Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫৫

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫৫

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫৫
রাত্রি মনি

“তুমি এখানে?…..”
জেইনের কণ্ঠস্বর নিচু, কিন্তু তাতে এক ভয়ানক শীতলতা।​জেইন তার আসন থেকে নড়েচড়ে বসতেই, তার কোলে বসে থাকা মেয়েটি বিদ্যুৎবেগে উঠে দাঁড়ালো। সেই মুহূর্তে ঘরের ভেতরের বাতাস যেন জমে বরফ হয়ে গেল।
​জেইন চেয়ার ছেড়ে উঠে ধীর অথচ ভারী পায়ে রিমের সামনে এসে দাঁড়ালো। পকেটে দুহাত গোঁজা, কিন্তু তার শার্টের ওপর দিয়েও বোঝা যাচ্ছে শরীরের প্রতিটি পেশি তপ্ত হয়ে আছে। চোয়ালের হাড়গুলো শক্ত হয়ে বেরিয়ে এসেছে, আর চোখ দুটো থেকে যেন আগুনের হলকা ছুটছে। সে রিমের খুব কাছে এসে দাঁড়ালো। তার গলার রগগুলো রাগে ফুলে উঠছে।

“এখানে কীভাবে এসেছো তুমি? আমি কি স্পষ্ট করে বলিনি যে হাউজের সীমানার বাইরে এক পা-ও রাখবে না তুমি? আমার নির্দেশ কি তোমার কানে পৌঁছায় না, নাকি অবাধ্য হওয়াটা তোমার নেশায় পরিণত হয়েছে? কেন বারবার আমাকে এই নরক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলো তুমি!”
​রিমের কানে শব্দগুলো তপ্ত সীসার মতো এসে বিঁধল। যে মানুষটার জন্য সে এক শহর বিপদ মাথায় নিয়ে ছুটে এসেছে, তার কোলে আজ অন্য কেউ?কিছুক্ষণ আগে জেইনের কোলে অন্য কাউকে দেখার দৃশ্যটা তার চোখের সামনে স্থির হয়ে আছে। রিম নিজের আঙুলের ব্যান্ডেজটার দিকে একবার তাকালো, যে হাতটা একটু আগে জেইন আদরে ভরিয়ে দিয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যেই জেইনের সেই আদরগুলো বিষাক্ত ঘৃণায় রূপান্তরিত হলো।
​রিমকে পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জেইনের ভেতরের সুপ্ত আগ্নেয়গিরি যেন ফেটে পড়ল। সে গর্জনে করে উঠলো,

“ড্যামন ইট!!! ইডিয়ট!!! এভাবে বোবার মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন? উত্তর দাও আমাকে!!!!!”
​আচমকা ধমকের শব্দে রিমের পুরো শরীর কেঁপে উঠল। চোখের কোণে জমা জলগুলো বাঁধ ভেঙে গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। ভাঙা গলায় সে বিড়বিড় করে বলল,
“ভুল হয়ে গেছে… অনেক বড় ভুল। এখানে আসাটা ঠিক হয়নি আমার। খুব ডিস্টার্ব করে ফেললাম তোমাকে, তাই না? তুমি তো খুব… খুব ‘ইম্পর্ট্যান্ট’ কাজে ব্যস্ত ছিলে!”
​শেষের কথাগুলো রিমের কণ্ঠ ছিঁড়ে বেরিয়ে এল অপমানে আর অভিমানে।
​জেইন এক ঝটকায় রিমের দু’বাহু শক্ত করে চেপে ধরল। আঙুলের চাপে রিমের নরম চামড়ায় নীলচে দাগ পড়ে যাওয়ার উপক্রম। জেইন ওকে সজোরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে হিংস্র স্বরে বলল,

“ইডিয়ট মেয়ে!!! তুমি কি এখনো বোঝোনি যে এই পৃথিবীতে তোমার থেকে বেশি ইম্পর্ট্যান্ট আমার কাছে আর কিছুই নেই? কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই এভাবে চলে এসেছো! একবারও ভেবেছো রাস্তায় কোনো বিপদ হতে পারত? চারপাশটা হায়েনাদের মতো শত্রুতে ছেয়ে আছে, তাদের একমাত্র লক্ষ্য আমার দূর্বলতা। আর সেটা ত্….!!! প্রতিটা সেকেন্ড তোমার চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছি আমি, আর তুমি—তুমি আমাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বে!”
রিমের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। বুক চিরে একটা শব্দ করে কান্নার আর্তনাদ বেরিয়ে এল তার। সর্বশক্তি দিয়ে সে জেইনকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে সরিয়ে দিল। রিমের দুচোখে তখন রাজ্যের ঘৃণা আর অভিমান টলমল করছে।
“আমার জন্য কেন কষ্ট হবে তোর? কে হই আমি তোর? শুধুই কি ভোগের পাত্রী?”
রিমের কণ্ঠস্বর কান্নায় ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে,
“কেন ঠকালি তুই আমাকে? কেন? আমার কষ্ট হচ্ছে….. বুকটা ফেটে যাচ্ছে! সাত বছর বয়সে সেই অবুঝ মনে যাকে নিজের রাজকুমার বলে জায়গা দিয়েছিলাম, যাকে নিজের সর্বস্ব দিয়ে ভালোবেসেছি—তার কোলে আজ অন্য কেউ! এই দৃশ্য আমি কীভাবে সইব? কীভাবে? কেন ঠকালি? বল কেন? আমায় এভাবে না ঠকালেও পারতি! আগেই বলে দিতে পারতি তুই শুধু শরীর চেয়েছিস আমার!”

“ঠাসসসস!”
একটা তীক্ষ্ণ শব্দের সাথে সাথে রিমের মাথাটা একদিকে ঝুলে পড়ল। থাপ্পড়টা এতটাই জোরালো ছিল যে রিমের কানে তালা লেগে গেল। সে টাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে প্রায় নুয়ে পড়ল। সাদা চামড়ার ওপর জেইনের শক্ত হাতের চার আঙুলের লালচে ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে; মনে হচ্ছে যেন গালের চামড়াটা জ্যান্ত খসে পড়ছে। প্রচণ্ড জ্বলুনিতে রিম এক মুহূর্তের জন্য চোখে সর্ষে ফুল দেখল।
সে অতি কষ্টে মাথাটা সামান্য তুলতেই জেইন বাজের মতো এসে ওর চোয়ালটা দুই আঙুলে চেপে ধরল। আঙুলের চাপ এতটাই পৈশাচিক যে মনে হচ্ছে চোয়ালের হাড়গুলো মটমট করে গুঁড়িয়ে যাবে। চাপের চোটে রিমের ঠোঁট দুটো গোল হয়ে ফাঁক হয়ে গেছে; ভেতর থেকে শুধু চাপা এক গোঙানি বেরিয়ে আসছে, কোনো কথা ফুটছে না।
জেইন নিজের মুখটা রিমের মুখের একদম কাছে নিয়ে এল। দাঁতে দাঁত চিপে আসা শব্দগুলো যেন তপ্ত আগ্নেয়গিরির লাভা,

“কী বললি তুই? ভোগ করতে চেয়েছি তোকে? আরে, তোকে যদি সত্যিই ভোগ করতে চাইতাম, তবে যেদিন তোকে তুলে এনেছিলাম সেদিনই নিজের সব খাহেশ মিটিয়ে নিতে পারতাম! তারপর কোনো নোংরা ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে দিতাম তোকে! এত যত্ন করে আগলে রাখার প্রয়োজন হতো না। আর বিয়ে? প্রশ্নই উঠত না!”
জেইন ওর মুখটা নিজের আরও কাছে এনে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“কাউকে ভোগ করার জন্য এই ‘আরাত্রিক জেইন চৌধুরী’কে ছলনার আশ্রয় নিতে হয় না! এই নামটাই যথেষ্ট যেকোনো মেয়েকে বিছানায় আনার জন্য। আমার একটা রাত পাওয়ার জন্য এই শহরের মেয়েরা উন্মুখ হয়ে থাকে। আমি যদি অতই সস্তা হতাম, তবে রোজ নতুন একটা শরীর পড়ে থাকত আমার বিছানায় !”
জেইন রিমকে সামান্য তাচ্ছিল্যভরে ঝটকা দিয়ে ছেড়ে দিল। তার ঠোঁটের কোণে একটা বিষাক্ত হাসির রেখা ফুটে উঠল, পরক্ষণেই গলার স্বর অদ্ভুত এক যন্ত্রণায় নিচু হয়ে এল।

“কিন্তু কী করব? উপায় নেই… যৌবনে পদার্পণ করার ঢের আগে থেকেই এই বুকের বা পাশে অন্য একজন নিজের রাজত্ব বিস্তার করে নিয়েছে। একটা… সাধারণ বাচ্চা মেয়ে! দীর্ঘ চোদ্দটি বছর ধরে যার অন্ধ আসক্তিতে তিলে তিলে শেষ হচ্ছি আমি। আমার মস্তিষ্ক, আমার হৃৎপিণ্ড, আমার এই দেহ—সবটুকু দখল করে নিয়েছে সেই মেয়েটা! সে নিজে বড় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছে। এই যে দেখ, এখনো জ্বলছি আমি!”
জেইন একটু থামল। তার ঘন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দে নিস্তব্ধ ঘরটা যেন কাঁপছে। রিম পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে জেইনের দিকে।
“একটা ছোট্ট স্কুল ড্রেস পরা বাচ্চা মেয়ে… সাদা শার্ট আর গ্ৰীণ স্কার্ট পরা সেই মেয়েটাকে দেখেই এই দেহের হৃদস্পন্দন থমকে গিয়েছিল প্রথম বার! আমার এই জমাটবদ্ধ অন্ধকার জীবনে একমাত্র জোনাকির মতো আলো ছড়িয়ে দিয়েছিল সে। সেদিন ওকে দেখেই আমার অবচেতন মন থেকে প্রথম একটাই শব্দ বেরিয়ে এসেছিল—ফায়ারফ্লাই!”

জেইনের বলা প্রতিটা বাক্য রিমের বুকের ভেতরটায় তীব্র এক মোচড় দিয়ে উঠল। জেইনের চোখে সে আজ নিজের জন্য যে হাহাকার দেখল, তা তার সব অভিমানকে এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দিল। রিম আর এক মুহূর্ত দেরি করল না; টলমল পায়ে ছুটে গিয়ে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল জেইনের চওড়া বুক। কান্নায় তার বুক ফেটে যাচ্ছে, হেঁচকি উঠতে উঠতে রুদ্ধ হয়ে আসছে কণ্ঠ।
“আমি সরি!আমি খুব, খুব, খুব সরি! আর কখনো ওসব নোংরা কথা বলব না তোমায়। প্লিজ, আমার ওপর এভাবে রাগ করো না।”
রিম ওর শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল, “কিন্তু আমি কী করব? তুমিই তো ওই মেয়েটাকে কোলে নিয়ে বসে ছিলে! আমার কি কলিজায় লাগে না? তুমি যেখানে আমাকে অন্য কোনো ছেলের ছায়ার পাশেও সহ্য করতে পারো না, সেখানে আমি তোমাকে অন্য মেয়ের পাশে কীভাবে সহ্য করব? এরপর যদি আর কোনো মেয়েকে তোমার আশেপাশে দেখি, তবে নির্ঘাত তোমাকে জানে মেরে ফেলব আমি! আমি পারি না আরাত্র… সহ্য করতে পারি না। খুব কষ্ট হয় আমার, অসহ্য কষ্ট!….”

রিমের এই অবুঝ অথচ তীব্র পাগলামি ভরা অধিকারবোধ দেখে জেইনের চোয়ালের কাঠিন্য কিছুটা শিথিল হলো। সে রিমের চুলের গুচ্ছ মুঠোয় ভরে ওর মুখটা টেনে তুলল। রিমের চোখের জলগুলো নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে মুছিয়ে দিতে দিতে জেইন নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“ইশ! আমি তো জানতাম না আমার সোনা’টা আমাকে নিয়ে এতটা পজেসিভ! ছোট্ট মনে এত হিংসা পুষে রেখেছ?”
জেইন রিমের কপালে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল। এক দীর্ঘ পবিত্র পরশ। তারপর ওর সিক্ত চোখে আর লাল হয়ে থাকা ছোট্ট নাকটায় একটা চুমু খেল। ঠিক যখন সে রিমের কাঁপতে থাকা ঠোঁটের দিকে ঝুঁকে এল, তখনই তার চোখের চাউনি আবার তীক্ষ্ণ আর শীতল হয়ে উঠল। রিমকে নিজের বাহুবন্ধনে শক্ত করে মিশিয়ে রেখেই সে ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লারার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকাল।

“মিস ক্লারা… আপনার পেপার সাইন করা হয়েছে নিশ্চয়ই?”
“ই-ইয়েস স্যার,”
“তাহলে এখনো, এখানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না আমি আমার স্ত্রীর সাথে কথা বলছি? আমি এই মুহূর্তে আমার ওয়াইফের সাথে একান্ত কিছু সময় কাটাতে চাই। আপনি এখন আসতে পারেন।”
“ওকে স্যার”
ক্লারা একবার আড় চোখে তীক্ষ্ণ লালচে দৃষ্টিতে রিমের দিকে তাকালো। কোনোমতে মাথা নিচু করে দরজার দিকে পা বাড়াল। কিন্তু সে দরজার হাতলে হাত দেওয়ার আগেই জেইনের কড়া কণ্ঠস্বর চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল,
“শুনুন মিস ক্লারা! আপনি আর কখনো এই ধরনের কুরুচিপূর্ণ পোশাক পরে অফিসে আসবেন না। আমি আগেও আপনাকে সতর্ক করেছি… দিস ইজ মাই লাস্ট ওয়ার্নিং! নাও ইউ ক্যান গো।”
ক্লারা অপমানে আর ভয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু জেইন আবারো দরজার দিকে তাকিয়েই গম্ভীর গলায় শেষ নির্দেশ দিল,

