Home প্রেমের পাঁচফোড়ন প্রেমের পাঁচফোড়ন পর্ব ৬৫+৬৬

প্রেমের পাঁচফোড়ন পর্ব ৬৫+৬৬

প্রেমের পাঁচফোড়ন পর্ব ৬৫+৬৬
Afnan Lara

কি?এমন করে চেয়ে আছো কেন?এটা কি নতুন নাকি?
দরজা নক হলো তখনই
শান্ত গিয়ে দরজা খুলে চা আর বিসকিট নিয়ে আসলো
আহানা এখনও রোবটের মত তাকিয়ে আছে শান্তর দিকে

চা খাওয়া শেষ করে সবাই এবার বের হলো ভূতের বাড়ি যাবে
আইডিয়াটা রুপার,সে তার গুগলে সার্চ করে বের করেছে রিসোর্টের আশেপাশে নাকি একটা প্রাচীন ভূতের বাড়ি আছে,রাতে গেলে মজা বেশি পাওয়া যাবে,রাত করে নাকি কিসব সাউন্ড আসে সেখানে
শান্ত তো এসব শুনে এক পায়ে খাড়া,সে ভূতের বাড়ি যাবেই যাবে
রইলো নওশাদ আর আহানা,তারা দুজনে ভয়ে শুধু ঢোক গিলছে
চা বিসকিট খেয়ে সন্ধ্যা হতেই ৪জন মিলে বেরিয়ে পড়লো,বিরাট এই মাঠ শেষ হলে একটা জঙ্গল পড়বে,সেটার মাঝ বরাবর ভূতের বাড়ি আই মিন জমিদার বাড়িটা অবস্থিত
শান্ত আহানার হাত ধরে হেঁটে চলছে আরেকহাতে টর্চ
আর পিছন পিছন নওশাদ রুপার হাত ধরে আসতেসে তাদের কাছেও টর্চ আছে
ঘুটঘুটে অন্ধকার,পিচ্ছিল মাটির সরু পথ,চারপাশে ঘাস,সেগুলো ভিজে আছে কারণ আজ সারাদিন ধরে গুটিগুটি বৃষ্টি হয়েছে

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

ভেজা ঘাস পায়ে লাগলেই মনে হয় এই বুঝি জোঁকে ধরলো
আহানা প্লাজো একটু উঠিয়ে হাঁটতেসিলো কিন্তু যখন শুনলো জোঁকের কথা আবার নামিয়ে ফেললো
খালি পায়ে না লেগে জোঁক যদি প্লাজোয় লাগে তাহলে মন্দ কি?
একটা বাদুড় উড়ে সামনে দিয়ে গেলো এটা দেখে আহানা আর নওশাদ এমন চিৎকার করলো বাদুড় নিজেই ভয় পেয়ে তার পথের দিশা হারিয়ে কোনদিকে না কোনদিকে চলে গেলো
এটা সিউর!! সে মানুষের চিৎকারে এমন ভয় পেয়েছে যে আজ তার পরিবারের কাছে ফিরেই অজ্ঞান হয়ে বিছানায় পড়ে থাকবে
কিসের যেন আওয়াজ আসতেসে সবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে আওয়াজটা বুঝার চেষ্টা করছে অবশেষে বুঝতে পারলো আওয়াজটা হলো পেঁচার
যাই হোক মাঠ পেরিয়েছে তারা এবার জঙ্গলে ঢুকবে,আহানা তো শান্তর হাত যত শক্ত করে ধরতে পারে তত শক্ত করে ধরে রেখেছে
জঙ্গলে ঢুকতেই মনে হলো আশেপাশে ভূত আর ভূত,অথচ ভূতের নিশানাও নেই

শুধু পথ চেয়ে চেয়ে তারা জমিদার বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালো
ইয়া বড় এক পুরোনো রাজবাড়ি,,শতে শতে শেকড় দ্বারা আবৃত যা বাড়িটাকে প্রাচীন হওয়ার পরিচয় বহন করে
শেউলা জমে আছে,লাইট মেরে মেরে সব দেখতেসে ওরা
শান্ত তো আর অপেক্ষা না করেই ঢুকেই পড়লো
ভিতরে
কোথাও পুরনো একটা জিনিসপাতিও নেই,এলাকাবাসী সব লুটেপুটে নিয়ে গেসে,এখন খালি বাড়িটা রয়ে গেসে
নওশাদ আর রুপা নিচের তলা ঘুরে দেখতেসে
আর শান্ত আহানাকে টেনে দোতলায় নিয়ে গেসে

