প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪৫ (২)
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
রাত প্রায় এগারোটা বেজে বিশ মিনিট,
শীতের রাত,একটা নির্জন জায়গায় জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে লামিয়া। গাঁয়ে কালো পাতলা শাড়ি। তাঁর উপর শাল জড়িয়ে রেখেছে। চোখ বুলিয়ে সবাই কে খুঁজছে কিন্তু কেউ কোথাও নেই। প্রায় ত্রিশ মিনিট হয়ে গেলো কিন্তু তাঁকে রেখে সবাই কোথায় গেলো? অচেনা একটা জায়গায় কীভাবে তাকে এতো রাতে একা রেখে যেতে পারলো। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো ঘুটঘুটে অন্ধকার। শুভ্র ভাই? সে কোথায় আজকে। ভীষণ ভয় লাগছে। ভেবেই চোখের কোণে পানি জমে গেলো লামিয়ার।
আজ সবাইকে একটা সুন্দর পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে এসেছে শুভ্র। সবাই এখানে এসে একটা রিসর্টে উঠেছে। কিছুক্ষণ আগেই তাঁকে জোড়া জোড়ি করে মেয়েদের গ্রুপ তাঁকে শাড়ি পড়িয়ে দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়ে তাঁকে নিয়ে বেরিয়েছিলো সবাই। তবে এখানেই তো ছিলো কিন্তু গেলো কোথায়? ভেবেই লামিয়া বেশ চিন্তিত হলো। আবার একটু ভিতর ভিতর ভয় ও লাগছে। কান্না পাচ্ছে ভীষণ, তবে কান্না করলে চলবে না মনটা কে শক্ত করতে হবে।
আর কিছু না ভেবে অন্ধকার দৌড়াতে লাগলো লামিয়া।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
দৌড়ে একটু সামনে আসতেই হঠাৎ চারপাশে আলো জ্বলে উঠলো। আলো জ্বলতেই লামিয়া চমকে উঠে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলো । তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে শুভ্র। হোটেল থেকে আসার সময় শুভ্র কে দেখে নি সে। রাশেদ বলেছিলো তার কী নাকি কাজ পড়েছে তাই সে পরে আসবে। কিন্তু শুভ্র কে এখানে দেখে বেশ অবাক হলো।
শুভ্র লামিয়ার দিকে এগিয়ে এসে হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে লামিয়ার দিকে হাত বাড়িয়ে বললো ” ভালোবাসি ভ্রমর। অনেক অনেক অনেক ভালোবাসি তোকে। সংসার করবি আমার সাথে? চল না একটা সংসার করি। আমি তুই মিলে একটা ছোট্ট সংসার পাতি দুজন মিলে। অনেক তো হলো রাগ অভিমান আর কতো? চল না আমাদের পিছনের কথা বাদ দিয়ে নতুন জীবন শুরু করি। সেই জীবনে কোনো কষ্ট থাকবেনা, দুঃখ থাকবেনা। তোর যতোটুকু সুখ দরকার তাঁর চেয়ে দ্বিগুণ সুখ আমি তোকে দিবো। আর কখনো কষ্ট পেতে দিবো না। সাজিয়ে রাখবো তোকে সারাজীবন আমার এই দিলে দিলওয়ালি করে।” বলেই থামলো শুভ্র। লামিয়া স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে শুভ্রর দিকে।
শুভ্র তা দেখে আবারো লামিয়ার চোখে চোখ রেখে বললো ” আমার লাল টুকটুকে বউ হবি?