“আর শুনুন! যতক্ষণ না আমি নিজে থেকে ডাকছি, কেউ যেন আমাকে এই ঘরে ডিস্টার্ব করার দুঃসাহস না দেখায়। আই সেইড, কেউ না!!”
ক্লারা কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতেই জেইন রিমকে পাঁজাকোলে তুলে নিল। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে নিজের সেই রাজকীয় বিশাল চেয়ারটিতে ওকে বসিয়ে দিল। তারপর সে নিজে দাসের মতো হাঁটু গেড়ে বসল রিমের পায়ের কাছে। কেউ কি বিশ্বাস করবে,কারো সামনে কখনো মাথা নত না করা হিংস্র মাফিয়া বসটাও এভাবে বউয়ের পায়ের কাছে মাথা ঝুঁকিয়ে দাসের মতো বসে! হয়তো স্বচক্ষে না দেখলে নয়!
রিমের ফর্সা গালে জেইনের হাতের চার আঙুলের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে, জায়গাটা কালশিটে পড়ে লালচে-বেগুনি হয়ে উঠেছে। জেইন কাঁপাকাঁপা হাতে আঙুল ছোঁয়ালো সেখানে।
“আআহহ্”

ছোঁয়া লাগতেই যন্ত্রণায় রিমের মুখ থেকে এক ব্যথাতুর আওয়াজ বেরিয়ে এল। ঠোঁট দুটো উল্টে এল কান্নায়, চোখের কোণে আবার নতুন করে জল টলমল করে উঠল। জেইন এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল; নিজের ওপর নিজেরই প্রচণ্ড ঘৃণা হলো এমন ফুলের মতো মুখটাতে আঘাত করার জন্য। সে আলতো করে রিমের চোখের জল মুছে দিয়ে সেই কালশিটে পড়া জায়গাটায় গভীর অনুতাপে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। রিম আবেশে চোখ বুজে নিল। জেইনের ঠোঁটের উষ্ণতায় গালের সেই জ্বালা যেন মুহূর্তেই জুড়িয়ে গেল।
“শুধু শুধু কেন এখানে আসতে গেলে বলতো? আমি কি আবার আসতাম না তোমার কাছে? কেন বারবার নিজের বিপদ বাড়িয়ে তোলো? আমার সব কথা অমান্য করার প্রতিজ্ঞা করেছো তাই তো!”
জেইন রিমের চিবুক ধরে নিজের দিকে সামান্য তুলে ধরল,
” এতো পাগলামি!! আমাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারছিলে না বুঝি!!”

লজ্জায় আর সোহাগে রিমের গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে ফুলে উঠল। সে কোনোমতেই চোখ খুলে তাকাতে পারল না। জেইন মুচকি হেসে ড্রয়ার থেকে একটা অয়েন্টমেন্ট বের করল। খুব সাবধানে নিজের আঙুলের ডগায় একটুখানি মলম নিয়ে ও রিমের গালে ধীরে ধীরে ফু দিতে দিতে প্রলেপ লাগিয়ে দিতে লাগল। রিম যন্ত্রণায় কুঁচকে গেল। জেইন অস্থির হয়ে আদুরে গলায় বলল,
“বেশি জ্বলছে সোনা? কষ্ট হচ্ছে তোমার?…”
রিমের চোখে তখনো অভিমানের মেঘ জমে আছে। সে চোখ খুলে জেইনের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে মুখ ফুলিয়ে বলল,
“খুব জ্বলছে… কিন্তু এখানে না, বুকে!”
হঠাতই রিম জেইনের শার্টের কলারটা শক্ত মুঠোয় ধরে নিজের দিকে এক হেঁচকায় টেনে আনল। শাসন করার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,

“এটা পরে লাগাবে। আগে বলো ওই মেয়েটা কে? আর আমার জায়গায় তোমার কোলে বসে ছিল কেন? জবাব দাও!!!”
জেইন ঠোঁট কামড়ে এক চিলতে শয়তানি হাসল। রিমের এই অধিকারবোধ সে তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে উপভোগ করছে। নিচু স্বরে জবাব দিল,
“আসলে তোমার হাসব্যান্ড একটু বেশিই হ্যান্ডসাম কিনা!! তাই মেয়েরা নিজেকে সামলাতে পারে না। এখানে আমার কী দোষ বলো?”

কিছুক্ষণ আগে…………
ম্যারাথন মিটিং শেষে বোর্ড রুম থেকে সবাই বেরিয়ে গিয়েছে। এসি চললেও জেইনের তপ্ত শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। সে বিরক্তির সাথে নিজের স্যুটটা খুলে সোফার ওপর ছুড়ে মারল। শার্টের হাতা ভাঁজ করে দিল কুনই পর্যন্ত, ওপরের কয়েকটা বোতাম আলগা করে দিয়ে এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দিল সর্বোচ্চ। ক্লান্তিতে শরীরটা ভেঙে আসছে। নিজের বিশাল আসনে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজল সে; মুখটা ঢেকে নিল একটা কালো ডায়েরি দিয়ে।
ইয়াশ তখন ড্রাগ ডিল কনফার্ম করে পার্টনার গ্যাব্রিয়েলকে এগিয়ে দিতে বাইরে গেছে। ঠিক সেই নির্জন মুহূর্তেই দরজায় মৃদু করাঘাত হলো।জেইন ডায়েরিটা মুখ থেকে না সরিয়েই নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“কাম ইন…”

ভেতরে প্রবেশ করল সেই মোহনীয় রাশিয়ান কন্যা—মিস ক্লারা। শুভ্র গায়ের রঙ, টকটকে লাল ঠোঁট আর কার্ল করা রেশমি সোনালী চুল। যার রূপের জাদুতে এই শহরের বড় বড় বিজনেসম্যান আর মাফিয়া বসে’রা কুপোকাত।
ক্লারা ফাইল হাতে দুলকি চালে জেইনের একদম কাছে এসে মোলায়েম স্বরে বলল,
“স্যার, এই ফাইলে আপনার একটা সাইন লাগবে।”
জেইন আগের ভঙ্গিতেই শুয়ে থেকে গম্ভীর গলায় বলল, “রেখে যাও। পরে করে নেব।”
“বাট স্যার, ইটস ভেরি আর্জেন্ট! ফাইলটা এখনই লাগবে। আপনি যদি এখনই সাইন করে দিতেন…”
জেইন বিরক্ত হলো। এই মেয়েটা সুযোগ পেলেই তার গায়ে পড়ার চেষ্টা করে। জেইন বুঝতে পারছিল এটা ক্লারার স্রেফ একটা অজুহাত তার কাছাকাছি আসার। সে ধীরে শ্বাস নিয়ে সোজা হয়ে বসে ক্লারার দিকে না তাকিয়েই হাত বাড়িয়ে বলল,

