বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪২
রানী আমিনা
“কি ব্যাপার, কাজ কেমন চলছে?”
“যেমন চলে রোজ, হাতির মতো মশার কামড় খাওয়া।”
উত্তর দিলো প্রাসাদের সিংহদ্বারে দাঁড়িয়ে পাহারা দিতে থাকা লিডার গার্ডটি। হাতে একটা ধোঁয়া ওঠা কফির মগ, তা থেকে কিছুক্ষণ পর পর একটু একটু করে চুমুক দিচ্ছে সে। আশেপাশে যথাযথ নিয়মে রোবটের মতোন স্থীর দাঁড়ানো জনা পঞ্চাশেক গার্ড। সকলের প্রখর দৃষ্টি ছুটে চলেছে প্রাচীরের চতুর্দিকের জমাট বাধা আঁধারের ভেতর। আকাশে মেঘ জমে ঢেকে দিয়েছে অর্ধচাঁদটিকে। রেড জোন এই মুহুর্তে ডুবে আছে চাপা অন্ধকারে।
“বৃষ্টি আসবে বোধ হয়!”
আকাশের দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করলো দ্বিতীয় জন। প্রথম জনও তার দেখাদেখি আকাশের দিকে তাকিয়ে কপালে ভাজ ফেললো, মৃদু স্বরে স্বগতোক্তি করলো,
“হু, বেশ মেঘ জমেছে। এই শীতে বৃষ্টি নামলে কিভাবে কাজ করবে ছেলেগুলো?”
তারপর চোখ নামিয়ে পাশে তাকিয়ে বলল,
“তোমার চোখ লাল হয়ে গেছে দেখি, এদেরকে নিয়ে ভেতরে গিয়ে এবার একটা জম্পেশ ঘুম দাও। আমার গ্রুপের ছেলে গুলো এখনো রেডি হচ্ছে৷ এখুনি চলে আসবে। ভেতরে গিয়ে ওদেরকে ইনফর্ম করো রেইনকোট সমেত বের হতে, আকাশের অবস্থা সুবিধার নয়।
আর আমাকে এক কাপ কফি দিয়ে যেতে বলে দিও কাউকে।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
দ্বিতীয় জন পায়ের মশায় কামড়ানো স্থানটি চুলকাতে চুলকাতে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো, তারপর নিজের গ্রুপের গার্ড গুলোকে একত্রিত করে সারিবদ্ধভাবে মার্চ করিয়ে নিয়ে গেলো প্রাসাদের নিচ তলার রক্ষী দের আবাসিকে।
কিছুক্ষণ পর একজন সাধারণ রক্ষী এসে প্রথম গার্ডটিকে এক কাপ কফি দিয়ে গেলো। কফিতে চুমুক দিতে দিতে জঙ্গলের দিকে ধীর গতিতে এগোতে এগোতে চারদিকে দেখতে লাগলো সে।
সেই মুহুর্তেই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দ্রুত পায়ে, নিঃশব্দে প্রাচীরের দিকে এগোতে দেখা গেলো আপাদমস্তক কালো, পেশাদার পোশাকে মোড়া একদল ছায়াকে। আকাশের কালো মেঘের কারণে তাদের যে সামান্য তম অস্তিত্ব সাধারণের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো সেটুকুও মুছে গিয়ে হয়ে পড়লো এক প্রকার অদৃশ্য।
এক জোড়া ফ্যালকন ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে এসে বসলো কফির কাপে চুমুক দিতে থাকা লোকটির মাথার ওপরের লম্বা ইউক্যালিপটাস গাছটার মগডালে। শব্দ পেয়ে গাছের ডালের দিকে ভ্রু কুচকে তাকালো গার্ডটি, ব্যাস্ত হয়ে গেলো মধ্যরাতের রহস্যময় বাজপাখি দুটোকে দেখতে।
প্রাসাদের চতুর্দিকে স্থাপিত স্বয়ংক্রিয় মোশন সেনসরস নিরাপত্তা ক্যামেরা গুলো স্থীর হয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ, আর সেই সুযোগেই ছায়া গুলো তরতরিয়ে প্রাসাদের সুউচ্চ প্রাচীর বেয়ে উঠে চোখের পলকে ঢুকে পড়লো প্রাসাদের গণ্ডীর ভেতর।
ক্যামেরা গুলো চালু হলো আবার, তার কিছু মুহুর্ত বাদেই একে একে সারিবদ্ধভাবে মার্চ করতে করতে সিংহদুয়ার দিয়ে বেরিয়ে এলো অস্ত্রসজ্জিত এক ঝাঁক রক্ষী। দাঁড়িয়ে গেলো যার যার নির্দিষ্ট স্থানে। একে অপরের সাথে ভাব বিনিময় করে নিলো ইশারায়, তারপর যন্ত্রের মতোন স্থীর হয়ে স্ব স্ব দায়িত্বে মনোনিবেশ করলো।
প্রাসাদের নিচতলা।
বেইজমেন্টের দিকে নামা পথ জুড়ে কিছু দুরত্ব পর পর দাঁড়িয়ে আছে অস্ত্রসজ্জিত প্রহরীরা। নিঃশ্বব্দ রাত্রীর বুক চিরে তারা জেগে আছে অতন্দ্র প্রহরীর মতোন। কারো কারো হাতে চকচকে ফার্স্ট ক্লাস গান, কারো হাতে ধারালো অস্ত্র। প্রত্যেকের নিকট রিভলবার।
নিচ তলার বিদ্যুতের মেইন সার্কিট বক্সের ভেতর হঠাৎ দেখা গেলো আগুনের ফুলকি। কিছু মুহুর্ত পর হঠাৎই বিকট শব্দে ব্লাস্ট করলো সেটা, সঙ্গে সঙ্গে কে যেন চেচিয়ে বলে উঠলো,
“আগুন লেগেছে, আগুন!”