শান্ত প্লিস চলুন ফিরে যাই,আমার খুব ভয় করতেসে,প্লিস চলুন😭
আরে আমি আছি না?এত ভয় পাচ্ছো কেন??
ভয় পাবো না? কি বলেন,যদি এখন ভূত এসে পড়ে বা পাগল ছাগল ও তো থাকতে পারে এখানে তাই না?
মেরে তাহলে ওদের সত্যিকারের ভূত বানাই দিবো😎
উফ আপনি বুঝতেসেন না কেন?
শান্ত আহানার কোমড় জড়িয়ে টান দিয়ে কাছে নিয়ে এসে ওর মুখ চেপে ধরলো
চুপ, একদম চুপ,এত কথা কি করে বলতে পারো তুমি?তোমার না অসুখ?অসুখের মাঝেও এত এত কথার জোর তোমার??
তো কি করতাম আমি?কি দরকার ছিল এত রাত করে এখানে আসার,শান্তিতে রুমে থাকা যেতো না নাকি?
যেতো তবে এরকম সুযোগ বারবার আসেনা বুঝলা
আমরা নিউ কাপল,আমাদের উচিত এসব ইঞ্জয় করা আর তুমি কিনা আমাকে বকেই যাচ্ছো?
আমি কাল সকালে ঢাকায় ফিরতে চাই ব্যস
না কাল না,পরশু,পরেরটা পরে দেখা যাবে

হেহে হেহে,কারা তোরা??এখানে কি করিস?
লোকটার কথা শুনে আহানা চোখ বড় করে শান্তর পিছনে লুকিয়ে পড়লো
একটা পাগল লোক দাঁড়িয়ে আছে ওদের সামনে,হাতে লাঠি আর পরনে সাদা ময়লা পাঞ্জাবি
লোকটা আহানাকে দেখে এগিয়ে আসতে ধরতেই শান্ত হাত দিয়ে আটকালো উনাকে
কি??
লোকটা ব্রু কুঁচকে বললো “তোরা এখানে কেন এসেছিস?সুখে থাকতে তোদের ভূতে কিলায়,যা চলে যা”
আহানা শান্তর জ্যাকেট চেপে ধরে মুখ লুকিয়ে রেখেছে
শান্ত কিছু বললো না আর,আহানাকে নিয়ে দোতলা থেকে নেমে আসলো,লোকটা এগিয়ে এসে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বললো”চলে যা তোরা,আমি আমার বউরে এই বাড়িতে হারিয়েছি,তোরাও হারাবি দেখিস!”
শান্ত থেমে গিয়ে আহানার হাত শক্ত করে ধরে নওশাদ আর রুপাকে ডাক দিলো
কি হলো ভাইয়া??
আচ্ছা রুপা!!অনেক দেখা হইসে,চলো আমরা ফিরে যাই,রাত বেশি হয়ে গেলে বিপদ বাড়বে,আর এই লোকটাকে সুবিধার মনে হচ্ছে না আমার

ভাইয়া কি বলো,পুরো বাড়িটা তো দেখাই হলো না
লাগবে না থাক
হ্যাঁ শান্ত ঠিক বলতেছিস তুই,চল যাই
রুপা মন খারাপ করে সেও সাঁই জানালো নওশাদ আর শান্তর সিদ্ধান্তে
সবাই মিলে আবার রিসোর্টের উদ্দেশ্যে হেঁটে চলেছে
অবশেষে তারা জলদি পা চালিয়ে রিসোর্টে পৌঁছেই গেলো

