প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৭২
জান্নাত নুসরাত
আরশের ঘুম যখন ছুটল তখনো ঘড়ির কাটায় বেশি সময় হয়নি। ঘন্টাখানেক হবে। নুসরাত বসে বসে ঝিমোচ্ছে। তার নড়াচড়া বুঝতে পেরেই চোখ মেলে তাকাল, তাকিয়েই একজন স্ত্রী ন্যায় শুধাল,”কিছু লাগবে?
আরশের তো অনেক কিছু লাগবে, কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারল না। নুসরাত তার মাথাটা বালিশে রেখে আড়মোড়া ভাঙল। সময়ের সাথে লোকটার চোখ আরো বেশি লাল হয়েছে৷ গা গরম হয়েছে। জ্বর নামার বদলে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। থরথর করে বাড়তেই আছে৷ আরশ কিছু একটা বলতেই নুসরাত কান পাতল, বলল,”কী কী, শুনতে পাইনি!
আরশ আবারো বলল। ঠোঁট নড়ল সেকেন্ড কয়েকের জন্য। নুসরাত নিজের কান আরশের ঠোঁটের কাছে নিয়ে শোনার চেষ্টা করল। তারপর জানতে চাইল,”ভালোবাসার স্বীকারোক্তি শুনতে চাচ্ছেন?
আরশ মাথা দোলাল নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে থেকে৷ নুসরাত কী বুঝল বোঝা গেল না, এমনভাবে মাথা দোলাল উপর নিচে যেন সব বুঝেছে। ভাবলেশহীন কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,” স্বীকারোক্তি দেওয়া জরুরী?
জ্বরের ঘোরে থাকা আরশের গলা ঈষৎ নরম। স্বাভাবিক কথাগুলো ভাঙা ভাঙা। নুসরাতের কথায় হেসে ফেলল গা দুলিয়ে। বলল,” জরুরী কিনা জানি না, কিন্তু যেদিন তোর মুখে ভালোবাসার স্বীকারোক্তি পাব সেদিন আমার থেকে সুখী এই পৃথিবীতে দ্বিতীয় কেউ হবে না।
নুসরাত আরশের মাথায় জলে ভিজানো কাপড়টা দিতে দিতে বলল,”মনে হয় না, আপনি কখনো হতে পারবেন সেই সুখী মানুষ।
আরশের নরম স্বরের আর্জি,”একবার বলা যায় না?
“না।
ঘুমে ডুবে যেতে যেতে সে জিজ্ঞেস করল,”কেন? হোয়াই?
” এই স্বীকারোক্তি শুনলে আপনি বারবার শুনতে চাইবেন।
কথাটা শেষ করে সে চোখ বন্ধ করল। তখনো রুমে ফিসফিসানি আওয়াজ প্রতিধ্বনি হচ্ছে,”আই হেইট ইউ!
নুসরাত শুনল। উত্তর তার থেকে আসলো নিমেষেই,”আই হেইট ইউ টু..!