“গিভ মি দ্য ফাইল।”
ক্লারা ফাইল দেওয়ার বাহানায় আরও কাছে ঘেঁষে এল। জেইনের সামনে ঝুঁকে পড়ে নিজের শরীরের উন্মুক্ত অংশ প্রদর্শন করার চেষ্টা করল সে। কিন্তু জেইনের দৃষ্টি নড়ল না; সে নিস্পলকভাবে ফাইলের পাতায় চোখ বুলিয়ে খসখস করে সাইন করে দিল। সাইন শেষ হতেই ফাইলটা টেবিলের ওপর সজোরে ঠেলে দিল সে।
নিজের সমস্ত রূপের জাদু ব্যর্থ হতে দেখে ক্লারা ভেতরে ভেতরে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। যে মেয়েকে পাওয়ার জন্য এতো ছেলে পাগল, সে মেয়েকে এভাবে উপেক্ষা করছে? রাগে আর জেদে ক্লারা ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে লাগলো। হঠাৎ তার ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময়ী হাসি ফুটে উঠল। ফাইলটা হাতে নিয়ে দু-পা এগোতেই সে টেবিলের কোণায় হোঁচট খেয়ে, পরের মুহূর্তেই ‘ঠাস’ করে গিয়ে পড়ল সরাসরি জেইনের কোলে। তার মাথাটা লেপ্টে রইল জেইনের উন্মুক্ত বুকের সাথে। জেইনের শরীরটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে এল। প্রচণ্ড বিরক্তিতে তার চোয়ালের হাড়গুলো কাঁপছে। ইচ্ছে করছিল মেয়েটাকে এক ধাক্কায় মেঝেতে আছড়ে ফেলে দিতে, কিন্তু এই মুহূর্তে কোনো লঙ্কাকাণ্ড ঘটাতে চাইল না সে। ক্লারা ওঠে পড়ার ভান করে আবারও জেইনের বুকের ওপর নেতিয়ে পড়ে বলল,

“স-সরি স্যার… একচুয়ালি আই…”
আর ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাত করে ঘরের দরজাটা খুলে গেল। জেইন বিরক্ত হয়ে মাথা তুলল, কিন্তু দরজায় দাঁড়ানো রিমকে দেখেই তার হৃদপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। রিমের চোখে টলমল করা জল আর একরাশ ঘৃণা দেখে জেইনের ভেতরের বিরক্তি নিমেষেই প্রচণ্ড ক্ষোভে রূপান্তরিত হলো। বারণ করা সত্ত্বেও মেয়েটা কেন এল? কেন আবারও অবাধ্য হলো?
জেইন নড়েচড়ে বসতেই ক্লারা তটস্থ হয়ে কোল থেকে নেমে দাঁড়াল। জেইন তার সমস্ত ক্ষোভ চেপে বরফ শীতল গলায় প্রশ্ন করল,
“তুমি এখানে?…..”

জেইনের শয়তানি হাসিতে রিমের ভেতরের আগ্নেয়গিরি যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠল। সে জেইনের শার্টের কলারটা আগের চেয়েও জোরে পেঁচিয়ে ধরল, যাতে জেইন তার একদম কাছে চলে আসতে বাধ্য হয়। রিমের ছোট ছোট নিঃশ্বাসগুলো জেইনের মুখে আছড়ে পড়ছে।
“তুমি সবসময় এমন ডেশিংম্যান সেজে থাকো কেন?”
রিমের কণ্ঠে এখন অদ্ভুত এক অধিকারবোধ মেশানো ধমক,
“শার্টের বোতামগুলো সবসময় ওপর পর্যন্ত লাগিয়ে রাখবে, একটাও বোতাম যেন খোলা না থাকে! আর এই চুল… এভাবে এলোমেলো করে রেখেছো কেন? জানো না, এভাবে তোমাকে আরও বেশি ‘হট’ লাগে!”
রিমের মুখে সোজাসুজি এমন কথা শুনে জেইন অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও চওড়া হলো।

“হওট!!! রিয়ালি?
তারপর রিমের মুখের একদম কাছে নিজের মুখ নিয়ে ফিসফিস করলো,
“বাই দ্য ওয়ে, আমার চুলের এই এলোমেলো স্টাইলটা কিন্তু আসার সময় তুমিই তোমার ওই ছোট্ট আঙুলগুলো দিয়ে করে দিয়েছিলে। মনে নেই?”
জেইন রিমের কোমরে হাত রেখে বাঁধনটা আরও একটু শক্ত করে দুষ্টুমিভরা গলায় ফিসফিস করল,
“বাপরে, কী রাগ! সামান্য কোলে বসে ছিল তাতেই এত জেলাসি! আর যদি কিসিং-টিসিং বা আরও কিছু……”
“খবরদার!!!!”

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই রিম সাপের মতো ফোঁস করে উঠল। তার দুচোখ দিয়ে যেন আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছুটছে। সে জেইনকে হ্যাঁচকা টানে নিজের ঠোঁটের একদম কাছাকাছি নিয়ে এল। তাদের নিঃশ্বাস এখন একে অপরের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। রিম দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলল,
“আর একবারও এই কুৎসিত কথা মনে আনবে না, মুখে আনা তো দূরের কথা! যদি অন্য কাউকে ছোঁয়ার চিন্তাও করো, তবে জানে মেরে দেব, ওই মেয়েটাকেও আর তোমাকেও! আমি আর যা-ই পারি, আমার জিনিস অন্তত কারো সাথে ভাগ করতে পারব না ‘আরাত্রিক জেইন চৌধুরী’!! তুমি শুধু আমার, তোমার নখ থেকে চুলের ডগা পর্যন্ত শুধু আমার রাজত্ব! সেখানে অন্য কারো ছায়াও যদি পড়ে, তবে আমি সেই ছায়াটাকেও পুড়িয়ে ছাই করে দেব!”

রিমের তপ্ত নিঃশ্বাস জেইনের ঠোঁটের ওপর আগুনের হলকার মতো আছড়ে পড়ছে। দুজনের মাঝখানের সামান্যতম দূরত্বটুকুও যেন এখন বিষের মতো মনে হচ্ছে। জেইনের ভেতরের সেই দহন, যা সে এতক্ষণ ধরে চেপে রেখেছিল, রিমের এই উগ্র অধিকারবোধ দেখে তা মুহূর্তেই আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হলো।
জেইন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার সহ্যশক্তির সীমা ছাড়িয়ে গেল। এক পৈশাচিক অথচ গভীর তৃষ্ণা নিয়ে সে আচমকা রিমের নরম ঠোঁটদুটো নিজের দখলে নিয়ে নিল। রিম স্তব্ধ হয়ে গেল; জেইনের এই আকস্মিক এবং আক্রমণাত্মক চুম্বনের তীব্রতা সে কল্পনাও করেনি। জেইনের ঠোঁটদুটো যেন কোনো ক্ষুধার্ত শিকারির মতো রিমের ঠোঁটকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে চাইছে। সে একবার রিমের নিচের ঠোঁটটা নিজের মুখে পুরে নিয়ে মরণ কামড় দিয়ে শুষে নিচ্ছে, তো পরক্ষণেই উপরের ঠোঁটটা পাগলের মতো শুষে নিচ্ছে।