আহানা হাত পা ধুতে ধুতে বললো”আমার কথায় কানই দেন না আপনি,দিলে আজ এত কষ্ট করে জমিদার বাড়ি গিয়ে সন্ধ্যাটা বরবাদ করতে হতো না
ঘুরলেই মন ভালো হয় না,আপন মানুষের পাশে বসে থাকলেও মন ভালো হয়ে য়ায়
কে বুঝাবে আপনাকে,আপনি তো আমার কথা বুঝতেই চান না!!”
শান্ত জ্যাকেট খুলে,টিশার্টটাও খুলে আয়নায় নিজের পিঠ দেখতেসে,জঙ্গলের মাঝ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার ফলে পোকামাকড় কিছু একটা মনে হয় কামড় দিয়েছে, তাই তোয়ালে নিয়ে গোসল করতে চলে গেলো সে,আহানার কথায় কান দিলো না
আহানা বিছানায় এসে বসে আছে,চাদর মুড়ি দিয়ে বারান্দার দিকে তাকালো,পাগল লোকটার কথা মনে পড়ে ভয় লাগলো ওর
যদি এখন সেই লোকটা এই বট গাছ ধরে এখানে এসে যায়,কি করবো তখন আমি??
শান্ত তো এমনিতেও বিকাবেলায় সব বন্ধ করে দিয়েছিল আমি গাছে উঠেছিলাম বলে
আমি তাও খুলসি বারান্দার দরজা বটগাছটা দেখার জন্য,হুমমম বটগাছ দেখতে হবে না আর
আহানা উঠে গিয়ে বারান্দার দরজাটা লাগিয়ে দিলো,পর্দাও টেনে দিলো,লাগবে না বারান্দায় যাওয়া,গা এখনও গুলিয়ে আসতেসে আমার
আবার এসে বিছনার মাঝখানে বসে চাদর গায়ে পেঁচিয়ে গাপটি মেরে বসে রইলো সে,যত দোয়াদরুদ আছে সব পড়া শেষ,শান্ত বাথরুম থেকে বের হলে ওকে জড়িয়ে বসে থাকবো তাহলে ভয় যাবে

শান্ত কয়েক মিনিট বাদেই বের হলো,বেরিয়ে দেখলো আহানা চাদর মুড়ি দিয়ে ঢুলতেসে
কি হইসে?ভূতে ধরলো নাকি তোমাকে?
না যদি ঐ লোকটা এসে যায়?
আরে কিছু হবে না,ঐ লোকটা ওখানেই থাকে,তুমি এখনও ওসব নিয়ে ভাবতেসো??
বাদ দাও ওসব,এখন আমরা রুই মাছ খাবো,পুকুরের টাটকা মাছের তরকারি সেই লাগবে খেতে,আমি রুম সার্ভিসে কল করতেসি, বসো তুমি
প্লিস এখন না আরেকটু পর,আমার খিধা নেই এখন,আপনি প্লিস এখানে এসে বসুন না
শান্ত এসে আহানার পাশে বসে পড়লো,তারপর ফোন নিয়ে গেমস খেলায় মনোযোগ দিলো সে
আহানা শান্তকে ধরে ওর মুখের দিকে চেয়ে আছে বোকার মতন,বিয়ের আগে এত রোমান্টিক ছিল আর এখন কিনা বিয়ের পর পুরো আনরোমান্টিক?হাউ?হাউ?

শান্ত গেমস খেলতে খেলতে বললো”বিকালেও তো কিস করলাম,আনরোমান্টিকের কি দেখলা তুমি?আর তোমার শরীরের অবস্থার কথা মাথায় আছে তোমার??এত কিছুর পরও তুমি আবার এত কিছু আশা করো,মাই গড!!,তুমি এত…।
এই!! এই!! কি বলতে চান কি আপনি??আমি এত মানে??আমি কি কিছু বলসি আপনাকে?আর কখনও কিস ও করতে দিব না,আপনি খুব খারাপ!
আহানা আরেকদিকে ফিরে শুয়ে পড়লো
১৬সেকেন্ড বাদে গলার কাছে শান্তর খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির স্পর্শ পেতেই উঠে বসে পড়লো সে
কি??কি হইসে?এত ঢং করতে হবে না আর হুহ!!
তুমি এত রাগ করো কেন?আমি তো মজা করসিলাম
রাখেন আপনার মজা,আমার ভাল্লাগতেসে না
আমি ঘুমাবো,রাতে খাবো না,ঘুম থেকে উঠাবেন না আমাকে
মানে কি বলতেসো তুমি?তোমাকে আমি খালি পেটে ঘুমাতেও দিব না

