বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৯
রানী আমিনা
এক্সপোজার এরিয়ার কিনারে নিয়ে গিয়ে মীরকে একপ্রকার ছুড়ে বাইরে ফেলে দিল আনাবিয়া, পরক্ষণেই ঘুরে এগোলো ক্রেনটির দিকে। মীর তৎক্ষণাৎ উঠে পড়লো আবার, ক্ষিপ্র বেগে এসে আকড়ে ধরলো আনাবিয়ার কোমর, টেনে নিয়ে চলে যেতে চাইলো পেছনে। সর্বশক্তি দিয়ে আনাবিয়াকে টেনে নিয়ে চলল সে, একবার সুযোগ পেলেই আনাবিয়াকে নিয়ে এ জায়গা ছেড়ে উড়াল দিবে সে!
কিন্তু সেই মুহুর্তেই দ্বিতীয় বার গর্জে উঠল আনাবিয়া, আচমকা দুহাতে পেছন থেকে মীরের কাঁধ খামচে ধরে হ্যাচকা টানে মীরকে একপ্রকার শূণ্যে ঘুরিয়ে সমুদ্রের কিনারে থাকা শক্ত, ক্ষুরধার পাথরের ওপর সজোরে আছাড় মারলো সে! মুহুর্তেই চিড় ধরলো মীরের কপাল, হাত জুড়ে, ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এলো তাজা রক্ত! চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে এলো সবকিছু, তবুও হাল ছাড়লোনা সে।
আনাবিয়া চরম ক্রোধে, তাচ্ছিল্যভরে এগিয়ে গেলো তাকে পেছনে ফেলে রেখে। মীর উঠে দাঁড়াতে চাইল একবার, কিন্তু ব্যর্থ হল। কপালের কিনার থেকে ঝরা রক্তের গতি বেড়ে চলল, প্রায় শরীর ঘষিয়ে নেমে এলো সে নিজ রক্তে রঞ্জিত পাথরখন্ডটির ওপর থেকে, বালুর ওপর দিয়ে নিজেকে প্রায় টানতে টানতে নিয়ে চলল সে আনাবিয়ার পেছন পেছন।
কোকো ছুটে এলো দূর থেকে কিন্তু সে পৌছবার আগেই মীর আবার ঢুকে পড়লো এক্সপোজার এরিয়ার ভেতর! নিজেকে টেনে হিচড়ে নিয়ে পৌছে গেলো সে আনাবিয়ার পায়ের নিকট, এক হাতে শরীরের বেঁচে থাকা শক্তিটুকু ঢেলে সে আচমকা সজোরে জাপটে ধরলো আনাবিয়ার ডানপা! কিন্তু থামানো গেলোনা আনাবিয়াকে, মীরকে পায়ের সাথে টানতে টানতেই এগিয়ে চলল সে সামনের দিকে।
মীর জোর দিল আরও, প্রাণপণ চেষ্টায় দ্বিতীয় হাতখানাও কাজে লাগাল আনাবিয়ার একটি পা কে নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসার জন্য। সজোরে চেপে ধরলো যেন আর একটুও এগোতে না পারে আনাবিয়া। কিন্তু পরবর্তী পদক্ষেপ ফেলতে গিয়ে পায়ের অসাড়তা টের পেয়েই আনাবিয়া তাকাল নিজের পায়ের দিকে। পূর্বের পুরুষটিকেই আবার নিজের পথে বাঁধা হতে দেখে ঘুরে দাঁড়াল আবার, আচমকা দাঁতে দাঁত চেপে এক ভয়াল গর্জন দিয়ে বা’পা খানা দিয়ে এক সজোর আঘাত হানলো সে মীরের মুখ বরাবর!
