বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৮
সুমি চৌধুরী
বৃষ্টিকে এভাবে কলিজা ফাটানো চিৎকার দিতে দেখে আকাশ চরম বিরক্তিতে নিজের কান দুটো চেপে ধরে। তারপর কপালে তিনটা ভাঁজ ফেলে কড়া গলায় ধমক দিয়ে বলে,
—- “শাট আপ। কী হয়েছে এমন শিয়ালের মতো চিৎকার দিলে কেন?”
ওদিকে বিছানায় বসা রূপা ততক্ষণে হাসতে হাসতে শেষ। হাসির চোটে ওর পেট ফেটে যাওয়ার অবস্থা। বৃষ্টি এবার নিজের কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো কামড়াতে কামড়াতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলে,
—- “স্যার, বি-বিশ্বাস করুন আমি আপনাকে ডাকিনি। আমি তো বা- বাঁধ…”
পুরো কথা শেষ করার আগেই আকাশ নিজের বাঁ দিকের ভ্রুটা কুঁচকে কড়া গলায় শুধায়,
—- “হোয়াট? কী বলছো তুমি?”
বৃষ্টি এবার অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে, ফিসফিসিয়ে বলে,
—- “আসলে স্যার, একটু ভুল মন্ত্র পড়ে ফেলেছিলাম, তাই মনে হয় ওপরওয়ালা বাঁধন ভাইয়ার বদলে আপনাকে পাঠিয়ে দিয়েছে।”
আকাশ এবার নিজের তীক্ষ্ণ নজর জোড়া বৃষ্টির ওপর স্থির করে। এই মেয়েটা সাতসকালে কী জাতা বকছে। সে কড়া সুরে বলে,
—- “কী আবল-তাবল বলছ? কিসের মন্ত্র ভুল?”
বিছানায় বসা রূপা তখন হাসতে হাসতে বিছানায় গড়াগড়ি খায়। সে কোনোমতে নিজের হাসি চেপে বলে,
—- “ভাইয়া, ও নাকি খাঁটি কালো জাদু পারে। তাই কালো জাদু করে বাঁধন ভাইয়াকে ওর পায়ের কাছে টেনে নিয়ে আসছিল। ওই কালো জাদুর মন্ত্রই পড়ছিল, কিন্তু মাঝপথে উচ্চারণ ভুল হওয়ার কারণে ওনার জায়গায় তোমায় পাঠিয়ে দিয়েছে।”
কথাটা শোনা মাত্রই বৃষ্টি একদম রাগী ডাইনির মতো চোখ গরম করে রূপার দিকে তাকায়। মনে মনে চায় রূপাকে কাঁচা চিবিয়ে খেতে। আকাশ অবশ্য আর একটা শব্দও খরচ করে না। সে কিছুক্ষণ ভ্রু উঁচিয়ে বৃষ্টির ভ্যাবলা মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে যেন দেখছে চিড়িয়াখানার কোনো অদ্ভুত জীব। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, মনে মনে একে আস্ত পাগল ভেবে কোনো কথা না বলেই ওখান থেকে চলে যায়। আকাশ চোখের আড়াল হতেই বৃষ্টি তিরের মতো ছুটে এসে ধুমধাম রূপার পিঠে দুটো কিল বসিয়ে দিয়ে ক্ষোভের সুরে বলে,
—- “তোকে কে বলতে বলেছে হ্যাঁ? এখন স্যার মনে মনে আমাকে কোন লেভেলের পাগল ভাবছে বল তো?”
