বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৭ (২)
রানী আমিনা
মটেল ছেড়ে আনাবিয়া রাস্তায় নেমে এলো, পার্কিং লটে ওর আরভি টা পার্ক করা। স্থায়ী কোনো বাসস্থান নেই তার, ইচ্ছে করেনা কোথাও গেড়ে বসতে। আরভিটা নিয়ে যখন যেখানে খুশি চলে যায়; কখনো নদী, কখনো সমুদ্র পাড়ে কাটে ওর রাত, কখনো বা কোনো গহীন জঙ্গলের কিনারে।
সূর্যের রোদ প্রখর। আনাবিয়া ভ্রুতে ভাজ ফেলে চোখের ফ্রেম বাঁধানো চশমাটা খুলে একটা সানগ্লাস চড়ালো। তখনি পেছন থেকে প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে ডাকলো ইলহান,
“আনাবিয়া!”
আনাবিয়া পিছু ফিরে দেখলো, ইলহান হাঁফাচ্ছে। আনাবিয়া ওর অবস্থা দেখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই জোরালো দম ছেড়ে ক্লান্ত গলায় বলল,
“আরে লিফট বিজি ছিলো, তাই ষোল তলা থেকে ছুটে এলাম, অনলি ফ’ ইউ৷ তুমি কি রাগ করেছো আমার ওপর?”
“রাগের কি আছে? তাছাড়া আপনার ওপর রাগ করার কোনো রিজন নেই। আমি যার তার ওপর রাগ করিনা। আমার রাগেরও একটা রুচি আছে।”
আরভির ডোর খুলতে খুলতে বলল আনাবিয়া। ইলহান সশব্দে হাসলো তাতে, বলল,
“অনেক মজার কথা বলো তুমি। তেজের রুচি যে শুধু কার ওপর আসে সেটা সবার জানা। শোনো আনাবিয়া, তোমাকে আমি ভালোবাসি। আমি অবশ্যই চাইবো তুমি ভালো থাকো, খুশি থাকো। নিজের দিকে চেয়ে দেখো, তুমি ভালো নেই আনাবিয়া। এই বয়সে তোমার চোখে চশমা ওঠার কোনো কারণ নেই, তবুও উঠেছে৷ তুমি নিজেও বুঝছো তোমার ওপর এই সমস্ত দুরত্বের কেমন ইম্প্যাক্ট পড়ছে, কিন্তু তুমি তোমার জেদের কাছে হার মেনেছো, জিততে পারোনি।”
আনাবিয়া ড্রাইভিং সিটে বসে নাকের পাটা ফুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আপনি আপনার এসব কথা বলা যদি বন্ধ না করেন তবে আমি আপনাকে সিইও থেকে টোটালি আউট করে দিব। এখন আপনি ভেবে দেখুন আপনি কি করবেন।”
ইলহান ভ্রু তুলে হেসে বলল,
“আমি সিইও বাধ্য হয়ে, আমাকে বাধ্য করা হয়েছে। যাই হোক, সে প্রসঙ্গে না আসি। কিন্তু আমি তোমার ভালো চাই অবশ্যই। দাঁড়াও।”
শেষোক্ত শব্দটা উচ্চারণ করেই ইলহান পকেট থেকে ফোন বের করে কিছু একটা টাইপ করতে করতে ঘুরে আরভিতে উঠে এলো অন্যপাশ থেকে। সিটে বসে বলে উঠলো,
“চলো দেখি, তুমি কোথায় যেতে চাও!”
“আপনি নামুন। লুসি আছে ওপরে, ওকে রেখে আপনি আমার সাথে কোথায় চলেছেন?”
“শী ইজ টোটালি সিকিউরড, তাছাড়া আমি ওকে মাত্রই জানিয়ে দিয়েছি আমার ফিরতে দেরি হবে৷ লেটস গো।”
ইলহান আগ্রহ নিয়ে চেয়ে রইলো রাস্তার দিকে। আনাবিয়া স্টার্ট করছে না দেখে ভ্রু উচিয়ে তাকালো। আনাবিয়া হতাশ ভঙ্গিতে শ্বাস ছেড়ে গাড়ি স্টার্ট করলো। চলতে শুরু করতেই ইলহান বলে উঠলো,
“আনাবিয়া, আমি জানি তুমি আমাকে পছন্দ করো না। আমি এক সময় সফল হয়েছিলাম তোমার মন পেতে কিন্তু নিজের স্বার্থপরতার কারণে আবার হারিয়েছি। সত্যি বলতে স্বার্থপরতা, হিংস্রতা, পাওয়ার হাঙ্গার, টক্সিসিটি; দে আর অল ইন আওয়ার ব্লাড৷ এখানে আমাদের কারো নিয়ন্ত্রণ নেই। বাট আসওয়াদ, হি ইজ এক্সেপশনাল, টু মি।”
ইলহান চেয়ে দেখলো একবার আনাবিয়ার মুখভঙ্গি। পরক্ষণেই আবার বলতে শুরু করলো,
“তুমি কিছুই জানোনা আনাবিয়া। আসওয়াদ কোন ধরণের পুরুষ মানুষ ছিলো অতীতে তুমি তার কিছুই জানোনা, যেগুলো জানো বা যেগুলো তোমার কানে এসেছে এত যাবৎকাল, সেগুলো জাস্ট দ্যা সারফেস৷ তোমার বাবা ওর সব অপকর্ম জানতেন, বরং সাক্ষী ছিলেন ওর হিংস্রতার, বর্বরতার, নিষ্ঠুরতার। সে হিসেবে আমি অনেক ব্রাইট ছিলাম, আমার কোনো ডার্ক পাস্ট নেই৷ তবুও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সময়ে তিনি আসওয়াদের কাছেই তোমার দায়িত্ব দিয়ে গেলেন, আমাকে দিলেন না, কেন? কখনো প্রশ্ন জেগেছে মনে?”
