Home প্রেমের বাজিমাত প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫০(২)

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫০(২)

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫০(২)
রোজ ও রুশা

নিলয় তো সহজে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে বারবার হেরার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, নিজের বন্ধুত্বের অধিকারটুকু দাবি করে। হেরার অনিচ্ছা সত্ত্বেও কখনো কখনো নিলয়ের সাথে কথা বলতে হয়, পা বাড়াতে হয় তার সাথে। হেরা যেন এক দোলাইচলের মাঝে আটকে আছে—সবকিছুই সে করে এক অদ্ভুত দ্বিধা নিয়ে। একদিকে নাভানকে সে একটু বাজিয়ে দেখতে চায়, আবার অন্যদিক থেকে এক অজানা ভয়ও তাকে গ্রাস করে। এই দুই টানাপোড়েনের মাঝেই কাটছে হেরার দিনগুলো। আজ দুপুরের কড়া রোদে তপ্ত, তৃষ্ণার্ত পথিক যেমন এক ফোঁটা জলের জন্য আকুল থাকে থাকে তার জলন্ত তৃষ্ণার্থ বুকে পানি দিয়ে ঠান্ডা করার জন্য , তেমনি…সেই সময় নাভানের বুকের ভেতর তেমন একটা তীব্র দাবানল জ্বলছিল। যখনই সে শুনল নিলয় আবারও হেরাকে তার জিম সেন্টারে নিয়ে গিয়েছে, তখনই তার মস্তিষ্কের সমস্ত শিরা উপশিরা যেন এক লহমায় ছিঁড়ে যেতে চাইল। রক্ত মাথায় উঠে যাওয়া কাকে বলে, তা আজ নিজের শরীরের প্রতিটি কোষে কোষে টের পাচ্ছিল নাভান। একটা অন্ধ, হিংস্র জেলাসি তাকে গ্রাস করে নিচ্ছিল। এই মেয়েটা কেন বোঝে না তার ভালোবাসা? কেন সে এত অবুঝ? নিলয় যে ওর দিকে কতটা কুৎসিত আর খারাপ দৃষ্টিতে তাকায়, সেটা বুঝতে হেরার আর কতদিন লাগবে? রাগে, ক্ষোভে আর এক অদ্ভুত অধিকারবোধের যন্ত্রণায় নাভান নিজের ঘরের জিনিসপত্র এক এক করে আছাড় মেরে ভাঙতে শুরু করল। কাচ ভাঙার ঝনঝন শব্দে পুরো ঘর প্রকম্পিত হয়ে উঠল, ঠিক যেমন তার বুকের ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল।

এমন সময় হেরা বাসায় পা দিতেই নাভান আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না। ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবার সামনেই সে হেরার হাত শক্ত করে চেপে ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিজের রুমের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। হেরা চরম অবাক হলো, তার ফর্সা মুখখানিতে বিস্ময় আর কিছুটা অস্বস্তি ফুটে উঠল। বাড়িতে তখন বড়রা নেই। রোজ, রুশা, অধীর—সবাই সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারা প্রত্যেকেই হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল নাভানের এই আকস্মিক রুদ্ররূপের দিকে। নাভানের চোখ-মুখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছিল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অধীর তড়িঘড়ি করে সৃজনকে ফোন করতেই সে মাত্র দুই মিনিটের মাথায় এসে হাজির হলো। ততক্ষণে নাভান হেরাকে টেনেহিঁচড়ে নিজের ব্যক্তিগত জিম রুমে নিয়ে এসেছে এবং ভেতরের দরজাটা সশব্দে আটকে দিয়েছে। হেরা চরম বিরক্ত এবং একই সাথে কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বললো —
” কী হচ্ছেটা কী? হাত ছাড়ুন আমার! আমায় এমনভাবে এখানে টেনে নিয়ে এসেছেন কেন?”
নাভান একটা কুটিল, হিংস্র হাসি হাসল। তার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। সে হেরার দিকে এক কদম এগিয়ে গিয়ে থমথমে গলায় বলল—

