প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৫
সাইদা মুন
সকাল নয়টা বাজে। সকালের আলো এখন ঘরের ভেতর নরম উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে রেখেছে। সবাই নাস্তার টেবিলে বসে আছে। কেউ কেউ ঘুম জড়ানো চোখে খাচ্ছে, কেউ কেউ টুকটাক কথার মাঝে খাচ্ছে। খাওয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে। টেবিলে তালহার ঠিক পাশে মেহরীন বসেছে, আর মেহরীনের ডানদিকে তাহিয়া। তাদের মুখোমুখি বসেছে তাহসান, পাশে ফারাহ।
ফারাহর খাওয়া যেন অজুহাতমাত্র। চামচ নেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু চোখ বারবার আটকে যাচ্ছে তালহা আর মেহরীনের দিকে। তালহা আজ প্রকাশ্যেই মেহরীনের পাতে এটা-সেটা তুলে দিচ্ছে। কখনো পরোটা, কখনো সবজি, কখনো মাংসের টুকরো। লুকোচুরির খেলা শেষ। এখন সবাই জানে, সবাই অবগত তাদের হালাল সম্পর্ক সম্পর্কে। তাই তো তার যত্নেও আর কোনো গোপনীয়তা নেই।
দাদি-নানি তো নাতিকে নিয়ে রীতিমতো মশকরা করছেন। “এই যে, বউ আসতে না আসতেই এমন যত্ন কই আমাদের তো কোনোদিন পাতে কিছু তুলে দিলে না?” এমন নানান কথায় চারদিক হালকা হাসিতে ভরে উঠছে। ভাই-বোনেরাও মজা নিচ্ছে তাদের সঙ্গে। তবে তাহসান একদম নীরব মাথা তুলে তাকাচ্ছেও না। একমনে খেয়ে যাচ্ছে।
মেহরীনের গাল লাল হয়ে উঠেছে লজ্জায়, মাথা নিচু করে রেখেছে সে। কিন্তু তালহার ভঙ্গিমায় কোনো পরিবর্তন নেই। যেন এ সবই স্বাভাবিক, উল্টো নির্লজ্জের মতো তাদের কথায় কথায় উত্তর দিচ্ছে।
মেহরীন পরোটার শেষ টুকরোটা মুখে পুরতেই তার প্লেটে আরেকটা পরোটা এসে পড়ল। এবার সে আর শান্ত থাকতে পারল না। রাগী চোখে তাকাল তালহার দিকে। এই নিয়ে দুটো পরোটা খেয়েছে, তাও তালহার জোরাজুরিতে, বহু কষ্টে। আর খাওয়া সম্ভব না। ছেলেটা তাকে পেয়েছে কি? ভাবতে ভাবতেই চোখ গরম করে ফিসফিসিয়ে বলল,
—আচ্ছা, আমি কি রাক্ষস?
তালহা ফিরে তাকাল না। তবে আন্দাজ করতে পারছে তার বউ রেগে আছে। সেসবে তোয়াক্কা না করেই সে নিজের মতো খেতে খেতেই শান্ত গলায় বলল,
—না, তুমি আমার বউ।
মেহরীন ফুস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। এই মানুষটার সঙ্গে ঝগড়া করাই দায়। কিছু বললেই এমন উত্তর দেয় যে, পরের কথা মাথায় আসে না। কি বলবে পরবর্তীতে ভেবে পায় না। তালহা আড়চোখে একবার তাকিয়ে দেখে নিল। মৃদু হাসল মেয়েটার মুখভঙ্গি দেখে। তারপর মেহরীনের পরোটা অর্ধেকটা ছিঁড়ে নিজের পাতে তুলে নিল। বাকিটার দিক ইশারা করে গম্ভীর সুরে বলল,
—এটা যেন শেষ করে উঠতে দেখি।
