বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮১
রানী আমিনা
মীর আর আনাবিয়ার মাঝে এখন বলা চলে যোজন যোজন দুরত্ব। সেদিন রাতে তাদের মাঝে যা কিছু বিনিময় হয়েছিলো তাকে কথোপকথন না বলে বরং একটা ছোট খাটো সংঘর্ষই বলা যায়৷ কিন্তু সেদিনের পরই মীর আচমকা যেন কর্পূরের মতো উধাও হয়ে গেলো। প্রথমদিন তার উপস্থিতি অনুভব করতে না পেরে আনাবিয়া দরজার ওপাশ থেকে জিজ্ঞেস করেছিলো মহসিনকে, উত্তরে মহসিন বলেছিলো মীর কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেরিয়েছে, তবে তার গন্তব্য কোথায় সে বিষয়ে সম্পুর্ন অজ্ঞাত।
মীর এরপর প্রায় সপ্তাহ হলো গায়েব। আনাবিয়া বদ্ধ ঘরে একাকী বসে থাকে। পাশের কক্ষে মীরের উপস্থিতি তাকে যেটুকু উষ্ণতা দিত এখন সেটুকুও আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও। চতুর্দিক শীতল, নিঃসঙ্গতায় পরিপূর্ণ!
কি যেন হয়েছে আজকাল তার, কখনো কখনো এই কামরাতে বসেই সে যেন এক অন্য জগতে হারিয়ে যায়, যা সে চেনেনা, কখনো দেখেনি। মনে হয় কারা যেন হাটছে তার চতুর্দিকে, কাদের জানি জীবন বয়ে চলেছে তার কামরা জুড়ে, কাদের সুখময় হাসি জানি ভেসে আসে ওর কানে। কখনো কখনো আচমকা চোখের সম্মুখে ঝলসানো আলো দেখে ও, কখনো বা দেখে সম্পুর্ন কালকূট আঁধার!
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
সে বোধ হয় সত্যিই পাগল হয়ে যাচ্ছে, এই নিঃসঙ্গতা যেন প্রাণঘাতী গরলের মতোন ছড়িয়ে পড়ছে তার শিরায় শিরায়! এক অসহ্য একাকিত্ব ক্ষয় করে দিচ্ছে তাকে তিলে তিলে! কেউ নেই তার কেউ নেই! তার কোলে কেউ নেই; না কোকো, না ফ্যালকন, না লিন্ডা, না ফক্সি; আর না মীর! কেউ নেই তার কাছে! কি যেন এক শূন্যতা, কি যেন এক ফাঁপা অনুভূতির মায়াজালে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গিয়েছে সে, এর থেকে বেরোনোর পথ তার জানা নেই!
দরজায় সজোর করাঘাতে আচমকা হুশ ফেরে আনাবিয়ার, হাঁফাতে থাকে সে। কোথায় যেন চলে গেছিলো, কোন দূর অজানায়। সে বোধ হয় হারিয়ে যাচ্ছে এই জগৎ থেকে, ক্রমে ক্রমে! শূন্যতার অতল বোধ করি শিশুর স্বপ্নে হানা দেওয়া অশরীরীর মতোন হাতছানি দিয়ে ডেকে চলেছে তাকে প্রতিনিয়ত!
বিছানা থেকে নেমে মৃদু, টলটলয়মান পায়ে দরজার নিকট এগোলো আনাবিয়া, দুর্বল স্বরে শুধোলো,
“কে?”
“শেহজাদী, আমি…. ফিলোমেলা।”
“বলো।”
“দুপুরের খাবারের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে শেহজাদী, দরজাটা দয়া করে খুলুন। আপনি অভুক্ত আছেন জানতে পারলে হিজ ম্যাজেস্টি ভয়ানক রাগ করবেন, দয়া করুন শেহজাদী।”
আনাবিয়া বিষণ্ণ হাসলো। এ জগতে তার জন্য আদতে ভাববার মতোন কেউ নেই। সবাই তার সেবা করে ভয়ে, তার যত্ন নেয় ভয়ে, তাকে ভালোবাসে ভয়ে, তার পাশে থাকে ভয়ে; মীরের ভয়ে। নামীর আসওয়াদ দেমিয়ান নামক আতঙ্কে বন্দি হয়ে তারা আনাবিয়ার সেবা যত্নে এতটুকু ত্রুটি রাখতে চায়না! মীর না থাকলে হয়তো এত ভিড় হতোনা তার জীবনে। যে গুটিকয়েক থাকতো তাদের ভালোবাসায় কোনো মেকি ভাব থাকতোনা, সে ভালোবাসা হতো খাঁটি, যার অল্পটুকুও হতে পারতো তার পরম প্রাপ্তি!
এ পৃথিবীতে সম্ভবত মীরই তাকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসে। তার খেয়াল, যত্ন, ভালোবাসা, পাশে থাকার ভেতর কোনো কৃত্তিমতা নেই! সে ভালোবাসে বলেই হয়তো সবাইকে বাধ্য করে তার শিনজোকে ভালোবাসতে! তার হয়তো ধারণা ভীতি জড়ানো এই কৃত্রিম আদর যত্নের ঘেরাটোপে আনাবিয়া ভালো থাকবে!
