Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৩

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৩

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৩
রাত্রি মনি

“আপনি মানুষ!
দেখুন মিস্টার, আগেও একবার এমন হয়েছিল। মেয়েটার শরীরে এতটুকু শক্তি অবশিষ্ট নেই। আপনি কি সত্যিই ওকে সুস্থ থাকতে দেবেন না?”
জেইন কোনো উত্তর দিল না, কেবল নীরব রইল।
ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিমের দিকে তাকালেন।
“আমি স্যালাইন লাগিয়েছি এবং ব্যথা কমানোর ইনজেকশন দিয়েছি। কমপক্ষে দুটো দিন সম্পূর্ণ বেড রেস্টে থাকতে হবে। সামান্য হাঁটাহাঁটি করাও চলবে না।”
তিনি দ্রুত ব্যাগ গুছিয়ে নিলেন।
“আমি চললাম। প্রেসক্রিপশন টেবিলের ওপর রাখা আছে, ওষুধগুলো সময়মতো দেবেন। খুব সাবধানে থাকবেন।”
বিরক্তি নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
জেইন নিঃশব্দে রিমের মাথার কাছে এসে বিছানায় বসলো। তার অপরাধবোধ এখন অনুশোচনায় পরিণত হয়েছে। সে সত্যিই একটু মাত্রাতিরিক্ত করে ফেলেছে।নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেনি। আলতো করে রিমের কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। রিমের মুখটা বিবর্ণ; ফ্যাকাসে, রক্তশূন্য দেখাচ্ছে। ঠোঁট দুটো শুকনো। চোখের নিচে হালকা ডার্ক সার্কেল—হয়তো গত দু’রাতের অনিয়ম আর ধকলের ফল।

ডাক্তার মহিলাটি লিফটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করলেন,
“ছেলেটা তো দেখতে হলিউড নায়কের মতো, কিন্তু চরিত্র সুবহানাল্লাহ! এর হাতে মেয়েটা আর কতোদিন টেকে কে জানে? একেবারে বন্য।”
তিনি গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিলেন, প্রথম দিনের কথা মনে পড়তেই একটা হালকা নিঃশ্বাস ছাড়লো। যখন জেইনকে প্রথম দেখেই মনে লাড্ডু ফুটেছিল। আর তারপর যখন বিয়ের কথা শুনল মন ভেঙে গিয়েছিল। মাথা নেড়ে মনে মনে ভাবলেন, ‘ভাগ্যিস আমি এর পাল্লায় পড়িনি, নয়তো শুধু বিছানায় শুয়েই দিন কাটতো!’
জেইন পরম যত্নে রিমের নিস্তেজ শরীরে কম্ফোর্টারটি ভালোভাবে জড়িয়ে দিল। সে ভেবে পায় না তার বউ হয়ে মেয়েটা এতো নাজুক কেন? এভাবে চললে সারাজীবন সামলাবে কিভাবে তাকে! সে যে এই মেয়ের সামনে বড্ডো বেপরোয়া উন্মাদ।

ভোরের আলো ফোঁটার পর সে রিমকে অচেতন অবস্থাতেই স্নান করিয়ে পরিষ্কার করে বেডশিট বদল করেছে। তারপর মাত্তেওকে বলে ডাক্তার ডাকিয়ে এনেছে। এখন তার নিজেরও শাওয়ার নেওয়া প্রয়োজন; এই শরীরে আর বেশিক্ষণ থাকা যায় না।
সে আবারো রিমের কপালে একটি গভীর চুম্বন এঁকে দিয়ে নিঃশব্দে ওয়াশরুমে চলে গেল।
ওয়াশরুমে শাওয়ারের নিচে দাঁড়াতেই তীব্র ঠান্ডা জল পিঠ বেয়ে গড়িয়ে নামল। মুহূর্তেই সে যন্ত্রণায় ছিটকে দাঁড়াল। মিররের দিকে চোখ রাখতেই দেখতে পেল, তার পুরো পিঠ জুড়ে নখের সরু, গভীর আঁচড়ের চিহ্ন। রক্ত জমাট বেঁধে লালচে দাগ পড়ে রয়েছে—গত রাতের উন্মত্ততার স্বাক্ষর।
জেইনের ঠোঁটে ফুটে উঠলো এক হালকা, বাঁকা, শিকারী হাসি। সে আবারো দাঁড়িয়ে পড়ল ঝর্ণার নিচে, চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে লাগল সেই গভীর, মিষ্টি যন্ত্রণা।