আমি খাবো না আপনার কি তাতে?
আমার কি??
দেখাচ্ছি আমার কি
শান্ত আহানার গাল টিপে ধরে বিছানার সাথে লাগিয়ে ধরলো
আচ্ছা সরি আর বলবো না আপনার কি,বলবো আপনার কিছু না
কিহহহ?আহানা!তুমি অনেক দুষ্টু হয়ে গেসো!!
কবে বুঝি শান্তশিষ্ট ছিলাম?
ওহ তাহলে এটা আগেরই স্বভাব ছিল?আমাকে দেরি করে দেখাইলা এই তো?
হুম,মুখ থেকে আপনার হাত সরান আমার মুখ ব্যাথা হয়ে গেসে
আহানা!
কি?
অনেক ভালোবাসি তোমায়,কখনও ভুল করেও আমাকে ছেড়ে যাবা না তো?
না
শান্ত আহানাকে জড়িয়ে ধরে ওর গলায় মুখ গুজলো
আহানা হালকা চোখ বুজে শান্তকে ধরে রাখলো
তারপর শান্তর ভেজা চুলে হাত বুলাতে লাগলো সে

আমাকে চুল মুছার জন্য বকা দিয়ে এখন নিজেই চুলে সব পানি রেখে দিসে
কথাটা বলে আহানা হাত বাড়িয়ে নিজের ওড়নাটা পাশ থেকে নিয়ে শান্তর চুল গুলো মুছতে লাগলো
শান্ত আহানার গলায় বারবার খোঁচা দিচ্ছে দাঁড়ি দিয়ে
আহানা নড়তে নড়তে অনেক কষ্টে চুল মুছে নিলো ভালো করে
একটা সময় শান্ত আহানার গলা থেকে মাথা উঠিয়ে ছোঁ মেরে ওড়নাটাই নিয়ে নিলো আহানার দিকে
কি?
এত মুছে কি হবে?এমনিতেও শুকায় যাবে,তুমি যেভাবে মুছতেসে যেন আর শুকাবে না
চুলে পানি থাকা ভালো কথা নয় হুমমম
তুমি প্লিস আমার আম্মুর সব ডায়ালগ মেরো না
আমি আপনার আম্মুর কাছে বিচার দিব কিন্তু
আমার মায়ের সাথে আমি কথা বলতে পারি কিন্তু তুমি না
আমিও পারি,কারন এখন থেকে তো আমি ও আপনার অংশ হলাম তাই না?তাহলে আমিও তো কথা বলতে পারবো আর মা আমাকে বেশি ভালোবাসে 😎

তাই নাকি?কে বললো তোমায়?
কে আবার মা বললো,তুমি মাকে জিজ্ঞেস করিও
এক মিনিট,তুমি??তুমি আমাকে তুমি বললা?
🙈সরি মুখ ফসকে বলে দিসি
ইটস ওকে,তুমি শুনতে ভালোই লাগে
তুমি/ আপনি/ তুমি /আপনি,একবার একটা বলবো,পুরোপুরি বলার সাহস নেই আমার
কেন?আমি কি তোমায় খেয়ে ফেলবো নাকি?
হ্যাঁ

“”হ্যাঁ””শুনে শান্ত ব্রুটা নাচিয়ে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে
আহানা দাঁত কেলিয়ে জিভে এক কামড় দিয়ে চুপ করে রইলো
মাঝে মাঝে যতসব উল্টা পাল্টা বলে ফেলি
আজ তোমাকে ছাড়বো না আহানা দ্যা পাতানো বউ টু রিয়েল বউ!
এইটা আবার কি নাম,সুন্দর একটা নাম দেন
আহান্ত!!
বাহ!!কিউট নাম
এখন আমার দিকে তাকাও
কি জন্যে?
দেখাচ্ছি কি জন্যে
এই মুখ আমি বহুবার দেখেছি,নতুন করে কি দেখবো শুনি?

দেখো এই মুখে কত কত ভালোবাসা!!
কথাটা বলে শান্ত আহানার দিকে কেমন করে যেন চেয়ে রইলো বেশ কিছুক্ষন ধরে
আহানার বিনা লিপস্টিক আলা ঠোঁট জোড়া থম হয়ে আছে,থুতনির তিলটাও স্পষ্ট!!
হাত দিয়ে সেটা ধরে টেনে দিলো সে
রুমটায় এতক্ষন বাতি জ্বলছিল কারেন্ট ছিল বলে তবে এখন মোমবাতি জ্বলতেসে কারেন্ট চলে গেসে বলে
আহানা আর শান্ত দুজনে বিছানায় হেলান দিয়ে বসে সামনের আয়নার দিকে চেয়ে আছে
আহানা শান্তর বাম হাতটা জড়িয়ে ওর কাঁধে মাথা রেখে চুপটি করে আছে,চারিদিক নিস্তব্ধ, কোথাও কোনো আওয়াজ নেই,মেঘের ডাক শুনা গেলো হালকা করে,হয়ত বৃষ্টি আসবে,আর বৃষ্টি আসার আগেই কারেন্ট আলা ভয় পেয়ে কারেন্ট নিয়ে পালিয়েছে
রুম সার্ভিসের লোক এসে খাবার দিয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে
শান্ত তো লোভ সামলাতে পারছে না আর
টাটকা রুই মাছের ঝোল তাও তার হাতে ধরা মাছ,আহা আহা,তার সাথে সরষে তেল দিয়ে শশা টমেটোর সালাদ,লা জাওয়াব!!

আর সাদা ভাত,আর এক বাটি দেশি মুরগীর মাংস
দেরি না করে হাত ধুয়ে খাওয়ায় লেগে গেলো সে
আহানা বালিশে মাথা রেখে বারান্দার পর্দাটার দিকে চেয়ে আছে
পর্দাটা হালকা সরে যাওয়ায় বাইরের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে,,অন্ধকার আর অন্ধকার,তবে বজ্রপাতের কারণে মাঝে মাঝে বটগাছটা স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়
কাঁধে কারও হাতের স্পর্শ পেশে লাফ দিয়ে উঠে বসলো আহানা,শান্তকে দেখে দম ফেললো সে
হুট করে অন্যমনস্ক হয়ে থাকলে কাছের মানুষ ও যদি এসে স্পর্শ করে তাও কলিজা কেঁপে উঠে
শান্ত ব্রু কুঁচকে বললো”কি ভাবো এতো?তুমি তো খেতেও এলে না,দেখো আমি খেয়ে নিয়ে তোমার জন্য ও নিয়ে এসেছি,চলো তোমাকে খাইয়ে দিব,হা করো”

আহানা শান্তর কথামত খেতে রাজি হলো,নিয়ম অনুযায়ী হা ও করলো
খাচ্ছে তবে তেমন ভালো লাগতেসে আর ফিল হচ্ছে না,নিমিষেই চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেলো তার
জ্ঞান হারিয়ে দুম করে বিছানা থেকে পড়ে যেতে নিতেই শান্ত এক হাত দিয়ে ওকে টেনে ধরে ফেললো,আরেক হাতে তার খাবারের প্লেট
আহানার নাম ধরে ডেকে প্লেটটা বিছানায় রেখে আহানাকে কোলে নিয়ে আসলো,আহানা চোখ খুলতেসে না দেখে ভীষণ ভয় লাগলো ওর
পানি নিয়ে ওর মুখে দুই তিনবার ছিঁটা দিয়ে দরজা খুলে নওশাদ রুপাকে ডাকতে যাবে তখনই আহানার আওয়াজ পেলো

আহানা হালকা কন্ঠে বলতেসে “আমি ঠিক আছি”
শান্ত আর সেদিকে গেলো না,, আহানার কাছে ফিরে এসে ওর হাত দুটো ধরে পাশে বসলো,চোখেমুখে ভয় আর চিন্তার ছাপ
এত এত সুখের মূহুর্তে এভাবে আহানার অসুস্থতার কথা সে একদমই ভুলে গেসিলো
আহানাকে শক্ত করে ধরে বসে আছে সে,ফোন নিয়ে ২০বার ডাক্তারকে কল করলো,তার ফোন অফ আর তার উপর নেট যায় আবার আসে
বিরক্ত হয়ে ফোন ছুঁড়ে মারলো সে

আপনি এত চিন্তিত হবেন না,আমি ঠিক আছি
না তুমি ঠিক নেই,আমি কালই ঢাকায় ফিরে যাবো তোমাকে নিয়ে
হুম,আমার ও এখানে একদম ভালো লাগতেসে না,চলে যাবো আমি
শান্ত ফোনটা ফ্লোর থেকে নিয়ে আবারও ট্রাই করতেসে ডাক্তারকে কল করার
পিছন থেকে আহানার উপস্থিতি টের পেলো সে
আহানা ওকে পিছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরেছে,ওর পিঠে মাথা ঠেকিয়ে চুপ করে আছে
ভয় করতেসে তোমার?আমি আছি না,আমি তোমার কিছু হতে দিব না আহানা
মৃত্যুর ভয় আমার হচ্ছে না,আমার ভয় হচ্ছে আপনাকে ছেড়ে কি করে থাকবো সেটা নিয়ে,ওপারে গেলে তো….
শান্ত আহানার মুখে হাত দিয়ে ওর কথা থামিয়ে দিলো
তোমার শুধু রক্তশূন্যতা রোগ,আর কিছু না,বড় কিছুই না,বুঝছো তুমি??
আহানা পা উঁচু করে শান্তর গলা জড়িয়ে ওকে ধরলো,কান্না থামানোর একমাত্র কৌশল এটা

