Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৭

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৭

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৭
রানী আমিনা

রেড জোনের ভেতর, আনাবিয়ার লাইফট্রিটার পাশে একটি অস্থায়ী কিচেন৷ সেখানে চপিং বোর্ডের ওপর সশব্দে, দ্রুত হাতে সবজি কেটে চলেছে ফিরাস৷ তার উন্মুক্ত, সফেদ চওড়া, পুরুষালি পিঠে বারংবার একটা ছোট্ট মশা এসে বসছে। ইস্পাত-দৃঢ় হাতখানা দিয়ে মশাটাকে বেখেয়ালে মারার চেষ্টা করছে সে, কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছে বারবার। পাশেই আরামসে শুয়ে আছে ওর পোষা গিরগিটি। মশার ওপর বিরক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত গিরগিটিটাকে উঠিয়ে সে বসিয়ে দিলো নিজের চওড়া, বলিষ্ট কাঁধে।
গিরগিটিটি অত্যন্ত মনোযোগী চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো উড়ন্ত মশার দিকে। এরপর আচমকাই নিজের লম্বা জিহবা দিয়ে খপ করে ধরে মুখে পরে নিলো মশাটিকে। ফিরাস সেটা দেখে ভারী পুরুষালি কন্ঠে বলে উঠলো,

“গুড জব, ফেলিক্স!”
ওর পাশেই রান্নার কড়াই গুলোকে পরিষ্কার করছে আরসালান। বাবার মতোই পেয়েছে উচ্চতা। মাথার ঝাকড়া কোকড়া চুল গুলো বারংবার এসে পড়ছে সম্মুখে, সেগুলোকে মাথা ঝাকি দিয়ে সরানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে সে বার বার। শরীরের ঊর্ধ্বাংশ উন্মুক্ত, দেহের সাদা কালোর বিভাজনটি দুই সমুদ্রের মিলনস্থলের মতোন ঢেউ খেলানো। কালোর কিছু অংশ গাছের ক্ষুদ্র পত্রের ছায়ার মতো ছড়িয়ে আছে সফেদে। বলিষ্ঠ হাতের প্রতিটি আন্দোলনে ফুটে উঠছে তার দৃঢ় পেশি৷ ফেলিক্সের নাম শুনে তাকালো সে ফিরাসের দিকে, ওর কাঁধে ফেলিক্সকে দেখা মাত্রই নাক কুচকে নিলো ঘৃণায়।
জিবরান আর কাসওয়ার মিলে ক্ষণিক পূর্বে জঙ্গল থেকে শিকার করা একটা হরিণের গলা কাটা মরদেহ গাছের ডালে ঝুলিয়ে চামড়া ছিলছে। ওদের গায়ে এখনো লেগে আছে রক্তের ছিটে। নাকের ডগায় চশমা আটকানো কাসওয়ারের সফেদ দেহে রক্তকণা গুলো তুষারের বুকে ফোটা রক্তগোলাপের ন্যায় দেখাচ্ছে৷
দূর জঙ্গল থেকে অ্যানিম্যাল টাউনের মেয়ে গুলো লুকিয়ে দেখছে ওদের, চোখে খেলে যাচ্ছে উচ্ছাস। উঁকি দিয়ে দেখা দৃশ্য গুলো একে অপরকে বর্ণণা করে চলেছে উত্তেজিত, লাজুক মুখে৷