ঘনিষ্ঠ সময়গুলোতে সে প্রতিবার রিমের হাত বেল্ট দিয়ে বেঁধে দিলেও, চূড়ান্ত মুহূর্তে বাঁধন খুলে দেয়। কারণ সে চায়, যখন সে তার ‘জংলী বিল্লির’ শরীরে নিজের হিংস্র ছাপ ফেলতে ব্যস্ত থাকবে, তখন তার বিল্লিও যেন একইভাবে তার শরীরে প্রমাণ রেখে যায়।
অন্তরঙ্গ মুহূর্তের এই আঘাত, এই আঁচড়—জেইনের কাছে অবিশ্বাস্যরকম উপভোগ্য মনে হয়। কারণ জীবনের প্রতিটা কাজেই সে ‘থ্রিল’ পেতে চায়, সে চায় তার ‘জংলী বিল্লি’ সেইসব মুহূর্তে নিজের সম্পূর্ণ বন্যতা প্রকাশ করুক।
জেইন ফোঁস করে এক দীর্ঘ, শীতল নিঃশ্বাস ছাড়লো। আসল পুরুষের পরিচয় তখনই মেলে—যখন নারী নিজের ইচ্ছের লাগাম ছিঁড়ে, প্রতিঘাত করতে বাধ্য হয়!

কেটে গেছে দুটো দিন। এই দুটি দিন জেইন তার সমস্ত পৃথিবীর প্রতি বিতৃষ্ণা ত্যাগ করে রিমের একমাত্র পরিচর্যাকারীর ভূমিকায় ছিল। রিমকে ওয়াশরুমে নিয়ে যাওয়া, স্নান করানো, খাইয়ে দেওয়া, সময়মতো ওষুধ দেওয়া—সবটাই সে করেছে নিজের হাতে। এই দুই দিন রিম বিছানা থেকে নামতে পারেনি, কথাও বলতে পারেনি; কেবল ইশারা দিয়ে সবটা বুঝিয়েছে। আর জেইন, তার প্রতিটি নীরব ইশারা মুহূর্তেই বুঝে নিয়েছিল।
ভোরের মিষ্টি রোদের আলো চোখে মুখে পড়তেই ঘুম ভাঙে রিমের। ধীরে ধীরে উঠে বসে। তার ওয়াশরুমে যেতে হবে। পাশে ফিরে দেখে জেইন খালি গায়ে, উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। বলিষ্ঠ পিঠের উপরিভাগে কেমন প্রজাতির ডানার মতো আকৃতি। যা বড্ডো আকর্ষণীয় লাগছে রিমের কাছে। মুহূর্তের জন্য রিম সব ভুলে মুগ্ধ দৃষ্টিতে লোকটির দিকে তাকিয়ে রইল। ঘুমন্ত চেহারাটা একেবারে শান্ত, নিষ্পাপ বাচ্চার মতো লাগছে। অথচ এই মানুষটাই জেগে থাকলে কতটা হিংস্র হয়ে ওঠে। রিম অবাক হয়ে তাকায়, লোকটা এতো ফর্সা কেন? সে নিজেও যথেষ্ট ফর্সা, কিন্তু জেইন যেন তার চেয়েও দ্বিগুণ শুভ্র, যেন গ্রিক মার্বেলের কোনো ভাস্কর্য! ছেলেদের শরীর এমন হয়! রিমের ভেতরে এক অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিলো, যা দ্রুতই নির্দোষ ঈর্ষায় পরিণত হলো।

‘ছিঃ, সামান্য গায়ের রং নিয়ে এত হিংসা কেন হচ্ছে আমার?’ সে নিজেকে ধমকালো।
কিন্তু পরক্ষণেই ওয়াশরুমে যাওয়ার তীব্র প্রয়োজন অনুভব হওয়ায় সে নড়ে উঠলো। সারারাত রিমের পাশে জেগে থাকার ক্লান্তিতে জেইনের শরীর এলিয়ে আছে। রিম মুখে বলতে পারে না, তাই হাত দিয়ে জেইনকে আলতো করে ঠেলতে থাকে। জেইন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তাই পাশ ফিরে আবারও শুয়ে পড়ে।
রিমের এবার কান্না পাচ্ছে। সে বহু কষ্টে মুখ থেকে শব্দ বের করার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। কেবল একটি আর্ত গোঙানির শব্দ বেরিয়ে আসে। সেই শব্দে জেইন ধড়মড় করে ঘুরে তাকায়। চোখ দুটো এখনো লাল, ক্লান্তি স্পষ্ট। রিমের কান্নারত মুখের দিকে তাকাতেই তার সমস্ত তন্দ্রা নিমেষে ছুটে যায়। অস্থির হয়ে উঠে বসে সে।রিমের দু’গালে হাত রেখে, কণ্ঠে সমস্ত কোমলতা ঢেলে সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে,
“কী হয়েছে, সোনা? কাঁদছো কেন? কোথায় কষ্ট হচ্ছে তোমার? দেখাও আমাকে।”

