প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১০
সাইদা মুন
ভোরের আলো জানালার পর্দা ভেদ করে চোখে পড়তেই মেহরীনের কপাল কুচকে আসে। ঘুম এখনো চোখে ভালোই বসে আছে, চোখ মেলতে চাইছে না। আলো থেকে বাঁচতে ঘুমের মাঝেই দু’হাতে আকড়ে ধরা বস্তুটায় মুখ আরও গুঁজে দেয়, বালিশ ভেবে। তবে শক্তপোক্ত জিনিসটিও নড়ে-চড়ে তাকে আরও নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়। মুহূর্তের মধ্যে মেহরীনের টনক নড়ে, বালিশ কিভাবে নড়াচড়া করে, সঙ্গে সঙ্গে ঘুম যেন জানালার ফাঁক দিয়ে পালিয়ে গেছে। ফট করে চোখ মেলে তাকায়। চোখ খুলতেই সামনে পড়ে এক প্রশস্ত পুরুষালি বুক। মাথা তুলে তাকাতেই তালহার ঘুমন্ত চেহারাটা সামনের ভেসে ওঠে।
মেহরীন যেনো পলক ফেলতেই ভুলে গেছে। মনে হয়, সে স্বপ্ন দেখছে। স্বপ্নের সকাল তো ঠিক এভাবেই শুরু হয় তার। তালহার ঘুমন্ত রূপ, শান্ত চেহারা, কি স্নিগ্ধ লাগে দেখতে। দিনের আলোয় মুখে যে গাম্ভীর্য থাকে, তার কোনও ছিটেফোঁটাও নেই এখন। মনের মধ্যে এক অদ্ভুত উষ্ণতা ঘেঁষে যায় মেহরীনের। এভাবেই তাকিয়ে থাকে কতোক্ষন তা নিজেও জানে না।
এরমধ্যেই তালহা কিছুটা নড়েচড়ে উঠতেই তার ধ্যান কাটে, সে ভড়কে ওঠে। তালহা ঘুমঘুম চোখ জোড়া মেলতেই মেহরীনের আতঙ্কে ভরা চোখে চোখ পড়ে। ভ্রু কুচকে কয়েক সেকেন্ড ধরে বোঝার চেষ্টা করে বিষয়টা। মেহরীন তার বুকে লেপ্টে থাকা বিষয়টি বুঝতেই হকচকিয়ে উঠে বসে। মেহরীনও ছিটকে দূরে সরে যায়। শাড়ির আঁচল ঝটপট ঠিক করে নেয়।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
তালহা চোখ বন্ধ করে বসে আছে। কপালে দু’আঙুল দিয়ে হালকা স্লাইড করছে। কপালের রগ হালকা ফুলে আছে, হয়তো রেগে গেছে কিছুতে। মেহরীন ভাবছে, তার উপর রেগে গেছে নাকি। সেই ভেবে কাচুমাচু হয়ে বসে আছে। এদিকে তালহা কয়েকটি গভীর শ্বাস ফেলে নিজেকে স্বাভাবিক করে নেয়। মেহরীনের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই তাকে এভাবে অস্থির হয়ে বসে থাকতে দেখে নিজের ওপর রাগ আরও তিরতিরিয়ে বেড়ে ওঠে।
-“আম সো সরি।”
বলেই সে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। মেহরীন কিছু বলছে না, এখনো মাথা নিচু করেই আছে। সে তো লজ্জা পেয়ে বসে আছে। তবে তার আচরণে তালহা বুঝছে উল্টো। সে ভাবছে হয়তো তালহার কাজে মেয়েটি এমন করছে।
-“তোমার কি খারাপ লাগছে? আমি ইচ্ছে করে তোমাকে কাছে আনিনি ঘুমের মধ্যে, হয়তো ভুলবশত… তবে গড প্রমিস, আমি আর কিছু করিনি। আমার খারাপ কোনো উদ্দেশ্য ছিলোনা।”
বলেই দ্রুত পায়ে বাথরুমে চলে যায় তালহা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দশবার-বারোবার কি তারও বেশি পানির ঝাপটা মেরেছে চোখে-মুখে,
-“ধ্যাত, কেনো যে ওর কথায় বিছানায় ঘুমাতে গেলি। এখন কি মেয়েটা খারাপ ভাবছে, কি না কি মনে করবে। উফফ, তালহা, এতো ইডিয়েট তো না তুই!”