শান্ত হাত থেকে ফোনটা ছেড়ে দিলো,তারপর আহানাকে কোলে তুলে বিছানার কাছে চলে আসলো
এ কেমন জীবন কাটাচ্ছে সে,যে জীবনের নাম নেওয়ার পরই মনে পড়ে এর বিষাদ ভবিষ্যতের কথা,একজন আপনজনকে হারানোটা আজ পর্যন্ত সে মেনে নিতে পারেনি আর সেখানে এখন যদি আহানাকেও
নাহ!!! এটা সে কিছুতেই মানতে পারবে না
মায়ের হারিয়ে যাওয়াটা তাকে তিলে তিলে কষ্ট দিচ্ছে আর আহানার হারিয়ে যাওয়া তাকে একেবারেই মেরে ফেলবে
আহানাকে বিছানায় নামিয়ে দিয়ে সে ভাবলো বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনকে শক্ত করবে
কিন্তু না!! তার এই ভাবনায় ছেদ ঘটালো আহানা
এক হাত দিয়ে শান্তর জামাটা ধরে রাখলো সে,শান্তকে নিজের কাছে টেনে নিলো
শান্ত এখন এই অবস্থাতে চায় না আহানার কাছে যেতে,এমনিতেও ওর শরীর খারাপ কিন্তু আহানা সব ভুলে শান্তকে খুব কাছে নিয়ে আসলো
হয়ত আহানাও জানে সে বাঁচবে না,শেষবারের মত প্রিয় মানুষটাকে নিজের করে নিতে তো কোনো বাধা নেই

আহানা শান্তর মুখটা দুহাত দিয়ে ধরে বারবার শ্বাস টান দিচ্ছে,বুকের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে তার,মনে হয় কিছু একটা আঘাত করছে তাকে ক্রমশ!!
আহানা তুমি আমাকে এখন এই মূহুর্তে কাছে টেনে কি বুঝাতে চাও??তুমি আর আমার কাছে থাকবা না?আমি তোমাকে কোথাও যেতে দিব না
তুমি আমার পাশে থাকবে, যেতে দিব না আমি
আচ্ছা গেলাম না,তাহলেও কি কাছে আসবেন না?
আহানাকে ভালোবাসার পুরো মন মানসিকতা তার আছে কিন্তু আহানার শরীর ভালো না বলেই সে আহানাকে কাছে টেনে নিচ্ছে না,, আহানা সেটা বুঝার চেষ্টাও করতেসে না,ওর ধারনা হলো অন্য কিছু,অন্য পথ,অন্য চিন্তাধারা!
রাত ১২টা বাজে ১মিনিট

আহানা শান্তর সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে,শান্ত এক হাত দিয়ে ওর মাথায় হাত বুলাচ্ছে থেমে থেমে
আহানার শরীরের সব অসুস্থতা মনে হয় যেনো শান্তকে নিজের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে সে
আহানার গায়ে চাদরটা ভালো করে মুড়িয়ে দিয়ে চেয়ারের উপর থেকে জ্যাকেট নিয়ে পরতে পরতে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো শান্ত
এভাবে ওর দিকে তাকিয়ে থাকার ক্ষমতা তার নেই
আজই ঢাকায় ফিরে গেলে হতো না?

দালানের নিচে এসে দেখলো ম্যানেজার ঘুমাচ্ছে,শান্ত গিয়ে উনাকে জাগালো
জিজ্ঞেস করলো মোহনগঞ্জ থেকে ঢাকার ট্রেন কি এখন আছে?
উনি বললেন”এখন তো নেই,বরং কাল সারাদিন গিয়ে বিকালে ঢাকার ট্রেন পাবেন ”
শান্ত চিন্তিত হয়ে ফিরে আসতেসে রুমে,বাসে করে গেলে সেই সারাদিন লেগে যাবে,আমি কি করবো এখন!
আহানা জেগে উঠে বসে পড়লো,আশেপাশে শান্ত কোথাও নেই
তার গায়ে শান্তর টিশার্টটা ছিল,,তাড়াতাড়ি করে বিছানা থেকে নেমে ফ্লোর থেকে জামা নিয়ে চেঞ্জ করে নিলো সে
শান্ত কোথায় গেলো আমাকে ছেড়ে!!এসব ভাবতে ভাবতে
ওড়না নিয়ে দরজার পাশে যেতেই দেখলো শান্ত সিঁড়ি বেয়ে উপরে আসতেসে
মনে হয় প্রান ফিরে পেয়েছে আহানা
এক দৌড়ে শান্তর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে

শান্ত ব্রু কুঁচকে বললো “তুমি এখানে আসছো কেন?কি হইসে?”
আপনি কোথায় গেসিলেন,আপনাকে না দেখতে পেয়ে ভয় করছিল আমার
আমি ম্যানেজারের কাছে জানতে গিয়েছিলাম ঢাকার ট্রেন কবে ছাড়বে
কবে?
কাল বিকালে
ওহ
চলো এখন
শান্ত আহানাকে নিয়ে আবার রুমে ফিরে আসলো,এই নিয়ে কতবার ওকে ঘুম পারিয়েছে,কিসের জন্য যে বারবার জেগে যায় সে,জেগেই শান্তর দিকে তাকিয়ে থাকে
শান্ত বিরক্ত হচ্ছে না একটুও
তাকে আহানাকে হারানোর ভয় গ্রাস করছে রীতিমত
আহানা প্লিস ঘুমাও

আসতেসে না তো
তাহলে চলো
কোথায়?
আমি যেখানে নিয়ে যাবো সেখানে
শান্ত আহানার হাত ধরে ওকে বিছানা থেকে নামিয়ে ওর ওড়নাটা মাথায় পেঁচিয়ে ওকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো
অন্ধকার শূন্য মাঠে তারা হাঁটতেসে তাও খালি পায়ে,ভেজা ঘাস পায়ে লাগতেই ভালো লাগা কাজ করতেসে,আহানার এতক্ষণ জোঁকের ভয় লাগতেসিলো কিন্তু শান্তর ভরসায় সেই ভয়টা কেটেছে
অনেকদূর চলে এসেছে তারা
চাঁদ আছে তবে মাঝে মাঝে বিলীন হয়ে যায় সেটা
আবহাওয়া ভালো না,বৃষ্টির ভয়ে তাই চাঁদ লুকাচ্ছে মেঘের আড়ালে
শান্ত আহানাকে নিয়ে এবার ঘাসের উপর বসে পড়লো,ওর সামনে বসে ওর হাত ধরে বললো চোখ বন্ধ করতে
বলো আহানা কি দেখতে পাচ্ছো?

কিছুই না
আর আমি দেখতে পাচ্ছি আমার আহানার মত একটা কিউট বাচ্চা মেয়ে তোমার গলা জড়িয়ে খিলখিল করে হাসতেসে
তার দুই ব্রুর মাঝখানে একটা তিল আছে,একদম তোমার মত যেমন তোমার থুতনিতে তিল
আমার মেয়ের কখনও টিপ দিতে হবে না কারণ তার কপালে টিপ ন্যাচারালি রয়েছে
আহানা হেসে বললো আর এখন আমি দেখতে পাচ্ছি একটা কিউট হ্যান্ডসাম ছেলে শান্তর পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে,হুবুহু শান্তর মত দেখতে,চোখজোড়া খালি আমার মত,চোখে মুখে এটিটিউড পুরো আপনার মতো
আহানা মুচকি হেসে চোখ বন্ধ করে তার ছেলেকে কল্পনায় দেখতেসে
হঠাৎ কানের কাছে শান্তর ঠোঁটের স্পর্শ পেতেই চোখ খুললো সে
আর দেরি না করে শান্ত আহানার হাত ধরে ওকে নিয়ে রিসোর্টে ফিরে আসলো
এবার আহানা ঘুমিয়ে পড়েছে ভালোমতন
স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে শান্ত ও এবার চোখ বুজলো

আবার সকাল হতেই উঠে পড়লো সে,আহানা এখনও ঘুমাচ্ছে
ঘড়িতে চেয়ে দেখলো ৫টা ৩২বাজে
শান্ত ফ্রেশ হয়ে রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে গেলো,নওশাদকে কল করে বললো রুপা যেনো আহানার পাশে থাকে,সে ঢাকার ট্রেনের খবর নিতে যাচ্ছে
শান্তর কথামতো রুপা এসে আহানার পাশে শুয়ে পড়লো
শান্ত স্টেশনে এসে জানতে পারলো বিকাল ৪টা ২মিনিটের ট্রেন আছে মোহনগঞ্জ টু ঢাকা

সকাল ৮টা বেজে গেছে
আহানা চোখ খুলতেই বারান্দার বটগাছটা দেখতে পেলো,পর্দা সরিয়ে দিয়েছিলো শান্ত
হাসিমাখা মুখে উঠে বসলো সে,এপাশে তাকিয়ে শান্তকে দেখলো,শান্ত উল্টো হয়ে শুয়ে আছে
চাদর সরিয়ে বটগাছটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো আহানা
গাছটা পুরো ভিজে আছে,বৃষ্টি হয়েছিল কাল গভীর রাতে
তাই হয়ত গাছটার এই দশা

বেশ ভালোই লাগতেসে
ফ্রেশ মাইন্ড নিয়ে হাত মুখ ধুয়ে একটা নতুন জামা পরে রুম থেকে বের হলো সে
রিসোর্টের ঘাস ভর্তি খোলা মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে আকাশ দেখছে,হালকা রোদের ছটা আর মিষ্টি আবহাওয়া
তারপর দেখলো কজন মিলে চেয়ার টেবিল আনতেসে এদিকে
আহানা চমকে তাকালো,ম্যানেজার বললো শান্ত বলছে এখানে নাস্তা করবে
আহানা মাথা নাড়িয়ে এসে চেয়ারে বসলো,দোতলার দিকে তাকিয়ে আছে সে
ভাবতেসে শান্ত কি উঠেছে?নাকি উঠে নাই!
রুপা আর নওশাদ সেজেগুজে এসে পড়েছে,খাওয়াও শুরু করে দিয়েছে,আহানা শান্তকে ডাকার জন্য উঠতেই দেখলো শান্ত আসতেসে
পেস্ট কালারের জ্যাকেট,ব্ল্যাক জিন্স,খুব সুন্দর লাগছে ওকে,আহানাও আজ পেস্ট কালারের জামা পরে নিচে নেমেছিলো
“শান্ত তো তখন ঘুমে ছিল দেখলো কি করে আমি কি পরে নেমেছি,হয়ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখেছে”
শান্ত হেসে ওর পাশে বসে পড়লো,মনোযোগ দিয়ে পাউরুটিতে জেলি মাখতেসে সে
আহানা চমকে বললো “কার জন্য??রুটি ভাজি চিকেন সবই তো আছে তাহলে এটা?”

তোমার জন্য
কি?!!!আমি এসব খাবো না,আমি তো রুটি ভাজি খাবো
না তুমি হেলদি ফুড খাবা,আগে পাউরুটি পরে নাহয় রুটি খাইও
রুপা মুখ চেপে হাসতেসে
আহানা গাল ফুলিয়ে অনেক কষ্টে পাউরুটি ২পিস খেলো
তারপর রুটির দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইলো সে
এটা দেখে শান্ত ওকে রুটি খেতে দিলো

প্রেমের পাঁচফোড়ন পর্ব ৬৩+৬৪

খাওয়া শেষ করে শান্ত আর আহানা একটা গাছতলায় এসে বসলো আর রুপা নওশাদ মিলে দৌড়াদৌড়ি করতেসে
একটা সময় দুজনেই কাদায় পড়ে গেলো
রুপা নওশাদের অবস্থা দেখে আহানা আর শান্ত হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে
শেষে নওশাদ আর রুপা এসে ওদের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেলো কাদায়,৪জনে কাদায় মাখামাখি হয়ে ভূত হয়ে গেছে
শান্ত এক মুঠো কাদা নিয়ে আহানার সারামুখে গায়ে মেকআপের মত মাখাচ্ছে
আর আহানা রোবটের মত দাঁড়িয়ে থেকে শান্তর কান্ড দেখে যাচ্ছে

প্রেমের পাঁচফোড়ন পর্ব ৬৭+৬৮