প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৯
সাদিয়া সাদু
ফজরের আজান ভেসে এলো হাওরের নীরব বুক চিরে।ভোরের আকাশ তখনও পুরোপুরি আলোয় ভরেনি। পূর্ব দিগন্তে হালকা নীলের ওপর ধীরে ধীরে ফিকে কমলা রঙ ছড়িয়ে পড়ছে। রাতের শেষ অন্ধকারটুকু যেন গুটিয়ে নিচ্ছে প্রকৃতি। দূরের কোনো মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের সুমধুর ধ্বনি চারপাশের নিস্তব্ধতাকে আরও গভীর করে তুলল।
হাওরের ওপর তখন পাতলা কুয়াশার আস্তরণ। পানির বিশাল বিস্তারটাকে মনে হচ্ছে সাদা ধোঁয়ার চাদরে ঢেকে রাখা হয়েছে। দূরের গাছপালা, ছোট ছোট বাড়িঘর আর নৌকাগুলো কুয়াশার ভেতর আবছা হয়ে আছে।
রাতের ঠান্ডা বাতাসে ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির চিকচিক করছে।
এই শান্ত সকালেই বিভোর ঘুমিয়ে আছে জারুল, দিগন্ত আর দিয়া। দিগন্তের বা হাতের উপর রয়েছে জারুল এর মাথা আর চোখেমুখে লেপ্টে আছে রাশভারী ঘন কালো চুল , বুকের উপর দিয়া ,
সারাদিনের দুশ্চিন্তা, রাতের দীর্ঘ পথ আর ক্লান্তির পর তিনজনের ঘুম যেন অনেকটা গভীর হয়ে এসেছিল। দিগন্তের ঘুমন্ত অবস্থাতেও তার মুখে গত কয়েকদিনের ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। ফজরের আজানের শব্দে ধীরে ধীরে তার ঘুম ভাঙল।
কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করেই শুয়ে রইল সে।
তারপর বুকের উপর ভারী কিছু আর বা হাত অবশ মনে হতেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল পাশ ফিরে তাকাতেই চোখে পড়ল জারুল আর দিয়াকে।দৃশ্যটা দেখে তার মুখে অজান্তেই প্রশান্তির ছাপ ফুটে উঠল।
এত ঝামেলা, এত অস্থিরতার পর অন্তত এই মুহূর্তটুকু শান্ত। দিগন্ত দৃঢ়ে মেয়েটাকে পাশে শুয়ে দিলো তার নড়েচড়ে জারুল চোখ পিটপিট করে তাকাল । তার বর্তমান অবস্থা বুঝতে পেরে পাশ ফিরতে চাইলে , তার আগেই দিগন্ত বলিষ্ঠ হাতের শক্ত বাঁধনে আর দূরে যাওয়ার সাধ্যি হলো না । দিগন্তের উষ্ণ আলিঙ্গনে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে ।
সকাল ৭ টা ফজরের নামাজ আদায় করে ফিরে এসে আবার একবার ঘরের দিকে তাকাল। জারুল তখনও ঘুমিয়ে। দিয়াও মায়ের বুকের কাছে মুখ লুকিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। সকাল একটু গড়াতেই জারুলের ঘুম ভাঙল। চোখ মেলে প্রথমেই দিগন্তকে দেখতে পেল। ঘুমঘুম কণ্ঠেই আওড়াল
— “তুমি কখন উঠেছ?
দিগন্ত মৃদু হেসে বলল,
— *অনেকক্ষণ হলো।”
জারুল চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসল। বাইরে থেকে আসা সকালের আলোয় তার চেহারায় ঘুমের কোমল ছাপ তখনও রয়ে গেছে। দিয়া তখনও ঘুমিয়ে। জারুল ধীরে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
— “ঘুমোক। ”
দিগন্ত মাথা নাড়ল।
তারপর দুজনেই নিজেদের মতো ফ্রেশ হয়ে নিল। জারুল চুলগুলো হাত খোঁপা নিল, দিগন্তও রাতের শরীরটা আবার বিছানায় এলিয়ে দিল , চোখ দুইটা বন্ধ করে শুয়ে আছে । তার পাশেই দিয়া উল্টো হয়ে ঘুমিয়ে আছে , চার হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিছানায় । দিগন্ত মেয়েটাকে দেখে হাসল একটু , একদম তার কার্বন কপি বলা যায় , এইভাবে দিগন্তও ঘুমাই একদম তার মতো হয়েছে মেয়েটার ঘুম , চোখের চাহনি , হা টা চলা সব দিগন্ত একটু জায়গা ফাঁকা পেয়ে শুয়ে পড়ল ।
কিছুক্ষণ পর দিয়ারও ঘুম ভাঙল। চোখ দুইটা কচলে কচলে তাকাল , আশপাশে মাকে খুঁজতে ব্যস্ত অথচ পাশেই দিগন্ত শুয়ে আছে , সে মাকে খুঁজে না পেয়ে ঘুমজড়া কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল ।
_’ আম্মু কোই ? আম্মু যাব । ‘
দিগন্ত চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল মেয়ের চিৎকারে অমনি চোখ দুইটা খোলে উঠে বসল । খোলে নিতে নিতে মেয়েকে শান্ত করল সে ।
জারুল নাজমা বেগমের সাথে হাতে হাতে কাজ করছে । সম্পর্কে দিগন্তের বড় মামী , বর্তমানে গ্ৰামে তিনি একাই থাকেন । ছেলে মেয়ে সবাই শহরে পড়াশোনা করে । দিগন্ত মামা গত হয়েছে বছর দুয়েক আগে , তার বাকি মামাগুলোও এখন আর গ্ৰামে থাকে না , সবাই শহরের দিকে বাসা করেছে । বর্তমানে এত বড় বাড়িতে নাজমা একাই ।
দুইজন হাতে হাতে রুটি বানাচ্ছে আর হাঁসের ডিম ভাজা । জারুল কাজ শেষ করে নাস্তা নিয়ে রুমের দিকে পা বাড়াল ,
_’ মা বাহিরে যাব । ‘
ঘরে প্রবেশের সাথে সাথেই মেয়ের ঘুম জড়ানো কণ্ঠে দাঁড়িয়ে পড়ল জারুল ।
জারুল হেসে বলল,
— *যাব। আগে নাস্তা কর।”
সকালের নাস্তায় খুব সাধারণ আয়োজন।
নাস্তা শেষ করে দিয়া আর অপেক্ষা করল না।
— “বাবা, হাওরে যাব!”
দিগন্ত হেসে মেয়ের দিকে তাকাল।
— ‘এত তাড়া কিসের?’
— “আমি নৌকায় উঠব!”
জারুল মেয়ের উৎসাহ দেখে হেসে ফেলল।
গতকাল হাওরে এতো নৌকা আর ট্রলার দেখে দিয়া খুবই উৎফুল্ল সে কখন উঠবে এই অচেনা গাড়িতে ।
— “যাও, তোমার বাবাকে বলো নৌকা ঠিক করতে।”
দিয়া দৌড়ে দিগন্তের কাছে গেল।
দিগন্ত মেয়েকে কোলে তুলে নিল।
তারপর জারুলের দিকে তাকিয়ে বলল,
— *তাহলে চল?’
জারুল বাইরে তাকাল।
সকালের রোদ তখন নরম হয়ে হাওরের পানির ওপর পড়ছে। বাতাসে এক ধরনের সতেজতা। দূরে নৌকা ভাসছে, পানির ওপর সূর্যের আলো চিকচিক করছে।
জারুলের বুকটা হঠাৎ হালকা লাগল।
কতদিন পর এমন একটা সকাল!
কোনো আতঙ্ক নেই, কোনো তর্ক নেই, চারপাশে নেই খান বাড়ির ভারী পরিবেশ।
আছে শুধু হাওরের মুক্ত বাতাস, পাশে দিগন্ত আর কোলে তাদের ছোট্ট দিয়া।
তিনজন ধীরে ধীরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাওরের দিকে এগিয়ে গেল।
সামনে বিস্তীর্ণ জলরাশি।
আর নতুন দিনের আলোয় যেন তাদের জন্যও খুলে গেল একটুকরো শান্ত সকাল।
তিনজন ছসাতে ছোট একটা নৌকা নিল , দিগন্ত নৌকার পাশে বসে হাতে বৈঠা নিয়ে
আপনি মনে নৌকা চালাতে শুরু করল ।
দিগন্ত এইখানেই নৌকা চালানো শিখেছে ।
জারুল এর জন্যই শিখেছে সে ।
দিয়া নৌকার মাঝখান বসে আছে তাকে জড়িয়ে ধরে জারুল । তিনজন একসাথে হাওরের পানির উপর নৌকা দিয়ে ঘুরাফেরা করছে। সময়টা যদি আটকে যেত খুব খারাপ হত কি ?
খান মহল
খান বাড়িটা যেনো একটা শ্মশানে পরিণত হয়েছে । যদিও খান বাড়িতে মানুষের সংখ্যা বরাবরই কম , তাও এতো দিন পর দিগন্তের আগমনের বাড়িটাতে একটু খুশির ঝিলিক দেখা দিয়েছিল কাল থেকে আবারো আগের ন্যায় শুনশান নীরবতা, দীনা চুপচাপ নিজের কাজ নিজে করেই ঘরে খিল দেন । তার মতে ভয়ংকর মানুষের সাথে বাড়িতে বসবাস করছে , তাদের থেকে যতোটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে । সহজ সরল মানুষের মনের ভেতর একবার সন্দেহর ভিজ রোপণ করলে তা দিনদিন বৃদ্ধি পায় । আর তার এই রোপন গেঁথে দিয়েছেদিগন্ত ।
দীনা রান্নার কাজ শেষ করে নিজের খাবার নিয়ে উপরে চলে গেছে , অমনি উপর থেকে জহুরা ,জিসা আর নাসিমা তিনজন একসাথে পা মিলিয়ে নেমে আসল ।
হলরুমের সোফায় গিয়ে বসল তিনজন ।
_’ মা , আমরা কি তাহলে এই সকল কিছু হাত ছাড়া করব ? তুমি তো কিছু্ই আমার নামে লিখিয়ে নিতে পারলে না । ‘
নাসিমা কিছুটা ছলছল চোখে তাকিয়ে বলল । জিসা ও মায়ের মতোই নানির মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে । জহুরা দুইজনে দিকে এক পলক তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে বলল ।
_’ কিভাবে নিতাম , ওই বুড়োকে বিয়ে করেছিলাম সম্পত্তির জন্য , মরার আগেও তো সব তার নাতনির নামে লিখে দিয়ে গেল । ছেলের নামের লিখে দিলেও নিতে পারতাম বোকাসোকা একটা , কিন্তু ছেলেটা একটা হারামি । এর থেকে সকল কিছু লিখে নেওয়া জাস্ট ইম্পসিবল। ‘
_” তাহলে আমাদের সারাজীবন ওর দাস হয়ে কাটাতে হবে নানুমনি? ‘
_’ আমি থাকতে তা হতে নিবো না । দিগন্তকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করতে হবে , কঠিন হয়ে কিছু করা যাবে না । যা করার বাগে এনে করতে হবে । জিসাকে বিয়ে না করলেও অন্য উপায় খুঁজে বের করতে হবে , কিন্তু তার জন্য বাড়িতে আনতে হবে তাকে । ‘
জিসা আর নাসিমা মনযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনল । আর পায়ের উপর পা তুলে আলম করে চা খেতে শুরু করল ।
তারা বাসায় পৌছাতে পৌছাত বিকেল গড়িয়েছে ,
সন্ধ্যার পর হাওরের বাতাস আরও ঠান্ডা হয়ে উঠেছে। জানালার বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছে, দূরের নৌকার আলো পানির ওপর কাঁপছে। ঘরের ভেতর দিয়া গভীর ঘুমে। সারাদিন ঘোরাঘুরির ক্লান্তিতে তার ছোট্ট মুখটা একেবারে শান্ত। বিছানায় বিভোর ঘুমি আছে দিয়া ।
জারুল জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। চুলগুলো বাতাসে বারবার মুখের ওপর এসে পড়ছে। সে হাত দিয়ে চুল সরিয়ে আবার হাওরের দিকে তাকাল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে দিগন্ত এসে দাঁড়াল।কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে দুই হাত দিয়ে জারুলকে জড়িয়ে ধরল। শক্ত হাতে কোমড় জড়িয়ে ধরল । খোলা চুল গুলোয় থুতনি রেখে সেও জারুল এর দৃষ্টি অনুসরণ করে বাহিরে তাকায় ।
জারুল চমকে উঠে নিচু গলায় বলল,
— “এই! কী করছ?”
দিগন্ত তার কানের কাছে মুখ এনে মৃদু হেসে বলল,
— “বউকে জড়িয়ে ধরছি।”
জারুল মাথা নামিয়ে লাজুক হাসল । মিনমিনে বলল
— “নির্লজ্জ, তোমার লজ্জা বলে কিছু নেই?”
— ‘তার জলজ্যান্ত উদাহরণ বিছানায় ’
জারুল আগের ন্যায় মাথা নামিয়ে হাতের বাঁধন গুলার চেষ্টা করে আমতা আমতা করে বলল ।
— “মামি দেখে ফেললে?”
— “দরজা বন্ধ। আর দিয়া ঘুমাচ্ছে। এখন আমাদের দেখার মতো কেউ নেই।”
জারুল একটু ঘুরে তার দিকে তাকাল।
— ‘খুব চালাক হয়ে গেছ দেখছি।’
দিগন্ত তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তোমার কাছ থেকে শিখেছি।’
— ‘আমি আবার কী শিখিয়েছি?’
— ‘কীভাবে একজন মানুষকে সারাদিন মনে পড়তে হয়।’
জারুল লাজুক হাসল ,দিগন্তে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল।
জারুল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,
—’ দিগন্ত…’
— ‘হুম?’
_’ ভালো লাগছে আমার,চলো না সব ফেলে এইখানে একেবারেই জন্য থেকে যায় । শান্তিতে বাঁচি আমরা । ‘
দিগন্ত হেসে তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
_’ তাদের শাস্তি দিবে হবে বউ , আমার মেয়ে স্ত্রীর দিকে তাকানোর শাস্তি তারা কড়ায়গণ্ডায় পাবে । ছয়টা বছর, এই ছয়টা বছরের কত কিছু হতে পারত দিয়ার আরো এক দুইটা ভাই বোন হতো , ওদের জন্য আমার বাচ্চারা পড়াশোনা থেকে কতটা পিছিয়ে যাচ্ছে । ‘
জারুল প্রথম মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনলেও পরমুহূর্তেই কিড়মিড় করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে মুখ দিয়ে
_’ নির্লজ্জ, নির্লজ্জ উচ্চারণ করে , অমনি দিগন্তের ফোন বেজে উঠল । পকেট থেকে ফোন বের করে জহুরার নাম্বরটা দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকায় , জারুল ও দেখে দিগন্তের মুখের দিকে তাকিয়ে রয় ।
দিগন্ত লাউড স্পিকারে ফোন ধরে ।
কিছুক্ষণ নীরবতা ।
_’ হ্যালো দিগন্ত। ‘
_” হু। ‘
আবারো অপর পাশ থেকে নীরবতা জারুল চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে । জহুরা গলার স্বর নরম করে বলে
_’বয়স হয়েছে আমার । কি থেকে কি বলে ফেলি তার কোনো ঠিক নেই , তোমার সাথে করা আচারণের জন্য দাদুকে ক্ষমা করে দাও , দাদুভাই । তোমাকে ছাড়া বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে । চলে আসো দাদুভাই । ‘
দিগন্ত একটু বাঁকা হাসি দিয়ে বলল
_’ কাল আসব। ”
_’সত্যিই’
দিগন্ত আর কথা বলেনি ফোন কেটে রেখে দেয় । জারুদ দিগন্তের হাবভাব বুঝার চেষ্টা করছে । ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলে।
প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৮
_’ তুমি যাবে ?’
_” হে খেলা হবে সামনাসামনি।
দুইজনেই চুপ , বাইরে হাওরের বাতাস বইছে, পানির ঢেউ তীরে এসে মৃদু শব্দে ভেঙে পড়ছে।
আর ঘরের ভেতর দিয়া নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে।তার পাশেই দুজন মানুষ নিঃশব্দে নিজেদের ভালোবাসার মুহূর্তটুকু উপভোগ করছে—কোনো বড় প্রতিশ্রুতি নয়, কোনো ভারী কথা নয় শুধু একে অপরকে কাছে পাওয়ার উষ্ণতা আর দীর্ঘদিনের জমে থাকা প্রেম।