সাইয়্যিদ আর মিশআলকে সাথে নিয়ে মীর সমুদ্রে গেছে মাছ শিকারে, হয়তো ফিরবে এখনি। তার মতে মাছ শিকার করতে প্রচন্ড ধৈর্যের প্রয়োজন, যা তার এই দুই ছেলে ব্যাতিত অন্য কোনো ছেলের ভেতর নেই৷ জিবরান বা কাসওয়ারকে তবুও ভরসা করা যায়, কিন্তু ফিরাসকে নিলে সে বর্শিতে মাছ ধরতে না পারার ব্যর্থতায় রেগে নিজেই সমুদ্রে ঝাপ দিয়ে মাছের সাথে মারামারি বাধিয়ে দিতে পারে৷ আর আরসালান সময় নষ্ট করে মাছ ধরতে যাওয়ার থেকে বাজারে গিয়ে মাছ কিনে নিতে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করবে৷
বিগত ষোল বছরে বদলে গেছে অনেক কিছুই। মীরের সাথে আর কখনোই দেখা হয়নি আনাবিয়ার, হয়নি কোনো যোগাযোগ। বাচ্চারা নির্ধারিত সময়ে দেখা করে এসেছে মায়ের সাথে৷ বর্তমানে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে যে যার মত। মিশআল এবং সাইয়্যিদ বাবার ডান হাত হয়ে দাপিয়ে চলেছে পঞ্চদ্বীপ, তাদের জন্য বর্তমানে ঘুম হারাম হয়ে গেছে কন্ট্রোলারদের। পূর্বের চেয়েও সুষ্ঠু ভাবে চলছে সব।
ফিরাস স্থায়ীভাবে রেড জোনের বাসিন্দায় পরিণত হয়েছে। কখনো মন চাইলে প্রাসাদ ঘুরে আসে, সময় মতো কলেজ অ্যাটেন্ড করে। এ ছাড়া বাদবাকি সময় এই রোড জোনই তার জীবন যাপনের একমাত্র স্বস্তিদায়ক স্থান৷ মায়ের মতোই রেড জোনের প্রাণীদের প্রতি তার এক অদ্ভুত আকর্ষণ কাজ করে সর্বদা, এই জঙ্গল চুম্বকের ন্যায় টানে তাকে। ইতোমধ্যেই জঙ্গলের প্রতিটা কোণায়, অলিগলিতে ছাপা হয়ে গেছে তার পদক্ষেপ।

তুখোড় মেধাবী কাসওয়ার ইতোমধ্যেই পার করে ফেলেছে ইউনিভার্সিটির চৌকাঠ৷ বই ব্যাতিত অন্য কিছুতে কোনো আগ্রহ নেই তার৷ কিছুদিনের ভেতরেই ভার্সিটিও শেষ হবে তার, আরও উচ্চতর শিক্ষার জন্য তাকে দ্রুতই বহির্বিশ্বে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে মীর।
মিশআল আর জিবরান হয়ে উঠেছে বাবার ছায়া। সাম্রাজ্যের প্রতিটা কাজে মীর তাদেরকে নিজের সাথেই রাখে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পর দুই ছেলেকে নিয়ে নিরিবিলি বসে সে আলোচনা করে সিদ্ধান্তটির সুবিধা অসুবিধা; কখনো চায় তাদের মতামত, কখনো সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার ভার তাদের ওপরেই ছেড়ে দেয়।
আনাবিয়া প্রাসাদ ত্যাগ করার কিছুদিনের ভেতরেই সন্তানদের মানসিকতা বুঝে মীর লাগিয়ে দিয়েছে কাজে। সন্তানদেরকে সিংহাসনের জন্য উপযুক্ত করে তোলার জন্য যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে তার ক্লান্ত দেহ মন।
ব্যাস্ততার মাঝেই মাসের একটি দিন মিলিত হয় তারা সকলে, এদিনটিতে স্বাভাবিক পিতা পুত্রের মতোন কাটায় তারা, একত্রে রান্না-খাওয়া, হাসি-মজা করেই কাটিয়ে দেয়৷ তারপর আবারও গতানুগতিক ব্যাস্ততা ভর করে তাদের জীবনে।

ফিরাস সবজি কাটা শেষে ফেলিক্সকে কাধ থেকে নামিয়ে রেখে চলে গেলো কোথাও। আরসালান রান্নার পাত্রগুলো একপাশে সরিয়ে রেখে এগিয়ে এলো ফেলিক্সের নিকট এরপর ঘৃণাভরে ফেলিক্সের দিকে চেয়ে ওর সরু লেজটা দুই আঙুলে ধরে আচমকা সজোরে ছুড়ে মারলো কোনো এক দিকে৷ ফেলিক্স তীরের মতো উড়ে গিয়ে উধাও হলো কোথাও, তার কোনো সাড়াশব্দ আর পাওয়া গেলোনা।
আরসালান সিনেমার খলনায়কের মতো দুহাত মেলে হাসলো কিছুক্ষণ। কাসওয়ার দূর হতে চশমার ওপর দিয়ে ওকে দেখে জিবরানকে বলল,
“দেখছোস, রোজ রোজ ফিরাসের কাছে চটকানা খাওয়ার পরও ওর শিক্ষা হলোনা, আজ আবার ফেলিক্সকে কোথায় ছুড়ে মেরেছে৷”
“ওয় যে আসছে ফিরাস, এবার একটা জব্বর শর্ট ফিল্ম দেখা যাবে।”
“হেডলাইন হবে ফেলিক্সের বিরহে ফিরাস আরসালানের পাসায় কত জোরে চড় মারলো দেখুন ভিডিও সহ।”
সুউচ্চ ফিরাস হেলে দুলে এগিয়ে এলো আবার, রান্নার উপকরণ গুলো সব ঠিক ঠাক আছে কিনা দেখতে দেখতে খেয়াল হলো ফেলিক্সকে দেখতে পাচ্ছেনা৷ চতুর্দিকে নিজের ঝলমলে, শকুনি চোখ জোড়া দিয়ে খুঁজলো একবার। পরক্ষণেই কঠিন চোখে তাকালো আরসালানের দিকে।
আরসালান কিছুই জানেনা এমন ভাব করে কাজ করছিলো, ফিরাসকে ওর দিকে চেয়ে থাকতে দেখে ফিরতি নজর দিলো সে। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“কি সমস্যা? আমাকে কি এতই সুন্দর লাগছে যে চোখ ফেরাতে পারছিস না?”
“ফেলিক্স কোথায়?”
“তোর টিকটিকি কোথায় আমি কি করে জানবো? আমি তো আর ওর লেজ ধরে ঘুরিনা।”
ফিরাস হাতের মুষ্টি শক্ত করে এগিয়ে এলো আরসালানের দিকে। আরসালান নিজেও কাজ ফেলে এগিয়ে এলো ওর দিকে। দুজনের মাথা প্রায় একত্র হয়ে এলো, চোখে হিংস্রতা।
“ফেলিক্স কোথায়?”
“বলব না, কি করবি?”
“তোকে এখানে পুতে ফেলবো।”
“আচ্ছা! দেখি, গায়ে হাত লাগা।”
ফিরাসের দিকে আরও একটু এগিয়ে গিয়ে বলে উঠলো আরসালান। ওর গরম শ্বাস বাড়ি খেতে রইলো ফিরাসের মুখের ওপর। সেই মুহুর্তেই ফেলিক্স দুর্বল পায়ে এঁকেবেঁকে এসে মালিকের শরীর বেয়ে উঠে পড়লো কাঁধে।
“এই তো, ফিরে এসেছে তোর বউ।”
তাচ্ছিল্যের সাথে উপহাস মিশিয়ে বলে উঠলো আরসালান। ফিরাস চোয়াল শক্ত করে তাকালো ওর দিকে, বলল,

“হ্যাঁ, বউ। ভাবি ডাকবি আজ থেকে।”
আরসালানা দুই আঙুলে ফেলিক্সের লেজ উঁচিয়ে নিচটা দেখে বলল,
“বাবা জানে যে তুই গ্যে?”
ফিরাস ওর দিকে কটমট করে তাকিয়ে অন্যদিকে চলে গেলো। কাসওয়ার আর জিবরান এতক্ষণ দেখছিলো ওদের দুজনকে, ফিরাস চলে যেতেই জিবরান আরসালানের উদ্দ্যেশ্যে বলে উঠলো,
“ভালোই তো লাগছিলো, থামলি কেন?”
আরসালান বিনিময়ে এক টুকরো ফিচেল হাসি ছুড়ে দিলো ওদের দিকে, ইশারায় বুঝিয়ে দিলো একটু পরে আবার হবে।
সেই মুহুর্তেই দূর হতে ভেসে এলো মীরের গমগমে কন্ঠস্বর। কিচেনের পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে এলো আবারও। আরসালান ভন্ডামি ছেড়ে নিতান্ত শান্ত, ভদ্র ছেলেটির মতো লেগে পড়লো কাজে৷ ফিরাসও নিরুদ্দেশ হওয়া থেকে বিরত হয়ে ফিরে এলো কিচেনে।

মীর এসে উপস্থিত হলো তখন, ওর পেছনে মিশআল আর সাইয়্যিদ। মিশআলের হাতে একটা বিরাট সাইজের কিং ক্র‍্যাব, অনেক কষ্টে ধরেছে সে এটাকে। নিজের বুকের কাছে ধরার পরও সেটার হাত পা গুলো মাটি ছুই ছুই। সাইয়্যিদের হাতের বিরাট বাস্কেটে কয়েকটি মাঝারি সাইজের টুনা।
মীর এগিয়ে এসে খুলে ফেললো গায়ের ঘর্মাক্ত শার্ট, উন্মুক্ত হলো তার পেশিবহুল, বলিষ্ঠ শরীর। দৃঢ় চোয়ালে খোচা খোচা চাপা দাঁড়ি, চোখ জোড়ার স্বর্ণাভ দীপ্তি প্রখর হয়েছে আরও৷ সন্তানদের পিতার চেয়ে বড়ভাই বেশি দেখাচ্ছে তাকে৷ সাইয়্যিদের হাত থেকে বাস্কেটটা নিয়ে টুনা মাছ গুলোকে তুখোড় দক্ষতার সাথে কাটতে লেগে পড়লো সে।
আরসালান আড়চোখে একবার দেখলো বাবাকে, ফিরাস এগিয়ে এলো ওর দিকে। ফিসফিসিয়ে বলল,
“আমাদের বাবা একজন বাবা বটে!”
“হ্যান্ডসাম ফ্রিক!”
“হট হট!”

মীর আচমকা তাকালো ওদের দিকে। ওর খুনো দৃষ্টি দেখে তৎক্ষনাৎ একে অপর থেকে দূরে চলে এলো ওরা দুজন। দ্রুতহাতে করতে রইলো কাজ।
খাবার টেবিলে ওরা যখন বসলো তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে এগিয়েছে। বাচ্চারা বসে আছে টেবিলে, বাবার অপেক্ষায়৷ রান্না গুলো মীরের হাতের, অসম্ভব সুস্বাদু ঘ্রাণ বের হচ্ছে সেগুলো থেকে। আরসালান অপেক্ষা করতে পারছেনা আর, লোলুপ চোখে চেয়ে আছে কিং ক্র‍্যাবের মোটা মোটা হাত পা গুলোর দিকে।
মীর এলো এমন সময়ে। চেয়ার টেনে বসতেই বাচ্চারা প্রায় হামলে পড়লো খাবারের ওপর। মীর মৃদু হাসলো তাতে, নিজেও টেনে নিলো একটা প্লেট৷ সেই মুহুর্তেই দৃষ্টি গেলো তার বিরাট ট্রেতে রাখা গ্রিলড কিং ক্র‍্যাবটির দিকে। মিশআল আর সাইয়্যিদ মিলে পুড়িয়েছে সেটা।

মুহুর্তেই আনাবিয়ার সুন্দর, সফেদ, ক্ষুধার্ত, লোভাতুর মুখখানা মনে পড়লো তার। কল্পনায় দেখতে পেলো আনাবিয়া তার কোলে বসে দুহাতে আয়েশ করে খেয়ে চলেছে খোলস ছাড়ানো কিং ক্রাবের মাংস, সারা মুখে লেগে আছে মশলা। মুখভর্তি মাংসের কারণে চিবোনো মুশকিল হয়ে উঠেছে যেন, তবুও বিরতি নেই!
ক্ষণিকের জন্য অতিত স্মৃতি সুখের বন্যা বইয়ে দিল তার বুকে, পরক্ষণেই মুখের স্মিত হাসি মিলিয়ে গেলো ক্রমশ, সেখানে এসে ভর করলো এক অবর্ণনীয় বেদনা। মিশআল কিং ক্র‍্যাবের ট্রে টা এগিয়ে দিলো তার দিকে, কিন্তু এগোলোনা মীর, যন্ত্রণাবিদ্ধ চোখে চেয়ে রইলো ট্রের দিকে।
আনাবিয়া প্রাসাদ ছাড়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত আনাবিয়ার পছন্দের কোনো খাবার খেতে পারেনি সে, কখনোই না। আনাবিয়ার ক্ষুধার্ত, মিষ্টি, নিষ্পাপ মুখখানা ভেসে উঠেছে তার চোখে, প্রতিবার! তার শিনজোকে রেখে এই মজার খাবার সে কিভাবে খাবে সে বুঝতে পারেনা, নিতে চায়না তার পাকস্থলী, তার মন, তার মস্তিষ্ক!
মীর ঢোক গিললো একটা, আচমকাই কঠিন হয়ে এলো তার চোয়াল। এক সুদৃঢ় অভিমান ভর করলো তার চোখে। উঠে পড়লো সে চেয়ার ছেড়ে, গুরুগম্ভীর স্বরে বলল,

“তোমরা খাও, আমার কিছু কাজ আছে।”
পরক্ষণেই ঝড়ো বেগে বেরিয়ে গেলো রেড জোন ছেড়ে৷ সকলে অবুঝের মতো চেয়ে রইলো তার প্রস্থানের দিকে। সাইয়্যিদ কিছু বুঝতে না পেরে বলে উঠলো,
“বাবার কি হলো? উনি কিছুক্ষণ আগেও ঠিক ছিলেন, কিন্তু মাত্র উনাকে দেখে কেমন অস্বাভাবিক মনে হলো।”
“জানিনা, কিং ক্র‍্যাবের ট্রে এগিয়ে দিতেই বাবা উঠে গেলেন। আমি কি নিজের অজান্তে বাবার সাথে কোনো বেয়াদবি করে ফেললাম?”
চিন্তিত, হতাশ স্বরে বলল মিশআল। ফিরাস ট্রেটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলে উঠলো,
“উহু, অন্য কিছু হয়েছে।”
“বাবা আম্মার পছন্দের কোনো খাবার খান না।”

প্লেটে খাবার উঠিয়ে নিতে নিতে অত্যন্ত স্বাভাবিক স্বরে বলল আরসালান। এতদিন ধরে বাবার সাথে সাথে থেকে তার প্রায় সবই জানা হয়ে গেছে৷ মায়ের পছন্দ-অপছন্দ, ভালোলাগা-খারাপ লাগা সবই। বাবার সাথে বসলেই কোনো না কোনো ভাবে মায়ের উপলক্ষ্য উঠে আসে, মায়ের ব্যাপারে কথা বলার সময়ে বাবার চোখের উচ্ছাস, আগ্রহ, ভালোবাসা খেয়াল করেছে সে, চকচক করে তার বাবার চোখ! একই সাথে খেয়াল করেছে বাবার চোখে মায়ের বিরহে লুকিয়ে থাকা বিধ্বংসী যন্ত্রণা! যতই খেয়াল করেছে ততই মায়ের প্রতি আরও বেশি বিতৃষ্ণা জন্মেছে তার মনে৷ ক্রমে নারীবিদ্বেষী হয়ে উঠছে তার মস্তিষ্ক!
ফিরাস তাকিয়ে রইলো আরসালানের দিকে। মায়ের পছন্দ অপছন্দ জানার মতো, খতিয়ে দেখার মতো সুযোগ হয়নি ওদের কারো। পাওয়া হয়নি মায়ের আদর, ভালোবাসা; তবুও মাকে প্রচন্ড ভালোবাসে সে। আরসালান পছন্দ করেনা মা’কে এটাও তার জানা। কিন্তু আরসালানকে কখনো দোষী করেনি সে, বরং আফসোস করেছে! আরসালান যে কতটা ভালোবাসতে পারে সেটা তার চাইতে বেশি কেউ জানেনা, কিন্তু আম্মা পেলোনা তার এই একটি সন্তানের উন্মত্ত ভালোবাসা৷

কুরো আহমারের এক বিরাট, আলিশান মটেলের রুফটপ লাউঞ্জে বসে আছে আনাবিয়া। চোখে চওড়া, সরু ফ্রেমের চশমা, গায়ে স্যাটিনের অফ হোয়াইট শার্ট, ব্রাউন প্যান্ট। ক্ষণে ক্ষণে চুমুক দিচ্ছে টেবিলে রাখা জুসের স্ট্রতে।
ওর পাশের চেয়ারে ইলহান, পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে সে।
একটু আগেই শেষ হলো ফারহা কর্প এর বিজনেস মিটিং। ইলহানের টুয়েন্টি ফাইভ পার্সেন্ট শেয়ার তাতে, আনাবিয়ার ফোর্টি সেভেন। বাকি শেয়ার গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সমস্ত পঞ্চদ্বীপ জুড়ে। ইলহানকে সিইও এর দায়িত্ব দিয়েছে আনাবিয়া, ইলহানের অভিজ্ঞতা ভালো।
ইলহানের মুখে স্মিত হাসি৷ আনাবিয়া সেটা খেয়াল করে জিজ্ঞেস করলো,

“হাসছেন কেন?”
“পুরোদস্তুর বিজনেস ওম্যান হয়ে গেছো! চেয়ারম্যান অব ফারহা কর্প, বাবা! শুনলেও ভয় করে।”
আনাবিয়া তখুনি বললনা কিছুই, স্ট্রতে চুমুক দিয়ে গলা খাকারি দিয়ে শীতল স্বরে বলে উঠলো,
“আপনি নিশ্চয় জানেন আমি আপনাকে অপছন্দ করি। শুধুমাত্র আপনি রেসপন্সিবল, এবং আমার ব্লাড রিলেটিভ তাই আপনাকে আমি সিইও এর দায়িত্ব দিয়েছি। কিন্তু এটাকে নিজের প্রিভিলেজ মনে করে আমার সাথে খাতির জমাতে আসবেন না আশা করি৷”
ইলহান শব্দ করে হাসলো তাতে, বলল,
“এ পৃথিবীতে সবাই স্বার্থপর আনাবিয়া, এমনকি তুমিও। এবং তুমি প্রচন্ডরকম স্বার্থপর, হতে পারে আমার থেকেও বেশি।”
“এমনটা কেন মনে হলো?”
“আমি যা করেছি প্রাণ বাঁচানোর দায়ে, আর তুমি জেদ। সুতরাং আমার চেয়েও তুমি বেশি স্বার্থপর৷”
“যা জানেননা সেটা নিয়ে কথা বলবেন না৷”
“আমি তোমাকে চিনি আনাবিয়া, মীরকেও চিনি। তুমি যদি স্বার্থপর না হতে তবে শেহজাদারা আজ তোমার সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হতনা। কিন্তু হয়েছে, এর অর্থ তুমি ভীষন রকম স্বার্থপর। যাই হোক, তোমাদের পারিবারিক ব্যাপারে আমি নাক না গলাই৷”

আনাবিয়া নাকের পাটা ফুলিয়ে শ্বাস নিলো একবার। এমন সময় লুসি ছুটে এলো সেখানে। পূর্ণাবয়স্কা রমণী সে এখন, বা হাতের অনামিকাতে জ্বলজ্বল করছে একটি হীরের আংটি, কিছুদিন পূর্বেই ইলহানের সাথে বাগদান হয়েছে তার৷ এসেই ইলহানের গলা জড়িয়ে ধরে আবদারের সুরে বলে উঠলো,
“আমি একটু ওদিকে যাই? এখুনি ফিরে আসবো, একদম দেরি করবনা৷”
ইলহান চেয়ে দেখলো, বাচ্চারা খেলছে সেদিকে। লুসির বাচ্চা পছন্দ অনেক, তার ইচ্ছে বিয়ের পর পরই সে সন্তান নিবে অনেকগুলো। ইলহান মৃদুস্বরে অনুমতি দিল ওকে, লুসি হাসিমুখে ছুটে গেলো সেদিকে।
ও চলে যেতেই ইলহান বলল,
“একসময় আসওয়াদকে আমি উপহাস করতাম, তোমার প্রতি ওর আদিখ্যেতা দেখে। কিন্তু এখন আর করিনা, এখন আসওয়াদের মন বোঝার মত সক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছি।”
“হুম, ভাইয়ের জন্য আজকাল আপনার দরদ উথলে ওঠে। অথচ একসময় পাগলা কুকুরের মতো কামড়াকামড়ি করেছেন।”
ইলহান হাসলো। বলল,
“তুমি মীরের সাথে বর্তমানে একটা লাভ-হেট রিলেশনশীপে আছো৷ তোমার মুখে ওর জন্য ঘৃণা, কিন্তু চোখে ভালোবাসা। এটা খুবই যন্ত্রণাদায়ক বলে আমি মনে করি। ঠিক?”
“তার জন্য আমার কোনো অনুভূতি নেই, তাকে আমি ভুলে গেছি।”
ইলহান আচমকা হো হো করে হাসলো, বলল,

“নাইস জোক্স৷ সরি টু সে, তুমি এখনো ভালোভাবে মিথ্যা বলা শেখোনি, আরও ট্রেইনিং নিতে হবে৷”
ঠিক তখুনি লাইঞ্জের অপর পাশ থেকে একটি সজোর থাপ্পড়ের আওয়াজ এলো, ইলহান আনাবিয়া দুজনেই চমকে তাকালো সেদিকে। একটি মেয়ে লাল চোখে বসে আছে গালে হাত দিয়ে, ছেলেটি ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে চেয়ে মেয়েটির দিকে। থাপ্পড়টা মাত্র সে-ই মারলো সেটা স্পষ্ট।
ইলহান ছেলেটির উদ্দ্যেশ্যে একটা অস্পষ্ট গালি দিয়ে সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বলে উঠলো,
“তোমার কি মনে হয়? মীর কি এভাবে কখনো তোমার গায়ে হাত তুলতে পারবে?”
“না। যার তার সাথে মীরকে মেলাবেন না আশা করি।”
“এক্স্যাক্টলি! সব ভালোবাসাতে, সব সংসারে টুকটাক ঝামেলা হয়েই থাকে। এমনকি আমিও দুদিন মেজাজ হারিয়ে লুসিকে থাপ্পড় মেরেছি, যদিও পরে অনেক আফসোস হয়েছে, ক্ষমাও চেয়েছি। কিন্তু আমি জানি, এবং আমি শতভাগ নিশ্চিত মীর কখনো তোমাকে আঘাত করেনি, নট ইভেন ওয়ান্স।”
“করেছে, একবার। যদিও সে তখন সেন্সে ছিলোনা৷”
ইলহান মৃদু হাসলো আবারও, বলল,

“আমি বলবোনা মীর নির্দোষ। তার দোষ হলো সে নিজেকে সবজান্তা ভাবে এবং তার আত্মবিশ্বাস প্রচুর। তার মতে সে যে সিদ্ধান্তই নিবে সেটাই সবার জন্য মঙ্গলজনক এবং কারো মতামত, সিদ্ধান্ত তার কাছে কোনো মাইনে রাখে না৷ তার উচিত ছিলো যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তোমার সাথে পরামর্শ করা, অ্যাজ তুমি ওর ওয়াইফ৷ কিন্তু ও তা করেনি, দ্যাটস ইট। এছাড়া আমি মীরের কোনো দোষ দেখিনা।”
আনাবিয়া তাচ্ছিল্য হাসলো, বলল,
“আচ্ছা, আমার জায়গায় লুসি থাকলে কি করতেন আপনি? বলুন, শুনি।”
“আমি অবশ্যই তার কাছে আমার প্রস্তাব পেশ করতাম, তাকে আমার সিদ্ধান্ত জানাতাম কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে।”
“আর তারপর? সে যদি আপনার সাথে একমত না হতো?”
“তাতে আমার কিছু করার থাকতো না, কজ আই নিড বোথ অব দেম। আমি সিদ্ধান্ত জানিয়েছি, তার পছন্দ হয়নি, দ্যাটস নট মা’ প্রবলেম। শী হ্যাজ টু অ্যাক্সেপ্ট ইট।”
আনাবিয়া শান্ত ভঙ্গিতে অন্যদিকে ফিরে বসলো। ইলহান তাতে হেসে উঠে বলল,
“আমার মুখ না দেখলে সত্য মিথ্যা হয়ে যাবেনা, আনাবিয়া।”
“আপনার মুখটা এবার বন্ধ করুন, অনেক হয়েছে৷”
ইলহান তাকালো চারদিকে, একটা অল্পবয়সী দম্পতি চোখে পড়লো তার। মেয়েটির হাতের একটা আঙুলে ব্যান্ডেজ, চামচ ধরতে পারছেনা ঠিকঠাক, কিন্তু ছেলেটি খেয়েই চলেছে৷ ইলহান বলল,
“ওদিকে দেখো, তোমার কি মনে হয়? মীর তোমাকে কখনো এই অবস্থায় নিজের হাতে খেতে দিত?”
আনাবিয়া সেদিকে একপলক তাকিয়ে ছোট্ট করে উত্তর দিল,

“না।”
“এক্স্যাক্টলি! ওদিকে দেখো, ওই মেয়েটার জুতার ফিতে ছিড়ে গেছে। তোমার কি মনে হয়, মীর হলে সে কি করতো?”
“আমাকে কোলে তুলে নিত, নয়তো নিজের জুতা খুলে দিত, নয়তো নতুন কিনে দিত৷”
“এক্স্যাক্টলি। আচ্ছা ওদিকে দেখো, ওই যে মেয়েটা রাগ করেছে বলে ওর প্রেমিক রাগ ভাঙাতে ভাঙাতে অধৈর্য হয়ে নিজেই রেগে যাচ্ছে। আচ্ছা তুমি বলো, মীর হলে কি করতো?”
“রাগ না ভাঙা পর্যন্ত পেছনে পড়ে থাকতো।”
“এক্স্যাক্টলি। আচ্ছা, ওইদিকে দেখো, ওই যে মেয়েটা বসার মতো প্লেস খুঁজে পাচ্ছেনা, কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটা কি করবে বুঝতে পারছেনা। মীর হলে কি করতো?”
“আপনি আমাকে এসব প্রশ্ন কেন করছেন? আপনার কি মনে হচ্ছে যে এসব প্রশ্ন করলে আমি ওকে অ্যাক্সেপ্ট করতে শুরু করবো?”
“উহু, আমি জাস্ট তোমাকে ফ্যাক্ট বলছি।”

“আমি জানি মীর কি করতো, আমি জানি সে আমাকে ভালোবাসে। এটা এভাবে প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই৷ কিন্তু ভালোবাসলেই যে সেটা ভালো ভালোবাসা হবে সেটার কোনো মানে নেই৷ তাই চুপ থাকুন।”
ইলহান হাসলো, তখুনি লাঞ্চ এসে পড়লো ওদের। ইলহান উঠে পড়লো, ডাইনিং লাউঞ্জের দিকে এগোতে এগোতে লুসিকে ডেকে নিলো। অন্য শেয়ার হোল্ডাররাও একে একে হাজির হলো সেখানে৷
আনাবিয়া উঠে ধীরপায়ে সেখানে গিয়ে বসলো চেয়ার টেনে, ওর পাশেই উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে বসে পড়লো লুসি৷
টেবিলের দিকে তাকালো আনাবিয়া, ম্যেনুতে পোলাও রোস্ট দেখা মাত্রই থমকালো সে। মুহুর্তেই মীরের দৃঢ়, পুরুষালি মুখখানা ভেসে উঠলো তার সামনে। আচমকা বুকের ভেতর এক অজানা কারণে শুরু হলো তোলপাড়! খাবারের দিকে চেয়ে রইলো ও অপলক। ক্রমশ শক্ত হয়ে এলো তার মুখমণ্ডল, চোখ জোড়া স্থির হয়ে এলো হঠাৎ।

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৬

আচমকাই উঠে পড়লো সে চেয়ার ছেড়ে। সে উঠতেই বাকিরা থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো তৎক্ষনাৎ। আনাবিয়া কাঠকাঠ স্বরে বলে উঠলো,
“তোমরা খেয়ে নাও, আমার ক্ষুধা নেই।”
পরক্ষণেই বেরিয়ে গেলো রুফটপ ছেড়ে৷

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৭ (২)