রিমের শরীরটা নিস্তেজ হয়ে আসছে, ছিন্নভিন্ন যন্ত্রণা আর ঠোটের অমোঘ চাপে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। কিন্তু পরক্ষণেই জেইনের বেসামাল স্পর্শের এক অদ্ভুত নেশা তাকেও গ্রাস করল। সে তার দুহাত দিয়ে জেইনের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের সর্বস্ব দিয়ে জেইনের এই পাগলকরা নেশায় সাড়া দিতে শুরু করল। রিমও জেইনের পাতলা ফিনফিনে ঠোঁটদুটো নিজের কবজায় নিয়ে এক অদ্ভুত স্বাদে মজে উঠল।
জেইন চুম্বনরত অবস্থাতেই রিমকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। তার বেপরোয়া ভাব তখন তুঙ্গে। সে রিমকে নিয়ে গিয়ে সজোরে চেপে ধরল ঘরের বিশাল কাঠের বুক শেলফটার সাথে। রিমের দুই পা জেইনের কোমরে লতার মতো জড়িয়ে গেল। জেইনের চুম্বনের ধার যেন বেড়েই চলেছে—সে এমনভাবে রিমকে আস্বাদন করছে যেন আজই ওকে পুরোপুরি নিজের ভেতরে শুষে নেবে।
শেলফের শক্ত কাঠের সাথে পিঠ ঠেকে যেতেই রিম যন্ত্রণায় সামান্য কুঁকড়ে উঠল। ব্যথায় তার ঠোঁট দুটো অবলীলভাবে একটু ফাঁক হয়ে আসতেই জেইন রিমের নিচের ঠোঁটটা কামড়ে রাবারের মতো টেনে ধরল, যেন এখনই মাংস ছিঁড়ে নেবে।

“উমম্… আরাত্র! ব্যথা পাচ্ছি…”
রিমের অস্ফুট আর্তনাদ জেইনের মুখেই মিলিয়ে গেল।জেইনের স্পর্শে রিমের শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় যেন বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে। তার এক হাত রিমের বুকের ওপর দিয়ে অবাধ্যভাবে বিচরণ করছে, যেন এক অধিকারি তার নিজের সাম্রাজ্য মেপে নিচ্ছে। রিমের গলার ভেতর থেকে বারবার অবদমিত যন্ত্রণার আর আরামের সংমিশ্রণে এক অদ্ভুত গোঙানি বেরিয়ে আসছে। জেইনের ভেতরের সেই আদিম পুরুষটি এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ লাগামহীন।
সে রিমকে আরও উঁচুতে তুলে ধরল। জেইনের শরীরের প্রচণ্ড চাপে আর রিমের ভারে পেছনের সেই ভারি কাঠের বুকশেলফটা স্থির থাকতে পারল না;
‘ধরাম’!

এক বিকট শব্দে তা আছড়ে পড়ল মেঝেতে। কিন্তু সেই প্রলয়ঙ্করী শব্দও জেইনের উন্মাদনায় বাধা দিতে পারল না। সে যেন বাইরের পৃথিবীর সমস্ত শব্দ আর শাসনের ঊর্ধ্বে চলে গেছে।
জেইন রিমকে কোল থেকে না নামিয়েই কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে ওকে বসিয়ে দিল বিশাল কাঁচের টেবিলটার ওপর। রিমকে জায়গা করে দিতে সে এক ঝটকায় টেবিলের ওপর রাখা দামী কলমদানি, ল্যাপটপ, ডায়েরি আর গাদা গাদা ফাইল সব বিকট শব্দে ফেলে দিল মেঝেতে। ‘ঝনননংং! কাঁচ আর প্লাস্টিকের সংঘাতের সেই ‘ঝং’ শব্দে পুরো কক্ষটা কেঁপে উঠল। জানালার খোলা পাল্লা দিয়ে আসা দমকা হাওয়ায় অফিসের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রগুলো প্রজাপতির মতো ডানা মেলে পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ল, কিছু আবার জানালার বাইরে হারিয়ে গেল। কিন্তু জেইনের জগত তখন শুধুই রিমকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে।
অবশেষে জেইন রিমের ঠোঁট ছেড়ে দিল। দুজনের বুক কামারের হাপরের মতো দ্রুত ওঠানামা করছে। নিস্তব্ধ ঘরে তখন কেবল দুজনের ভারী আর অসম নিঃশ্বাসের শব্দ। রিমের ঠোঁট দুটো ফুলে টকটকে লাল হয়ে আছে, চোখের পাতা কাঁপছে এক অজানা আবেশে। জেইন নিজের ঠোঁটের ওপর লেগে থাকা রিমের স্বাদটুকু জিভ দিয়ে আলতো করে চেটে নিল—এক পরম তৃপ্তির স্বাদ।
সে রিমের চোখের গভীরে নিজের জ্বলন্ত দৃষ্টি গেঁথে দিল। লজ্জায় রিমের ফর্সা গাল দুটো এখন কাশ্মীরি আপেলের মতো রাঙা হয়ে উঠেছে। জেইন রিমের কানের লতিটা আলতো করে কামড়ে ধরে অত্যন্ত ভারী আর ফিসফিসে গলায় বলল,

“কী যেন বলছিলে? অন্য কোনো মেয়েকে আমার পাশে দেখলে তুমি তাকে জানে মেরে ফেলবে, সাথে আমাকেও হুহ্?… উপস্! এটাই তো চেয়েছিলাম এতোদিন। এটাই তো এই আরত্রিক জেইন চৌধুরীর বউয়ের যোগ্য জবাব! এই না হলে মাফিয়া বসের ওয়াইফ!
রিম লজ্জায় মাথা নিচু করতেই জেইন ওর নাকে নাক ঘষে ঠোঁট কামড়ে বললো,
“ডোন্ট ওয়ারি ওকে আজকেই ফায়ার করে দিব এখান থেকে। এরপর থেকে আর কোনো ফিমেইল এমপ্লয়ি থাকবে না এখানে।আর না তোমার হাসব্যান্ডের ওপর নজর দিতে পারবে। এবার শান্তি।”

রিম অস্ফুটে কিছু বলতে চাইলো কিন্তু তৎক্ষণাৎ জেইনের হাত ঠোঁটের স্পর্শ রিমের শরীরে আরো গভীর হয়ে উঠলো। প্রতিটি পরত যেন আগুনের স্রোত হয়ে রিমের শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। লজ্জার এক নিবিড় আস্তরণ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে; জেইনের ওই অতল তৃষ্ণার্ত চোখের দিকে তাকানোর সাধ্য রিমের নেই। সে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাইলেও জেইন তাকে একচুল ছাড় দিল না। সে রিমের দুপায়ের মাঝে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরের সমস্ত ভার রিমের ওপর সঁপে দিয়ে ওর ঘাড়ের কোমল খাঁজে মুখ ডুবিয়ে দিল। সেখানে তার ঠোঁট আর জিভের অবিরাম স্পর্শ রিমকে এক অলৌকিক যন্ত্রণার সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে—যেখানে ব্যথা আর আবেশের সীমারেখা মুছে গেছে।

রিম আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না।সে আবেশে জেইনকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সাথে পিষে ধরল। জেইনের বিশাল পেশিবহুল শরীরের ভারে কাঁচের টেবিলের ওপর রিমের শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে হেলে পড়ল। জেইন উন্মত্তের মতো রিমের কাঁধের কাপড় সরিয়ে সেখানে নিজের তপ্ত ঠোঁটের মোহর এঁকে দিল। রিমের কলারবোনের ওপর থাকা সেই কুচকুচে কালো তিলটা যেন জেইনকে বারবার প্রলুব্ধ করছিল। সে আর ধৈর্য রাখতে না পেরে সেখানে এক তীক্ষ্ণ কামড় বসিয়ে দিল। রিম যন্ত্রণায় শিউরে উঠে দাঁতে দাঁত চেপে ধরল, তার আঙুলগুলো অজান্তেই জেইনের চুল মুঠো করে ধরল। জেইন থামল না; কামড়ের সেই নোনতা ক্ষতস্থানে জিব ছুঁইয়ে পরম তৃষ্ণায় তা আস্বাদন করতে লাগল। কক্ষের বাতাস তখন তাদের উত্তপ্ত নিশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছে।

হঠাৎ জেইন রিমের থেকে সামান্য নিচে ঝুঁকে এল। অত্যন্ত ধীর অথচ নেশাতুর ভঙ্গিতে সে রিমের পায়ের জুতো জোড়া একটি একটি করে খুলে মেঝেতে ফেলে দিলো। এরপর সে রিমের ন*গ্ন পায়ের পাতায় আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে শব্দ করে চুমু খেয়ে নিল। সেই স্পর্শের তীব্রতা বিদ্যুতের মতো রিমের মেরুদণ্ড বেয়ে ওপরে উঠে এল; তার সর্বাঙ্গ থরথর করে কেঁপে উঠল। জেইন রিমের পায়ে নিজের আঙুল চালিয়ে চুম্বন দিতে দিতে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠে আসতে লাগল। সেই সাথে রিমের লম্বা গাউনের রেশমি কাপড়টাও একটু একটু করে ওপরের দিকে উঠে আসতে শুরু করল। রিমের হৃৎপিণ্ড তখন খাঁচায় বন্দি পাখির মতো ধড়ফড় করছে, চোখের পাতা মুদে এসেছে এক অবর্ণনীয় ঘোরে।
ঠিক সেই চরম মুহূর্তে, যখন সময় আর স্থান জ্ঞান লোপ পেয়েছে দুজনেরই, তখন পুরো নিস্তব্ধতা চিরে দিয়ে কর্কশ স্বরে বেজে উঠল ‘এমার্জেন্সি বেল’!

জেইন প্রথমে সেটাকে নস্যি মনে করে উড়িয়ে দিতে চাইল। তার সমস্ত স্নায়ু তখন রিমের শরীরের ঘ্রাণে মগ্ন। কিন্তু বেলের কর্কশ শব্দটা যখন বারবার তার মস্তিষ্কে হাতুড়ির মতো আঘাত করতে লাগল, তখন জেইনের ভেতরে এক আদিম হিংস্রতা চাড়া দিয়ে উঠল। তার চোখ-মুখ মুহূর্তেই আগ্নেয়গিরির তপ্ত লাভার মতো লাল হয়ে গেল। সে এক ঝটকায় রিমকে ছেড়ে দিয়ে কাঁচের টেবিলের ওপর নিজের মুষ্টিবদ্ধ হাত দিয়ে সজোরে এক আঘাত করল। টেবিলের ওপর মাকড়সার জালের মতো চির ধরে গেল। রিম ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল।
“আআআহহহ্ ফা*ক!!! ড্যামন!!! হু ইজ দ্যাট বাস্টার্ড টু ডিস্টার্ব মি…!!!!!”
জেইনের গলার স্বর বাঘের গর্জনের মতো শোনাল।
সে ক্ষিপ্র গতিতে রিমোট চেপে দরজার লক খুলে রিমোটটা মেঝেতে আছাড় মেরে চুরমার করে দিল। দরজার ওপাশে তখন দাঁড়িয়ে আছে ইয়াশ। ঘরের ভেতরের লন্ডভন্ড দশা দেখে ইয়াশের চোখ চড়কগাছ। মনে হচ্ছে ঘরে কোনো সাইক্লোন বয়ে গেছে।
জেইন হুঙ্কার দিয়ে উঠল,

“মিস ক্লারাআআআ!!!!!!! হোয়্যার দ্যা হেল আর ইউ স্টুপিড!!!”
ইয়াশ ভড়কে গিয়ে বলল,
“হেই হোয়াট হ্যাপেন্ড! চিল্লাচ্ছিস কেন?”
“আমি মিস ক্লারাকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলাম কেউ যেন আমাকে ডিস্টার্ব না করে! তবে তুই কোন সাহসে এখানে এসেছিস?”
জেইনের কণ্ঠ দিয়ে তখন যেন আগুন ঝরছে।ইয়াশ ঘরের অবস্থা দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তুই রুমের মধ্যে এমন তাণ্ডব শুরু করেছিস কেন? শব্দ পেয়েই তো ছুটে এলাম! আর… ওয়েট! তোর পেছনে ওটা কে?”
জেইন তখন এক পাহাড়ের মতো অটল হয়ে তার পেছনে রিমকে আড়াল করে রেখেছে। রিম তড়িঘড়ি করে নিজের এলোমেলো জামাকাপড় ঠিক করে জেইনের বিশাল পিঠের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। ইয়াশ সন্দেহের চোখে তাকালো,

“কাকে ঢুকিয়েছিস এখানে? তুই কি শেষমেশ পরকীয়ায় লিপ্ত হলি? লিটল সিস্টারকে ঠকাচ্ছিস না তো?”
জেইন বিরক্তির এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ইডিয়ট!!!!! তুই যাবি এখান থেকে? পুরো মুডটাই নষ্ট করে দিল! তোদের জ্বালায় একটু শান্তিতে নিজের বউয়ের সাথে রোমান্সও করতে পারব না? বুঝেছি, ওকে নিয়ে এখানে আর থাকা যাবে না, অন্য ব্যবস্থা করতে হবে।”
রিম অতি সাবধানে জেইনের বগলের নিচ দিয়ে নিজের মুখটা একটু বের করতেই, ইয়াশ বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল, “আরে লিটেল সিস্টার! তুমি এখানে? কখন,কিভাবে, কার সাথে এলে?”
রিম নিচু গলায় কোনোমতে বিড়বিড় করে বলল।
“এলেনা দি’র সাথে… ও-ওর জন্য খাবার নিয়ে…”
“আচ্ছা ওওও… বরের জন্য এত ভালোবাসা! কী খাচ্ছে… সেটা তো বেশ ভালো করেই বুঝতে পাচ্ছি!”
ইয়াশ বাঁকা হাসি দিল।রিমের গাল দুটো এখন টকটকে লাল জবা ফুলের মতো দেখাচ্ছে। সে লজ্জায় জেইনের শার্টের পেছনে মুখ লুকাল।

“ইডিয়ট, তুই যাবি এখান থেকে!!! আমার বউ লজ্জা পাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছিস না!!!”
জেইনের তীক্ষ্ণ গর্জন শুনে ইয়াশ দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বলল,
“ওকে ওকে কাম ডাউন! যাচ্ছি আমি। কিন্তু একটু সাবধানে ভাই… তোর চাপে তো মেয়েটা একদম চ্যাপ্টা হয়ে যাবে!”
জেইন চোখের মনিতে আগুনের শিখা জ্বালিয়ে তাকাতেই ইয়াশ ঠোঁটে আঙুল দিয়ে সুড়সুড় করে প্রস্থান করল।

ইয়াশ কক্ষ থেকে বেরিয়ে লম্বা করিডোর দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে আসছিল, ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ালো এলেনা। ইয়াশ ওকে দেখা মাত্রই নিজের চোখের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইল, যেন এলেনা ওর কাছে এক অদৃশ্য সত্তা।
এলেনার বুকটা কেন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। যে ছেলেটা সবসময় তার কাছে থাকার জন্য ঘুরঘুর করতো, তার এমন অবহেলা সে সহ্য করতে পারছে না। সে এক পা এগিয়ে এসে ইয়াশের পথ আটকে দাঁড়ালো। করিডোরের নিস্তব্ধতায় এলেনার কণ্ঠস্বর তীক্ষ্ণ শোনাল
“আমাকে ইগনোর করছো?”
ইয়াশ থামল, তবে ওর চোখেমুখে এক অদ্ভুত শীতলতা। সে পকেটে হাত গুঁজে এলেনার চোখের দিকে না তাকিয়েই তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।

“এতে তো তোমার খুশি হওয়ার কথা এলেনা! তুমি তো এটাই চাইতে এতদিন—যেন আমি তোমার ছায়া থেকেও দূরে থাকি। আজ যখন তোমার ইচ্ছেই পূরণ করছি, তখন আপত্তি কেন?”
“স্টপ ইট ইয়াশ! আই নো ইউ আর টিজিং মি।” এলেনার দুচোখে জেদ আর যন্ত্রণার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
“ইয়েস আই অ্যাম,”
ইয়াশ এবার সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকালো, সেই চাউনিতে এক ধরনের অবজ্ঞা।
“বাই দ্য ওয়ে, তোমার যেন কী একটা প্রমাণ করার কথা ছিল? কই? নেই তো! জানতাম থাকবেও না। মিথ্যে দিয়ে সাজানো দুর্গ বেশিদিন টেকে না এলেনা। হাহ্!”
ইয়াশের এই তাচ্ছিল্য এলেনার ভেতরটা জ্বালিয়ে দিল।ও তো কখনো এলেনা বলে ডাকে নি। সবসময় এলি বলেই ডাকতো। এতদিন এই ভয়টাই পেয়েছিল এলেনা। এইজন্যই সে সত্যিটা বলতে চায়নি ইয়াশকে। কারণ সে ইয়াশের অবজ্ঞা সইতে পারবে না। তাই ওকে সবসময় নিজের থেকে দূরে সরিয়ে রাখত। সে এক মুহূর্ত স্থির থেকে নিজের হাতের মুঠো থেকে একটা ছোট মেমোরি চিপ বের করল। ইয়াশের সামনে হাত বাড়িয়ে ওটা ধরিয়ে দিয়ে ধীরে গম্ভীর গলায় বলল,

“খুব শীঘ্রই সব প্রমাণ করে দেব। তবে তার আগে… একবার এই ভিডিওটা নিজ চোখে দেখে নিও।”
ইয়াশ অবাক হয়ে চিপটার দিকে তাকাতেই এলেনা ওর আরও কাছে সরে এল। ওর কণ্ঠস্বর এখন ফিসফিসে, যা বাতাসের চেয়েও ভারী।
“এটা দেখার পর তোমার এতদিনের গড়ে তোলা ধারণাগুলো যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে না পড়ে ইয়াশ! আর মনে রেখো, এটা শুধুমাত্র একটা ছোট্ট ডেমো। আসল সত্যটা এখনো দেখা বাকি। সেই সত্য সহ্য করার ক্ষমতা তোমার আছে তো?”
এলেনা আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না। খটখট শব্দে হিল জুতো বাজিয়ে সে করিডোর দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। ইয়াশ চিপটা হাতের তালুতে নিয়ে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। করিডোরের আবছা আলোয় চিপটার মেটালিক অংশটুকু চিকচিক করছে।
নিজের অজান্তেই ইয়াশের কপালে ভাঁজ পড়ল। সে বিড়বিড় করে নিজেকেই প্রশ্ন করল,
“কী এমন আছে এই চিপে?……….”

ইতালি রোমের অভিজাত হাসপাতালের করিডোরে তখন এক থমথমে নিস্তব্ধতা।চারপাশে ফিনাইল আর অ্যান্টিসেপটিকের এক কড়া গন্ধ।
জেইন দ্রুত হাতে ইতালীয় ভাষায় লেখা কিছু ফর্মে সই করে সমস্ত ফরমালিটিজ পূরণ করে নিচ্ছিল। রিম পাশেই ওয়েটিং লটের নীলচে রঙের প্লাস্টিক চেয়ারটায় বসে ছিল। তারা অফিস থেকে বের হয়েই সরাসরি এখানে এসেছে। মাত্তেওকে আজ ডিসচার্জ করে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হবে, রিম মনে মনে ভীষণ খুশি কিন্তু তার শরীরটা আজ যেন সায় দিচ্ছে না।
হঠাৎ করেই রিমের চারপাশের জগতটা যেন উল্টেপাল্টে যেতে লাগল। হাসপাতালের ওই তীব্র ফিনাইলের ঘ্রাণ আর যান্ত্রিক পরিবেশটা তার কাছে অসহ্য হয়ে উঠল। চোখের সামনে দেয়ালে টাঙানো ঘড়িটা ঝাপসা হয়ে দুলে উঠছে। পেটের ভেতর থেকে একটা বমি বমি ভাব দলা পাকিয়ে গলার কাছে উঠে আসছে। রিম বাঁচার তাগিদে তার প্লাস্টিকের আসনটা নখ দিয়ে শক্ত করে খামচে ধরল। তার ফর্সা কপাল বেয়ে একবিন্দু তপ্ত ঘাম গড়িয়ে পড়ল মেঝের ওপর।

“Hey miss! Oh my God! Somebody help!”
পাশে থাকা একজন নার্স চিৎকার করে উঠল।
রিম আর নিজেকে সামলাতে পারল না। মুহূর্তের মধ্যে তার শরীরটা অবশ হয়ে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ল। নার্সের আর্তনাদে মুহূর্তেই ভিড় জমে গেল সেখানে।
চিৎকার শুনে জেইন কলমটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে পাগলের মতো ছুটে এল। মেঝের ওপর নিথর হয়ে পড়ে থাকা রিমকে দেখে জেইনের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। এক নিমেষে বুকটা এমনভাবে মুচড়ে উঠল, মনে হলো কেউ জীবন্ত হৃদপিণ্ডটা ছিঁড়ে বের করে নিচ্ছে। সে বিদ্যুৎবেগে রিমকে পাঁজাকোলে তুলে নিল। জেইনের পেশিবহুল হাত দুটো তখন কাঁপছে।
“Doctor!!!!! Doctor!!!! Where the he*ll are you…!!!!! Get a doctor right now! I said NOW!”

জেইনের গর্জনে হাসপাতালের শান্ত করিডোর কেঁপে উঠল।কাঁচের দেয়ালগুলো যেন থরথর করে কাঁপতে লাগল।স্ট্রেচার আসার অপেক্ষা না করেই সে রিমকে নিয়ে কেবিনের দিকে দৌড় দিল। পুরো হাসপাতাল তখন জেইনের অস্থিরতায় স্তব্ধ। ডাক্তার কেবিনে প্রবেশ করতে নিলে জেইন অস্থির হয়ে বলে উঠলো,
“My wife! What’s wrong with her? Answer me!”
স্পেশালিস্ট ডাক্তার অত্যন্ত শান্তভাবে বিনয়ের সাথে বললেন,
“There is no reason to worry, Mr. Chaudhary. Nothing much has happened to your wife. It seems that she has become dizzy due to physical weakness. We need to do a small test on her. You should rest assured.”
‘Assured!’ এই সান্ত্বনাটুকু জেইনের কানে বিষের মতো লাগল। তার হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেল। সে এক লাফে গিয়ে ডাক্তারের কলারটা মুঠোয় ভরে ধরল। জেইনের চোখের মনিতে তখন শয়তানি আগুন জ্বলছে। দাঁতে দাঁত চিপে সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,

“জানোয়ারের বাচ্চা! এদিকে আমার ফায়ারফ্লাই অজ্ঞান হয়ে আছে, আর তুই বলছিস চিন্তার কিছু নেই? ইউ ফা”কিং বাস্টার্ড! তোর ডাক্তারি আজ সারাজীবনের জন্য ঘুচিয়ে দেব আমি!”
জেইনের আঙুলের চাপে ডাক্তারের কণ্ঠনালী প্রায় পিষ্ট হওয়ার উপক্রম। তার চোখ উল্টে যাচ্ছে। জেইন যেন আজ আস্ত এক পৈশাচিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ইয়াশ এসে জেইনকে সজোরে টেনে ধরল।
“কী করছিস তুই! ছেড়ে দে ওকে, মেরে ফেলবি নাকি?”
জেইন হিংস্র শক্তির এক দানব হয়ে ইয়াশকে ধাক্কা দিয়ে তেড়ে এসে ডাক্তারকে আবার আক্রমণ করতে চাইল।
“Yes, I’ll kill him! How dare he say it’s nothing. ওকে বল আমার ফায়ারফ্লাইকে এক্ষুনি সুস্থ করে দিতে, নয়তো এই হসপিটাল আমি শ্মশান বানিয়ে দেব!”
ইয়াশ চোখের ইশারায় ডাক্তারকে চলে যেতে বলল। ডাক্তার যেন যমের দুয়ার থেকে প্রাণ হাতে নিয়ে পালালেন।

করিডোরে জেইন অস্থিরভাবে পায়চারি করছে। তার কালো শার্টটা ঘামে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। কপালের নীল রগগুলো ফুলে উঠে লাপঝাঁপ করছে। সে হঠাৎ আরো বেশি অস্থির হয়ে উঠলো। নিঃশ্বাস উপচে পড়ছে। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত গতিতে। সে পাগলের মতো পায়চারি করতে করতে মাথার চুলগুলো টেনে ধরলো। তারপর হঠাৎ ইয়াশের কলার টেনে হাঁপাতে হাঁপাতে শ্বাসরুদ্ধ কন্ঠে বললো,
“ওরা ভেতরে এতক্ষণ কী করছে বলতো? আমার ফায়ারফ্লাইয়ের কিছু হবে না তো? আমাকে ভেতরে যেতে দিচ্ছে না কেন! আমি ভেতরে যাবো। ওই কসাইগুলো হয়তো আমার ফায়ারফ্লাইয়কে কষ্ট দিচ্ছে। আমি দেখব ওরা কী করছে ভেতরে!”
জেইন যখন অস্থির হয়ে দরজায় লাথি মারতে উদ্যত হলো, তখনই ডাক্তার বেরিয়ে এলেন।জেইনের হিংস্র চেহারা দেখে ডাক্তার কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন। ইয়াশ সামনে এসে ডাক্তারকে অভয় দিল। ডাক্তার শুকনো ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন,

“The patient is stable now. She has regained consciousness. It will take 24 hours for the final reports, but looking at her symptoms… we suspect there might be some ‘Good News’ on the way.”
“24 hours means? I want, the report, right now!!! Do you hear me???”
জেইনের গর্জনে করিডোরের নার্সরা ভয়ে সিঁটিয়ে গেল।ডাক্তার জেইনের চোখের দিকে তাকানোর সাহস পেলেন না। নিচু স্বরে বললেন,
“The patient wants to see her husband. You can go in now.”
‘Husband’ শব্দটা শুনতেই জেইনের ভেতরের সেই পৈশাচিক দানবটা এক লহমায় শান্ত হয়ে নতুন অস্থিরতা চেপে ধরল। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে কেবিনের ভেতর ঢুকে পড়ল।
বেডের ওপর বালিশে পিঠ ঠেকে আধশোয়া হয়ে বসে ছিল রিম। জানালার পর্দা সরিয়ে আসা মৃদু আলো ওর ফ্যাকাশে মুখে এসে পড়েছে। জেইন তার মুখটা দেখা মাত্রই দরজায় থমকে দাঁড়ালো। এক দীর্ঘ শ্বাস টেনে সে নিজের ফুসফুসটা হালকা করল।

“ফায়ারফ্লাই…”
জেইনের কন্ঠস্বরে মৃদু কম্পন। সে ধীর পায়ে রিমের দিকে এগিয়ে গেল।রিম ওকে দেখে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুর্বল কিন্তু স্বর্গীয় হাসি ফুটিয়ে তুলল। জেইন রিমের ছোট্ট হাতটা নিজের বিশাল হাতের মুঠোয় নিয়ে গালের সাথে ঘষতে লাগল।
“তুমি ঠিক আছো তো সোনা? খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার?”
“আমার কিচ্ছু হয়নি তো। শুধু মাথাটা একটু ঘুরছিল। তুমি শুধু শুধু চিন্তা করছো।”
“তোমার শরীর এতো দূর্বল হয়ে গেছে, আমাকে আগে বলোনি কেন?”
“বলছি তো আমার কিছু হয়নি।”

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫৪

“সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি! একবার বাড়ি চলো শুধু… বিছানা থেকে যদি এক পা নিচে ফেলেছ, তবে খবর আছে তোমার! মজা বুঝিয়ে ছাড়ব তখন!”
“না তুমি এটা করতে পারো না!”
জেইন রিমের কপালে নিজের ঠোঁটটা গভীরভাবে চেপে ধরল,
“তোমার জন্য আমি সব পারি……..”

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫৬