বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪৫
সুমি চৌধুরী
সীমা কিচ্ছু না বলতে পেরে একপ্রকার বাধ্য হয়েই ধীরপায়ে ইশতিয়াকের সাথে ওর রুমে এলো। সীমা আগে আগে হেঁটে ঘরে ঢুকলো, আর ইশতিয়াক পেছনে পেছনে ঢুকে ধপাস করে দরজাটা বন্ধ করে লক লাগিয়ে দিল।দরজা লাগানোর সেই সশব্দ শব্দে শিউরে উঠে পেছনে তাকালো সীমা। দেখলো ইশতিয়াক দরজায় গা ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার ঠোঁটের কোণে ঝুলছে এক চরম দুষ্টুমিভরা মুচকি হাসি।সীমা নিজেকে সামলে নিয়ে সামান্য আড়ষ্ট গলায় বললো,
—-” কী হয়েছে? এভাবে হাসছেন কেন?”
ইশতিয়াক সীমার দিকে একপলক তাকিয়ে মাথা দুলিয়ে বললো,
—-” তোমাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হুট করে একটা গান মনে পড়ে গেল!”
সীমা ভ্রু দুটো খানিকটা কুঁচকে কৌতূহল নিয়ে শুধালো,
—-” কিসের গান?”
ইশতিয়াক দুই হাত ডানার মতো মেলে ধরে, পাখির ভঙ্গিমায় সীমার দিকে এক-পা দুই-পা করে এগিয়ে আসতে আসতে উদাত্ত কণ্ঠে সুর তুলে গেয়ে উঠলো,
‘ওরে তুই যে আমার ময়না মনের পিঞ্জিরার ও পাখি,
আদর কইরা যতন কইরা,
পুইষা বুকে রাখি,
পাইলে তোরে হইমু সুখি সংসারে,
তোরে কিইনা দিমু খাঁটি সোনার গয়না রে,
‘যদি ভালোবাসিস আমারে তুই ময়না রে
তোরে কিইনা দিমু খাঁটি সোনার গয়না রে,
সীমা দুই হাত বুকের ওপর শক্ত করে ভাঁজ করে চরম বিরক্তি ফুটিয়ে বললো,
—-” ধুর! একদম ফালতু গান!”
ইশতিয়াক বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ন না হয়ে সোফা থেকে চকিতে একটা বালিশ তুলে নিল। সেটাকে কোলে আড়াআড়িভাবে ধরে হুবহু গিট্যার বাজানোর ভঙ্গি করে সীমার দিকে চোখে চোখ রেখে বলে উঠলো,
—-” ওকে ম্যাডাম! এবার তবে একটা খাঁটি রোমান্টিক গান শোনাই দেখোই না কেমন ফিল আসে! আর হ্যাঁ, যদি অনুভূতির পারদ একটু বেশিই চড়ে যায় তবে আমায় বোলো, আমি নিজ দায়িত্বে কমিয়ে দেবো!”
বলেই সে আবেশ জড়িয়ে গিট্যারে ঝংকার তোলার মতো করে গাইতে শুরু করলো,
‘অভদ্র হয়েছি আমি তোমারই প্রেমে তাই,
কাছে আসো না, আরো কাছে আসো না
শিশি কথা বলো না,
কোনো কথা বলো না’
গানটা সীমার বুকের গহীনে আছড়ে পড়তেই অচেনা এক আবেশে ঝিমঝিম করে উঠলো সারা শরীর। রক্তে বয়ে গেল এক অদ্ভুত উন্মাদনার জোয়ার! কিন্তু সে কিছুতেই নিজের এই দুর্বলতা বাঁধ ভাঙতে দিল না। মুখ ভেংচি কেটে বিছানা থেকে একটা বালিশ তুলে ইশতিয়াকের দিকে ছুড়ে দিয়ে ক্ষোভের সাথে বললো,
—-” আপনার অভদ্রতা আপনার কাছেই রাখুন! সোফায় যান, ওখানেই আপনার ঘুমানোর জায়গা। আর আমি বিছানায় ঘুমাবো, গুড নাইট!”
বলেই সীমা তড়িঘড়ি করে বিছানায় উঠে ইশতিয়াকের দিকে পেছন ফিরে গা ঢাকা দিয়ে শুয়ে পড়লো।কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানেই পুরো বিছানাটা মারাত্মক গতিতে দোলে উঠলো! সীমা কিছু ভেবে ওঠার বা নিজেকে সামলে নেওয়ার ন্যূনতম সুযোগটুকুও পেল না। পেছন থেকে ইশতিয়াক তাকে একদম শক্ত খাঁচায় বাঁধার মতো জড়িয়ে ধরে, সীমার অনাবৃত ঘাড়ে নিজের মুখটা গভীর করে ডুবিয়ে দিল।তারপর কানের লতিতে উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে নিচু, গম্ভীর আর ক্ষুরধার ফিসফিসানি কণ্ঠে বলে উঠলো,
—-” এখন যদি ভুল করেও একটা অতিরিক্ত কথা মুখ দিয়ে ফুট তলেছো, তবে এখনি বাচ্চার আম্মু বানিয়ে দেবো! আমি কিন্তু চরম ডার্ক মুডে আছি পাখি তাই ভালো চাও তো একদম নড়াচড়া কোরো না, চুপচাপ পড়ে থাকো”
হঠাৎ ইশতিয়াকের এতটা ঘনিষ্ঠতায় পাথরের মতো স্থির হয়ে যায় সীমা। ইশতিয়াকের উষ্ণ নিঃশ্বাস তার ঘাড় ছুঁয়ে যাচ্ছে, আর অজান্তেই শরীরজুড়ে কেমন এক অদ্ভুত শিহরণ জেগে উঠছে।সীমার চুলের মিষ্টি শ্যাম্পুর ঘ্রাণটা গভীরভাবে টেনে নিয়ে ইশতিয়াক মৃদু স্বরে বলে ওঠে,
—-এই সামান্য ঘ্রাণেই আমি মাতাল। তাহলে শাশুড়ির মেয়ে, একবার ভেবে দেখ তো তোর প্রেমে আমি কতটা মাতাল! মাতাল ভীষণ মাতাল। একেবারে পাগল করে দেওয়ার মতো মাতাল।,
ফেন্সি ইয়ারাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে চলছে রূপা। বুকের ভেতর জমে থাকা এত বছরের কষ্ট যেন আজ অশ্রু হয়ে বেরিয়ে আসছে। এর জন্যই এত আপন মনে হতো এই মানুষটাকে, এই মানুষটাই যে তার বাবার মা, তার নিজের দাদি। সত্যিটা জানার পর বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা আর আপন করে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে মিশে যাচ্ছে রূপার।ফেন্সি ইয়ারাও নাতনিকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে চলেছেন। বারবার রূপার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, যেন এত বছরের না-পাওয়াগুলো এক মুহূর্তেই মুছে দিতে চাইছেন। দুজনের ফুঁপিয়ে কান্নায় পুরো রুমটা ভারী হয়ে উঠছে।
একটু দূরে দুই হাত বুকে ভাঁজ করে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে বাঁধন, আকাশ, জেইন আর ওমর। পাশেই অ্যান্সি আর নিক্সিও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। সবাই নীরবে তাকিয়ে আছে সামনে ঘটে যাওয়া নাতনি-দাদির এই আবেগঘন মিলনের দিকে।কাঁদতে কাঁদতে রূপা দাদির বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে বলে,
—- দাদি আমি এতিম। আমার বাবা-মা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।
ফেন্সি ইয়ারার চোখের কোণ বেয়ে আবারও অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। তিনি রূপার মাথায় হাত বুলিয়ে মমতা মেশানো কণ্ঠে বলেন,
—- কে বলেছে তুই এতিম? বাবা-মা না থাকলেই মানুষ এতিম হয় না রে মা। জীবনে এমন একজন মানুষও আসে, যার হাত ধরে গোটা জীবনটা পার করে দেওয়া যায়। তোর জীবনেও সেই মানুষটা আছে। তাকে পেয়ে তুই কোনোদিন বুঝতেই পারবি না, তুই একা তুই এতিম।
ফেন্সি ইয়ারার কথা শুনে বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে রূপা। কথাগুলোর গভীরতা যেন পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারে না সে। নাতনির চোখেমুখে জমে থাকা সেই প্রশ্ন দেখে ফেন্সি ইয়ারা নিজের চোখের কোণের অশ্রু মুছে নেন। তারপর ধীর, স্নেহমাখা কণ্ঠে বলতে শুরু করেন।
—- বাঁধন আমাকে সব বলেছে। আমিও বাঁধনের ব্যাপারে সব জেনেছি। ছেলেটা তোকে প্রচণ্ড ভালোবাসে, এটা বলতে আমি বাধ্য হচ্ছি। কারণ যে পুরুষ তার ভালোবাসার মানুষের জন্য নিজের শখের চাকরিটাও ছেড়ে চলে আসতে পারে, সে আর যাই হোক, সেই নারীকে হারিয়ে বাঁচতে পারবে না।
একটু থেমে রূপার মুখের দিকে তাকান ফেন্সি ইয়ারা। চোখেমুখে তখন অদ্ভুত এক মায়া।
—- বাঁধন একদম তোর বাবার মতো। তোর বাবাও ঠিক এমন করেই তোর মাকে ভালোবাসত। এক কথায়, তোর মায়ের জন্য উন্মাদ ছিল তোর বাবা। তোর মা যখন যা চাইত, যা প্রয়োজন হতো, তোর বাবা সবকিছু তার পায়ের কাছে এনে হাজির করত। কখনো টাকার অভাব হতে দেয়নি, কখনো ভালোবাসার অভাব হতে দেয়নি। নিজের সবটুকু দিয়ে তোর মায়ের জীবনটা ভালোবাসায় পরিপূর্ণ করে রেখেছিল।
ফেন্সি ইয়ারার আঙুলগুলো ধীরে ধীরে রূপার গাল ছুঁয়ে যায়।
—- ঠিক তেমনটাই দেখেছি আমি বাঁধনের চোখে। তোকে হারানোর ভয় দেখেছি, তোকে পাওয়ার উন্মাদনা দেখেছি, আর দেখেছি তোকে ঘিরে তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। তুইও তোর মায়ের মতো ভাগ্য করে এমন একজন পুরুষ পেয়েছিস, যে তোকে পাওয়ার জন্য নিজের সবকিছু ছেড়ে দিতে পারবে। কিন্তু তোকে ছেড়ে দিতে পারবে না।
ফেন্সি ইয়ারার প্রতিটি শব্দ নীরবে শুনে যায় রূপা। কথাগুলো যেন একে একে এসে তার হৃদয়ের গভীরে স্পর্শ করছে। বুকের ভেতর অজান্তেই ভালোবাসার এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে। এতদিন বাঁধনের চোখে যে অনুভূতিগুলো দেখেছে, আজ যেন সেগুলোর ভাষা খুঁজে পাচ্ছে রূপা।
ফেন্সি ইয়ারা রূপার গালে হাত রেখে আবারও মমতা ভরা কণ্ঠে বলেন।
—- তোর জন্ম হয়েছে খ্রিষ্টান পরিবারে, কিন্তু তুই বড় হয়েছিস মুসলমান ধর্মের বিশ্বাস আর সংস্কৃতির মধ্যে। তোর জীবনের সঙ্গীও একজন মুসলমান। তাই আমি চাই, তুই সবসময় মুসলমান ধর্মেই থাকিস। আমাদের খ্রিষ্টান ধর্মে ফিরে আসিস না। তুই যে বিশ্বাসে বড় হয়েছিস, যে বিশ্বাসে নিজের জীবনসঙ্গীকে পেয়েছিস, সেই বিশ্বাস নিয়েই সুখে থাকিস। আমার কাছে তোর ধর্মের চেয়েও বড় তোর শান্তি আর তোর সুখ,।
রূপার বুকটা যেন মুহূর্তেই খুশিতে ভরে ওঠে। কোনো কিছু না ভেবেই ফেন্সি ইয়ারাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাসিমাখা কণ্ঠে বলে,
—- তুমি অনেক ভালো দাদি।
বলেই আবার কী যেন মনে পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে দাদির বুক থেকে মুখ তুলে কৌতূহলী চোখে তাকায় রূপা।
—- আচ্ছা দাদি, তুমি আমাকে চিনলে কীভাবে? কী করে বুঝলে আমিই তোমার নাতনি?
ফেন্সি ইয়ারা রূপার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলেন,
—- তোর চোখ আর ওই ঘ্যাঁচ দাঁতটা দেখেই।
রূপা চোখ বড় বড় করে তাকায়।
—- মানে?
ফেন্সি ইয়ারা এবার রূপার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ধীরে ধীরে বলেন,
—- চল, তোকে দেখাই কীভাবে চিনেছি তোকে।
রূপার হাত ধরে ফেন্সি ইয়ারা এগিয়ে যান পাশের একটি রুমের দিকে। তাদের পেছন পেছন বাঁধন, আকাশ, জেইন আর ওমরও এসে দাঁড়ায়।
রুমে ঢুকেই থমকে চারপাশে তাকায় রূপা। ঘরটা যেন অন্যরকম এক জগৎ। চারপাশে কালো রঙের আধিপত্য, অথচ প্রতিটি জিনিস এত পরিপাটি আর যত্নে সাজানো যে ঘরটার ভেতর এক ধরনের গম্ভীর সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে। রূপার চোখ ঘুরে বেড়ায় দেয়াল থেকে আসবাব, প্রতিটি কোণায়।ফেন্সি ইয়ারা ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর এগিয়ে গিয়ে বলেন,
—- এটা তোর বাবার রুম ছিল। যদিও তোর বাবা এখানে খুব একটা থাকত না। তোর বাবার অনেকগুলো বাড়ি ছিল,যেমন ডুপ্লেক্স হাউস,প্রাইভেট ভিলা,এস্টেট হাউস,আরো অনেক হাউস। যখন যেখানে মন চাইত, সেখানেই গিয়ে থাকত। কখনো মাটির নিচে, কখনো আবার জাহাজে। তোর বাবার জীবনটাই ছিল এমন। এক জায়গায় বেশিদিন স্থির হয়ে থাকার মতো মানুষ ছিল না সে।
ফেন্সি ইয়ারার দৃষ্টি এবার ঘরের একেকটা জিনিসের ওপর থেমে থেমে যায়।
—- কিন্তু তোর মা এই ঘরটা ভীষণ ভালোবাসত। এই ঘর ছেড়ে কোথাও যেতে চাইত না। নিজের হাতে প্রতিটা জিনিস গুছিয়ে রাখত, বারবার পরিষ্কার করত। তোর বাবা এখানে না থাকলেও ঘরটা সবসময় তোর মায়ের যত্নে একদম পরিপাটি থাকত।
কথার মাঝেই ফেন্সি ইয়ারার কণ্ঠে হালকা বিষণ্ণতা নেমে আসে।
—- তোর বাবা তোর মায়ের সঙ্গে খুব একটা থাকত না। কাজের জন্য বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকত। কিন্তু তোর মা কখনো এই ঘরটার যত্ন নেওয়া বন্ধ করেনি।
রূপার চোখে তখন কৌতূহল। এতক্ষণ নীরবে শুনলেও এবার প্রশ্নটা আর আটকে রাখতে পারে না
—- বাবা মায়ের সঙ্গে থাকত না কেন?
ফেন্সি ইয়ারা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
—- তোর বাবা ছিল মাফিয়া। গোটা শহর নিজের হাতের মুঠোয় রাখত। তার চারপাশে সবসময় কাজ, মানুষ আর বিপদ ঘিরে থাকত। তাই তাকে বেশিরভাগ সময়ই বাইরে থাকতে হতো।
বলেই ফেন্সি ইয়ারা ধীরে ধীরে এগিয়ে যান ঘরের একপাশের দেয়ালের কাছে। সেখানে ঝোলানো কালো পর্দাটা সরিয়ে দেন। মুহূর্তের মধ্যে দেয়ালে টানানো বিশাল একটি ফ্রেমের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ফেন্সি ইয়ারার দৃষ্টি ছবিটার ওপর স্থির হয়ে যায়। তারপর ধীরে ধীরে বলেন,
—- তুই জানতে চেয়েছিলি না, আমি তোকে কীভাবে চিনলাম? তাহলে শোন। তোকে আমি তোর বাবার চেহারা দেখে চিনেছি, তোর বাবার চোখ দেখে চিনেছি। আর তোর মায়ের ঘ্যাঁচ দাঁতটা দেখেও চিনেছি। তোর মুখের মধ্যে তোর বাবার সঙ্গে অনেক মিল, ঠিক তোর বাবার মতোই বাদামি চোখ দুটো হয়েছে তোর। আবার তোর মায়ের মতোই ডান পাশে ওই ঘ্যাঁচ দাঁতও আছে তোর। তোকে প্রথম দেখেই আমার বুকের ভেতরটা বলে উঠেছিল, এই মেয়েটাই আমার প্রিয়াসার মেয়ে, আমার ইথানের সন্তান।
রূপার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। কাঁপা কাঁপা পায়ে ধীরে ধীরে ছবিটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। চোখ দুটো বিস্ফারিত, ঠোঁট কাঁপছে।
—- এই দুজন কে, দাদি?
ফেন্সি ইয়ারা অশ্রুসিক্ত চোখে ছবিটার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলেন,
—- তোর বাবা-মা।
মুহূর্তেই ঘরের সবাই অবাক চোখে ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে।সোনালি কারুকার্য করা বিশাল এক ফ্রেমের ভেতর বন্দি হয়ে আছে বহু বছর আগের এক বিয়ের সুন্দর মুহূর্ত।ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি সুন্দর সোনালি কারুকার্য করা ফ্রেমে বাঁধানো বিয়ের ছবি দেয়ালে টানানো। ছবির মাঝখানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে প্রিয়াসা ও ইথান রিচার্ডসন।প্রিয়াসার পরনে ঝলমলে সাদা ব্রাইডাল গাউন। গাউনের ওপর সূক্ষ্ম নকশা করা, কোমর থেকে নিচে কাপড়টি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে। মাথায় সাদা ওয়েডিং ভেইল, সঙ্গে ছোট্ট ঝকঝকে টায়রা। এক হাতে সে সাদা ফুলের সুন্দর একটি ব্রাইডাল বুকেট ধরে আছে। প্রিয়াসা ইথানের কাঁধের নিচে হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে আলতো করে তার কাঁধে মাথা রেখেছে। মুখে ফুটে আছে মিষ্টি, শান্ত একটি হাসি, আর তার দৃষ্টি সোজা ক্যামেরার দিকপাশে দাঁড়িয়ে আছে ইথান রিচার্ডসন। তার পরনে পরিপাটি কালো টাক্সেডো, ভেতরে সাদা শার্ট এবং গলায় কালো বো-টাই। বুকের কাছে লাগানো আছে ছোট্ট সাদা ফুলের বুটোনিয়ার। এক হাত দিয়ে সে প্রিয়াসার কোমর জড়িয়ে ধরে রেখেছে, আর অন্য হাতটি প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখা। মুখভঙ্গি বেশ গম্ভীর ও স্থির, চোখ সোজা সামনের দিকে নিবদ্ধ।তাদের পেছনে নরম হলুদাভ আলো, চারপাশে সাদা ফুলের সাজসজ্জা। পুরো ছবিটা যেন তাদের ভালোবাসার একটি নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে দেয়ালের বুকে আটকে আছে।
রূপা ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে ছবিটার ওপর আঙুল রাখে। ছবির কাচ ছুঁতেই তার চোখ থেকে টুপটুপ করে পানি ঝরতে থাকে। কাঁপা ঠোঁটে ফিসফিস করে ওঠে,
—- এই দুজন… আমার বাবা-মা…
পরক্ষণেই ছবিটার গায়ে কপাল ঠেকিয়ে শব্দ করে কেঁদে ওঠে রূপা। বুকের ভেতরটা যেন কেউ মুঠো করে চেপে ধরেছে। এতদিন পর নিজের পরিচয় পেয়েছে সে, জেনেছে তার বাবা-মায়ের কথা, জেনেছে তাদের ভালোবাসার গল্প। অথচ এই পরিচয়ের সঙ্গে যদি আজ বাবা-মা দুজনকেও ফিরে পেত, তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটা হয়তো রূপাই হতো।কিন্তু ভাগ্য তাকে পরিচয় দিয়েছে, স্মৃতি দিয়েছে, ভালোবাসার গল্প দিয়েছে শুধু বাবা-মাকে দেয়নি
ফেন্সি ইয়ারা ধীরে ধীরে ছবিটার আরও কাছে এগিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ কোনো কথা বললেন না। স্থির দৃষ্টিতে ছবির ভেতর হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয়াসার দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। সেই হাসিটা যেন বহু বছর আগের কোনো এক বিকেল থেকে আজও ছবির ভেতর আটকে আছে। অথচ সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল কতটা অপেক্ষা, কতটা কষ্ট তা জানতেন কেবল এই মানুষটিই।
ফেন্সি ইয়ারা ধীরে করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর ভারী কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন।
—- তোর মা ছিল আমার ভাইয়ের মেয়ে। খুব সাধারণ একটা পরিবার ছিল আমার ভাইয়ের। কোনো বড়লোকি ছিল না, কোনো অহংকার ছিল না। ছিল শুধু ভালোবাসায় ভরা একটা ছোট্ট সংসার। আর সেই সংসারের সবচেয়ে আদরের মেয়েটা ছিল তোর মা। শান্ত, মিষ্টি, হাসিখুশি একটা মেয়ে। ওর মুখে সবসময় একটা হাসি লেগেই থাকত।
একটু থামলেন তিনি। ছবিতে প্রিয়াসার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন, কিন্তু সেই হাসিতে মুহূর্তেই বিষাদের ছায়া নেমে এলো। তিনি এবার ইথান রিচার্ডসনের দিকে তাকিয়ে বলেন,
—- আর অন্যদিকে আমার ছেলেটা ছিল ঠিক তার উল্টো। মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর। মানুষ তার সামনে দাঁড়াতেও ভয় পেত। ভালোবাসা তো দূরের কথা, তার নামটা মুখে আনতেও মানুষ দশবার ভাবত। কোনো মেয়েই সাহস করে তার দিকে তাকাত না। কারণ আমার ছেলে, ছেলে হোক কিংবা মেয়ে কেউ তার সঙ্গে ভুল করলে কথায় জবাব দেওয়ার মানুষ ছিল না সে। কথার চেয়ে তার বন্দুকই বেশি কথা বলত। তাই তার আশেপাশে কোনো মেয়ের ছায়াও পড়ত না।
ফেন্সি ইয়ারার চোখ ধীরে ধীরে ছবির ওপর স্থির হয়ে গেল।
—- কিন্তু জানিস, সেই ভয়ংকর মানুষটার প্রেমেই প্রথম থেকে পড়ে গিয়েছিল তোর মা। কীভাবে ভালোবেসেছিল, কেন ভালোবেসেছিল সেটার উত্তর হয়তো প্রিয়াসার নিজের কাছেও ছিল না। শুধু জানত, সে আমার ছেলেটাকেই ভালোবাসে।
কণ্ঠটা আরও নরম হয়ে এলো তাঁর।
—- শুধু আমার কাছে এসে বলত, ফুপি তোমার ছেলেটাকে আমায় দিয়ে দাও না গো। এমনভাবে বলত, মনে হতো ওর পৃথিবীতে আমার ছেলেটা ছাড়া আর কিছুই নেই। ভাইয়ের বাসায় গেলেই আমাকে এই এক কথা বলত, তোমার ছেলেটাকে আমায় দিয়ে দাও। আমি প্রথমে হাসতাম, ওকে বকতাম। কিন্তু মেয়েটা নাছোড়বান্দা। প্রতিদিন একই আবদার। ধীরে ধীরে কখন যে আমিও ওর মায়ায় পড়ে গেলাম, বুঝতেই পারিনি।একসময় আমিও ঠিক করে ফেললাম, আমার ইথানের সঙ্গে প্রিয়াসারই বিয়ে দেব। মনে হয়েছিল, এই মেয়েটাই হয়তো আমার ছেলেটার অন্ধকার জীবনে একটু আলো এনে দিতে পারবে। কিন্তু কথাটা যখন তোর বাবাকে বললাম, ছেলেটা কী রাগটাই না করেছিল! সাফ জানিয়ে দিল, কোনোভাবেই প্রিয়াসাকে বিয়ে করবে না। আমার কথা শুনবে না, আমার কোনো অনুরোধ শুনবে না। যেন বিয়ের কথা বলাটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় অপরাধ। কিন্তু আমিও সেদিন জেদ ধরে বসেছিলাম। নিজের মরা কসম দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, আমার কথা না রাখলে আমি আর কোনোদিন তোকে ক্ষমা করব না। শেষ পর্যন্ত আমার জেদের কাছেই হার মানতে হয়েছিল আমার ছেলেকে। বাধ্য হয়ে তোর বাবাকে তোর মাকে বিয়ে করতে হয়েছিল।
রূপার দিকে একবার তাকিয়ে আবার ছবির দিকে তাকালেন তিনি।
—- কিন্তু জানিস, বিয়ের পরে তোর বাবা প্রিয়াসাকে একটিবারও নিজের করে নেয়নি। বিয়ের পরপরই চলে গিয়েছিল। মেয়েটার সঙ্গে একটা কথাও বলেনি। একটা স্বামী তার নতুন বউকে যেভাবে কথা বলে, যেভাবে কাছে টেনে নেয় তার কিছুই করেনি আমার ছেলে। অথচ তোর মা? সে একটুও রাগ করেনি। অভিমান করেনি। আমাকে কিংবা তোর দাদাকে একবারও বলেনি, তোমাদের ছেলে আমার সঙ্গে এমন করছে কেন? বরং আমাদের দুজনকে এমনভাবে আগলে রেখেছিল, যেন আমরাই তার আপন পৃথিবী। সারাক্ষণ আমাদের হাসাত। আমাদের যত্ন নিত। নিজের কষ্টটা বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখত। অথচ তোর বাবাকে নিয়ে একটা অভিযোগও করত না। টানা দুই মাস পর বাড়িতে ফিরেছিল তোর বাবা। আর সেদিন তোর মা যে কী খুশি হয়েছিল সেটা তোকে কীভাবে বোঝাব বল? মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখটা বুঝি সে পেয়ে গেছে। চোখেমুখে কী যে আনন্দ ছিল মেয়েটার! অথচ সেই আনন্দ বেশিক্ষণ টেকেনি। তোর বাবা তোর মায়ের সঙ্গে খুব বাজে ব্যবহার করত। তাকে কাছে ঘেঁষতে দিত না, কথায় কথায় এড়িয়ে যেত। কিন্তু তোর মা? সে কখনো উল্টো একটা কথাও বলেনি। সব চুপচাপ সহ্য করে গেছে। আমি অনেকবার ওর চোখে পানি দেখেছি, কিন্তু মুখে অভিযোগ শুনিনি। তখন বুঝেছিলাম, মেয়েটা শুধু ভালোবাসে না ভালোবাসার মানুষটার জন্য নিজের কষ্টটাকেও হাসিমুখে বয়ে নিয়ে যেতে শিখে গেছে।
ফেন্সি ইয়ারা কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন।
—- তোর বাবা একদমই তোর মায়ের সঙ্গে থাকত না। যখনই বাড়িতে আসত, আমাদের সঙ্গে দেখা করত, কিছুক্ষণ থাকত, তারপর আবার চলে যেত। আমরা চাইলেও তাকে আটকাতে পারতাম না। কিন্তু তোর মা? সে থেমে থাকেনি। তোর বাবা যে জায়গায় থাকত, সেখানেই চলে যেত। নিজের হাতে রান্না করে নিয়ে যেত। আমার ছেলে বিরক্ত হতো, রাগ করত তবুও মেয়েটা জোর করে নিজের হাতে খাইয়ে আসত।কখনো তোর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে সারারাত জেগে সেবা করত। নিজের ঘুম, নিজের খাওয়া সব ভুলে যেত। আর আমার ছেলেটা? সে যেন মেয়েটার এই ভালোবাসাটুকুও সহ্য করতে পারত না। একদিন তো রাগের মাথায় তোর মায়ের গায়ে হাত পর্যন্ত তুলেছিল।কিন্তু তোর মা সেদিনও কোনো অভিযোগ করেনি। কাউকে কিছু বলেনি। যেন কষ্ট পাওয়ার অধিকারটুকুও সে নিজের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল।
ফেন্সি ইয়ারার চোখ বেয়ে এবার একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল।
—- কিন্তু তোর দাদা আর আমি আর সহ্য করতে পারিনি। আমরা ঠিক করলাম, এই সম্পর্কের ইতি টানব। তোর বাবা ডিভোর্স দিতে রাজিও হয়ে গেল। কিন্তু তোর মা…
কথাটা বলতে গিয়ে তাঁর গলা আটকে এলো।
—- তোর মা কিছুতেই রাজি হলো না। একেবারে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল মেয়েটা। তোর বাবার পায়ে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, যেন তাকে ডিভোর্স না দেয়। আমাদের পায়েও জড়িয়ে ধরেছিল। বলেছিল, ফুপি, আমি সারাজীবন ওর দাসী হয়ে থাকব, তবুও আমাকে ওর কাছ থেকে আলাদা করে দিও না।
ফেন্সি ইয়ারা চোখ মুছে নিলে,
—- বল তো, একটা মানুষ আর কতটা ভালোবাসলে এমন কথা বলতে পারে?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ছবির দিকে তাকিয়ে খুব ধীরে বললেন তিনি।
—- সেদিন তোর মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে আমরা আর ডিভোর্স করাতে পারিনি। কারণ তখন বুঝে গিয়েছিলাম, মেয়েটা আমার ছেলেটাকে শুধু ভালোবাসে না নিজের পুরো পৃথিবীটাই ওই মানুষটার হাতে তুলে দিয়েছে।
ফেন্সি ইয়ারার ঠোঁটে কাঁপা হাসি ফুটে উঠল।
—- তোর মাকে দেখে আমার গর্ব হতো। আমার ছেলের মতো নিষ্ঠুর একটা মানুষকে কেউ এতটা ভালোবাসতে পারে এটা আমি নিজের চোখে প্রিয়াসাকে না দেখলে কোনোদিন বিশ্বাসই করতে পারতাম না। আমার ছেলে যেখানে সবাইকে ভয় দেখিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, সেখানে একটা মেয়ের ভালোবাসা তাকে ছেড়ে যায়নি। বরং যতবার সে দূরে ঠেলে দিয়েছে, তোর মা ততবার আরও শক্ত করে তাকে ভালোবেসেছে।তোর মা জানত, তোর বাবা তাকে ভালোবাসে কি না… তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবুও সে ভালোবেসে গেছে। কারণ কিছু মানুষ ভালোবাসার প্রতিদান পাওয়ার জন্য ভালোবাসে না,। তারা শুধু ভালোবাসে আর সেই ভালোবাসার মানুষটাকে আঁকড়ে ধরেই সারাজীবন বেঁচে থাকতে চায়। তোর মা ছিল ঠিক তেমনই একজন মানুষ।
আকাশ এতক্ষণ চুপচাপ ফেন্সি ইয়ারার কথা শুনছিল। কিন্তু একটা প্রশ্ন কিছুতেই তার মাথা থেকে যাচ্ছিল না। এতটা কঠিন, এতটা ভয়ংকর একটা মানুষ কীভাবে শেষ পর্যন্ত প্রিয়াসার মতো একজন মানুষকে এত গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলল?কৌতূহলটা আর সামলাতে না পেরে আকাশ একটু এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল।
—- আচ্ছা দাদি, ইথান আঙ্কেল তাহলে আন্টিকে এতটা গভীরভাবে কীভাবে ভালোবেসে ফেলল?
ফেন্সি ইয়ারার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। তিনি কিছুক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন।
—- সে কথা জানতে চাও? সে কথা বললে তো একটা পুরো কাহিনি হয়ে যাবে। আমার ছেলেটা একদিন রূপার মাকে শর্ত দিয়েছিল যদি ডিভোর্স না চায়, তাহলে যেন তার থেকে দূরে দূরে থাকে। তার চোখের সামনে যেন একদম না পড়ে। যখন-তখন হাউসে গিয়ে যেন না ওঠে। আর সবচেয়ে বড় কথা, তার সামনে যেন কোনো ভালোবাসার আবেগ না দেখায়।আর জানো মেয়েটা কী করেছিল? একটাও তর্ক করেনি। একটাও প্রশ্ন করেনি। সেদিন থেকে সত্যি সত্যিই আমার ছেলের কাছ থেকে দূরে সরে গেল।হাউসেও আর যেত না। আমার ছেলে বাড়িতে এলে অন্য একটা রুমে গিয়ে বসে থাকত। যতক্ষণ আমার ছেলে বাড়িতে থাকত, ততক্ষণ ওই ঘর থেকে বের হতো না। আমার ছেলে চলে যাওয়ার পরই শুধু বের হতো। একবারও তার সামনে গিয়ে দাঁড়াত না। একবারও জোর করে কথা বলার চেষ্টা করত না। আমার ছেলেটা যেটা চেয়েছিল, সে ঠিক সেটাই করেছিল।
আকাশ মনোযোগ দিয়ে শুনছে। ফেন্সি ইয়ারার মুখে এবার অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল।হঠাৎ তিনি একটু জোরে হেসে উঠলেন। তারপর হাসতে হাসতেই মাথা নাড়লেন।
—- কিন্তু কথায় আছে না, যেটাকে অবহেলা করতে করতে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়, ভাগ্যে থাকলে একসময় সেই জিনিসটাও নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি দামি হয়ে ওঠে। আমার ছেলের বেলায় ঠিক সেটাই হয়েছিল।
হাসিটা ধীরে ধীরে মুছে গিয়ে তাঁর চোখে স্মৃতির ছায়া নেমে এলো। রূপার দিকে তাকিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন,
—- তোর বাবার গার্ডদের কাছ থেকে তখন প্রায়ই শুনতাম, ছেলেটা কেমন যেন হয়ে গেছে। আগের মতো নিজের যত্ন নেয় না। ঠিকমতো খায় না, ঘুমায় না। সামান্য কিছু হলেই মেজাজ হারিয়ে ফেলে। এমনকি কোনো কারণ ছাড়াই নিজের গার্ডদের ওপর রেগে গিয়ে গুলি চালিয়ে দেয়।
ফেন্সি ইয়ারা একটু থামলেন।
—- একদিন তো শত্রুদের সঙ্গে সংঘর্ষে নিজেই গুলি খেল। সেদিনের কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিল। ইথান রিচার্ডসন গুলি খেয়েছে এই কথাটাই যেন কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না। কারণ আমার ছেলেকে কেউ এত সহজে আঘাত করতে পারবে, এটা মানুষ কল্পনাও করত না।
ফেন্সি ইয়ারার চোখে এবার মায়া ফুটে উঠল।
—- কিন্তু আমি সব শুনে ঠিকই বুঝেছিলাম, কী হয়েছে আমার ছেলেটার। প্রথমবারের মতো সে হয়তো প্রিয়াসার শূন্যতাটা অনুভব করতে শুরু করেছে। প্রথমবার বুঝতে শুরু করেছে, একটা মানুষ তার জীবন থেকে সরে গেলে সেই শূন্যতাটা কতটা গভীর হয়। এতদিন আমার ছেলে শুধু জানত, এই শহরের সবাই তাকে ভয় পায়। সবাই তাকে ঘৃণা করে। তার কাছ থেকে সবাই দূরে থাকতে চায়। কিন্তু প্রিয়াসা?প্রিয়াসা তাকে ভয় পায়নি। তার ভয়ংকর নাম শুনেও পিছিয়ে যায়নি। সবাই যখন আমার ছেলের কাছ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে দূরে সরে গেছে, তখন ওই মেয়েটাই তার কাছে এগিয়ে এসেছিল। তার হাত ধরেছিল। তার সঙ্গে জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিল। এমনকি আমার ছেলের মতো একজন মানুষের সঙ্গে সংসার করার জন্য নিজের পুরো জীবনটা তার হাতে তুলে দিয়েছিল। আর তখনই আমার ছেলে বুঝতে শুরু করেছিল, পৃথিবীর সবাই তাকে ঘৃণা করলেও একজন মানুষ আছে, যে তাকে ভালোবাসে। সবাই তার রক্তাক্ত অতীত দেখে ভয় পেলেও একজন মানুষ আছে, যে তার ভেতরের মানুষটাকে দেখতে চায়। সবাই যেখানে তাকে এড়িয়ে চলে, সেখানে একজন মানুষ তার পাশে দাঁড়াতে চায়।
তিনি মৃদু হেসে ছবির প্রিয়াসার মুখের দিকে তাকালেন।
—- সেই একজন মানুষটা যে প্রিয়াসা, সেটা আমার ছেলেটা খুব ভালোভাবেই অনুভব করেছিল। আর যেদিন সে বুঝেছিল, প্রিয়াসাকে ছাড়া তার চারপাশটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেছে সেদিন থেকেই বোধহয় আমার ছেলেটা অজান্তেই সেই মেয়েটার প্রেমে ডুবে যেতে শুরু করেছিল।তোর মাকে দূরে সরিয়ে দিয়েই আমার ছেলে প্রথমবার বুঝেছিল, মেয়েটা তার কতটা কাছে ছিল।
ফেন্সি ইয়ারা এবার ইথানের ছবির ওপর আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তাঁর চোখের সামনে যেন বহু বছর আগের সেই দিনটা আবারও জীবন্ত হয়ে উঠল।মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তিনি বলতে শুরু করলেন।
—- একদিন আমি আর তোর দাদা তোর মাকে নিয়ে শপিং করতে গিয়েছিলাম। সেদিন কে যেন তোর বাবাকে ফোন করে বলেছিল, প্রিয়াসার নাকি এক্সিডেন্ট হয়েছে। অবস্থা নাকি খুব খারাপ।ব্যস, এতটুকু খবরই যথেষ্ট ছিল আমার ছেলেটাকে পাগল করে দেওয়ার জন্য। আমাকে ফোন করে কিছু জিজ্ঞেস পর্যন্ত করেনি। আমার ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করে সোজা গাড়ি নিয়ে, সঙ্গে সব বডিগার্ড নিয়ে হাজির হয়ে গিয়েছিল শপিং মলে।তারপর কী করেছিল জানিস? পাগলের মতো পুরো শপিং মল ছুটে ছুটে প্রিয়াসাকে খুঁজেছিল। এক দোকান থেকে আরেক দোকানে, এক তলা থেকে আরেক তলায় কোথাও তোর মাকে না পেয়ে যেন ওর মাথাই কাজ করছিল না। চোখেমুখে এমন ভয় ছিল, আমি আমার ছেলেকে জীবনে কখনো সেভাবে দেখিনি। শেষ পর্যন্ত যখন তোর মাকে একদম সুস্থ অবস্থায় নিজের চোখের সামনে দেখতে পেল, তখনই যেন ওর বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়টা একসঙ্গে বেরিয়ে এলো। নিজেকে আর সামলাতে পারেনি। পুরো শপিং মলের সবার সামনে তোর বাবার মতো একটা মানুষ প্রিয়াসার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিল।
তিনি চোখ বন্ধ করে সেই দৃশ্যটা মনে করার চেষ্টা করলেন।তারপর কাঁপা গলায় চিৎকার করে বলেছিল,
—- আমি ভুল করেছি, প্রিয়াসা। যা শাস্তি দেবে, মাথা পেতে নেব। কিন্তু এই মুহূর্তে আমাকে একটু শান্তি দাও। আমাকে একটু জড়িয়ে ধরো আমার বুকের ভেতরটা যেন রক্তক্ষরণ করছে।
ঘরের সবাই নিঃশব্দ হয়ে গেল।ফেন্সি ইয়ারা মৃদু স্বরে আবার বললেন।
—- সেদিন পুরো শপিং মল থমকে গিয়েছিল। মানুষজন অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। কেউ বিশ্বাসই করতে পারছিল না, ইথান রিচার্ডসনের মতো একজন মানুষ একটা মেয়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। যে মানুষটার সামনে দাঁড়াতে সবাই ভয় পায়, সেই মানুষটাই সেদিন নিজের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটা সবার সামনে প্রকাশ করে দিয়েছিল।সেদিন সবাই প্রথমবার দেখেছিল, ইথান রিচার্ডসনেরও একটা হৃদয় আছে। যে মানুষটা কখনো কারও সামনে মাথা নত করেনি, সেদিন সে প্রিয়াসার সামনে মাথা নত করেছিল। গুলি খেয়েও যে মানুষটা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, সেই মানুষটা প্রিয়াসাকে হারানোর ভয়েই ভেঙে পড়েছিল।
ফেন্সি ইয়ারার চোখে পানি চিকচিক করল।
—- আর তোর মা? সে কি আর তোর বাবাকে ওই অবস্থায় দেখে নিজেকে সামলাতে পেরেছিল? পারেনি। মেয়েটা নিজেই কেঁদে ফেলেছিল। তারপর তোর বাবাকে তুলে নিয়ে জড়িয়ে ধরেছিল।সেদিনই তাদের ভালোবাসার শুরু হয়েছিল।তারপর থেকে দুজন দুজনের চোখেই যেন হারিয়ে থাকত। মনে হতো, দুজনের মধ্যে এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা চলছে কে কাকে বেশি ভালোবাসতে পারে। তোর বাবা এক কদম এগিয়ে ভালোবাসলে তোর মা দুই কদম এগিয়ে যেত। তোর মা যত্ন করলে তোর বাবা তার দ্বিগুণ যত্ন করত। এভাবেই ভালোবাসতে ভালোবাসতে কখন যে দুজন একে অপরের পুরো পৃথিবী হয়ে উঠেছিল, আমরা কেউ টেরই পাইনি। তোর মা অনেকবার তোর বাবাকে বলত, এসব ছেড়ে দাও। এই মাফিয়ার জীবন থেকে বেরিয়ে এসো। কিন্তু আমার ছেলেটা ওই কথা শুনলেই যেন অন্যরকম হয়ে যেত।
ঠোঁটে হাসি ফুটল তাঁর।
—- জানিস, তোর মা আমাকে নিজেই বলেছিল, সে যখনই তোর বাবাকে বলত, আপনি এসব ছেড়ে দিন তোর বাবা কোনো উত্তর না দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তাকে জড়িয়ে ধরত আর বলত, ভালোবাসি।মানে মাফিয়ার জীবন ছাড়ার কথা শুনবে না, কিন্তু বউকে ভালোবাসার কথা ঠিকই বলবে! এটাই ছিল তোর বাবা।
কিছুক্ষণ পর তাঁর মুখের হাসি আবার কোমল হয়ে এলো।
—- মাঝে মাঝে তোর বাবাকে কাজের জন্য বাইরে যেতে হতো। তখন প্রিয়াসাকেও সঙ্গে নিতে চাইত। কিন্তু তোর মা যেত না। বলত, তোমাদের ছেড়ে আমার যেতে ইচ্ছে করে না। তাই তোর বাবা যতদিন বাইরে থাকত, তোর মা আমাদের সঙ্গেই থাকত। আমাদের সঙ্গে সময় কাটাত, আমাদের হাসাত, আমাদের যত্ন নিত। অথচ নিজের স্বামীকে ছাড়া যে মেয়েটার বুকটা কেমন খালি হয়ে থাকত, সেটা কখনো আমাদের বুঝতে দিত না।এভাবেই দিন গেল। একটা বছর গেল, তারপর আরেকটা বছর। তাদের ভালোবাসা আরও গভীর হলো।সব শেষে তুই তোর মায়ের গর্ভে এলি।
ফেন্সি ইয়ারা একটু থামেন। তারপর তার চোখে হঠাৎ এক অন্যরকম স্মৃতির আলো ফুটে ওঠে।
—- কিন্তু তুই যখন তোর মায়ের গর্ভে এলি, সেদিন যেন আমার সেই কঠিন ছেলেটা এক নিমিষে বদলে গেল।তোর বাবা যখন প্রথম জানতে পারল, সে বাবা হতে যাচ্ছে, সেদিন আমি আমার ছেলের চোখে পানি দেখেছিলাম। সেই মানুষটার চোখে পানি! তাও আবার দুঃখের নয়, খুশির পানি। তোর বাবার চোখে পানি দেখা তো দূরের কথা, তার মুখে এক চিলতে হাসিও দেখা যেত না। ভীষণ কঠিন একটা মানুষ ছিল সে।অথচ তুই মায়ের পেটে আসার পর রাতারাতি যেন অন্য মানুষ হয়ে গেল তোর বাবা। সারাক্ষণ তোর মায়ের কাছে থাকত। এক সেকেন্ডের জন্যও তাকে চোখের আড়াল হতে দিত না। বাড়িতে ডাক্তার, নার্স সবসময় লোকজন রেখে দিয়েছিল, যাতে তোর মায়ের সামান্য কষ্টও না হয়। নিজের সবটুকু দিয়ে তোর মা আর তার পেটের তোকে আগলে রেখেছিল একদিন তো আমার কাছে এসে কী বলেছিল জানিস? বলেছিল, মা, তোমার ছেলে বাবা হতে যাচ্ছে। সবাই জানবে, ইথান রিচার্ডসন শুধু একজন মাফিয়া নয়, একজন বাবাও। কী যে খুশি ছিল আমার ছেলেটা সেদিন! সেই খুশি দেখে আমি আর তোর দাদাও ভেবেছিলাম, হয়তো এবার সত্যিই আমার ছেলেটা বদলে যাবে। হয়তো এবার ভালো কিছু হতে চলেছে।
শেষ কথাগুলো বলতে বলতে ফেন্সি ইয়ারার কণ্ঠ ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসে। মুখের সেই ক্ষীণ হাসিটুকুও মিলিয়ে যায়।
—- কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন সইল না। যেদিন তুই জন্ম নিলি, সেদিনই আমাদের সেই সুখটা যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল।
বলতে বলতে হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন ফেন্সি ইয়ারা। কথাগুলো যেন শুধু মুখে উচ্চারণ করছেন না, প্রতিটি শব্দের সঙ্গে বহু বছরের পুরোনো ক্ষত আবারও রক্তাক্ত হয়ে উঠছে। কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো একবার চেপে ধরে চোখের পানি মুছে নেন তিনি। তারপর বুকের ভেতর জমে থাকা সেই দুঃসহ স্মৃতিটা আবারও বলতে শুরু করেন,
—- তোকে জন্ম দিতে গিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তোর মা মারা যায়। আর তোর বাবা কিছুতেই সেটা মেনে নিতে পারেনি। মুহূর্তের মধ্যে পুরো হাসপাতালটা যেন তার কাছে নরক হয়ে উঠেছিল। যে ডাক্তার এসে তাকে বলেছিল, তার প্রিয়াসা আর নেই সেই ডাক্তারকেও সে মেরে ফেলেছিল। থিয়েটারে যারা ছিল, তাদের কাউকেই সেদিন ছাড়েনি।
ফেন্সি ইয়ারার কণ্ঠ হঠাৎ কেঁপে ওঠে।
—- আমার ছেলেটা সেদিন আর মানুষ ছিল না রে। তোর মায়ের নিথর দেহটা বুকে জড়িয়ে পাগলের মতো চিৎকার করে কেঁদেছিল। যে ইথান রিচার্ডসনের চোখে মানুষ কোনোদিন একফোঁটা পানিও দেখেনি, সেই পাষাণ মানুষটার বুকফাটা আর্তনাদে সেদিন পুরো হাসপাতাল কেঁপে উঠেছিল। সবাই দেখেছিল পাষাণ ইথান রিচার্ডসনও ভালোবাসতে জানে। আর মানুষ ঠিক কতটা ভালোবাসলে নিজের প্রিয় মানুষকে হারিয়ে কতটা ভেঙে পড়তে পারে, সেদিন সবাই দেখেছিল।
একটু থেমে চোখ মুছতে মুছতে ফেন্সি ইয়ারা আবার বলেন,
—- তোর বাবাকে কিছুতেই সামলানো যাচ্ছিল না। তোর মায়ের শরীরটা ছেড়ে উঠতেই চাইছিল না সে। শেষ পর্যন্ত যখন বুঝলাম, এভাবে চললে আমার ছেলেটা নিজেকেই শেষ করে ফেলবে, তখন তোকে কোলে নিয়ে তার সামনে যাওয়ার সাহস করলাম। কিন্তু জানিস, আমার নিজেরই ভয় লাগছিল। নিজের ছেলের কাছে যেতেও ভয় লাগছিল আমার। কারণ সেদিন তোর বাবা যেন একটা আহত জানোয়ারের মতো হয়ে গিয়েছিল। আমার ভয় হচ্ছিল যদি তোকে দেখেও তার ভেতরের সেই উন্মাদনা থামানো না যায়? যদি আমার ছোট্ট নাতনিটারও কোনো ক্ষতি করে ফেলে?
ফেন্সি ইয়ারার চোখ বেয়ে টুপটুপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
—- কিন্তু আমাকে ভুল প্রমাণ করেছিল তোর বাবা। আমি তোকে নিয়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তুই কাঁদতে শুরু করলি। আর সেই কান্নার শব্দটা শুনে তোর বাবা থেমে গেল। ধীরে ধীরে তোর দিকে তাকাল তারপর তোকে আমার হাত থেকে কোলে তুলে নিল। আর আশ্চর্য কী জানিস? বাবার বুকে উঠতেই তুই সঙ্গে সঙ্গে কান্না থামিয়ে দিলি।
ফেন্সি ইয়ারা কাঁপা হাসি হাসেন, চোখের পানি আর হাসি যেন একসঙ্গে মিশে যায়।
—- সেদিন প্রথমবার আমার মনে হয়েছিল, আমার সেই পাষাণ ছেলেটার বুকের ভেতরেও বুঝি একটা নরম জায়গা আছে। নিজের মেয়ের পরশে হয়তো সে প্রথমবার বুঝেছিল, সে শুধু একজন মাফিয়া নয় সে একজন বাবা। তোর বাবা তোকে বুকের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছিল, যেন পৃথিবীর কেউ কোনোদিন তার কাছ থেকে তোকে কেড়ে নিতে পারবে না।
একটু থেমে ফেন্সি ইয়ারা রূপার দিকে তাকান।
—- তারপর তোর কপালে একটা চুমু খেয়ে তোর নাম রেখেছিল ইথান প্রিসিয়া। বলেছিল, সবাই জানবে ইথান রিচার্ডসন আর প্রিয়াসার একমাত্র রাজকন্যা এই মেয়ে তাদের ভালোবাসার শেষ চিহ্ন।
———ইথান প্রিসিয়া———-
ফেন্সি ইয়ারার গলা এবার আরও ভারী হয়ে আসে।
—- সেদিন অনেকক্ষণ তোকে বুকের মধ্যে নিয়ে বসেছিল তোর বাবা। কখনো তোকে দেখছিল, কখনো তোর মায়ের নিথর মুখটার দিকে তাকাচ্ছিল। তারপর তোকে কোলে নিয়েই তোর মায়ের সঙ্গে কথা বলছিল, যেন প্রিয়াসা তখনও তার সামনে বসে আছে। কী বলছিল জানিস? বলছিল, প্রিয়াসা, দেখো আমাদের মেয়ে হয়েছে। তুমি তো বলেছিলে, আমি বাবা হলে বদলে যাব হয়তো। দেখো, আমি সত্যি বদলে গেছি। কিন্তু তুমি কোথায় গেলে? কেন ছেড়ে গেলে আমাকে। ফিরে আসো আমাদের মেয়ে কাঁদছে, তার মায়ের দুধ প্রয়োজন, ফিরে আসো আমার নিশ্বাস প্রিয়াসা।
ফেন্সি ইয়ারা আর নিজেকে সামলাতে পারেন না। চোখের পানি মুছে আবার বলেন,
—- অনেকক্ষণ পর তোকে আমার কোলে দিয়ে তোর বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
—- মা, আমাদের মেয়ের জীবনে যেই আসুক, ধনী হোক, গরিব হোক, কিংবা যদি কিছুই না থাকে,কিন্তু সে যদি আমার মেয়ের জন্য উদ্মাদ থাকে, তাহলে তোমরা কখনো তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।কারণ একজন উন্মাদ প্রেমিকের কাছে টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদ না থাকলেও রাজ্যভরা ভালোবাসা থাকে। বুকভরা হারানোর ভয় থাকে। আর থাকে নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে আগলে রাখার পাগলামি।
কথাগুলো বলতে বলতে ফেন্সি ইয়ারার কণ্ঠ প্রায় ভেঙে আসে।
—- তারপর তোর বাবা আমার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলেছিল, মা আমি যেদিন মারা যাব, আমার কবরটা যেন আমার প্রিয়াসার পাশেই হয়। আমি ওর কাছেই থাকতে চাই। পৃথিবীতে থাকতে পারিনি অন্তত মাটির নিচে যেন ওর কাছ থেকে দূরে না থাকি।
ফেন্সি ইয়ারা এবার মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলেন। কিছুক্ষণ পর কাঁপা কণ্ঠে বলেন,
—- এই কথাটুকু বলেই তোর বাবা সেখান থেকে চলে গিয়েছিল। আমি তখন বুঝতেই পারিনি, এটাই ছিল আমার সঙ্গে তার শেষ কথা। আমি জানতাম না, আমার ছেলে আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে যাচ্ছে। যদি জানতাম যদি একটুও বুঝতে পারতাম, সেদিন আমি তাকে এক পা-ও যেতে দিতাম না। বুকের সঙ্গে আটকে রাখতাম আমার ছেলেটাকে। কিন্তু মানুষ কি আর জানে, কোন বিদায়টা শেষ বিদায় হয়ে যায়?
কথাগুলো শেষ করার আগেই ফেন্সি ইয়ারা ঢুকরে কেঁদে ফেলেন। বয়স্ক মুখের চামড়া বেয়ে অঝোরে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে। রূপাও কান্নায় ভেঙে পড়ে কাঁপা গলায় বলে,
—- কী হয়েছিল বাবার সঙ্গে, বলো দাদি?
ফেন্সি ইয়ারা চোখের পানি মুছে কাঁপা গলায় বলেন,
—- তোর বাবার যত সম্পত্তি, টাকা-পয়সা, গাড়ি সব তোর নামে লিখে দিয়ে ২২ তলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে তোর বাবা।
কথাটা শুনেই দুই হাতে কান চেপে ধরে চিৎকার করে ওঠে রূপা। আকাশ, জেইন আর ওমরের মুখ হা হয়ে যায়। অ্যান্সি আর নিক্সিও যেন মুহূর্তেই পাথর হয়ে যায়। বাঁধন নিজের ঠোঁট কামড়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।মাত্র কয়েকটি শব্দেই যেন পুরো ঘরের ওপর শোকের কালো ছায়া নেমে আসে। ২২ তলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে ইথান রিচার্ডসন। কথাটা শুনেও যেন কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না। কয়েক মুহূর্তের জন্য সবাই নিঃশব্দ হয়ে যায়, কারও মুখে কোনো শব্দ নেই। শরীরের ভেতরটা কেমন শীতল হয়ে আসছে, বুকের ধুকপুকানি যেন নিজের কানেই শোনা যাচ্ছে। এতক্ষণ যে মানুষটার ভালোবাসা, তার বদলে যাওয়া, নিজের মেয়েকে ঘিরে স্বপ্ন দেখার গল্প শুনছিল সবাই, সেই মানুষটার জীবনের শেষটা যে এত নির্মম হবে এটা যেন কারও কল্পনাতেও ছিল না।ফেন্সি ইয়ারা আবারও চোখ মুছে ভারী কণ্ঠে বলেন,
—- তোর বাবার মৃত্যুর পর এই শহরে কেউ আনন্দের মিছিল করেছে, আবার কেউ আর্তনাদের মিছিল করেছে। কারণ তোর বাবা ছিল কারও কাছে একেবারে বিষের মতো, আবার কারও কাছে অমৃতের মতো। কারও জীবনে সে ছিল আতঙ্কের নাম, আবার কারও জীবনে ছিল আশ্রয়ের শেষ ঠিকানা। তাই তার চলে যাওয়ার দিনটাও এই শহর একভাবে নেয়নি কেউ আনন্দ করেছে, আর কেউ বুক চাপড়ে কেঁদেছে।
রূপা ঘর ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে। সেই হয়তো প্রথম মেয়ে,যে বাবার ভালোবাসার গল্প শুনেছে , শুনছে তার বাবার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়ের কথা, আর শেষে শুনছে মানুষটার করুণ পরিণতির কথা। নিজের বাবাকে কখনো চোখে দেখার সুযোগ না পাওয়া মেয়েটা আজ প্রথমবার তার ভালোবাসার গল্পের মধ্য দিয়ে বাবাকে চিনছে, অনুভব করছে।ফেন্সি ইয়ারা কিছুক্ষণ চুপচাপ ইথান আর প্রিয়াসার ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ছবির ভেতর দুজনের মুখে তখনও সেই শান্ত, পরিপূর্ণ হাসি। অথচ সেই হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকা গল্পটা মনে পড়তেই তাঁর বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে এলো। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তারপর ভাঙা, ভারী কণ্ঠে বলেন।
—- সবশেষে মাঝে মাঝে আমার ছেলেটার ছবিটার দিকে তাকিয়ে ভাবি, যে মেয়েটাকে একসময় সহ্যই করতে পারত না, সেই মেয়েটাকেই কত অপমান করেছে, কত বকাঝকা করেছে, কতবার নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে অথচ নিয়তির কী অদ্ভুত লিখন!শেষ পর্যন্ত সেই ছেলেটাই মেয়েটাকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছে। আর ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস দেখ যে মানুষটা একদিন প্রিয়াসার ভালোবাসা থেকে পালিয়ে বেড়াত, শেষ পর্যন্ত সেই মানুষটাই প্রিয়াসার সাথে ওপারের পথে পাড়ি জমিয়েছে আসলে এটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্য,। যাকে আমরা অবহেলা করি, দূরে সরিয়ে দিই, তার মূল্য অনেক সময় তখনই বুঝতে পারি, যখন সে আর আমাদের পাশে থাকে না। আর তখন সেই অবহেলা করা মানুষটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে আপন নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি মূল্যবান।আমার ছেলের বেলাতেও ঠিক তাই হয়েছে। যেদিন প্রিয়াসার প্রাণটা এই দেহ ছেড়ে চলে গেল,যেদিন প্রিয়াসার প্রাণটা এই দেহ ছেড়ে চলে গেল, সেদিনই তার নিজের জীবনটাও যেন থেমে গেছে।সে বুঝে গিয়েছিল, যে প্রিয়াসাকে একসময় অবহেলা করেছে, দূরে সরিয়ে দিয়েছে, সেই প্রিয়াসাই আজ তার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতদিন যাকে ছাড়া থাকার কথা ভেবেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই মেয়েটাকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারল না আমার ছেলেটা।প্রিয়াসা চলে যাওয়ার পর মাত্র দুই ঘণ্টা, মাত্র দুই ঘণ্টা পরেই তোর বাবাও চলে গেল ওপারে। আমাদের সবাইকে ছেড়ে। এই পৃথিবীর সবকিছু, সব সম্পর্ক, সব ভালোবাসা পেছনে ফেলে অনেক দূরে চলে গেল সে।সেদিন ঘটলো তাদের ভালোবাসার ইতি। হয়তো ওপারে গিয়ে তোর বাবা আবার তোর হাতটাই ধরেছে। যে হাতটা একদিন সে নিজেই দূরে সরিয়ে দিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই হাত ধরেই অনন্ত পথ পাড়ি দিয়েছে।
অ্যান্সি আর নিক্সি এতক্ষণ নিঃশব্দে পুরো ঘটনাটা শুনছিল। প্রিয়াসা আর ইথানের গল্পের শেষ পরিণতি শুনে দুজনের চোখ দিয়েই অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এত ভালোবাসার পরও তাদের শেষটা এমন হবে কেউ যেন মেনে নিতে পারছে না।
রূপাও আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। বুকের ভেতর জমে থাকা কান্না আর কষ্ট যেন একসঙ্গে তার ওপর চেপে বসল। চোখের সামনে সবকিছু ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে এলো। শরীরটা হঠাৎ নিস্তেজ হয়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে মেঝের দিকে ঢলে পড়তে নিল।মুহূর্তের মধ্যেই বাঁধন এগিয়ে এসে তাকে সামলে ফেলল। একটুও দেরি না করে রূপাকে পাঁজা কোলে তুলে নিল সে।ফেন্সি ইয়ারা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন।
—- কী হয়েছে এই প্রিসিয়া?
বাঁধন রূপাকে শক্ত করে ধরে শান্ত গলায় বলে,
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪৪
—- দাদি, তোমার এই নাতনির একটা ছোটখাটো সমস্যা আছে। ও বেশি মানসিক চাপ নিতে পারে না। একটু অতিরিক্ত চাপ পড়লেই ও এভাবেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, আর প্রতিবারই আমি ওকে ঠিক এভাবে ধরে ফেলি। দেখো, এবারও কিন্তু মিস গেল না, ঠিক সময়েই ধরে ফেললাম! মনে হয় তোমার এই নাতনিকে এভাবে হুটহাট ধরার জন্যই ওপরওয়ালা আমাকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।