” জিম সেন্টার কখনো দেখোনি, তাই না? ভালো করে দেখে নাও। এখানে সব বিদেশি আর আধুনিক সরঞ্জাম রাখা আছে। আজ তোমার জিম করার সব শখ আমি এখানেই মেটাব।”
হেরা ভয়ে দু-কদম পিছিয়ে গিয়ে আমতা আমতা করে বলল—
” আ “আ ” আমার এখন সময় নেই, সরুন প্লিজ,আমি আমার রুমে যা” যা “যাবো ।”
কিন্তু নাভান আজ কোনো যুক্তি শোনার মুডে ছিল না। সে গর্জে উঠে বলল–
” জিম সেন্টারে গিয়েছিলে তো জিম করার জন্যই, তাই না? নাও, স্টার্ট করো!”
হেরা থতমত খেয়ে বলল–
” মানে…”।
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই নাভান পাশ থেকে একটা ভারী জিম ইন্সট্রুমেন্ট তুলে মেঝের ওপর সশব্দে আছাড় মারল। বিকট শব্দে হেরা ভয়ে এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে গেল। নাভান আবার চেঁচিয়ে উঠল —
” শুরু করো!” হেরা কাঁপতে কাঁপতে বলল —
“আ… আ… আমি?”

নাভান এবার দ্বিতীয় আরেকটি যন্ত্র তুলে মেঝেতে আছাড় মারল। নাভানকে এত ভয়ঙ্কর রূপে রাগতে হেরা আগে কখনো দেখেনি। আজ তার বুকটা দুরুদুরু করে কাঁপতে লাগল। তার ওপর আজ বাসায় বড়রা কেউ নেই যে তাকে বাঁচাবে। নিলয়ের কাছে যেতে নাভান কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছিল, তবুও সে অবাধ্য হয়েছে। সেদিন নাভানের হাতের ওই শক্ত থাপ্পড়ের কথা মনে পড়তেই হেরা ভয়ে একদম সিঁটিয়ে গেল। সে কান্নাকাটি করার মতো গলায় বলল —
” কী… কী”… কী” করব ভা”… ভাই”… ভাইয়া?”
” ভাইয়া ” শব্দটা শুনতেই নাভানের মেজাজ যেন আরও এক ধাপ চড়ে গেল । তার ভালোবাসার মানুষটি তাকে অন্য চোখে দেখছে , এটা তার পুরুষালী অহংকারে আঘাত করল । সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল —

” যাও , মেশিনের ওপর ওঠো। টানা ১ ঘণ্টা দৌড়াবে, তাও ফুল স্পিডে ! ”
শুনে হেরার চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে গেল। সে আর্তনাদ করে বলল —
” আ… আমি” পারব না “ভাইয়া!”
মুহূর্তের মধ্যে নাভান এগিয়ে এসে হেরার সাদা টি-শার্টের কলারটা এক হাত দিয়ে মুচড়ে ধরে নিজের একদম কাছাকাছি টেনে আনল। দুজনের নিঃশ্বাস তখন একে অপরের গায়ে আছড়ে পড়ছে। নাভান চোখ বড় বড় করে হেরা ধকধক করতে থাকা হৃদপিণ্ডের স্পন্দন টের পেয়েও নিষ্ঠুর গলায় বলল—
“এখন আমি যা যা বলব তা যদি না করিস, তবে তোর শরীরের প্রতিটি স্পর্শকাতর জায়গায় আমার হাত যাবে!”
কথাটি বলেই নাভান যেই অবহেলায় হেরার নরম গলায় আঙুল ছোঁয়াল, হেরা তীব্র আতঙ্কে ও লজ্জায় শিউরে উঠল। সে দু-কদম পিছিয়ে গিয়ে হাত জোড় করে বলল–