মুহুর্তেই মীর ছিটকে গেলো অন্যদিকে, আলগা হয়ে গেলো তার শক্ত আলিঙ্গন। ক্ষণিক পূর্বের ক্ষতের ওপর দ্বিতীয় বার আঘাত পড়ে মুহুর্তেই ক্ষতবিক্ষত হল তার মুখ! গলগলিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করল তা থেকে। আনাবিয়া এবার আর দয়া দেখাল না। মাটিতে মুখ থুবড়ে ঝপসা দৃষ্টিতে তাকে দেখতে থাকা মীরের নিকট এগিয়ে গিয়ে আচমকা এক সজোর আঘাত হানলো তার অসাড় হয়ে আসা বলিষ্ট হাতের ওপর। পায়ের এক আঘাতেই বালু ভেদ করে মাটির ভেতরে সবেগে দেবে গেলো মীরের হাতখানা!
হিংস্র, কঠোর চোখে একবার মীরের রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত মুখে চেয়ে আনাবিয়া এগিয়ে গেলো আবার ক্রেনটির দিকে। মীর ঝাপসা হয়ে যাওয়া রক্তাক্ত দৃষ্টিতে দেখলো তার চলে যাওয়া। ভ্রুর ওপর দিয়ে গড়িয়ে, পাপড়ি ভেদ করে রক্ত চুইয়ে পড়তে রইল তার চোখের ভেতর। তবুও এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সে আনাবিয়ার যাওয়ার পানে, প্রাণপণ চেষ্টা করতে রইল নিজের শরীর এতটুকু নাড়ানোর, কিন্তু মাথায় লাগা আঘাতটি কোনোক্রমেই উঠতে দিল না তাকে!
আনাবিয়া এগিয়ে গেলো ক্রেনের দিকে, ঠিক যে স্থানে ভেঙে পড়েছিলো কন্টেইনারটি। সেখানে দাঁড়াতেই হঠাৎ বিদ্যুৎ বেগে দৃশ্যমান হয়ে উঠল গামা রশ্মি গুলো। আচমকাই গাঁঢ় বেগুনি রঙা আলোক বিন্দুতে চেয়ে গেলো চতুর্দিক। এক্সপোজার এরিয়ার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কোকোর সম্মুখে পড়ে গেলো এক গভীর বেগুনী পর্দা, ভেতরের কি হয়ে চলেছে দেখতে ব্যর্থ হল সে৷ আশাহত হয়ে বসে পড়লো সেখানেই৷
ঝাপসা চোখে, বালুর ভেতর মুখথুবড়ে পড়ে একটু একটু করে শরীর টেনে আনাবিয়ার দিকে যেতে থাকা মীর হঠাৎই খেই হারিয়ে ফেললো এই অদ্ভুত বেগুনি দ্যুতির ঝলকে। তবুও অনুমানের ভিত্তিতে হাতড়ে হাতড়ে এগিয়ে চলল সে সামনের দিকে।
আনাবিয়া এক্সপোজার এরিয়ার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে নিজের ঝলসানো দৃষ্টি দিয়ে একবার পর্যবেক্ষণ করলো চতুর্দিক। পরক্ষণেই নীলচে বেগুনি রঙা আলোক বিন্দুর ভেতর দুহাত বাড়িয়ে দিল সে দুদিকে। পরমুহূর্তেই তার কন্ঠ হতে বেরিয়ে এলো এক সুমধুর, মোনহর সুর। সে সুরের মূর্ছনায় আচমকা নীলচে বেগুনি আভা গুলো একে একে এগিয়ে আসতে রইল তার দিকে।
ক্রমে বাড়লো তার কণ্ঠনিঃসৃত মোহনীয় সুরের তেজ, সেই সাথে বাড়লো তার দিকে ধেয়ে আসতে থাকা বেগুনি রঙা দ্যুতি গুলোর বেগ, সবেগে সেগুলো ধাবিত হল তার দিকে! আলোক বিন্দু গুলো যেন মরিয়া হয়ে ছুটলো তার পানে, কোন এক অমোঘ আকর্ষণে উন্মাদ হয়ে উঠল যেন সকলে!