মেহরীন অসহায় মুখ করে ধীরে ধীরে খেতে লাগল। জানে তাকে কিছু বললেও লাভ হবে না, খাইয়েই ছাড়বে। তালহাও নিরবে খাচ্ছে। মাঝেমধ্যে চাচাদের সঙ্গে অফিসের টুকটাক বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে। আজ তাদের গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং আছে। যা নিয়ে বেশ উত্তেজিত দেখাচ্ছে তিনজনকেই।
ফারাহ নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে, চোখে যেন ঘন কালো ছায়া। তালহার যত্ন, মেহরীনের পাওয়া লজ্জা, বাকিদের কথা ফাইজলামি, সবই সে দেখছে গভীরভাবে। এসব তো তার সঙ্গে হওয়ার কথা ছিল। চোখ বেয়ে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়তেই সঙ্গে সঙ্গে মুছে নিল। মাথা নিচু করে নিল সে। ছোট থেকে কম স্বপ্ন বুনেনি এই তালহাকে নিয়ে। সব যে এভাবে স্বপ্নই রয়ে যাবে তা কি জানত? এখন তো অন্য কাউকে নিয়ে ভাবতে গেলেও তালহার চেহারাই সামনে আসবে। কিভাবে সামলাবে নিজের মনকে সে? ভীষণ অসহায়ত্ববোধ করছে মেয়েটা। তাহসান ইতোমধ্যে কোনোরকমে খাওয়া শেষ করে উঠে চলে গেছে।
খাওয়া প্রায় অনেকেরই শেষ, ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসেছে তারা। টেবিলে বসে আছে নানি, দাদি, মা, চাচিরা, সঙ্গে মেহরীন ক। গল্প চলছে হালকা সুরে। হঠাৎ তালহার নানি মুচকি হেসে বললেন,
—তা নাতি-বউ তো পেয়ে গেলাম, এখন নাতি-বউয়ের হাতের রান্না খাওয়ার ভাগ্য কবে হবে?
কথাটা শুনতেই মেহরীন ঠোঁট সামান্য উল্টে তিতলি বেগমের দিকে তাকাল। আফসোসের সুরে নিচু স্বরে বলল,
—আন্টিই তো করতে দেয় না কিছু। যদি পার্মিশন..
বাকিটা আর বলা হলো না। তিতলি বেগম কপাল কুঁচকে তাকালেন। কথার মাঝেই থামিয়ে দিয়ে একটু রাগী গলায় বললেন,
—এই, আমি তোর আন্টি হই?
মুহূর্তে মেহরীন থতমত খেয়ে গেল। উনার কণ্ঠের ঝাঁজে ভরকে উঠল বেচারি। কিছু ভুল বলে ফেলল কিনা তাই নিয়ে দ্বিধায় পড়ল। তাড়াতাড়ি মিনমিনিয়ে নিজের ভুল শুধরে বলল,
—না মানে, খালামনি।
এতে যেন তিতলি বেগমের চেহারার রাগী ভাব কিছুটা কমলেও অল্প রয়েই গেছে। কড়া চোখে চেয়ে বললেন,
—শুধু খালামনি?
মেহরীন আমতাআমতা করতে লাগল। তিতলি বেগম নিজে থেকেই বললেন,
—আমি তোর শাশুড়ি হই। এরপর থেকে যেন আন্টি না, আম্মু ডাক শুনতে পাই।
মেহরীন চমকে তাকাল। বিস্ময়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। হাতের পানির গ্লাসটা উঠিয়েছিল খাওয়ার জন্য, মাঝপথে তা আটকে রইল। তিতলি বেগম মাত্র কী বললেন তাই সে বারবার মনে আওড়াতে লাগল। তাকে আম্মু বলতে বললেন? অবাক হয়ে, প্রায় আনমনেই প্রশ্ন করল,
—আম্মু ডাকব?