“আ… আ ” আপনি যা বলবেন, আ ” আ ” আমি তা” তা “… তাই করব!”
নাভান নিজে হেরাকে ট্রেডমিলে উঠিয়ে সুইচ অন করে দিল এবং গতি বাড়িয়ে দিল। হঠাৎ তীব্র গতিতে দৌড়াতে গিয়ে হেরা প্রথম দিকে পড়ে যেতে যেতেও কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল। তারপর সে অনবরত দৌড়াতে লাগল। নিষ্ঠুর নাভান ধীরে ধীরে মেশিনের স্পিড আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। মাত্র পাঁচ মিনিট পার হতেই হেরার ফর্সা শরীর বেয়ে ঘাম ঝরতে শুরু করল, তার সাদা টি-শার্টটি ঘামে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে গেল। মাথা থেকে টপটপ করে ঘাম ঝরে মেঝের চিবুক বেয়ে পড়ছিল। ফুসফুস ফেটে বাতাস বের হওয়ার উপক্রম হলেও নাভানের ভয়ে সে থামতে পারছিল না। অবশেষে দীর্ঘ ২০ মিনিটের মাথায় নাভান যখন সুইচের নবটা ঘুরিয়ে মেশিন অফ করল, হেরা তখন ক্লান্তিতে আর যন্ত্রণায় ভেঙে পড়েছে,হাপাতে লাগলো কিছুক্ষন । হেরা একজোড়া কাঁদোকাদো চোখ নিয়ে নাভানের দিকে তাকিয়ে ম্লান কণ্ঠে বলল—
” হয়েছে তো ভাইয়া? আমি এখন যাই…”
নাভান আবারও পশুর মতো ধমকে উঠল —
“না! যতক্ষণ পর্যন্ত আমি না বলব, ততক্ষণ এখানকার প্রত্যেকটা সরঞ্জামের কাজ করতে হবে। এখান থেকে যাওয়া মিলবে না!”

এরপর সে হেরাকে মেঝেতে পুশ-আপ (বুক ডডাউন) দিতে বলল। ক্লান্ত হেরা কোনোদিন এসব করেনি, নাভানের কথা শুনে তার হাত-পা যেন শুকিয়ে গেল। সে আদৌ একটা পুশ-আপ দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে নিজের মনেই ঘোর সন্দেহ ছিল। কিন্তু নাভানের রাগী চোখের সামনে সে বাধ্য হয়ে যেই নিচু হয়ে পুশ-আপ দিতে গেল, অসাবধানতাবশত তার ওড়নাটি বুক থেকে সম্পূর্ণ সরে গেল। হেরা নিচু হতেই নাভানের চোখ গিয়ে পড়ল তার উন্মুক্ত বক্ষে। তীব্র এক আদিম মেয়ালি আকর্ষণ আর দুর্বলতা নাভানের সমস্ত শরীরে বিদ্যুতের মতো খেলে গেল। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ে নাভান চট করে চোখ বন্ধ করে নিল এবং এক ঝটকায় হেরাকে টেনে দাঁড় করিয়ে দিল।
নিজের ভেতরের এই অবাধ্য দুর্বলতাকে আড়াল করতে নাভান উল্টো হেরাকেই দোষী সাব্যস্ত করে চেঁচিয়ে উঠল —

” এই বেয়াদব মেয়ে! আমায় সিডিউস করছো ? তোমার লোভনীয় জায়গা দেখিয়ে আমার মন ভোলাতে চাইছ? ওঠো এখান থেকে, এটা করতে হবে না!”
নাভান রাগের মাথায় পাশ থেকে একটা ভারী হ্যান্ড পেয়ার (ডাম্বেল) এনে হেরার হাতে ধরিয়ে দিল। হেরা কাঁপতে কাঁপতে সেটা যেই নিচে নামাতে গেল, ক্লান্তির কারণে ভারসাম্য রাখতে পারল না। পুরো ভারী সরঞ্জামটি সশব্দে তার নরম হাতের ওপর এসে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে জায়গাটা কালচে ও নীলচে আকার ধারণ করল। তীব্র যন্ত্রণায় হেরা উফ করে উঠলেও নাভানের রাগ যেন তাতেও কমল না। সে এবার মেঝের মাদুরের দিকে আঙুল নির্দেশ করে বলল —
“এবার ওই মাদুরের ওপর শুয়ে ক্রাঞ্চেস করো!”

হেরা আর চোখের জল ধরে রাখতে পারল না। সে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে মাদুরের ওপর শুয়ে পড়ল। নাভানের দেখিয়ে দেওয়া প্রতিটি ব্যায়াম করতে গিয়ে তার বুকটা হাঁপরের মতো ওঠানামা করছিল। সে পুরোপুরি হাঁপিয়ে উঠেছিল, শরীর আর দিচ্ছিল না। এমন সময় দরজার ওপাশ থেকে সৃজন আর অধীরের চিৎকার ও ডাকাডাকি শুনতে পেল হেরা। বাইরের মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে সে যেন মনের ভেতর একটু সাহস পেল। নাভান যেই মাত্র দরজার দিকে পেছন ঘুরে তাকাল, হেরা সেই সুযোগে মাদুর ছেড়ে দরজার দিকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করল। কিন্তু নাভানের নজর এড়ানো এত সহজ নয়! সে এক ঝটকায় পেছন থেকে হেরার পা টেনে ধরে নিজের দিকে নিয়ে এল এবং নিজের দুই পা দিয়ে হেরার পা দুটোকে শক্ত করে লক করে দাঁড়িয়ে রইল। হেরা মেঝেতে পড়ে গেল।
নাভান হেরার ওপর ঝুঁকে পড়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলল—

” পালানো এত সহজ? এত যখন জিম সেন্টারে যাওয়ার শখ, আজ এখানেই থাকো!”
হেরা তখন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ফোঁপাতে লাগল–
” আ… আমি আর কখনো যাব না। কোনোদিন আর কোনো জিম সেন্টারে যাব না!”
নাভান গর্জে উঠে, কতোবার বলেছে কিন্তু হেরা শুনে নি —
” তুই একটা অবাধ্য মেয়ে!” নাভান দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
” সত্যি বলছি, একবার বিশ্বাস করুন! বাপের জন্মেও আর কখনো কোনো জিম সেন্টারের দিকে পা বাড়াবো না!” হেরা কাঁদতে কাঁদতে আর্তি জানাল।

কিন্তু নাভান তখন নিজের জেদ আর রাগের মাথায় এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিল যে সে হেরার কোনো কথাই শুনতে পাচ্ছিল না। হেরা যে হাপাচ্ছে নিশ্বাস নিতে পারছে না ঠিক করে তা খেয়ালে নেই নাভানের। সে নিজের মনেই প্রতিজ্ঞা করে বসেছে যে এই অবাধ্য মেয়েটাকে আজ সে চরম শিক্ষা দিয়েই ছাড়বে। তীব্র জেদের বশে সে হেরার বর্তমান শারীরিক অবস্থার দিকে লক্ষই করেনি। তীব্র গরমে আর পরিশ্রমে হেরার সাদা টি-শার্টটি ঘামে সম্পূর্ণ ভিজে সপসপে হয়ে গিয়েছিল, যার কারণে শরীরের বহু অংশ খুব বিশ্রী ও উন্মুক্ত দেখাচ্ছিল। তার দুধে-আলতা ফর্সা মুখখানা অতিরিক্ত রক্ত সঞ্চালনের কারণে একদম লাল রক্তবর্ণ ধারণ করেছিল। ভারী ডাম্বেল পড়ে হাতটা কালচে হয়ে ফুলে উঠেছিল। হঠাৎ করেই, ব্যায়ামের তীব্র ধকল আর প্রচণ্ড আতঙ্কে হেরার শরীরটা আর সায় দিল না। সে অবশ হয়ে মেঝের ওপর ঢলে পড়ল।
নাভান কিছুটা বিরক্ত হয়ে যেই তার দিকে তাকাল, অমনি তার বুকের ভেতরটা যেন এক নিমিষে হিম হয়ে গেল! সে দেখল, অচৈতন্য হেরার নাক আর মুখ গড়িয়ে তাজা লাল রক্ত মেঝেতে গড়িয়ে পড়ছে।
মুহূর্তের মধ্যে নাভানের মাথার সমস্ত রাগ, জেদ আর অহংকার ধুলোয় মিশে গেল। তার সমস্ত হুশ এক লহমায় ফিরে এল। নিজের চোখের সামনে নিজের ভালোবাসার মানুষকে এভাবে রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়তে দেখে নাভানের বুকের পাঁজর যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। যে জেলাসি আর তীব্র ভালোবাসার অভিমানে সে হেরাকে কষ্ট দিতে চেয়েছিল, সেই কষ্ট এখন তীরের মতো এসে বিঁধল নাভানের নিজের বুকেই। সে এক তীব্র অপরাধবোধ আর বুক ফাটানো আর্তনাদ নিয়ে হেরার নিথর শরীরটাকে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল।