সকল আলোক বিন্দু গুলো অকস্মাৎ একত্রিত হয়ে বিধ্বংসী ঘূর্ণির ন্যায় ঝোড়ো বেগে ঘুরপাক খেতে রইলো আনাবিয়ার চতুর্দিক জুড়ে৷ আর তারপর হঠাৎই আনাবিয়ার কণ্ঠনিঃসৃত এক বিকট, জোরালো সুরে সেগুলো বিদ্যুৎ বেগে এক বিরাট ঝলসানো গোলকে পরিণত হয়ে আচমকা ঢুকে যেতে রইলো আনাবিয়ার শরীরের ভেতর! যেন এক অদৃশ্য শক্তি চুম্বকের মত টেনে নিতে রইলো তাদেরকে!
তীব্র রেডিয়েশনের আক্রমণে অকস্মাৎ জ্ঞান ফিরলো আনাবিয়ার, পরমুহূর্তেই তার সুরেলা কন্ঠ পরিণত হলো এক বিভীষিকাময় আর্তনাদে! এক বিধ্বংসী, অসহ্য যন্ত্রণা মুহুর্তেই গ্রাস করলো তাকে, গামারশ্মির প্রচন্ড তীব্রতায় আচমকা গগনবিদারী এক চিৎকার দিয়ে উঠল আনাবিয়া।
মীর নিজের শরীরের সমস্ত যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে প্রাণপণ চেষ্টায় উঠে দাঁড়াল, এক হাতে কপালের গভীর ক্ষতটিকে চেপে ধরে ছুটলো সে আনাবিয়ার দিকে! গামারশ্মি গুলো লক্ষ সূচের রূপ নিয়ে সবেগে ঢুকে যেতে রইলো আনাবিয়ার শরীরের প্রতি পরতে পরতে। রশ্মি গুলোর শেষ বিন্দুটি পর্যন্ত যেন শুষে নিতে রইলো তার শরীর! সেই সাথে কিমালেবের আকাশ কেঁপে উঠলো আনাবিয়ার বিধ্বংসী যন্ত্রণার আর্তনাদে!
ক্ষণিক পর ক্রমে ক্রমে পরিষ্কার হয়ে উঠলো কিমালেবের আকাশ, দৃশ্যমান হল চতুর্দিক। সমস্ত গামারশ্মি গুলো শরীরের ভেতর টেনে নেওয়া আনাবিয়া যেন অসাড় হয়ে গেলো, ক্ষণিকের জন্য সে ঠাই দাঁড়িয়ে রইল নিজের স্থানে, চোখে ফুটে রইলো এক নিদারুণ, তীব্র যন্ত্রণায় ছাপ!
পরমুহূর্তেই চোখ উল্টে গেলো তার, জ্ঞান হারিয়ে সে ঢলে পড়লো বালুর বুকে। কিন্তু পৃথিবী পৃষ্ঠ স্পর্শ করার আগেই তার মোলায়েম শরীরটাকে সজোরে জাপটে ধরে বুকে টেনে নিল মীর!