রিম ওয়াশরুমের দিকে ইশারা করতেই জেইন তাকে এক লহমায় কোলে তুলে নেয়। তারপর ওয়াশরুমে নিয়ে যায়, খুব যত্ন সহকারে ফ্রেশ করিয়ে নিয়ে আসে। বিছানায় বসিয়ে তার সুন্দর চুলগুলো বিনুনি করে দেয়। এরপর নরম হাতে খাবার খাইয়ে ওষুধ দিয়ে দেয়।
সবশেষে হঠাৎ রিম তার কোলের ওপর উঠে বসে, দু’হাতে গলা জড়িয়ে ধরে অস্ফুটে বলে ওঠে, “আ-রা-ত্র…”
বিস্ময়ে জেইনের চোখ বড় হয়ে যায়। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ তীব্র হতে থাকে। এই দু’দিনে রিম একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারেনি মুখ দিয়ে। সে রিমকে নিজের বুকের আরও কাছে টেনে নেয়। চোখের সামনে পড়ে থাকা নরম বেবি হেয়ারগুলো আলতো করে কানের নিচে গুঁজে দিয়ে আরও গাঢ় আবেগী গলায় বলে,
“কী বললে তুমি? আবার বলো।”

রিম অস্ফুটে ভাঙা গলায় আধো বুলি আওড়ে বলে, “আরাত্র… তুমি কি এবারেও আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে না? আমার এভাবে খুব বোরিং লাগছে। বলো না, আমাকে বাইরে নিয়ে যাবে, প্লিজ?”
রিমের চোখ ছলছল করছে। মুহূর্তে জেইন তাকে শক্ত আলিঙ্গনে বুকে জড়িয়ে ধরে। অস্থির ভাবে আদুরে গলায় বলে,
“নিয়ে যাবো, সোনা। তুমি যেখানে বলবে, সেখানেই নিয়ে যাবো। এখন থেকে আমার লক্ষ্মীটি যা চাইবে, তাই হবে। আমি আমার মালকিনের আর একটা কথাও ফেলবো না। তুমি শুধু হুকুম দেবে, আর আমি তোমার একান্ত দাস হয়ে তা শিরোধার্য করে পালন করবো, মাই কুইন।”
সাথে সাথেই প্রচণ্ড খুশিতে রিম তার গালে একটা গাঢ়, নরম চুম্বন বসিয়ে দেয়। পরমুহূর্তেই তার মুখে একটা মিষ্টি, লজ্জামাখা হাসি ফুটে ওঠে। জেইন ঠোঁট কামড়ে ক্রুর হাসে, রিমের গালে টুপ করে একটা চুমু বসিয়ে দিয়ে কভার্ড থেকে তার জন্য ড্রেস বের করে আনে।
রিম হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকে। কারণ কাপড়গুলো আকারে তার চেয়েও দ্বিগুণ বড়। জেইন তার অবাক হওয়ার কারণ বুঝতে পেরে বাঁকা হেসে বলল,

“এখন তাড়াতাড়ি প্যাকেট হয়ে নাও, সোনা। এটা পরেই বাইরে যাবে তুমি। নয়তো… তোমাকে রুমেই বসে থাকতে হবে। আমি তোমাকে এভাবে কাউকে দেখাতে চাই না, বার্বিডল।”
রিমের মুখটা গোমড়া হয়ে যায়। পরক্ষণেই কিছু একটা ভেবে তার মুখে দুষ্টু হাসি ফুটে ওঠে। সে চঞ্চল পায়ে বিছানা থেকে নেমে কভার্ডের সামনে চলে যায়। জেইন চোখ-মুখ কুঁচকে বলে,
“আরে! কী করছো? এভাবে ছোটাছুটি করো না, ব্যথা পাবে!”
রিম জেদি কণ্ঠে বলে,

“কিচ্ছু হবে না! আমি এখন ঠিক আছি, পুরোপুরি ফিট! বুঝেছ?”
সে নিজের সাথে ম্যাচ করে জেইনের জন্য একটা শার্ট আর প্যান্ট বের করে। তারপর হাসি মুখে বলে,
“আমি এটা পরব আর তুমি এটা। সুন্দর না?”
জেইন পেছন থেকে তার কোমর জড়িয়ে ধরে। ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিয়ে শরীরের ঘ্রাণ নিতে নিতে ফিসফিস করে,
“হ্যাঁ, খুব সুন্দর। কিন্তু তোমার চেয়ে বেশি না। You are the most beautiful person in the world, in my life… And the naughtiest, of course।”
লজ্জার আভা রিমের ফর্সা গাল দুটোকে মুহূর্তেই রাঙিয়ে দিল। সে জেইনের প্রশস্ত বুকে আলতো ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু জেইন তাকে আরও শক্ত করে নিজের সাথে পিষে ধরল। ঘাড়ে ছোট ছোট চুমু দিয়ে আরও গাঢ় কন্ঠে ফিসফিস করে,

