনো শিল্পকর্ম। তারপর সেগুলোকে ছোট ছোট কুচি কুচি করে কেটে একটি পাত্রে রাখে।
পাত্রের ভেতরে সে বিভিন্ন ধরনের মশলা ধীরে ধীরে মিশিয়ে দেয়। গরম তেলে ফ্রাই করার আগে আলেসান্দ্রোর চোখে এক অদ্ভুত আনন্দের ঝিলিক ফুটে ওঠে প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি নুন-মশলার ছোঁয়া যেন তার বিকৃত আনন্দকে আরও প্রখর করে।
একটু তেল নিয়ে ফ্রাইপ্যানটি গরম করে কিছুক্ষণের মধ্যে তেল থেকে উঠতে শুরু করে ঝাঁঝালো, কড়কড়ে ঘ্রাণ। সে একে একে কলিজা আর মগজ ফ্রাইতে শুরু করে। ঘরের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে একধরনের রক্তিম, ঝাঁঝালো উটকো ঘ্রাণ। কিচেন ছাড়িয়ে ঘ্রাণটি হলরুমের প্রতিটি কোণে প্রবেশ করছে।
আলেসান্দ্রো বড় করে বুক ফুলিয়ে নেয়, ধীরে ধীরে সেই ঘ্রাণ টেনে নেয়। যেন এই ঘ্রাণ তার জন্য নতুন প্রান, নতুন উৎসাহ। ফ্রাই হয়ে গেলে সে প্রতিটি টুকরো নিখুঁতভাবে প্লেটে সাজিয়ে রাখে প্রতিটি অঙ্গ যেন প্রস্তুত কোনো ভয়ানক, কিন্তু নিখুঁত খাবারের জন্য।
আলেসান্দ্রো আবার সেই কাঁচের ঘরে প্রবেশ করে, যার বাইরে বড় বড় অক্ষরে লেখা “ন্যারোস হাউজ”। ঘরে ঢুকে সে আরাম করে লেদার চেয়ারে বসে পড়ে।
এতক্ষণে ন্যারো নিজের ক্ষুধা মেটিয়ে আরামে শুয়ে আছে তার জন্য রাখা কাঁচের বক্সে। পুরো শরীর, হাতে এবং মুখে ভেজা রক্তের দাগ, যেন একটি প্রাচীন দানবের আলোকিত স্মৃতি।
আলেসান্দ্রো ধীরে রিমোটে চাপ দেয়। সাথে সাথেই ন্যারোর হাত-পায়ে মোটা লোহার শিকল বেঁধে যায়। কাচের বক্স ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।
তার চোখ ঘাড় হালকা কাত করে ঝুলানো লোকটির দিকে যায়। হ্যান্ডকাফে আটকানো সে ব্যক্তি, মাথা ঝুঁকিয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছে ধীর গতিতে। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা, শরীর ততক্ষণে দুর্বল হয়ে গেছে।
আলেসান্দ্রো ধীরে পায়ে উঠে তার সামনে দাঁড়ায়। ঠোঁটে ফুটে ওঠে এক রহস্যময়ী, কুটিল হাসি। হাতে থাকা প্লেট থেকে মাংসের ঝাঁঝালো ঘ্রাণ ধীরে ধীরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে।
মাংসের ঘ্রাণে বাঁধা লোকটার চোখ উঁচু হয়ে যায়। সে গভীরভাবে শ্বাস টেনে নেয়, চেষ্টায় থাকে চোখ মেলে দেখতে। দু’দিন ধরে অভুক্ত। ক্ষুধার আগুন তার ভেতর থেকে জ্বলছে, আর এই ঘ্রাণ যেন তার ক্ষুধাকে দ্বিগুণ জ্বালিয়ে তুলেছে।
আলেসান্দ্রো এক ভ্রু উঁচিয়ে তাকায়। ঠোঁটে বাঁকা হাসি, কণ্ঠে মিশ্রিত কৌতুক যেন সে পুরো পরিস্থিতিকে খেলায় পরিণত করেছে।
“ক্ষিদে পেয়েছে, বেবি বয়…?”
তার কণ্ঠের নরম, ধীরে ধীরে ভয়ানক ছোঁয়া, শোনার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে প্রতিটি কোণে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
লোকটা তড়িৎ, সজোরে মাথা ঝাঁকায় যেন ক্ষিদের জ্বালায় তার আত্মা খুলে বেরোচ্ছে। দেহটি ছটফট করছে, প্রত্যেকটি শ্বাস যেন তীব্র হাহাকার।
আলেসান্দ্রো বাঁকা হেসে, ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত কুটিলতা নিয়ে, লোকটার মুখের সাদা টেপ এক টানে খুলে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে হাতের বাঁধনও খোলা হয়ে যায়।
প্লেটটি সে ধীরে ধীরে লোকটার সামনে এগিয়ে দেয়। এক মুহূর্তের জন্য লোকটার সামনে ঘটা এতক্ষণের সমস্ত হিংস্রতা ভুলে যায়, তার ক্ষুধার্ত তীব্রতা বেড়ে যায়।
ক্ষুধার আগুনে লোভী মানুষটা ঝাপিয়ে পড়ে প্লেটের ওপর। এক টুকরো, দুই টুকরো একসাথে বেশ কিছু টুকরো মুখে দিতেই যেন ফ্লেভার বিস্ফোরণ ঘটে। মাংসের ঝাঁঝালো ঘ্রাণ, চর্বি আর মশলার মিলন লোকটার পুরো শরীর কেঁপে ওঠে। চোখ বড় করে তাকায় বিস্ময়ে, তারপর চোখ বন্ধ করে চিবিয়ে চিবিয়ে স্বাদ অনুভব করতে থাকে। এত সুস্বাদু মাংস সে আজ পর্যন্ত কখনোই খায়নি।
আলেসান্দ্রো বাঁকা হাসে। তার চোখের ভিতর এক অদ্ভুত তৃপ্তি, কণ্ঠে ভয়ানক কৌতুক যেন সে পুরো পরিস্থিতিকে খেলায় পরিণত করেছে।
“ওয়াজ ইট টেস্টি?”
লোকটা হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বলে,
“অন্নেক… এতো সুস্বাদু খাবার আমি আজ পর্যন্ত কখনো খাইনি। মনে হচ্ছে যেন অমৃত।”
বলেই আবারও খেতে শুরু করে, হাত কাঁপছে, কিন্তু ক্ষুধার আগুন তাকে থামাতে পারছে না।
আলেসান্দ্রো ঠোঁট বাঁকিয়ে ধীরে বলে,
“খা। বেশি করে খা। হতেও পারে… এটাই তোর জীবনের শেষ খাবার।”
লোকটা এক মুহূর্ত থমকে যায়। হঠাৎ তার মনে ঝাপটা দেয় নিজের করা ভুল। সে বুঝে যায়, এই যত্ন করে খাওয়ানো, এই সুন্দর ব্যবহার, সবকিছুই ছাগল কুরবানী করার প্রস্তুতি। তার আত্মা কেঁপে ওঠে। ঠোঁট শুকিয়ে কাঠের মতো, গলা শুকনো, কিন্তু তবুও ভয়ানক তীব্রতার মধ্যে সে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করে,
“আ..আমার ভুল হয়ে গেছে, বস। আর হবে না। ক্ষমা… ক্ষমা করে দিন এইবারের মত। একটা সুযোগ দিন।”
লোকটা থরথর কাঁপছে, গলা শুকনো, হৃদস্পন্দন যেন সীমানার উপর দাঁড়িয়ে। আলেসান্দ্রো ডানে বামে ঘাড় কাত করে ঘুরায়, ক্যারক্যার করে ফুটে ওঠে ঘাড়ের সমস্ত রগ। বিদ্যুৎ গতিতে তার মুখ আনলক করে লোকটার মুখের সামনে।
লোকটা ভরকে যায়, দুই কদম পিছিয়ে যায়। চোখের ভেতর আতঙ্কের অগণিত ছাপ। হৃদস্পন্দন এখনও ধক ধক করছে। আত্মা যেন বেরিয়ে যেতে চায়, কিন্তু শরীর আটকে আছে।
আলেসান্দ্রো ঠান্ডা, নির্মম কণ্ঠে বলে,
“I don’t like mistakes… And I don’t like those who make mistakes.”
আলেসান্দ্রো লোকটার হাতে থাকা প্লেটের দিকে তাকায়। চোখে অদ্ভুত ধ্যানস্থ দৃষ্টি। শান্ত সুরে ধীরে আদেশ করে,
“তাড়াতাড়ি শেষ কর। আমার হাতে সময় খুব কম।”
লোকটার চোখ থেকে পানি পড়তে থাকে। এক মুহূর্তের জন্য সমস্ত ক্ষুধা যেন গায়েব হয়ে গেছে। ঠোঁট কেঁপে যাচ্ছে, হাত কাঁপছে, হৃদপিণ্ড দ্রুত স্পন্দিত।
আলেসান্দ্রো ঠোঁট বাঁকিয়ে বাঁকা হাসি দিয়ে বলে,
“খাবি না? খেয়ে নে। ভালো করে খেয়ে নে… কারণ এটাই তোর জীবনের শেষ খাওয়া।”
লোকটা থরথর করে কাঁপছে। কাঁপতে কাঁপতে ভাঙা গলায় বলতে পারে,
“আমি আর খেতে পারব না, বস… আমাকে ছেড়ে দিন প্লিজ।”
আলেসান্দ্রোর মাথার রক্ত টগবগিয়ে ওঠে। চোখে হিংস্রতার আগুন জ্বলে ওঠে, গলায় গর্জন। চাপা কণ্ঠে হিসহিসিয়ে বলে,
“তুই খাবিনা? তোর ঘাড় খাবে! তোকে খেতেই হবে। তোর জন্য এত কষ্ট করে রান্না করে আনলাম। আর তুই বলছিস খাবিনা! এটা তো অনেক বড় অন্যায়। জানিস এগুলো কিসের কলিজা?”
লোকটা কাঁপতে কাঁপতে সন্দেহভাজন দৃষ্টিতে তাকায়।আলেসান্দ্রো মুচকি হাসে। নিষ্ঠুর কণ্ঠে স্পষ্ট করে বলে,
“তোর রক্তের ভাইয়ের কলিজা।”
এক সেকেন্ডের জন্য ঘরটি স্তব্ধ। তারপর হুট করেই লোকটা গরগর করে বমি করে দেয়। আলেসান্দ্রো ছিটকে পেছনে সরে দাঁড়ায়। চোখ-মুখ বিকৃত, মুখে ঘৃণিত আবেশ, ধীরে ধীরে ফিসফিস করে উচ্চারণ করে,
“ছিঃ ইয়াক… বমি করার আর জায়গা পেলিনা? শু*য়ো*রের বাচ্চা! এগুলো এখন চেটে খাবি তুই।”
লোকটা চোখ বড় করে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকায়, না বোঝায়। আতঙ্কে হাত-পা কাঁপছে। আলেসান্দ্রো হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজের রাগ কমানোর চেষ্টা করে। বড় বড় শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করতে থাকে।
“খা বলছি।”
তার কণ্ঠে ঠাণ্ডা, নির্মম হিংস্রতার ছোঁয়া।
সে লোকটার ঘাড় টেনে মাথা চেপে ধরে ফ্লোরে। যেখানে পড়ে আছে বমি, তার মুখ চেপে ধরে। শরীর থেকে বের হচ্ছে বন্য পশুর তেজ। চোখে হিংস্রতা, মুখে ধারালো কণ্ঠ যেন প্রাণঘাতী শিকার।
“চা ট বলছি!”
লোকটা মাথা ঝাঁকায়, না বোঝাতে চায়। আলেসান্দ্রো তার ঘাড়টা আরও শক্ত করে চেপে ধরে, শরীর দিয়ে প্রায় চাপা দিচ্ছে।
“আমার কথা না শুনলে, তোর ভাইকে যেমন মৃত্যু দিয়েছি, এর থেকেও কঠিন মৃত্যু পারি তুই।”
লোকটা কাঁদতে কাঁদতে জিভ দিয়ে চেটে নেয়। শরীরে শিরশিরে ঝাঁকুনি ওঠে, দাঁতে দাঁত চেপে হজম করে নেয়।
আলেসান্দ্রো ধীরে তার হাতের বাঁধন ঢিলে করে ছেড়ে দেয়। লোকটা স্বস্তির একটি নিঃশ্বাস ফেলে, মনে হয় সাময়িক মুক্তি।
কিন্তু পরবর্তী মুহূর্তেই আলেসান্দ্রো এক হাতে লোকটার ঘাড়ের দুই পাশের ক্যারোটিড ধমনিতে চাপ প্রয়োগ করে। শেষ নিঃশ্বাস! লোকটা মাথা ছেড়ে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ে।
আলেসান্দ্রো উঠে, হাত ঝাড়তে থাকে। শরীরে একটু আটটু বমির ছিটা লেগে আছে, চোখে মুখে ঘৃণা উপচে পড়ছে।
“শু*য়োর! মরার আগেও ভুল করে।”
বলেই সে সজোরে লোকটার শরীরে লাথি মেরে দেয়।
“এখন আবার গোসল করে এসব পরিষ্কার করতে হবে।”
কক্ষ থেকে বের হয়ে সে দুজন গার্ডের দিকে তাকায়।
“ঘরটা ভালো করে পরিষ্কার করে ফেলবে। একটুও নোংরা যেন না থাকে। আর ডেড বাড়িটাকে সুন্দর করে প্যাকেট করে ফ্রিজার করে রাখবে। একটুও যেন পচন না ধরে। ন্যারোর ঘুম ভাঙলে আবার খেতে চাইবে। পঁচা গন্ধ যুক্ত খাবার ওর পছন্দ নয়। কথাটা যেন মাথায় থাকে।”
বলেই আলেসান্দ্রো কক্ষ থেকে চলে যায়। ঘরের মধ্যে এখন নিঃশ্বাসের শব্দ, রক্তের ঘ্রাণ, এবং নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত আতঙ্কের ছাপ ছড়িয়ে আছে।
ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
জেইন একটু ঝুঁকে আস্তে আস্তে ঘুমন্ত রিমের গায়ে কালো কম্ফোর্টার’টা খুব যত্ন সহকারে জরিয়ে দিল। তারপর যখনি উঠে দাঁড়াতে যাবে ঠিক তখনই আধোঘুমন্ত রিম হঠাৎ তার ছোট্ট হাতদুটো বাড়িয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল জেইনের গলা।
জেইনের বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দন যেন ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। দাঁতে দাঁত চেপে শ্বাস আটকাল সে।
ফিসফিসিয়ে বলল,
“Damn….stop beating so fast. Stop… stop beating like this…”
কিন্তু শরীর তার কথা শুনল না। প্রতিটা ধুকপুক শব্দ যেন তাকে আরও অস্থির করে তুলছিল। নিজের হৃদয়ের প্রতি তখন প্রবল রাগ হয়।
“Why the hell are you running like this? Calm down… she’ll hear you…”
সে আলগো করে হাত সরিয়ে নিতে চায়, কিন্তু রিম তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। সেই অনিশ্চিত, নির্দোষ আলিঙ্গন তার ভেতরের অন্ধকার বাসনাকে তীব্র করে তুলল। হঠাৎই পরাজিত আত্মসমর্পণের মতো সে রিমকে বুকের সাথে চেপে ধরে, এতটাই জোরে যে যেন দু’জনের নিঃশ্বাস মিশে এক হয়ে যাচ্ছে।
তার ঠোঁট ধীরে ধীরে গিয়ে ছুঁয়ে যায় রিমের মাথার চুল তারপর কপাল তারপর গাল। নিঃশ্বাসে ভেসে আসছিল রিমের শরীরের মাদকতা। নরম মিষ্টি সুবাস যেন তাকে পাগল করে দিচ্ছে। সেই সুবাস ঢুকে যাচ্ছিল তার রক্তে, নেশার মতো ছড়িয়ে পড়ছিল প্রতিটি কোষে। সে চোখ বুজে মুখ গুঁজে দেয় রিমের বুকের নরম ভাঁজে, ঠোঁট আলতো করে ছুঁয়ে যায় ওর ত্বক।
সে রিমকে আরও শক্ত করে জাপটে ধরে। রিমের বুকের ভাঁজেই যেন তার পৃথিবীর সমস্ত শান্তি লুকায়িত। যেখানে আছে একধরনের মাদকতা মিশ্রিত আরাম এক ধরনের সুখ।
কালো কম্ফোর্টারের ভেতর তাদের শরীর জড়িয়ে থাকে একে অপরের সাথে। রিম ঘুমের ভেতরেই নিজেকে আরও গুটিয়ে নিল তার বুকে। বাইরের শীতল রাত আর অন্ধকার মিলিয়ে যায়, শুধু বাকি রইল উষ্ণ শ্বাস, কাঁপা শরীর আর দমবন্ধ করা এক ঘনিষ্ঠতা।
কিছুক্ষণ পর জেইন ধীরে ধীরে চোখ তোলে, রিমের ঘুমন্ত মুখের দিকে। নিঃশ্বাসের সাথে ওঠানামা করা সেই শান্ত মুখটা যেন সারা দুনিয়ার নিষ্পাপতার প্রতিচ্ছবি। তার ঠোঁটের কোণে এক অনিচ্ছাকৃত হাসি ফুটে ওঠে।
আলতো ঝুঁকে এসে কপালে টুপ করে রেখে দেয় এক চুমু নিঃশব্দে লেখা এক অদৃশ্য প্রতিশ্রুতি। তারপর আস্তে করে তার ওপর থেকে উঠে দাঁড়ায়। কালো কম্ফোর্টারের আঁচল ঠিক করে আবার যত্নে জড়িয়ে দেয় যেন শীতের কোনো হাওয়াও তার গায়ে গিয়ে না লাগে।
দু’চোখ ভরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সেই ঘুমন্ত মুখের দিকে। নিষ্পাপ, নির্ভার, নিরাপদ দেখে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি ছড়িয়ে যায়। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত এক আত্মা যেন মুহূর্তের জন্য আশ্রয় খুঁজে পেল।
আলতো করে আঙুল বুলিয়ে দেয় ওর মাথায়, যেন স্বপ্নের ভেতরেও সে স্পর্শটা টের পায়। সে ফিসফিস করে প্রায় শুনতে না পাওয়া স্বরে বলে,
“Even in your dreams, you’ll belong to me.”
তারপর ধীর পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। দরজা ভেজানোর আগে শেষবারের মতো ফিরে তাকায়। বিছানায় নিস্তব্ধ শুয়ে থাকা রিমকে দেখে বুকের ভেতর আরও গাঢ় হয়ে উঠে সেই শান্তি, সেই অদম্য অধিকারবোধ।
দরজার গায়ে বড় বড় অক্ষরে খোদাই করা — “Hell Chamber”।
জেইন কোড চাপতেই ভারী দরজাটা ধীরে গড়িয়ে খুলে যায়। মুহূর্তেই একধরনের পচা আর ধাতব গন্ধ মিশ্রিত দমবন্ধ করা বাতাস তার নাকে এসে লাগে।
সে ঢুকে রাজকীয় লেদার আসনে অলস ভঙ্গিতে বসে পড়ে। শরীরে এক অদ্ভুত গা-ছাড়া ভাব, কিন্তু দৃষ্টি ধারালো। সামনে শিকলবন্দি রিশাব শরীরের জায়গায় জায়গায় ব্যান্ডেজ, চোখে নিভু নিভু আলো, নিঃশ্বাস কষ্টকর।
জেইন একহাত টেবিলের ওপর ছড়িয়ে রেখে অন্য হাতে ধীরে ইলেকট্রিক সিগারেট ঘুরাতে ঘুরাতে বলে,
“শুনলাম তুই নাকি কিছু খাচ্ছিস না? না খেয়ে মরার এতো শখ?”
তার ঠোঁটে কৌতুক মেশানো তাচ্ছিল্যের হাসি। পাশে রাখা শুকনো খাবারের প্লেটটা সে ধীরে রিশাবের দিকে ঠেলে দেয়।
“খেয়ে নে। ভাবিস না তোর জন্য আমার মায়া জেগেছে। দয়া, মায়া, ভালোবাসা এইসব জিনিস আমার ভোকাবুলারিতেই নেই। তোকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছি শুধু আমার বউয়ের আবদারের কারণে। নইলে অনেক আগেই তোর শরীরটা ফ্রিজারে ঠাণ্ডা হয়ে পড়ে থাকতো।”
সে একটু থামে, ধোঁয়া ছেড়ে ঠান্ডা গলায় বলে,
“বউ যদি তোর কথা জিজ্ঞেস করে, তখন কি জবাব দিব? বউ’কে তো মিথ্যে বলতে পারবো না। বউয়ের যা আগুন চোখ দিয়েই ভস্ম করে দেবে।”
জেইন হালকা হেসে বুকের ওপর হাত বুলায়, যেন নিজের জ্বালা নিজেই সামলাচ্ছে।
“ইশশশ্… পরপুরুষের জন্য বউয়ের এতো দরদ! অন্তরটা জ্বলে ছাই হয়ে যায় রে… বউকে আজও বুঝতে পারলাম না। পিচ্চি মানুষ, অথচ ভেতরে আগুনের পাহাড়!”
রিশাবের চোখ রাগে জ্বলছে। রাগের তাপে হাত-পা থ্যথর করে কাঁপছে।
“ওকে ছেড়ে দেহ্! তুই ওকে সারাজীবন আটকে রাখতে পারবি না। রিম একদিন ঠিক তোর বন্দী খাঁচা থেকে মুক্ত হয়ে যাবে।”
জেইন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। হঠাৎ সে রিশাবের গলার টুটি শক্ত করে চেপে ধরে। চোখে বন্য পশুর মতো হিংস্রতা, সাদা অংশ লালাভ। চোয়াল তীক্ষ্ণ হয়ে দাঁত চেপে ধরে।
“ইউ বা*স্টার্ড! আর একবার ওর নাম মুখে নিলে, তোর জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব আমি। তারপর রাস্তার কুকুর দিয়ে খাওয়াবো।”
রিশাব কেঁপে উঠে, শরীর ছটফট করছে।
জেইন ধীরে ধীরে তাকে ছেড়ে দেয়। বড় বড় শ্বাস টেনে নিজের রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করে। হাত মুষ্টিবদ্ধ, নীল শিরাগুলো ফুলে উঠেছে, কপালেও স্পষ্ট। মুখে সামান্য বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে।
“আজকে তোকে মারলাম না। কেন বলতো? আসলে বউয়ের আদর পেয়ে শরীর আর মন দুটোই ফুরফুরে লাগছে। তাই তোকে মেরে হাত নষ্ট করতে চাই না।”
রিশাব রাগে কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করে,
“কি করেছিস তুই ওর সাথে?”
জেইন ঠোঁট কামড়ে ধীরে হাসে, হালকা অলস ভঙ্গিতে বলে,
“অনেক কিছু… কিন্তু বাইরের মানুষকে এসব বলা যাবে না। এগুলো আমাদের husband-wife সিক্রেট। কেউ জানলে সমস্যা হবে।”
তারপর সে একটু থেমে নাকের নিচটা ঘষে নেয়, মুখে বিরক্তি ভাব,
“Fu*ck off…!!! ধুর, এখন দিলি তো সব মনে করিয়ে। এখন তো বউয়ের জন্য মনটা ছটফট করছে।”
সে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ায়,
“না, এখন বউকে লাগবেই লাগবে। যতক্ষণ না এই বুকের মাঝে পাচ্ছি শান্তি পাবো না।”
তার চোখ রিশাবের দিকে ঘুরে আসে, কণ্ঠে এক অদ্ভুত প্রলোভনের রেশ।
“শোন, খাবারটা খেয়ে নে। আমি বউয়ের আদর খেতে যাচ্ছি। ওটার ভাগ কাউকে দেয়া যাবে না।”
বলেই সে বিদ্যুৎ গতিতে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। ঘরে রিশাব রাগে কাঁপতে কাঁপতে বসে থাকে, দম বন্ধের মতো উত্তেজনা আর আতঙ্কে ভরা।
জেইন দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসতেই হঠাৎ করিডোরে তার সাথে ইয়াশের ধাক্কা খাওয়ার মতো দেখা হয়ে যায়। করিডোরে হালকা অন্ধকার, মাথার উপরের লাইটটাও টিমটিম করে জ্বলছিল। ইয়াশ তার হাত বুকের কাছে গুটিয়ে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে থাকে। জেইনকে হেল চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেই সবটা বুঝে যায়। ঠোঁট বাঁকিয়ে কড়া গলায় বলে,
“এবার তো ওকে ছেড়ে দে। আর কতো টর্চার করবি?”
জেইনের মুখটা এক মুহূর্তে কষে ওঠে। চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, চোখে আগুন জ্বলে ওঠে। রাগে ভরা কঠোর গলায় দাঁত চেপে বলে,
“ইমপসিবেল! ওকে এতো সহজে ছাড়বো না আমি। ও আমার ফায়ার ফ্লাইকে ছুঁয়েছে। সেই শাস্তি তো ওকে পেতেই হবে।”
ইয়াশ চোখ কুঁচকে এক কদম এগিয়ে আসে, গলা নরম হলেও ভরাট তর্কের সুরে বলে,
“আর কত শাস্তি দিবি? অনেক তো হলো!”
জেইনের বুক ওঠানামা করতে থাকে। সে একবার চোখ বন্ধ করে বড় করে শ্বাস টেনে নিয়ে আবার চোখ মেলে তাকায়। কণ্ঠে ভারী ধমক নামিয়ে বলে,
“এ ব্যাপারে আমি আর কোনো কথা শুনতে চাই না।”
ইয়াশ ঠোঁট কামড়ে এক নিঃশ্বাস ছেড়ে দেয়, যেন হাল ছেড়ে দিলো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে গলা বদলে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
“রিম এখন কেমন আছে? জ্বর কি এখন কমেছে?”
শব্দটা কানে যেতেই জেইনের শিরা টনটন করে ওঠে। তার চোখে আগুন জ্বলে ওঠে, ঠোঁট বেঁকে যায়। নিঃশ্বাস গর্জনের মতো ফোঁস ফোঁস করছে।
ইয়াশের চোখ তখন জেইনের দিকে আটকে যায়। বুক শুকিয়ে আসে, সে ঢোক গিলে গলা ভিজিয়ে নিতে চায়। এক চুল এগোনোর সাহস না পেয়ে কাঁপা গলায় বলে,
“স-সরি, সরি, মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। আই মিন… আম্মা মানে মা এখন কেমন আছে?
জেইন ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। ভ্রু কুঁচকে, বিরক্তিতে গলা নিচু করে বলে,
“একটু ভালো। কিন্তু মনে হচ্ছে অসুস্থ থাকলে আরও বেশি ভালো। সুস্থ অবস্থায় না হোক অন্তত অসুস্থ অবস্থায় তো একটু কাছে টেনে নেয়। এই সুযোগে তো একটু আদর পাই। মনে হচ্ছে বউয়ের আদর পেতে হলে মাঝে মাঝে বউকে অসুস্থ বানিয়ে রাখতে হবে।”
ইয়াশ হা করে তাকিয়ে যায়, চোখ বড় বড় হয়ে যায়। অবিশ্বাসে থতমত খেয়ে বলে,
“কি বললি?”
জেইন চোখ ঘুরিয়ে বিরক্তিতে নিঃশ্বাস ছেড়ে দেয়। কণ্ঠে বিরক্তি ঝরে পড়ে,
“কিছু না, যা তো। বউকে চুমু খেতে যাবো। খালি রোমান্সের সময় ডিস্টার্ব করিস! এই শোন, তুই আর এক বছরেরও এখানে আসবি না। আগে আমি নতুন বাচ্চার বাপ হবো তারপর আসবি। তুই থাকলে এ জন্মে বাবা ডাক শোনা হবে না আমার।”
ইয়াশ ঠোঁট ফুলিয়ে চোখ পিটপিট করে তাকায়। কণ্ঠ ভিজে যায়, প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,
“এটা কিন্তু ঠিক না আব্বা। নতুন ভাই-বোন আসার আগেই আপনি আমাকে বিদেয় করতে চাইছেন! আসলে তো আমাকে আর সহ্যই করতে পারবেন না।”
জেইনের শরীর হঠাৎ কেঁপে ওঠে। রাগ ও বিরক্তি একসাথে গরম ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে। গলা ভারী করে চেঁচিয়ে ওঠে,
“হারামির বাচ্চা!!! তুই যাবি এখান থেকে!আজ থেকে তোকে আমি ত্যাজ্য পুত্র করলাম। যে ছেলে বাপের মন বোঝে না তাকে আমার চাই না। যা বের হ এখান থেকে!!”
ইয়াশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। বুঝতে পারে বেচারাকে আজ বড্ড বেশি জ্বালিয়ে ফেলেছে। মনে মনে বলে, ‘বউয়ের জ্বালায় এমনিই পাগল, তার ওপর আবার আমি… নাহ, কপালে দুঃখ ডেকেছি।’ তাই আর কথা বাড়ায় না। কাঁধ ঝাঁকিয়ে যেতে যেতে গজগজ করে,
“যাচ্ছি যাচ্ছি… কিন্তু মনে রাখিস, প্রয়োজনে এই ছেলেকেই খুঁজতে হবে তোকে।”
জেইন এবার তেড়ে ওঠে। ইয়াশ’কে আর পায় কে। ভো দৌড়ে পালিয়ে যায় করিডোর ধরে। তার পায়ের শব্দ করিডোরে প্রতিধ্বনির মতো বেজে ওঠে। জেইন দাঁড়িয়ে পড়ে, বুক ধড়ফড় করছে। এক হাত কপালে নিয়ে রাগে শ্বাস টেনে নেয়। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে।
উপকণ্ঠ,রোম
আলেসান্দ্রো শাওয়ার শেষে ধীর পায়ে বেরিয়ে আসে। শরীরে সাদা বাথরোব জড়ানো। ভেজা চুল থেকে এখনো জলের ফোঁটা টপটপ করে পড়ছে। সে গিয়ে বসে রকিং চেয়ারে, বারান্দার আধো অন্ধকারে। চেয়ারের তালে তালে তার শরীরও দুলছে। এক হাতে ধরা সিগারেট। অন্য হাতে ঢিলে ভঙ্গি। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে রাতের বাতাসে।
হঠাৎ ঘরে প্রবেশ করে এক বিজ্ঞানী। মুখে ভয়ের ছাপ, কপালে ঘাম জমে আছে। বুক ওঠানামা করছে অস্বস্তির ছন্দে। শরীর যেন আতঙ্কে জমে গেছে।
আলেসান্দ্রো একবারও তার দিকে তাকায় না। চোখ স্থির আকাশের দিকে, ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা রেখা। ঠান্ডা অথচ ধারালো কণ্ঠে বলে ওঠে,
“কি বলবে বলে ফেলো।”
বিজ্ঞানীর শ্বাস আটকে আসে। কাঁপা গলায় কোনো রকমে শব্দ বের হয়,
“এবারেও সাবজেক্টের কোনো রেসপন্স নেই। আমরা আবারও…”
আলেসান্দ্রো হালকা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
“নতুন কিছু বলো… ছয়টা বছর ধরে একই বাজে রিপোর্ট শুনে আসছি আমি। সাবজেক্ট অস্বাভাবিক, সাবজেক্ট রেসপন্স করছে না… blah blah blah. প্রশ্নটা এখনো একটাই why?”
সে মাথা নিচু করে একটু থেমে আবার বলে,
“কারো কাছে কি সেই ডিএনএ নেই? কোনো এক ফোঁটা কি হারিয়ে গেছে পৃথিবী থেকে?”
তারপর সে দৃঢ় কন্ঠে বলে,
“না… আমি হার মানব না। যেকোনো মূল্যে এবার সাকসেস পেতেই হবে। কারণ ইতিহাসের পাতায় এক নতুন অধ্যায় লেখা হবে আমার নামে। Alessandro Zharkov , যে কিনা ঈশ্বরকেও হারিয়ে প্রমাণ করবে, মৃত মানুষও আবার বাঁচতে পারে।”
তার ঠোঁট বাঁকলো। চোখে এক অমানবিক দীপ্তি। সে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। কাঁধ থেকে বাথরোব ফেলে দেয় মেঝেতে। পাতলা কালো টি-শার্ট গায়ে চড়িয়ে ল্যাবরেটরির দিকে হাঁটতে শুরু করে।
ল্যাবে প্রবেশ করতেই দৃশ্যটা তার চোখ আটকে দিল।
সেখানে বসে আছে কেউ একজন অবাক করার মতো শান্ত ভঙ্গিতে, যেন নিজের ঘর। হাতে ফোন, আঙুল অবিরাম স্ক্রিনে নাচছে।
আলেসান্দ্রোর চোখ সরু হয়ে এলো। গলায় কৌতূহল আর সতর্কতার মিশ্রণ।
“হেই, ডি… আমার ল্যাবে হঠাৎ? How the hell did you come inside? I’m… surprised.”
ড্যানিয়েল বাঁকা হেসে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়। দু’হাত পকেটে ঢুকিয়ে বলে,
“Just came… to see you, and your works.”
আলেসান্দ্রো ধোঁয়া উড়িয়ে ঠান্ডা গলায় জবাব দেয়,
“Well… I’m glad to know that.”
ড্যানিয়েল চোখ সরু করে তাকায়,
“What about your project?”
আলেসান্দ্রো হালকা মাথা নাড়ে,
“On the way.”
ড্যানিয়েল গলায় নিস্পৃহ ভঙ্গি এনে জিজ্ঞেস করে,
“And that woman?”
“She’s alright. He will never find her… not in this lifetime.”
কথা শেষ হতেই আলেসান্দ্রো একটা রিমোট তোলে। বোতাম চাপতেই ছাদ থেকে গড়িয়ে নামে বিশাল সাদা পর্দা। পর্দার আড়াল সরে যেতেই দেখা যায় কাঁচের দেয়াল। ভেতরে শুয়ে আছে এক মহিলা, মুখে অক্সিজেন মাস্ক, চারপাশে তার জড়ানো। মনিটরে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে নিয়মিত হার্টবিট।
আলেসান্দ্রোর ঠোঁটে রহস্যময় বাঁকা হাসি। ড্যানিয়েল বিস্ময়ে চোখ বড় করে ফিসফিস করে ওঠে,
“She is… alive?”
আলেসান্দ্রো মুচকি হেসে আস্তে মাথা নাড়ে,
“Yeah.”
ড্যানিয়েল ভ্রু কুঁচকে ঠান্ডা স্বরে বলে,
“What if he finds out?”
আলেসান্দ্রো সোজা তার চোখে তাকিয়ে হিমশীতল কণ্ঠে,
“He already knows. কিন্তু কোথায়… সেটা কোনোদিন জানতে পারবে না।”
ড্যানিয়েল জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলে তারপর ভান করা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে,
“শুনলাম Draven আর Daisuke-কে মেরে ফেলা হয়েছে! But why?”
প্রশ্ন শুনে আলেসান্দ্রোর ঠোঁটের কোণে সামান্য বাঁকা হাসি খেলে যায়। চোখে এক ঝলক তীক্ষ্ণ ঝলকানি।
“Ooo… so that’s why you’re here.”
ড্যানিয়েল এবার আর হেয়ালি সহ্য করে না। চোখ কড়া করে তাকিয়ে বলে,
“হেয়ালি না করে আমার কথার উত্তর দে।”
আলেসান্দ্রো কাঁধ ঝাঁকিয়ে অবহেলার সুরে হেসে ফেলে,
“ভুল করেছিল। আর আমি ভুল সহ্য করি না।”
ড্যানিয়েল চোয়াল শক্ত করে হিসহিসিয়ে বলে,
“সামান্য ভুলের জন্য জানে মেরে দিবি? তুই জানিস না ওরা এই প্রজেক্টের জন্য কতটা important ছিল! তোর এই সাইকোপ্যাথি, এই অন্ধ রাগ এর জন্যই আজ পর্যন্ত সফল হতে পারিনি আমরা।”
আলেসান্দ্রো বাঁকা চোখে তাকিয়ে ঠান্ডা কণ্ঠে,
“Correction… প্রজেক্টটা আমার, তোর নয়।”
ড্যানিয়েল দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে,
“কিন্তু ইনভেস্টমেন্টটা করেছি আমি। আর ওদের মতো ব্রিলিয়ান্ট সায়েন্টিস্টকে মেরে তুই আজীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করে ফেলেছিস।”
আলেসান্দ্রো গলার স্বর আরও নিচু করে ধারালো কণ্ঠে বলে,
“এমনি এমনি মারিনি। ওদের আমার হয়ে কাজ করার কথা ছিল। প্রতিটি তথ্য, প্রতিটি সিক্রেট আমার টেবিলে আসার কথা। But they were leaking news to my enemies!! Betrayal-এর জন্য একটাই শাস্তি আছে death. ওরা ধোঁকা দিয়েছে, তাই ওরা মরে গেছে।That’s it.”
ড্যানিয়েল চোখ বড় করে স্তব্ধ গলায় ফিসফিস করে,
“It’s true??”
আলেসান্দ্রো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে, তার চোখে শীতল ঝড়ের ছাপ।
“You know… আমি মিথ্যে বলা আর মিথ্যেবাদী দুটোই সহ্য করতে পারি না।”
ড্যানিয়েল আর কোনো কথা খুঁজে পায় না। নিস্তব্ধতা ভর করে চারদিকে। আলেসান্দ্রো ধীর গতিতে টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট সোনালী বক্সটা হাতে নেয়। ধীরে ধীরে সেটা খুলে বের করে আনে এক কালো হার্ডড্রাইভ। কিছুক্ষণের জন্য সেটার দিকে তাকিয়ে থাকে সে। ঠোঁটের কোণে টেনে আনে এক রহস্যময়ী, হিংস্র হাসি।
একটা দেশলাই কাঠি ঘষতেই শিখা জ্বলে ওঠে। পরের মুহূর্তেই সেই আগুনে ছুঁড়ে দেয় হার্ডড্রাইভটা। প্লাস্টিকের পোড়া গন্ধে ঘর ভরে যায়।
ড্যানিয়েল বিস্ময়ে চোখ বড় করে ওঠে, কণ্ঠে অস্থিরতা
“What the hell did you just do?”
আলেসান্দ্রো দপদপ করা আগুনের শিখার দিকে চোখ রেখেই ফিসফিস করে, কণ্ঠে পাগলামি মেশানো ঠান্ডা তেজ
“এটার আর কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ আমি খুঁজে পেয়েছি… সেই ডেমনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা!…….”
তার চোখের আকাশি-সাদার মিশ্রিত রঙ আগুনের আলোয় জ্বলজ্বল করে ওঠে।
“এবার আমার টার্গেট আর ও নয়… ওর দুর্বলতা। একবার যদি সেই বিন্দুতে আঘাত করতে পারি, ও নিজেই ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়বে।”
সে থামে, চোখ আধখানা বুঁজে তীক্ষ্ণভাবে তাকায় ক্লোনের দিকে।
“১২ বছর…. আত্মার সম্পর্ক আমাদের। শুধু ওর জন্য সবকিছু হারাতে হয়েছে আমাকে । এবার পালা ওর।”
একটা বাঁকা শীতল হাসি টেনে নিয়ে শেষবারের মতো বলে
“Now, My first target is his weakness……….”
প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৮
ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
“হোয়ার ইজ মাই ফায়ারফ্লাই??? আই সেইড হোয়ার ইজ সী???? আই ওয়ান্ট হার রাইট নাউ, ইন ফ্রন্ট অফ মি!!!!!”
জেইনের হুংকারে যেন পুরো ক্যালাব্রিয়া অঞ্চল কেঁপে ওঠে। গার্ডের সবার মুখ থমথমে। সবার মাথা নিচু কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। আতঙ্কে কাঁপছে তারা। তবুও শাস্তির জন্য প্রস্তুত।