তিতলি বেগমের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল,
—হ্যাঁ।
মেহরীন যেন আরও চমকাল। মনে হলো সময়টা আচমকা একটু থেমে দাঁড়িয়েছে তার সামনে। বুকের ভেতর ঝড় শুরু হয়েছে, অচেনা, অথচ গভীর এক আলোড়ন। শ্বাসগুলো এলোমেলো, হাতের আঙুল কাঁপছে অকারণে। তিতলি বেগমের চোখের দিকে তাকাতেই সে যেন খুঁজে পেল এক নিরাপদ আশ্রয়ের ছায়া। যেন মেহরীনের বহুদিন ধরে খূঁজতে থাকা নিরাপত্তারা সেখানে নীরবে বসে আছে। এটাই তার খূঁজতে থাকা সেই আশ্রয়স্থান। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে খুব ক্ষীণ স্বরে ডেকে উঠল,
—আম্মু…
শব্দটা বেরোতেই বুকের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতার ওপর দিয়ে যেন এক শান্ত, মোলায়েম বাতাস বয়ে গেল। দীর্ঘ খরার পর প্রথম বৃষ্টির ফোঁটার মতো। বুকে শান্তিময় এক হাওয়া বিচরণ করছে। মাত্র দুটি অক্ষর, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এত বিশাল অনুভব। মেহরীন নিজেই চমকে উঠল। এতটা প্রশান্তি? শুধু একটা ডাকে? আবারও ধীরে, আরও মোলায়েম কন্ঠে টেনে উচ্চারণ করল,
—আ..ম্মু..
এইবার অনুভূতিটা আরও স্পষ্ট হলো। বুকের ভেতরের ঝড় থেমে গিয়ে জায়গা করে দিল উষ্ণ এক শান্তির। মনে হলো এই শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সবটুকু মমতা। এতদিন সে কি তবে এই মূল্যবান অনুভূতিটা অনুভব করা থেকে বঞ্চিত ছিল? তার মা তাকে এত সুন্দর ডাক থেকে বঞ্চিত করে চলে গেল? হঠাৎ নিজের মায়ের কথা মনে পড়তেই বুকের কোথাও জমে থাকা অভিমানটা মাথা চাড়া দিল। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল অজান্তেই। তার মা বেঁচে থাকলে হয়তো সে এই নিরাপদ পরম শান্তিটা আরও আগেই অনুভব করতে পারত। তিতলি বেগম বিচলিত হয়ে উঠলেন। এগিয়ে এসে গালে হাত রাখলেন,
—কি হয়েছে? কাঁদছিস কেন? আমার কথায় খারাপ লেগেছে? আচ্ছা, ডাকতে হবে না আম্মু, তোর যা খুশি তাই ডাকিস।
মেহরীন ছলছলে চোখে তাকিয়ে আচমকা তার কোমর জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ গুঁজে দিল। ফুপিয়ে উঠল। তিতলি বেগম মাথায় হাত বুলিয়ে বুঝলেন, মেয়েটার মায়ের কথা মনে পড়েছে। নিজের বোনের মুখটাও যেন ভেসে উঠল চোখের সামনে। বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল তারও। সামনে তাকিয়ে দেখলেন, তার মা আচল দিয়ে চুপিচুপি চোখ মুছছেন। এখন ভেঙে পড়লে চলবে না। যা নেওয়ার তা তো আল্লাহ নিয়েই গেছেন। নিজেকে শক্ত করে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেসে বললেন,
—আরে পাগলি মেয়ে, কাঁদছিস কেন? দেখ, তোর নানি-শাশুড়ি কিন্তু তোর হাতের রান্না খেতে চেয়েছে। যা, সকলের জন্য চা বানিয়ে নিয়ে আয় তো।
চা বানাচ্ছে মেহরীন। তবে মন এখনও তিতলি বেগমের কথাতেই পড়ে আছে। ভেতরে কোথাও এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছে। যেন সে তার জীবনে আরও একটা বড় জিনিস পেয়ে গেছে। মনে মনে কতশত বার যে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছে। কথায় আছে ধৈর্যের ফল মিষ্টি হয়। মেহরীনের জীবনেও সেটাই ঘটেছে, এত অবহেলা, অনাদর পাওয়া মেয়েটা মনের কোনে দৃঢ় এক প্রতিজ্ঞা নিয়ে ছিল। আশা নিয়ে ছিল একদিন সে সুখের মুখ দেখবে, অনেক বড় হবে। আর ধীরে ধীরে তাই ঘটছে।