দেমিয়ান প্রাসাদের মেডিক্যাল জোনের রয়্যাল এরিয়ার একটি সুসজ্জিত কেবিনের নরম বিছানায় শোয়ানো জ্ঞানহীন আনাবিয়াকে। পাশেই চেয়ার পেতে বসে তার একটি হাত মুঠি করে ধরে রেখেছে মীর৷
মাথায় জড়ানো সাদা ব্যান্ডেজ, বা’হাতেও। বেশ গুরুতর ফ্র্যাকচার হয়েছে আনাবিয়ার পায়ের আঘাতে। ঠোঁটের কোণে, চোয়ালের জখমে ব্যান্ড-এইড।
কেবিনের ভেতর রেডিয়েশন রেজিস্টেন্স পোশাকে ঘোরাফেরা করছে ডাক্তাররা। আনাবিয়ার যাবতীয় পরীক্ষা নীরিক্ষা সম্পন্ন হয়েছে, রিপোর্ট হাতে আসা বাকি৷ শরীরে তার বিপুল পরিমাণ রেডিয়েশন। তবুও তাকে এখনো সুস্থ বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে, রেডিয়েশনে আক্রান্ত হওয়ার উপসর্গ অনেকাংশেই নেই।
কোকো সহ তার অধীনে কর্মরত সবাইকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে, বিশেষ মেডিক্যাল টিম দেখাশোনা করছে তাদের। সম্পুর্ন রেডিয়েশন মুক্ত হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে লোকালয়ে ফেরানো হবে না।
মীর আনাবিয়ার যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখখানার দিকে চেয়ে ছিল। শরীর জুড়ে বয়ে চলা তীব্র বেদনায় ভ্রু জোড়া কুচকে আছে এখনো আনাবিয়ার। ক্ষণে ক্ষণে থেমে থেমে দম ছাড়ছে সে, এটা যে ওর ভেতরে ঝড় তোলা বিধ্বংসী যন্ত্রণার চিহ্ন সেটা বুঝতে বেগ পেতে হচ্ছেনা মীরের। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে তাকাল আনাবিয়ার অতিস্ফিত জঠরের দিকে। এখনো আলট্রাসাউন্ড হয়নি তার, দেখা হয়নি ওই অতিকায় গর্ভে ঠিক কোন প্রাণী তৈরি হচ্ছে!
এক উগ্র ভীতি দানবের মত তাড়া করে চলেছে তাকে, বুকের ভেতর দ্রিম দ্রিম করছে তার। বারংবার মস্তিষ্ক তাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে বহুবছর আগের সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি গুলো! হেকিমেরা বারবার অনুরোধ করছে আলট্রাসাউন্ডের অনুমতি দিতে, কিন্তু মীরের থেকে কোনো উত্তর পাচ্ছেনা তারা।
এই একটি মাত্র প্রশ্নে এসে থমকে যাচ্ছে সে৷ যতবারই তাকে উত্তর খুঁজতে তাড়া দিচ্ছে তার মনন ততবারই আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিচ্ছে সে আনাবিয়ার হাতখানা! ঠোঁটের সাথে ছুইয়ে নিচ্ছে বারেবার!
অবশেষে ডাক্তারদের বারংবার অনুরোধে সম্মত হল সে। একজন হেকিম দুজন নার্সকে সাথে নিয়ে প্রস্তুতি নিল আলট্রাসাউন্ডের। মীর অন্যদিকে ফিরে বসে রইল। দেখবেনা সে কোনো কিছুই, আর কোনো দুঃখের মুখোমুখি সে হতে পারবেনা। হেকিম আনাবিয়ার পেটে আলট্রাসাউন্ড জেল লাগানোর সময় মীর বলে উঠলো,
“আমার শিনজোর গর্ভে যা বেড়ে উঠছে তা যদি এখনো বেঁচে থাকে এবং কোনোভাবে তার ক্ষতির কারণ হয় তবে তখুনি সেটা অপসারণের ব্যাবস্থা করবে, আমার অনুমতির প্রয়োজন নেই৷”
“আপনার যেমন আদেশ ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
বলে উঠলো হেকিম। ইতস্তত ভঙ্গিতে সে আনাবিয়ার পেটের ওপর দিয়ে চালাতে রইল প্রোব। এক অদ্ভুত উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা পেয়ে বসলো তাদের সবাইকে। বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হল সকলের, না জানি আজ কোন দৃশ্যের সাক্ষী হয় ওরা! কোন অজানা সৃষ্টির সম্মুখিন হতে হয় সকলকে! এত এত রেডিয়েশনের পরেও সে কি স্বাভাবিক থাকবে? স্বাভাবিক থাকা দূরের ব্যাপার, সে কি আদৌ বেঁচে থাকবে? থাকলেও কিভাবে জন্মাবে সে? বিকলাঙ্গ হয়ে? নাকি….. নাকি অন্য কোনো জীব, যেকিনা হবে ভয়ঙ্কর, বিধ্বংসী!
