Home প্রেমের নীলকাব্য প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৮

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৮

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৮
নওরিন কবির তিশা

সবে কক্ষ প্রবেশ করেছে নীল। হস্ত-ললাট সবখানেই নব ব্যান্ডেজের ‌উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়। হয়তো বদলেছে; সামান্য জিনিস নিয়ে আর হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন হয়নি তার। এমন ঘটনা সচরাচর ঘটেই থাকে, তাই তাদের পারিবারিক ডাক্তারই এগুলোর চিকিৎসা করেন। নীলের প্রবেশমাত্র তিহু এগিয়ে এসে বলল,,
—’যন্ত্রণা কমেছে?
নীল জবাব দিলো না; নির্বিকার ভঙ্গিমায় প্রবেশ করলো ওয়াশরুমে।তিহু বুঝলো নেতা সাহেবের রাগের কারণ, এটাতো অস্বাভাবিক কিছু নয়! নীলের জায়গায় সে থাকলেও একই কাজটাই করত কেননা যাওয়ার আগে নীল বারংবার নিষেধ করেছিল তাকে।
পইপই করে নিষেধ করা সত্ত্বেও তিহু গিয়েছিল তাই উদ্বিগ্নতা দ্বিগুণ।ভাবাতুর দৃষ্টিতে ভাবতে লাগলো এখন কি করে এই মানবের রাগ বা অভিমান ভাঙানো যায়?

—’তোমার কি হয়েছে বলোতো নিহিত ভাই? এভাবে এড়িয়ে চলছে কেন সব সময় আমায়?
ঘড়ির কাঁটায় হয়তোবা দুইটা বেজে ত্রিশ। রেডি হয়ে একটা কনসার্টের উদ্দেশ্যে বের হচ্ছিল নিহিত। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ হাত আঁকড়ে ধরে তার। পরমুহূর্তেই এমন প্রশ্নের অপস্তুত হয়ে ওঠে নিহিত। পাশ ঘুরতেই দেখতে পায় রাফার, জিজ্ঞাসু দৃষ্টি।
—’কি হলো উত্তর দিচ্ছ না কেন?
নিহিত ঝটকা মেরে নিজের হাত সরাতে যেতেই আরো শক্ত করে তা আঁকড়ে ধরে রাফা,—’উত্তর দিয়ে যাও নিহিত ভাই। বেশ অনেকদিন ধরেই আমি নোটিশ করছি, তুমি ইগনোর করছো আমায়। নিহিত তার হাত ছাড়িয়ে বলল,,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—’সো হোয়াট?তোর সো কল্ড ফাহাদ ভাই আছে না? তার সাথে কথা বল যা।
এতক্ষণে রাফা বুঝল নিহিতের রাগের কারণ। এবার সে শব্দ করে হেসে বলল,,—’ওয়েট আ মিনিট। লেট মি থিং! দ্যাট মিন্স তুমি ওই কারণে রেগে…!
হোঁ হোঁ করে হেসে দিল রাফা, তার এই হাসি যেন নিহিতের রাগের আগুনে ঘি ঢালার ন্যায় কাজ করল।সে সর্বশক্তিতে রাফার কোমল বাহু আঁকড়ে ধরে, ঝাঁকিয়ে বলল,,
—’এটা তোর কাছে ফান মনে হচ্ছে? আমাকে কি সার্কাসের জোকার মনে করিস তুই?
আর এমন কাণ্ডে হাসি উবে গেল রাফার, ভয়ার্ত দৃষ্টিতে চেয়ে সে বলল,,—’স্যরি.!