রূপা পিঠ হাতাতে হাতাতে তখনো হেসেই চলে, হাসতে হাসতে বলে,
—- “আরে থাম থাম। সত্যি কথাই তো বলছি। তবে যাই বলিস দোস্ত, তোর এই কুত্তা-শিয়ালের জাদুটা কিন্তু বেশ জোস ছিল। এমন ভুলভাল জাদু তুই রোজ রোজ করিস, বিনোদন ভালোই পাব।”
দুজনের এই দুষ্টমির মাঝেই বৃষ্টির হঠাৎ প্রচণ্ড ওয়াশরুম পায়, সে তাড়াহুড়ো করে ওয়াশরুমে চলে যায়। বৃষ্টি যেতেই ঘরের দরজায় এসে প্রবেশ করে বাঁধন। এক হাতে একটা বড় শপিং ব্যাগ। বাঁধনের ভারী অবয়বটা দেখামাত্রই রূপার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে, পরপর দুইবার শুকনো ঢোক গিলে নেয় সে। বাঁধন কোনো কথা না বলে সোজা রূপার পড়ার টেবিলের ওপর শপিং ব্যাগটা ছুড়ে দেয়। তারপর পাশের সোফাটায় গিয়ে বসে, দীর্ঘ শরীরটা এলিয়ে দিয়ে ফোনে স্ক্রল করতে করতে বলে,
—- “ফাস্ট রেডি হো, আমি দিয়ে আসব।”
রূপা আর কোনো কথা বাড়ানোর সাহস পায় না। কাঁপন্ত হাতে টেবিলের ওপর থেকে শপিং ব্যাগটার মুখ খোলে। ভেতরে তাকাতেই রূপার চোখ জোড়া স্থির হয়ে যায়, স্তব্ধতায় বুকের ভেতরের হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ায়। ভেতরে একটা চমৎকার সাদা স্কার্ফ, নিখুঁত পাথরের ডিজাইন করা আকর্ষণীয় মাথার ব্যান্ড, এক ডজন ঝকঝকে সাদা পাথরের চুড়ি, সেফটিপিন, আলপিন এবং তার সাথে জমকালো পাথরের কিছু এক্সট্রা সেফটিপিন।
জিনিসগুলো দেখে রূপার গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। বাঁধন কি এসব তার জন্যই কিনে এনেছে? জিনিসগুলো বড্ড পছন্দ হয়ে যায় রূপার, বিশেষ করে ওই পাথরের মাথার ব্যান্ডটা দেখে অবশ হয়ে যাওয়া মনেও একটা তীব্র দোলা লাগে। তীব্র এক ভালোলাগায় ইচ্ছে করছে এখনই জোরে একটা চিৎকার দিতে, কিন্তু বাঁধনের ভয়ে সেই চিৎকার গলার ভেতরেই দলা পাকিয়ে থাকে।
ঠিক তখনই সোফায় বসা বাঁধন আড়চোখে রূপার দিকে তাকায়। রূপাকে ওভাবে হা করে জিনিসগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফোন স্ক্রল করতে করতেই একদম গম্ভীর পাতালভেদী গলায় বলে,
—- “হা করে তাকিয়ে থাকার দরকার নেই, ওইগুলো তোরই। জাস্ট টেন মিনিটস সময় দিলাম, রেডি হো।”
কিছুই ভাবে না রূপা। ব্যাগ থেকে স্কার্ফটা বের করে মাথায় জড়াতে যায়। কিন্তু কখনো স্কার্ফ না পরায় কিছুতেই তা ঠিকঠাক করতে পারছে না। যতবারই বাঁধতে যাচ্ছে, রেশমি কাপড়টা পিছলে আলগা হয়ে খুলে যাচ্ছে। এই ব্যর্থ চেষ্টা আর ছটফটানি চোখ এড়ায় না বাঁধনের। সোফায় বসা অবস্থা থেকেই সে একদৃষ্টে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করে,
—- “বাঁধতে জানিস না?”
অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায় রূপা। চুপচাপ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় বাঁধন। নিজের ফোন থেকে স্কার্ফ বাঁধার একটা ভিডিও বের করে সে রূপার টেবিলের ওপর সশব্দে রাখে। তারপর রূপার হাত থেকে স্কার্ফটা কেড়ে নিয়ে, শক্ত করে ধরে সোজা করে দাঁড় করায় তাকে।বাঁধনের শরীরের তীব্র পুরুষালি সুবাস আর ভারী রাজকীয় উপস্থিতি নিমেষেই অবশ করে দেয় রূপার চারপাশ। ফোন থেকে ভিডিওর দিকে চেয়ে ঠিক ওই কায়দাতেই বাঁধন মাথায় কাপড়টা পেঁচাতে থাকে। তার শক্ত আঙুলের আকস্মিক ছোঁয়া রূপার নরম চামড়ায় এক অদ্ভুত শিরশিরানি অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।রূপা সম্মোহিতের মতো হা করে বাঁধনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাঁধনের ফর্সা, নিখুঁত কামানো মুখটা এই মুহূর্তে কিছুটা তীক্ষ্ণ হয়ে আছে। সোজা নাক, ধারালো চোয়াল আর বাম চোখের ভ্রুর পাশে চামড়া কাটা পুরুষালি দাগটা গভীর মনোযোগে কুঁচকে উঠেছে। ওই একটা কাটার দাগ যেন বাঁধনের সৌন্দর্য আরও হাজার গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে! চোখের ঘন পাপড়ি আর ঠোঁটের তাচ্ছিল্যের ভাঁজে কী ভীষণ পৌরুষদীপ্ত আর মোহময় লাগছে এই পুরুষটাকে! এক অদ্ভুত বন্য আর মাদকতাময় আকর্ষণ ছড়াচ্ছে তার পুরো অবয়ব থেকে, যা এই নির্জন ঘরে একমাত্র রূপাই এত কাছ থেকে দেখছে। তার এই রূপ যে কাউকেই পাগল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।ঠিক তখনই সামনের আয়নাটায় চোখ পড়ে বাঁধনের। সে স্পষ্ট দেখে, আয়নার প্রতিফলনে রূপা তার দিকে কামাতুরের মতো হা করে তাকিয়ে আছে। বাঁধন এক মুহূর্তও দেরি না করে পাতালভেদী গলায় বলে,
—- “চোখ নামা, তোর চোখের দৃষ্টি ভালো না।”
আচমকা বাঁধনের এই হুল ফোটানো কথায় চমকে যায় রূপা। তীব্র এক লজ্জায় আর অপমানে নিমেষেই মাথা নিচু করে ফেলে সে। বাঁধন কী বলল। তার দৃষ্টি ভালো না? এর মানে কী? বাঁধন কি তাকে সস্তা বা চরিত্রহীন বোঝাতে চাইছে? রাগে আর ক্ষোভে নিজের নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে রূপা, ভেতরটা পুরো জ্বলেপুড়ে যায়। বাঁধন না হয়ে এই জায়গায় এখন অন্য কেউ থাকলে আজ তার অবস্থা চরম খারাপ করে ছাড়ত সে।
এমন সময় ভার্সিটি যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে রূপার রুমে প্রবেশ করে শান্তা. ভেতরে পা রাখতেই থমকে যায় সে, চোখ দুটো বিস্ময়ে স্থির হয়ে আসে। বাঁধন নিজে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে রূপাকে স্কার্ফ পরিয়ে দিচ্ছে। নিজের চোখকে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারে না শান্তা। মনের ভুলে দুবার চোখের পলক ফেলে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে, কিন্তু সামনের এই বাস্তব এতটুকুও মেকি নয়। এটা কী করে সম্ভব? যে মেয়েটাকে এই ছেলে দুটো চোখে দেখতে পারত না, শৈশবের অবাধ্যতায় যার মাথা পর্যন্ত ফাটিয়ে দিয়েছিল, আজ সেই কঠিন হৃদয়ের পুরুষই কিনা এত যত্ন করে তার মাথায় কাপড় জড়িয়ে দিচ্ছে!মুহূর্তের মধ্যে এক তীব্র, দমচাপা হিংসা বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ে শান্তার সারা শরীরে। গতকাল থেকেই সে লক্ষ করছে, বাঁধন অতিরিক্ত মাত্রায় রূপার ওপর এক অদৃশ্য অধিকার খাটিয়ে চলেছে। ভাই হিসেবে বোনের ওপর শাসন করাটা স্বাভাবিক, কিন্তু বাঁধনের এই চাউনি আর অধিকারবোধের ধরন কোনো সাধারণ ভাইয়ের মতো নয়। পুরো বিষয়টা শান্তার মনে এক অদ্ভুত অস্বস্তি তৈরি করে, ভেতরটা রূপার প্রতি এক অজানা আক্রোশে রি রি করে ওঠে। ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে বাইরে আসে বৃষ্টি। ঘরের ভেতরের এই অবিশ্বাস্য দৃশ্যটা দেখামাত্রই সে যেখানে ছিল সেখানেই জমে যায়। বিস্ময়ের চরম ধাক্কায় একদম বোকার মতো হা করে তাকিয়ে থাকে সে। তবে বাঁধন সেদিকে বিন্দুমাত্র মনোযোগ দেয় অত্যন্ত নিখুঁত ও পরিপাটি ছন্দে রূপার স্কার্ফটা বাঁধা শেষ করে সে। তারপর একটু পিছিয়ে গিয়ে, তার সেই গম্ভীর চোখে গভীর এক চাউনি দিয়ে শান্ত গলায় বলে,
—- “এবার ঠিক আছে।”
রূপা দুরুদুরু বুকে আয়নার দিকে তাকায়। আর তাকানোমাত্রই নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে বুকের ভেতর এক তীব্র দোলাচল অনুভব করে সে। এত সুন্দর করে, মাথায় নিখুঁত ভাঁজ ফেলে স্কার্ফটা বেঁধে দিয়েছে বাঁধন। একটা কঠোর স্বভাবের ছেলে মানুষ হয়েও যে এত সুনিপুণ আর মন মাতানো উপায়ে স্কার্ফ বাঁধতে জানে, তা রূপার ধারণারও বাইরে ছিল। বাঁধনের হাতের সেই আকস্মিক ছোঁয়ার রেশ এখনো যেন তার পুরো অস্তিত্বে এক অদ্ভুত ঘোর তৈরি করে রেখেছে।
কিছুক্ষণ পর রূপা, বৃষ্টি আর শান্তা গাড়ির পেছনের সিটে গিয়ে বসে। পুরো গাড়িতে এক স্তব্ধ, ভারী নীরবতা কলেজের গেটের কাছে আসতেই রূপাদের সাথে সীমার দেখা হয়ে যায়। এই কয়দিনে রূপার সাথে সীমার বেশ একটা আত্মিক মিল তৈরি হয়েছে, এমনকি চটপটে বৃষ্টির সাথেও সীমার একটা সুন্দর ভাব জমে উঠেছে। সীমা রূপার মাথায় ওই চমৎকার স্কার্ফটা দেখে বেশ চমকে উঠে একগাল হেসে বলে,
—- “ওয়াও। আজ হঠাৎ স্কার্ফ পরেছ যে? তোমাকে কিন্তু দারুণ মানিয়েছে।”
বৃষ্টি মুচকি হেসে পাশ থেকে আলতো করে ফোড়ন কাটে,
—- “আসলে তার ভাই হিজাব ছাড়া বাইরে বের হতে একদম কড়া নিষেধ করেছে। ধরে নিতে পারো, এখন থেকে প্রতিদিন হিজাব করেই কলেজে আসতে হবে।”
সীমা গভীর চোখে রূপার দিকে তাকিয়ে নরম, প্রশান্ত গলায় বলে,
—- “তোমাকে হিজাবেই বেশি সুন্দর লাগছে।”
ওদের এই টুকটাক কথোপকথনের মাঝেই হঠাৎ একটা তীব্র কর্কশ শব্দে ঠিক গেটের সামনে এসে বাইকের ব্রেক কষে ইশতিয়াক। সামনে তাকাতেই ইশতিয়াকের চোখ দুটো এক অদ্ভুত ক্রোধ আর বিস্ময়ে স্থির হয়ে যায়। সীমা রূপার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। এর মানে কী? সীমা রূপাকে চেনে? হুট করেই বৃষ্টির চোখ পড়ে ইশতিয়াকের দিকে, সে মুহূর্তেই চটপটে গলায় ইশতিয়াকের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
—- “আরে, ইশতিয়াক ভাইয়া। কেমন আছেন? আপনাকে তো অনেক দিন পর দেখছি।”
ইশতিয়াক ভেতরের সেই আকস্মিক ধাক্কাটা কোনোমতে চেপে রেখে, মুখটা স্বাভাবিক করার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করে বলে,
—- “এই তো, আলহামদুলিল্লাহ। তুমি কেমন আছো?”
—- “ভালো।”
এদিকে ইশতিয়াককে আচমকা এভাবে দেখে সীমার বুকের ভেতরের হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়, এক অজানা আশঙ্কায় ধক করে ওঠে ভেতরটা। তবে তার থেকেও বেশি অবাক হয় এটা দেখে যে, বৃষ্টি ইশতিয়াককে চেনে। হঠাৎ ইশতিয়াক চোখের একটা কঠোর ইশারায় সীমাকে একটু আড়ালে ডাকে। সেই ইশারা দেখামাত্রই এক তীব্র ভীতি গ্রাস করে সীমার পুরো শরীরকে। সে অত্যন্ত ধীর পায়ে এসে ইশতিয়াকের সামনে দাঁড়ায় এবং অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে থাকে। ইশতিয়াক সীমার দিকে একধাপ এগিয়ে আসে। তার চোখ দুটো তখন ক্রোধে জ্বলছে। দাঁতে দাঁত চেপে, একদম নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলে,
—- “তুমি রূপাকে চেনো, এটা আমাকে আগে বলোনি কেন?”
সীমা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
—- “রূপা? কোন রূপা?”
ইশতিয়াক চোখের ইশারায় রূপাকে দেখিয়ে দেয়। সীমা সেই দিকে তাকিয়ে কিছুটা বিস্মিত গলায় বলে,
—- “ওহ, আচ্ছা। ও তো আমার ক্লাসমেট। তার মানে আপনি এত দিন যে রূপার কথা বলছিলেন, ও-ই সেই রূপা?”
ইশতিয়াক হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে। সীমার বুকের ভেতরটা এক তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠলেও, সে কোনোমতে নিজের মুখাবয়বে একটা আলতো হাসি ফুটিয়ে তুলে বলে,
—- “বাহ্। আপনার চয়েজ আছে বলতে হবে। মেয়েটা আসলেই অনেক সুন্দর।”
ইশতিয়াক কিছুটা দ্বিধা নিয়ে মাথা চুলকে বলে,
—- “তাহলে একটা ব্যবস্থা করে দাও, প্রেমটা করিয়ে দাও। আমরা তো আর একসাথে থাকছি না, একসময় আলাদা হয়েই যাব। এভাবে তো সম্পর্ক টেনে নেওয়া সম্ভব না, তাই না?”
ইশতিয়াকের এই অবহেলা মেশানো কথাগুলো শুনে সীমার মনে হয়, কেউ যেন তার কলিজার ঠিক মাঝখানটায় ধারালো কোনো ছুরি বসিয়ে দিল। এতগুলো দিন ধরে সে এই মানুষটাকে নিজের অজান্তেই প্রচণ্ড রকম ভালোবেসে ফেলেছে। আজ নিজের সেই ভালোবাসার মানুষের মুখে অন্য কারও সাথে প্রেম করিয়ে দেওয়ার কথা শোনা যে কতটা কষ্টের, তা শুধু সীমার অন্তরই জানে। তার এই স্তব্ধ ভাবনার মাঝেই ইশতিয়াক আবার তাগাদা দিয়ে বলে,
—- “কী হলো? কথা বলছ না কেন?”
সীমা ভেতরের রক্তক্ষরণ আড়াল করে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলে,
—- “আমি, চেষ্টা করব।”
ইশতিয়াকের মুখে মুহূর্তেই একটা মিষ্টি হাসি ফুটে ওঠে। সে আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
—- “সত্যি বলছ?”
সীমা নিচু স্বরে জবাব দেয়,
—- “হুম।”
কেটে যায় আরও কিছুদিন। কলেজ ফাঁকি দিয়ে রূপা তার সেই ডেলিভারি কাজে চলে আসে। এসেই পার্সেল আর ঠিকানা বুঝে নিয়ে স্কুটার নিয়ে বেরিয়ে পড়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। এতদিনে বৃষ্টি ওকে খুব ভালো খুব করেই স্কুটার চালানো শিখিয়েছে, তাই রূপা এখন মোটামুটি সামলে নিয়ে আস্তে আস্তেই চালাতে পারে। ঠিকানা মেলাতে মেলাতে স্কুটার নিয়ে এক জায়গায় এসে কড়া ব্রেক কষে রূপা। কিন্তু সামনের সাইনবোর্ডটার দিকে তাকাতেই তার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় ধক করে ওঠে। এটা কি কোনো কাকতালীয় ব্যাপার? ঠিকানাটা ময়মনসিংহের কোতোয়ালি মডেল থানার। তার মানে খোদ থানা থেকে কেক ডেলিভারির অর্ডার এসেছে। যা-ই হোক, তাতে তার কী? সে তো শুধু কেক দিতে এসেছে, পার্সেলটা বুঝিয়ে দিয়েই চলে যাবে।
রূপা আর দেরি না করে স্কুটারটা লক করে পার্সেলটা হাতে নেয় এবং থানার ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতরে পা রাখতেই সে অবাক হয়ে চারপাশ দেখে। পুরো থানাটা হরেক রঙের বেলুন আর ফুল দিয়ে সাজানো। সে থমকে গিয়ে চারপাশ দেখছে কারণ, সেই চেয়ারে বসে আছে স্বয়ং বাঁধন। খোদ এসপি বাঁধন আজ এই থানায় উপস্থিত। তার পাশে অত্যন্ত কড়া পাহারায় তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নতুন জয়েন করা ওসি অখিল আর কয়েকজন পুলিশ সদস্য। কোনো একটা অত্যন্ত জটিল আর রহস্যময় বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে। পুলিশের পোশাকে বাঁধনের সেই চেনা শান্ত অথচ গম্ভীর মুখটা এই মুহূর্তে যেন আরও বেশি থমথমে আর ধারালো দেখাচ্ছে। বাঁধনকে এই জায়গায় এই রাজকীয় রূপে দেখে রূপার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে যায়। সে দ্রুত উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলে,
—- “সর্বনাশ। এই লোকটা এই থানায় কী করছে?”
যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই বুঝি সন্ধ্যা হয় রূপার বেলাতেও ঠিক তা-ই হলো। উল্টো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ডেলিভারি ইউনিফর্ম পরা মেয়েটার দিকে হঠাৎ করেই চোখ পড়ে অখিলের। সে কিছুটা উচ্চস্বরেই বলে ওঠে,
—- “ওই তো, কেক এসে গেছে।”
অখিলের কথায় বাঁধনের তীক্ষ্ণ নজরটাও গিয়ে পড়ে উল্টো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অবয়বটার ওপর। মুহূর্তেই তার দুই ভ্রু কুঁচকে আসে। থানার ভেতর এভাবে অদ্ভুতভাবে মুখ লুকিয়ে কেন দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা?
অখিল টেবিল ছেড়ে কিছুটা এগিয়ে এসে রূপার উদ্দেশ্যে বলে,
—- “এক্সকিউজ মি, আমাদের কেকটা?”
রূপা এতটুকুও সামনে না তাকিয়ে, কোনোমতে মাথাটা আরও নিচু করে কাঁপা গলায় বলে,
—- “হ্যাঁ, হ্যাঁ,স্যার।”
বলেই সে আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না, পেছন ফিরে বাইরের দিকে এক দৌড় দিল। ভেতরে থাকা প্রতিটি পুলিশ সদস্য গভীর বিস্ময়ে একে অপরের দিকে তাকায়। কী হলো মেয়েটার? এভাবে চোরের মতো দৌড়ে চলে গেল কেন? ওদিকে কোনোমতে থানার বাইরে এসে একটা আড়ালে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড গতিতে হাঁপাতে থাকে রূপা. তার বুকের ভেতরের হূৎস্পন্দন যেন কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে। কী করবে এখন সে, কিছুই মাথায় ঢুকছে না। তাড়াহুড়োয় আজ কোনো মাস্কও সাথে আনেনি, এমনকি হিজাবটাও খুলে স্কুটারের ডিকিতে রেখে এসেছে। এই অবস্থায় যদি বাঁধন কোনোভাবে তার মুখ দেখে ফেলে, তবে একেবারে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।
বড্ড কঠিন এক বিপদে পড়ে গেল সে। মনের ভেতর তীব্র ছটফটানি শুরু হয় কারো হয়তো জন্মদিনের উপহার এটা, সে যদি পার্সেল না দিয়ে পালিয়ে যায়, তবে পুরো আয়োজনটাই মাটি হয়ে যাবে। ঠিক তখনই তার চোখ পড়ে থানার এক কোণে জমে থাকা কিছুটা কাদা-মাটির দিকে সকালের বৃষ্টিতে জল জমে জায়গাটা একদম প্যাচপ্যাচে কাদা হয়ে আছে। নিমেষেই রূপার মাথায় এক দুর্দান্ত শয়তানি বুদ্ধি খেলে গেল। হাতের পার্সেলটা সাবধানে শুকনো জায়গায় রেখে, সে এক ঝটকায় ওই কাদার ওপর বসে পড়ে। নিজের হাত দুটো দিয়ে দলা দলা কাদা তুলে সে তার ফর্সা মুখমণ্ডল আর দু-হাতে লেপে দিতে থাকে। পুরো শরীরে কাদা মাখামাখি করে নিজের রূপটা এমনভাবে ঢেকে ফেলে, যাতে বাঁধন কেন দুনিয়ার কেউ যেন তাকে চিনতে না পারে। নিজের পুরো অবয়বটা একদম নাজেহাল আর নোংরা করে রূপা উঠে দাঁড়ায়। তার ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে বিজয়ের শয়তানি হাসি। ফিসফিসিয়ে নিজে নিজেই বলে ওঠে,
—- “এবার হয়েছে। এখন তো আমি নিজেই নিজেকে চিনতে পারছি না, তাহলে উনি কীভাবে চিনবেন? হি হি রূপা, তুই আসলেই একটা জিনিয়াস।”
নিজের এই রূপান্তরের পর রূপা পার্সেলটা হাতে নিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক আর ধীর পায়ে আবার থানার ভেতরে প্রবেশ করে। একটু আগে দেখে যাওয়া সেই পরিপাটি ডেলিভারি গার্লকে হুট করে এভাবে ভূত সেজে আসতে দেখে থানার ভেতরের সবার মুখ জাস্ট হা হয়ে যায়। অখিল তো পুরো হাবলার মতো চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে। রূপা চরম অবহেলায় অখিলের সামনে এসে দাঁড়ায় এবং নিজের আসল আওয়াজটা লুকিয়ে, একটু মোটা আর কর্কশ গলায় বলে,
—- “স্যার, এই নিন আপনার পার্সেল।”
অখিল কোনোমতে নিজের ঘোর কাটিয়ে বোকার মতো পার্সেলটা হাতে নেয়। রূপা আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে পুনরায় বলে,
—- “স্যার, পেমেন্টটা?”
অখিল দ্রুত পকেট থেকে টাকা বের করে রূপার হাতে গুঁজে দেয়। রূপা মুখে একগাল হাসি টেনে, কিছুটা সম্মান দেখিয়ে বলে,
—- “ধন্যবাদ স্যার।”
বলেই রূপা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে উল্টো ঘুরে চলে আসতে যাবে, ঠিক তখনই চারপাশের পুরো থমথমে পরিবেশকে কাঁপিয়ে দিয়ে মূল টেবিলের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায় বাঁধন। তার সেই ভারী আদেশ গমগম করে ওঠে,
—- “এক মিনিট, দাঁড়ান।”
বাঁধনের সেই চেনা ইস্পাত-কঠিন ডাক শোনামাত্রই রূপার পা দুটো যেন মেঝেতে আটকে যায়, বুকের ভেতরটা এক তীব্র আতঙ্কে দুমড়ে-মুচড়ে ওঠে। এই লোকটা তাকে হঠাৎ ডাকছে কেন? কোনোভাবে কি চিনে ফেলল? রূপা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বাঁধন ধীর কিন্তু ভারী পদক্ষেপে এগিয়ে আসে এবং রূপার ঠিক পেছনে, প্যান্টের দুই পকেটে হাত গুঁজে সটান হয়ে দাঁড়ায়। চারপাশের বাতাস তখন এক অদৃশ্য টানটান উত্তেজনায় কাঁপছে। গম্ভীর গলায় বলে,
—- “টার্ন অ্যারাউন্ড অ্যান্ড ফেস মি।”
নিজেকে যথাসম্ভব সামলে নিয়ে আস্তে আস্তে বাঁধনের দিকে ঘুরে দাঁড়ায় রূপা। মাথাটা নিচু করে গলাটা যতটা পারে মোটা আর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলে,
—- “জ্বি স্যার?”
বাঁধনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ রূপার কাদায় ঢাকা মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে। চারপাশের পরিবেশ তখন একদম নিস্তব্ধ। কয়েক সেকেন্ড পর বাঁধনের ভারী গলা ভেসে আসে,
—- “আপনার নাম কী?”
রূপার মাথায় হুট করে যে নামটা আসে, তা-ই বলে দেয়,
—- “স্যার, নাইমা।”
বাঁধন দু-পা সামনে এগিয়ে আসে। তার চোখের দৃষ্টি যেন রূপার মনের ভেতরটা পড়ে ফেলতে চাইছে। সে মেপে মেপে বলে,
—- “কিছুক্ষণ আগেই তো আপনাকে দেখলাম বেশ পরিপাটি ছিলেন। হঠাৎ এমন কী হলো যে শরীরে এভাবে কাদা মেখে ভূত হয়ে গেলেন?”
রূপা ভেতরে ভেতরে ভয়ে কাঁপতে থাকে। কোনোমতে আমতা আমতা করে বলে,
—- “স্যার আসলে কাদার ভেতর পিছলে পড়ে গিয়েছি।”
বাঁধনের ঠোঁটের কোণে এবার একটা তীক্ষ্ণ বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। সে দুই হাত পকেটে গুঁজে ধীর পায়ে রূপার চারপাশটা একবার ঘুরে আসে। তারপর ঠিক রূপার সামনে এসে দাঁড়িয়ে ধারালো গলায় বলে,
—- “সিম্পল লজিক, তা-ই বলে। কাদায় পড়ে গেলে মানুষের সারা শরীরে কাদার ছিটে লাগে, মুখে লাগলেও সামান্যই লাগে। আর আপনার এই মেকআপ দেখে তো মনে হচ্ছে, কাদাটা আপনি বেশ ইনটেনশনালি মানে ইচ্ছে করেই পুরো মুখে লেপে দিয়েছেন।”
রূপার যেন জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা। এই হিমশীতল পরিবেশেও গালের ঘন কাদার ভেতর দিয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরে পড়ছে। কোনো রকমে থমকে যাওয়া বুকটা সচল করে তোতলামি গলায় বলে,
—- “স্যার আসলে ওই ওই স্যার, মানে একটা বাচ্চার সাথে দুষ্টুমি করতে গিয়ে একে অপরকে এইভাবে কাদা লাগিয়েছি।”
বাঁধন তার চোখের ওপর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও নজর সরায় না। নিস্পৃহ মুখে বলে,
—- “সিরিয়াসলি?”
রূপা এবার বাঁচার তাগিদে দ্রুত মাথা নাড়ে,
—- “হ্যাঁ হ্যাঁ স্যার। এখন আমি আসি।”
কথাটা শেষ করে রূপা পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই চারপাশের সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে রূপার কাদা মাখা হাতটা এক হ্যাঁচকা টানে শক্ত করে চেপে ধরে বাঁধন। মুহূর্তের মধ্যে এক তীব্র বৈদ্যুতিক স্পন্দনে রূপার সারা শরীর শিউরে ওঠে, কলিজাটা যেন মুখের কাছে চলে আসে। থানার ভেতরে উপস্থিত কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাঁধন হাতটা আরও শক্ত করে নিজের দিকে টানে। তারপর অখিলের দিকে সোজা তাকিয়ে অদ্ভুত ঠান্ডা গলায় বলে,
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৭
—- “অখিল, তুই না আমাকে প্রায়ই বলতিস আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি, বিয়ে করছি না? সো, লিসেন টু মি, এই কাদা মাখা মেয়েটাকে আমার পছন্দ হয়েছে। কোনো কথা নেই, এক্ষুনি কাজি ডাক। আই উইল ম্যারি হার রাইট নাও।”