মীর আনাবিয়ার হাতের ওপর নিজের দুশ্চিন্তায় জর্জরিত মস্তিককে বিশ্রাম দিয়ে চোখ জোড়া বন্ধ করে রইল।
আনাবিয়ার জ্ঞান নেই বত্রিশ ঘন্টা পেরিয়েছে, এখনো তার শিয়র হতে একচুল নড়েনি মীর, নাওয়া খাওয়া হয়নি সেই থেকে তার। মহসিন প্রতিবেলা খাবার নিয়ে এসে ফিরে গেছে আবার, এতটুকু খাবার মুখে তোলেনি সে। ক্লান্তিতে চোখ লেগে আসতে চাইছে তার, কপালের ক্ষতটি মাঝে মাঝে পীড়া দিচ্ছে। গায়ে উত্তাপ, উত্তরোত্তর বাড়ছে তা৷
আলট্রাসাউন্ড করতে থাকা হেকিমটি থমকে গেলো হঠাৎ। ঘরময় নেমে এলো পিনপতন নিরবতা। যেন আরেকটু কান পাতলেই স্পষ্ট কর্ণগোচর হবে অন্যের হৃৎস্পন্দন!
মীর স্পষ্ট টের পেলো হেকিমের থেমে যাওয়া। আনাবিয়ার হাতখানা আরও জোরে মুঠি করে ধরে সে মুখ লুকালো মোলায়েম হাতের ভাজে৷ প্রাণপণে সৃষ্টিকর্তার নিকট আবেদন করতে রইল যেন দ্বিতীয় বার কোনো খারাপ খবর তাকে না শুনতে হয়, সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য গুলোর যেন দ্বিতীয় বার পুনরাবৃত্তি না হয় তার জীবনে।
“ই-ইয়োর ম্যাজেস্টি….!”
উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলো হেকিমটি। মীর উত্তর করলনা কোনো, মুখ গুজে পড়ে রইলো আগের মতোই। হেকিমটি উৎসাহ ভরে বলে উঠল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি…. শেহজাদারা সবাই সুস্থ আছেন!”
মুহুর্তেই চোখ খুললো মীরের! আনাবিয়ার হাতের ভাজ থেকে ঝটিতি মুখ তুলে সে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল হেকিমের দিকে। হেকিমটি অতিরিক্ত আনন্দে উত্তেজনায় কথা বলতে পারলোনা কিছুক্ষণ, শুধুই মুখে এক সুখময় চওড়া হাসি ফুটিয়ে তাকিয়ে রইলো মীরের দিকে। মীর বিস্মিত স্বরে শুধোলো,
“শেহজাদা..রা….?”
“ই-ইয়েস ইয়োর ম্যাজেস্টি! আমাদের প্রাসাদকে আনন্দে ভাসিয়ে দিতে একজন দুজন নয়, পাঁচজন শেহজাদা আসতে চলেছেন!”