জায়িন বাসার বাহিরে নিশ্চুপ হেঁটে চলেছে। কোথায় যাবে এখনো ঠিক করেনি। অনবরত হাঁটছে। গায়ে জড়ানো স্কাই ব্লু কালার ঢিলেঢালা শার্টটা উড়ছে। নরম বাতাসের তালে মৃদুমন্দ। বাতাসের প্রকোট এতটাই নাকে লেগে শ্বাস ফেলা বড্ড মুশকিল। জায়িনের দৃষ্টি শূণ্যে৷। রাস্তার পাশ ঘেঁষে গজিয়ে উঠেছে সবুজ কিছু ঘাস। সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ধ্যান নেই। তার ভাবনা অন্য জায়গায় আটকে আছে৷ জাগতিক জ্ঞান এখনো সেখানেই আটকে। চোখের সামনে গত পাঁচ বছরের দৃশ্য ভাসছে। ভাসছে হাস্যজ্জ্বল একটা পরিবারের ছবি, যেখানে চারজন সদস্য আনন্দে ছিল। তাদের জন্যই ওই পরিবারে দুঃখের ছায়া পড়েছিল, ব্যাপারটা ভাবতেই ভেতরে ভেতর বুকটা ভার হয়ে আসলো।
বারো বছর পর দেশে যখন সে পা রাখল, অনিশ্চিয়তায় ভুগছিল ইসরাত কী তাকে মনে রেখেছে? তার সেই অনিশ্চিয়তা আরো বাড়ল যখন হসপিটালের করিডোরে দাঁড়ানো পানপাতার মতো ঢলঢলে গোলগাল মুখটা দেখল৷ ইসরাত এতটাই সুন্দর হয়েছিল, যা বলার জন্য যেসব শব্দের প্রয়োজন তা তার কাছে নেই। গোল গাল মুখে আপেলের মতো থুতনি। হাসির তালে সেই আপেলের মতো থুতনির কাটা দাগটা আরো যেন বেড়ে গেল। চোখ দুটো এতটাই স্বচ্ছ ছিল, জায়িন আটকে গিয়েছিল ওই চোখে, ওই মুখে, ওই মনোরম হাসিতে। এরপর সে আর সরে আসতে পারেনি, নিজেকে ছাড়াতে পারেনি মেয়েটার থেকে। চেষ্টা করেনি। যতদিম গিয়েছে ইসরাতের প্রতি ভালোবাসা বাড়তেই থাকল। ভালোবাসা থেকে মায়া হয়তো বেশি৷ ছিল। ওই মুখের দিকে তাকালেই তার প্রখর অনুভূতি হতো৷ ওই মুখের হাসি, ওই মুখের মালিক মাদকতার মতো গ্রাস করতেই থাকল। সময়ের সাথে কমার বদলে আরো বেশি তার প্রতি মায়া, ভালোবাসা যাই বলুক না কেন সব তরতরিয়ে বৃদ্ধি পেল জায়িনের৷ সে বারবার শুকরিয়া আদায় করত আল্লাহর কাছে, দাদা তাদের বিয়ে দিয়ে যাওয়ার জন্য। ছোটবেলায় আজমল আলী বলতেন একটা কথা সবসময়,’নাছিরের বড়ো মেয়েটা বড় হয়ে আরো রুপবতী হবে, লিখে রাখো আমার কথা। মায়ার তুলনায় বেশি সুন্দরী হবে।’
সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছে, আরো রূপবতী হয়েছে সে। বেঁচে থাকলে হয়তো খুব অহম নিয়ে বলতেন,’দেখো, আমার কথা ফলেছে না?’
চেহারার আগের কাঠামোতে থাকলেও, সুন্দর হওয়ার সাথে মানুষকে আকর্ষণ করার ক্ষমতাটা বেশি ছিল ওই মুখে।
জায়িন নুসরাতকে যখন প্রথম দেখল তখন যেন চিনতেই পারল না৷ আরশ কী চিনবে সে নিজেই চিনেইনি। কী ছিল আর হয়েছে কী! বয়সের তুলনায় ছোট খাটো ছিল, আর এখন তালগাছের মতো লম্বা হয়ে গেছে। তাকে আরো বেশি অবাক করল আরেকটা বিষয়। ছোটবেলায় গুছিয়ে থাকা মেয়েটা বড় হয়ে ছন্নছাড়ার মতো হয়ে গেছে। হাত-পা ছড়িয়ে কে করিডোরে বসে থাকে?৷ মানুষ হেঁটে যাচ্ছে তার দিকে তাকিয়ে, সে হাত নেড়ে নেড়ে হাসছে।যখন প্রথম তাকে দেখেল, দেখেই না চিনার ভান ধরল, এমন ভাব করল যেন এই জীবনে এই মুখ কখনো দেখেনি। নুসরাতদের দাদার এই স্বভাব ছিল৷ যাদের সে চিনতে চাইতেন না মুখ এমনভাবে চোখা বানিয়ে নিতেন জীবনে দেখেননি এসব মানুষকে। একদম তার সামনে বসা মেয়েটার মতো অবিকল।
কথাটা ভাবতে গিয়ে হেসে উঠল জায়িন৷ দেশে ফেরার পর যখন বুঝল ইসরাত তাকে ভুলে যায়নি, তখন হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো খুশি হয়েছিল সে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ের আয়োজন করল। দেরি করল না। এত বছরে তাদের ভেতর এমনিতেই অনেক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল সেই দূরত্ব আরো বাড়ানো কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়৷ আর জায়িন কোনো বোকামি করতে চায়নি। দাদির মৃত্যু হোক বা ইসরাতকে বিয়ে করার জন্য হোক, সে দেশে আসত৷ আর এখন এসে এভাবে ফেলে যাবে তা সে মোটেও করবে না।
ইসরাতকে দেশে ফিরার পর থেকেই হেলাল সাহেব পছন্দ করতেন। হয়তো মায়ের মতো দেখতে চেহারা হওয়ায়৷ এজন্য তিনিও এই বিষয়ে চাপাচাপি করেননি৷ একটু ঘাউড়ামি করেছিলেন। তার সেই ঘাড়ত্যাড়ামিতে নুসরাত নিজেও সঙ্গ দিয়েছে পুরোদমে। তারপরও কেমন করে যেন তাদের বিয়েটা হয়ে গেল। সকলের সম্মতিতেই। যখন বিয়েটা হয়ে গেল তখন তো সব ঠিক ছিল, তাহলে এতটা অগোছালো হলো কীভাবে জীবন? জায়িন ভাবতে বসল। মস্তিষ্কে কোথাও একটা বারবার তাকে ঠুকরাচ্ছে আর বলছে,’তোমার দোষে হারিয়েছ। এখানে ভাবাভাবির কী আছে?’
সেই ভাবাভাবির অন্তিম ঘটল, অতীতের সেই দিনের কথা ভেবে৷ যেদিন ইসরাত তার লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে ছিল ওই বাড়ি থেকে৷ তার মুখ দেখতে চায় না বলে চ্যাঁচিয়ে ছিল। নাছির সাহেবের এত অসুস্থতার ভেতর তারা ফেলে চলে এসেছিল এখানে৷ কীভাবে পারল এটা করতে? জায়িন তো কখনো এতটা অমানুষ ছিল না? তাহলে এই কাজ করল কীভাবে সে? জায়িন এখন বুঝতে পারছে সে যদি ওইদিন আবারো ইসরাতকে মানাতে যেত, তার পাশে থাকত, তাহলে কোনোদিন মুখ ফিরিয়ে নিত না৷ একটু বেশি কী কষ্ট দিয়ে ফেলেছে ওই বোকা মেয়েটাকে? যেদিন তারা দেশ থেকে ফেলে এসেছিল সেদিনই মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল ইসরাত, আর এখনো সেই মুখ ঘোরানো রয়েছে। সে মরে গেলেও ক্ষমা করবে না। জায়িন অভিমানটুকু বোঝেনি। অভিমানটুকু বুঝলে আজ এত দূর গড়াত না। তাদের সম্পর্কের হাল এই হতো না। কে বলে জায়িন বুদ্ধিমান? সে আসলে ইসরাতের থেকে বেশি বোকা৷
মেয়েটা যে তার প্রতি অভিমানের পাহাড় জমিয়ে রেখেছে বুকের মাঝে তা এখন বুঝতে পারল জায়িন। মানুসিক ভাবে ভেঙে পড়েছে এখানে আসার পর। হয়তো তার মস্তিষ্ক জায়িনের এই রুপ মেনে নিতে পারেনি৷ এত ধাক্কা কীভাবে সামলাবে সে? গতকাল রাতেই তো দেখল সুস্থ স্বাভাবিক ছিল, আজ হঠাৎ করে এত জ্বর বাঁধল কীভাবে? তা ও যেই সেই জ্বর না, একদম ১০৪ ফরেনহাইট৷ চোখ খোলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই তার। অভিমানে চোখ খুলছে। ডাক্তার ঠান্ডা স্বরে বলেছেন,’রোগী বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন শরীর দূর্বল এর জন্য। মানুসিক ভাবে উনি ভঙুর, বেঁচে থাকার ইচ্ছে নেই৷ নিজের মনোবল নিজেই না রাখলে তো আমাদের কিছু করা সম্ভব না৷ যদি পড়ে থাকেন এভাবে, তাহলে বাচ্চা, মা দু-জনেই মারা যাবেন। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চোখ খোলাতে হবে রোগীর। উনাকে চেষ্টা করুন মনোবল দেওয়ার। এই বাচ্চাএ জন্য, বা তার আপনজনের জন্য।
ডাক্তার বলেছেন ওষুধ খাওয়ালে সুস্থ হবেন কিন্তু ইসরাত মুখেই তুলছে না। হুঁশ থাকলেই পেট চেপে ধরে বিড়বিড় করে,’’আমার বাচ্চা, আমার বাচ্চা
জায়িন কত চেষ্টা করল এন্টিবায়োটিক মুখে ঢোকানোর, দাঁত চেপে বসে রইল। ঠোঁট দুটো আলাদা করেছিল বহু কসরতে, কিন্তু তার ঘরের শিয়ানা মেয়ে মানুষ ঠোঁট দুটো চেপে ধরল একটার সাথে অন্যটা। জায়িনকে টানাহ্যাঁচড়া করতে দেখে হেলাল সাহেবই খ্যাপা ষাঁড় হয়ে গেলেন। তাকে ঠেলে বের করে দিলেন ওই রুম থেকে। বাচ্চার কী প্রয়োজন? বাচ্চার প্রয়োজন নেই জায়িনের৷ বাচ্চা আসলো কী গেল তাত্ব বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই জায়িনের। বর্তমানে তার চিন্তা আটকে আছে কীভাবে জ্বরের ওষুধ খাওয়াবে মেয়েটাকে।
কথাটা ভেবে যখন চোখ তুলল সে রাস্তা থেকে, তখন বুঝতে পারল তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে৷ ঝিরিদারার মতো টিপটিপ করে। কখন থেকে পড়ছে তা তার বোধগম্য হলো না৷ বোধগম্য হবে কীভাবে,যখন থেকে বাসা থেকে বেরিয়েছে, তখন থেকেই অন্য মনস্ক হয়ে হেঁটে চলেছে। নিজের কান্নার উপলব্ধি হতেই ঠোঁট ফেঁড়ে তাচ্ছিল্যের হাসি বেরিয়ে আসলো। চোখের পানি মোছার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করল না। এখানে কেউই তার কান্না দেখার জন্য থেমে থাকবে না, সবাই সবার কাজ করবে। কারোর, কারোর দিকে মনোযোগ নেই।
বাতাস এসে চেপে ধরল জায়িনের চেহারা। শুভ্র বর্ণের চেহারাটায় সেই বাতাসের ঝাপটা ভীষণ শিরশিরে ঠেকল। শ্বাস ফেলতে কষ্ট হলো। চোখ দিয়ে পানি পড়া অনবরত বাড়ল, তার সাথে জ্বালাপোড়া। নিজের ভুলগুলো হয়তো চোখে আঙুল দিয়ে সে নিজেকেই দেখিয়েছে, এজন্য অপরাধ বোধে ভীষণ লজ্জিত বোধ করল। এতদিন নিজে কী করেছে! কেমন ব্যবহার হয়েছিল তার! নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছিল? না, ভুলের জন্য ক্ষমা চায়নি একবারো সে, তাহলে মেয়েটা তাকে ক্ষমা করবে কীভাবে? এর মধ্যে তার সংস্পর্শে গিয়েছে। ইসরাত থামায়নি। সে কখনো প্রতিবাদী সত্ত্বা নিজের মধ্যে প্রকাশ করে