প্রায় আধাঘন্টা পর বাথরুম থেকে বের হয়। রুমে আসতেই মেহরীনকে আশেপাশে না দেখে কপাল কুচকে আসে। কোথায় গেলো মেয়েটি ভাবতে ভাবতে রুম থেকে বের হয়। ড্রয়িং রুমেও না পেয়ে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। হালকা আওয়াজে ডাকে,
-“মেহরীন কোথায় তুমি।”
সাথে সাথেই উত্তর আসে,
-“জ্বী আমি এখানে..”
গলার স্বর অনুসরণ করে তাকাতেই মেহরীনকে দেখতে পায়। রান্নাঘর থেকে বের হচ্ছে, শাড়ি এখনো খুলেনি, কোমরের এক পাশে গুঁজে রেখেছে। হয়তো কাজ করছিলো, কেমন যেন পাক্কা গিন্নি-গিন্নি লাগছে। তালহার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
-“জ্বী, বলুন।”
মেহরীনকে উপরে থেকে নিচ পর্যন্ত আরেকবার পরখ করে বলল,
-“এখনও কাপড় চেঞ্জ করোনি যে, যাবেনা বাসায়?”
মেহরীন ছটফট গলায় উত্তর দিলো,
-“দাদি বললো নাস্তা করে যেতে। একা একা বানাচ্ছিলো, তাই একটু হেল্প করছি। নাস্তা বানানো হলেই চেঞ্জ করে নিবো।”
তালহা কিছু না বলে মাথা নাড়ে। মেহরীন ফের চলে যায় রান্নাঘরে। প্রায় ঘণ্টা খানেক পর খাওয়া দাওয়া শেষ হলে, তালহারা ঢাকার উদ্দেশ্যে বের হতে গেলে বৃদ্ধ লোকটা তাদের আটকে দেয়। বৃদ্ধ মহিলা হন্তদন্ত পায়ে তাদের ঘরে যায়। কিছু সময়ের ব্যবধানে ফিরেও আসে দুইটি প্যাকেট নিয়ে। দুজনের হাতে ধরিয়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তালহা জিজ্ঞেস করে,
-“এগুলো কি?”
বৃদ্ধ মহিলা হেসে মেহরীনের মুখে হাত বুলিয়ে বলেন,
-“এই দুই বুড়ো-বুড়ির পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য সামান্য উপহার।”
-“কি বলেন দাদি, এসবের দরকার নেই। তাছাড়া আমরা আসার সময় হাতে করে কিছু আনতেও পারিনি। উল্টো আপনাদের ঘরে উড়ে এসে জুড়ে বসেছি। আমাদের যে আশ্রয় দিয়েছেন, এতেই কৃতজ্ঞ থাকবো।”
-“কি যে বলো না! এই বুড়ো-বুড়ির একার সংসারে তোমরা এসে কিছু মুহূর্তের জন্য হলেও যে আনন্দ দিয়ে গেলে। কতো বছর ধরে এই বাড়িতে মানুষের আনাগোনা নেই। ছেলে-বউ, নাতি-নাতনি সব বিদেশে। কতো বছর ধরে তাদের মুখ দেখিনি। তোমরা এসে আমাদের সঙ্গে দুটো কথা বলেছো, একটা রাত থেকেছো। আমরা যে কতোটুকু খুশি হয়েছি, বলে বোঝাতে পারবো না। এগুলো নিতে না করো, ভালোবেসে দিয়েছি, অনেক খুশি হবো গ্রহণ করলে। তোমার দাদা ভোর সকালে ওই দূরের বাজার থেকে গিয়ে কিনে এনেছেন।”
মেহরীন তার কাঁধে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরে হেসে বলল,