চা বানানো হতেই একে একে সবার হাতে চা দিয়ে আবার রান্নাঘরে গেল তালহার জন্য কফি বানাতে। লোকটা চা তেমন খায় না, তাই আলাদা করে কফি বানাচ্ছে। ড্রয়িংরুমে বসে ভাইবোনেরা কী যেন আলোচনা করছে। হাসি-ঠাট্টা মিলিয়ে চলছে কথা টুকটাক আওয়াজ আসছে রান্নাঘরে। কফি বানিয়েই কফি-মগ হাতে এগিয়ে গেল সেদিকে। রিতু তালহাকে কিছু বলছিল, সেখানে ফারাহ, মেহেদি, রাফা, ফারিহা, তাহিয়া, সবাই আছে। বড়রা যার যার রুমে চলে গেছেন নাস্তা করেই।
মেহরীন সকলের মাঝে উপস্থিত হতেই হঠাৎ কথার স্রোত থেমে গেল। নেমে এল এক অস্বস্তিকর নীরবতা। রিতু আচমকা চুপ হয়ে গেল। যেন মেহরীনকে দেখে চুপ হয়েছে। অস্বস্তিতে মেহরীন একবার তার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে তালহার দিকে এগোল। তালহা কফির মগ হাতে নিয়ে ইশারায় পাশে বসতে বলল। সে ইতস্তত করে বসতেই তালহা এক চুমুক দিয়ে বলল,
—থামলি কেন? কী ইম্পর্ট্যান্ট কথা বলবি বলছিলি, বল।
রিতু আড়চোখে মেহরীনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—ওর সামনে বলতে পারব না। এটা পার্সোনাল কথা।
মেহরীন দ্রুত তাকাল। বিস্ময় চোখে। এখানে সকলেই আছে প্রায়। বাকিদের সামনে বলা যাবে, শুধু তার সামনে নয়? সকলের দৃষ্টি এবার তার ওপর এল। তালহাও কপাল কুঁচকে আছে। মুহূর্তটা তীব্র অস্বস্তির লাগল তার কাছে।
অপমানিতবোধ হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে বলল,
—আচ্ছা, আপনারা কথা বলুন। আমার রুমে কাজ আছে।
বলে মাথা নিচু করে সে জায়গা প্রস্থান করে যেতে লাগল। কয়েক কদম এগোতেই পাশে আরেক জোড়া পা দেখতেউ কপাল কুঁচকে চোখ তুলে তাকাল। এটা তালহা। সময় কোথায় যাচ্ছে? কথাটা জিজ্ঞেস করতে যাবে, তার আগেই পেছন থেকে রিতুর গলা এল,
—ভাইয়া, তুমি কোথায় যাচ্ছ? আমার কথা আছে!
তালহা থামল এবার ঘুরে দাঁড়াল। শান্ত ও স্পষ্ট কন্ঠে বলল,
—আমার স্ত্রীর সামনে যেটা বলা যাবে না, আমি মনে করি আমার সামনেও তা বলা যাবেনা। আমার কানে আসলে ঘুরে ফিরে আমার স্ত্রীর কানে যাবেই, কারণ আমাদের মধ্যে পার্সনাল বলতে ওয়ার্ড নেই। তাই তোর প্রাইভেসি মেইনটেইন করতেই।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এল। রিতু থমকে গেল এমন শান্ত এক অপমানে। থমথমে মুখে তাকিয়ে আছে। মেহরীন তালহার মুখপানেই চেয়ে আছে। মুখে সুক্ষ্ম এক হাসির রেখা ফুটেছে। তবে তা স্পষ্ট করতে চাচ্ছে না, রিতুর জন্য অপমানজনক হবে এই ভেবে। রিতু আর কিছু বলতে পারল না, কোনোরকমে কথা হজম করে শক্ত চোখমুখ নিয়ে বসে আছে। তালহা ধীরে আগ বাড়াল, মেহরীনের পাশে এসে দাঁড়াল। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
—চলো।
তালহা এগোতে এগোতেই দৃঢ় স্বরে সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
—মেহরীন এ বাড়ির বউ। আমি যে যে বিষয়ে জড়িত থাকব, আমার বউয়েরও সেই সব বিষয়ে সমানভাবে জড়িত থাকার অধিকার আছে। তোর ভাবির সামনে বলতে পারলে রুমে চলে আসিস, সেখানেই শুনব।
কথাগুলো ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু প্রতিটি শব্দ যেন বেশ ওজন নিয়ে বাজছিল হচ্ছিল মেহরীনের কানে। তার এই কথাগুলোয় আপোষের কোনো জায়গা নেই, শুধুই ঘোষণা। সে তার স্ত্রীর জায়গাটা সকলের চোখে আঙুল দিয়ে যেন দেখিয়ে দিল। মেহরীনের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি স্পষ্ট হলো। সে মুখ নিচু করল, ঠোঁট কামড়ে হাসল। এই তো, এটাই সে চেয়েছিল। পাশে দাঁড়ানোর মতো একজন মানুষ। পেয়ে গেছে সে। ইচ্ছে করছে সকলের মাঝে চিল্লিয়ে বলতে “আমি পেয়ে গেছি আমার মানুষ। ”
রিতু এবার কিছুটা রেগে পেছন থেকে ডেকে উঠল,
—ভাইয়ায়ায়া!