—’তোর স্যরি মাই ফুট। সামনে থেকে সর আমার।
—’আরে আমার কথাটা তো শোনো। ভাইয়া তো ইকোনমিক্সে ভীষণ ভালো এই জন্য আমি একটু একটা প্রবলেম সলভ করতে গেছিলাম।
—’তো আমাকে দেখে কি তোর গর্ধব মনে হয়? ওটার সলিউশন কি আমি করতে পারতাম না?
—’কিন্তু তুমি তো সাইন্সের।
—’তো তোকে আর্স নিতে কে বলেছিলো?
—’আমি ওসব সাইন্স-ফাইন্স বুঝিনা। মশার ডিম-ঠিম ওসব তুমি বুঝে বেড়াও।

তার এমন কথায়, নিহিত মুখ কুঁচকে বলল,,—’সাইন্স মানে মশার ডিম? এটা তোকে কে বলল?
রাফা হাত নাঁড়িয়ে বলল,,—’তা নয়তো কি? কি সব আউলা-ঝাউলা জিনিসপত্র!
তার এমন কথায় আর নিজেকে সামলাতে পারল না নিহিত;সশব্দে হেসে বলল,, —’লাইক সিরিয়াসলি? সাইন্স মানে তুই মশার ডিম বুঝিস?
রাফা মুখ বাঁকিয়ে বলল,,—’তা নয় তো কি? কিছুদিন আগে নীরের বইতে দেখেছিলাম। আমার তো মশার ডিমের মতো লাগলো।
নিহিত প্রথমে শব্দ করে হাসতেও পরক্ষণে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,,,—’ওটা মশার ডিম নয় রে পাগলি। পার্সোনালি দেখা করিস,প্র্যাকটিক্যালি শিখাব।
বলেই মুখ চেপে হাসতে হাসতে সেখান থেকে প্রস্থান করল নিহিত। রাফা তার কথার মর্মার্থ না বুঝে চোখ কুঁচকে তাকালো শুধু।

—’আমি চাইছি এবার নমিনেশন ফর্ম তুমি জমা দাও।
মধ্যাহ্ন ভোজের পর, বাবার নির্দেশে তার কক্ষে উপস্থিত হয়েছে নীল। হঠাৎ ওয়ালিদ খানের এমন কথায় চমকে তাকালো সে। বিষ্ময় ভাবাপন্ন কণ্ঠে বললো,,
—’নমিনেশন! বাবা, তুমি কী বলছো? নির্বাচন হতে আর মাত্র ৪৫ দিন বাকি। ফর্ম জমা দেওয়ার শেষ দিন তো প্রায় চলেই এসেছে… এত অল্প সময়ে সবকিছু গুছিয়ে ওঠা কি সম্ভব? আর হঠাৎ এমন অন্তিমক্ষণে এসে সিদ্ধান্ত বদলের কারণ কি?
ওয়ালিদ খান শান্ত অথচ আত্মবিশ্বাসী হাসি হেসে বললেন,,—’ সম্ভব করতে হবে, নীল। সবকিছু প্রস্তুত। তোমার হলফনামা তৈরির কাজ শেষ, জামানতের ব্যবস্থা করা আছে, এমনকি প্রস্তাবক ও সমর্থনকারীও তৈরি। নির্বাচনী ম্যানেজার জামান সাহেব আজ বিকেলেই সমস্ত কাগজ নিয়ে আসবেন। কালই স্বাক্ষর করিয়ে জমা দিতে হবে।।
নীল চুড়ান্ত বিস্মিত,টেবিলের ওপর রাখা গ্লাসটা স্পর্শ করল সে চোখে হাজারো প্রশ্ন,,

—’কিন্তু তুমি কেন নয়? তুমিই তো এই আসনের জন্য সবচেয়ে যোগ্য। আর… বিপক্ষ দলের প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা এই সুযোগটা নেবে না? তুমি নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছ কেন, বাবা?
ওয়ালিদ খান চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। তার গলায় রাজনীতিবিদের দৃঢ়তা,,
—’রাজনীতি থেকে আমি সরে যাচ্ছি না। তবে এই আসন এবং আমাদের দল,দুটোর জন্যই এখন নতুন রক্তের প্রয়োজন। প্রতিদ্বন্দ্বী দল এবার অতীতের চেয়েও বেশি আগ্রাসী। তারা আমার পুরনো কৌশলগুলো মুখস্থ করে ফেলেছে। তাদের হারাতে হলে, তাদের সামনে এমন একজনকে দাঁড় করাতে হবে, যাকে তারা চেনে না, যার চাল তারা বুঝতে পারবে না।
মুহূর্ত কয়েকের বিরতি নিয়ে তিনি ফের বলা শুরু করলেন,,