“এই মিসাইল গার্ল! এই প পরি বউ, এই অক্সিজেন, কী হয়েছে তোর? আর ইউ ওকে? অক্সিজেন… প্লিজ চোখ খোল, আ আমায় ভয় দেখাস না প্লিজ। আ আমি তো ইচ্ছে করে করি নি, আমার রাগ হয় খুব। কেনো তুই আমার অবাধ্য হস। আ, আম, সরি অক্সিজেন, প্লিজ ওপেন ইউর আইস।
নাভানের ভেতরের পাথরটা যেন মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা তীব্র এক ভূমিকম্পে কেঁপে উঠছে। যে মেয়েটার ওপর একটু আগে সে নিজের সমস্ত ক্ষোভ আর জেদ উগরে দিচ্ছিল, তাকে এভাবে নিস্তেজ হয়ে পড়তে দেখে নাভানের নিজের অজান্তেই মুখ থেকে ছিটকে বের হলো—
” ড্যাম ইট! একি করলাম আমি? উফ শিট! আবার আমার কলিজাটাকে কষ্ট দিয়েছি। নো নাভান, এটা তুই একদম ঠিক করলি না। এর শাস্তি তোকে পেতেই হবে!”
বাইরে তখন রোজ আর সৃজনের অবিরাম চিৎকার। তারা দরজায় ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে।
” প্লিজ ভাইয়া, হেরাকে আজ ছেড়ে দাও!”
(রোজের আকুতি।)
” নাভান! তুই বনুকে ছেড়ে দে বলছি, দরজা খোল!” (সৃজনের বজ্রকণ্ঠ)

অধীর আর রুশা বাইরে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের ভেতরের নিস্তব্ধতা বাইরে থাকা সবার বুকেই এক অজানা ভয়ের সৃষ্টি করছিল। তারা অনেক ডেকেও যখন নাভানের কোনো সাড়া পাচ্ছিল না, তখন সবার মাথায় কেবল একটা আশঙ্কাই ঘুরপাক খাচ্ছিল— কিছু একটা খুব খারাপ ঘটে গেছে।
কিন্তু ঘরের ভেতরের সত্যটা সম্পূর্ণ আলাদা। নাভান হেরার এই অবস্থা দেখে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছিল। সে ঝট করে নিজের গায়ের শার্টটা খুলে পরম যত্নে হেরার গায়ে জড়িয়ে দিল, যেন সামনের দরজা খুললে সৃজন বা অধীরের নজর ওর ওপর না পড়ে। হেরা শুধু তার— শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত হেরার ওপর কেবল তারই অধিকার। এরপর এক ঝটকায় হেরাকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে সে দরজা খুলে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল।