তালহা থামল না। পেছন ফিরেও তাকাল না। কেবল বলল,
—কথা বুঝলে রুমে চলে আসিস।
ড্রয়িংরুমের বাতাস ভারী। ফারাহ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে তাদের যাওয়ার পানে। মুখে স্পষ্ট অসন্তোষের ছাপ। নিজের রাগ আর চেপে রাখতে পারল না। বিরক্তির কন্ঠে ঝাঁজ নিয়ে বলল,
—ভাইয়া, বেশি বউ-বউ করছ না? এমন আচরণ তোমার পার্সোনালিটির সঙ্গে যায় না।
অর্ধেক সিঁড়ি উঠে পড়েছে তারা। ফারাহর কথায় মেহরোনের পায়ের গতি ধীর হয়ে এসে একসময় থেমে গেল। তালহাও থামল। ধীরে ঘাড় ঘুরে তাকাল। চোখে স্থির দৃষ্টি। মৃদু স্বরে বলল,
—তো..?
শব্দটা যেন তার কথাকে অবহেলা করে বলা হলো। ফারাহর মুখ কঠোর হয়ে উঠল। রাগী চোখে একবার তাকালো মেহরীনের দিকে। চোখ ফিরিয়ে শক্ত গলায় বলল,
—তোমার কি মনে হয় না, এসব তোমার ইমেজে ইফেক্ট ফেলছে?
তালহা হালকা হেসে বলল,
—যদি বউয়ের প্রতি সম্মান দেখানোকে মানুষ বউ-পাগল বলে, তবে সেই পাগল উপাধিই সই।
একটা কথাও তালহা গায়ে মাখছে না দেখে ফারাহর আরও অসহ্য লাগল। ফারাহ দাঁত চেপে বলল,
—এটা উপাধি না, বদনাম।
তালহা এবার এক ঝলক তাকাল মেহরীনের দিকে। সেই দৃষ্টিতে ছিল দুষ্টুমি, আশ্বাস, আর একরাশ গর্ব। ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
—যার জন্য মাঝরাতে নিজের নামে বদনামি সহ্য করতে পেরেছি, তার জন্য আরেকটু বদনাম হলে মন্দ কী..?
কথা শেষ করেই সে পা বাড়াল। মেহরীনও তার পাশাপাশি হাঁটা শুরু করল। দু’জন পাশাপাশি উঠতে লাগল ধীরে ধীরে। মেহরীনের মুখে এক অনির্বচনীয় হাসি, যেন বিশ্বজয়ের উল্লাস। একটু বেশি খুশি খুশি লাগছে। ইচ্ছে করছে তালহার হাতটা ধরে ধেইধেই করে নেচে নেচে হেঁটে হেঁটে যেতে। তবে এই মুহুর্তে তা অসম্ভব। তাই নিজের এই ইচ্ছে দমিয়ে রেখেছে। পেছন থেকে হঠাৎ মেহেদি শিস বাজিয়ে উঠল। তাহিয়াও হাততালি দিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল,
—ওওও কিয়া বাত হে ভাই! ফাটাই দিছো!