—’আমি চাইছি তুমি তাদের সামনে একটি তাজা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দাও। তুমি নও শুধু একজন প্রতিদ্বন্দ্বী, তুমি হবে ভবিষ্যতের নেতা। এখন থেকেই যদি তুমি ময়দানে না নামো, তবে ওরা এই আসন পুরোপুরি দখল করে নেবে। আমি তাদের সেই সুযোগ দেব না। আমার কাজ এখন থেকে তোমার ব্যাক-আপ দেওয়া। এটা শুধু নির্বাচন জেতা নয়, বিপক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভবিষ্যতে তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রথম পদক্ষেপ।
নীল সর্বপ্রথমে চিন্তিত হলেও পরক্ষণে দৃঢ় কন্ঠে বলল,,—’আমি তোমার সাথে সহমত বাবা;বুঝলাম সবটা । তাহলে আমার প্রথম কাজ কী? জামান সাহেব এলে কী কী করতে হবে?
ছেলের দৃঢ়তায় খুশি হলেন ওয়ালিদ খান,—’বিকেলে জামান সাহেবের উপস্থিতিতে, শুধু নমিনেশন ফর্মটায় একটা সাইন করলেই হবে।
নীল কিছু একটা ভেবে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।

ঘড়ির কাটায় রাত বারোটা বেজে পনেরো মিনিট। ব্যবসার পাশাপাশি এবার রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে, চাপ দ্বিগুণ হয়েছে নীলের। এ কারণেই বাড়ি ফিরতে কিছুটা বিলম্ব হল তার। গেট পেরিয়ে, মহলের প্রাচীর ঘেরা এলাকার মধ্যে গাড়িতে বেশ মাত্র নীল দেখতে পেল;আজও ব্যালকনিতে চাতক পাখির ন্যায় অপেক্ষমান তার ঘরণী।
নীল গাড়ির ভেতর থেকে এক ঝলক তাকিয়েই দৃষ্টি সরালো। প্রবেশ করলো মহলে।তবে আশ্চর্যজনক ভাবে দরজা খুলল তিহু।কি হলো ব্যাপারটা এক্ষুনিই তো সে ব্যালকনিতে ছিল। আশ্চর্য হলেও তা প্রকাশ করল না নীল। বরং তিহুকে একপ্রকার পাশ কাটিয়েই চলে যেতে চাইলো।
তবে তাকে আটকে তার হাত আঁকড়ে ধরল তিহু।চোখ সরু করে বলল,

—’এত রাগ কেন মিস্টার?বউ দরজা খুললে তাকে যে একটু…,উহু,‌উহু করতে হয়তো আপনি জানেন না?
নীল ভ্রু কুঁচকে বলল,,—’উহু,উহু মানে?
তিহু লাজুক হেসে ওড়নার আগায় আঙুল প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলল,,—’মানে ওই আর কি…!
নীল বিরক্ত কণ্ঠে বলল,,—’আই এম সো মাচ টায়ার্ড। তো তোমার ফালতু বকবক বন্ধ করে, আমাকে রুমে যেতে দিলেই খুশি হব।
তিহু নীলের এমন কথায় কিঞ্চিৎ রাগ দেখিয়ে বলল,,—’আমার কথাগুলো আপনার ফালতু বকবক মনে হচ্ছে? যান,বেডা আনরোমান্টিক। এতক্ষণ জেগে থাকলাম আর..!
মুখ বাঁকালো সে।নীল আর কিছু না বলেই উঠে গেল সিঁড়ি পেরিয়ে। তিহু চোখ কুঁচকে চেয়ে রইল শুধু।

—’খাবেন না?
—’না।
—’এমা কেন?
—’বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি।
নীলের এমন কথায় এবার সত্যিই রাগ হলো তিহুর। সে সেই কখন থেকে ক্ষুধা চেপে, বসে আছে আর নীল নাকি বাইরে থেকে খেয়ে এসেছে। রাগে-দুঃখে কান্না চলে আসছে তার। তবুও নিজেকে সামলালো সে। কেননা কান্না করলে নিশ্চিত নীল তাকে এখন ন্যাকা ভাববে। আর ন্যাকামি তার ধাঁচে নেই। তবুও রাগ দেখিয়ে সে বলল,,
—’আপনি কি বলুন তো? আমি আপনার জন্য সেই কখন থেকে না খেয়ে বসে আছি!আর আপনি!
নীল কোনো রূপ হেলদোল না দেখিয়ে বলল,,—’খাওনি কেন?
তিহু এবার আর রাগ সংবরণ করতে পারল না। রেগে সে যখন নীলকে কয়েকটা কড়া কথা শোনাতে প্রস্তুতে তখনই দরজায় কড়া নাড়লো কেউ,তিহু মুখ কুঁচকে তাকালে নীল বলল,

—’কাম ইন!
নিম্ন পানে চেয়ে রুমে প্রবেশ করল ইফাজ। তিহুর উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে পরক্ষণে নীলের পানে চেয়ে বললো,,—’ভাই ঔষধ গুলো মনে করে খেয়ে নিয়েন। আর হ্যাঁ আপনি তো রাতে কিছু খাননি, খাওয়ার পর দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে বলেছে ডক্টর।
তার কথায় বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকালো নীল,—’শাট আপ স্টুপিড।বেরিয়ে যা এক্ষুনি।
—’কিন্তু ভাই।
—’আই সে আউট।
বোকা দৃষ্টি বিনিময় করেই বেরিয়ে গেল ইফাজ। সে বেরিয়ে যেতেই এতক্ষন ঠোঁট চেপে হাসতে থাকা তিহু শব্দ করে হেসে বলল,,,
—’ইস, মিস্টার পলিটিশিয়ান। সেই তো ধরা পড়ে গেলেন। কি লাভ হলো মিথ্যা বলে?
সে নিজেকে সামলে বলল,,—’আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন আমি খাবার নিয়ে আসছি।
বলেই কিচেনের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করলো সে। নীল বিরক্তি মুখে, প্রবেশ করল ওয়াশরুমে।

কিছুক্ষণের মাঝেই সার্ভিং ট্রেতে নানান খাবারের পসরা সাজিয়ে আনলো তিহু। নীল তখন সদ্য সদ্য শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে। অবাধ্য জলকানারা এখনো তার চুলে সর্বোচ্চ চঞ্চলতা নিয়ে খেলা করছে। তিহু, নীলের জল সিক্ত মুখোপানে চেয়ে শুকনো ঢোক গিললো। পরমূহুর্তেই কি জানি ভেবে চোখ বুজে নিলো পরম আবেশে।

খাবার সময় বাঁধলো আরেক ঝঞ্ঝাট।নীলের ডান হাতের তালু মাঝবরাবর আড়াআড়িভাবে কেটে গিয়েছে। শাওয়ার নেওয়ায় স্পষ্ট হতে উঠেছে তা।তিহু দ্রুত হাত বাড়িয়ে বলল,,—’ দিন আমি খাইয়ে দিচ্ছি।
চূড়ান্ত বিস্মিত নীল অবাক দৃষ্টিতে তাকালে,তিহু তার দৃষ্টিকে পাত্তা না দিয়ে বরং প্লেটে ভাত আর মাংস নিয়ে মাখাতে লাগলো।সে যখন সযত্নে ভাত মাখছিলো, তখন তার হাতে থাকা কঙ্কণজোড়া এক অপূর্ব চঞ্চলতায় বেজে উঠল। রিনিঝিনি ‌সেই শব্দে ঘরের নিবিড় নিস্তব্ধতা যেন সহসা সচকিত হয়ে এক মায়াবী ছন্দে যেতে উঠল।
নীল মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে রইলো অনিমেষ। যেন তিহুর হাতের প্রতিটি সঞ্চালন কোনো অজানিত রাগিণীর আলাপ। সেই শব্দতরঙ্গ ঘরের চারিপার্শ্বে অলক্ষ্য কুহেলিকা জালের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ছে। তপ্ত অন্ন আর মাংসের ঘ্রাণে মিশে গেল তিহুর চুরির সেই অবাধ্য গুঞ্জন। নীলের বিস্ময়াবিষ্ট নয়নপল্লব স্থির-স্থবির।
হঠাৎ তিহুর দৃষ্টিগত হলো নীলের এমন অবস্থা।সে আরেকটু দুষ্টুমি করে, হাতে থাকার চুরিগুলো নীলের সম্মুখে এনে ঝনঝন করে বাজালো। ধ্যান ভাঙল নীলের। তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি সরালো সে।তিহু মুচকি হেসে, খাইয়ে দিতে লাগলো তাকে।

রাত গভীর হয়েছে বেশ, নিশীথ-নীরব পরিবেশ। নীরবতা এতটাই যে, নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ অব্দি শোনা যাচ্ছে বোধ হয়। সারাদিনের ক্লান্ততায় রাজ্যের ঘুম এসে উপস্থিত হয়েছে তিহুর নয়ন জুড়ে।ঘুমের পূর্বাভাস হিসাবে একের পর এক ‌জৃম্ভণ উঠে চলেছে তার। এদিকে নীল এখনো ল্যাপটপে ঘুটঘুট করেই চলেছে।
কিছুক্ষণ পর, ল্যাপটপ বন্ধ করে সে যখন বিছানা থেকে বালিশ নিতে হাত বাড়ালো, তিহু তাকে আটকে বলল,,

—’কি করছেন?
—’ঘুম আসছে।
—’ঘুম তো আমারও আসছে।
—’তো ঘুমাও।
—’আপনি বালিশ নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন মিস্টার? এখানে ঘুমান।
—’আমি একা ঘুমাতে চাই।
তিহু মুখ বাঁকিয়ে বলল,,—’আইছে আমার, তাহলে বিয়ে করেছিলেন কেন?
নীল ভ্রু কুঞ্জন পূর্বক বলল,,—’মানে?

—’মানে অনেক রাত হয়েছে। নাটক না করে বিছানায় ঘুমান।চাইলে আমার বুকেও ঘুমাতে…!
লজ্জায় কথাটা শেষ করতে পারল না। পরক্ষণেই বলল,,—’বেশি ঢং না করে বিছানায় ঘুমিয়ে যান। আপনার লাভের জন্যই বলছি।
বলেই অপর পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল তিহু। আজকে একটু বেশিই লাগাম ছাড়া কথা বলে ফেলেছে সে। ইচ্ছে করছে লজ্জায় মাটির নিচে ঢুকে যেতে। এদিকে সে অপর পাশ ঘুরতেই মুচকি হাসলো নীল, শুয়ে পড়লো তিহুর ডানপাশে। ঠোঁট-চাপা হাসি তখনো বিদ্যমান তার মুখে। আলতো হাতে টেবিল ল্যাম্প টা অফ করে দিল সে, সমগ্র কক্ষ নিমজ্জিত হলো ঘুটঘুটে আঁধারে।

তপ্ত রোদ্দুরে আবৃত ধরণী। বেলা চড়াও হয়েছে বেশ, সোনালী রোদ্দুরের তীক্ষ্ণ আলোয় কক্ষের স্নিগ্ধতা সবেমাত্র ভাঙতে শুরু করেছে।তিহু আজ বেশ ভোরে উঠেছে ভার্সিটি যাবে কিনা। নাহা’র সাথে দেখা করতে একবার তার রুমে গিয়েছিল সে।হঠাৎ, নিজ রুমে প্রবেশ করতে গিয়ে তিহু চোখ সরু করে তাকালো।
রুমের দীঘল চওড়া আয়নাটার সম্মুখে দাঁড়িয়ে সযত্নে চুল আঁচড়াচ্ছে নীল।তিহু হাতে থাকা ফোনটা ঘাটতে ঘাটতে আড়দৃষ্টিতে একঝলক আয়নায় তাকালো। তবে আয়নায় তিহুর প্রতিচ্ছবি দেখার পরও নীল ভ্রুক্ষেপহীন, যেন নিজের প্রস্তুতিতেই সে মগ্ন। এরপরই সে পাশে রাখা একটি কালো ও সোনালী বোতল তুলে নিল।

ফুঁস করে এক শব্দে বোতল থেকে সুগন্ধির একটা ঘন আস্তরণ সারা ঘরে ছড়িয়ে গেল। তীব্র, কিন্তু মোহিত করা সেই সুঘ্রাণে নিমেষেই ঘরের শীতল বাতাস যেন এক উষ্ণ আভিজাত্য লাভ করল।ঘরের স্নিগ্ধতা পুরোপুরি ভেঙে গিয়ে এখন সেখানে শুধু বিলাসবহুল পারফিউমের গন্ধ আর সোনালী রোদের উজ্জ্বলতা।
ছাত্র জীবন শেষে আজ অনেক বছর পর নীল একা জনসমক্ষে দাঁড়াবে, নেতার বেশে, নিজের প্রথম রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তৃতা দিতে যাবে। এটি তার প্রথম যুদ্ধ, এবং প্রস্তুতির প্রতিটি পদক্ষেপে সেই গুরুগম্ভীর দায়িত্বের ছাপ স্পষ্ট। তার চোখে-মুখে এক দৃঢ় সংকল্প।
তবে তিহুর দিকে পাত্তা না দেওয়ায়, সে মুখ কুঁচকে চেয়ে আছে নীলের দিকে। নীল বিছানায় থাকা ওয়ালেটটা তিহুর পাশ থেকে তুলতে যেতেই তিহু তার হাত আঁকড়ে, ভ্রু গুটিয়ে বলল,,

—’ সকাল সকাল এত সাজগোজ করে কোথায় যাওয়া হচ্ছে মিস্টার?
নীল তার ওয়ালেটটা হাতে তুলে বলল,,—’লিসেন। আ’ম অলরেডি টু মাচ হ্যান্ডসাম, সো আই ডোন্ট নিড অ্যানি এক্সট্রা এফোর্ট টু লুক গুড, গট ইট?
তার এমন জবাবে মুখ বাঁকালো তিহু,—’ঢংয়ে আর বাঁচি না। বেশি ঢং না করে বলে ফেলুন কোথায় যাচ্ছেন?
—’লিসেন আ’ম ইয়াং এন্ড ভেরি গুড লুকিং। এন্ড এভরি গার্ল হ্যাজ আ ক্রাশ অন মি। সো,আই হ্যাভ ফুল রাইট টু এনজয় মাই লাইফ।

তিহু হাতের বন্ধনে থাকা নীলের হাতটা আরো শক্ত করে ধরল, চিবিয়ে বলল,,—’আই অলসো হ্যাভ দ্য ফুল রাইট টু কিল অল দ্য গার্লস হু হ্যাভ আ ক্রাশ অন ইউ।ডোন্ট আই?
নীল ঠোঁটে চেপে হাসলেও, সেটা লক্ষ্যগত হলো না তিহুর। বরং সে দ্বিগুণ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,—’কোথাও যাবেন না,আপনি।
তাদের এমন মুহূর্তেই কিছু না বলে দ্রুত রুমে প্রবেশ করল আসিফ, জলদি কণ্ঠে বললো,,—’ভাই সময় হয়ে যাচ্ছে তো। সমাবেশে অলরেডি অনেক ভিড় জমা হয়েছে।
হঠাৎ সে লক্ষ্য করল তিহু-নীলের ঘনিষ্ঠ অবস্থা। দ্রুত অপর পাশে ফিরে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,,

—’স্যরি স্যরি।
এদিকে আসিফের কথায় তিহু বুঝলো নীল এতক্ষণ তাকে ঘোল খাওয়াচ্ছিলো। সে মূলত সমাবেশে যাচ্ছে। তিহু কোমরে হাত রেখে মুখ কুঁচকে বলল,,—’ইউ!
নীল অপরদিকে ঘুরে মুচকি হেসে;বেরিয়ে গেল রুম থেকে।

—’নেতা সাহেব আমার উপর রেগে আছেন। এত চেষ্টার পরেও ভাঙাতে পারছি না রে।
ভার্সিটির ক্লাস শেষে বরাবরের ন্যায় খোলা উদ্যানটায়, বসেছিল তিন অন্তরঙ্গ বন্ধু। হঠাৎ তিহুর এমন কথায় মাহা অপর দিকে ঘুরে মুখ বাঁকিয়ে বলল,,
—’খুব ভালো হইছে আর একটু যা পাকনামি করে ভাইয়ার কথা না শুনে।
—’ধুর বা’ল। তুই আমার বান্ধবী না কি বলতো? আগের জন্মে আমি নিশ্চিত কোনো বড় পাপ করছিলাম না হলে তোর মতন একটা শা’কচু’ন্নি কেন জুটবে? কোথায় আমি বললাম অ্যাডভাইজ দে। তা না বেডি শুরু করছে ভন্ডামি।
মাহা তার প্রত্যুত্তরে কিছু বলার আগেই সেখানে উপস্থিত হলো রাওফিন। ব্যাস,মাহা মুখে কুলুপ আটলো। এদিকে তার উপস্থিতিতে মুখ চেপে হেসে একে অন্যের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করল তিহু-রিশাদ। রাওফিনকে দেখেই সেখান থেকে উঠে গেল মাহা। রিশাদও কিছু কথা সেরে পরপর পিছু নিল মাহার।
তারা চলে যেতেই তিহু আশেপাশের চেয়ে বলল,,—’নেতা সাহেব আসেননি?
রাওফিন ধপ করে বসে পড়লো দুর্বাঘাসের উপর। তিহুর দিকে ফিরে অসহায় দৃষ্টিতে বলল,,

—’তোমার আর আমার কপাল পোড়া সিস্টার। সবাই খালি আমাদের ওপর রাগই করে গেলো। এই তোমার বেস্ট টুকে দেখো না। কতদিন ধরে চেষ্টা করতেছি বেডি আমার সাথে ঠিক করে কথা পর্যন্ত বলল না এখনো পর্যন্ত।বাই দ্যা ওয়ে নীল সমাবেশে ব্যস্ত তাই আমাকে বলল আসতে।
তিহু ছোট্ট করে বলল,,—’ওহ! পরক্ষণেই রাওফিনের দিকে ফিরে সান্ত্বনা দেওয়ার স্বরে বলল,,
—’ টেনশন না ব্রাদার। তোমার প্রবলেমের সলিউশন আমিই দিবো কালকে। আমার কাছে ঝাক্কাস একটা প্লান আছে।শুধু তুমি পাশে থাকবে কিনা বলো?
রাওফিন তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,—’কি প্ল্যান?
তিহু একে একে তাকে সবটা বুঝিয়ে বললো । কথার শেষেই এক প্রকার লাফিয়ে উঠলো রাওফিন উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠে বললো,,

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৭

—’এই না হলে আমার সিস্টার! পুরাই ঝাক্কাস প্ল্যান। তুমি যা বলবে তাই হবে। এখন বলো তুমি কি ট্রিট চাও।
—’আপাতত কালকে আগে সাকসেস হই তারপর না হয় ট্রিট নিব।
রাওফিন তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,,—’ওকে, তাহলে ডিল ডান?
তিহু তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে বলল,,—’ডান।

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৯