না, কিন্তু আসল জায়গায় সে জায়িনকে ঝুঁকিয়ে ফেলেছে৷ মানুষকে না দেখা করার ক্ষমতা আছে ভীষণ। নুসরাত যেখানে মুখে যা আসে বলে দেয় সেখানে ইসরাত? সে চুপচাপ নিজেকে সরিয়ে নিবে, আর এটাই হলো তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র৷ তার সাথে থাকবে, ব্যবহার রাখবে আগের মতো, শুধু কথা বলাই কমিয়ে দেবে। আর এটাই মানুষের অপরাধ বোধে আগাত হানবে। কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে। ইসরাত এটা জানে, তাই তো এখন চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়েছে। দুনিয়ার মায়া ছেড়ে দিয়েছে। বাচ্চাটা যাচ্ছে যাক, কিন্তু ইসরাত? সে কীভাবে জায়িনকে একা ফেলে যাওয়ার চিন্তা করে? জায়িন কোনোভাবে তাকে একা ফেলে যেতে দিবে না। যেকোনো মূল্যে জ্বরে ওষুধ খাওয়াবে সে।
ইসরাত যে প্রেগন্যান্ট এই কথা সে কখনো বলত না, চেপে যেত ভেতরে৷ জায়িন যদি না বুঝত তাহলে একটা মানুষকে জানাত না। বোকা ইসরাত ভেবেছিল এইভাবে জায়িনকে শাস্তি দিবে, কিন্তু সে জানেই না এই বাচ্চার প্রতি জায়িনের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। সে বাঁচল কী মরল তাতে যায় আসে না জায়িনের। তার শুধু দরকার ইসরাতের। ইসরাত বেঁচে থাকলেই তআর পুরো পৃথিবী পূর্ণ, আর কারোর প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন হবে না তার এই পৃথিবীতে।
ডায়নিং টেবিলে আরশ মাথা হেলিয়ে বসা। টিভি অন করে রাখা। গান বাজছে, মৃদু স্বরে,”Maula mere maula…
গানের তালে তালে নুসরাত মাথা দোলাচ্ছে। ঘুরপাক খাচ্ছে দুয়েকবার৷ আরশ বসে বসে দেখল স্ত্রীর কান্ড -কারখানা। তার জন্য খিচুড়ি বানাতে এসেছে মেয়েটা। আর এখন তাকেই জিজ্ঞেস করছে কীভাবে রাঁধবে। উঠে দাঁড়াল। নিচে শুধু সোয়েট প্যান্ট। উপর খালি। উদোম গায়ে নেমে এসেছে। জ্বর নামায় গরম লাগছিল বলে গায়ে কিছু চড়ায়নি। নুসরাতের পাশে দাঁড়াতেই চোখ তুলে একবার তাকাল নুসরাত, তারপর আবার নিজের হাতের দিকে চাইল। আরশ হাত বাড়িয়ে ডেকচিটা নিয়ে নিল। চাল পানি দিয়ে ভালো করে সিঙ্কে ধুয়ে পরিস্কার করতে যখন ব্যস্ত হলো, নুসরাত জিজ্ঞেস করল,”আপনি রাঁধতে জানেন, আরশ ভাই?
“নাহ্..!
সেই কথা কানে যেতেই মেয়েড়া তাকাল অবাক নয়নে। বলল,” রাঁধতে জানেন না, তাহলে এমনভাবে এসে দাঁড়িয়েছেন কেন যেন সব পাড়েন? আমি তো ভাবলাম আপনি রাঁধতে জানেন।
“সে আমার ব্যক্তিগত বিষয়, জানি কি-না।
“ আপনার ও ব্যক্তিগত বিষয় আছে নাকি?
আরশ চোখ উলটে নুসরাতের মুখের দিকে এমনভাবে তাকাল যেন বিশ্ব সেরা জোকটা সেই বলেছে। চাল, ডাল, ভালো করে ধুয়ে চুলায় বসিয়ে দিল৷ ঘড়ির কাটায় তখন সবে আটটা বেজেছে। নুসরাত ফ্রিজে দেখল কিছু খাওয়ার মতো খুঁজে পাওয়া যায় কিনা, কিন্তু কিছুই পেল না। আরশ শুধাল,”কিছু খোঁজচ্ছিস?
“হ্যাঁ..”
“কী?
