ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৯১
শানজানা আলম
এহসান অফিসে এসেছে একটু দেরী করে। প্রথম কয়েকঘন্টা ভালোই কাটল। লাঞ্চের আগে এহসানের কলিগ রাজীব একবার জিজ্ঞেস করল,
কি খবর এহসান ভাই?
এহসান বলল, এই তো!
-ভাবীর খবর দেখলাম, সে তো সেলিব্রিটি হয়ে গেল! ধরসে তো বড় মাছ!
এহসান চট করে উত্তর দিলো না। কি উত্তর দেবে, চুপ করে রইল।
-তা আপনি এসব জানতেন না?
এহসান বলল, আপনি মনে হয় জানেন না, আমার সাথে ওর ডিভোর্স হয়ে গেছে, আমি বিয়ে করেছি, আমার সংসার, স্ত্রী সব কিছু নিয়ে আমি যথেষ্ট বিজি, পাস্ট নিয়ে আমার ভাবার মতন সময় নেই!
-কি বলেন, ভাবী যা সুন্দরী! আপনাদের সম্পর্কের কথা
তো দেখলাম, আপনি ভাবীর বোনকেই বিয়ে করেছেন!
এহসান বলল, এটা ঠিক, তবে আমি বিয়ে করেছি আমার ডিভোর্সের পাঁচ মাস পরে। সেটা কোনো অপরাধ না। যাই হোক, রাজীব ভাই, আমি এই বিব্রতকর বিষয়টা নিয়ে কথা বাড়াতে চাই না।
-আগে প্রেম করতেন নাকি, আপনি তো মিয়া হিরো, দুই বোনকেই…. হে হে হে… কেমনে পারেন মিয়া!
-রাজীব, অফিসে বসে অশালীন আচরন বা জোক করা অপরাধ, সেটা মনে হয় ভুলে গেছেন।
– আপনে মিয়া করতে পারবেন, আর বললেই দোষ, দেখতেছি–
রাজীব বেশি সুবিধা করতে না পেরে কিছুক্ষণ অন্যদের সাথে ফিসফাস করতে লাগল। এডমিনের ডেস্কেও বসে থাকতে দেখা গেল, নালিশ করেছে।
এহসানের কানে গেলেও এহসান চুপ করে রইল। কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডে ল্যাং মারার জন্য সবাই রেডি থাকে, এখানে তো মুখরোচক গল্প। তাকে কিছুটা সহ্য করে নিতেই হবে। তাও ভালো, অথৈ নিজেকে সামলে নিয়েছে।
এহসানের টেনশন ছিল, বিষয়টা নিয়ে তার বস ডাকে কিনা, কিন্তু এই বিষয়ে আর কথা উঠল না।
অফিসে ঢুকে ডেস্কটপে বসেছে রুহুল। সে কফিশপে ফ্রন্ট ডেস্কে বসে। মালিক একটা ডাটা খুঁজতে কিছু নির্দিষ্ট ডেটের সিসি টিভি ফুটেজ চেক করতে বলেছেন। মেজাজ খিচুড়ি হয়ে আছে, এত ব্যাক ডেটের ডাটা খোঁজা বেশ ধৈর্য্যের বিষয়। হঠাৎ একটা ফুটেজে চোখ আটকে গেল, আরে, এই মেয়েটাই তো ভাইরাল, সাথে কে? নাসির নাকি! ক্লোজ করে চিনতে পারলো না রুহুল, তবে ডাটা খোঁজার সাথে ক্লিপটা নিয়ে নিলো।
ট্রেন্ডিং টপিক, ভাইরাল হয়ে যাবে।
কাজ শেষে বিকেলে ফেসবুকে আপলোড করে দিলো, ভাইরাল ঐশির নতুন ফুটেজ লিখে!
কিছুক্ষণ পরে ঐশির সাথে মানুষটিকে চিনতে পারলো অনেকে, নায়েব পাশা, পূর্ত মন্ত্রীর ছেলে!
তার মানে বিষয়টা পলিটিক্যালও! নিউজ ফিডে আবার আসতে লাগল, বিজনেসম্যান নাসিরের কথিত বান্ধবীর সাথে পূর্তমন্ত্রীর ছেলের যোগাযোগ! বিষয়টি তাহলে রাজনৈতিক চক্রান্তও হতে পারে। অনলাইন মিডিয়া গুলো আবার গরম হয়ে উঠল।
নওফেল সাহেবের সামনে নিউজ গেল৷ তিনি পূর্তমন্ত্রীকে ফোন করলেন৷ এই নিউজও ভেসে বেড়াতে সময় লাগে না। পূর্ত মন্ত্রী নিজেও দেখেছেন, এই ফোন আসার কথা, তার কাছে ওপর থেকেও ফোন চলে এসেছে।
-কি খবর মন্ত্রী সাহেব?
নওফেল সাহেব জানতে চাইলেন।
-এই তো, আপনি কেমন আছেন?
-আছি, যেমন রেখেছেন! আলাপ করার জন্য ফোন করি নাই, ছেলেকে সামলান, সামনে আবার ইলেকশন আছে, বিষয়টা মাথায় রাখবেন। কথা বাড়াতে চাই না।
-আমি দেখছি বিষয়টা।
মন্ত্রী সাহেব নায়েব পাশাকে ডেকে পাঠালেন।
নায়েব পাশা ফুটেজটা দেখেছে, এটা ঐশির লিক করা নয়, কফিশপের ফুটেজ, ঐশি ভাইরাল টপিক হওয়ায় পাবলিক করে দিয়েছে।
মন্ত্রী সাহেব ছেলেকে বললেন,
-কি করছ তুমি আজকাল, কি সব মেয়েদের সাথে ঘুরে বেড়াও, মা বলেছে বিয়ে করতে, বিয়ে করছ না, এসব কি হচ্ছে! তোমার জন্য তো আমার গদি নিয়ে টান পড়বে!
বাবার কথায় উত্তর দিতে পারল না নায়েব পাশা, মিনমিন করে বলল, এমনি পরিচিত, ক্লাবে আসত, নাসিরও তো আমার বন্ধু!
মন্ত্রী সাহেব বললেন, বিষয়টা নাসিরের সাথে ক্লিয়ার করে মিটমাট করে নাও, ভুলে যেও না, পার্টির বড় ডোনার নওফেল সাহেব। তিনি আমাকে ফোন করলেন, ছি ছি ছি, শেষ পর্যন্ত তুমি ষড়যন্ত্র করেছ!
নায়েব পাশা বলল, বাবা এসব কিছু সত্য না।
মন্ত্রী সাহেব বললেন, জল ঘেলা হওয়ার আগে সব মিটিয়ে ফেলো। যাও এক্ষণি৷
নায়েব পাশা উত্তর দিলো না। নাসিরকে ফোন করতে হবে, সেই ফেঁসেই গেল! বোঝা উচিৎ ছিল, সে ঐশিকে সাহায্য করেছে, এটা সামনে আসার আগে তাকে অন্যভাবে ম্যানেজ করতে হবে।
নাসির নায়েব পাশার ভিডিওটা পেয়েছে। তবে সে সিরিয়াসলি নেয় নি। ঐশির মতন মেয়েরা একেকটা ক্লায়েন্ট জোগাড় করেই। তবে নায়েবের সাথে তার কিছুটা বোঝা পড়া আছে। সেক্ষেত্রে নায়েব ঐশিকে ব্যবহার করতেই পারে।
নায়েব পাশাই নাসিরকে ফোন করল।
নাসির–
নাসির বলল, ঐশির সাথে জোট পাকাতে হলো, বিজনেসের বদলা মা★গী ধরে নিতে হলো!
নায়েব পাশা বলল, আমি কোনো জোট পাকাই নি, তুমি জানো ঐশি পার্টিতে আসতো,, পার্টিতে আলাপ, কফিশপে একদিন দেখা হয়েছিল, আর ও তো ভাইরাল। তাই ফুটেজ লিক করে দিয়েছে।
নাসির বলল, পাশা, আমি সব ভুলে যাব, ঐশিকে সরিয়ে দাও! আর কোনো নিউজ যেন মিডিয়ায় না আসে। তোমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার কিন্তু শেষ হয়ে যাবে৷
নায়েব বলল, মানে? আমি ঐশিকে কোথায় পাবো?
নাসির বলল, সেটা আমি জানি না। তুমি ব্যবস্থা করবে। সব কিছু ঠিক থাকবে, শুধু ঐশিকে সরিয়ে দিতে হবে।
নায়েব পাশা বলল, সেটা তো তুমিও করতে পারো, আমাকে কেন জড়াচ্ছ এসবের মধ্যে?
নাসির বলল, জড়াচ্ছি, কারন তুমি নিজে জড়িয়ে গেছ, আর কিছুই না। যা বললাম, সেটা করো। – নাসির ফোন কেটে দিলো।
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৯০
ঐশি হোটেল থেকে বের হয়ে নায়েব পাশার পাঠানো গাড়িতে উঠল। সেখান থেকে সে কোথায় গেল, তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। মিডিয়ার কোনো সাংবাদিক তাকে তার খুঁজে পেলো না। যেন দিনে দুপুরে ঐশি উধাও হয়ে গেল।