বলতে বলতে অতিরিক্ত খুশিতে সশব্দে হেসে উঠলো হেকিমটি। মীর ক্ষণিক অবিশ্বাস্য চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইল তার দিকে, পরক্ষণেই ঝটিতি উঠে প্রায় লাফিয়ে গিয়ে দাঁড়াল মনিটরের সামনে। অত্যন্ত মনোযোগী চোখে সে দেখতে রইলো পর্দায় ভেসে ওঠা সাদা কালো দৃশ্যটির দিকে। পেছন থেকে হেকিমটি খুশি খুশি গলায় বলে উঠল,
“শেহজাদারা ইতোমধ্যে পাঁচ মাস অতিক্রম করে ফেলেছেন, সব ঠিক ঠাক থাকলে আগামী কিছু মাসের মধ্যেই তারা ভূমিষ্ট হবেন।”
মীরের যেন আনন্দের সীমা রইলোনা! চরম সুখে, উচ্ছাসে, তৃপ্তিতে পুলকিত হয়ে উঠলো সে! হঠাৎ তার বক্ষপিঞ্জরের ভেতর এত আনন্দোচ্ছ্বাস কোনো আগমনী বার্তা ছাড়াই দস্যুর ন্যায় হামলে পড়ায় ক্ষণিকের জন্য স্থির হয়ে গেলো সে, তার মস্তিষ্ক ঠিক কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে বুঝতে পারলনা। শ্বাস প্রশ্বাসে বাঁধা পড়ল মুহুর্তেই, এমন অনাকাঙ্ক্ষিত সংবাদে উত্তেজিত হয়ে পড়লো তার সমস্ত শরীর!
হেকিমটি ছুটে গিয়ে চেয়ারটা এনে দিল তাকে, শ্রদ্ধা আর আনুগত্য মিশিয়ে বলে উঠল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, দয়া করে বসুন এখানে, আপনার শরীর ভালো নয়।”
মীর বসে পড়ল তৎক্ষনাৎ, শ্বাস প্রশ্বাস তবুও স্বাভাবিক হলনা তার! একদৃষ্টিতে সে তাকিয়ে রইলো কম্পিউটার স্ক্রিণের দিকে, যেখানে এখনো দৃশ্যমান হয়ে আছে তার সন্তানেরা! ক্ষণিক পর পর নড়েচড়ে উঠছে তারা, একে অপরের গায়ে গুতো দিচ্ছে হাত পা দিয়ে। হেকিমটি প্রোব ঘোরাতে ঘোরাতে ভুলবসত একটু জোরে চাপ দিয়ে ফেলতেই বাচ্চা গুলো থেমে গেলো হঠাৎ। তারপর হঠাৎই একজন পেটের ভেতর থেকে গুতো মারলো সে স্থানে।
হেকিমটি সাথে সাথেই প্রোব সরিয়ে নিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলে উঠলো,
“চাপ দেওয়ার জন্য ভেরি ভেরি সরি।”
নিজের অজান্তেই এক সুখময় হাসি ফুটলো মীরের ঠোঁটের কোণে, হাত বাড়িয়ে সে স্পর্শ করলো আনাবিয়ার উন্মুক্ত পেট। পরম আদরে হাত বুলিয়ে দিতে রইলো সে আনাবিয়ার পেটে, ক্ষণিক পরেই নিজের হাত রাখা স্থানে টের পেলো কয়েকটি ছোট্ট ছোট্ট স্পর্শ! যেন পেটের ভেতর থেকেই ওরা অনুভব করছে বাবার স্পর্শ, বাবাকে ফিরতি স্পর্শ দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে সকলে মিলে!
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৮
শিশুদের মতন হেসে উঠলো মীর, হাত সরিয়ে উন্মাদের মতন চুমু এঁকে দিলো আনাবিয়ার উন্মুক্ত পেটে। হেকিমটি আনাবিয়ার রিপোর্ট দেখার নামে নার্সগুলোকে নিয়ে কেটে পড়লো তৎক্ষনাৎ।
মীর সরে এলো আনাবিয়ার মুখের দিকে, ক্ষণিক আনাবিয়ার ক্লান্ত মুখশ্রীতে চেয়ে থেকে অজস্র চুমু খেলো ওর সারা মুখে! মোলায়েম স্বরে বলে উঠলো,
“সব ঠিক হয়ে যাবে, খুব দ্রুতই সুস্থ হয়ে যাবে তুমি। তোমাদের আমি আর কখনো কিছুই হতে দেবোনা, কখনোই না, এটা আমার ওয়াদা!”