প্রশ্ন করে উত্তরের অপেক্ষায় রইলো ইলহান। আনাবিয়া নিজ মনে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে চলল, উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলোনা। ইলহান নিজেই নিজ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বলল,
“বিকজ হি হ্যাজ দ্যা পটেনশিয়াল। আসওয়াদ দায়িত্ব পালনে প্রচন্ড দক্ষ, এবং নিজের আপন মানুষ গুলোকে ও যেকোনো মূল্যে প্রটেক্ট করে৷ এখানে আপন মানুষ বলতেই সে যে ওর আশেপাশের মানুষ হবে সেটা নয়।
আমি ওর সাথে একই গর্ভ শেয়ার করেছি, জীবনে কখনো ওর মুখে আমার নাম শুনেছো? আমি ওর ভাই, নিজের মায়ের পেটের আপন ভই। কিন্তু ও আমাকে ওর আপন মনে করেনা, করেনি কখনো৷ ওর আপন মানুষের লিস্ট অনেক ছোট। সেখানে এখনো পর্যন্ত দাদাজান, আম্মা, সালিম ভাইজান আর তুমি স্থান পেয়েছো। এখন হয়তো তোমাদের সন্তানরাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে লিস্টে।
যদিও আম্মাকে ও অনেক কম পেয়েছে কাছে, বহির্বিশ্ব থেকে পঞ্চদ্বীপে ফেরার আগেই আম্মা পরপারে পাড়ি জমিয়েছিলেন। আম্মা ওকে দেখার জন্য অনেক হাঁসফাঁস করেছিলেন মৃত্যু বেলায়, এই সংবাদ যখন ওকে বলা হয়েছিলো ও দু’মিনিটের জন্য স্থীর হয়ে গেছিলো, কিন্তু এরপরেই আবার ফিরে গেছিলো নিজের স্বাভাবিক জীবনে৷ তারপর থেকে কখনো ওকে আম্মার জন্য আফসোস করতে দেখিনি, আম্মাকে মনে করতে দেখিনি। অন্তত আমার জানা মতে নয়।”
“আপনি এসব আমাকে কেন বলছেন?”
“সেটা পরে বলছি। তুমি বলোতো আনাবিয়া, তোমার একজন বাবা ছিলেন, একজন মা ছিলেন। তোমার হয়তো ছোটবেলায়, বা কখনো কখনো তাদের কথা স্মরণ হতো। হয়তো মনে হতো যে তারা যদি থাকতো তবে তোমার জীবন অন্যরকম হতো, দ্যাটস ইট! তারপরেই আবার তুমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসো। মানুষ এমনই, বিশেষত আমরা। আমাদেরকে সহজে বাঁধা যায় না, সম্ভব নয়। আমাকেই দেখো, লুসি আমার জীবনে আছে। আমি জানি ও বেশিদিন বাঁচবে না, ইভেনচুয়ালি ও আমাকে ছেড়ে যাবে, মৃত্যু হোক বা অন্য কোনো কারণে। এমনও হতে পারে আমাদের ম্যারিজ সাকসেসফুল হলোনা, আমাদের সেপারেশন হয়ে গেলো৷ তখন আমি আবার ফিরে যাবো আমার পূর্বের জীবনে, ওকে হয়তো তখন আমার আর মনেও পড়বেনা৷”
আনাবিয়াকে বিরক্ত দেখালো, কিন্তু মুখে কিছু বললনা। ইলহান ঠোঁট ভাজ করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে বলে উঠলো,
“আমি জানি এটা আমার বলা উচিৎ নয়, তবুও বলছি। আসওয়াদের জীবনে কতশত নারীর আগমন ঘটেছে সেটা ও নিজেও জানেনা। আমি বা আমাদের বাবা, বা তোমার বাবার কথাই ধরো, আমাদের যেহেতু মন আছে, আমরা কখনো কখনো হেরেমের কোনো নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি, মানসিক ভাবে। তাদের সাথে আমাদের কিছু সুখময় স্মৃতি আছে। তোমার মায়ের আগেও তোমার বাবার জীবনে একবার ভালোবাসা এসেছিলো, যদিও তোমার বাবা তখন নিতান্তই কিশোর ছিলো, কিন্তু ওই যে বললাম! মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী! কিন্তু আসওয়াদের এমন কোনো রেকর্ড নাই। আমার মনে হয়না কোনো দাসী দ্বিতীয় বার ওর বেডরুমে প্রবেশ করতে পেরেছে৷ এগুলো যদিও তোমার জন্মের আগের কথা, তোমাকে বলছি বোঝানোর জন্য। আসলে আসওয়াদের এমন পরিবর্তন তুমি না বুঝলেও আমরা যারা ওকে চিনি তারা ঠিকই বুঝতে পেরেছি। ও তোমার প্রতি ফুললি ডিপেন্ডেন্ড, এবং ও তোমাকে প্রচন্ড পরিমাণ ভালোবাসে৷ যদি না বাসতো তবে আজ ওই প্রাসাদে ওর অনেক গুলো সন্তান দেখতে, অন্য দাসীর গর্ভের৷ কারণ ও তোমার অনূভুতির কোনো কেয়ার করতো না। এমনকি তুমি যদি ওর বিরহে মরতেও, ও ফিরে তাকাতো কিনা সন্দেহ।”
আনাবিয়া গাড়ি থামালো আচমকা, ইলহানের দিকে ফিরে শক্ত গলায় বলল,
“ওর হয়ে ওকালতির জন্য কি দিয়েছে আপনাকে? আপনি তো স্বার্থ ছাড়া কিছুই করেন না! কি নিয়েছেন বিনিময়ে? বলুন দেখি।”
ইলহান হো হো করে হাসলো। আনাবিয়ার ক্রোধে রক্তিম হয়ে যাওয়া মুখের দিকে চেয়ে বলল,
“সরি, যদি আমি ওর পাস্টের কথা বলে তোমার মন খারাপ করে ফেলেছি তো৷ বাট আ’ম বিয়্যিং অনেস্ট।”
“নামুন গাড়ি থেকে, আপনার আর একটা কথাও আমি শুনতে চাইনা, জাস্ট গেট আউট!”
