প্রিয় জারুলফুল পর্ব ২
সাদিয়া সাদু
_’ তোমাকে আর এই বাড়িতে কাজ করতে হবে না । এই মাস আর সামনের মাসের বেতন নিয়ে নিয়ো কাল । আজকেই শেষ ।কাল থেকে আসার প্রয়োজন নেই । ‘
জহুরার কথায় জারুলের হাত থেকে কাঁচের গ্লাসটা ঝনঝন শব্দে পড়ে ভেঙ্গে গেলো । মলিন মুখটাই কান্নার চাপ পড়লো।
_’ দয়া করে আমাকে কাজ থেকে বের করে দিবেন না । আপনাদের কাজের টাকা দিয়েই আমার মেয়ের চিকিৎসার খরচ চালাতে হচ্ছে । দাদি আমি আপনার পায়ে ধরি আমাকে বের করে দিবেন না । ‘
জারুল জহুরার পায়ে ধরতে গেলেই । জহুরা দুই পা পিছিয়ে যায় । দাঁতে দাঁত চেপে ধরে । চিবিয়ে বলে ।
_’ অলক্ষ্মী একটা । আমার নাতি ফিরেছে এরকম চেংরা মেয়ে আমার বাড়ির কাজের লোক হিসেবে রাখব না আমি । আজকাল কার দিনে যা হচ্ছে বলা তো যায় না । তোর শকুনের চোখ আবার আমার নাতির উপরে গিয়ে পড়ে । ‘
জহুরা আর দাঁড়ায় না । লাঠির ঠুক টুক শব্দে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে ।
পিছনে জারুল হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছে বিরবিরিয়ে বলে । ‘দাদী তোমার নাতির হৃদয় থেকে বহু দূরে আছি আমি । এক পাহাড়সম রাগ , অভিমান আমার উপর যা কখনো ডোবার পানি ডাঙ্গাতে পারবে না । ‘
তার কথা শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে দীনা প্রবেশ করে রান্নাঘরে । নিম্ন স্বরে বলে ।
_’ থালা ভাটি মাজা শেষ হলে হল রুমের ফ্লোরটা একটু মুছে দিছ তো । সন্ধ্যায় কিছু মেহমান আসবে । তোর আজ বাড়িতে যেতে রাত হবে । ‘
জারুল মাথা কাত করে সম্মতি প্রদান করে । দীনাও আর কথা বাড়ায় না রান্নার কাজ চালিয়ে যায় ।
দুপুরের রোদটা হলরুমের কাঁচের জানালা ভেদ করে মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে।
নিস্তব্ধ বাড়ি। শুধু শোনা যাচ্ছে ন্যাকড়ার ঘষা-ঘষি শব্দ।
জারুল হাঁটু গেড়ে বসে হলরুমের শ্বেতপাথরের মেঝে মুছছে। পরনে সাদা-মাটা একটা সুতি থ্রি পিছ। মাথার চুল খোঁপা করা। ছয় বছরের কঠোর জীবন তার প্রতিটি ভাঁজে। হাতের তালু রুক্ষ, পিঠটা ক্লান্তিতে বাঁকা। কিন্তু মেরুদণ্ডটা সোজা।
উপরতলা থেকে পায়ের আওয়াজ। ধীর, ভারী, দ্বিধাগ্রস্ত।
দিগন্ত সিঁড়ি বেয়ে নামছে। একটা একটা ধাপ। ছয় বছর পর সে নিজের বাড়িতে বন্দী। মায়ের জোরে।
সিঁড়ির মাঝামাঝি এসে তার চোখ আটকে গেলো নিচে।
হলরুমের মাঝখানে, মাথা নিচু করে বসে থাকা সেই নারী। যাকে সে একদিন ভালোবেসে বহু উপরে স্থান দিয়েছিল। আজ সে তার পায়ের নিচে
দিগন্তের মুখে খেলে গেলো এইটা বাঁকা হাসি ।
সে আর নামলো না। শেষ তিনটা সিঁড়িতেই থেমে গেলো। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। প্যান্টের পকেটে দুই হাত গুজে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে এল
জারুলের একদম মুখের সামনে এসে দাঁড়ালো।
তার ছায়াটা জারুলের উপর পড়তেই জারুলের হাতটা থেমে গেলো এক মুহূর্তের জন্য। তারপর আবার মেঝে মোছা শুরু করলো। যেন সামনে কেউ নেই। যেন সে শুধু বাতাস।
দিগন্ত কথা বললো না।
সে শুধু তাকিয়ে রইলো। খুঁটিয়ে। পরখ করলো।
ছয় বছর আগের জারুল* অভিমানী, কোমল, ভয়ে জড়সড়। চোখে জল টলটল করতো। ঠোঁট কাঁপতো।
আজকের জারুল* মুখটা শীর্ণ, গাল বসে গেছে। চোখের নিচে গাঢ় কালি। রোদে-পোড়া চামড়া। কিন্তু ওই চোখ দুটো… ওই চোখে আর ভয় নেই। নেই কোনো প্রত্যাশা। আছে শুধু পাথরের মতো কঠিন একটা দেওয়াল। মাথা নিচু, কিন্তু আত্মার মাথা উঁচু। দিগন্ত মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে ।
জারুল তবুও মুখ তুললো না। সে ন্যাকড়াটা নিংড়ে, শীতল, কর্কশ গলায় শুধু বললো
