ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১
নওরিন কবির তিশা
—‘ ফার্স্ট অফ অল এক বাচ্চার বাপ উনি তাই উনি নেভির ক্যাপ্টেন হোক কিংবা সামান্য অফিসার আমার তাতে বিন্দুমাত্র কিছু যায় আসে না।আমি কিছুতেই ওনাকে বিয়ে করতে পারব না।
তৃষা তীব্র চিৎকারে কথাগুলো বললেও ঘরের অন্য দুই সদস্যের মধ্যে বিশেষ কোনো বিকার দেখা গেল না। ভাবি শায়লা বেগম পাষাণমূর্তির ন্যায় নির্বিকার চিত্তে বসে আছেন; আর বড় ভাই তৌফিক সাহেব অপরাধীর মতো মস্তক অবনত করে নিঃশব্দে অবস্থান করছেন।
তৃষা সদ্য কলেজে পদর্পণ করেছে বলা যায়;চঞ্চলতা তার স্বভাবজাত।উচ্চমাধ্যমিকের দ্বিতীয় বর্ষের অত্যন্ত মনোযোগী একজন শিক্ষার্থী। বাড়ি সুর্বণ নগর গ্রামে হলেও পড়াশোনার খাতিরে শহরে থাকে সে। তবে দুদিন আগে বড় ভাইয়ের অসুস্থতার খবরে,হন্তদন্ত হয়ে জরুরী ভিত্তিক ছুটি নিয়েই আজ হোস্টেল থেকে ছুটে এসেছে সে।
অথচ বাড়ি এসে দেখল, ভাইয়ার অসুখটা আসলে একটা বাহানা মাত্র। আসল উদ্দেশ্য তাকে বিয়ে দেওয়া। সাধারণ বিয়ে হলে তার হয়তো কোন আপত্তি থাকতো না কিন্তু যখন শুনলো তার পাত্র আর্য এহসান;শায়লা বেগমের দূর সম্পর্কের আত্মীয় এবং নেভির দাপুটে ক্যাপ্টেন তৎক্ষণাৎ বেঁকে বসেছে সে। কারণ একটাই আর্য বিপত্নীক, শুধু তাই নয় তার পাঁচ বছরের একটি মেয়েও আছে তার।
তৃষা ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,,,
—-‘ভাইয়া, তুমি অন্তত কিছু বলো! আমায় এভাবে মিথ্যা বলে ডেকে এনে এই বয়সে একটা বাচ্চার মায়ের চেয়ারে বসিয়ে দিতে চাইছ?
শায়লা বেগম এবার মুখ খুললেন। গলার স্বর তীক্ষ্ণ করে বললেন,,
—-‘অনেক তো হলো! বাবা-মা মরা ননদকে নিজের মেয়ের মতো আগলে রেখেছি। এখন আমাদের ঘাড়ে বসে আর কতদিন খাবি? ভালো পাত্র পেয়েছি, তাই সম্বন্ধ করেছি। তোর ভালোর জন্যই বলছি তৃষা, জেদ করিস না।
ভাবির মুখের এই কর্কশ কথাগুলো তৃষার বুকে তীরের মতো বিঁধল। নিজের ভাইকেও আজ কেমন যেন অচেনা মনে হচ্ছে তার। তৌফিক সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,,
—-‘তৃষা, আর্য মানুষ হিসেবে খুব ভালো। তোর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে রে বোন আমার আর জেদ করিস না।
তৃষা বরাবরই বড্ড একগুঁয়ে। জেদ আর ক্রোধে প্রকম্পিত কন্ঠে সে বলল,,
—-‘আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে তোমাদের চিন্তা করা লাগবে না ভাইয়া! বড্ড ভেবেছো আমাকে নিয়ে। এবার আমার নিজের চিন্তা আমাকে করতে দাও। এই বিয়ে আমি করবো না, করবো না মানে করবই না।
শায়লা বেগম অত্যন্ত ধূর্ত রমণী। আর্যর সাথে বিয়ে হলে তৃষার ভবিষ্যৎ করবে কিনা সে ব্যাপারে তার কিচ্ছু যায় আসেনা। তিনি চিন্তিত নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে। আর্যর সাথে তৃষার বিয়ে হলে তার ভবিষ্যৎ আর তার ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ পরিষ্কার। শায়লা বেগম এবার সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তৌফিক নেওয়াজের দিকে আঙুল উঁচিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলতে শুরু করলেন,,
—-‘এই জন্যই বলেছিলাম বোনকে বেশি আস্কারা দিও না। শুনলে না আমার কথা, পাঠালে শহরে পড়তে! এখন বুঝছ তো ঠেলা? এত বড় মেয়ে এখন মাথার ওপর চড়ে নাচছে, মুখে মুখে তর্ক করছে! আমাদের খেয়ে পরে আমাদেরই অপমান করছে।
তৌফিক সাহেব অসহায়ের মতো মিনমিন করে বললেন,,
——‘আরে ও তো ছোট মানুষ, হুট করে সব শুনে ঘাবড়ে গেছে…
‘ছোট মানুষ?’—–শায়লা বেগমের ব্যঙ্গাত্মক হাসিতে ঘর যেন কেঁপে উঠল। —‘আঠারো বছর বয়স হয়েছে, একে ছোট মানুষ বলে না। আর কতকাল আমাদের হাড়মাস জ্বালিয়ে এখানে পড়ে থাকবে? আমরা কি নিজেদের সন্তানদের বাদ দিয়ে আজীবন ওর পেছনে টাকা ঢালব? ক্যাপ্টেন আর্যর মতো পাত্র কপালে জোটা ভাগ্যের ব্যাপার। আর্যর হাত ধরে এই পরিবারে উন্নতি আসবে বলেই তো আমি এত খাটছি। আর উনি এখন নখরা দেখাচ্ছেন!
তৃষা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। ভাবির কথাগুলো তার আত্মসম্মানে প্রচণ্ড আঘাত করল। সে বুঝতে পারল, এই বাড়িতে তার অবস্থান এখন কেবলই একজন বোঝা হিসেবে। তার পড়াশোনা, তার স্বপ্ন—সবই শায়লা বেগমের চোখে অপচয়।শায়লা বেগম থামলেন না, আরও বি*ষ ঢেলে বললেন,,
—– ‘নিজের মা-বাপ তো নেই, এখন আমরা মরে গেলেই তো বাঁচিস! তাহলে বুঝতি দুনিয়া কত কঠিন। আমাদের ঘাড় মটকে খেয়ে এখন সতীপনা দেখানো হচ্ছে! রাজী না হলে আজই হোস্টেলে চলে যা, আর কোনোদিন এই বাড়ির মুখ দেখবি না। আমরাও দায়মুক্ত হই।
তৌফিক সাহেব অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে রইলেন। নিজের আদরের বোনটার দিকে চেয়ে একটা প্রতিবাদ করার সাহসও তার নেই।তৃষার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল,,
——‘কিন্তু পরক্ষণেই সে সেটা মুছে ফেলল। জেদটা এখন আর বিয়ে না করার ওপর নেই, বরং এই বাড়ি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার ওপর চেপে বসেছে। শায়লা বেগমের প্রতিটি কথা তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, এখানে তার মায়ার কোনো দাম নেই।
তৃষা কাঁপাকাঁপা গলায়, কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলল,,
—-‘থামো ভাবি! আর একটা কথাও বলবে না। আমি বুঝতে পেরেছি আমি তোমাদের কাছে কতটা অপছন্দের। তোমাদের ঘাড় থেকে নামার জন্য যদি এই বিয়েটাই সমাধান হয়, তবে আমি রাজি।
তৌফিক সাহেব চমকে উঠে ডাকলেন,,—‘তৃষা!
তৃষা ভাইয়ের দিকে না তাকিয়ে শায়লা বেগমের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—-‘আমি বিয়ে করব। আজই করব। তবে মনে রেখো ভাবি, আজ এই বাড়ি থেকে বিদায় নিচ্ছি মানে চিরকালের জন্যই নিচ্ছি।
শায়লা বেগমের মুখে এক পৈশাচিক জয়ের হাসি ফুটে উঠল। তিনি ব্যস্ত হয়ে বললেন,,
—-‘এই তো লক্ষ্মী মেয়ের মতো কথা। ইশার বাবা যাও আয়েশা কাকিমাদের খবর দাও। ওরা তো আজই আসতে চেয়েছিল,আর কাজি সাহেবকেও বলে রাখো। আজ রাতেই শুভ কাজটা সেরে ফেলি।
তৃষা ধীর পায়ে নিজের ঘরের দিকে হেঁটে গেল। অথচ তার চঞ্চল মনটা আজ নিথর হয়ে গেছে। যার সাথে জীবন শুরু হতে যাচ্ছে, তার প্রতি কোনো ভালোবাসা নেই, নেই কোনো আগ্রহ—আছে কেবল এক বুক অভিমান আর নিরুপায় হয়ে মেনে নেওয়া এক নিয়তি।
পৌষের শেষ প্রহর আসন্ন। দিবালোক ম্লান হয়ে আসাতে ছায়া বিস্তার দীর্ঘতর হয়েছে; আকাশপ্রান্তে গোধূলির রাঙা আভা যেন কোনো এক বিদায়-ব্যথার করুণ রাগিণী আলাপ করছে। নীল দিগন্ত কমলাভ রঙে রঞ্জিত। আর্যদের গাড়িটা এসে থামল সুবর্ণ নগর গ্রামের শান্ত প্রান্তর চিরে এক সুদৃশ্য অট্টালিকার সম্মুখে।
বাড়িটি দুই তলা বিশিষ্ট, ওপরে তৃন-সবুজ রঙের টিনের ছাউনি, যা শহুরে মানুষের কাছে টিনশেড হিসেবে পরিচিত। চারদিকের পরিপাটি বাগান আর কারুকার্যময় স্থাপত্য বলে দেয়, এ পরিবারটি কেবল বিত্তবানই নয়, যথেষ্ট রুচিবোধসম্পন্ন।
গাড়ির ভেতরে ক্যাপ্টেন আর্য এহসানের মুখচ্ছবি শ্রাবণের মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মতো গম্ভীর। ললাটে চিন্তার সূক্ষ্ম রেখা। এই পরিণয়ে তার বিন্দুমাত্র অভিপ্রায় ছিল না; বরং একপ্রকার বাধ্য হয়েই সে আজ এখানে উপস্থিত। সহধর্মিণীর সেই আকস্মিক ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মৃ*ত্যুর পর তার জগতটা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে।
বিশেষ করে তার পাঁচ বছরের মেয়েটি যে একসময় প্রজাপতির মতো চঞ্চল ছিল, সে এখন এক বিষণ্ণ ছায়ায় পরিণত হয়েছে। বাবার সান্নিধ্য ছাড়া সে এক মুহূর্ত স্থির থাকতে পারে না, এমনকি কক্ষের বাইরে পর্যন্ত পা বাড়ায় না। অথচ পেশার তাগিদে আর্যকে দিনের অধিকাংশ সময় সমুদ্রের নোনা জলে আর রণতরীর ব্যস্ততায় অতিবাহিত করতে হয়।
প্রাণ প্রিয়তমাকে হারিয়ে আর্য জগৎটাও বড্ড অগোছালো। তার ওপর মাতৃহীনা ছোট্ট মেয়েটি তার চোখের মনি। মেয়েটির সামান্য কষ্টও সহ্য করা সম্ভব নয় আর্যর পক্ষে। তাই বিয়েতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছা না থাকলেও শুধু মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে চাচির কথায় রাজি হয়েছে সে।
গাড়ি থেকে নামার আগে আর্য একবার নিজের মনেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নীল দিগন্তের কমলাভ আভা তখন ক্রমশ গাঢ় অন্ধকারে লীন হতে শুরু করেছে।তৌফিক সাহেব গাড়ির শব্দ পেতেই ব্যস্তসমস্ত হয়ে বাড়ির সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলেন। মুখে মেকি হাসির রেখা থাকলেও দৃষ্টিতে অপরাধবোধের ছায়া। শায়লা বেগমও ভেতর থেকে উৎসুক নয়নে তাকিয়ে আছেন—তার আকাঙ্ক্ষার সিদ্ধি বুঝি এই মূহুর্তেই হতে চলেছে।
অন্দরমহলে তৃষার শয়নকক্ষে তখন কৃত্রিম উৎসবের আয়োজন চলছে। বাতাসের আর্দ্রতায় পৌষের হাড়কাঁপানো শীতের চেয়েও বেশি অনুভূত হচ্ছে এক থমথমে নীরবতা। তৃষার ছোটবেলার দুই সখী—ওহি আর সিয়া, তাকে বিবাহের সাজে সাজাতে ব্যস্ত। পাড়ার চঞ্চল মেয়েদের স্বভাবসুলভ কৌতূহল আর হাসাহাসি আজ যেন তৃষার কানে তপ্ত বালুর মতো বিঁধছে।
ওহি ওর চুলে ফুল গুঁজতে গেল, তৃষা ঝটকা দিয়ে মাথাটা সরিয়ে নিল।ওহি। মুখ ছোট করে বলল,,,
—-‘আরে তৃষা, অন্তত একটু তো হাস! শুনলাম বরের নাকি হেব্বি পার্সোনালিটি। নেভির ক্যাপ্টেন বলে কথা, তার ওপর দেখতেও নাকি দারুণ!
তৃষা আয়নার দিকে তাকিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল; বলল,,
—– ‘পার্সোনালিটি দিয়ে কি ধুয়ে খাব? ফার্স্ট অফ অল, উনি এক বাচ্চার বাপ। তোদের কাছে এটা দারুণ মনে হতে পারে, আমার কাছে এটা জাস্ট একটা ট্র্যাপ। এতই যখন পছন্দ, যা না—নিজে গিয়ে বিয়ে করে আয়। কে মানা করেছে?
সিয়া ফিসফিস করে বলল,,
—-‘উফ তৃষা! কী সব বলছিস! বাচ্চার মা হবি তো কী হয়েছে?ক্যাপ্টেন ওয়াইফ হওয়ার সুযোগ কি সবাই পায়? আর এমনিতেও তোর তো বাচ্চা অনেক পছন্দ!
—-‘ওটা ওয়াইফ না সেকেন্ড ওয়াইফ সিয়া।আর সেকেন্ড ওয়াইফ হওয়ার শখ আমার কোনোকালেই ছিল না। আর এটা ঠিক যে আমার বাচ্চা অনেক পছন্দ কিন্তু তা বলে অন্যের বাচ্চার মা? নিজের পড়াশোনা, ক্যারিয়ার সব বিসর্জন দিয়ে আমি অন্যের বাচ্চার ন্যানি হতে যাব কোন দুঃখে?
তৃষার প্রত্যুত্তরে ওহি সিয়া রীতিমতো চুপসে গিয়েছে। তবে তৃষা দামেনি। আরো কিছু কড়া কথা শোনানোর জন্য তৈরি হচ্ছে সে.ঠিক তখনই ঘরে ঢুকলেন শায়লা বেগম। তৃষার ত্যাড়া কথাগুলো উনার কানে গেছে। তিনি কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন,,,
—-‘তোর ড্রামা কি শেষ হবে না তৃষা? বাইরে গেস্টরা এসে বসে আছে, আর তুই এখানে ফ্রেন্ডদের সাথে সিন ক্রিয়েট করছিস!
তৃষা উঠে দাঁড়াল। পরনের শাড়িটা যেন ওর কাছে একটা বোঝা। ও ভাবির চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি বলল,,
—-‘সিন আমি ক্রিয়েট করছি না ভাবি, তোমরা করেছ। যে নাটকটা শুরু করেছ, সেটার শেষ দেখার জন্যই তো এখানে বসে আছি। চলো, কোথায় যেতে হবে?
শায়লা বেগম মনে মনে রেগে গেলেও এখন তা দেখালেন না। কারণ আজকের রাতটা পার করতে পারলেই ওনার আপদ বিদায় হবে। তিনি তৃষার হাত ধরে একরকম টেনে নিয়ে যেতে যেতে বললেন,,,
—–‘এই তেজটা যেন বাসর ঘরেও থাকে। তখন বুঝবি দুনিয়া কত কঠিন।
—-‘আমি না হয় বুঝব দুনিয়াটা কঠিন কতটা! তবে তবে তোমার নিজেরও কিন্তু একটা মেয়ে আছে ভাবি। তাকেও এভাবে জীবনের বাস্তবতা শেখাবে তো?
শায়লা বেগম ক্রোধিত দৃষ্টিতে তাকালো তৃষার দিকে। তৃষা জবাবে বাঁকা হাসলো শুধু অতঃপর নিজেই নেমে গেল নিজের তলার উদ্দেশ্যে একা একাই।
বৈঠকখানায় এক ভারী স্তব্ধতা। মাঝখানে একটা কারুকার্য করা পর্দা টাঙানো হয়েছে—একপাশে পুরুষদের মজলিস, অন্যপাশে অন্দরমহল। পর্দার এপাশে আর্য এহসান পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে, তার পরনে সাদা ফরমাল শার্ট আর চোখেমুখে এক বিষণ্ণ গাম্ভীর্য। আর পর্দার ওপাশে ক্রোধিত তৃষা।
কাজী সাহেব গম্ভীর গলায় তৌফিক সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বললেন,,
—– ‘বাবার নাম তো মরহুম আহমাদ নেওয়াজ,তা আপনিই কি কন্যার ওলি (অভিভাবক)?
তৌফিক সাহেব মাথা নাড়লেন। কাজী সাহেব এবার তৃষার উদ্দেশ্যে পর্দার আড়াল থেকে বললেন,,
—– ‘মা তৃষা, শোনো। তোমার ভাই তৌফিক নেওয়াজ সাহেবের উপস্থিতিতে, আর্য এহসানের সঙ্গে তোমার বিবাহ স্থির হয়েছে। মোহরানা ধার্য করা হয়েছে নগদ পাঁচ লক্ষ টাকা। এই মোহরানা এবং উপস্থিত সাক্ষীগণের সামনে তুমি কি এই বিবাহে রাজি আছো? সম্মতি থাকলে তিনবার বলো—কবুল।
তৃষা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। ঘরের প্রতিটি মানুষ তখন নিশ্বাস বন্ধ করে আছে। তৃষার মনে হচ্ছিল, এই ‘কবুল’ শব্দটা তার সমস্ত স্বপ্নের সমাধি। কিন্তু শায়লা বেগমের সেই বিষাক্ত কথাগুলো তার কানে বাজতেই সে চোয়াল শক্ত করে নিল। অত্যন্ত নির্লিপ্ত আর শীতল কণ্ঠে সে শুধু বলল—
‘কবুল।’
তিনবার এই শব্দের উচ্চারণে ঘরভর্তি মানুষের মধ্যে একটা স্বস্তির নিশ্বাস পড়ল।
কাজী সাহেব এবার খাতাটা নিয়ে পর্দার ওপাশে আর্যর কাছে গেলেন। সেখানে সাক্ষীদের সামনে তিনি একইভাবে প্রশ্ন করলেন,
—-‘জনাব আর্য এহসান, আপনি কি সাক্ষীগণের উপস্থিতিতে তৃষা নেওয়াজকে পাঁচ লক্ষ টাকা মোহরানা সাপেক্ষে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি আছেন? আপনিও তিনবার বলুন—কবুল।
আর্যর কণ্ঠে কোনো আবেগ নেই, যেন সে কোনো অফিশিয়াল ডকুমেন্টে সই করছে। একদম নিরেট গলায় সে তিনবার উচ্চারণ করল,
–‘কবুল।
বিয়ে সম্পন্ন হতেই কাজী সাহেব হাত তুললেন মোনাজাতের জন্য। তৌফিক সাহেব ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। মোনাজাতের সেই করুণ সুর আর ‘আমিন’ ধ্বনিতে ঘরটা ভারী হয়ে উঠল। সবাই যখন নতুন দম্পতির সুখের জন্য দোয়া করছিল,তৃষা তখন মনে মনে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসছে,
-:-যে সম্পর্কের ভিত্তিই হলো জেদ আর অবজ্ঞা, সেখানে সুখ আসবে কোথা থেকে?
মোনাজাত শেষ হতেই শায়লা বেগম ব্যস্ত হয়ে পড়লেন মিষ্টি বিতরণে। আর্যর কাকিমা তৃষার চিবুক ছুঁয়ে দোয়া করলেন। অতঃপর সকলে উপস্থিত হলো আর্যর কাছে। বিয়ে শেষে বরকনের দেখা হবার মুহূর্ত এটি। যেহেতু তারা একে অপরকে আগে কখনো দেখেনি তাই এই মুহূর্তে দেখা করানোর জন্য তৎপর সকলে।
আর্যর কাকি হামিদা বেগম তখন থেকে তাড়া দিচ্ছে আর্যকে। কিন্তু অপরপক্ষকে দেখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই আর্যর। তাই উঠে উঠছে না সে। তবে এবার আর রক্ষে হলো না, তৌসিফ সাহেব নিজেই আসলেন বোনজামাই এর কাছে। তার সম্মান রক্ষার্থে আর্য ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়ালো।
সুঠাম দেহের অধিকারী আর্য। তবে বিয়ের পাত্র হলেও তার পরনে নেই কোনো পাঞ্জাবি। গতানুগতিক পোশাকে আবৃত তার দেহ। চৌকষ মুখাবয়ে বিরক্তি স্পষ্ট। পর্দা সরিয়ে অপর পাশে যাওয়ার আগেই হঠাৎ পকেটে থাকা ফোনটা তীব্র শব্দে বেজে উঠল। এই অসময়ে ফোনের এই কর্কশ আওয়াজে উপস্থিত সবাই চমকে উঠলেন। আর্যর ভ্রু কুঁচকে গেল। ফোনের স্ক্রিনে ‘হেডকোয়ার্টার্স’ লেখাটা ভেসে উঠতেই তার পেশাদার সত্তা সজাগ হয়ে উঠল। মুহূর্তেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
উপস্থিত সবার দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে সে ফোনটা কানে তুলল। ওপাশ থেকে ভেসে আসা জরুরি নির্দেশ শুনে আর্যর কণ্ঠস্বর বদলে গেল। সে অত্যন্ত গম্ভীর আর সংক্ষেপে বলল,,
‘ইয়েস স্যার… আই আন্ডারস্ট্যান্ড… আই অ্যাম অন মাই ওয়ে।’
ফোনটা পকেটে রেখেই সে তৌফিক সাহেবের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে এখন আর জামাতার মোলায়েম ভাব নেই, বরং কমান্ডিং অফিসারের দৃঢ়তা। সে বলল,,
—-‘তৌফিক সাহেব,আমি অত্যন্ত দুঃখিত। নেভাল হেডকোয়ার্টার থেকে জরুরি তলব এসেছে। সাগরে প্রতিকূল পরিস্থিতি, আমাকে এখনই জয়েন করতে হবে।’
শায়লা বেগম আকাশ থেকে পড়লেন।
—‘বলেন কী! এই তো মাত্র কবুল বললেন, এখনই চলে যাবেন? অন্তত মিষ্টি মুখটা…
আর্য তাকে থামিয়ে দিয়ে শান্ত কিন্তু শীতল কণ্ঠে বলল,,
—— ‘ডিউটি ফার্স্ট। দেশের জরুরি অবস্থায় মিষ্টি খাওয়ার অবকাশ আমার নেই। আমি চলে যাচ্ছি বাদবাকি সবাই কাকির সঙ্গে চলে যাবে।
নির্লিপ্ত কন্ঠে কথাগুলো একনাগাড়ে বলেই সকলের উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে সেখান থেকে প্রতিস্থান করলো আর্য। উদ্দেশ্য মেয়ের সঙ্গে একটিবার দেখা করা। তাই সদ্য বিবাহিত রমণীকে দেখা বা বিবাহের কোন কাজকর্ম সম্পন্ন করার পিছুটান রইলো না তার। সকলের অবাক দৃষ্টিকে একপ্রকার অবজ্ঞা করেই বেরিয়ে গেল বিয়ের মজলিস হতে।