মীরের এমন ধারণা সমুহের যে অন্ত নেই! নিজের প্রতিটি ধারণাকে বাস্তব রূপ দিতে সে কখনো কোনো খামতি রাখেনি। শৈশব থেকেই সে আনাবিয়ার একমাত্র মুসকিল আসান হয়ে থেকেছে, আর এই অতিনির্ভরশীলতাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে আনাবিয়ার জীবনে!
মানসিকভাবে যেন এক পঙ্গুত্ব বরণ করেছে সে, মীরকে ছাড়া এতটুকু চলতে শেখেনি! খেতে গেলে মীর, পরতে গেলে মীর, ঘুমোতে গেলে মীর; তার শিক্ষা দিক্ষা থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে মীর তার প্রবল আধিপত্য বজায় রেখেছে সর্বদা! আনাবিয়ার নিজস্বতা বলতে এখন আর কিছুই নেই, তার পুরো অস্তিত্বটাই যেন মীরের নিপুণ হাতে গড়া এক পরাধীন সত্তা!
দীর্ঘশ্বাস ফেললো আনাবিয়া, মৃদুস্বরে বলে উঠলো,
“ঠিক আছে, খাবার নিয়ে এসো।”
ফিলোমেলা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। ছুটে গিয়ে ফুড ট্রলিটি নিয়ে এসে রাখলো দরজার সম্মুখে, গিয়ে আবার দাঁড়ালো আড়ালে।
খাবারের মাঝপথে আচমকা দরজায় কষাঘাতের শব্দ হলো আবারও। ওপাশ থেকে ফিলোমেলা বলে উঠলো,
“শেহজাদী, বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা করবেন। মেডিক্যাল জোনের প্রধান হেকিম আপনার সাথে কথা বলতে চান, রয়্যাল ফ্লোরে প্রবেশের অনুমতি চাইছেন।”
আনাবিয়ার হাত থেমে গেলো। বুকের ভেতর কিসের এক অশনি সংকেত দামামা বাজিয়ে চলল মুহুর্মুহু! তড়িঘড়ি নেমে সে ব্যাস্ত পায়ে এগোলো দরজার নিকট, বন্ধ দরজার এপাশ হতেই বলে উঠলো,
“পাঠিয়ে দাও।”
ফিলোমেলার পায়ের আওয়াজ মিলিয়ে গেলো, আনাবিয়া ধুকপুকে বুক নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো দরজার এপাশে। ক্ষণিক পর একটি ভারী পদশব্দ এসে থামলো, ও পাশ হতে ভেসে এলো ইয়াসিরের গলা,
“শেহজাদী, ক্ষমা করবেন। আপনার মধ্যাহ্নভোজে ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য আমি আন্তরিক দুঃখিত।”
“ব্যাপার নয়, বলুন ইয়াসির হেকিম।”
“শেহজাদী, আপনাকে বলবো তবে….. আমার একটা অনুরোধ রাখবেন দয়া করে! আমার আগমনের ব্যাপারে হিজ ম্যাজেস্টিকে কিছু জানাবেন না, উনি জানলে প্রচন্ড রেগে যাবেন।”
“তিনি কিছুই জানবেন না, ইয়াসির হেকিম। আপনি নির্দ্বিধায় বলতে পারেন।”
“শেহজাদী, আপনি হয়তো ইতোমধ্যে জেনেছেন হিজ ম্যাজেস্টি বিগত কয়েক মাস যাবৎ সেভার হেডেকে ভুগছেন, আমরা তার চিকিৎসা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এই হেডেকের কোনো হেতু আমরা এখনো উদ্ধার করতে পারিনি। এটা কোনো সাধারণ মাথাব্যাথা নয়, এর পেছনে বিশেষ কোনো কারণ আছে, কিন্তু আমরা খুঁজে পেতে অপারগ! বেশ কয়েকবার তার এমআরআই করা হয়েছে কিন্তু আমাদের চোখে তেমন কিছুই পড়েনি, কিন্তু….!”
থেমে গেলেন ইয়াসির। আনাবিয়া অস্থির হয়ে উঠলো, শঙ্কিত স্বরে শুধোলো,
“কিন্তু…?”
“শেহজাদী, সম্প্রতি করা মাইক্রো এমআরআই তে আমাদের নিউরোসার্জন টিম হিজ ম্যাজেস্টির মস্তিষ্কে খুবই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু সার্জারির চিহ্ন পেয়েছে। এক্সাক্ট সার্জারী কিনা আমরা নিশ্চিত নই, তবে চিহ্ন গুলো সার্জারীর মতোই। আমি জানিনা এই চিহ্ন কিভাবে এসেছে তার মস্তিষ্কে, বা কি হয়েছে, কখন কিভাবে হয়েছে! কিন্তু এতটুকু ধারণা করতে পারছি এই সার্জারী বা হোয়াটেভার ইট ইজ, এগুলোর কারণেই হিজ ম্যাজেস্টি সেভার হেডেকে ভুগছেন।”
“ইয়াসির হেকিম! এর সমাধান কি? এই যন্ত্রণা থেকে তার কিভাবে নিষ্কৃতি মিলবে? আপনারা কোনো উপায় পেয়েছেন? কোনো ক্লু পেয়েছেন? কোনো মেডিসিন পেয়েছেন?”
অস্থির, উদ্বিগ্ন স্বরে শুধোলো আনাবিয়া। ইয়াসির ব্যাস্ত স্বরে বলে উঠলো,
“শেহজাদী, শান্ত হোন! আমরা চেষ্টা করছি সমাধানের, আমাদের টিম তাদের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছে কোনো উপায় বের করার। কিন্তু শেহজাদী…. যতদিন না আমরা কোনো উপায় বের করছি ততদিন যথাসম্ভব তার এই যন্ত্রণা প্রশমিত করার চেষ্টা করা উচিত, কিন্তু হিজ ম্যাজেস্টি কোনো ভাবেই আমাদের কথা শুনছেন না। তাকে আমরা বার বার বলছি বিশ্রাম নিতে, প্রোপার স্লিপ মেইনটেইন করতে, মানসিক ভাবে প্রশান্ত থাকতে, অতিরিক্ত দুঃশ্চিন্তা না করতে, ছোটাছুটি কম করতে কিন্তু তিনি আমাদের কোনো কথাই মানতে নারাজ!”
আনাবিয়া নির্বাক রইলো, ইয়াসির ক্ষণিক নিরব থেকে বলল,
“শেহজাদী, আপনার কাছে অনুরোধ, আপনি দয়া করে তাকে বাধ্য করুন। তিনি যেন একটু বিশ্রাম করেন, মনকে প্রশান্ত করেন, পর্যাপ্ত ঘুমান! তিনি আমাদের কথা না শুনলেও আপনার কথা ফেলবেন না। এখনি এগুলো সমাধান করে নিয়ন্ত্রণে না নিয়ে এলে পরবর্তীতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কা করছে নিউরোসার্জন টিম। এমনকি…….. তার প্রাণনাশেরও…..! এসবই উনি জানেন, জেনে শুনেও তিনি….. তিনি কারো কথা শুনতে চাইছেন না! দয়া করে তাকে একটু বুঝাবেন, শেহজাদী!”
“ঠিক আছে, আমি খেয়াল রাখবো।”
অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করলো আনাবিয়া, যেন প্রাণপণ চেষ্টায় শব্দগুচ্ছ কয়েক বের হলো তার গলা চিরে। ইয়াসিরের পায়ের আওয়াজ মিলিয়ে গেলো বাইরে। হতভম্ব আনাবিয়া দুর্বল পায়ে অন্ধের মতোন হাতড়ে এসে উঠলো বিছানায়। খাবার গুলো ওভাবেই পড়ে রইলো, আর এতটুকু উঠলোনা তার মুখে। মস্তিষ্ক জুড়ে শুধু প্রতিধ্বনিত হতে রইলো ইয়াসির হেকিমের বলা কথা গুলো!
“মহসিন চাচা, কোথায় আপনি? মহসিন চাচা!”
জোর গলায় তাকে ডাকতে ডাকতে বারান্দা দিয়ে দ্রুত পায়ে এগোলো ফিলোমেলা। মহসিন সবে এক কাপ চা নিয়ে বসেছিলো, সারাদিনে ফাই ফরমায়েশ খাটতে খাটতে তার বৃদ্ধ শরীর আর কুলিয়ে দিচ্ছে না। এই স্বল্প বিশ্রামের ফাঁকেই আবার ফিলোমেলার গলা শুনে একটু বিরক্তই হলো মহসিন। গলা চড়িয়ে বলে উঠলো,
“কি হয়েছে? ষাঁড়ের মতো চিল্লাও কিসের জন্য?”
ফিলোমেলা একটু জিড়িয়ে নিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল,
“শেহজাদী….. শেহজাদী হেরেম থেকে কয়েক জন সুন্দরী দাসীকে নিয়ে যেতে বলেছেন তার কাছে; সুন্দরী, শক্তিশালী, লম্বাচওড়া। যেন একদম চোখ ধাধানো সুন্দরী হয়!”
“এহ্! কেন? তাদের দিয়ে শেহজাদী কি করবেন কিছু বলেছেন? ফিলোমেলা, তুমি কি দায়িত্বে কোনো অবহেলা করেছো? শেহজাদী রেগে যান এমন কিছু করেছো?”
চায়ের কাপ সজোরে রেখে রাগান্বিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো মহসিন। এই মেয়েকে সে কত খুটিয়ে খুটিয়ে তবেই শেহজাদীর জন্য বাছাই করেছিলো। এখন যদি এই মেয়ে কোনো ভুল করে বসে তবে হিজ ম্যাজেস্টির কাছে তাকেই জবাবদিহি করতে হবে!
মহসিনের বিকৃত মুখ দেখে ফিলোমেলা তড়িঘড়ি কানে হাত দিয়ে অসহায় স্বরে বলল,
“কসম আমি কিছু করিনি! শেহজাদী যখন যা বলেছেন, যেভাবে বলেছেন আমি সেভাবে করেছি! আর আমি ভুল করলেও তিনি কিছুই বলেন না, আমাকে সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে বলেন। আর আমাকে বদলাতে চাইলেও তিনি অতগুলো দাসী কেন চাইবেন? একজনকেই চাইতেন! আর, কাজের জন্য সুন্দরীও বা হতে হবে কেন? উনি নিশ্চয় কর্মে নিপুণা দাসী চাইতেন!”
মহসিনের মনে ধরলো কথা গুলো। সে ব্যাস্ত ভঙ্গিতে উঠে ফিলোমেলাকে নিয়েই এগোলো হেরেমের দিকে।
আজ অনেক দিন বাদে কামরা থেকে বের হলো আনাবিয়া, দাঁড়ালো বারান্দার রেলিং ঘেঁষে। পড়ন্ত বিকেলের কমলা রোদ এসে পড়লো তার চোখে, চোখ কুচকে বন্ধ করে নিলো সে তৎক্ষনাৎ। শুভ্র মুখে সূর্যের আলো যেন প্রতিফলিত হলো, ঝকমক করে উঠলো প্রাসাদের শ্বেতপাথরের দেয়াল, মেঝে! ঝিকিমিকি আলো ছড়াতে রইলো তার শুভ্র চুল। পরণের পাতলা পোশাক ভেদ করে সূর্যালোক পৌঁছে গেলো তার শরীরের প্রতিটি ভাজে। বন্ধ চোখে কিছুক্ষণ সূর্যের নরম আলোর স্নিগ্ধ উত্তাপ উপভোগ করলো সে৷ আবার কবে কামরা থেকে বের হবে তার ইয়ত্তা নেই; হয়তো হবেই না।
বারান্দার নকশাদার দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ানো দাসী গুলো তখন আশ্চর্য চোখে চেয়ে আনাবিয়ার দিকে, চোখে এক রাশ মুগ্ধতা, বিস্ময়ে আলগা হয়ে এসেছে অধর। যেন সম্মুখে কোন অষ্টমাশ্চর্য দাঁড়িয়ে আছে, রূপকথার চাঁদের দেশের রাজকন্যার মতোন টিকরে পড়ছে যার রূপ, ঠিক যেন মাঝ সমুদ্রের তলদেশে বসবাসকারী সাইরেনের প্রাণনাশী সৌন্দর্য!
মহসিন আর ফিলোমেলা মিলে নিঃশব্দ ধমকে ধাতস্থ করলো তাদের, বার বার করে সাবধান করলো মাথা তুলে না চাইতে। অসাড়তা কাটিয়ে দ্রুতই তাদের সাবধানতা অনুসরণ করলো মেয়েগুলো, আনত চোখে চেয়ে রইলো মেঝের দিকে।
রোদ মাখা শেষে এগিয়ে এলো আনাবিয়া, পূর্বের তুলনায় একটু বেশিই ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে তাকে, ঠোঁট জোড়া টকটকে, হীরকখণ্ডের ন্যায় চোখ জোড়ার ঝলকানি প্রখর। খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে রইলো সে মেয়েগুলোকে, কে বেশি সুন্দরী, কার আবেদনময়তা বেশি, কার শরীরি সৌন্দর্য মনকাড়া!
গত কয়েকদিনে তার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে সে মেনে নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, সবাই অনেক ভালো থাকবে, সব পূর্বের নিয়মে পূর্বের মতোন ভালোভাবে চলবে, কোথাও আর কোনো অসঙ্গতি থাকবেনা। এসব অনাচারের সৃষ্টি তো তার জন্যই হয়েছে! তার কারণেই তো শুরু হয়েছিলো সব, তার গর্ভধারণের কারণে। সেই প্রথমেই যদি জেদ না ধরে সব মেনে নিতো, প্রথমেই যদি মীরকে অন্য কারো হাতে তুলে দিতো তবেই ভালো হতো! তার এই মাত্রাতিরিক্ত অধিকার বোধই ধ্বংস করছে তাকে, এই সাম্রাজ্যকে, ভবিষ্যৎকে, মীরকে!
কি প্রয়োজন!
এই সামান্য জীবনে অন্যের ক্ষতির কারণ হয়ে উপকার কি? আজ সে বাধা দিবে, কাল সে বাধা দিবে, পরশুও না হয় দিবে; তারপর? তারপর কি? কতদিন বাধা দিবে? যার যাওয়ার সে তো যাবেই! বনের পাখিকে সোনার খাঁচায় পুরে রাখলেও যে তাকে পোষ মানানো যাবেনা! সে তো সুযোগ পেলেই উড়ে যাবে, ফিরে যাবে তার বনে! তবে কি প্রয়োজন?
ভালো হয় খাঁচাই ভেঙে ফেলা!
দুঃখ ঘুচে যাবে সবার, আগের মতো হাসিখুশি থাকবে সকলে। সব কিছু আবার ফিরে আসবে নিয়মে, মীর হয়তো তখন অনেক উৎফুল্ল থাকবে। তার সন্তান সন্ততিরা মাতিয়ে বেড়াবে এ প্রাসাদ, আর সন্তানের মায়েরা বিকেল পড়লে এ বারন্দার কিনারে এসে দাঁড়াবে। হয়তো রেষারেষি থাকবে প্রচন্ড রকম, কিন্তু সংঘর্ষের স্পর্ধা করবেনা, মীরের ভয়ে!
মৃদু হাসলো আনাবিয়া। একটি দাসীকে বেশ মনে ধরলো তার, তাকে রেখে বাকিদের ফেরত পাঠালো। মহসিনকে শুধোলো,
“তিনি কোথায় আছেন?”
“শেহজাদী, হিজ ম্যাজেস্টি মিটিং রুমে আছেন।”
“রাতে ফিরবেন?”
“নিশ্চিত নই শেহজাদী, তবে ফিরবেন হয়তো।”
আনাবিয়া ফিলোমেলাকে বলল দাসীটিকে ভালোভাবে গোসল দেওয়াতে। ফিলোমেলা নিয়ে গেলো মেয়েটিকে, দাসীটি পুতুলের মতোন অনুসরণ করলো তাকে। এখনো জানতে পারেনি ঠিক কি উদ্দ্যেশ্যে নিয়ে আসা হয়েছে তাকে, ঠিক কোন কারণে এত নিখুঁতভাবে যাচাই করা হলো তাকে!
সন্ধ্যা নামলে ফিলোমেলা আবার নিয়ে এলো মেয়েটিকে। আনাবিয়া আরেকবার ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলো। খারাপ নয়, মীরের মন ভরবে অবশ্যই।
ক্লজেট থেকে অফ হোয়াইটের বল গাউনটি বের করলো আনাবিয়া। পোশাকটির সাথে সাথে তাজা হয়ে উঠলো কিছু স্মৃতি! মীরের সাথে কাটানো তার শেষ অ্যানিভার্সারিতে এই পোশাকটিই পরেছিলো সে, মীর দিয়েছিলো তাকে। সাথে একটা মিষ্টি চিরকুট। এখনো চিরকুট খানা বোধ হয় লুকোনো আছে তার ডায়েরির ভাজে। অন্য সময় হলে আনাবিয়া হয়তো এতক্ষণে বসে যেতো মীরের সবগুলো চিরকুট পড়তে, পুরোনো দিন গুলোকে স্মরণ করতে। কিন্তু এখন আর ইচ্ছে হয়না তার, শুধু শুধু পুরোনো কথা মনে করে ক্ষত বাড়ানোর অর্থ হয়না!
পোশাকটি নিয়ে এসে ফিলোমেলাকে দিলো আনাবিয়া। ফিলোমেলা সময় নিয়ে সফেদ পোশাকটি পরালো মেয়েটিকে। শুভ্র পোশাকের জাদুতেই যেন মেয়েটির সৌন্দর্য বেড়ে গেলো কয়েকগুণ। আনাবিয়ার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি দেখা দিলো, ঠিক কেন হাসলো তা বোধ করি সে নিজেও ঠাহর করতে পারলো না।
এরপর একে একে সে বের করলো নিজের আজন্মলালিত গহনা গুলো। অফ হোয়াইটের সাথে মানানসই প্রতিটি অলঙ্কার একে একে সাজিয়ে রাখলো ডেস্কে। প্রসাধন সামগ্রী বের করে ফিলোমেলার সাহায্যে মেয়েটিকে সে সাজালো ঠিক তার বিবাহবার্ষিকীর দিনের মতোন, দূরে দাঁড়িয়ে সে বারংবার দেখতে রইলো মেয়েটিকে।
একে একে মেয়েটির গায়ে চড়লো মীরের উপহার সামগ্রী গুলো, তারই পছন্দের হীরের গহনা, তারই পছন্দের লিপস্টিক শেড, তারই পছন্দের আইশ্যাডো, তারই পছন্দের কাজল।
আনাবিয়ার কেন যেন দুঃখ লাগলোনা, বুকে আজ ব্যাথা লাগলোনা, কোনো অনুভূতিই হলোনা। সকলের অগোচরে একবার নিজের হাতে একটা চিমটি কাটলো সে, নিশ্চিত হওয়ার জন্য আদতেই সে সজ্ঞানে আছে কিনা!
নাকি সে আর এ পৃথিবীতে নেই, অনেক আগেই হয়তো প্রাণত্যাগ হয়েছে তার। নইলে এতসবের পরেও তার কোনো অনুভূতি হচ্ছেনা কেন?
কিন্তু চিমটিতে ব্যাথা পেলো আনাবিয়া, শিউরে উঠলো অস্ফুটস্বরে। বুজতে পেলো মন মরে গেছে তার, দেহ টা বেঁচে আছে বাধ্য হয়ে, তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে জোর করে!
মেয়েটির সাজানো শেষ হলো, আনাবিয়া ফিলোমেলাকে আদেশ দিলো মেয়েটিকে মীরের কামরায় রেখে আসতে, তাকে শিখিয়ে দিতে সব নিয়ম কানুন, সব আদেশ নিষেধ!
ফিলোমেলা কিয়ৎক্ষণ অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে রইলো আনাবিয়ার দিকে। এতক্ষণ যাবৎ এক অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে সে সাজিয়েছে মেয়েটিকে, হঠাৎ শেহজাদীর এমন আদেশের কারণ বোধগম্য না হলেও একটু আঁচ করতে পেরেছিলো যেন! কিন্তু এই মুহুর্তে নিজের কানকে বিশ্বাস করতেও কষ্ট হলো তার।
তাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আনাবিয়া ধমকালো, কঠিন গলায় বলে উঠলো,
“তোমাকে যেতে বলেছি ফিলোমেলা। যা করতে বলেছি করো, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকোনা।”
ফিলোমেলা উচ্চবাচ্য করলোনা, কেবল সাজানো মেয়েটিকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো তৎক্ষনাৎ। ভীষণ সুন্দর লাগছে মেয়েটিকে, ফিলোমেলা নিজেই সরাতে পারছেনা দৃষ্টি। মেয়েটিকে বারান্দাতেই দাঁড় করিয়ে রেখেই সে ছুটলো মহসিনকে ডাকতে। মহসিনকে পাওয়া গেলো কিচেনে, সব খুলে বলতেই মহসিন বিস্ময়ে হতবাক হলো। ব্যাস্ত ভঙ্গিতে ফিলোমেলার পেছন পেছন সেও এলো মেয়েটির কাছে।
মেয়েটি ভয় পাচ্ছে। এতক্ষণে বোধ করি বুঝতে পেরেছে কেন নিয়ে আসা হয়েছে তাকে। একা দাঁড়িয়ে খোঁজার চেষ্টা করছে দিশা! ফিলোমেলা মহসিকে নিয়ে আসতেই মহসিন মেয়েটিকে দেখে চমকালো প্রথমটায়। এই পোশাক, এই গহনা, এই সাজ সে আগেও দেখেছে, কিন্তু ঠিক কোথায় স্মরণে আসছে না।
কিন্তু মেয়েটিকে যে অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছে। স্নিগ্ধ, মনোরম! চাপা স্বরে ভীতসন্ত্রস্ত মেয়েটিকে সে অভয় দিলো, বলল,
“ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই, সব ঠিক আছে। তুমি কিছুক্ষণ এখানে অপেক্ষা করো আমি ফিলোমেলার সাথে একটু কথা বলে আসছি।”
ফিলোমেলাকে টেনে নিয়ে গেলো সে অন্যদিকে, চাপা স্বরে শুধোলো,
“সত্যিই শেহজাদী বলেছেন এমন কথা?”
“আমি কি মিথ্যা বলছি বলে মনে হচ্ছে? বিশ্বাস না হলে শেহজাদীকেই জিজ্ঞেস করে আসুন!”
ফিলোমেলা রেগেই বলল। মহসিন দমে গেলো কিঞ্চিৎ, শেহজাদীকে গিয়ে জিজ্ঞেস করার মতোন স্পর্ধা নেই তার। বলল,
“ঠিক আছে, পরে কিছু হলে কিন্তু আমি কিছু জানিনা। আমি এসবে নেই, কিছু শুনিওনি। তুমি এসে যা বলেছো তাই।”
“ঠিক আছে, কোনো দ্বিধা থাকলে শেহজাদীর থেকে শুনে আসুন আবার। তিনি নিজেই বলেছেন মেয়েটিকে সব নিয়ম কানুন শিখিয়ে হিজ ম্যাজেস্টির কামরায় রেখে আসতে, তার সেবার জন্য!”
মহসিন এবার একটু নিশ্চিত হলো। দুজনে মিলে মেয়েটিকে সময় নিয়ে শেখালো কি করতে হবে তাকে, কি করা যাবেনা ভুলেও। মেয়েটি ভয়ে ভয়ে শুনলো সব, ক্রমে ক্রমে বুকের ভেতর ভীতির সাথে সাথে তৈরি হলো এক অদ্ভুত উত্তেজনা, এক অদ্ভুত আনন্দ স্ফুরিত হলো তার মন মস্তিষ্ক জুড়ে!
মধ্যরাত।
খসখস শব্দে কাগজে কিছু লিখে চলেছে মীর। সভাসদগণ মিটিং রুম ত্যাগ করেছেন অনেক আগেই, কিন্তু মীর এখনো চেয়ার ছাড়েনি। গুরুগম্ভীর মুখে, মনোযোগী চোখে সে লিখে চলেছে কিছু। জায়ান সাদি পাশেই বসে, অন্যরা বেরিয়ে গেলেও সে এখনো প্রস্থান করেনি। মীর মিটিং রুম ত্যাগ না করা পর্যন্ত সে কখনো করেনা, করেনি আজ পর্যন্ত।
মীরের দেহরক্ষী দুজন ঘড়ি দেখলো। দুজন চোখাচোখি করতেই একজন এগিয়ে এসে নত মুখে বলে উঠলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আপনার ঘুমানোর সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।”
“যেতে থাকুক।”
গমগমে স্বরে বলে উঠলো মীর। দেহরক্ষীটি দ্বিতীয় কথা বলার সাহস করলোনা। আবার গিয়ে দাড়ালো নিজের স্থানে।
জায়ান ওদের দিকে চেয়ে ফোস করে শ্বাস ছাড়লো একটা। মীরের বিপরীতের চেয়ারে বসে সে, মীরের সম্পুর্ন মনোযোগ এই মুহুর্তে টেবিলের কাগজ পত্রের দিকে, জায়ানের দিকে ফেরার মতোন সময় নেই। জায়ান গলা খাকারি দিলো এমন সময়ে, শুধলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, কৌতুহলের জন্য ক্ষমা করবেন, কিন্তু আপনি এগুলো এভাবে কেন লিখছেন? মানে…. আমি বলতে চাইছি আপনি কার জন্য এসব লিখে রেখে যাচ্ছেন?
“ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, জায়ান ভাইজান।
আমি জানিনা তারা আমাকে কতটা শুনবে, বা আমাকে কতটুকু মানবে, আমার আদর্শের কতটুকু শিরোধার্য করবে; তবুও আমি একটা শেষ চেষ্টা করতে চাইছি। হাতে সময় সীমিত; হয়তো বড়জোর ফিফটি ইয়ার্স। এ সময়ের ভেতর যদি আমার সন্তান পৃথিবীতে আসে তবে এই সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য, এর ভার বইবার জন্য যথেষ্ট পরিপক্বতা তার থাকা চাই। আমি জাস্ট তার জন্য একটা রোডম্যাপ রেখে যেতে চাই, যদি ব্যাক্তিগতভাবে তাকে গড়ে তোলার জন্য ইনাফ টাইম না পাই তবে আমার রেখে যাওয়া এই রোডম্যাপই তাকে পথ দেখাবে৷”
মীর হাত চালালো। আপন মনেই বলে উঠলো,
“এটা স্রেফ একটা খসড়া। অনেক কাজ এখনো বাকি। আস্তে ধীরে করে ফেলবো। পরিস্থিতি যাই হোক এই সাম্রাজ্যকে সবদিক থেকে সিকিউর করে তবেই আমাকে যেতে হবে।”
জায়ান চুপ করে রইলো, কি হচ্ছে আজকাল সে বুঝতে পারছে না! হিজ ম্যাজেস্টি মরিয়া হয়ে উঠেছেন, যাবতীয় আইন কানুন তিনি নতুন করে লিখতে শুরু করেছেন! যেগুলো অদূর ভবিষ্যতে পরিবর্তন করা প্রয়োজন সেগুলো ঠিক কেমন কেমন ধারায় পরিবর্তন করা চলে, কোন স্থানে কোন আইনে চলবে, কোথায় কি আছে, কোথায় কি প্রয়োজন; সবই তিনি লিখছেন, খুটে খুটে লিখছেন, বিরামহীন!
জায়ান আচমকা জিজ্ঞেস করলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, শেহজাদীর জন্য কি ভেবেছেন?”
এ প্রশ্নে মীর হাসলো মৃদু। লেখা থামিয়ে বলল,
“এখনো কিছুই না… ভাইজান।
তবে সে অবশ্যই ভালো থাকবে, তাকে ভালোবাসবে বা ভালো রাখবে এমন মানুষ অনেক আছে, তাই চিন্তা নেই। বরং…. আমি আছি বলেই সে ভালো নেই। আমার জন্য তার একটা স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছে। অ্যান্ড আ’ম গিল্টি ফ’ দ্যাট। আমি যখন থাকবোনা তখন সে ভ্যাস্ট ফ্রিডম পাবে, যা সে এতদিন চেয়েছিলো। তবে আমি চেষ্টা করবো তারজন্য কিছু করে যাবার, যেন সে ভালো থাকে, খুশি থাকে। এখনো ভাবিনি কি করবো, তবে করবো।”
হাত চালালো মীর আবারও। জায়ান বসে রইলো সেদিকে চেয়ে। ডাক্তার গুলো শত চেষ্টা করে চলেছে তাকে সম্পুর্ন সুস্থ করে তোলার, অথচ তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই সেদিকে! নিজের মনের মতো চলছে, চাতকের ন্যায় ছুটছে সর্বত্র! কিসের টানে, কিসের উদ্দ্যেশ্যে ছুটছে জানেনা জায়ান! এত কিছু বলে, এত কিছু করেও তাকে এই পরিশ্রম থেকে দমিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছেনা, হয়তো সম্ভব হবেও না। কে করবে সম্ভব? কে বাধ্য করবে তাকে? কে তাকে বাগে এনে আবার বসিয়ে দিবে তার আরামদায়ক স্থানে?