“সরুন, সাহেব। জায়গাটা মুছতে হবে।”
*”সাহেব”*। একটা শব্দ। ছয় বছরের সমস্ত ভালোবাসা, সমস্ত রাগ, সমস্ত অভিযোগের সমাধি।
দিগন্ত পিছালো না । আরেকটু সামনে দাঁড়ালো। বাঁকা হেঁসে বলে ।
_’ বিলাসবহুল জীবন-যাপনের জন্য আমার চার বছরের গড়ে তুলা ভালোবাসাকে পায়ে পিষ্ট করে অন্য একজনের হাত ধরেছিলে । সে কি তোমাকে এতোটাই সুখে রেখেছে যে আমার বাড়িতেই ফের কাজ করতে আসতে হলো ! ‘
জারুল চোখ বন্ধ করে ফাঁকা ঢোঁক গিলে । কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলে না । বাকরুদ্ধ সে , তার বলার মতো লক্ষাধিক কথা থাকলেও এই মুহুর্তে তার নীরব থাকাটা তার এবং তার মেয়ের জন্য ভালো হবে ।
দিগন্ত জারুলের বাকরুদ্ধ দেখে আবারো মুখ খোলে । দাঁতে দাঁত চেপে ধরে । হাঁটু গেঁড়ে জারুলের সামনে বসে গাল দুইটা চেপে ধরে । দাঁতে দাঁত পিষে বলে ।
_’ তুই আমার গার্লফ্রেন্ড ছিলি না । তুই আমার বিবাহ করা বউ ছিলি আর তুই আমাকে ডিভোর্স না দিয়েই অন্য এক লোকের সাথে সংসার পেতেছিস ! আমাকেও ধরে রেখেছিস আবার অন্য জন কেও ধরেছিস । ছিঃ তোর মুখ দেখলেও আমার বমি আসে । তুই কি কাজ করার জন্য অন্য বাড়ি খুঁজে পেলি না ? শেষমেষ আমার চোখের সামনেই পড়তে হলো তোর ।’
( লেখিকার পেইজে ফলো দিয়ে রেসপন্স করবেন। পেইজে রেসপন্স না পেলে তাল হারায় )
জারুল হাতে থাকা ময়লা পানি নিয়েই দিগন্তের বলিষ্ঠ বুকে চেপে ধরেছে । আকাশী রঙের শার্ট খানা মূহূর্তেই নোংরা পানিতে ভিজে জুবুথুবু হয়ে গেছে ।
জারুল নিজের হাত জায়গাই রেখেই অস্পষ্ট স্বরে বলে ।
_’ তোমাকে আমি ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছিলাম । ‘
দিগন্ত এইবার দ্বিগুণ তেতে উঠল । তার চোখ দুইটাই আগুনের লেলিহান শিখা দাও দাও করছে । দিগন্ত দ্বিগুণ রাগ দেখিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে । বলল ।
_’ আমি সাইন করিনি ।’
_’ সেইটা আপনার সমস্যা। আমার তরফ থেকে সকল সম্পর্ক ছিন্ন। ‘
দিগন্ত এইবার চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে ।
জারুল ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলো । চোখ দিয়ে টপটপ করে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে । কিন্তু মুখের কোণে লেগে আছে এক বিজয়ের হাসি ।
জারুল এর এই হাসিটা যেনো সহ্য করতে পারলো না দিগন্ত । দাঁতে দাঁত চেপে ধরে রাখে হিসহিসিয়ে আরেকটু হাত শক্ত করে ধরে চুলের গোড়া মুখের কাছে মুখ এগিয়ে নেয় । দিগন্তের তপ্ত শ্বাস আঁচড়ে পড়ছে জারুলের মুখে , দিগন্ত এইবার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিদ্রুপের হাসি হেসে হিসহিসিয়ে বলে ।
_’ তোর এই তেজ ঠিক কতদিন ধরে রাখতে পারিস তা আমি দেখবো । আমাকে যতটুকু আগুনের তুপে ছুঁড়ে ফেলে নতুন নাগর ধরেছিস আমি ঠিক তার থেকে এক মুঠো বেশি আদর দিবো তোকে । আই রিপিট আদর । কেনো যন্ত্রণা নয় । ‘
প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১
দিগন্ত চুলের মুঠি ছেড়ে হনহনিয়ে উপরের দিকে চলে যায় । পিছনে ফেলে যায় এক আত্মবিশ্বাসী নারীকে। যে দীর্ঘ ৬ বছর একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পিছনে ছুটেছে এখনো ছুটছে । দিগন্ত ডিভোর্সের কাগজে সাইন করেনি । এই কথাটা এখনো বেজে চলেছে তার কানে । তার মনে একটা অপ্রত্যাশিত নিষিদ্ধ অনুভূতি খেলা করছে । ভালো লাগছে । নিজের মন না চাইতেও হেসে উঠেছে ।
তাদের দুজনের এই ঝগড়া কথাকাটি দূর থেকে দেখে দীনা বেগম । চোখে আর মুখে সন্দেহের খেলা করছে । সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাশুড়ির রুমের দিকে হাঁটা ধরে।