-“অবশ্যই নিবো।”
তালহাও আলতো হেসে প্যাকেটটি হাতে নেয়। তারপর পকেট থেকে তার অফিসের কার্ড বের করে তাদের হাতে দেয়,
-“কোনো দরকার পড়লে নির্দ্বিধায় কল করবেন। আপনাদের এই নাতিকে অবশ্যই স্বরণ করবেন।”
তারা হাসি মুখে বিদায় নেয়। সেদিনের পর কেটে যায় আরও এক সপ্তাহ। এই এক সপ্তাহে মেহরীনের বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করেছে তালহা, তবে কিছু বলেনা ছোট্ট মনে কষ্ট পাবে বলে। ভাবনার মাঝেই দরজায় টোকা পড়ে। সে জানে কে এসেছে।
-“কাম…”
বলতেই মেহরীন কফি হাতে ঢুকে পড়ে তালহার ঘরে। ডিরেক্ট তার সামনে গিয়ে থামে। হাত বাড়িয়ে খুশিমনে কফিটা বাড়িয়ে দেয় তালহার দিকে। তালহা কোনো ভনিতা ছাড়াই হাতে নিয়ে চুমুক দেয়। এই কদিনে এগুলো মেহরীনের নিত্যদিনের কাজ হয়ে উঠেছে। আগে যে মেয়েটা তালহার আশেপাশে ঘেঁষতেও দ্বিধাবোধ করতো, সে এখন নির্দ্বিধায় চারপাশে ঘুরঘুর করে। অবশ্য এর জন্য তালহা নিজেকেই দায়ী করে। মেয়েটা তার প্রতি দূর্বল জেনেও সে কিছু বলতে পারেনা তার খারাপ লাগবে বলে।
মেহরীনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তালহা জিজ্ঞেস করে,
-“কিছু বলবে?”
মেহরীন আমতা আমতা বলে,
-“আমাকে একটু মার্কেটে নিয়ে যাবেন?”
-“কেনো, কিছু লাগবে?”
-“না, মানে বেশি কিছু না। একটা সাদা হিজাব কিনে দিলেই হবে। কাল থেকে তো কলেজের ক্লাস শুরু হবে, হিজাব ছাড়া অভ্যস্ত নয়…”
-“নিয়ে আসবো।”
মেহরীন ছোট ছোট চোখ করে তাকায়,
-“আপনি কিনবেন?”
-“হু, আম্মু তাহিয়ার জন্য অনেকবারই কিনেছি। সমস্যা নেই, নিয়ে আসবো।”
মেহরীন মাথা নেড়ে চলে যায়। কাল থেকে তার আর তাহিয়ার কলেজের প্রথম ক্লাস। দুজনেই এক্সাইটেড, ব্যাগ থেকে ধরে সব একই । তাহিয়ার জন্য যা নিয়েছে, তা একটা বেশি করে মেহরীনের জন্যও নিয়েছে তালহা।
রান্নাঘরে এসে তিতলি বেগমের সঙ্গে হাতে মিলিয়ে কাজ করতে লাগে। তিনি মুচকি হাসেন, মেয়েটা বড্ড মনখোলা। সে কতবারই না করে, তবুও শোনেনা।
-“বলছি মেয়ে, আজকেই আপনার রান্নাঘরের শেষ দিন। কাল থেকে পড়ার টেবিল, খাবার টেবিল আর বিছানা,মাথায় রাখবেন।”
-“ওকে ম্যাডাম।”
বলেই মেহরীন হেসে চায়ের কাপ হাতে সোফার রুমে চলে যায়। বিল্লাল সাহেব আর আফতাব সাহেব চায়ের কাপ হাতে নিয়ে তাদের পাশে বসতে বলেন তাকে।
-“কাল থেকে তোমার কলেজের প্রথম ক্লাস, অনুভূতি কেমন?”