আমার ব্ল্যাকবেরি আর জ্যাকির মা হবি? আমার ভবিষ্যৎ ছেলে – মেয়ের মা হবি? আমার বৃদ্ধ বয়সের সঙ্গি হবি? এই শাহরিয়ার শুভ্রর বউ হবি ভ্রমর। ঘটা করে লিখে দে না এই শাহরিয়ার শুভ্রর পাশে নিজের নাম টা।”
লামিয়া নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে আছে কিছু বলছে না। হঠাৎ পাশ থেকে হামিদা রা সবাই এক সাথে বলে উঠলো ” হ্যাঁ বলে দে লামু, হ্যাঁ বলে দে।”
লামিয়া একজন চোখ ঘুরিয়ে সবার দিকে তাকালো। সবাই এইখানে তাঁর মানে তাকে সবাই প্লান করে ভয় দেখিয়েছিলো। ভেবেই রাগ হলো। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে শুভ্রর দিকে অগ্নি চোখে তাকিয়ে ঠাস করে গালে চড় বসিয়ে দিলো।
সবাই হা করে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। কেউ ভাবতে পারে নি লামিয়া শুভ্র কে থাপ্পড় দিবে। শুভ্র গালে হাত দিয়ে লামিয়ার দিকে তাকালো।
লামিয়া দাঁতে দাঁত চেপে চেঁচিয়ে উঠল ” কী ভেবেছিস তোরা? আমাকে কেনো এমন ভয় দেখালি হ্যাঁ? তোদের কারণে আমার মনের উপর দিয়ে কী গিয়েছে একবার বুঝতে পেরেছিস? নাকি বোঝার চেষ্টা করেছিলি? আর তোকে আমি ঘৃণা করি বুঝতে পেরেছিস? চলে যা আমার সামনে থেকে। তোর মুখ আমি দেখতে চাই না। তোকে দেখলে আমার ঘৃণা লাগে।” কথাটা বলতে বলতে লামিয়ার চোখে পানি জমা হলো।
শুভ্র লামিয়ার দিকে তাকিয়ে কোনো কথা না বলে উঠে দাঁড়িয়ে পিছন ঘুরে নিশ্চুপ পায়ে চলে যেতে লাগলো। লামিয়ার চোখে পানি চিকচিক করছে। রাগের মাথায় আবার উল্টো পাল্টা বলে দেয় নি তো। ভেবেই পিছনে ঘুরে তাকালো। সবাই মুখ কালো করে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে।
হামিদা রেগে লামিয়া কে বললো ” তোর রাগ ভাঙানোর জন্য ছেলেটা এতো কিছু করলো আর তুই কি না অপমান করলি থাপ্পড় মারলি?”
লামিয়া তা শুনে মুখ ফুলিয়ে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে শাড়ির কুচি ধরে শুভ্রর দিকে ছুটে গেলো।
” এই দাঁড়ান ফালতু লোক, দাঁড়ান বলছি।”
শুভ্র তবুও হাঁটতে লাগলো পিছন ফিরে তাকালো না। লামিয়া শুভ্রর পিছন পিছন দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বললো ” কোথায় যাচ্ছেন , দাঁড়ান বলছি।”
শুভ্র পিছনে না ঘুরে হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে ” জানি না?”
” দাঁড়ান বলছি।”
” দাঁড়াবো না।”
” কেনো দাঁড়াবেন না?”
” যে আমার মুখ দেখতে চায় না, যে আমাকে ঘৃণা করে তাঁর সামনে কেনো দাঁড়াবো?”
” দেখুন দাঁড়ান বলছি। উফ হাঁটতে পারছি না।”
” তো হাঁটতে বলছে কে? চলে যান।”
” না যাবো না। একটু আস্তে হাঁটুন।”
” না হাটবো না আস্তে, চলে যান আপনি। আমার পিছু পিছু কেনো আসছেন? যাকে ঘৃণা লাগে তাঁর পিছন পিছন আসতে লজ্জা করেনা?”
” না করে ন…” বলতে বলতে ঠাস করে পড়ে গেলো শাড়ির সাথে বেজে। পড়ার সাথে সাথেই লামিয়া কুঁকড়ে উঠলো হাঁটু ধরে।
লামিয়ার কথা শুনতে না পেয়ে শুভ্র দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে দেখলো লামিয়া মাটিতে বসে হাঁটু চেপে বসে আছে। শুভ্র দৌড়ে লামিয়ার পাশে বসে অস্থির গলায় বললো ” দেখি কোথায় লেগেছে। সাবধানে কী চলা যায় না?”
লামিয়া মাথা নিচু করে বসে আছে। নাক টেনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো ” আপনার জন্যই তো হয়েছে। ”
” এখন সব দোষ আমার?”
” তা নয়তো কী হ্যাঁ? কতো করে বললাম আস্তে হাঁটুন। ”
শুভ্র লামিয়ার কোমড় চেপে ধরে পাঁজা কোল তুলে হাঁটতে হাঁটতে কঠিন গলায় বললো ” কেনো আস্তে হাঁটবো ?”
লামিয়া হঠাৎ শুভ্রর গলা জড়িয়ে ধরে গলায় মুখ গুঁজে নীচু স্বরে বললো ” আমি রাগের মাথায় বলে দিয়েছি।”
” ওই তো এক ই রাগের মাথায় মানুষ সত্যিটাই বলে দেয়। ”
” সরি।” বেশ নরম গলায় বললো লামিয়া।
শুভ লামিয়ার এমন নরম স্বর শুনে হালকা হাসলো কিছু বললো না।
বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার কর শুভ্র একটা বাড়িতে প্রবেশ করতেই লামিয়া শুভ্রর গলা থেকে মুখ তুলে চারপাশে চোখ বুলিয়ে অবাক হয়ে বললো ” বাড়িটা সুন্দর, আমরা কোথায় এসেছি? আর এই বাড়িটা কার?”
শুভ্র লামিয়া কে একটা রুমে নিয়ে গিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বললো ” তোর।”
লামিয়া বিরক্ত হয়ে বললো ” সবসময় মজা ভালো লাগে না। কার বাড়িতে এনেছেন আপনি আমাকে?”
শুভ্র ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে স্যাভলন আর তুলা বের করতে করতে বললো ” মজা না সত্যি বলছি। এটা তোর বাড়ি, আমি কিনেছিলাম তোর জন্য। আমাকে বিশ্বাস না করলে বাড়ির কাগজ পত্র দেখতে পারিস।”
বলেই আলমারি খুলে কিছু কাগজপত্র বের করে লামিয়ার দিকে এগিয়ে দিলো।
লামিয়া কাগজে চোখ বোলাতেই চোখ গোল গোল করে ফেললো। সত্যি তো তাঁর নামে এই বাড়ি।
অবাক হয়ে শুভ্র কে জিগ্যেস করলো ” কবে কী ভাবে কিনলেন এই বাড়ি?”
শুভ্র লামিয়ার পায়ের কাছে বসে বললো ” এতো কিছু তোর না জানলেও চলবে এখন দেখি শাড়ি তোল উপরে।”
” শাড়ি তুলবো মানে? মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে আপনার?”
” সবসময় রোমান্টিক মুডে থাকিস কেনো? আমি বলছি শাড়ি উপরে তুল আমি পরিষ্কার করবো তোর ক্ষত জায়গাটা।”
” না না কোনো দরকার নেই আমি পড়ে করে নিবো।”
” এক কথা বারবার বলতে ভালো লাগে না। তুই পা দেখাবি নাকি আমি জোর করে দেখবো কোনটা?”
শুভ্রর কথায় ভয়ে লামিয়া বসা থেকে উঠে দূরে সরতেই শুভ্রর রাগ লাগে। লামিয়ার আঁচল টেনে ধরে নিজের কাছে নিয়ে আসলো। লামিয়ার দিকে তাকাতেই কেমন ঘোর লেগে গেলো তাঁর।
শাড়ি ভেদ করে উন্মুক্ত কোমড় শক্ত করে চেপে ধরে হাস্কি কন্ঠে বললো ” সবসময় জ্বালাস কেনো তুই? কথা কেনো শুনিস না হুঁ?”
লামিয়া নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো কিন্তু শুভ্র আরো জোড়ে চেপে ধরলো নিজের সাথে।
লামিয়ার জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। হার্টবিট ভীষণ দ্রুত চলছে। কিছু বলছে চাইছে শুভ্র কে কিন্তু কথা গুলো গলায় আটকে আছে।
শুভ্র এলোমেলো হাতে এক টানে খুলে দিলো লামিয়ার চুলের খোঁপা। লম্বা চুল গুলো ছাড়া পেতেই আছড়ে পড়লো লামিয়ার পিঠে, কপালে। শুভ্র নেশাগ্রস্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। লামিয়া শুভ্রর দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিললো। শুভ্র লামিয়ার কাঁধ থেকে চুল গুলো সরিয়ে ঘাড়ে ঠোঁট ছুঁয়ে দিতেই লামিয়ার পুরো শরীর কেঁপে উঠলো । শুভ্র ঘাড় থেকে মুখ তুলে লামিয়ার দিকে তাকালো তারপর হাস্কি কন্ঠে বলে উঠলো ” আই ওয়ান্ট ইউ টুনাইট।”
লামিয়া মুখ খুলে কিছু বলার আগেই শুভ্র লামিয়া কে পাঁজা কোল তুলে নরম তুলতুলে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে হিসহিসিয়ে বললো ” উহু আজকে কোনো কথা শুনবো না। আজকে আমি যা বলবো তাই হবে। তুই বাঁধা দিলেও শুনবো না।” বলেই লামিয়ার গাঁয়ের শাল টেনে খুলে ফ্লোরে ফেলে দিয়ে গলায় মুখ গুঁজে একটা চুমু এঁকে দিলো। লামিয়া সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে নিলো।
শুভ্র পর পর চুমু খেয়ে গলা থেকে মুখ তুলে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখলো ব্রাউন ঠোঁট জোড়া হালকা কাঁপছে, তা দেখে বাঁকা হেঁসে ঠোঁট জোড়া চেপে ধরলো। লামিয়া আজ আর বাঁধা দিলো না, আর না সরতে চাইলো। পুরোপুরি সপে দিলো নিজেকে তাঁর ভালোবাসার কাছে।
সময়টা যেনো থেমে গিয়েছে আজ । আজ রাতে চাদ সাক্ষী হলো তাদের ভালোবাসার নতুন শুরুতে।
হঠাৎ দূর থেকে ভেসে আসলো
প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪৫
~ বাতাসে গুন গুন, এসেছে ফাগুন।
বুঝিনি তোমার,
শুধু ছোঁয়ায় এতো যে আগুন।।