“Every part of your body is beautiful. But the most beautiful part is your… Cat।”
রিম ভ্রু কুঁচকে তাকাল। জেইনের হেঁয়ালিপূর্ণ কথার অর্থ ধরতে না পেরে অবুঝের মতো শুধাল,
“কিন্তু আমার তো কোনো ক্যাট নেই! তুমি কিসের কথা বলছো?”
জেইন ঠোঁট কামড়ে ক্রুর হাসলো।
“আছে, এন্ড ইট’স ভেরি স্পেশাল। Only for me, baby।”
রিম পাল্টা কিছু বলতে যাওয়ার আগেই জেইন তার কানের লতির কাছে মুখ নামিয়ে আনল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস রিমের স্পন্দন বাড়িয়ে দিচ্ছিল। সে গাঢ় কণ্ঠে বিড়বিড় করল,
রিম ভ্রু কুঁচকে তাকায়। মুখ ফুটে কিছু বলতে গেলেই জেইন আবারো তার কানের কাছে ঝুঁকে এসে গভীর, শ্বাসরুদ্ধকর কন্ঠে বলল,
“It’s your ‘Pu**ycat’… Whose taste is sweeter than forbidden honey. And you know I’m addicted to that taste, don’t you?”

মুহূর্তেই রিমের কান-ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল, লজ্জায় মুখ লাল।শরীর রি রি করে উঠল তার। এই লোকটা এত সাবলীলভাবে এমন সব কথা কীভাবে বলতে পারে! একটুও লজ্জা নেই। ছিঃ! সে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগলো। জেইন তাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরলো। কিন্তু রিম যখন তার বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য অস্থিরভাবে মোচড়াতে লাগলো, জেইন এক লহমায় তাকে আচমকা কোলে তুলে নিলো।
পরমুহূর্তেই, জেইন তাকে শব্দ করে বিছানায় ফেলে দিল। রিম হাঁসফাঁস করতে করতে উঠে বসার আগেই, জেইন ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো।

রিমের বুক তখন ভয়ে দমাদম কাঁপছে, গত দু’রাতের স্মৃতিতে তার নিঃশ্বাস পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে গেল। সে বুঝতে পারছিল না, এই লোকটা এখন কী করবে। জেইন যখন একেবারে তার কাছে এসে, বিছানার ওপর ভর দিয়ে ঝুঁকে পড়লো, রিম তখন আতঙ্কে চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো। সে প্রস্তুত হলো পরবর্তী পদক্ষেপ বা স্পর্শের জন্য।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর, কোনো স্পর্শ না পেয়ে, রিম ভয়ে ভয়ে চোখ খুললো। দেখলো, জেইন তার দিকে তাকিয়ে বাঁকা, দুষ্টু হাসিতে ঠোঁট বাকিয়ে আছে। সেই হাসি ছিল জাদুকরের মতো রহস্যময়, যা মুহূর্তে রিমের বুক কাঁপিয়ে দিল। রিম ভ্রু কুঁচকে তাকালে, জেইন বিছানার ওপর রাখা বড় সাইজের কাপড়গুলো উঁচু করে ধরলো। গভীর কন্ঠে বলল,
“কী হলো, ভয় পেয়ে গেলে? ভাবছিলে আমি এখনই… উমম্? মাই বার্বি ডল।”
সে রিমের আরও কাছে এসে, তার ঠোঁট প্রায় কানের লতিতে ছুঁইয়ে দিয়ে গাঢ় কণ্ঠে বলল,
“আজকে এসব নয়। এখন মুড নেই। এবার ফটাফট ‘প্যাকেট’ হয়ে যাও তো। নয়তো, জানোই তো, তোমাকে নিয়ে বের হতে দেরী হয়ে যাবে… আর আমার ধৈর্য ফুরোলে কী হয়, তা তো খুব ভালো করেই জানা আছে তোমার, তাই না?”

বলেই রিমকে চোখ মেরে দিল। তারপর গভীরভাবে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে শীতল কন্ঠে বলল,
“হেই আমি তো শুধু মজা করছিলাম। তুমি এতো ভয় পাচ্ছো কেন? আমি কখনোই চাই না তুমি কখনো আমাকে ভয় পাও।”
জেইন রিমের মুখটা তুলে ধরে, তার চোখে সরাসরি তাকিয়ে বলল,
“আমি চাই তুমি আমাকে শাসন করো। আমি তোমাকে ভীতু নয় , বন্য রূপেই দেখতে ভালোবাসি। আমার তো সেই পুরনো ফায়ারফ্লাইকেই বেশি ভালো লাগে। যার অগ্রাসী রূপে দগ্ধ হই আমি। যার চোখের দৃষ্টিতে ঝলসে যায় আমার সমস্ত কায়া। সেই সাহসী, জেদী নারীকেই চাই আমি। খুব করে চাই।”