মেহরীন মাথা ঝাকিয়ে বলল,
-“অনেক ভালো।”
-“শোনো, তাহিয়া যেমন আমাদের মেয়ে, তুমিও আমাদের মেয়ে। তাহিয়া থেকে আমরা যা আশা রাখি, তোমার থেকেও তা আশা রাখছি। পড়ালেখায় কোনো গাফিলতি একদমই চলবে না। পড়ার সময় পড়ো, এরপর যা খুশি করবে।”
কথা মনোযোগসহ শুনছিল মেহরীন। কথার মাঝে তালহার গম্ভীর গলায় মাথা তুলে পাশে তাকায়,
-“চিন্তা করোনা মেঝো আব্বু, আমি তো আছি। পড়াশোনায় ফাঁকি কে দেয়, দেখবো।”
তাহিয়া উপর দৌড়ে নামে, আফতাব সাহেবের পাশে বসতে বসতে বলে,
-“দেখোনা ছোট আব্বু, ভাইয়াকে বলছি, আমাদের জন্য টিচার রাখলেই হবে। হুদাই অফিস থেকে কষ্ট করে এসে আবার বাসায়…”
-“আপনাকে এতো পণ্ডিতি করতে হবে না। আমার বোনকে আমি পড়াবো, অন্যসব টিচারের উপর ভরসা নেই।”
তাদের ভাই বোনের খুনসুটি দেখে আফতাব সাহেব তাহিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
-“তোর ভাই যখন একথা বলেছে, আমাদের আর কিছু বলার সাধ্যি নেই। বাড়ির কর্তা মশাইয়ের মুখের উপর কথা বলার সাহস আমাদের নেই বাবা…”
তার নাটকীয় ভঙ্গিমায় বলা কথায় তালহা সহ সবাই হেসে ওঠে। সায়রা বেগম চোখ জুড়িয়ে দেখছে ছেলে নাতি-নাতনিদের হাসি, চোখের কোনে হালকা পানি জমে তার স্বামী আর বড় ছেলেটা থাকলে হয়তো আরও পরিপূর্ণ হতো এ আড্ডা। অন্যদিকে মেহরীন খুশিমনে অনুভব করছে প্রতিটা বন্ধন, এ বন্ধন শুধুই পারিবারিক নয়, গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ বন্ধনও বটে।
সেদিন সারাদিন কেটে যায় তালহার অপেক্ষায়। তালহা নিজ হাতে তার জন্য কিছু কিনে আনবে, এ নিয়ে তার খুশির সীমা নেই।
রাত ৯টা বাজে,
মেহরীন বারান্দায় দাঁড়িয়ে তালহার অপেক্ষায়। তাহিয়া তার এসব পাগলামি দেখে বেশ মজা উড়ায়,
-“বাপরে, আমার ভাইকে বিয়ে না করেই চোখে হারাচ্ছিস। বিয়ে করলে কি যে করবি ভাবছি, গেটের সামনে গিয়ে মেভি দাঁড়িয়ে থাকবি।”
মেহরীনের মুখে গাঢ় হাসি ফুটে উঠে, মনে মনে ভাবছে,
-“বিয়ে করা জামাই তো লাগেই। শুধু বিয়ে করা নয়, একেবারে সিল মারা, তার বুকে…।”
কথাটা ভাবতেই সেই সকালে কথা মনে পড়ে। তালহার বুকে নিজেকে আবিষ্কার করেছিলো, ভাবতেই লজ্জায় গাল লাল হয়ে ওঠে। মেহরীনকে লজ্জা পেতে দেখে, তাহিয়া গুতা মেরে বলে,
-“ভাই আমার জাদুকর নাম নিতেই লজ্জায় লাল-নীল হয়ে যায় কেউ কেউ।”
-“তুই চুপ করবি, খালি আজাইরা কথা বলিস। আমি কোনো লজ্জা পাচ্ছি না।”
-“হু হু উচিত কথা আজাইরাই হয়..”
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৯
তাদের কথার মাঝেই, তালহার গাড়ি এসে ঢুকে গেট দিয়ে। মেহরীন তালহাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে আর দাঁড়ায় না, বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। দ্রুত পায়ে নিচে নামতে গিয়ে বাধে বিপত্তি। হঠাৎ হন্তদন্ত পায়ে এগিয়ে আসা কারো সাথে ধাক্কা লাগে। পড়ে যেতে যেতে সামনের লোকটি তার হাত ধরে এক টানে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দেয়। ভয়ে বুকে থু থু দিয়ে সামনের লোকটি কে দেখতে যেয়েও চোখ যায় দরজায়, চোখ-মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকা তালহার দিকে। হাত মুঠো করে তার দিকে তাকিয়েই দাঁড়িয়ে আছে…