মুহূর্তের মধ্যে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রোজ আর রুশা কান্নায় ভেঙে পড়ল। রুশার চোখ-নাক কেঁদে লাল হয়ে গেছে, আর রোজ তার প্রিয় বান্ধবী রুপি বোনের এই অবস্থা দেখে প্রায় হাইপার হয়ে যাওয়ার জোগাড়। নাভান হূৎপিণ্ডের তীব্র স্পন্দন সামলে হেরাকে নিজের বিছানায় শুইয়ে দিয়েই ডাক্তারকে ফোন করতে উদ্যত হলো। ঠিক তখনই সৃজন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
ক্ষোভে, রাগে নিজের বোনের মতো মেয়েটিকে হারানোর ভয়ে সৃজন ছুটে গিয়ে নাভানের কলার চেপে ধরল। দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল —
” তুই কি মানুষ, নাকি জানোয়ারে পরিণত হচ্ছিস নাভান? তুই কি সেই পুরোনো নাভান? আমার তোকে চিনতে আজ ভুল হচ্ছে! তুই একের পর এক মেয়েটার ওপর কেন এভাবে অত্যাচার করছিস? তুই তো নিজেই বলেছিলি তুই ওকে ভালোবাসিস না! তবে কেন ওর প্রতি এই তীব্র দরদ? কেন এই অধিকারের জ্বালা? শুধুমাত্র একটা জোরপূর্বক সম্পর্কের জন্য? যদি আজ আমার বোনটার কিছু হয়, সিরিয়ালি বলছি নাভান, আমি আমাদের এতদিনের বন্ধুত্ব ভুলে যাব!

ঠিক সেই মুহূর্তে ঝিনুক আর তুষারও খবর পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ছুটে এলো। ঝিনুক হেরার অবস্থা দেখে এবং সৃজনের কথা শুনে আর চুপ থাকতে পারল না। সেও চেঁচিয়ে উঠল —
“এখন ডাক্তারকে খবর দিয়ে লাভ কী নাভান? যখন মেয়েটার ওপর অত্যাচার করিস, তখন এই বোধটা কোথায় থাকে তোর? কেন করিস এমন? সত্যি করে বল, তুই কি ওকে ভালোবাসিস, নাকি শুধু একটা নামেমাত্র সম্পর্কের টানে ওকে এভাবে শেষ করছিস?”
সবার তীব্র বাক্যবাণে নাভান তখন পাথরের মতো নিশ্চল। নাভানের ফর্সা মুখটা রাগে ও ভেতরে জমে থাকা এক তীব্র যন্ত্রণায় একদম লাল বর্ণ ধারণ করেছে। তার মাথাটা ঝিমঝিম করছে, মনে হচ্ছে এই বুঝি সে মাটিতে লুটিয়ে পড়বে। কেউ জানে না, এই কঠিন, নিষ্ঠুর নাভানের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক মারাত্মক অসুস্থতা। অতিরিক্ত মানসিক চাপ আর তীব্র প্যানিক অ্যাটাকের কারণে তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ছুটে আসে, সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কিন্তু তুষার পরিস্থিতি বুঝতে পেরে নাভানের দিকে এগিয়ে গেল এবং বলল।
” ডাক্তারকে ফোন দিতে হবে না, আমি দেখছি।”
তুষার তড়িঘড়ি করে হেরাকে ভালোমতো চেকআপ করল। তারপর উপস্থিত সবার দিকে তাকিয়ে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল,