রক্ষীরা অন্ধকারে হঠাৎ দিশেহারা হয়ে উঠলো, চিৎকার করে আলোর ব্যাবস্থা করতে বলল কেউ একজন। জান চলে গেলেও এই বেইজমেন্টের রাস্তা ফেলে তারা কেউই একচুল সরতে পারবেনা। হাতের অস্ত্রগুলো শক্ত করে ধরে সকলে সতর্ক হয়ে গেলো মুহুর্তেই, অস্ত্র গুলোকে সচল করে তুলে ধরলো, তর্জনী রাখলো ট্রিগারের ওপর। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে যোগাযোগ রক্ষা করতে শুরু করলো একে অপরের সাথে, অন্যের অবস্থান জানার প্রয়াসে৷
গিজগিজ করতে থাকা গার্ডদের ফাঁক ফোকড় দিয়ে অনায়াসে শরীর গলিয়ে এগিয়ে গেলো কালো ছায়া গুলো, বেইজমেন্টের দরজাটা খুলে গেলো সন্তর্পণে, ভেতরে নিকষ কালো আঁধার থাকায় দরজা খোলার দৃশ্য চোখে বাধলো না কারো। পিলপিল করে একে একে ভেতরে ঢুকে পড়লো তারা কজন। ঢুকতেই দরজা লক হয়ে গেলো আবার পূর্বের মতোন।
গার্ডদের চিৎকার চেচামেচির মাঝেই আবার ফিরে এলো বিদ্যুৎ, চারদিক ঝলমলিয়ে উঠলো মুহুর্তেই। সতর্ক চোখে তারা তাকিয়ে গেলো চতুর্দিকে। কোথাও কোনো অসঙ্গতি লক্ষিত হলেই অ্যাকশন নিবে তারা। কিন্তু কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর সব কিছু স্বাভাবিক দেখে শান্ত হলো সকলে। দাঁড়িয়ে পড়লো আবার নিজ নিজ স্থানে।
ভেতরে ঢুকেই ওরা তিনজনে ফেটে পড়লো চাপা উল্লাসে, আনাবিয়া ইশারায় ওদেরকে আস্তে কথা বলতে বলে খুলে ফেললো ওর মাথা সহ সমস্ত মুখমণ্ডল আবৃত করে রাখা কুচকুচে কালো রঙা মাস্কখানা, এগিয়ে গেলো সামনের দিকে।
ওর দেখা দেখি কোকো ও এক টানে খুলে ফেললো নিজের মাস্ক, তারপর আনাবিয়ার মতো করে হেটে পেছনে পেছনে এগিয়ে গেলো ভেতরে। লিও আর কাঞ্জি দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে একই ভঙ্গিতে মাস্ক খুলে এগোলো কোকোর পেছন পেছন, ফিসফিসিয়ে বলল,
“হামলোগ মা কা বেটা৷”
কোকো শুনে খিক খিক শব্দে চাপা হাসলো। আনাবিয়া পেছনে তাকিয়ে হাত উঁচিয়ে মার দেখালো, চুপ হয়ে গেলো তিনজনেই।
ভেতরে ঢুকতেই লম্বা করিডর, দুইপাশে সাধারণ কয়েদিদের সেল। বৈদ্যুতিক লাইটের ক্ষীণ হলুদাভ আলোতে এদিক থেকে ওদিক হেটে পাহারা দিচ্ছে দুজন গার্ড।
হঠাৎ বাতিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলতে নিভতে শুরু করলো, গার্ড দুটো একে অপরের দিকে তাকিয়ে বাতি গুলোর দিকে এগিয়ে গেলো। একজন কাঠের চেয়ারে ভর দিয়ে উঠে একটা বাতিকে মনোযোগী দৃষ্টিতে দেখলো কিয়ৎক্ষণ, তারপর টোকা মারলো তর্জনী দিয়ে। মুহুর্তেই সব গুলো বাতি আবার জ্বলতে শুরু করলো আগের মতো করেই।
বাল্ব ঠিক করতে ওঠা গার্ডটা নিজের এহেন গুণে চমকিত হয়ে সবগুলো বাতির দিকে একবার তাকিয়ে মেঝেতে দাঁড়ানো গার্ডটির দিকে তাকিয়ে বিজয়ীর হাসি দিলো।
সেই সাথে দূরের করিডোর হতে শোনা গেলো কয়েকটি পুরুষালি হাসি, সাথে একটি মিহি সুরের মিষ্টি খিলখিলে হাসির সুমিষ্ট ক্ষীণ শব্দ।
সিঁড়ি বেয়ে তারা নামল নিচের গভীর স্তরে। রেড জোনের সাথে সরাসরি সংযুক্ত থাকায় এখানের বাতাস বেশ ভারী, আর্দ্র। স্যাতস্যাতে দেয়াল গুলোতে মশাল জ্বালিয়ে রাখা। কয়েকটি জরাজীর্ণ বাল্বের আলো টিমটিম করছে যেখানে সেখানে। দেয়ালে কোথাও কোথাও শেকল ঝুলছে, কয়েদিদের যে এখানে বেধে নির্যাতন করা হয় সেটা টের পাওয়া যাচ্ছে স্পষ্ট, মেঝেতে পড়ে আছে অস্পষ্ট রক্তের ছাপ। দূরে কোথাও পানি পড়ছে টপটপ শব্দে।
আনাবিয়া চারদিকে দেখতে দেখতে এগোলো সামনে। কোকো একটু পিছিয়ে লিও কাঞ্জির মাঝখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“এইখানের ওই সেলটিতে হিজ ম্যাজেস্টি একবার একটা মেয়ের চামড়া তুলেছিলো।”
“কি বলিস! মেয়ে?
কিন্তু কেন?”
“মেয়েটি আম্মাকে ব্যাড টাচ করেছিলো, আম্মার গোসলের সময়ে। বেলিন্ডাকে মনে আছে তোদের? ওয় আম্মাকে গোসল করাতো, কিন্তু সেদিন বেলিন্ডা ব্যাস্ত থাকায় অন্য আরেকটি মেয়েকে এ কাজে নিযুক্ত করেছিলো। ব্যাস!
হিজ ম্যাজেস্টির কড়া নিষেধ ছিলো বেলিন্ডা ব্যাতিত অন্য কারো আম্মার ঘরে প্রবেশের ব্যাপারে। শুনেছিলাম হিজ ম্যাজেস্টি ভয়ানক রেগে গেছিলেন।
সেদিনই আম্মাকে বিয়ে করে নিয়েছিলেন তিনি, যেন তাদের মাঝে আর অন্য কারো যাওয়ার প্রয়োজন না পড়ে। সেদিনের পর থেকে রয়্যাল ফ্লোরে ইয়াসমিন আর বেলিন্ডা ছাড়া অন্য কোনো দাসীই বিনা অনুমতিতে ঢুকতে পারতোনা৷ আর আম্মার সমস্ত ব্যাক্তিগত ব্যাপার গুলো তখন থেকেই হিজ ম্যাজেস্টি নিজের দায়িত্বে নিয়েছিলেন, অন্য সকলকে এক্কেরে নো এন্ট্রি করে দিয়েছিলেন।
ওই মেয়ের চামড়া দিয়ে বাধাই করা একটা নোটবুক আছে আম্মার দেখিস, একদম টকটকে লাল রঙা।”
“তুই তখন কোথায় ছিলিস?”
“আমি বোধ হয় সেদিন সদ্য জন্মগ্রহণ করেছিলাম। আম্মা সমুদ্রে আমাকে পেয়েছিলেন। কোন শার্ক নাকি আমার বায়োলজিক্যাল মা বাবা কে খেয়ে ফেলেছিলো, আমার অন্যান্য ব্রাদার সিস্টার দের সাথে।”
বেশ খোশ মেজাজেই বলল কোকো। লিওরা এতদিন এই ঘটনার ব্যাপারে কিছুই জানতো না, শুধুই জানতো অন্য সবার মতোন কোকোও এতিম। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে নিরবে ভাব বিনিময় করলো। লিও সামনে ফিরে জিজ্ঞেস করলো,
“তোর মনে পড়ে না পরিবারের কথা? খারাপ লাগে না?”
“খারাপ লাগবে কেন? আ’ বেয়ারলি নিউ দেম! কারো চেহারাই মনে নেই। আর তাছাড়া আ’ অলরেডি হ্যাভ অ্যা ফ্যাম’লি, ওই দ্যাখ সামনে আমার হুরপরীর মতোন আম্মা হেটে যায়, আমার বাবা ওদিকে কোথায় কোন শহরে কি উদঘাটন করে চলেছে হয়তো। যতই আমার সাথে খিটিমিটি করুক, আ’ নো হি লাভস মি।
আর এই যে তোরা আছিস, আমার এত গুলো ভাই! লিন্ডা, শার্লট, ফাতমা, এরা কি আমার বোন নয়? এরা আমার বোনের থেকেও বেশি। সব হারিয়েও আমি দ্বিগুণ ফেরত পেয়েছি, এমন ভাগ্য কজনের হয়? আমার আম্মা আমাকে যেমন ভালোবাসে কারো সত্যিকারের আম্মাও এতটা ভালোবাসতে পারবে না, আ’ম ড্যাম শিওর।”
লিও হাসলো মৃদু, চোখের কোণে পানি জমলো ওর৷ মনে পড়ে গেলো কিভাবে অন্য গ্রুপের লিডারের সাথে লড়াইয়ে হেরে গেছিলো তার বাবা, প্রচন্ড জখম নিয়ে মৃতপ্রায় হয়ে রক্তাক্ত শরীরে খোড়াতে খোড়াতে কোথাও গিয়ে হয়তো মুখ থুবড়ে পড়েছিলো।
মাকে নিয়ে নিয়েছিলো সেই বিজয়ী, মেরে ফেলেছিলো ওর সমস্ত ভাই বোনকে। অর্ধমৃত অবস্থায় পড়ে ছিলো ও মৃত ভাইবোনদের লাশের স্তুপের ওপর, নিভু নিভু চোখে দেখেছিলো মায়ের চলে যাওয়া! মা যাওয়ার আগে কতই না অসহায় চোখে দেখেছিলো ওকে! তবুও, চলে তো গেছিলো!
তারপরেই বদলে গেলো জীবন! ভাগ্য কিভাবে তাকে ওই মায়ায় মোড়া সুন্দরী রমণীর ক্রোড়ে তুলে দিয়েছিলো সেটা ওর অজানা, হেসে খেলে এত গুলো বছর পেরিয়ে গেলো! এত সুখময় জীবনে কখনো আর মনে পড়েনি কাউকে। শেহজাদী লাইফট্রি থেকে ফেরার পূর্বে বন্দী জীবনে মনে পড়তো আবছা আবছা, কিভাবে মায়ের বুকের ভেতর গুটিসুটি মেরে, গায়ে গা লাগিয়ে চুপটি করে ঘুমিয়ে থাকতো ওরা সকলে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো লিও, সকলের অগোচরে মুছে নিলো চোখের কোণে জমা বাষ্প টুকু।
আনাবিয়া মনোযোগী চোখে চারদিকে নজর দিতে দিতে হেটে চলেছে সামনে। পেছনের কারো কথা কানে আসছে না ওর, কানে নিতে চাইছে না। মন পড়ে আছে এখানের অজানা বন্দীদের প্রতি। এখনো পর্যন্ত কোনো কারারক্ষী কে চোখে পড়েনি। এদিকের কারাগারের যে ভয়াল চেহারা তাতে কারারক্ষীদের কোনো প্রয়োজনই হবে না।
হাটতে হাটতে হঠাৎই ওর কানে ভেসে এলো কারো গোঙানির ক্ষীণ শব্দ।
দাঁড়িয়ে পড়লো আনাবিয়া। কান খাড়া করে শুনলো।
মেয়েলি গোঙানির শব্দ ভেসে আসছে কোনো এক কারাগার থেকে।
পেছনে চাপা সুরে কথা বলতে বলতে এগোনো বাচ্চাদেরকে হাত উঁচিয়ে নিরব হতে নির্দেশ দিলো সে। তিনজনে চুপ হয়ে দ্রুত পায়ে নিঃশব্দে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো আনাবিয়ার কাছাকাছি, ওদেরও কানে গেলো গোঙানির শব্দ। তাকালো একে অপরের দিকে।
আনাবিয়ার কাছে বেশ চেনা চেনা ঠেকলো কন্ঠস্বরটিকে। ইশারায় কোকোকে আদেশ দিলো কোন সেল থেকে শব্দ আসছে খুঁজে বের করতে।
কোকো আশেপাশের পাথুরে দেয়ালে আটকানো সেল গুলোর ধাতব দরজায় কান পেতে পেতে শুনলো সন্তর্পণে। কয়েকটি পেরিয়ে সামনে যেতেই কোকো চমকে চোখ তুলে তাকালো আনাবিয়ার দিকে।
আনাবিয়া এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো দরজার সামনে। দরজার ওপর লাগানো ভিউ হ্যাচ টেনে ভেতরে উঁকি দিলো সে, চোখ জোড়া গিয়ে পড়লো লাল রঙা চুলের অধিকারিণী, রক্তাক্ত এক মেয়েলি অবয়বের ওপর৷
টানা টানা চোখ জোড়া বিস্ময়ে হঠাৎ বড় বড় হয়ে গেলো আনাবিয়ার। বিড়বিড়িয়ে উচ্চারণ করলো,
“বাহার…!”
পরমুহূর্তেই নিজের হাতের পর পর কয়েকটি শক্তিশালী ঘুষিতে ভেঙে ফেললো দরজার মধ্যাংশ।
বিকট শব্দে মুহুর্তেই সচকিত হয়ে এলো কারাগারের ভেতরের সকলে। আশেপাশে থাকা কারারক্ষী গুলো শব্দের উৎস লক্ষ্য করে যারপরনাই ছুটে আসতে শুরু করলো এদিকে, বদ্ধ জায়গা হওয়ায় স্পষ্ট শোনা গেলো তাদের ভারী পদশব্দ। বাহারের চতুর্দিকে কিলবিল করতে থাকা ইদুর আর পোকামাকড় গুলো এত শব্দে আতঙ্কিত হয়ে ছুটে পালালো এদিক সেদিকে।
ভাঙা দরজায় সশব্দে একটা লাথি মেরে পুরোটা ছাড়িয়ে ফেললো আনাবিয়া। সেটা বাহারের শরীরের ওপর আছড়ে পড়ার আগেই ধরে ফেলে ছুড়ে দিলো বাইরের মেঝেতে।
দ্রুত পায়ে ভেতরে গিয়ে দুহাতে টেনে তুলে নিলো ওকে বুকের ওপর। ডাকলো দুবার,
“বাহার… বাহার শুনতে পাচ্ছো আমাকে?”
বাহার কোনো সাড়া শব্দ দিলো না। গোঙানির মৃদু শব্দ তখনো ভেসে আসতে থাকলো ওর মুখ থেকে। ঠোঁটের কোণা বেয়ে রক্তের স্রোতের দাগ শুকিয়ে লেগে আছে মুখের ওপর। অর্ধনগ্ন শরীর জুড়ে ক্ষতের চিহ্ন, কালশিটে পড়ে আছে কোথাও কোথাও। লাল চুলের ভেতর রক্ত জমাট বেধে বিশ্রি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
আনাবিয়া দ্রুত টেনে বের করে নিয়ে এলো ওকে কুঠুরির বাইরে৷ দ্রুত স্বরে বলল,
“লিও, কাঞ্জি, বাহারকে নিয়ে এক্ষুনি সিক্রেট রুট ধরে বেরিয়ে যাবি। অ্যাসাপ! ফাতমাকে বলবি যত টুকু সম্ভব ট্রিটমেন্ট দিতে, বাকিটা আমি এসে দেখছি।”
লিও কাঞ্জি একে অপরের সাথে দৃষ্টি মেলালো, মুখে দ্রুত আবার চড়িয়ে দিলো মাস্ক। কাঞ্জি বাহারকে তুলে নিলো পাঁজাকোলে, গার্ডরা পৌছানোর আগেই সকলেই ঝড়ো বেগে ছুটে এগোলো সিক্রেট রুটের দিকে৷
এদিকে ঘোর অন্ধকার, একটা মশাল পর্যন্ত কেউ জ্বালেনি। দূর হতে আনাবিয়ার নিশাচরী চোখে বাধলো সিক্রেট রুটের ওপর বাধানো ধাতব দরজা। দ্রুত গিয়ে সেটা খুলে দিতেই কিলবিল করতে থাকা সাপেরা আছড়ে পড়লো ওর পায়ের ওপর।
আনাবিয়া দৃঢ় ভঙ্গিতে উঁচু করলো নিজের ডান হাত খানা, পথের মধ্যভাগ হতে উঠে এলো দুটো মোটা মোটা শেকড়, সাপ গুলোকে দুদিকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে তৈরি হলো একটি নিরাপদ শিকুড়ে পথ। লিও কাঞ্জি বাহারকে নিয়ে মুহুর্তেই ছুটে অদৃশ্য হয়ে গেলো অন্ধকারের ভেতর।
আনাবিয়া আবার আঁটকে দিলো দরজা।
ওদিকে বাহারের কারাগারের সম্মুখ হতে ভেসে আসছে রক্ষীদের চিৎকার চেচামেচি। আনাবিয়া তাকালো কোকোর দিকে, কোকোকে মুখে বলার প্রয়োজন হলোনা কিছুই, তার আম্মার প্রতিটা ইশারা তার নখদর্পনে।
কোকো পথ চিনিয়ে সামনে সামনে এগোলো নিষিদ্ধ কারাগারের দিকে। এপ্রান্তে মানব রক্ষীর উপস্থিতি নেই বললেই চলে, তাদের জায়গা দখল করে আছে অন্য কিছু। ক্ষণে ক্ষণে ভেসে আসছে কয়েকটি জাগুয়ার আর প্যানথারের হিংস্র আওয়াজ। আশেপাশেই কোথাও আর্তচিৎকার করে চলেছে কোনো সিংহ।
আনাবিয়া এগিয়ে যেতে দেখতে পেলো করিডরের দুপাশ জুড়ে সারি সারি বিশাল বিশাল ধাতব সেল। কোনো কোনো সেলের ভারী ধাতব দরজার ওপর জ্বলে আছে রক্তাভ রেড লাইট, বাকি গুলোতে মৃদু ব্লু লাইট।
রেড লাইট জ্বলা প্রিজন গুলো পুরোপুরি আবদ্ধ, কোনো ফাঁক ফোকড় নেই তাতে, যেন বদ্ধ কবরের মতোন। আনাবিয়া কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে গেলো রেড লাইট ওয়ালা প্রিজন গুলোর দিকে। দরজার কাছাকাছি আসতেই ধাতব দরজার ওপর লালচে নীয়ন আলোয় ফুটে উঠলো একটি স্বচ্ছ স্ক্রিণ। তার ওপর ভেসে উঠলো একটি হাতের ছাপ, ওপরে ছোট্ট করে লেখা উঠলো -ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিডেড।
আনাবিয়া হাত রাখলো তার ওপর। পরক্ষণেই বদ্ধ কামরাটি যান্ত্রিক শব্দে খুলে গেলো দুদিকে। মুহুর্তেই বাতাসে ভেসে এলো বিশ্রী দুর্গন্ধ! নাকে হাত চেপে ভেতরে উঁকি মারলো আনাবিয়া, চোখে পড়লো একটি কঙ্কালসার বৃদ্ধকে, পড়ে আছে মেঝেতে।
আনাবিয়া ভ্রু কুচকে দেখলো তাকে কিছুক্ষণ, চিনতেও পারলো। বছর ত্রিশ আগে সাম্রাজ্যের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন তিনি। একটি বিশাল অংকের টাকার গরমিলের জন্য ধরা পড়েছিলেন। পরবর্তীতে জানা যায় চোরাইকৃত টাকা দিয়ে নিজের আলাদা সাম্রাজ্য গঠনের পরিকল্পনা করছিলেন তিনি, তারপর থেকে এই কারাগারই হয়েছে তার স্থায়ী বাসস্থান।
শব্দ পেয়ে বৃদ্ধটি অত্যন্ত দুর্বল ভাবে ধীরে ধীরে চোখ ঘুরিয়ে দেখলেন দরজার দিকে। আনাবিয়াকে চিনতে পারলেন বোধ হয়! চোখ জোড়া চকচক করে উঠলো তার, মুখ ফুটে হয়তো বলতে চাইলেন -আলো দেখবো আমি, আলো! করুণা করো!
আনাবিয়া মুখ ফিরিয়ে নিলো ঘৃণায়, শক্ত হাতে আবারও আটকে দিলো দরজা। ভেতর থেকে বৃদ্ধের বুকফাটা আর্তনাদের ক্ষীণ ফিসফিসে আওয়াজ ভেসে এলো ওর কানে।
ক্ষনিক বাদে দরজা খুলে গেলো আবার, তবে ভেতরে এলো না কেউ। শুধু কংক্রিটের মেঝে ফুড়ে উঠে এলো একটি শেকড়, তাতে মুহুর্তেই ফুটলো একটি নীলচে আলো ছড়ানো ফুল, সবুজ পাতাতে ছেয়ে গেলো তার ছোট্ট শরীর৷
বৃদ্ধ ছোট্ট শিশুটির মতোন খুশি খুশি চেহারা নিয়ে তাকিয়ে রইলেন ফুলটির দিকে, চোখের ঘোলাটে তারায় প্রতিফলিত হলো নীল রঙা ফুলের অপার সৌন্দর্য!
দরজার বাইরে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে অতঃপর সামনের দিকে এগিয়ে গেলো আনাবিয়া।
মেঝেতে শরীর এলিয়ে শুয়ে আছে কয়েকটি জাগুয়ার, আশেপাশে লেপ্টে আছে রক্ত। হয়তো ক্ষনিক আগেই কোনো শিকার পেটে গেছে তাদের।
দূরে একটি সিংহ হিংস্র ভঙ্গিতে পায়চারি করে চলেছে, বোধ হয় খাবারের ভাগে বেশ কম পড়েছে তার।
আনাবিয়া কোকোকে ইশারায় পেছনে থাকতে বলল, নইলে যেকোনো সময়ে ক্ষুধার্ত সিংহটি হামলে পড়তে পারে ওর ওপর। এতগুলো প্রাণীগুলোকে এখানে এভাবে ছেড়ে রাখার একটাই অর্থ, খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো কয়েদি!
আনাবিয়া এগিয়ে গেলো ধীর পায়ে, সিংহটি পায়ের শব্দ পেয়ে হিংস্র, গর গর শব্দ করতে করতে চোখ তুলে তাকালো। তারপর হঠাৎই বিকট গর্জন তুললো আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে! শিকারী চোখ জোড়াতে ক্ষুধার তীব্রতা নিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে লাফিয়ে এগিয়ে আসতে শুরু করলো আনাবিয়ার দিকে।
আনাবিয়া দাঁড়িয়ে রইলো স্থির ভঙ্গিতে। সিংহটি কাছে এগিয়ে আসতেই হাত বাড়ালো সে দৃঢ় ভঙ্গিতে, সিংহটি লাফিয়ে আক্রমণ করতে আসতেই হাত ঢুকিয়ে দিলো সে সিংহের মুখের ভেতর, শক্ত হাতে ধরে ফেললো ধারালো দাঁতালো চোয়ালের নিচের অংশ। তারপর সজোরে আছড়ে ফেললো মেঝেতে।
সাথে সাথেই স্তব্ধ হয়ে এলো সিংহের গর্জন, শোনা গেলো কেবল তার ভারী নিঃশ্বাস। কিছুমুহূর্ত বাদেই উঠে বসলো সে, তার ভেতরের হিংস্রতা গলে গিয়ে জায়গা নিলো অনুগত্য। মাথা নিচু করে আনাবিয়ার পায়ের কাছে বসে রইলো চুপটি করে৷
আনাবিয়া আলতো করে ছুঁয়ে দিলো তার কেশর৷ আবেশে চোখ বুজে পড়ে রইলো জন্তুটা। মীরের সময়কালে এদেরকে নিয়ম মাফিক খাওয়ার দেওয়া হতো, প্রচন্ডরকম শক্তিশালী ছিলো এরা। এখন খাওয়া দাওয়ায় ভাটা পড়ায় কমে গেছে শরীর, শক্তি, ক্ষমতা।
সিংহটাকে ভালোভাবে দেখলো আনাবিয়া। ওদের সকলেরই গায়ে লাইফট্রির ছোট্ট ছোট্ট সরু লতা বেধে রাখা, যাতে ওরা ট্রান্সফর্ম হতে না পারে।
সেইফজোনে থাকাকালীন ওর কোমরেও এমনই একটা লতা বেধে দিয়েছিলো মীর৷ কিমালেবের দ্বীপে গিয়ে সেই লতা খুলে ফেলেছিলো সে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাল বাতি জ্বলতে থাকা বদ্ধ কারাগারের দিকে দেখলো আনাবিয়া৷ হাতের স্পর্শে খুলে ফেললো দরজা৷ ভেতরে উঁকি দিতেই চোখে পড়লো একটি ধাতব তারের তৈরি বেড়া। বেড়ার দু পাশে দুজন কৃশকায় পুরুষ বসে মেঝেতে, একে অপরের সাথে অস্পষ্ট স্বরে কোনো স্মৃতি আওড়াতে ব্যাস্ত৷
দরজা খুলে যেতেই, দুর্বল ভঙ্গিতে চোখ তুলে দেখলো তারা। সফেদ চুলের, হীরকখন্ডের ন্যায় ঝলমলে চোখের মেয়েটিকে দেখা মাত্রই যেন স্তব্ধ হয়ে গেলো দুজনেই, অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইলো আনাবিয়ার দিকে।
পেট যেন লেগে আছে পিঠের সাথে, চোখ জোড়া ঢুকে গেছে কোটরে। পাংশুবর্ণের শরীর জুড়ে শত সহস্র ক্ষতের নতুন পুরোনো দাগ! পাজরের হাড় গুলো গোণা যায়।
আনাবিয়া বিস্মিত চেহারায় পা বাড়ালো ভেতরে, মৃদুস্বরে ডেকে উঠলো,
“চাচাজান….!”
এহেন সম্বন্ধে যেন হুশ ফিরলো পুরুষ দুজনের, সম্মুখের দৃশ্যটা আজ সত্যি জেনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বিহ্বল চোখে চেয়ে রইলো তারা! সময় গড়াতেই হঠাৎ ভেঙে পড়লো কান্নায়, তাদের কান্না শোনালো আর্তনাদের মতোন!
জায়ান দুর্বল ভঙ্গিতে হামাগুড়ি দিয়ে টেনে টেনে এগিয়ে এলো আনাবিয়ার নিকট। পা জোড়াতে উঠে দাঁড়ানোর মতোন শক্তি যে তার অবশিষ্ট নেই!
নওয়াস বড় বড় দম ফেলে, দুহাতের সর্বশক্তি দিয়ে চেপে ধরলো তারের বেড়াটিকে, যেন ভেঙেচুরে তাদের ছোট্ট মেয়েটির কাছে পৌছানোর চেষ্টা!
আনাবিয়া হাটু ভেঙে বসে পড়লো মেঝেতে, চোখ জোড়া ভরে উঠলো জলে! জায়ান এগিয়ে এসে দুহাতে শেষ অবলম্বন টির মতোন করে আকড়ে ধরলো আনাবিয়ার নরম হাতখানা। ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে দেখলো আনাবিয়ার শুভ্র সুন্দর মুখখানাকে!
কোকো দ্রুত ভেতরে এসে দুহাতে টেনে ভেঙে ফেললো তারের বেড়াটিকে। দুহাতে উঠিয়ে নিলো নওয়াসের পাতলা শরীরের ভর।
আনাবিয়া হাত রাখলো জায়ানের চোয়ালের ওপর। নরম হাতের স্পর্শ পেয়ে জায়ান চোখ বুজে নিলো, যেন হাজার বছর পর কোনো স্নেহের স্পর্শ পেলো সে!
নিজের কাছের মানুষ গুলোকে এভাবে দেখে সহ্য হলোনা আনাবিয়ার, চোয়াল বেয়ে উপচে পড়লো শ্রাবণের ধারা। নিজেকে কোনো রকমে সামলে নিয়ে কোকোর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলো,
“দুজনকে এক সাথে বাহিরে নিতে পারবি?”
“খুব পারবো আম্মা।”
“ঠিক আছে, সিক্রেট রুট দিয়ে চলে যা। ফ্যালকনের সাথে একবার কথা বলে নে৷ ওদেরকে রুটের মুখে অপেক্ষা করতে বল, এদিকে থাকার আর প্রয়োজন নেই৷”
“আপনি কি করবেন আম্মা?”
“আমি সামনে দিয়েই বের হবো।”
চোখ মুছে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল আনাবিয়া। কোকো এক হাত নওয়াসের বাহুর নিচে দিয়ে উঁচু করে অন্য হাতে জায়ানকে তুলে নিলো। বলল,
“আপনার যেমন আদেশ আম্মা। আমি এনাদের রেখেই আপনার জন্য ফিরে আসবো। ঘেউল দের এরিয়া পেরিয়ে আসার প্রয়োজন নেই আম্মা, ওদিকে রাস্তা বেশি। আপনি অন্য দিক দিয়ে আসবেন।”
আনাবিয়া ওপর নিচে মাথা নাড়ালো দুবার, জায়ান আর নওয়াসের সাথে আবার সাক্ষাতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেরিয়ে পড়লো বাহিরে যাবার উদ্দ্যেশ্যে।
ভারী অস্ত্র হাতে লোয়ার প্রিজনে প্রবেশের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আর্মরে মোড়া এক ঝাঁক প্রহরী। এই শীতেও মুখে ঘাম জমে চিকচিক করছে তাদের। সকলেরই চোখ গাঁথা সেই বিশাল দরজার দিকে, অপেক্ষায় কমান্ডারের ইশারার৷
বাহার নামক মেয়েটির কারাগারের দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া ব্যাক্তিটা যে সাধারণ কেউ নয় সেটা তাদের ভালো করেই জানা৷ দেমিয়ান ব্যাতিত অন্য কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে অক্ষম, এখানে প্রবেশাধিকার বাদশাহ জাজীব ইলহান শুধুমাত্র ইযান সালেহ্ কে দিয়েছেন। তবে এর ভেতরে সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে কে ঢুকলো? নাকি অন্য কোনো গোপন রাস্তা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লো হিজ ম্যাজেস্টির শত্রুপক্ষ!
ইযান একপ্রকার ছুটতে ছুটতে এসে উপস্থিত হলো সেখানে। ভেতরের রক্ষীদের থেকে খবর এসেছে বাহার নামক আসামীকে কেউ নিয়ে পালিয়ে গেছে৷ তবে তারা সংখ্যায় প্রায় চার পাঁচ জন। এবং কেউ কেউ এখনো ভেতরে আছে।
ইযানকে ডাকা হয়েছে লোয়ার প্রিজনের দরজা খোলার জন্য। সে খবর পাওয়া মাত্রই সব ফেলে ছুটে এসেছে। চার পাঁচ জনের একটা দল এত সিকিউর্ড স্থানে ঢুকে পড়েছে শুনে হৃদযন্ত্র থেমে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে ওর। একজন হলেও মানা যায়, তাই বলে চার পাঁচ জন!
কমান্ডারের পেছনে থাকা একজন গার্ড ফিসফিসিয়ে বলল,
“স্যার, আমার মনে হয় ওরা মানুষ নয়, দানব টানব হবে। নইলে এভাবে কিভাবে ভেতরে ঢুকবে? ওই দানবদের সামনে আমরা কিভাবে টিকবো?”
কমান্ডার তির্যক দৃষ্টিতে তার দিকে একবার তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিলো।
আরেকজন গার্ড ধীর গলায় যোগ করলো,
“স্যার, শুনেছি ওরা বাহারের সেলের দরজা ভেঙে ওকে বের করেছে। দানব ছাড়া এটা কিভাবে সম্ভব? আমার তো এখনি ভয় করছে!”
কমান্ডার দাঁত চেপে বলল,
“মানুষ হোক আর দানব, এই দরজা পার হয়ে সামনে এলে সে আর বাঁচবে না। আমার হাতে তাকে মরতেই হবে!”
ইযান এসেই ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলো দরজার কাছে, বড় বড় দম ফেলতে ফেলতে হাত বাড়িয়ে খুলতে গেলো দরজা। সেই মুহুর্তেই যান্ত্রিক শব্দে নিজে থেকেই খুলতে শুরু করলো সেটি।
কমান্ডার আঁতকে উঠলো, চিৎকার করে বলে উঠলো,
“প্রিপেয়ার ইয়োর আর্মস!”
সঙ্গে সঙ্গে খট খট শব্দে সকলেই অস্ত্র প্রস্তুত করে নিশানা করলো দরজার দিকে। ধড়াস ধড়াস করে লাফাতে থাকা বুক নিয়ে শক্ত হাতে অস্ত্র ধরে ওরা প্রস্ততি নিলো আক্রমণ করার।
দরজা এবার খুলে গেলো সম্পুর্ন। ইযান সকলের সামনে ছিলো, ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে থাকা রমনীকে দেখা মাত্রই ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো সে। পরক্ষণেই মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো শ্রদ্ধাভরে। চিৎকার দিয়ে আদেশ করলো,
“সোলজার্স! লেই ডাউন ইয়োর উয়্যিপোনস! লোয়ার ইয়োর আইজ! শেহজাদী আনাবিয়া ফারহা দেমিয়ান ইজ হিয়ার!”
ইযানের আদেশ শোনা মাত্র সকলে অবিশ্বাস্য ভঙ্গিতে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিয়ৎক্ষণ। মস্তিষ্ক সম্পুর্ন কথা গুলো বুঝে ওঠা মাত্রই সশব্দে নামিয়ে ফেললো অস্ত্র। তৎক্ষনাৎ মাথা নুইয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেলো করিডর জুড়ে।
পরক্ষণেই তাদের চোখে পড়লো কালো রঙা গ্লসি হাইহিলে মোড়া এক জোড়া শ্বেতশুভ্র পা।
লম্বা খোলা চুলে, কোমরে ঢেউ তুলে, ধীর ছন্দে পা ফেলে সগর্বে হেটে চলল আনাবিয়া। কেউ মাথা তুলে তাকিয়ে দেখার সাহস করলোনা তাকে৷
বেইজমেন্ট থেকে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো ইলহানকে। ওকে দেখা মাত্রই ইলহান সোজা হয়ে দাঁড়ালো, ক্ষ্যাপাটে স্বরে ডেকে উঠে বললো,
“আনাবিয়া, দাঁড়াও! এই কাজের জবাব দিয়ে যাবে তুমি!”
আনাবিয়া ওর দিকে ফিরে পেছন দিকে হেটে সিংহদুয়ারের দিকে যেতে যেতে হাসলো খুব মিষ্টি করে। পরমুহূর্তেই ঘুরে দাঁড়িয়ে ছুটে বেরিয়ে গেলো প্রাচীরের বাইরে।
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪১
ইলহান আহত সিংহের ন্যায় হিংস্র, আশাহত চোখে তাকিয়ে রইলো ওর যাওয়ার পানে৷ ইলহানের মুখখানা কল্পনা করে ভীষণ হাসি পেলো আনাবিয়ার৷ শব্দ করে হেসে উঠে ও ছুটে চলল গন্তব্যের দিকে।
কিছুদূর ছুটতেই আচমকা বিদ্যুৎ গতিতে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো কেউ!
চমকালো আনাবিয়া! থেমে যেতে চাইলো, কিন্তু পরমুহূর্তেই গতি জড়তার কারণে সজোরে আছড়ে পড়লো পুরুষালি অবয়বটির ইস্পাত-দৃঢ় বক্ষে!