“খাবারের কিছু।
কথাটা বলার পর আরশ আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। খোপা করে বেঁধে রাখা চুলগুলো হাত দিয়ে টেনে খুলে দিল। ফ্রিজ থেকে চোখ সরিয়ে নুসরাত একবার তাকিয়ে আবারো নিজের কাজে মন দিল। যেন তেমন বড় কোনো ঘটনা না এটা। খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে আইস্ক্রিম দুটো পেল। আরশকে সাধাসাধির প্রয়োজন বোধ করল না, নিজেই দুটো মুখে ঢুকিয়ে নিল। ডাকল,”আরশ ভাই?
আরশ তার দিকে তাকিয়ে ছিল কাউন্টারে ভর দিয়ে। জবাব দিল,”হু..!
আইস্ক্রিম এ কামড় বসিয়ে জিজ্ঞেস করল,“আপনার ইনকাম সোর্স কী?
বুকে আড়াআড়ি হাত বেঁধে আরশ বলল,“তা জেনে তুই কী করবি?
নুসরাত ভ্রু যুগলে ভাঁজ ফেলে বলল,“ আরে বলুন না, জানতে ইচ্ছে হয়। এত টাকা কোথায় পান আপনি?
আরশ চোখা নয়নে তাকিয়ে বলল,”ডাকাতি করে।
নুসরাত হেসে ফেলল। বলল,”বলুন না, আপনার ইনকাম সোর্স কী, আমি কী মেরে দিব?
কথা শেষে চোখ তুলে তাকাল। দু-জনের ভেতর চোখাচোখি হলো কয়েক মুহূর্ত। আরশ না সরাল দৃষ্টি, না সরাল নুসরাত। তাদের সেই তাকানোর ভেতরে আরশ বলে ওঠল,”আমার ইনকাম সোর্স জানাটা জরুরি?
“অবিয়েসলি হ্যাঁ..! এবার জানান আপনি কী করেন?
ছোট্ট করে উত্তর আসলো আরশের তরফ থেকে,“ফিল্যান্সার…”
নুসরাত ওও করে মুখে আকৃতি গোল করল। বলল,”তবে কাজবাজ করেন একটু আকটু। আমি ভেবেছি, বেকার বসে বসে অন্ন ধ্বংস করেন।
কথা শেষ হতেই তার কোমর প্যাঁচিয়ে ধরল আরশ। ভ্রু চূড়ায় তুলে জিজ্ঞেস করল,” অন্ন ধ্বংস? এটা মিন করে কী বোঝালি?
থতমত গলায় নুসরাত বলল,”সেরকম কিছু বোঝাইনি৷
গ্রীবা বাঁকিয়ে ঝুঁকে আসলো আরশ। বলল,”তাহলে কী বুঝিয়েছেন আপনি?
সেই কথার উত্তর দিল না। কথা পালটে ফেলল,”একিটা কাজের জন্য কেমন এমাউন্ট পান আপনি?
আরশ তার কোমর আরো শক্ত করে ধরে শুধাল,”বাংলাদেশি নাকি ফ্রান্সের?
“আমাদের এখানের।
“ দু থেকে তিনলাখ।
নুসরাতের চোয়াল ঝুলে পড়ল। চোখ দুটো বড় বড় করে বলল,”আরেব্বাস, আরশ ভাই, আপনার কাছে তো দেখি খাজানা আছে। একটা কাজের জন্য তিন লাখ টাকা।
হাতের আঙুল তুলে দেখাল এমন ভাবে জীবনে টাকা দেখেনি৷ আরশ তার নাকে টোকা দিয়ে বলল,”এমনভাব করছিস যেন জীবনে টাকা দেখিসনি?
নুসরাত ঠোঁট টিপে দু-পাশে মাথা দোলাল সে জিবনে টাকা দেখেনি৷ আরশ আরো কিছু বলার পূর্বে বিপ বিপ শব্দে বেজে উঠল ইন্টারকম। নুসরাত একবার সেদিকে তাকিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। ততক্ষণে চুলোর চাল ডাল সিদ্ধ প্রায় হয়ে গেছে। কানে লাগিয়ে হ্যালো বলার পূর্বেই রুহিনী বেগমের গলার স্বর ভেসে এলো,”নুসরাত আম্মা, গেইট খোলো।
কথা অনুযায়ী গেইট খুলে দিল সে৷ ভেতরে ঢুকে কিছুক্ষণ নুসরাতের দিকে তাকিয়ে রইলেন রুহিনী বেগম। অস্বাভাবিক কোনো কিছুই চোখে পড়ল না তার। হাত বাড়িয়ে ছোঁয়ার পূর্বেই নুসরাত সরে গেল। বলল,”এসেই ছোঁয়া ছুঁয়ি শুরু করে দিয়েছ কেন, তুমি?