“ভয়ের কিছু নেই। অতিরিক্ত গরম এবং অতিরিক্ত ওজনের জিনিস নেয়ার কারণে ক্লান্ত হয়ে পরেছে। আর অতিরিক্ত ভয়ে আসলে এটা একটা মারাত্মক প্যানিক অ্যাটাক। অতিরিক্ত ভয় বা মেন্টাল প্রেশার অনেকে হুট করে মাথায় নিতে পারে না, হেরার মস্তিষ্ক সেটা ধারণ করতে পারে না। অনেকেরই এই রোগটা থাকে। একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে। আমি কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি।
আর নাকে নখের খোচা লেগে রক্ত বেরহয়ে সেটা মুখ অব্দি এসেছে ভয়ের কিছু নেই।
” তুষারের কথা শুনে অধীর এক ছুটে বাইরে গেল ওষুধগুলো নিয়ে আসার জন্য।
মেডিকেল চেকআপ শেষ হতেই সৃজন আবার নাভানের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে তখনো প্রশ্নের আগুন।
” বল নাভান, তুই কি হেরা বনুকে ভালোবাসিস?”
নাভান সৃজনকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এক ঝটকায় তার হাতটা সরিয়ে দিল। তার চোখ দুটো তখন রাগে আর এক প্রচ্ছন্ন অভিমানে জ্বলছে। সে এক অদ্ভুত কঠোর দৃষ্টিতে সৃজনের দিকে তাকিয়ে বলল, ”
” যে সম্পর্কে কোনো ভালোবাসা নেই, আমি শুধু সেই দায়িত্বটুকুই পালন করছি।”
সৃজনও ছাড়ার পাত্র নয়। সে তীব্র কণ্ঠে প্রত্যুত্তর দিল,

” হেরা হয়তো রক্তে আমার বোন নয়। কিন্তু এই কয়দিনে সে আমার নিজের বোনের জায়গাটা নিয়ে নিয়েছে। রুশা আর হেরাকে আমি কখনোই আলাদা চোখে দেখি না। রক্তে না হতে পারে, কিন্তু মনে তারা আমার বোন। আমার বোনেদের বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলে আমি তোকে ছেড়ে কথা বলব না নাভান, তুই আমার যতই জানে জিগার দোস্ত হস না কেন! আমি আবারও জিজ্ঞেস করছি, তুই কি সত্যি ওকে ভালোবাসিস না?”
নাভানের ঠোঁটের কোণে তখন এক অদ্ভুত, বিষাদময় ও তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। কেউ জানল না, এই নাভান হেরা-কে আজ থেকে ভালোবাসেনি, ভালোবেসেছে সেই ছোটবেলা থেকে। যখন থেকে সে বুঝতে শিখেছে, তখন থেকেই তার পুরো পৃথিবী জুড়ে ছিল হেরা। কিন্তু বিধাতার নির্মম পরিহাসে তারা আলাদা!
আবার যখন সে জানতে পারল, হেরার মস্তিষ্কে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া যাবে না এবং তাকে পুরোনো কোনো স্মৃতি মনে করানোর চেষ্টা করা যাবে না,এতে সে মৃত্যুর ঝুকিতে পরে যাবে — তখন থেকেই নাভানের বুকের ভেতর একটা অদৃশ্য ভাঙন শুরু হয়েছিল। নাভান কিছুতেই মেনে নিতে পারে না যে, হেরার স্মৃতি থেকে তার অস্তিত্বটাই মুছে গেছে! যে হেরা একসময় তাকে পাগলের মতো ভালোবাসত, আজ সে তাকে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে এক অচেনা মানুষ বানিয়ে রেখেছে।