“আচ্ছা, একটা লাস্ট কথা, এরপরই নেমে যাব, প্রমিস!”
ইলহান অনুমতির জন্য চেয়ে রইলো, কিন্তু আনাবিয়ার ক্রুদ্ধ চোখে চেয়ে অনুমতির তোয়াক্কা না করেই বলল,
“দেখো আনাবিয়া, তুমি একজন শেহজাদী। তোমার আগেও অনেক শেহজাদী এসেছেন। একজন শেহজাদী হওয়া সহজ নয়, কখনোই। এটা যেমন ব্লেসিং তেমনি কার্স, ইউ ডোন্ট ইভেন নো হোয়াট আ শেহিজাদী জাস্ট গো থ্রু!
তুমি কি জানো তোমার আগে যিনি শেহজাদী ছিলেন, তার ঠিক কতবার বিয়ে হয়েছে?”
ইলহান প্রশ্ন করে তাকালো আনাবিয়ার দিকে। আনাবিয়া দ্বিধান্বিত চোখে চেয়ে রইলো, ইলহান ওর নিরবতায় উত্তর খুঁজে নিয়ে বলে উঠলো,
“জানোনা৷ উনার বিয়ে হয়েছিলো মোট সাত বার৷ কেন? তার অনেক আয়ু বলে? না। তার বিয়ে হয়েছিলো সাম্রাজ্যের সুবিধার কারণে। কন্ট্রোলার দের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য। এবং এর একটি বিয়েতেও তার মতামত নেওয়া হয়নি, তাকে সাম্রাজ্যের প্রয়োজনে তার বাবা, চাচা, ভাই, ভাইপো, তাকে বিয়ে দিয়েছে। এবং তাকে এটা মেনে নিতে হয়েছে, দ্যাটস দ্যা রুল আনাবিয়া! দ্যাটস হাউ দ্যা রুলিং ওয়ার্কস! ইটস ভেরি কমপ্লিকেটেড অ্যান্ড আগলি৷ যার কিছুই তুমি জানোনা।”
আনাবিয়া চেয়ে রইলো ওর দিকে৷ ইলহান আবার বলতে শুরু করলো,
“একিজন শেহজাদীর অর্থ শুধু ভোগ বিলাস নয় আনাবিয়া৷ আজ যদি তুমি মীরের স্ত্রী না হতে তবে তোমার ভাগ্যও অন্য শেহজাদীদের মতোই হতো। যেহেতু মীর বাদশাহ, সুতরাং সে-ই ডিসাইড করতো তুমি কাকে বিয়ে করবে, সেখানে তোমার অনুমতি থাকুক বা না থাকুক। কিন্তু আমি জানি মীর তোমাকে এসব কিছুই জানতে দেয়নি, এমনকি সাম্রাজ্যের ভেতর কত কমপ্লিকেটেড, ডার্টি ইস্যুজ চলে; একজন বাদশাহকে রোজ কত কত প্রবলেম ফেস করতে হয় এসবও তুমি কখনো জানতে পারোনি। ও যে এত স্ট্রেস নিয়েও তোমাকে এতটা আগলে রাখতে পেরেছে, এতটা খেয়াল রাখতে পেরেছে এটাই আশ্চর্যের বিষয়৷”
ইলহান শ্বাস নিলো একটা, গাড়ি থেকে নেমে যেতে উদ্যত হতে বলল,
“আমি জানি আমার এ কথা বলে উচিত হবেনা, তোমার খারাপ লাগবে, কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি, ও তোমাকে অনেক বেশিই প্রায়োরিটি দিয়ে ফেলেছে। ও যদি নিজের নরমাল জীবন যাপন জারি রাখতো তবে ওকে এত সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো না৷ সে যেমন তোমার লয়্যালটি, তোমার ভালোবাসাকে টেকেন ফ’ গ্রান্টেড নিয়েছে, তেমনই তুমিও ওর ভালোবাসা, ওর কেয়ার, ওর কনসার্নকে টেকেন ফ’ গ্রান্টেড নিয়েছো। তুমি অন্য দেমিয়ান দের থেকে এক্সেপশোনাল কেউ নও, উই অল আর দ্যা সেইম। দ্যাটস ইট! আমি গেলাম এখন, তুমি ঠান্ডা মাথায় ব্যাপার গুলো ভেবে দেখবে আশা করি৷”
ইলহান ডোর খুলে নামলো নিচে, চলে যেতে উদ্যত হয়েই আবার ফিরে নরম গলায় বলল,
“আসওয়াদ যে ভুল গুলো করেছে সেখানে তোমার অনেক বেশি ইনফ্লুয়েন্স ছিলো, তুমি যদি প্রথমেই ব্যাপারটা স্লাইড করতে দিতে তবে সেটা এতদূর গড়াতো না। ফলাফল কিন্তু এখন একই, তোমার সন্তানদের সাথে অন্য আরও একজন৷ শুধু নিজেদের গোল্ডেন টাইম গুলো নষ্ট করলে৷ আর তাছাড়া ওর এগুলো ভুলও নয়, অন্তত আমি মনে করিনা। দ্যাটস দ্যা ভেরি নরমাল থিং ফ’ আ দেমিয়ান। বাট তুমি ওসবের সাথে পরিচিত ছিলে না বলেই এতটা হার্ট হয়েছো। আসওয়াদের যদি কোনো ভুল থেকে থাকে তবে সেটা এখানেই, তোমাকে ওর ন্যাচারের সাথে প্রথম থেকেই পরিচয় হতে দেওয়া উচিত ছিলো। তুমি এগুলো বুঝবে যখন তোমার সন্তানরা ওর স্থানে থাকবে। ভায়োলেন্স অ্যন্ড ভায়োলেন্স অ্যান্ড ভায়োলেন্স! আসওয়াদ যদি কখনো এ পৃথিবী থেকে তোমার আগেই বিদায় নেয় তবে তুমি কিছু ব্রুটাল ট্রুথ দেখতে পাবে, সেদিন নিজের এই দীর্ঘ আয়ুকে অভিশাপ মনে হবে। সেদিন মীরকে অভিশাপ দিবে, কেন সে তোমাকে এতটা প্যাম্প্যার করেছে, এমন পাগলাটে ভালোবাসায় অভ্যস্ত করেছে৷ নো অফেন্স, জাস্ট বিয়্যিং অনেস্ট। ভালো থাকো আনাবিয়া।”
ইলহান চলে গেলো, ওর সুউচ্চ শরীর মিলিয়ে গেলো ভিড়ের ভেতর৷ আনাবিয়া চেয়ে রইলো ওর যাওয়ার দিকে। এক অবর্ণনীয় দুঃখ অকস্মাৎ দলা পাকিয়ে উঠে এলো ওর বুক থেকে, গলা ধরে এলো আচমকা। পরমুহূর্তেই সে দুঃখ রূপ নিলো ক্রোধে! সজোরে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিলো সে৷ বারংবার ঝপসা হয়ে আসতে রইলো চোখ, হাতের উলটো পিঠে চোখ মুছে গতি বাড়ালো আরও৷ তীব্র বেগে ছুটতে রইলো তার আরভি!
গোধূলির নরম আলোয় রাঙা হয়ে আছে আকাশ৷ মীর মেডিক্যাল জোনের রয়্যাল এরিয়া থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো। আশেপাশে সতর্ক চোখ বুলালো, কেউ তাকে দেখলো কিনা নিশ্চিত হয়ে পা বাড়ালো রয়্যাল ফ্লোরের উদ্দ্যেশ্যে। কিছুক্ষণ আগে হঠাৎ করেই শরীর খারাপ লাগতে শুরু করেছে তার, কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে হঠাৎ। শক্তিশালী পেইন কিলার নেওয়া সত্ত্বেও মাথার যন্ত্রণাটা অকস্মাৎ নির্ধারিত সময়ের আগেই ফিরে এসেছে৷
ইয়াসির হেকিম দাঁড়িয়ে আছেন লাঠিতে ভর দিয়ে৷ বার্ধ্যক্যের ভারে সম্পুর্ন শরীরে এক অদ্ভুত কাঁপুনি। লিও দাঁড়িয়ে ওর পাশে, মুখে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। কপাল, চোয়ালের চামড়া কুচকে আছে, মাথায় কাঁচাপাকা চুল। লিও জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে রইলো ইয়াসিরের দিকে। ইয়াসির ওর দিকে চশমার লেন্সের ওপাশ থেকে ভ্রু কুচকে চেয়ে কাঁপা, দুর্বল, চিন্তিত স্বরে বলে উঠলো,
“লিও, হিজ ম্যাজেস্টি রোজ এভাবে এত পরিমাণে পেইন কিলার নিতে থাকলে মাথা যন্ত্রণার আগেই কিডনি ফেইলিউরে মৃত্যুবরণ করবেন! আমি বললাম তোমরা নতুন কাউকে নিয়োগ দাও আমার স্থানে, কিন্তু তোমরা কেউ আমার কথা শুনছো না! আমি বাঁচবো আর ক’দিন? এমনও হতে পারে আজ ঘুমোলে আগামীকাল সূর্য দেখার সৌভাগ্য আমার হবে না!”
“কাকে কি বলছেন? হাজার বার বলেছি! উনি শুনতে নারাজ! শেহজাদী কিছুই জানেন না এ ব্যাপারে, বার বার বলেছি তাঁকে জানাতে, কিন্তু উনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল। শেহজাদারাও জানেন না কিছুই, উনি কাউকে কিছুই বলতে দিচ্ছেন না, জানতে দিচ্ছেন না। উনি কি চাইছেন সেটাই আমি বুঝতে পারছিনা ইয়াসির!”
লিওর কন্ঠে হতাশা।
ইয়াসির কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,
“কোনোভাবে শেহজাদীকে সংবাদটা দেওয়া যায় না?”
“জান নিয়ে নেবেন আমার, জানলে।”
“হিজ ম্যাজেস্টি চাইছেন টা কি? তুমি কিছু বুঝতে পারছো? তোমাকে কিছু বলছেন?”
“এসব বলে কোনো লাভ হবে না ইয়াসির। জানেনই তো হিজ ম্যাজেস্টি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেন, কাউকে কোনো কিছু জানানোর প্রয়োজন মনে করেন না। আমাদের একমাত্র দায়িত্ব তার আদেশ পালন করা৷ তবে উনি নিজেকে কোথায় নিয়ে চলেছেন আমি টের পাচ্ছি। শেহজাদাদেরকে এখন থেকেই সব রকম রাষ্ট্রীয় কাজে সাথে নিচ্ছেন, উনি মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছেন সাম্রাজ্যের দায়িত্ব শেহজাদাদেরকে হস্তান্তরের। আমার ধারণা জাস্ট, কতটুকু সঠিক বলতে পারিনা৷”
ইয়াসির অন্যমনস্ক হয়ে ভাবতে ভাবতে দীর্ঘশ্বাস ফেললো একটা। ক্ষণিক পর জিজ্ঞেস করলো,
“মেয়ে কেমন আছে তোমার? ওর জ্বর কমেছে?”