ঘরের ভারী আবহাওয়াটা মুহূর্তেই হালকা হয়ে গেল। হাসির ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।
তালহা সবে মাত্র গোসল শেষে বের হয়েছে। ভিজে চুল থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি ধীরে ধীরে কপাল বেয়ে ঘাড়ে হয়ে বুকে নামছে। গায়ে শুধু কালো প্যান্ট, কাঁধে তোয়ালে ঝুলছে। মেহরীন শার্ট আয়রন করছে। হঠাৎই তালহা মেহরীনের সামনে এসে ঝুকে দাঁড়াল। তার উপস্থিতি টের পেয়ে মেহরীন কাপড় থেকে ইস্ত্রি মেশিনটি তুলে তালহার দিকে তাকাতেই সে ভেজা চুল ঝারতে শুরু করল। চুলের পানি মেহরীনের চোখে-মুখে ছিটকে পড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে মেহরীন চোখ বন্ধ করে এক হাত মুখের সামনে তুলল।
—আরে, কি করছেন?
তালহা কিছু বলল না, শুধু হাসল। চুল মুছতে মুছতে আয়নার সামনে গিয়ে মুখে একটু নিভিয়া সফট ক্রিম মেখে ভেজা চুল আচড়াতে লাগল। মেহরীন ইস্ত্রি করা শেষ করে লাইন বন্ধ করে তা জায়গায় রেখে শার্টটি হাতে নিয়ে এগিয়ে গেল। তালহার দিকে শার্টটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
—নিচে অভাবে কথা না বললেও পারতেন। আমি তো হুট করে এসেছি এই পরিবারে, সকলের মানিয়ে নিতে একটু সময় তো লাগবেই।
তালহা শার্টটি গায়ে দিতে দিতে হেসে বলল,
—আমি যদি শুরুতেই ছাড় দিয়ে বসি, তাহলে দেখা যাবে সবাই মাথায় চড়ে বসবে।
মেহরীন তার হাত থামিয়ে নিজে শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলল,
—মানে?
শান্ত কন্ঠে তালহা বলল,
—আমি যদি তোমার অসম্মান মুখ বুজে সহ্য করি, তাহলে আজ একজন করেছে, কাল আরেকজন করতেও একবার ভাববে না। স্ত্রীর সম্মান অনেকটাই স্বামীর হাতে থাকে। একটা ছেলে যদি সকলের সামনে নিজের স্ত্রীর সম্মান রাখে, তার মর্যাদাকে নিজের মর্যাদা মনে করে, তার হয়ে দাঁড়ায়। তখন অন্য কেউও সাহস পায় না তাকে ফাইজলামি করেও হেয় করার। আমি চাই না, আমার বউকে কেউ ফাজলামোর সুরেও অসম্মান করুক। যতদিন আমি বেঁচে থাকব সম্মানে রাখব।
মেহরীন শেষ বোতামটা লাগিয়ে এগিয়ে গিয়ে কোটটি আনল। গালে মুঁচকি হাসি। কোটটি নিজ হাতে পড়াতে পড়াতে তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
—এমন চিন্তা কজনই করে? এখনকার বেশিরভাগ পুরুষই বউকে মানুষের সামনে যত ছোট দেখাতে পারে, তত নিজেকে বড় মনে করে। আমাদের গ্রামে বউদের সম্মান তো করেই না, পায়ের নিচে রাখলেই যেন সকলে তাকে বাদশাহ বলে।
তালহা মেহরীনের মুখ দুহাতের আজলায় ধরে নাক দিয়ে নাক ঘেঁষে বলল,
—তারা পুরুষ নয়, কাপুরুষের কাতারে পড়ে।
পরপর কপালে চুমু দিয়ে ছাড়ল তাকে। হাতে ঘড়ি পড়তে পড়তে বলল,
—দোয়া করবেন, ম্যাডাম। আজ অনেক ইম্পর্ট্যান্ট একটা মিটিং আছে।
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—চিন্তা করবেন না। আপনার পরিশ্রমের ফল অবশ্যই পাবেন।