মাসদাইর, নারায়ণগঞ্জ
সন্ধ্যার নরম, কমলা-বেগুনি আলোয় বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল রাহি। আকাশজুড়ে তখনো গোধূলির শেষ রঙটুকু লেগে, যেন এক বিশাল ক্যানভাসে প্রকৃতি তার দিনের সমাপ্তি আঁকছে। দূরে মসজিদের আজানের শান্ত, গম্ভীর সুর ভেসে আসে বাতাসে, যা সন্ধ্যার নিস্তব্ধতাকে ভেঙেও এক গভীর প্রশান্তি এনে দিচ্ছিল। রাহির খোলা চুলে হালকা বাতাস আলতো ছোঁয়া দিয়ে যাচ্ছিল; গালের পাশে কয়েকটি চুল নরম পরশের মতো লেগে আছে। তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি, যেন সে এই মুহূর্তের সম্পূর্ণ নীরবতাটুকু পান করছে। নিচে শহরের আলো একে একে জ্বলে উঠছিল, জীবনযাত্রা জানান দিচ্ছিল তার চলমানতা, আর সে তাকিয়ে ছিল ওপরে — মৃদু আলোয় রাঙা সেই মায়াবী আকাশের দিকে।
হঠাৎ, সেই প্রশান্তির মাঝে ছেদ টানলো ব্যালকনি থেকে ভেসে আসা কারো ঠকঠক পায়ের শব্দ। পাশে ফিরে তাকাতেই বিস্ময়ে চোখ বড়বড় হয়ে যায় তার। সেই পরিচিত মুখ!

“আপনি এখানে! এই সময়ে কী করছেন? প্লিজ, তাড়াতাড়ি চলে যান! আম্মু দেখে ফেললে খুব ভয়ানক কিছু হয়ে যাবে,”
প্রায় ফিসফিস করে বলে রাহি। তার কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট ভয় এবং অস্থিরতা।
মাত্তেও রেলিংয়ের সাথে পিঠ ঘেষে, অনায়াস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে তার এক হালকা তাচ্ছিল্যমাখা হাসি, যা এই মুহূর্তেও যেন রহস্যময়। ব্যস্ত শহরের মৃদু বৈদ্যুতিক আলোয় সেই হাসি যেন আরও বেশি ঝলমল করছে। সে রাহির দিকে গভীর, স্থির চোখে তাকিয়ে বলে,
“চলে তো যাবোই, সেটা জানাতেই এলাম। এখানে যেই কাজে এসেছিলাম, সেটা সম্পূর্ণ শেষ। কালকে ঢাকা গুলশানে যাবো, সেখানে আরও কিছু কাজ বাকি। সব মিটলেই সোজা ইতালি ব্যাক। তারপর… আর তোমাকে জ্বালাতে আসবো না।”

মুহূর্তেই রাহির বুকটা ধক করে উঠলো। এই কয়দিনে মাত্তেয়োর বারবার দেখা করার চেষ্টা, তার সেই অদম্য আকর্ষণ, যা রাহি মুখে বিরক্তি দিয়ে ঢেকে রাখলেও, তার অজান্তেই এক অন্যরকম অনুভূতি ছড়িয়ে দিয়েছিল হৃদয়ে। মাত্তেয়োর কথা মনে এলেই তার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটতো। কিন্তু এখন সে চলে যাবে শুনে কেমন যেন এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব হলো। এ কি কষ্ট? হয়তো। মাত্তেয়োর বিদায় তাকে অসহায় করে তুলছে।
আচমকা, মাত্তেও তার খুব কাছে চলে আসে, এত কাছে যে রাহির নিশ্বাস প্রায় বন্ধ। রেলিংয়ের সাথে ঠেস দিয়ে এক হাত রাখে রাহির কোমরের উপর। রাহি চোখ বড়বড় করে স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে। তার বুকের হৃদস্পন্দন এতটাই দ্রুত চলছিল যে মাত্তেয়োর কান অব্দি তা স্পষ্ট পৌঁছানোর কথা। মাত্তেও চাপা স্বরে ফিসফিস করে,
“তুমি এবার এসএসসি দেবে, তাইতো।”

রাহি শুষ্ক ঢোক গিলে কম্পিত মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝায়। জীবনে প্রথম কোনো ছেলে তার এত কাছে আসায়, সে সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে পড়ে। মাত্তেও তার কানের কাছে ঘন নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে, সেই স্বর যেন হৃদয়ে ঝড় তোলে,
“তুমি খুব ছোট। বাট ডোন্ট ওয়ারি, তোমাকে সময় দিলাম। দু’বছর পর তোমাকে নিতে আবার ফিরে আসবো। তখন বড় হবে তো!”
রাহি দুহাতে নিজের জামা খামচে ধরে নিঃশ্বাস আটকে রাখে। মাত্তেও তার কাছ থেকে সরে এলে, সে বড় করে নিঃশ্বাস টেনে নিজেকে সামলায়। মাত্তেও তার হাতে একটি ছোট্ট, রিবন-বাঁধা বক্স আর একটা কাগজের টুকরো ধরিয়ে দেয়।

“এটায় আমার ইতালির নাম্বার আছে। কখনো খুব মনে এলে কল করো, কেমন,”
বলেই, সে যেভাবে বেলকনি দিয়ে এসেছিল সেভাবেই অনায়াসে আবার নামতে নামতে চলে গেল। যাওয়ার আগে আরো একবার ঘুরে তাকিয়ে উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে বলল,
“আমাকে ভুলে যেও না কিন্তু রাগিনী! আমি কিন্তু আবার আসবো!”
তার যাওয়ার পথের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে রইল রাহি। সন্ধ্যা তখন গভীর হয়েছে, আর তার হৃদয়ে তখনো মাত্তেয়োর স্পর্শের উষ্ণতা। সত্যিই কি এই লোকটার সাথে আর দেখা হবে না তার? সেই প্রশ্ন তার মনের গভীরে কাঁটার মতো বিঁধে রইল।

ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
হাউজের আন্ডারগ্রাউন্ড কার ভল্টের স্বয়ংক্রিয় গেট খুলতেই রিমের চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল। সে আক্ষরিক অর্থেই হাঁ হয়ে তাকিয়ে রইল। দেয়ালজুড়ে কালো মার্বেল পাথর, আর ছাদের নিচে সোনালী স্পটলাইটের আলোয় ঝলমল করছে বিলাসবহুল গাড়িগুলোর ধাতব শরীর।
Ferrari, Lamborghini, Mercedes, SUV, Audi, Rolls-Royce, Aston Martin—বিশ্বের এমন কোনো নামীদামি ব্র্যান্ড নেই যা এখানে অনুপস্থিত। সংখ্যাটা হবে প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। কিন্তু প্রতিটি গাড়িই কেবল দামি নয়, custom-built for Aratrik Zain Chowdhury.
কোনোটির দরজায় জেইনের নাম খোদাই করা, কোনোটির বডি এমনভাবে গ্লাসে ঢাকা যেন মনে হয় এটি কোনো রাজার যুদ্ধঘোড়া, নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মাঝে বিশ্রাম নিচ্ছে। একদম সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি ‘ম্যাট ব্ল্যাক মার্সিডিজ এএমজি’, যেটি শুধুমাত্র জেইনের জন্য জার্মান কোম্পানি নিজে ডিজাইন করেছে—রাতের মতোই নীরব, অথচ ভয়ংকর ক্ষমতাধর।
রিম মূর্তির মতো স্থির দাঁড়িয়ে অবাক কণ্ঠে বলল,

“এতো গাড়ি! মনে হচ্ছে কোনো শোরুম এটা!”
পাশ থেকে গ্যারেজের ম্যানেজার বিনয় নিয়ে এগিয়ে এসে বললেন,
“এটাতো কিছুই না ম্যাম। আগে আরও বেশি ছিল। আমাদের স্যারের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গাড়ির অনেক শখ। প্রতিটি কোম্পানি স্যারের জন্য আলাদা করে বিশেষ ডিজাইনে তৈরি করে দেয়। স্যার তো আগে রোজ রাতে রেসিং করতেন। রেসিং করাটা যেন ওনার নেশা ছিল। তবে সেসব এখন পুরোনো, প্রায় তিন বছর আগের কথা।”
ঠিক সেই মুহূর্তে, গ্যারেজের প্রবেশমুখে এসে দাঁড়ায় জেইন। দুই হাত পকেটে গুজে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। ম্যানেজারের কথাগুলো তার কানে যেতেই রাগে তার চোখে যেন আগুন জ্বলছে। চোয়াল টানটান, তার পুরো শরীর থেকে এক বিপজ্জনক শীতলতা নির্গত হচ্ছে।
সে ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে, চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,

“হোয়াট দা ফা*ক আর ইউ ডুয়িং হেয়ার, হাহ্? ইউ স্কাউ*ণ্ড্রেল!”
ম্যানেজার শুকনো ঢোক গিললেন। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে কাঠ, শরীর কাঁপছে। কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বললেন,
“ক-কিছু না স্যার! ঐ আর কি ম-ম্যামকে বলছিলাম যে…”
জেইন এক পা এগিয়ে এলো, তার কণ্ঠস্বর এখন আরও শীতল, আরও নিচু—যা ভয়ের মাত্রা বাড়িয়ে দিল বহুগুণ।
“আজকাল খুব বেশিই বলছো না তুমি? আমি আবার কথা কম, কাজ বেশি পছন্দ করি। কারণ মুখ বেশি চললে আমার আবার হাত বেশি চলে… বুঝতে পারছো?”
“ইয়ে মানে স্যার আ…আসলে…”
লোকটা আমতা আমতা করতে থাকলে জেইন দৃঢ়, কর্তৃত্বপূর্ণ কন্ঠে আদেশ করল,

“‘মানে মানে’ না করে গাড়ি বের করো চুপচাপ! এক্ষুনি!”
“ওকে স্যার।” ম্যানেজার প্রায় ছুটে গিয়ে একটি গাড়ির চাবি হাতে নিলেন।
হঠাৎই জেইন রিমের কোমড় শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। তার কণ্ঠে এখন মিষ্টি আদুরে সুর
“সোনা… এখান থেকে কোন গাড়িটায় উঠতে চাও তুমি? তুমি যেটা বলবে, আমরা সেটাতেই যাবো, ওকে।”
পাশ থেকে ম্যানেজার দ্রুত চোখ নামিয়ে একবার খুকখুক করে কেশে উঠলেন। রিম এই প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতায় লজ্জায় হাঁসফাঁস করে উঠলো। সে জেইনকে ছাড়াতে চায়, কিন্তু জেইন তাকে আরও শক্ত করে কোমড়ে চাপ দিয়ে জড়িয়ে রাখলো। রিম হতাশার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে।
তারপর নিরুপায় হয়ে সেখান থেকে একটি কালো স্পোর্টস কার দেখিয়ে দিল। ম্যানেজার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সেই গাড়িটি ভল্ট থেকে বের করে আনলেন।

পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে রূপকথার মতো পথ। সেই পথ ধরে, প্রকৃতির বুকে আলতো আঁচড় কেটে, ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে ম্যাট ফিনিশ কালো মার্সিডিস-বেঞ্জটি। চারপাশে ঘন সবুজে মোড়া বৃক্ষরাজি, তাদের ফাঁক দিয়ে যেন উঁকি দিচ্ছে দূরের নীলাভ সমুদ্র—আকাশের কোলে ছড়িয়ে থাকা এক ফোঁটা তরল রুপালি রেখা।
গাড়ির উপরটা সম্পূর্ণ খোলা, তাই কোনো বাধা ছাড়াই হু হু করে ভেতরে ঢুকছে লবণাক্ত ঠান্ডা বাতাস, চুল উড়ে যাচ্ছে হালকা ঝোড়ো হাওয়ায়, আর গাড়ির ভেতরের দুই মানব-মানবী অনুভব করছে প্রকৃতির মায়াবী স্পর্শ।
নিচে পাথুরে ঢাল বেয়ে নেমে গেছে উচ্ছল ঝর্ণাধারা, সোনালী সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে তার ফেনিল জল, মুক্তোর মতো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। দিগন্তে পাখিরা ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে অস্তগামী সূর্যের দিকে, আকাশে তখন সোনালি আর কমলার এক মায়াবী আলপনা। চারপাশ এমন শান্ত—মনে হয় প্রকৃতি যেন নিজেই তার নিঃশ্বাস নিচ্ছে ধীরে ধীরে, আর সেই স্নিগ্ধ নিঃশ্বাসের ভেতর হারিয়ে গেছে দুটি মানুষের নীরব মুগ্ধতা।
ড্রাইভিং সিটে বসে অত্যন্ত দক্ষ হাতে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে ড্রাইভ করছে জেইন। তার পরনে একটা স্নিগ্ধ শুভ্র রঙের ওভারসাইজ শার্ট আর একটা অফ হোয়াইট ব্যাগী জিন্স। চোখে ক্লাসি সানগ্লাস আর মুখে এক চিলতে বাঁকা হাসি। হালকা বাতাসে তার কপাল অব্দি ছুঁই ছুঁই সিল্কি চুলগুলো যেন মৃদু তালে দোল খাচ্ছে।

আর তার ঠিক পাশেই, খোলা গাড়ির সুযোগ নিয়ে, রিম আনন্দ আর স্বাধীনতায় মাতোয়ারা। তার পরনেও একটি ঢিলেঢালা সাদা টি-শার্ট ও ডেনিম জিন্স। বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে তার খোলা এলোমেলো চুলগুলো উড়ছে, একবার ডানদিকে তো আরেকবার বামদিকে, ঠিক যেন বাতাসের সাথে নাচছে। সে দু’পাশে দু’হাত ছড়িয়ে দিয়েছে শূন্যে, বুক ভরে নিশ্বাস নিচ্ছে সমুদ্রের ঘ্রাণ মেশানো ঠান্ডা বাতাসে—যেন সে এই মুহূর্তের সমস্ত স্বাধীনতা আর আনন্দ উপভোগ করে নিচ্ছে। তার উচ্ছ্বাস দেখে জেইনের ঠোঁটের হাসি আরও চওড়া হয়। বাতাসের ঝাপটায় উড়ে আসা রিমের চুলের মিষ্টি ঘ্রাণ জেইনের মুখে আঘাত করে, আর সেই আবেশে এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজে ফেলে সে।
হঠাৎ জেইনকে অবাক করে দিয়ে রিম নিমিষেই তার কোলের উপর উঠে বসে পড়ে। তার দুই পা জড়িয়ে ধরে জেইনের কোমরে, আর দুই হাত বাড়িয়ে তার টি-শার্টের ভেতর ঢুকিয়ে দেয় জেইনের মাথা, আঁকড়ে ধরে তার গলা। জেইন কিছু বুঝে ওঠার আগেই, রিম আরও এক ধাপ এগিয়ে ছোট্ট করে একটি গাঢ়, উষ্ণ চুমু এঁকে দেয় তার ঠোঁটে। জেইনের চোখ বিস্ময়ে ছানাবড়া—মুহূর্তের জন্য স্টিয়ারিং-এর উপর তার গ্রিপ আলগা হয়। পরক্ষণেই সে ঠোঁট কামড়ে ধর ক্রুর হাসে।

এক হাতে সাবধানে স্টিয়ারিং ধরে রেখে, পেছন দিক দিয়ে সে হাত ঢুকিয়ে দেয় রিমের টি-শার্টের ভেতর। ঠান্ডা হাতের অপ্রত্যাশিত স্পর্শে কেঁপে ওঠে রিমের সমস্ত শরীর। শিরদাঁড়া বেয়ে যেন এক শীতল, মিষ্টি স্রোত বয়ে যায়। জেইনের হাত তার কোমল পিঠের উপর এলোমেলোভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছে, আলতো আদর বুলিয়ে দিচ্ছে। রিমের বুক অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে কাঁপতে থাকে। জেইন তার পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে নেশাক্ত চোখে তাকিয়ে শুষ্ক ঢোক গিলে গাঢ়, চাপা কন্ঠে বলে
“আজকে তোমার কি হয়েছে বলো তো? পাহাড়ের এই বাঁকে আমাকে পাগল বানিয়ে দেবার ধান্দা করছো? আমি কিন্তু আগে থেকেই পাগল হয়ে আছি। এরপর বেসামাল হয়ে গেলে, গাড়ির গতিপথ আর আমার বেপরোয়া ভাব সবটা কিন্তু তোমাকেই সামলাতে হবে।”
রিম তার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে, রেশমীর মতো চিকন, কম্পিত কন্ঠে উত্তর দেয়,
“আমি সামলে নিব।”

ব্যস, এই ছোট্ট বাক্যেই জেইন বেপরোয়া। সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে, নিজের ঠোঁট দুটো চাপিয়ে দেয় রিমের ঠোঁটে। হঠাৎ জেইনের এই আক্রমণাত্মক, তীব্র স্পর্শে কেঁপে ওঠে রিমের সমস্ত তনু মন। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত, মাদকতাপূর্ণ কম্পন সৃষ্টি হয়, হাত পায়ে শিহরণ ছড়িয়ে পড়ে।
জেইন তার ঠোঁট দুটোকে ধীরে ধীরে, পরম আশ্লেষে শুষে নিতে থাকে। রিমের চোখের কোণে চিকচিক করে এক ফোঁটা অশ্রু—বুকের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে অজানা অনুভূতি। জেইনের এই আদুরে, উন্মত্ত স্পর্শে মুর্ছা যায় তার ছোট্ট শরীর। সে দু’হাতে জেইনের বড়বড় সিল্কি চুল শক্ত করে খামচে ধরে। জেইন বেপরোয়া—সে রিমকে যেন পুরোপুরি নিজের ভেতর মিশিয়ে নিতে চায়।

একসময় রিমও এই আবেগে সাড়া দিতে শুরু করে। আবেশে ঠোঁটে ঠোঁট মেলায়, হারিয়ে যায় অনুভূতির অদৃশ্য জোয়ারে। দুজনের মুখের উষ্ণ লালা মিশে একাকার হয়ে যায়। জেইন এক হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং সামলে রেখেছে অত্যন্ত সতর্কতায়, আর অন্য হাতে শক্ত করে আগলে রেখেছে রিমকে। যখন সে অনুভব করে রিমের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, সে আস্তে করে তার ভেজা ঠোঁট দুটো ছেড়ে দেয়।
রিম ছাড়া পেয়ে চোখ বুজে ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে থাকে, তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে এক ফোঁটা অশ্রু। জেইন দেরি না করে, নিজের ঠোঁট দিয়ে শুষে নেয় সেই উষ্ণ নোনা জল। তীব্র লজ্জায় রিমের মুখ রাঙা হয়ে যায়। সে আর কিছু না বলে মুখ গুঁজে দেয় জেইনের বুকে। জেইন তাকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে আগলে রাখে, যেন পৃথিবীর কোনো শক্তি তাদের আলাদা করতে না পারে।
একটু পর রিম তার দিকে শান্ত চোখে মুখ তুলে তাকায়। সেই রেশমীর মতো চিকন গলায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে,
“আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?”
জেইন তার নাকে আলতো ভাবে নাক ঘষে। তারপর সেখানে ছোট্ট করে একটা চুমু এঁকে দিয়ে, নেশালো সুরে গেয়ে ওঠে,

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪২

“Do dil Safar main Nikal pade….
Jana kaha kyun fikar kare….
Kaha thikana ho rat ka,
Subha kaha pe basar kare…
Khoya khoya Dil Mera kehta hai….🎶
Haan….
Tum se hi bas Tum se hi
Meri jaan hai bas Tum se hi,
Dil ko mere aaram hai
Pareshan hai bus tumse Hi….🎶”

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৪