Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯০ (২)

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯০ (২)

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯০ (২)
রানী আমিনা

কিমালেবের সেই ছোট্ট একতলা বাসাটার বারান্দায় অস্থির হয়ে পায়চারি করে চলেছে মীর। জায়ান সাদি তাকে বারবার বসতে অনুরোধ করলেও বসছে না সে, কারণে অকারণে অশান্ত হয়ে উঠছে তার মন। সাম্রাজ্যের কিছু গণ্যমান্য ব্যাক্তি সঙ্গ দিচ্ছে তাকে, চেষ্টা করছে তাকে দুঃশ্চিন্তা মুক্ত রাখার৷
একটু আগেই খবর এসেছে বাহারের শরীর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হচ্ছে, মস্তিষ্ক ছেড়ে দিতে শুরু করেছে লাগাম। শ্বাস টুকু কোনোমতে ধরে রেখেছে এখনো! বারংবার অস্ত্রোপচার তার শরীর ভেঙে দিয়েছে যে, এ শরীর আর ঠিক হবার নয়৷ হেকিমেরা এসেছিল, জিজ্ঞেস করেছিল এই অবস্থায় কি করবে তারা। মীরের সোজা উত্তর, ধারকিনীর শ্বাস যাওয়ার আগেই বাচ্চাটিকে যে কোনো মূল্যে পৃথিবীর বুকে টেনে নিয়ে আসা। হেকিমেরা সেমতেই এগুচ্ছে।

ভেতরের কামরায় যমদূতের কড়া দৃষ্টি বাহারের ওপর। পেট চিরে এক প্রাণ পৃথিবীতে আসছে তার, যার ওপর কোনো অধিকার তার নেই, যাকে একবার স্পর্শ করার সময়টুকু তার নেই, না আছে তাকে একটা বার স্নেহের চুম্বন দেওয়ার শক্তি! মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তেই হঠাৎ সে ফিরে এলো কঠিন অ্যানেস্থেসিয়া থেকে, কিন্তু জানতে পারলনা কেউ। মস্তিষ্ক তাকে অনুভব করাল তার শরীর জুড়ে বয়ে যাওয়া সুগভীর অস্ত্রোপচারের তীব্র যন্ত্রণা, কিন্তু ঠোঁট উচ্চারণ করতে পারলো না একটি শব্দও।
এক নতুন প্রাণের বিকট, ক্ষুধার্ত চিৎকার আচমকা কানে এসে বাড়ি খেলো তার, জানান দিয়ে গেলো এই পৃথিবীর বক্ষে তার উপস্থিতির সংবাদ। নিস্তেজ, নির্জীব বাহারের বন্ধ চোখের কোণা বেয়ে পড়লো এক ফোটা নোনাজল, সেটা মুক্তি পাওয়ার খুশিতে নাকি নাড়িছেঁড়া সন্তানটিকে একবার বুকে জড়িয়ে নিতে ব্যর্থ হওয়ার যন্ত্রণায় সেটা ঠাহর হলো না। ওই একফোটা নোনা জলই তার শেষ অনুভূতির চিহ্ন হয়ে পড়ে রইল বালিশের কোণে, তার নিষ্প্রাণ দেহখানার একমাত্র সঙ্গী হয়ে।
রুপোলী সুতোয় বাঁধানো রেশমি কাপড়ে জড়ানো, উচ্চস্বরে ক্রন্দনরত এক ছোট্ট প্রাণকে একজন সাদা পোশাক পরিহিতা নার্স এসে সযত্নে তুলে দিল মীরের হাতে। মীরের হৃৎপিণ্ড আচমকা স্পন্দিত হতে শুরু করলো দ্রুত গতিতে। তার বিশাল হাতের ওপর তারস্বরে চিৎকার করে চলেছে এক নরম তুলতুলে নবজাতক! যে কিনা তারই অংশ।

শিনজোর পূর্বে কখনো কোনো বাচ্চাকে কোলে তোলেনি সে, আনাড়ি হাতে তখন সে নিষ্পাপ, পরীর মত মেয়েটির সমস্ত দায়িত্ব তুলে নিয়েছিল নিজের কাঁধে। এক অদ্ভুত পিতৃত্বের স্বাদ সে পেয়েছে তখন! মাতৃহারা শিনজোকে কোলে তুলতে বুকে কম্পন জাগেনি তার, মনে হয়নি এই ছোট্ট প্রাণকে সে কিভাবে বড় করে তুলবে! নিজেকে তখন ওই হীরকখন্ডের ন্যায় ঝলসানো দৃষ্টির অধিকারী মেয়েটির একমাত্র অবলম্বন, একমাত্র আশ্রয় হিসেবে মনে হয়েছে তার। সেই ধারণাটাই খোদাই হয়ে রয়ে গেছে তার মন মস্তিষ্কে, পাকাপোক্ত ভাবে।
কিন্তু আজকের অনুভূতি অন্যরকম। এক অদ্ভুত স্নায়ুচাপ, ভীতি, উৎকন্ঠা আচমকা এসে জাঁপটে ধরেছে তাকে। বাচ্চাটির নিজ দু’হাত মুঠি করে ধরে করা তীক্ষ্ণ কান্না এক উদ্ভট বেদনার জন্ম দিচ্ছে তার বুক পাজরের ভেতর। পিতৃত্ব বুঝি অবশেষে পেয়ে বসেছে তাকে!
“জায়ান ভাইজান, ওয়েট নার্সের সন্ধান পেয়েছেন?”
শুধোলো মীর৷ জায়ানকে একজন দুধমায়ের ব্যাবস্থা করতে বলেছিল সে অনেক আগেই। জায়ান সমস্ত পঞ্চদ্বীপ খুঁজে একজন সুযোগ্য দুধমায়ের ব্যাবস্থা করেছে বাচ্চাটির জন্য। মীরের প্রশ্নের উত্তরে সে বলল,
“জ্বি, ইয়োর ম্যাজেস্টি। উনি পাশের কামরাতেই আছেন। আপনি অনুমতি দিলেই উনি শেহজাদার দায়িত্ব নিবেন।”

মীর একবার রেশমি কাপড়ে মোড়া শ্যামরঙা শরীরের বাচ্চাটিকে দেখলো। তার সন্তানটি যে তার ওই কদর্য রূপটা ধারণ করেনি তাতে স্বস্তির শ্বাস ছাড়লো সে। আলগোছে ক্ষুদ্র ঠোঁট জোড়া আলগা করে দেখলো ক্ষুরধার দাঁতের কোনো চিহ্ন আছে কিনা।
না। নিশ্চিন্ত সে। অন্তত তার সন্তানটিকে তার মতন বৈষম্যের শিকার হতে হবে না, কেউ ভীতির চোখে দেখবেনা তাকে, প্রাণপণে এড়িয়ে চলবেনা! মীর মৃদুস্বরে আযান দিলো বাচ্চাটির কানে, অতঃপর নরম স্বরে তিনবার বলে উঠলো,
“তোমার নাম সাইয়্যিদ আরহাম দেমিয়ান।”
দৃষ্টি মোলায়েম হয়ে এলো তার। শান্ত চোখে কিছুক্ষণ বাচ্চাটির ছোট্ট মুখপানে চেয়ে ছোট্ট কপালটায় ঠোঁট ছুইয়ে তাকে তুলে দিল জায়ানের কোলে। জায়ান তাকে নিয়ে গিয়ে সোপর্দ করলো দুধমায়ের হাতে।
ক্ষণিক পর ফিরে এসে মীরের পাশে দাঁড়াল সে। মীর বলে উঠলো,
“শেহজাদার খাওয়া শেষ হলেই আমরা বেরোবো জায়ান ভাইজান। ওয়েট নার্সটির পরিবারের লোকের সংবাদ বলো।”

“মেয়েটির স্বামী হাসপাতালে ইয়োর ম্যাজেস্টি। বাচ্চাটির বোধহোয় পনেরো দিনের মত বয়স হয়েছিল, মেয়েটির স্বামী বাচ্চাকে কোলে নিয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় মালবাহী ট্রাক এসে চাপা দেয়। বাচ্চাটা স্পট ডেড, বাবার অবস্থাও আশঙ্কাজনক। পরিবারে অন্য কেউ আছে কিনা সে সংবাদ নেওয়ার সময় হয়নি, ইয়োর ম্যাজেস্টি। ক্ষমা করবেন।”
“কতদিন হয়েছে?”
“এইতো, সপ্তাহখানেক।”
মীর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। বাড়ি ছেড়ে বের হতে হতে বলল,
“আমি আমার গাড়িতে অপেক্ষা করছি, শেহজাদার খাওয়া হলে মেয়েটিকে অন্যদের সাথে গাড়িতে তুলে দেবে।”
“আপনার যেমন আদেশ, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। সূর্যের লালচে আভা নিভু নিভু। উজ্জ্বল লালিমার একাংশ এসে আছড়ে পড়েছে দেমিয়ান প্রাসাদের সফেদ পাথরের ওপর৷
রয়্যাল ফ্লোর জুড়ে দাসদাসী দের ভয়ানক ব্যাস্ততা। ছোটাছুটি করছে তারা ছোট্ট শেহজাদাকে স্বাগত জানাতে। কিছুক্ষণ পূর্বেই খবর এসেছে হিজ ম্যাজেস্টি আসছেন, সাথে এক শেহজাদা, দেমিয়ান শেহজাদা।
অবাক হওয়ার মতন সময় হাতে নেই তাদের, সকলে ব্যাস্ত রয়্যাল জ্যু নামক কামরাটা শেহজাদার জন্য সাজিয়ে গুছিয়ে তুলতে৷ কামরাটা শেহজাদীর কামরা থেকে দূরে। হিজ ম্যাজেস্টির কড়া আদেশ, শেহজাদার কান্না যেন কোনোভাবেই না পৌছুতে পারে ওই কামরা পর্যন্ত। যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আনাবিয়া জানতে না পারে এই প্রাসাদে এক নবজাতকের বেড়ে ওঠার সকল প্রস্তুতি চলছে৷ এই অবস্থায় তো কোনোভাবেই নয়!
তাদের ছোটাছুটির ভেতরেই আচমকা রয়্যাল মেম্বার ইন্ডিকেটরে ধ্বনিত হলো মীরের আগমন ধ্বনি। তটস্থ হয়ে উঠলো সকলে। মহসিন সকলকে সাবধান করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে দাঁড়া করিয়ে দিল সকলকে।
অন্যান্য ফ্লোর গুলোতে এই মুহুর্তে চলছে উৎসব, দেমিয়ান শেহজাদার আগমণের খুশিতে হৈ-হুল্লোড় চলছে সবখানে। আলোয় আলোয় মুড়িয়ে আছে চতুর্দিক। তাদের হল্লার ক্ষীণ শব্দ ছুটে আসছে রয়্যাল ফ্লোর পর্যন্ত!
মীর প্রবেশ করলো রয়্যাল ফ্লোরে, কোলে তার রেশমে মোড়া ছোট্ট শেহজাদা। ভরপেট খেয়ে ঘুমিয়ে আছে, শান্ত হয়ে। পেছনে তার দুই দেহরক্ষীর সাথে এগিয়ে আসছে সন্তান হারা মেয়েটি, দুঃখ স্পষ্ট তার চোখে। করুণ দৃষ্টি দিয়ে সে দেখে চলেছে এই অদ্ভুত প্রাসাদের আভিজাত্য, ঝলমলে আলোর ঝলকানি।

দাসদাসী গুলো নত মুখে মীরকে আনুগত্য জানালো তৎক্ষনাৎ। মীর নিজের কামরার সম্মুখে এসে আচমকা ফিরলো পেছনে। অল্পবয়সী মেয়েটা চমকে গেলো তাতে। সম্মুখের এই অদ্ভুত রকমের সুদর্শন, সুউচ্চ লোকটির ভয়ানক শান্ত দৃষ্টি শীতল করে দিচ্ছে তার রক্ত! চরম ভীতিতে বেড়ে যাচ্ছে তার হৃৎস্পন্দন!
“আমার শেহজাদার সকল দায়িত্ব এখন থেকে তোমার। ওর দুধমা নয় মা হয়ে উঠবে আশা করি। তোমার স্বামীর চিকিৎসার সমস্ত খরচ আমি বহন করব, প্রয়োজনে তাকে প্রাসাদের দক্ষ হেকিমকে দিয়ে চিকিৎসা করাব। বিনিময়ে শুধু তুমি আমার সন্তানকে একজন মমতাময়ী মা দিবে।”
বলে উঠলো মীর৷ তার ভারী, কর্কশ কন্ঠস্বর কাঁপুনি ধরিয়ে দিল মেয়েটির শরীরে৷ ভীতসন্ত্রস্ত, এলোমেলো কন্ঠে কোনোরকমে বলে উঠলো,
“আ-আপনার য্‌-যেমন আদেশ, ই-ইয়োর ম্যাজেস্টি!”
মীরির ঠোঁটের কোণে সুক্ষ্ম সন্তুষ্টির হাসি খেলে গেলো। শেহজাদাকে মেয়েটির হাতে তুলে দিয়ে সে ঢুকে পড়লো নিজের কামরায়। মেয়েটি ছোট্ট শেহজাদাকে কোলে নিয়ে এগুলো মহসিনের দেখানো পথে। দাসদাসীরা দৌড়ে এগোলো তাদের পেছন পেছন, শেহজাদাকে একপলক দেখার আশায়।

