ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৭৭
শানজানা আলম
টানা একঘরে থাকতে থাকতে ঐশির একঘেয়ে, ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত লাগে। ফোন ইউজ করা হয় না অনেক ঘন্টা হয়ে গেছে, এরকম এত বছরে কোনোদিন হয় নি। ঐশি বুঝতে পেরেছে, সে বন্দী হয়ে গেছে, নিজের উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে। নাসির ভয়ংকর হতে পারে, সেটা ঐশি জানে তবে মনে ক্ষীণ আশা ছিল, ওর মা হয়তো ছেলের অনাগত সন্তানের কথা ভেবে নরম হতে পারেন। ঐশির ধারনাও ছিল না নাসিরের মা এমন ভয়ংকর মহিলা হতে পারেন। নায়েব পাশার কথা মত সরাসরি প্রেস মিট করলেই হতো, কেন যে এই বাঘের খাঁচায় ঢুকতে গেল! প্রেস মিট করলে অবশ্য নাসিরের দিক থেকে সব আশা শেষ হয়ে যেত। নাসির তাকে বিয়ে করবে না কিছুতেই, নাসির শুধু তাকে ইউজ করেছে টিস্যু পেপারের মতন। অন্যান্য মেয়েরা যেমন হয়, টাকা, ব্যবসা নিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে ফেলে, ঐশি তেমনটা চায় নি। নাসির ওকে বিয়ে করে আলাদা বাসায় রাখতে পারত, তাহলেও ঐশি খুশি থাকতো, সেরকম নাসিরের কোনো ইচ্ছেই ছিল না। ঐশি পুরোপুরি ঠকে গেছে! আর এখন বোকার মতন নাসিরের মায়ের কাছে বন্দী হয়ে আছে।
ঐশিকে রুটিন করে খাবার পাঠাচ্ছে, খেতে সমস্যা হচ্ছে না৷ বিষ মেশায় না। তবে টেনশন লাগছে, তাকে এখনো কোনো চেক আপ করানো হয় নি।সম্ভবত প্ল্যান করেছে, ঐশিকে এবর্শন করিয়ে ফেলবে। শেষে কি হবে তার, এখান থেকে বেঁচে ফিরতে পারবে কি!
কেন যেন মনে হচ্ছে, এত তাড়াতাড়ি সে মরবে না।
জীবন এখনো অনেকটা বাকি!
রাত তখন প্রায় দুটো। পুরো বাড়িটা অস্বাভাবিক নীরব। দূরে কোথাও কুকুরের ডাকে মাঝে মাঝে সেই নীরবতা কেঁপে উঠছে। রুমের এক কোণে বিছানায় বসে ছিল ঐশি। জানালায় মোটা গ্রিল, দরজার বাইরে তালা দেওয়া, যেন পৃথিবী থেকে তাকে আলাদা করে রাখা হয়েছে।
ঘরের ডিম লাইট মিটমিট করছিল। ঐশি বিছানার কিনারায় বসে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল। হঠাৎ করিডোরে পায়ের শব্দ ভেসে এলো। ধীর, ভারী, সতর্ক পায়ের শব্দ।তার বুকের ভেতর ধকধক করতে শুরু করল। এক মুহূর্ত পরে দরজার তালা খুলে গেল।
কর্কশ শব্দে দরজাটা একটু ফাঁক হতেই চারজন লোক দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়ল। সবার মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। একজন দরজা বন্ধ করল, আরেকজন টর্চ জ্বালিয়ে পুরো ঘরে আলো ফেলল।
চুপচাপ থাকো, নিচু গলায় বলল একজন, এমনিতে গায়ে হাত তুলব না, কিন্তু নড়াচড়া করলেই এমন মার মারব যে হাড় গুড়োগুড়ো হয়ে যাবে।
ঐশি উঠে দাঁড়ানোর আগেই তারা তার হাত-পা আর মুখ শক্ত করে বেঁধে ফেলল। সে আতঙ্কে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু একজন আঙুল ঠোঁটে চেপে ইশারা করল— শব্দ করলে ভালো হবে না। তারপর শুরু হলো ঘর তল্লাশি।
লাগেজ খুলে ফেলা হলো, জামাকাপড় মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হলো, টেবিলের ওপর রাখা ছোট ব্যাগটাও ওলটপালট করে দেখল তারা। পুরো ঘরে শুধু জিনিসপত্র এলোমেলো হওয়ার শব্দ আর ঐশির দ্রুত শ্বাসের আওয়াজ।
হঠাৎ একজন বলল, পেয়ে গেছি। ফোনটা
বিছানায় বালিশের নিচ থেকে করে আনা হলো ।
ফোনটা হাতে নিয়ে লোকটা অন্যদের দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
ঐশির চোখ বড় হয়ে উঠল।
লোকটা নিচু স্বরে বলল, ম্যাডাম ঠিকই বলেছিলেন। ফোন হাতের কাছেই রাখবে।
ঐশির শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। সে জানে ম্যাডাম বলতে একজনকেই বোঝানো হচ্ছে— মিসেস নওফেল। এই শহরের সবাই তাকে ভদ্র, অভিজাত নারী হিসেবে চেনে। দামি শাড়ি, মিষ্টি হাসি, পরিমিত কথা— সবকিছুর আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর ধূর্ত একটা মন।এই লোকগুলোকে তিনিই পাঠিয়েছেন! ঐশির ফোন কেড়ে নিতে!
লোকগুলো আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। ফোনটা নিয়ে তারা দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বের হওয়ার আগে একজন একবার পেছনে ফিরে ঐশির দিকে তাকাল। তারপর দরজা বন্ধ হয়ে গেল।।
আবার নেমে এলো সেই ভয়ংকর নীরবতা। শুধু মিটমিট করা বাল্বের আলোয় হাত পা বাঁধা মুখ অবস্থায় বসে রইল ঐশি— বুঝতে চেষ্টা করছিল, কি হচ্ছে তার সাথে!
নায়েব পাশা ঐশির খোঁজ করতে ঐশিকে কয়েকবার ফোন করে ফোন বন্ধ পেলো। ঐশি গুলশানের ফ্লাটে যায় নি। সেখানেও খোঁজ নেওয়া হয়েছে।
নায়েব পাশা তার পিএস কে ফোন করে বলল, রেন্ট এ কারে ফোন দিয়ে ঐশিকে যে ড্রাইভার নিয়ে এসেছে, তার সাথে যোগাযোগ করতে। তাহলে ঐশি কোথায় নেমেছে শেষ, সেটা জানা যাবে। আর জানতে পারে সুবহানা। এই নটি সব নষ্টের মূল। কে জানে, হয়তো ঐশিকে অন্য কোনো বুদ্ধি দিয়েছে।
নায়েব পাশা সুবহানাকে ফোন করলো। সুবহানা একটা ট্যুরে গিয়েছিল। ফোন বন্ধ কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপ খোলয় পাওয়া গেল। ফোন পিক করল সুবহানা।
-আরেএএ, নায়েব পাশা, কি খবর! কাজ হাসিল হওয়ার পরে তো তোমার কাউকে প্রয়োজন হয় না!
হঠাৎ আমাকে ফোন করলে-
সুবহানা খোঁচা দিয়ে কথাটা বলল।
নায়েব ভণিতা না করে বলল, ঐশি কোথায় আছে?
– আমি কি জানি! আমার সাথে ওর কোনো যোগাযোগ হয় নি।
-সত্যিই জানো না?
– নাআআ, আমি একটা অফিস ট্যুরে এসেছি সিংগাপুরে। আমি কিভাবে জানব, ঐশি কোথায় আছে!
সে তো হাতির পাঁচ পা দেখেছে।
অফিস ট্যুর- নায়েব পাশা হাসলো। ক্লায়েন্ট নিয়ে ঘুরতে সরি শুতে গেছে, সেটা বলতে এত সংকোচ! যাক, এটা তার দেখার বিষয় না।
নায়েব পাশা বলল, ঐশির কোনো ট্রেস পাচ্ছি না।
সুবহানা বলল, নাসির গায়েব করে দিলো নাকি! নাকি স্পেশাল হানিমুনে নিয়ে গেছে!
নায়েব পাশা বলল, হেয়ালি বাদ দাও, ওর কোনো খবর জানলে সেটা সাথে সাথে আমাকে জানাবে! গট ইট?
-ওখেএএএ- হেয়ালি করতে ছাড়ে না সুবহানা।
নায়েব পাশার পিএস ফোন করেছে। ড্রাইভারের সাথে কথা হয়েছে, রাতে ধানমন্ডি চারের কোনো একটা জায়গায় নেমেছে ঐশি। ড্রাইভার আর কিছু জানে না।
ধানমন্ডি চার, তার মানে নাসিরের বাড়ির আসেপাশেই কোথাও! নায়েব পাশা মনে মনে বলল।
মেয়েটা কি বোকা নাকি!
ঠিক তখনি তার ফোনে টেক্সট এলো ঐশির।
“আমি নাসিরের বাড়িতে এসেছি, ওর মা আমাকে এখানে থাকতে বলেছেন, বিষয়টা তিনি দেখবেন”
আসলে ফোনটা মিসেস নওফেল অন করিয়ে ঐশির গুলশানের বাসায় পাঠানোর ব্যবস্থা করছিলেন, ফোন অন হওয়ায় সাথে সাথে টেক্সট চলে গেছে নায়েবের হোয়াটসঅ্যাপে!
গাধা মেয়ে একটা- ওকে দিয়ে কিছুই হবে না, নাসিরের মা মোটেই সহজ কেউ না। নিজের ইমেজ রক্ষা করতে ঐশিকে পুঁতে ফেলতে দুইবার ভাববেন না।
তবে হাল ছেড়ে দেওয়া চলবে না। এই বিষয়ে নায়েব পাশা সরাসরি ইনভলভ হতে চাইলো না। কারন সে ফোন করলে অনেকগুলো প্রশ্ন উঠবে।পলিটিক্যাল পরিস্থিতি সামলে চলতে হয়। তার যে কোনো ভুল পদক্ষেপে বাবার সিট নড়ে যেতে পারে।
অনেক ভেবে নায়েব পাশা আলী ভাইকে ফোন করল। আলী ভাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ক্ষমতাবান একজন, নাসির আর তার পরিবারকে সে ডিল করতে পারবে। এইটা ডিল করতে আলী ভাই কয়েকশ কোটি টাকা খেয়ে দিব নাসিরের। নাকানিচুবানিও দেওয়াতে পারবে।
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৭৬
ঐশির বোকামোর জন্য বিষয়টা কোন পর্যায়ে চলে গেল! তবে ভালোই হয়েছে, নায়েব সরে থাকলো পুরো বিষয়টা থেকে। আলী ভাই ঐশিকে বের করে প্রেস মিট, টাকা পয়সা ডিল, সব কিছু করিয়ে নেবে। শুধু তাকে সঠিক খবর জায়গা মতন পৌছে দিতে হবে।
