Home ফিরে গেছে কত আলো ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪০

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪০

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪০
শানজানা আলম

অথৈয়ের বাবা ড্রয়িংরুমে বসে পেপার পড়ছিলেন।
বাসার দরজা খোলাই ছিল, এহসান ঢুকে সালাম দিলো।
-আসসালামু আলাইকুম আব্বু!
এহসানকে দেখে অবাক হলেন তিনি। বিশেষ করে আব্বু সম্বোধন তাদের জন্য অতীত, প্রথম মেয়ের জামাই হিসেবে এহসানকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন। মেয়ের সাথে সম্পর্কের তিক্ততায় ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলেও তিনি এহসানকে বিশেষ দোষী ভাবতে পারেন নি, ঐশি চঞ্চল, অস্থির, হয়তো সংসারের বাঁধন ওকে বাঁধতে পারে নি।

আরে এহসান যে, এসো এসো। বসো।
ফিরোজও এসেছ, এসো।
এহসান জিজ্ঞেস করল, আপনার শরীর ভালো আছে?
আর থাকা, বয়স হয়ে গেছে, তারপরে একটা মানসিক ধকল তো গেলই, বুঝতেই পারছ। বসো এখানে।
তাহিরা, এদিকে এসো, এহসান এসেছে।
এহসান এসেছে -শুনে ধরফর করে উঠে বসল অথৈ!
ফোন চেক করে দেখল, এহসান কল করেছিল, সে টের পায় নি, এত সকালে নন্দীপুরে এসেছে, কেন! কাল তো কিছু বলল না।
এহসান বলল, আম্মা আসুক, আমি একটা আর্জি নিয়ে এসেছি আপনাদের কাছে ৷ অথৈকেও ডাকুন।
সবার সামনেই বলি।
ঐশির বাবা ভাবলেন, আবার সব ঠিকঠাক করার কথা বলবে এহসান? সেটা কি হয়? অনেক ঝামেলা তো, তাও ওরা ভালো থাকলে ভাবা যাবে না হয়।
তাহিরা বেগম আর অথৈ দুজনেই এলো। এহসান উঠে দাড়ালো, সালাম দিলো, তাহিরা বেগম বসতে বললেন এহসানকে।

বসো, ভালো আছ তো?
জি আম্মা!
ডাকটা কানে লাগে তাহিরা বেগম, অথৈ সকলের।
এখন ঠিক কোন দাবিতে আব্বা আম্মা ডাকা যায়, তারা মেলাতে পারে না।
তোমার আম্মা কেমন আছেন? কোথায় আছেন উনি?
জি ভালো আছেন, ভাইয়ার বাসায় আছেন।
ঐশি অথৈ এর বাবা বললেন, বলো, কি যেন বলবে বললে।
এহসান বলল, আপনি উত্তেজিত হবেন না, আমি শান্তভাবে বলতে চাই।
এই কথায় বরং ঐশির বাবা টেনশনে পড়ে গেলেন।
বলো, বলে ফেলো তো!
অথৈ এর বুক টিপটিপ করছে, কি বলবে এহসান!

এহসান বলল, আব্বু আম্মু, আমি তো আপনাদের চিনি বা আপনারাও আমাকে চেনেন। আশা করি আমি এমন কিছু করিনি যেটা আপনাদের খারাপ লাগার মতন।
একটু নিঃশ্বাস নিয়ে এহসান বলল, আমি অথৈ কে বিয়ে করতে চাই।
সমস্ত ঘরের মধ্যে মনে হলো কেউ একটা বোমা ফেলল।
অথৈ চোখ বন্ধ করে ফেলল। কেমন অসহায় লাগছে, সেও তো চাইত, এহসান এমন কিছু বলুক। তাকে এরকম কিছু না বলে, আব্বু আম্মুর কাছে এসে বলছে
বিয়ে করতে চায়। অদ্ভুত মানুষ তো!
ঐশির বাবা বললেন, দেখো এহসান, তোমার কিছু ভালো হলেও এটা হয় না বাবা।
এহসান বলল, কেন হবে না, আপনি অথৈ কে আমার হাতে তুলে দিলেই সব হয়।
-না, কেন হয় না তুমি বুঝদার ছেলে, এটা তো বোঝো, আমরা একটা সমাজে বাস করি। সেখানে আত্মীয় স্বজন আছে, পাড়া প্রতিবেশী, বন্ধু বান্ধব সবাইকে নিয়ে চলতে হয়। এই সম্পর্ক হলে চারপাশে ছি ছি উঠবে। তোমাদের সম্পর্কে নোংরা কথা ছড়াবে। যদিও আমি জানি, অথৈ এমন কিছু করার মেয়ে না যাতে ওর বোনের সংসার ভাঙে। কিন্তু এই দোষটাই ওর হবে।
বোঝাতে পেরেছি।

এহসান শান্ত স্বরে বলল, আব্বু, আপনার প্রতিটি কথাই আমি চিন্তা করেছি, মানুষ দুদিন কথা বলবে, তারপর থেমে যাবে। ঐশিও নিজের মতন জীবন সাজিয়ে নেবে। আমার মনে হয়, অথৈ আমার কাছে ভালো থাকবে, আমিও ওকে নিয়ে ভালো থাকতে পারব।
তাহিরা বেগম বললেন, এটা হয় না বাবা। তোমার সাথে আমাদের সম্পর্ক ছিল, যে কোনো কারনে সেটা এখন আর নেই, আমরা পারিবারিক বন্ধুত্ব বজায় রাখতে পারি। এর বেশি কিছু ভাবা সম্ভব না।
এহসান চুপ করে রইল। ফিরোজ ভাই বললেন, আঙ্কেল এখন পৃথিবী অনেক এগিয়ে গেছে, ওরা যদি ভালো থাকে, তাহলে আপনাদের সমস্যা কি?
ঐশির বাবা বললেন, আমার বড় মেয়েটা কষ্ট পাবে বাবা। তাছাড়া এহসানের পরিবার কি এতে রাজী হবে? আমার তো মনে হয় না।
এহসান বলল, আপনি ঠিকই ধরেছেন, তারা রাজী না।
-তো? পরিবারের অসম্মতিতে তুমি এসেছ, আমি কেন সেখানে আমার মেয়েকে দেব!
এহসান বলল, আপনি অথৈয়ের মতামত নিয়েছেন?
অথৈকে একবার জিজ্ঞেস করুন প্লিজ!
অথৈ এর হাত পা অবশ হয়ে এলো, কি করবে সে, আব্বু আম্মুর সম্মান, নাকি এহসানের প্রতি আসক্তি যা তাকে অন্য কোনো পুরুষকে আপন ভাবতে দিচ্ছে না।
সে কি অপরাধ করেছে? আপুর সংসার থাকাকালীন তো অথৈ এহসানকে নিয়ে ভাবে নি কখনো, দুঃস্বপ্নেও না, শ্যালিকা দুলাভাইয়ের সাধারণ সম্পর্কের খুনসুটিও করে নি। আপু ঢাকায় চলে গেছে, যোগাযোগ আপুর সাথেই হতো৷ তেমন করে কথা বলাও হয় নি কখনো!

কিন্তু এখন অথৈ কি করবে!
অথৈ মাথা নিচু করে ফেলল।
ঐশি অথৈ এর বাবা বললেন, এহসান, তোমার পরিবারকে জানাও। তারাও মেনে নিবে না।
এহসান বলল, আমি প্রাপ্তবয়স্ক, আমার সিদ্ধান্ত আমি নিতে পারি৷
অথৈর বাবা বললেন, কিন্তু আমার তো একটা পরিবারের মতামত চাই। আমি তো একা তোমার কথা শুনব না।
এহসান বলল, আপনি ভাইয়ার সাথে কথা বলুন বা মায়ের সাথে প্রয়োজনে। তারা যাই বলুক, তাতে আমার মত বদলাবে না।
-ঠিক আছে, আমি ফোন করছি।
অথৈ ঐশির বাবা ফোন করলেন এহসানের বড় ভাইকে। এহসানের বড় ভাইয়া বাসায় ছিলেন আজ, অফিসে যান নি কোনো কারনে। তিনি ফোন রিসিভ করে সালাম দিলেন।
-জি আঙ্কেল, আসসালামু আলাইকুম।
-ওয়ালাইকুম আসসালাম, ভালো আছ তুমি?
-জি আঙ্কেল, আপনারা কেমন আছেন? আসলে একটা বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হলো, খোঁজ খবর নেওয়াও বন্ধ হয়ে গেছে।

-আচ্ছা একটা কথা বলতে ফোন করেছি, এহসান এসেছে আমার বাড়িতে। ও একটা কথা নিয়ে এসেছে, অথৈ এর বিষয়ে, তোমরা কি জানো সে বিষয়ে?
এহসানের ভাইয়া আকাশ থেকে পড়লেন যেন!
-কি বলছেন আঙ্কেল, আমরা তো কিছুই জানি না। মাআআ, মা, এদিকে আসো তো, এহসান নাকি নন্দী পুরে গেছে, অথৈদের বাসায়, জানো তুমি?
এহসানের মা বের হয়ে এলেন, তিনি পুরোপুরি অন্ধকারে। কিছুই জানতেন না বললেন।
-আচ্ছা বুঝতে পেরেছি। দেখো বাবা, তোমরা তো ভালো পরিবার, এহসানও ভালো ছেলে আমাদের সম্পর্ক টেকেনি, সেটা তো অন্য বিষয়, এখন অথৈকে জড়ানো বিষয়টি ভালো দেখায় না।
-জি জি আঙ্কেল, সেটা তো অবশ্যই, আমরা জানি না, আর এই বিষয়ে আমার মত নেই। যদি এহসান এমন কিছু করে, আমি ওর কোনো বিষয়ে আর থাকব না।
এহসানের ভাবী পাশ দিয়ে বললেন, এরকম কিছু হলে কোনো কিছুতে আমাকে ডাকবে না।
এহসানের মা কথা বললেন, আমার কাছে ফোনটা দে।

এহসানের মা সালাম দিয়ে বললেন, দেখেন ভাই সাহেব, এহসান আমাকে বলেছিল অথৈকে বিয়ে করতে চায়, আমি না করছি ওকে, ও বুঝতে চাইতেছে না। আত্মীয় স্বজন অনেক কথা বলবে। এই ভয়ে আমি না করতেছি। কিন্তু আমার মত যদি চান, তাইলে আমি বলব, অথৈ এর বিষয়ে আমার কোনো আপত্তি নাই, আমার ছেলেটা ভালো থাকলেই আমি খুশি। ও তো ভালো ছেলে, এমনিতে কোনো সমস্যা হবে না। এখন আপনার মেয়ে, আমি জোর করতে পারি না। সেই মুখ আমার নাই, যে কোনো কারনেই হোক, আমি আপনার কাছে কিছু চাওয়ার মতন অবস্থায় আর নাই
-জি জি, বুঝতে পারছি, আপনারা সবাই সঠিক আছেন। আমরাও সেটাই চাইতেছি, আর কালি না ছড়াক। আমি বলতেছি এহসানকে বুঝিয়ে।
ফোন রেখে অথৈ এর বাবা বললেন, শুনলে তো, সবাই একই কথা বলছে। আমার বা অথৈয়ের মায়ের মত নেই। তাছাড়া ঐশি তো আমার বড় সন্তান। ওর মতামতের তো দাম আছে, ও তো রাজি হবে না, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এহসান বলল, আমার মায়ের দ্বিধা আছে,তবে সে কিন্তু রাজী না এমন নয়। মানুষের কথার ভয় পাচ্ছে আপনাদের মতনই।

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৩৯

-সেটাই তো স্বাভাবিক এহসান। পূর্বের ভালো সম্পর্কের
সুবাদে এতক্ষণ ধৈর্য্য ধরে আলাপ করা হলো। আশা করি তুমি বুঝেছ, আমরা সম্মত নই।
এহসান বলল, একটু বাকি আছে, আপনি একবার অথৈকে জিজ্ঞেস করুন। অথৈ যদি “না” বলে আমি চলে যাব। আর কোনো কথা বাড়বে না।
অথৈ এর হাত পা কেঁপে উঠল, কি করবে এখন সে! সমাজ সংসার
বাবা মা বোন সব কিছু একপাশে, আর একপাশে এহসান! কি করবে অথৈ?

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪১