বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৩
রানী আমিনা
তিন দিন হলো মীরের কোনো সংবাদ নেই! সে উধাও, যেন মিশে গেছে বাতাসে! আনাবিয়া পাগলপ্রায়, গত তিন দিনে এতটুকু ঘুমায়নি সে, নেয়নি এতটুকু বিশ্রাম! সারাটাক্ষন উদ্ভ্রান্তের মতোন মীরের পথ চেয়ে বসে থেকেছে বিরাট বারান্দার কাউচের ওপর; নিস্তব্ধ, নিঃসাড়! থেকে থেকে তার অজান্তেই চোখ ছাপিয়ে গড়িয়ে পড়ছে লোনা জল, বাহিরে ক্ষণে ক্ষণেই নামছে বৃষ্টি!
ফিলোমেলা, মহসিন, লিও, লাঞ্জি— সকলে মিলেও তাকে এই তিনদিনে পানি ব্যাতিত খাওয়াতে পারেনি কিছুই! লিও কাঞ্জি সমস্ত পঞ্চদ্বীপ উলটে ফেলেছে, তবুও পায়নি মীরের সন্ধান। লিওর মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে কোকো তখুনি রওনা দিয়েছে শিরো মিদোরির উদ্দ্যেশ্যে। হয়তো এসে পড়বে দ্রুতই।
আশাহত মুখে দুজন দাঁড়িয়ে নিজেদের কামরার সম্মুখে। শেহজাদীর এমন দুরবস্থা দেখার সাধ্য নেই ওদের। তার সামনে এই দায়িত্বজ্ঞানহীন, অপরাধী মুখ নিয়ে দাঁড়ানোর স্পর্ধাও নেই!
মহসিন তখন গুটিগুটি পায়ে এলো লিওর কাছে, চাপা স্বরে বলল,
“লিও ভাইজান, শেহজাদী যদি এভাবে অনাহারে থাকেন তবে তার শরীর খারাপ করবে! এমনিতেই তার শরীরের অবস্থা নাজুক, আজকাল তিনি একটু বেশিই অসুস্থ হচ্ছেন। এই অবস্থাতে…. এভাবে না খেয়ে থাকলে অনেক সমস্যায় পড়তে হবে! আপনি দেখুন কোনো উপায় করতে পারেন কিনা!”
লিও থমথমে চেহারায় মাথা নাড়লো, মৃদুস্বরে বলল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“জ্বি, দেখছি আমি, কোনো ব্যাবস্থা করা যায় কি।”
মহসিন আস্বস্ত হয়ে আবার গেলো আনাবিয়ার পাশে৷ ফিলোমেলাকে নির্দেশ দিলো ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবার বাদ দিয়ে নতুন করে গরম খাবার তৈরি করতে। ফিলোমেলা চলল তখুনি।
লিও একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পকেট থেকে সেলফোন বের করে যোগাযোগ করতে চাইলো কারো সাথে। কয়েকবার রিং হতেই ওপাশ থেকে রিসিভ করলো কেউ, পরক্ষণেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো পুরুষালি গলা,
“হ্যাঁ লিও বলো, কি ব্যাপার? সব ঠিক আছে? আমার মেয়ে কেমন আছে?”
“শেহজাদা, একটা সমস্যা হয়ে গেছে এদিকে।”
“কি সমস্যা? আমার মেয়ে ঠিক আছে? তার কিছু হয়নি তো?”
উদ্বিগ্ন স্বরে শুধোলো ইলহান। লিও তাকে আস্বস্ত করে বলল,
“জ্বি শেহজাদা, শেহজাদী ঠিক আছেন। মানে…. ঠিক আছেন বলতে তেমন ঠিক নন!”
“কেন? কি হয়েছে ওর ? শরীর খারাপ করেছে? জ্বর টর এসেছে?”
“না শেহজাদা, হিজ ম্যাজেস্টি মিসিং। আজ দিয়ে তিন দিন হচ্ছে! কোথায় গেছেন, কি করছেন আমরা কেউ জানিনা। সম্ভাব্য সবখানে খুঁজে দেখেছি কিন্তু তাঁকে পাইনি। শেহজাদী খুবই ভেঙে পড়েছেন, গত দু’রাতে এক ফোটাও ঘুমোননি, তাকে কিছু খাওয়ানোও সম্ভব হচ্ছেন না, কারো কথা শুনছেননা তিনি। আমি বলছিলাম…. মানে…. আপনি যদি একটু….. ”
“আমাকে আসতে হবে?”
“আসলে… আমরা কি করবো বুঝতে পারছিনা! উনি কিছুই খাচ্ছেননা, হিজ ম্যাজেস্টি মিসিং হওয়ার রাত থেকে ওভাবেই বারান্দায় বসে আছেন। সারাক্ষণ কাঁদতে কাঁদতে চোখ লাল করে ফেলেছেন, গায়ে জ্বরও এসেছে বোধ হয়! তার দিকে তাকানো যাচ্ছে না, আমাদেরকে তার ধারে কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছেননা! আপনি এলে উনি বোধ হয় একটু….”
বলতে বলতে গলা ধরে এলো লিওর, চুপ হয়ে গেলো সে। ইলহান স্থির বসে রইলো। তার জন্য প্রাসাদে যাওয়া খুবই রিস্কি। মীর যদি এর মাঝে ফিরে আসে তবে বিরাট সমস্যায় পড়তে হবে। যদিও আশার আলো হিসেবে আনাবিয়া আছে তার, আনাবিয়া থাকতে অন্তত মীর তাকে কখনো কিছুই করবেনা, এটুকু বিশ্বাস তার আছে!
ঠোঁট কামড়ে ভাবলো ইলহান ক্ষণিক। পরক্ষণেই বলল,
“ঠিক আছে, আমি আসছি।”
লিও কৃতজ্ঞ হলো, খুশি খুশি গলায় বলল,
“আপনাকে অনেক ধন্যবাদ শেহজাদা। দয়া করে একটু দ্রুতই আসার চেষ্টা করবেন।”
“তোমাকে বলতে হবে না লিও, আমার মেয়ে না খেয়ে আছে আর আমি দ্রুত আসবোনা, এমনটা হলে আমি আর মানুষ নেই, অমানুষের কাতারে চলে গেছি। রাখো, আমি তৈরি হবো।”
বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলো ইলহান। লিও মহসিনকে ডেকে চাপা গলায় বলল,
“নতুন করে আবার রান্না করাও, শেহজাদী যেগুলো খেতে খুব পছন্দ করেন সেগুলো রান্না করাও। শেহজাদা ইলহান আসছেন, উনি চেষ্টা করলে শেহজাদী খাবেন হয়তো। কোকো ভাইকেও বলেছি, উনিও এসে পড়বেন হয়তো এখুনি৷ দ্রুত যাও।”
মহসিন সোৎসাহে মাথা নাড়িয়ে এগোলো রয়্যাল ফ্লোরের কিচেনের দিকে। তাকে এখুনি গরুর টাটকা মাংসের ব্যাবস্থা করতে হবে।
আনাবিয়া তখনো বসে একভাবে। আকাশ মেঘলা, বৃষ্টি পড়ছে ক্ষণে ক্ষণে— কখনো ইলশেগুঁড়ি, কখনো ফিসফিসে, কখনো বা ঝমঝমিয়ে! শীতল বাতাস বয়ে চলেছে বারান্দা জুড়ে। ফিলোমেলা ভেতর থেকে একটা পুরু চাদর এনে জড়িয়ে দিলো আনাবিয়ার গায়ে, তাকে যে এই বারান্দা থেকে কামরায় নেওয়া দুষ্কর! আনাবিয়ার কান্নাভেজা শুণ্য চোখ জোড়া কখনো নিবদ্ধ মীরের ফেরার পথে, কখনো বা দূর কিমালেবের পর্বতসারির ওপর!
ক্ষণিক বাদেই হুড়মুড়িয়ে রয়্যাল ফ্লোরে প্রবেশ করলো কোকো। দূর হতে আনাবিয়ার কান্নারত মুখখানা দেখা মাত্রই প্রায় ছুটে এলো সে৷ কোকোকে দেখে আনাবিয়ার নিভে যাওয়া শোক যেন উদ্বেলিত হলো, শব্দ করে ফুপিয়ে উঠলো সে! অসহায়ের ন্যায় বাড়িয়ে দিলো হাত দুখানা, একটুখানি স্বান্তনা, ভরসা পাওয়ার আশায়!
কোকো ছুটে এসে আনাবিয়ার বাড়িয়ে দেওয়া দু’হাত নিজের হাতের মুঠিতে শক্ত করে আকড়ে ধরে পায়ের কাছে হাটু মুড়ে বসে পড়লো তৎক্ষনাৎ! ফিলোমেলা আর তার সাথের দাসীটি তার দানবীয় শরীর আর চেহারা দেখে ভয়ে জড়সড় হয়ে পিছিয়ে গেলো কিছুটা৷
কোকো আনাবিয়ার দুহাত একত্রিত করে ঠোঁট ছোয়ালো তাতে, আকুলতা নিয়ে ডাকলো,
“আম্মা!”
আনাবিয়ার কান্না দ্বিগুণ হলো তাতে, ক্রন্দনরত হতবিহ্বল কন্ঠে সে বলে উঠলো,
“আমি কি করবো? আমি ওকে খুঁজে পাচ্ছিনা কোথাও! ও কোথায় গেলো, ওর কিছু হলো কিনা আমি কিচ্ছু জানিনা! কি করবো আমি? কোথায় খুঁজবো ওকে? কোথায় গেলে ওকে পাবো আমি?”
“শান্ত হোন আম্মা, উনি যেখানেই আছেন ঠিক আছেন, হয়তো সাময়িক কোনো সমস্যা হয়েছে! আপনি কাঁদবেন না আম্মা, সব ঠিক হয়ে যাবে! সময় হলেই উনি ফিরে আসবেন, আপনি প্লিজ শান্ত হোন!”
মোলায়েম গলায় বলল কোকো, কিন্তু আনাবিয়া শান্ত হলোনা তাতে! দ্বিগুণ জোরে কেঁদে উঠে বলল,
“ও কখনো এমন করেনি, কখনো না! এভাবে কাউকে না জানিয়ে ও কখনো কোথাও যায়নি! শত রাগ হোক, অভিমান হোক, কাজ থাকুক, যা-ই হোক ও আমাকে না জানিয়ে কখনো কোথাও এভাবে নিরুদ্দেশ হয়নি! তবে আজ কেন….. আজ কেন…!”
আনাবিয়া ভীষণ কান্নার দমকে কথা বলতে পারলোনা আর! প্রাসাদ ভারী হয়ে উঠলো তার ভীষণ শোকের মাতমে! বাহিরে তখন তুমুল বৃষ্টি, যেন ভাসিয়ে নিবে সব, স্রোতে টেনে নিয়ে তলিয়ে যাবে সমুদ্রের গহীনে!
কোকো শঙ্কিত চোখে তাকালো বাইরে, এমন একটানা ভারী বর্ষণ ওদের পঞ্চদ্বীপের জন্য মারাত্মক ক্ষতি বয়ে নিয়ে আসবে! সমুদ্রের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বাড়িয়ে দিবে নদীর পানি, কূল ছাপালেই ফসলের চরম ক্ষতি হয়ে যাবে! আসার পথে সে দেখেছে পানি প্রায় কিনারে উঠে এসেছে, আরেকটু হলেই ডাঙায় চলে আসবে স্রোত!
কোকো আনাবিয়াকে শান্ত করতে উদ্যত হলো। আনাবিয়ার শুভ্র হাতের ওপর হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অসহায় গলায় বলল,
“আম্মা, এভাবে কান্না করবেন না আম্মা! দয়া করে কান্না থামান! আপনার শরীর খুব একটা ভালো নেই, এভাবে চলতে থাকলে আপনি আরও অসুস্থ হয়ে যাবেন! আপনি অসুস্থ হলে আপনার সন্তানেরা বিপদে পড়বে আম্মা, বাইরে তাকিয়ে দেখুন একবার! হিজ ম্যাজেস্টি সময় হলেই ফিরে আসবেন আম্মা, আপনি সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রাখুন! তাঁর কোনো বিপদ হবে না, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, উনি যেখানেই আছেন ভালো আছেন! শান্ত হোন আম্মা, কিছু খেয়ে নিন, একটু ঘুমান, নিজেকে শান্ত করুন, আমাদের কথা ভেবে হলেও!”
আনাবিয়া ফোঁপাতে ফোপাঁতে তাকালো বাইরে, ঝুম বৃষ্টির কারণে কোনো কিছু দেখতে পাওয়া দুষ্কর, যেন কুয়াশার আবরণে ঢেকে গেছে শিরো মিদোরি! কিন্তু কান্না কমলোনা আনাবিয়ার, কোনো ভাবেই বাঁধা মানতে চাইলো না তার চোখের পানি! ঝরতেই রইলো, ঝরতেই রইলো; কখনো নিঃশব্দে, কখনো বা সারা প্রাসাদে শোকের ছায়া বইয়ে!
বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে আনাবিয়া, মাথাটা হেলে পড়েছে একদিকে। ক্লান্তি, অবসন্নতায় চোখ বুজে আসতে চাইছে তার। এখন আর কাঁদছে না সে, কিন্তু বুকের যন্ত্রণা কমেনি এতটুকু! শুধু পানি ফুরিয়ে গেছে চোখের!
বাহিরে বৃষ্টির ছাট গায়ে লাগায় কোকো জোরজবরদস্তি তুলে কামরায় নিয়ে এসেছে তাকে, ফিলোমেলা বদলে দিয়েছে গায়ের ভেজা পোশাক। কোকো তাদের বলে গিয়েছে এক মুহুর্তের জন্যেও শেহজাদীকে চোখের আড়াল না করতে, এখন তার মানসিক অবস্থা বেসামাল, কখন কি করে বসে তার ইয়ত্তা নেই!
কোকো বাহিরে, লিও কাঞ্জির সাথে আলোচনা চলছে তার। লিও তাকে বলে চলেছে সেদিন রাত থেকে কি কি হয়েছে, কিভাবে কোথায় কোথায় তারা খুঁজেছে হিজ ম্যাজেস্টিকে। কোকো এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আম্মার সাথে ঝগড়া টগড়া কিছু হয়েছিলো? বা কোনো মনোমালিন্য?”
“সেদিন জঙ্গল থেকে ফেরার পর তো কিছুই হয়নি, অন্তত আমার জানামতে না। মহসিন ভালো বলতে পারবে, ওকে ডাকবো?”
কোকো সম্মতি জানালে লিও মহসিনকে ডেকে নিয়ে বসালো ওদের আসরে৷ কোকো জিজ্ঞেস করলো,
“মহসিন, সেদিন জঙ্গল থেকে ফেরার পর আম্মা আর হিজ ম্যাজেস্টি এর ভেতর কোনো অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেছো? মানে কোনো বাকবিতণ্ডা, বা অন্য কোনো কিছু?”
“এমন কিছু তো হয়নি কোকো ভাইজান, জঙ্গল থেকে ফেরার পর শেহজাদীর সাথে হিজ ম্যাজেস্টির প্রায় দেখাই হয়নি বলা যায়। সকালে শেহজাদী ঘুম থেকে ওঠার আগেই হিজ ম্যাজেস্টি বেরিয়ে যেতেন, দুপুরে ফেরেনইনি কিছুদিন। আর রাতে শেহজাদী বেশ কিছুদিন ধরে আগে আগেই ঘুমাচ্ছেন। হিজ ম্যাজেস্টির সাথে তাঁর এক রকম বিচ্ছিন্ন সম্পর্ক চলছিলো, শেহজাদীর জঙ্গলে পালানোর দিনেই কেবল দুজনের ভেতর…. বলা যায় কথাবার্তা বা একটু সংঘর্ষ ধরণের কিছু হয়েছে! লিও ভাইজান তো গেছিলেন গাড়ি নিয়ে আসতে, তিনি ভালো জানেন। হিজ ম্যাজেস্টির চেহারায় অন্য রকম কিছু ছিলো সেদিন, ঠিক স্বাভাবিক নয়।”
লিও তাল মেলালো তার সাথে, বলল,
“হ্যাঁ, এটা সত্যি। হিজ ম্যাজেস্টি যখন আমাকে ফোন দিয়ে বললেন গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে হয়েছে, আমি তো ভয়ে শেষ! গিয়ে দেখি গাড়ির অবস্থা নাজেহাল, ভেঙেচুরে এক শেষ। শেহজাদী ঘুমিয়ে ছিলেন খুব সম্ভবত, হিজ ম্যাজেস্টির চোখে মুখে এক অদ্ভুত ক্ষোভ দেখেছি সেদিন, কেমন এক অদ্ভুত চাহনি ছিলো তার চোখে। মানে….. ঠিক বলে বুঝাতে পারবোনা। জানিনা তাঁর মনে কি চলছিলো কিন্তু যা-ই চলুক সেগুলো ঠিক স্বাভাবিক নয় বলে আমার ধারণা।”
কোকো মাথা চুলকালো, লিও আবার বলল,
“ভাই, খুঁজতে কোথাও বাকি রাখিনি। সব জায়গা খুঁজেছি, কিন্তু হিজ ম্যাজেস্টির কোনো হদিস নেই। মানে একদম গায়েব! কেউ জানেও না, কেউ বের হতেও দেখেনি! আমাকে সেদিন বললেন যে তাঁর একটু কাজ আছে, শেষ করেই প্রাসাদে ফিরবেন। আমি ভেবেছি হয়তো ছোট খাটো কোনো কাজ তাই তাঁর আদেশ মতোই ফিরে এসেছি প্রাসাদে। নিচ তলার গার্ডদের সাথে কথা বলে জেনেছি তিনি ওই রাতে আন্ডারগ্রাউন্ডে গেছিলেন কোনো কাজে। কিন্তু তিনি সেখানেও নেই। অস্ত্রাগারে দেখতে চাইছিলাম, কিন্তু ওর দরজা বাহির থেকেই লক। হিজ ম্যাজেস্টি ভেতরে থাকলে যেমন সাইন দেখায় তেমন কিছুই ছিলো না।”
“জঙ্গল দেখেছিস?”
“হ্যাঁ, জঙ্গল দেখেছি বলতে, সম্ভাব্য জায়গা গুলো সব খুঁজেছি৷ হাইনার সাথেও যোগাযোগ করেছি, যদি কোনো কারণে তিনি অ্যানিম্যাল টাউনে গিয়ে থাকেন, কিন্তু তিনি সেখানেও নেই। হাইনা লোক লাগিয়ে প্রায় সব জায়গা খুঁজিয়েছে, অর্কিড বাগান, ডার্ক ফরেস্ট, ডার্ক প্যালেসের আশপাশ, সব জায়গা। এমনকি অ্যাবিসোরাকে জিজ্ঞেস করেও কিছু পাওয়া যায়নি, তিনি কোথাও নেই!”
লিও ক্ষণিক বিরতি দিয়ে আবার বলল,
“সভাসদদের কাউকেই জানাইনি হিজ ম্যাজেস্টির নিখোঁজের ব্যাপারে, কিন্তু এভাবে আর কতদিন? তারা তো রোজ জিজ্ঞেস করছে, আমি বলেছি তিনি শিরো মিদোরিতে নেই, কোথায় গেছেন জানাননি। তারা এখন প্রশ্ন তুলছে আমি কেন তাঁর পার্সোনাল গার্ড হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সাথে যাইনি, কেন প্রাসাদে আছি? এসব প্রশ্নের উত্তর আমি কিভাবে দিবো?”
কোকো উত্তর দিলোনা কোনো, ভাবতে রইলো চুপচাপ। এমন সময় রয়্যাল ফ্লোরের দরজা খুলে গেলো, রয়্যাল মেম্বার ইন্ডিকেটরে ধ্বনিত হলো ইলহানের নাম। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো ওরা সকলেই। ইলহান দ্রুত পায়ে ঢুকলো ভেতরে। এগিয়ে এসে কোনো সৌজন্য বাক্য ছাড়াই কোকোকে জিজ্ঞেস করলো,
“আমার মেয়ে কোথায়?”
“আম্মা কামরাতেই আছেন, শেহজাদা।”
আনুগত্যের সাথে উত্তর দিলো কোকো। ইলহান ব্যাস্ত পায়ে এগোলো সেদিকে। ওর পেছন পেছন এগোলো কোকোও৷ যাওয়ার আগে মহসিনকে বলল এখুনি খাবার নিয়ে ওর আম্মার কামরায় পৌছে দিতে। মহসিন মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো কিচেনের দিকে৷
ইলহান এগোতে এগোতে কোকোর উদ্দ্যেশ্যে বলল,
“আবহাওয়ার অবস্থা প্রচন্ড খারাপ। শিরো মিদোরিতে তো ঢুকতেই পারছিলাম না, বৃষ্টির পানি টানেলে পৌছে গিয়েছে, প্রায় গোড়ালি ডুবে যাবে এমন পানি। আকাশে মেঘ প্রচুর, আনাবিয়াকে এভাবে রাখা তোমাদের উচিত হয়নি, ওকে সেডেটিভ দিতে হতো। ঘুমিয়ে থাকলে অন্তত কান্না করতো না, কষ্টও কম পেতো।”
“ক্ষমা করবেন, শেহজাদা। আমি গতকালই জেনেছি এ ব্যাপারে। কিন্তু শেহজাদীকে সেডেটিভ দেওয়ার মতো সিন্ধান্ত নেওয়ার স্পর্ধা করতে পারিনি।”
“তুমি এখন আর্মি চিফ কোকো, বাদশাহর অনুপস্থিতিতে দেমিয়ান শেহজাদা বা শেহজাদী সাম্রাজ্যের দায়িত্বের প্রধান কর্তা হলেও তুমি তার পরেই অবস্থান করো। সুতরাং সাম্রাজ্যের ভালোর জন্য যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে তোমাকে প্রস্তুত থাকতে হবে, তা সে যা-ই হোক। তুমি যদি ভেবে থাকো একটি সাম্রাজ্য পরিচালনা করা খুব সহজ কাজ তবে ভুল করছো। ওই পাথুরে সিংহাসনে বসতে হলে বা তার দায়িত্ব নিতে হলে তোমাকে সর্বপ্রথম যে কাজ করতে হবে তা হলো বুকে পাথর চাপা। নইলে ওই সিংহাসন নিজ দায়িত্বে তার উপযুক্ত কাউকে বেছে নিবে।”
কোকো মাথা নিচু করলো, এত বড় কি সে এখনো হয়েছে? যে তার আম্মাকে সেডেটিভ দিয়ে জোর জবরদস্তি করে ঘুম পাড়িয়ে রাখবে? তার কষ্ট গুলোকে চোখের জলের সাথে বের হতে দিবে না? বুক হালকা হতে দিবে না? এতটা কঠিনও কি সে কখনো হতে পারবে তার আম্মার ক্ষেত্রে?
আনমনে সেসব ভাবতেই কোকো শিউরে উঠলো যেন! এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য ফুটে উঠলো তার চোখের সামনে! অসম্ভব, অসম্ভব! সে এত নিষ্ঠুর কিভাবে হবে? কিভাবে জেনে শুনে….. কিন্তু সে কি জেনে শুনে তার আম্মাকে কখনো কষ্ট দেয়নি?
অনেক বছর আগে…. যেদিন হিজ ম্যাজেস্টি তার আম্মার নিষ্কলুষ বক্ষ ছিন্নভিন্ন করে বহির্বিশ্বের উদ্দ্যেশ্যে বেরিয়ে গেছিলেন— সেদিন সব জানা সত্ত্বেও সে কি চুপ থাকেনি? সেও তো সেদিন বুকে পাথর চাপা দিয়েছিলো, তবে কি সে সেদিনই দায়িত্ব নেওয়ার মতো, ধোঁকা দেওয়ার মতো বড় হয়ে গেছিলো?
এমন বড় তো সে হতে চায়নি! সে তো চেয়েছিলো তার আম্মার আচলের তলায় থেকে পেট ভরে সারাজীবন ভাজা মাছ খেয়ে যেতে, খোলসাবৃত পেটে আম্মার পাগলাটে আদর পেতে, আম্মার কোলের পরে মাথা রেখে ঘুমিয়ে যেতে। শেষ রাতে হিজ ম্যাজেস্টির রোষানলে পড়ে মার্বেল পাথরের মেঝেতে আছাড় খেতে!
হয়তো একটু ব্যাথাই লাগতো, কিন্তু সে ব্যাথাতে যে অনাবিল সুখ ছিলো! তখন যে প্রচন্ড সুখে ডুবে ছিলো তার আম্মা, তার স্বঘোষিত পিতা— তার হিজ ম্যাজেস্টি, যাদের সে প্রাণের চাইতেও বেশি ভালোবাসে! কি হতো সারাজীবন অমন ছোট থাকলে, অমন সুখের সময়ে জীবন আঁটকে থাকলে? দায়িত্ব…. দায়িত্ব… দায়িত্ব!
কোকোর বোধ হয় কান্না পেলো, কিন্তু জল জমলো না চোখে। সে যে এখন বড় হয়ে গেছে! তার কি এখন কান্না করা শোভা পায়? সে যে দায়িত্ব নিতে শিখেছে— আর্মি চিফ! বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার!
ইলহান দরজা ঠেলে নরম পায়ে ভেতরে ঢুকলো, আনাবিয়া তার ক্লান্ত আঁখি জোড়া তুলে চাইলো একবার দরজার পানে। ইলহানকে দেখা মাত্রই ঠোঁট ফুলে উঠলো তার, রক্তিম নাকের পাটা ফুলিয়ে ফুলিয়ে কান্না জড়ানো গলায় প্রায় অস্ফুটস্বরে ডেকে উঠলো,
“চাচাজি!”
আনাবিয়ার অসহায় স্বরের সম্বোধন ইলহানের বুকে বাজলো বড্ড! এগিয়ে এসে বিছানায় উঠে বসে আনাবিয়ার মুখখানা ধরে শিউরে ওঠা গলায় বলল,
“এ কি অবস্থা করেছো নিজের? আয়নায় নিজেকে দেখেছো একবার? চোখ মুখ লাল করে ফেলেছো! গায়ে জ্বরও আছে দেখি!”
আনাবিয়ার কপাল স্পর্শ করে শেষোক্ত মন্তব্য করলো ইলহান৷ আনাবিয়া ফুঁপিয়ে উঠে, ক্লান্ত স্বরে বলল,
“আমার মীরি কে খুঁজে দাও চাচাজি, আমি ওকে কোথাও পাচ্ছিনা। ও আমাকে রেখে চলে গেছে! আমি ওকে কোথায় খুঁজবো? বলে দাও তুমি!”
দু গাল বেয়ে ফোটায় ফোটায় মুক্তোর মতোন লোনা জল ঝরে পড়লো তার। ইলহান আলতো হাতে সেটুকু মুছে দিয়ে মোলায়েম স্বরে বলল,
“কান্না কাটি কোরোনা, ওর সময় হলে ও ঠিকই ফিরে আসবে, চিন্তার কিছু নেই। এভাবে কান্না কাটি করলে কি সে ফিরবে? সে কি জানতে পারছে তার বিরহে এদিকে একজন শিরো মিদোরি ডুবিয়ে দিতে চলেছে?”
আনাবিয়া ফুঁপিয়ে উঠলো আবারও। ইলহান ওর হাত জোড়া চেপে ধরে আবার মৃদু স্বরে বলতে শুরু করলো,
“ছোটবেলায় যখন ওর খুব মন খারাপ হতো, ডিপ্রেসড থাকতো, যখন কোথাও মানসিক শান্তি পেতোনা তখন এভাবে উধাও হয়ে যেতো। দাদাজি কে দেখিনি কখনো ওকে নিয়ে চিন্তা করতে, সবাই জানতো ফিরে আসবে। আজ না হোক, আগামীকাল।
সবে তো তিন দিন হয়েছে, তখন কখনো কখনো কয়েক সপ্তাহ গড়াতো, তবুও সে ফিরতো না। তোমার বাবার সাথে মিলে কিমালেব নয়তো ওয়ারদিচার পাহাড়ে চড়ে বেড়াতো, কখনো কখনো রেড জোনের গহীনে জংলী দের মতো অর্ধ-উলঙ্গ হয়ে বনবাসী সাজতো।
হয়তো কোনো দুঃশ্চিন্তায় আছে সে, তার হয়তো নিরবতা প্রয়োজন, সলিটিউড প্রয়োজন, সে হয়তো কিছুদিন সবকিছু থেকে দূরে থাকতে চায়। কান্না থামাও, মাথা পাতলা হলেই আসওয়াদ ফিরে আসবে, চিন্তার কিছু নেই।”
“ওর কেন মন খারাপ থাকবে? ও কেন ডিপ্রেসড থাকবে? আজ পর্যন্ত ও কখনো এমন অদ্ভুত আচরণ করেনি, এভাবে দিনের পর দিন নিরুদ্দেশ থাকেনি! তবে এখন কেন?
ওর নিশ্চয় কিছু হয়েছে, ওর কোনো বিপদ হয়েছে চাচাজি! ও ভালো নেই, একদম ভালো নেই, ওর বোধ হয় খুব যন্ত্রণা হচ্ছে! আমার জন্য হয়েছে সব! আমার ওপর রাগ করে ও চলে গেছে, আমি কষ্ট দিয়েছি ওকে, খুব কষ্ট দিয়েছি ওকে….!”
বলতে বলতে কান্নায় আবারও ভেঙে পড়লো আনাবিয়া। ইলহান অস্থির হয়ে উঠলো, বলল,
“ওর কিছুই হবে না! এই সমগ্র পঞ্চদ্বীপে এমন কিছুই নেই যা ওর জন্য বিপদজনক, যা ওর ক্ষতি বয়ে আনবে! তুমি শান্ত হও আনাবিয়া, নিজেকে দোষী ভেবোনা, এখানে তোমার কোনো হাত নেই। হয়তো ও এমনিতেই ঘুরতে বেরিয়েছে। তোমাকে জানায়নি কারণ…. হয়তো প্রয়োজন মনে করেনি। সে তো আর এখন জানেনা তুমি তার স্ত্রী, জানলে ইনফর্ম করেই যেতো অবশ্যই। তুমি শুধু শুধু চিন্তা করছো!”
আনাবিয়া শান্ত হলো না তবুও, কি এক অজানা আশঙ্কা, এক অদ্ভুত ঝড়তোলা যন্ত্রণা বয়ে চলল তার বক্ষপিঞ্জরের মধ্যিখানে, বারংবার জানিয়ে দিয়ে গেলো ভালো নেই, তার মীরি ভালো নেই!
সকলে মিলে ঘন্টার পর ঘন্টা বোঝালো তাকে, ইলহান আর কোকো মিলে জোরজবরদস্তি করে খাওয়ালো তার প্রিয় খাবার গুলো। খেতে চাইলোনা সে একদম, তবুও তার কোকো, তার লিও, তার কাঞ্জি, তার চাচাজি, তার মহসিন, তার ফিলোমেলা তাকে সেধে সেধে, কত অবুঝ বুঝিয়ে, কত যত্ন করে শেষমেশ খাওয়ালো পেট ভরিয়ে!
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭২
হেকিম এলো, সেডেটিভ দিলো তাকে। ক্লান্তি, অবসন্নতা, বুকের তুখোড় যন্ত্রণা ভুলে ঘুমোলো সে অবশেষে। থেমে গেলো শিরো মিদোরির ঝুম বৃষ্টি, কৃত্তিম মেঘ গুলো মিলিয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ, আলোয় আলোকিত হয়ে উঠলো শিরো মিদোরির সবুজ শরীর, স্বস্তির শ্বাস ছাড়লো সকলে। শুধুই কারো বিধ্বংসী যন্ত্রণার আর্তচিৎকার দীর্ঘশ্বাস হয়ে ভেসে বেড়াতে রইলো লাইফট্রির প্রতিটি শাখা প্রশাখার রন্ধ্রে রন্ধ্রে!
তার কিছুদিন বাদেই এক ভোর বেলা শোকে নিস্তব্ধ দেমিয়ান প্রাসাদের বুকে প্রাণ ফিরিয়ে দিতে তার প্রাণভোমরা ফিরে এলো প্রাসাদে….!