উনি ঠোঁটের কোণ উচিয়ে হাসলেন। বললেন,”চেক করছি সব ঠিকঠাক আছে কিনা!
চোখ উল্টাল মেয়েটা৷ রুহিনী বেগম উপর নিচ দেখা শেষ হতেই সে শুধাল,”দেখা শেষ?
মাথা দোলালেন ভদ্রমহিলা। নুসরাত জিজ্ঞেস করল,”চাচ্চু কোথায়?
“তোমাদের বাড়িতে৷ নাস্তা খেয়ে একদম আসবেন৷। গতকাল রাতে তো সেখানেই থেকেছিলাম। তোমরা স্বামী স্ত্রী দরজায় এমন খিল আটলে, দরজাই খুললে না। ভেতরে কী করছিলে, খোদা মালুম।
কথা শেষ করে গটগটিয়ে চলে গেলেন। তার সেই চলে যাওয়া নুসরাত নিশ্চুপ মুখে দাঁড়িয়ে দেখবে ভাবল,, কিন্তু পরে কী ভেবে নিজেও পিছু পিছু ভেতরে যেতে যেতে বলল,”স্বামী স্ত্রী যে ডেটে গিয়েছ, আমরা কিছু বলেছি? আমাদের খোঁচাচ্ছো। তোমরা এই বয়সে ভাই বোন উপহার দিবে নাকি আমাদের?
কথা শেষ হতেই চাপড় পড়ল তার কাঁধে। বললেন,”পেলেপুষে বড় করার গুরু দায়িত্ব নিলে, অবশ্যই আরেকটা আনার প্ল্যান করতে পারি। নিবে দায়িত্ব, নুসরাত আম্মা?
নুসরাত কিছু বলতে গিয়ে দেখল আরশ এদিকে দৃষ্টিপাত করে আছে। গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি জরিয়েছে এই সময়ের ভেতরই। রুহিনী বেগম তাকে দেখেই হাসলেন। সে ও হাসল। চোখ মুখ লাল দেখে চিন্তিত স্বরে বললেন,”এ কী অবস্থা, চোখ মুখ এমন লাল হয়ে আছে কেন, আরশ আব্বা?
কথা শেষ করে নুসরাতের দিকে তাকালেন৷ দু্ষ্টুমি ভরপুর মুখের কোণায় কোণায়। আরশ ভারিক্কি স্বরে উত্তর দিল,”একটু জ্বর, ছোট মা।
আর জ্বালালেন না নুসরাতকে। একা পেলে জ্বালাতেন। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে শুধালেন,”কী রান্না করছ দু-জনে?
আরশ উত্তর দিল,”খিচুড়ি..!
‘“হাত মুখ ধুয়ে এসে খাচ্ছি, দু-জনে টেবিল সাজিয়ে ফেলো ঝটপট।
রুহিনী বেগম চলে গেলেন। নুসরাত হেলেদুলে এসে দাঁড়াল আরশের পাশে৷ ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইল,”কী দরকার, এখন মিসেস নুসরাত নাছির এর?
নুসরাত আরশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় দু-হাতে আঁকড়ে ধরল তার পিঠ। মুখ ঠেকাল বুকের কাছে। শ্বাস ফেলছে খুব ধীরে। আরশ তার বাহু ধরে সরিয়ে দিল। বলল,”হয়েছে কী? হঠাৎ জড়িয়ে ধরাধরি হচ্ছে কেন? মতলব কী?