নাভানের তীব্র রাগ আর জেদের আসল কারণ তো এটাই। হেরা তাকে ভুলে গেছে, এই অভিমানে সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে; অথচ সে নিজেও তো তার শৈশবের সেই প্রথম ও একমাত্র অনুভূতিকে নিজের কাছে লুকিয়ে বেচে আছে,পবিবারের দূরুত্ব,ভালোবাসার দূরুত্ব যখন সে বুঝতে পারে হেরাকে সত্যি সে ভালোবাসে,তখন থেকে তার মন মস্তিষ্ক একটু উগ্র হয়ে গিয়েছে,হাসি খুশি চিরতরে মুছে গেছে । তাই আজ সে হেরা-কে জোর করে কিছু মনে করাতে চায় না, সে চায় হেরা তার এই নতুন রূপেরই প্রেমে পড়ুক। কিন্তু নাভান এ যাবৎকাল হেরার সামনে নিজেকে এতটা নিষ্ঠুর ও খারাপভাবে উপস্থাপন করেছে যে, হেরার চোখে এখন তার জন্য কেবলই ঘৃণা। নাভান ভালো করেই জানে, এই মুহূর্তে ভালোবাসার কথা বললে হেরা তা বিশ্বাস করবে না, উল্টো আরও দূরে সরে যাবে,তার ক্ষতি হবে। তাই সে নিজের মুখে ভালোবাসার কথা না বলে, অধিকার আর শাসনের আড়ালে হেরার মনে সেই পুরোনো অনুভূতির ফুল আস্তে আস্তে নতুন করে ফোটাতে চায়। সে চায় হেরা তাকে ঘৃণা করতে করতেও একসময় তার উপস্থিতিতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠুক, তার এই রুক্ষতাকেও নিজের অভ্যাসে পরিণত করে নিক— আর এই গভীর চাওয়া থেকেই তো সে হেরাকে নিজের করে নিয়েছে, বিয়ে করেছে। মুখে সে ভালোবাসার দাবি করতে পারছে না ঠিকই, কিন্তু অবাধ্য অধিকার খাটানোর আড়ালে বুঝতে চাচ্ছে। সে আসলে হেরার মুখ থেকেই নতুন করে ‘ভালোবাসি’ শব্দটা শুনতে চায় , হেরার অতীত মনে করে নয়, বরং এই রাগী, জেদি নাভানেরই প্রেমে নতুন করে হাবুডুবু খাক এবং নিজ থেকে তার বুকে ফিরে আসুক; আর সেই অপেক্ষাতেই নাভান নিজেকে এক নিষ্ঠুর শাসকের মুখোশে আড়াল করে প্রতিনিয়ত এক নীল দহনে পুড়ছে।

হেরার এই মস্তিষ্কের অসুস্থতার কথা, — যে, হেরা বেশি চাপ নিতে পারে না, বেশি আবেগ সহ্য করতে পারে না, তখন থেকেই নাভান নিজের ভেতর এক অদ্ভুত, আত্মঘাতী দেওয়াল তুলে নিয়েছে। সে ভয় পায়, তার গভীর ভালোবাসার তীব্রতা যদি হেরার অসুস্থ মস্তিষ্ক সহ্য করতে না পারে? যদি তার ভালোবাসাই হেরার ক্ষতির কারণ হয়?
নিজের ভেতরের এই রক্তক্ষরণ আর হেরাকে হারানোর সেই তীব্র ভয়কে এক পাশে ঠেলে দিয়ে সে বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মুখে সেই চিরচেনা কঠোরতা এনে সৃজনকে বলল–
“ভালোবাসা? ও কি ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য? ওকে ভালোবাসা যায় না সৃজন… ওকে শুধু অধিকার দেখানোই যায়! ও তো কেবল অধিকার খাটানোর পাত্রী, ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য ও নয়। আর ভালোবাসার মতো ফালতু অনুভূতি এই নাভানের ডিকশনারিতে নেই, শুনে রাখিস!”

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫০

কথাগুলো বলেই নাভান আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। নিজের ভেতরের তীব্র প্যানিক অ্যাটাক, হৃদপিণ্ডের অবাধ্য স্পন্দন আর শারীরিক কষ্টকে আড়াল করে সে খটখট শব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
কেউ দেখল না, করিডোরের অন্ধকার কোণায় গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ধপ করে বসে পড়ল নাভান। তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল, আর তার নাকের কোণ ঘেঁষে চুইয়ে পড়ল এক ফোঁটা তাজা রক্ত। এই রক্ত হেরার প্রতি তার সেই নিষিদ্ধ, অপ্রকাশিত এবং আজন্ম লালিত ভালোবাসারই এক নীরব ও নির্মম দলিল।

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here