“হ্যাঁ, কমেছে বইকি। হয়েছে মায়ের মতো, ডানপিটে। একটু জ্বর নেমেছে আর অমনি ছুটেছে বাইরে৷ শেহজাদা ফিরাসের আশেপাশে ঘুরে সারাক্ষণ। বার বার করে সাবধান করছি কিন্তু কে শুনে কার কথা! বাবা হওয়া অনেক কঠিন, ইয়াসির।”
লিও দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ইয়াসির হেসে বলল,
“মেয়েকে বুঝিয়ে বোলো, তাঁরা ভালোবাসার জন্য নয়। দূর থেকেই দেখতে হবে, কাছে আসলেই বিপদ। ইতোমধ্যেই হেরেমে শেহজাদাদের নিয়ে ভাগবাটোয়ারা শুরু হয়ে গেছে। ওরা জানে ওদের ভাগ্য, তবুও উচ্ছ্বাসের কমতি নেই৷”
“কি করবো বলুন! মেয়েকে বোঝাতে পারছিনা, শেহজাদা ফিরাসের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই এসবে। আমার মেয়েকে তিনি স্রেফ আমার মেয়ে বলেই সুসম্পর্ক রেখেছেন, আমি সেটা ভালো ভাবেই জানি। কিন্তু আমার মেয়ে, উঠতি বয়স। শেহজাদা অসম্ভব সুদর্শন, তার ওপর তিনি শেহজাদা, তাকে ইগনোর করা কঠিন। কিন্তু মেয়েকে এটা কোনোভাবেই বোঝাতে পারছিনা, আমি কখনোই চাইনা ও এসবের মাঝে পড়ুক। তাছাড়া যেখানে শেহজাদার ওর প্রতি কোনো অনুভূতিই নেই সেখানে ব্যাপারটা নিতান্ত হাস্যকর!”
“তুমি নিশ্চিত?”
জিজ্ঞেস করলো ইয়াসির। লিও একটা ঠোঁট গোল করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“অবশ্যই, ভালোবাসা মানুষের চোখে ফুটে ওঠে ইয়াসির। চোখকে কখনো ফাঁকি দেওয়া যায়না৷ কিন্তু শেহজাদার চোখে আমার মেয়ের জন্য কোনো ভালোবাসা নেই, জাস্ট আমার মেয়ে, তাই৷”
“তাহলে সময় থাকতেই মেয়েকে সাবধান করো, শেহজাদা ফিরাসের মায়ায় পড়লে কিন্তু মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে৷ হি ইজ ওয়্যে ঠু হ্যান্ডসাম, শেহজাদীকে দেখলে যেমন লোকে থমকে যেত, তাকে দেখলেও সকলে থমকে যায়৷ তার ওপর যে গড়ন, জাস্ট লাইক ফিবাস!”
“ওটাই তো কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে! জঙ্গলে অলওয়েজ শার্ট লেস ঘুরে বেড়ান৷ মেয়েগুলোর মাথা খাচ্ছেন, কিন্তু জানতেও পারছেন না। হিজ ম্যাজেস্টির কড়া নিষেধ আছে, নো ইন্টিমেসি আনটিল সিক্সটি৷ যদিও দেমিয়ান রুলসে ফো’টি আছে, কিন্তু ছেলেদের জন্য আরও টুয়েন্টি ইয়ার্স বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর ধারণা মেয়ে মানুষ বেড রুমে ঢুকলে যতটা না প্রবলেম, মাথায় ঢুকলে তার চাইতে বেশি প্রবলেম। সুতরাং নো ইন্টিমেসি, ফিজিক্যাল অর মেন্টাল।”
ইয়াসির হাসলো, লিওর পিঠ চাপড়ে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিলো মেয়েকে সাবধান করার ব্যাপারে৷ লিও বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়ে বলল,
“আমাকে এখন যেতে হবে ইয়াসির, হিজ ম্যাজেস্টি হঠাৎ শেহজাদীর খোঁজ নিতে বলে গেছেন। আমি একটু যোগাযোগ করে দেখি অন্যদের সাথে৷”
পকেট থেকে ফোন বের করতে করতে মেডিক্যাল জোন ত্যাগ করলো সে৷
মীর কামরায় ফিরে পোশাক ছাড়লো। সারাদিনে বাচ্চাদের সাথে থেকে বেশ ধকল গেছে তার। ওদের সামনে নিজের শারীরিক অসুস্থতা আড়াল করার সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করে গেছে সে সবসময়, আজও৷ বুঝতে দেয়নি কিছুই। এতক্ষণে, নিজের একান্ত ব্যাক্তিগত স্থানে এসে খুলে পড়লো ওর খোলস। দুহাতে সজোরে চেপে ধরলো মাথা, বিধ্বংসী যন্ত্রণায় চাপা আর্তনাদ করে শুয়ে পড়লো বিছানায়৷
চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছে তীব্র ব্যাথায়, কে যেন পেরেক ঠুকছে তার মস্তিষ্কের প্রতিটি পরতে! দুহাতে চুলগুলো খামচে ধরলো মীর, দ্রুত বেগে উঠে পেইন কিলার বের করে খেয়ে নিলো দুই চারটা একত্রে। ঢকঢক করে পানি খেলো সাথে সাথে। যন্ত্রণায় চোখে রক্ত জমে যাওয়ার জোগাড়, ঘন দম ফেলতে রইলো সে সজোরে, যেন ফুসফুস শুদ্ধ বেরিয়ে আসবে তার শ্বাসনালি বেয়ে! সেই মুহুর্তেই দরজায় সজোর আঘাত পড়লো, বাইরে থেকে ভেসে এলো লিওর আতঙ্কিত কন্ঠস্বর,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি! ইয়োর ম্যাজেস্টি!”
মীর উত্তর দেওয়ার মতো শক্তি খুঁজে পেলোনা হঠাৎ, যন্ত্রণায় যেন বাক হারিয়ে ফেললো সে ক্ষণিকের জন্য৷ ক্ষণ পেরোলেও মীরের সাড়াশব্দ না পেয়ে সজোরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো লিও, চোখ দুইটা কোন এক অমোঘ বেদনায় ছলছল করছে, শিশুদের ন্যায় ঠোঁট ফুলে উঠছে বার বার৷
মীর ঠাই দাঁড়িয়ে গ্লাস হাতে, ওর দিকে চেয়ে রইলো অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে। যন্ত্রণায় ঝাপসা হয়ে যাওয়া চোখে লিওকে চিনতে যেন কষ্ট হলো তার। মস্তিষ্ক যেন বুঝে উঠতে অক্ষম হলো চতুর্দিকে কি হচ্ছে, কে ডাকছে, কাকে ডাকছে। লিও জোরে জোরে কয়েকবার দম নিয়ে বলে উঠলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি! শেহজাদী….. শেহজাদী অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন! ট্রাকের সাথে….. অবস্থা ভালো নয়.. আইসিইউতে ভর্তি….!”
অ্যাক্সিডেন্ট শব্দটার পর অন্য কোনো শব্দ মীর শুনতে পেলো বলে মনে হলো না। ক্ষণিকের জন্য অবুঝের ন্যায় দ্বিধাগ্রস্ত চোখে চেয়ে রইলো লিওর দিকে! হাত পা অকস্মাৎ অসাড় হয়ে এলো তার, হাত থেকে গ্লাস টা মেঝেতে আছড়ে পড়ে চূর্ণ বিচূর্ণ হলো মূহুর্তেই। অস্বাভাবিক কাঁপতে শুরু করলো ওর হাত জোড়া! বিস্মিত, ঝাপসা চোখে নিজের কম্পনরত হাত দুটোকে সম্মুখে তুলে দেখলো সে, পরক্ষণেই টুকরো কাঁচের ওপর জ্ঞান হারিয়ে আছড়ে পড়লো সেও৷
ফারহা মেডিক্যাল হসপিটালের চতুর্থ তলায় হন্তদন্ত হয়ে ছুটে উঠলো কোকো৷ উদ্ভ্রান্তের ন্যায় হয়ে আছে তার মুখাবয়ব! করিডোরে আসতেই চোখে পড়লো ইলহানকে, চোখ মুখ লাল হয়ে ফুলে গেছে, অশান্ত দেখাচ্ছে তাকে! পাশেই লুসি দাঁড়িয়ে, চোখের কোণে জলের আভাস, ইলহানকে শান্ত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে চলেছে৷
কোকো ছুটে আসলো ওর কাছে, আনাবিয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে পারলোনা, তার আগেই গলা ধরে এলো ওর! দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো। লুসি পাশ থেকে কান্না জড়ানো বাধো বাধো গলায় বলে উঠলো,
“কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না ভেতরে, অনলি ক্লোজ রিলেটিভ অ্যালাও করবে।”
ইলহান ডুকরে কেঁদে উঠে জড়িয়ে ধরলো ওকে, ওর কান্নার শব্দে ভারী হয়ে এলো হসপিটাল৷ একজন নার্স এসে লুসিকে বলল ওকে অন্যত্র সরয়ে নিতে। লুসি চেষ্টা করেছে আগেও, কিন্তু ইলহানকে এ স্থান থেকে সরাতে পারছে না, সে এখানেই থাকবে! ইলহান আর্তনাদের স্বরে বলে উঠলো,
“মাথা ফেটে গেছে আমার মেয়ের! পাঁজর ভেঙে গেছে দুটো! রাস্তায় শুধু রক্ত আর রক্ত! আমার মেয়ের এত সুন্দর গায়ে শুধু ক্ষত আর ক্ষত! আমার জন্য হয়েছে সব, আমি দ্বায়ী এসবের জন্য! আমার জন্যই অ্যাক্সিডেন্ট করেছে ও!”
কোকো কেঁদে ফেললো, ইলহানকে সামলানো দুষ্কর হয়ে পড়লো ওর পক্ষে৷ লুসি দুহাতে মুখ চেপে কাঁদতে শুরু করলো তৎক্ষনাৎ!
আচমকা কম্পন অনুভব করলো ওরা পায়ের তলায়, পরক্ষণেই সিড়িতে কারো সবেগ, ভারী, দুর্বার পদধ্বনি শুনে তাকালো সেদিকে। সেই মুহুর্তেই সিড়ি বেয়ে করিডোরে উঠে এলো আরসালান, ওর পেছন পেছন তড়িঘড়ি এলো সাইয়্যিদ৷ আরসালান বেদনাক্লিষ্ট, অবিশ্বাসের চোখে চেয়ে রইলো ইলহানের দিকে, শ্বাস পড়তে রইলো ঘনঘন। ইলহান দ্বিধাভরে একবার তাকালো আনাবিয়ার কেবিনের দিকে৷
আরসালান ঝড়ের বেগে ভেঙে চুরে ঢুকে পড়লো সেখানে। ওর পেছন পেছন এগোলো সাইয়্যিদ, চোখে মুখে তার এক অদ্ভুত ভীতি, অবিশ্বাস। আতঙ্কিত চোখে একবার তাকালো সে ইলহানের দিকে, পরক্ষণেই ঢুকে গেলো ভেতরে৷
আরসালান অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো সফেদ বিছানায় ব্যান্ডেজে মুড়ে রাখা নিঃসাড় দেহটির দিকে। ধীর, দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে এগোলো সে সেদিকে৷ মাথা, মুখ জুড়ে মোটা ব্যান্ডেজ, শরীরের যেখানে সেখানে ব্যান্ড এইড, মুখের ভেতর অক্সিজেনের নল ঢুকানো, সারা শরীরে অসংখ্য আঁচড়,ক্ষত। হাতে, পায়ে, বুকে লাগানো ডাক্তারি সরঞ্জাম।
স্তব্ধ, স্তম্ভিত হয়ে সে হাটু গেড়ে বসে পড়লো মায়ের পাশে৷ বিড়বিড়িয়ে ডেকে চলল,
“আম্মা..আম্মা…আম্মা..আম্মা…!
চোখ ছাপিয়ে ঝরঝর করে জল ঝরে পড়লো ওর, ঠোঁট ফুলে উঠলো তীব্র শোকে! আচমকাই চিৎকার করে কেঁদে উঠলো ও! আনাবিয়াকে দুহাতে সজোরে আঁকড়ে ধরে মুখে চুমু খেতে রইলো উন্মাদের ন্যায়৷
সাইয়্যিদ এলো তখনি, আনাবিয়ার থেকে আরসালানকে টেনে হিচড়ে ছাড়িয়ে নিয়ে এলো সে। কিন্তু আরসালানকে আটকানো কষ্টকর হলো, সে অশান্ত হয়ে সাইয়্যিদের শক্ত বাধন ছিড়ে ফুড়ে আবারও গিয়ে জাপটে ধরলো মাকে! ওর জোরালো কান্না ধ্বনিত হতে রইলো চতুর্দিকে৷ কয়েকজন ডাক্তার নার্স ছুটে এলো তখন, আরসালানকে একবার দেখে প্রধান সার্জন সাইয়্যিদের কাছে গিয়ে অসহায় স্বরে বলল,
“শেহজাদা! ছোট শেহজাদাকে দয়া করে সরিয়ে নিয়ে যান। শেহজাদী অনেক ক্রিটিকাল সিচুয়েশনে আছেন, এই মুহুর্তে বাইরের জার্ম ভেতরে ঢুকলে আমরা তার ইনফেকশন ঠেকাতে পারবনা!”
সাইয়্যিদ কিভাবে আরসালানকে সরিয়ে নিয়ে যাবে বুঝতে পারলোনা। দুহাতে জোরজবরদস্তি টেনে জড়িয়ে নিলো বুকে। আরসালান ওর বুকে ভর দিয়ে কাঁদতে রইলো সজোরে, সাইয়্যিদ ওকে টানতে টানতে নিয়ে চলল বাইরে, চোখ ভিজে উঠলো ওর। কোনো স্বান্তনাতেই আরসালানকে শান্ত করতে সক্ষম হলো না সে!
ফারহা মেডিক্যাল এর সম্মুখে ঝড়ের বেগে এসে দাঁড়ালো দশবারো খানা গাড়ি। গাড়ি থামার আগেই ডোর খুলে ছুটে বেরিয়ে গেলো ফিরাস, ওর পেছনে মিশআলকে ধরে বের হলো জিবরান আর কাসওয়ার। মায়ের দুর্ঘটনার কথা শোনার পর থেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে সে, দাঁড়াতে পারছেনা নিজে। মারাত্মক প্যানিক অ্যাটাকে থরথর করে কাঁপছে তার শরীর৷ হসপিটালের সামনে এসে যেন আরও প্যানিক হতে রইলো তার, মায়ের দুরবস্থা দেখার মতো সাহস যেন সঞ্চার হতে চাইলনা বুকে৷
ওদের পেছনেই এসে থামলো মীরের কালো রঙা গাড়িখানা৷ মীর বেরিয়ে এলো, দাঁড়াতে গিয়ে পড়েই যাচ্ছিলো সে। লিও কাঞ্জি ধরতে গেলো ওকে, কিন্তু হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিলো সে। পরক্ষণেই দ্রুত, ভারী পা ফেলে এগোলো সে হসপিটালের ভেতর৷ লিও কাঞ্জি ভীত মুখে এগোলো ওর পিছু পিছু।
একটু আগেই সিসিটিভি ফুটেজ চেক করতে গিয়ে ইলহানের সাথে আনাবিয়ার কথপোকথনের ফুটেজ দেখেছে মীর৷ সেখানে আনাবিয়ার ব্যাথাতুর মুখ স্পষ্ট! তার আধাঘন্টা পরেই আনাবিয়ার অ্যাক্সিডেন্ট! ফুটেজ দেখার পর থেকেই মাথা বিগড়ে গেছে মীরের, হন্যে হয়ে আছে সে৷
চতুর্থ তলায় গিয়ে ইলহানকে চোখে পড়লো তার, ইলহান চোখ তুলে ওর শোকে, ক্রোধে উন্মত্ত চেহারা দেখা মাত্রই ভড়কালো৷ মীর তীব্র ক্রোধে ছুটে এসে হিংস্র পশুর ন্যায় ঝাপিয়ে পড়লো ওর ওপর! নিজের বলিষ্ঠ হাতের বজ্রমুষ্ঠির একের পর এক শক্তিশালী আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে ফেললো সে ইলহানের মুখ, গর্জে উঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কি বলেছিস তুই ওকে? কি বলেছিস, সত্যি কথা বল!”
লুসি আঁতকে উঠলো, ডুকরে কেঁদে উঠে সে ছুটে যেতে চাইলো ইলহানকে ছাড়িয়ে নিতে৷ কোকো পেছন থেকে সজোরে টেনে ধরলো ওকে, দাঁতে দাঁত চেপে চাপা গলায় বলে উঠলো,
“পাগল হয়েছো নাকি? তোমাকে জানে মেরে ফেলবেন হিজ ম্যাজেস্টি! ভুলেও ওর ভেতরে যেও না!”
কোকো ওকে পেছন দিকে ঠেলে দিয়ে নিজে ছুটে গেলো সেদিকে, কিন্তু মীরকে ইলহানের থেকে ছাড়ানোর সাহস করে উঠতে পারলোনা৷ ইলহান নিজেও নিজেকে রক্ষায় উদ্যত হলো না, আর না ঠেকালো মীরের আঘাত। নিশ্চুপে মার খেতে রইলো!
মিশআল কে ধরে তখুনি ওপরে উঠে এলো জিবরান আর কাসওয়ার। বাবাকে এমন হিংস্র হতে দেখে আঁতকে উঠলো ওরা৷ ছুটে গিয়ে দুজনে পেছন থেকে জাপটে ধরলো বাবাকে, ইলহানের থেকে টেনে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে রইলো। কিন্তু মীরকে ছাড়ানো যেন দুঃসাধ্য হয়ে উঠলো! কাসওয়ার বার বার বলতে রইলো,
“বাবা শান্ত হোন, বাবা! শেহজাদাকে ছেড়ে দিন বাবা!”
কিন্তু মীর শুনলোনা ওদের কোনো অনুরোধ! ক্রোধে উন্মাদ হয়ে উঠলো সে, ইলহানের রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত মুখখানা রক্তাক্ত হতে রইলো আরও। সাইয়্যিদ আরসালানকে নিয়ে খোলা বাতাসে গিয়েছিলো। ফিরে এসে দুজনের এমন দুরবস্থা দেখে ছুটে এলো ওরাও৷ আরসালান ছুটে এসে ধরলো বাবাকে, তিন ভাই মিলে ইলহানকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে রইলো বাবার আক্রমণ থেকে। সাইয়্যিদ উপায় না পেয়ে ইলহান আর মীরের ভেতর ঢুকে পড়ে ইলহানকে আড়াল করে মীরের সজোর আঘাত থেকে। বাবার হাতের উন্মত্ত আঘাত তারও লাগলো কয়েকটা, কিন্তু তোয়াক্কা করলোনা! মীরকে টেনে পেছনে নিয়ে গেলো ওরা, সাইয়্যিদ ইলহানকে জাপটে ধরে অন্যদিকে সরিয়ে নিয়ে অবশেষে সক্ষম হলো মীরের হাত থেকে ওকে ছাড়াতে!
মীরকে ধরে রাখা কষ্টকর হলো ওদের জন্য, তবুও সর্বশক্তি দিয়ে তিনজনে জাপটে ধরে রইলো বাবাকে, বার বার বলতে রইলো শান্ত হতে৷ মীর তীব্র ক্রোধে শ্বাস ছাড়তে রইলো জোরে জোরে৷ দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত হয়ে রইলো ওর চোয়াল!
মিশআল দুর্বল পায়ে এগিয়ে গিয়ে ধরলো ইলহানকে, বসালো পাশের সোফায়৷ সাইয়্যিদকে ইশারায় নার্সকে সংবাদ দিতে পাঠিয়ে শোকার্ত, অসহায় স্বরে বলে উঠলো,
“শেহজাদা, বাবার মানসিক অবস্থা ভালো নেই! আপনি কিছু মনে নিবেন না!”
ইলহানের নাক, ঠোঁট থেকে রক্ত পড়ছে কলকলিয়ে। চোখের কোণায় কালশিটে পড়ে গেছে৷ দুর্বল ভঙ্গিতে ওপর নিচে মাথা নাড়িয়ে ও আশ্বাস দিলো মিশআলকে। লুসি ফোপাতে ফোপাতে এসে বসলো ইলহানের পাশে, নিজের রুমাল দিয়ে অল্প অল্প করে মুছতে রইলো ইলহানের মুখের রক্ত, আলতো হাতে চাপ দিতে রইলো যেন সে একটুও ব্যাথা না পায়। ইলহান চোখ বন্ধ করে সোফায় গা এলিয়ে ছিলো। লুসির স্পর্শ চিনতে বাকি রইলোনা তার, এক হাতে ওকে নিজের বুকে টেনে নিলো সে। লুসি ডুকরে কেঁদে উঠলো তাতে। দুহাতে জড়িয়ে নিলো ইলহানকে তৎক্ষনাৎ!
করিডোর তখন লোকে লোকারণ্য। সংবাদ পেয়ে রেড জোন থেকে চলে এসেছে ফ্যালকন, লিন্ডা, হাইনা সহ সকলে। লিন্ডা মেয়েকে নিয়ে এসেছে সাথে, সে মায়ের পেছনে লুকিয়ে আছে। চোখ মুখ থমথমে, নীল চোখ জোড়া এত ভিড়ের ভেতর খুঁজে চলেছে একটি মুখ।
কোকো গিয়ে দাঁড়িয়েছে ওদের সাথে, কিভাবে কি হলো সেই ব্যাপারে চাপা সুরে কথা বলছে সকলে৷ শেহজাদারা একদিকে বসে আছে চুপচাপ। ফিরাসের চোখের জল বাধা মানছে না, জিবরান ধরে আছে ওকে। অন্যরা বাবাকে ধরে বসে আছে সোফায়।
মীরের দৃষ্টি শূন্য, একটু আগেই আনাবিয়াকে দেখে এসেছে সে৷ কিন্তু সেইফটি ইস্যুজ এর কারণে ওকে ভেতরে থাকতে দেয়নি ডাক্তার। চোখের ঝাপসা দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে আরও। আনাবিয়ার নিঃসাড়, নিস্তব্ধ মুখখানা চোখে ভেসে উঠছে বার বার! বুক ঝাঝরা হতে চাইছে যন্ত্রণায়, যেন এ যন্ত্রণার ভারে বক্ষপিঞ্জর ভেঙে এখনি বেরিয়ে আসবে ওর হৃৎপিণ্ড! আরসালান বাবাকে দেখছে বার বার, বাবার এমন উদ্ভ্রান্ত, অসহায়, কাতর চেহারা দেখে কান্না পাচ্ছে ওর!
লিও কাঞ্জি এতক্ষণ কথা বলছিলো ডাক্তারের সঙ্গে। ফিরে এসে মীরের সম্মুখে দাঁড়ালো ওরা৷ গলা খাকারি দিয়ে লিও বলে উঠলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, ডাক্তার বলছেন এই মুহুর্তে শেহজাদীকে অন্যত্র মুভ করা রিস্কি। আরও কয়েক সপ্তাহ পর তাকে মুভ করলে ভালো হবে।”
মীর শুনলো, বললনা কিছুই। লিও তখনো দাঁড়িয়ে রইলো, ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, এখানে একজন খুব স্কিল্ড নিউরোসার্জন আছে। শেহজাদীকে সেই দেখছে, আর আমরা তাকে চিনিও।”
মীর জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো,
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৭
“কে সে?”
লিও জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কাঞ্জির দিকে তাকালো একবার, এরপর গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠলো,
“ব্রায়ান উইলসন, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