নুসরাত আরশের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসল ক্ষীন। বলল,”মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে আরশ ভাই, জড়িয়ে ধরি কিছুক্ষণের জন্য।
আরশ তার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল। দূরত্ব বাড়িয়ে দিল নিমেষেই। সন্দেহাতীত কন্ঠে শুধাল,”কেমন অনুভূতি হচ্ছে?
“সেটাই তো বুঝতে পারছি না, কাছে আসুন জড়িয়ে ধরি, তারপর ব্যাখ্যা করি।
নুসরাত থামল সেকেন্ড কয়েকের জন্য। তারপর আরশের চোখের দিকে তাকাল। সরাসরি একদম। সে কখনো চোখ নিচে রেখে কথা বলে না,”ষাট সেকেন্ড, ষাট সেকেন্ডের জন্য আমি আপনাকে জড়িয়ে ধরব, তবেই তো আমি বুঝতে পারব আপনাকে নিয়ে আমার অনুভূতি কেমন!
আরশকে আর কিছু বলার সুযোগ দিল না সে, হয়ে উঠল না। যখন জড়িয়ে ধরার জন্য সে হামলে পড়ল, তখন না চাইতেও আরশকে দু-পা পিছিয়ে যেতে হলো। নিজেকে সামলে রাখতে চেপে ধরতে হলো হাতের কাছের শক্ত রেলিঙটা। তাতে বিশেষ ভাবাবেগ হতে দেখা গেল না নুসরাতের, তার আঁকড়ে ধরা হাত আরো শক্ত হলো৷ বুকের কাছে মাথা ঠেকাল শক্ত করে। নাকে এসে সুরসুরি খেল ব্লুবেরি পারফিউম এর ঘ্রাণ। নাক টেনে সেই সুগন্ধি টুকু পুরে নিল নাসারন্ধ্রে। বিড়বিড়িয়ে কিছু একটা বলল, তা আরশের কানে গেলেও সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। বিভ্রান্ত হয়ে সরে যাবে এমন কিছু বলল না নুসরাতকে। পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল।
ষাট সেকেন্ডের জন্য নুসরাত আরশকে জড়িয়ে ধরলে তার সময়সীমা বাড়ল দ্বিগুণ। আরশকে নরম স্বরে বলতে শোনা গেল,”ষাট সেকেন্ড পাড় হয়ে গেছে, নুসরাত নাছির।
সেই কথা কানে তুলতে দেখা গেল না তাকে। নাক মুখ দাবিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আরশকে মেয়েটার ভার সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছিল, তবুও সে সটান দাঁড়িয়ে থেকে সব সয়ে নিল। চোখ নিচে নামিয়ে দেখল নুসরাতের চেহারা। নাকের কাছে জ্বলজ্বল করা রিং। মুখ, ঠোঁট, গাল, চোখ। মেয়েলি মুখের এক একটা অংশ।
নুসরাত পিঠ ছেড়ে দিল। আরশের হাত তার পিঠে ট্যাপট্যাপ করে পড়ছে তা বুঝতে পারছে। নিজের হাত এনে রাখল বুকের কাছে। সেই সময় দৃষ্টি কাড়ল শীর্ণ হাতটা। দেখতে সাধারণ মনে হলেও আংটিটা সেদিন থেকে আরশের জন্য বিশেষ মনে হলো। এবং বিশেষত্ব বাড়ার কারণ হলো, ওই রিং এ ছোট ছোট অক্ষরে আরশের নাম লিখা ছিল।
প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৭১
আরেকটা বিষয় আরশের বুঝতে বাকি থাকল না, নুসরাত নাছির স্বীকার না আসলেও তাকে তার মতো ভালোবাসে। ভীষণ ভালোবাসে। এবং এই কথা কখনো নুসরাত নাছির স্বীকার আসবে না নিজ মুখে। ভীষণ আফসোস হলো আরশের আজ, সে কখনো তার স্ত্রীর মুখে অন্যদের মতো ভালোবাসার কথা জানতে পারবে না। নুসরাত নাছির কখনোই তাকে বলবে না যে, পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র মানব সৈয়দ আরশ হেলালকে সে ভালোবাসে।