মীর লেখা শেষ করেই উঠে দাঁড়ালো আচমকা। চোখ জোড়া রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে! মিটিং রুম ছেড়ে বেরিয়ে যেতে যেতে সে দেহরক্ষী দের একজনের উদ্দ্যেশ্যে বলে উঠলো,
“দুটো হাই পাওয়ার স্লিপিং পিল।”
ছেলেটি আনুগত্য জানিয়ে তৎক্ষনাৎ এগোলো মেডিক্যাল জোনের দিকে। অন্যজন এগোলো মীরের পেছন পেছন।
রয়্যাল ফ্লোরে পা রাখতেই আজ তুলনামূলক নিস্তব্ধ ঠেকলো মীরের কাছে। এগোতে এগোতে বারান্দা চত্তরে এসে মুখোমুখি হলো মহসিন আর ফিলোমেলার। দুজনেরই চোখে অস্বস্তি, ভীতি। মীর মন দিলোনা সেদিকে, ঘুম প্রয়োজন তার! যেতে যেতে শুধু জিজ্ঞেস করলো,
“বাঘিনী খেয়েছে?”
ফিলোমেলা আঁতকে উঠলো! এত সবের মাঝে শেহজাদীর খাবারের কথা সে ভুলেই গেছে, কেউ তাকে বলেনি! শেহজাদীও একটিবারের জন্য বলেনি খাবারের কথা! আতঙ্কিত হয়ে উঠলো ফিলোমেলা, গা ঘামতে শুরু করলো তার, ঢোক গিলতে রইলো ঘন ঘন!
মহসিন ভীত চোখে একবার তাকালো তার শুকিয়ে যাওয়া মুখের দিকে। রাতের খাবার দেওয়া হয়নি শেহজাদীকে, কেউ স্মরণ করিয়েও দেয়নি তাকে! কামরার দাসীটির কি হতে চলেছে, আর তার সাথে তাদের দুজনেরই বা কি হতে চলেছে এ চিন্তায় মাথা থেকে সম্পুর্ন বেরিয়ে গেছে তা। কিন্তু এখন…?
উত্তর না পেয়ে আচমকা থেমে গেলো মীর, তাকালো ফিলোমেলার দিকে। তার শকুনি চোখের প্রখর দৃষ্টি বিধলো ফিলোমেলার মুখপরে! ফিলোমেলার বুক কেঁপে উঠলো, গলা শুকিয়ে এলো মুহুর্তেই, বেড়ে গেলো শ্বাসের গতি, আতঙ্কে মাথার ভেতর ঘুরতে শুরু করলো তার। অস্ফুটস্বরে কোনো রকমে বলে উঠলো,
“ই-ই-ই-ইয়োর ম্যাজেস্টি, ভ্-ভ্-ভুলে গেছি। আম্-আম্- আমি এখুনি……!
বাক্যটা শেষ করতে পারলোনা ফিলোমেলা তার পূর্বেই অতিরিক্ত ভয়ে জ্ঞান হারালো সে। মহসিন আতঙ্কে নিশ্চল হয়ে গেলো, বার বার ঢোক গিলতে রইলো। আচমকা টের পেলো কাঁপছে সে, ঘেমে উঠছে তার কপাল, এই বুঝি গড়িয়ে পড়লো!
মীর এগিয়ে এলো তার দিকে। মহসিনের দম আঁটকে এলো যেন, মনে হলো এখুনি ওই স্বর্ণাভ শকুনি চোখের তীব্র চাহনিতে ভস্ম হয়ে যাবে সে৷ তখনি মীর গমগমে, ভারী স্বরে বলে উঠলো,
“আমার শিনজোকে ধন্যবাদ দাও মহসিন। নেহাত সে তোমাদের পছন্দ করে! এই ভুল যদি দ্বিতীয় বার হয়, তা সে যেদিনই হোক, সেদিন তোমাদের দুজনকেই আমি মাটিতে মিশিয়ে দিবো!”
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮০
দাঁতে দাঁত পিষলো সে, স্পষ্ট দৃষ্টি গোচর হলো তা বাহির থেকেও। মহসিন দাঁড়িয়ে রইলো জবুথবু হয়ে, পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে আছে ফিলোমেলা।
মীর এগোলো নিজের কামরার দিকে। মহসিন দ্রুত বেগে উঠিয়ে নিলো জ্ঞানহীন ফিলোমেলাকে, অতঃপর প্রাণপণে ছুটে পালালো কোনো নিরাপদ স্থানে! যেন আসন্ন বিপদের রেশ কেটে যায় একটু হলেও……