ড্রয়ার থেকে কিছু ফাইল বের করে আরেকবার আয়নায় নিজেকে দেখল। মোবাইল ও মানিব্যাগ পকেটে ভরে বলল,
—যাচ্ছি। সাবধানে থাকবেন ম্যাডাম।
মেহরীন তার পিছু পিছু এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
—আপনিও সাবধানে যাবেন।
সিড়ির কাছে আসতেই তালহা নেমে গেল। মেহরীন ঠায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে সেদিকে। তালহাকে নামতে দেখে তার চাচারাও উঠে দাঁড়াল, কালো কোট শুটে একদম ফরমাল গেটাপে তারাও। তিনজনই বের হয়ে গেল। মেহরীন এবার সোজা রুমের দিকে ছুটল। বারান্দায় আসতেই চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তালহাকে দেখল, যেন তার জন্যই অপেক্ষা করছিল। মেহরীনকে দেখতেই তালহার মুখে বাঁকা হাসি ফুটল। সঙ্গে সঙ্গে হাত উঁচিয়ে ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিল দুতলার বারান্দায়। মেহরীন মুচকি হেসে মুঠো বানিয়ে যেন তা মুঠোবন্দি করে নিল। সাথে সাথে অন্য হাত বন্দুকের মতো করে তাক করে শুট করল মুঠিবদ্ধ হাতে। তা দেখে তালহা বুকে হাত দিয়ে চোখ-মুখ কুচকে নিল, মনে হল যেন সত্যি গিয়ে তার বুকে লেগেছে। মেহরীন খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। তালহাও হেসে হাতের ইশারায় বাই দিয়ে চলল নিজের গন্তব্যে। গেট পেরিয়ে বের হতে নিবে এমন সময় মেহরীনের মাথায় এক দুষ্টু বুদ্ধি এল। গলা বাড়িয়ে ডেকে উঠল,
—তালহা ভাইইইইই…
সঙ্গে সঙ্গে মেহরীন বারান্দার মেঝেতে বসে পড়ল, নিজেকে আড়াল করতে। যেন তালহা তাকে না দেখতে পায়। তালহা গেট থেকে বের হতে নিয়েও থেমে চোয়াল শক্ত করে সেদিকে তাকাল। মেহরীনকে দেখতে না পেয়ে আস্তে করে, “স্টুপিড” বলে উঠে বসল ড্রাইভিং সিটে।
গাড়ি চলে গেল দৃষ্টির বাইরে, তবুও মেহরীন চেয়ে আছে সেদিকেই। আচমকা কেউ পেছন থেকে কোমড় জড়িয়ে ধরতেই কাতুকুতু লাগাগ প্রায় লাফিয়ে উঠল। হঠাৎ স্পর্শে ভয় পেয়ে পেছন ফিরতেই দেখল,দাঁড়িয়ে আছে তাহিয়া।
বুকে থুতু দিতে দিতে কপট রাগে বলল,
—বেয়াদব, ভয় পাইয়ে দিয়েছিস! এভাবে কেউ আসে?
তাহিয়া মুখ ভেংচে বলল,
—ট্রেনিং দিচ্ছি। বিয়ের পর যখন ভাইয়ার রুমে থাকবি, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে মাঝে মধ্যেই ভাইয়া পেছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরবে। তাই ভয় যেন না পাস, সেই ট্রেনিং দিচ্ছি।
তাহিয়ার বাহুতে হালকা থাপ্পড় দিয়ে বলল,
—বেয়াদব মহিলা লজ্জা করে না, বড় ভাইয়ের বউকে এসব বলতে?
তাহিয়া পাল্টা জবাব দিল,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৪
—এই তোর লজ্জা নেই, জামাইকে ভাই ডাকিস।
তাহিয়ার কথায় পেছন ঘুরল। রেলিঙের উপর এক হাত রেখে রাস্তার দিকে চেয়ে মুঁচকি হেসে বলল,
—জামাইকে ভাই ডাকতে মজাই লাগছে….