ঘন জঙ্গলের ভেতর এক খরস্রোতা নদী। ভারী পাথরে আচ্ছাদিত তলে আছাড় খেয়ে নদীটির দামাল পানির স্রোত দস্যুর ন্যায় ছুটে চলেছে কোনো সমুদ্রের বুকে মিশে যেতে। শ্যাওলা জমেছে নদীর কিনারে থাকা সবুজাভ পাথরের গায়ে, ভীষণ পিচ্ছিল।
নদীর ওপারে কুয়াশা, দৃষ্টিগোচর হচ্ছেনা কিচ্ছুটি। ওপারে যাওয়ার জন্য মোটা মোটা দড়ি দিয়ে তৈরি এক সেতু, নদীর পানির ছিটে লেগে লেগে শ্যাওলা জমেছে তাতেও। স্রোতের তোপে মাঝে মাঝেই দুলে উঠছে সেতুটি, গিটে গিটে শব্দ হচ্ছে কট কট করে!
এপারে দাঁড়িয়ে আনাবিয়া, গন্তব্য তার ওপারে! কিন্তু নিচের ভীষণ স্রোত ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে তার মনে। ভীত চোখে চেয়ে সে দানব স্রোতের দিকে। একপা বাড়ালে পিছিয়ে আসছে আরও দু’পা!
আচমকা পেছনে এসে দাঁড়াল কেউ, নাকে ঠেকলো চিরপরিচিত এক পুরুষালি ঘ্রাণ! বলিষ্ট থাবায় জড়িয়ে নিল সে আনাবিয়ার কোমর, গমগমে কন্ঠে বলে উঠলো,
“ভয় নেই, আমি আছি।”

গায়েব হল আনাবিয়ার ভীতি। কোমরে বাঁধা হাতটিকে পুঁজি করে তরতরিয়ে এগিয়ে গেলো সামনের দিকে। শেষ হয়না…. শেষ হয়না এ পথ! অনন্ত কাল ধরে যেন সে আঁটকে আছে সেতুটির মধ্যিখানেই, দুরত্ব কমেনি এতটুকু! বলিষ্ঠ হাতজোড়া এখনো জড়িয়ে তার কোমর!
অস্থির হয়ে উঠলো আনাবিয়া, আচমকা ছুটে চলল সম্মুখে, মরিয়া হয়ে উঠলো পথের শেষটা দেখতে! অকস্মাৎ ঢেউয়ের দামাল শব্দ ছাপিয়ে তার কানে এসে ঠেকলো কোনো নবজাতকের তীক্ষ্ণ, ক্ষুধার্ত ক্রন্দনধ্বনি!
থমকে গেলো সে! এদিক ওদিক উদ্বিগ্ন চোখে দেখে চলল ঠিক কোথা থেকে আসছে কান্নার শব্দটি! ক্রমে বেড়ে চলল বাচ্চাটির চিৎকার, যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে সে আনাবিয়ার সমীপেই।
কে কাঁদে? কার বাচ্চা কাঁদে? বাচ্চাটির ক্ষুধা পেয়েছে নিশ্চয়! কেউ তাকে কোলে তুলে নিচ্ছেনা কেন? তাকে খাওয়াচ্ছে না কেন? বাচ্চাটার কান্না থামাচ্ছে না কেন কেউ? কেউ কি এই খরস্রোতা নদীর ধারে ফেলে রেখে গেছে তাকে? খুব ক্ষুধা লেগেছে বোধ হয় তার!
তারস্বরে চিৎকারটি ঘনীয়ে এলো ক্রমশ, ধীরে ধীরে সেটি তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে সূচের মত বিঁধতে রইলো আনাবিয়ার মস্তিষ্কে! তীব্র শব্দে চোখ মুখ কুচকে ফেললো আনাবিয়া। বলিষ্ঠ হাতজোড়া আচমকা হ্যাচকা টেনে সজোরে চেপে ধরলো তাকে নিজের সাথে! আর তখুনি দড়ি ছিড়ে সেঁতুটা আছড়ে পড়লো খরস্রোতা নদীর বুকে!

মুহুর্তেই ঘুম ভাঙলো আনাবিয়ার। আঁতকে উঠে জোরে শ্বাস ছাড়লো সে, হাঁফাতে হাঁফাতে উঠে বসলো তৎক্ষনাৎ৷ অসংলগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো চতুর্দিকে।
আঁধারে ঘেরা কামরা, কোথাও কোনো আলো নেই। তেষ্টা পেয়েছে ভীষণ! পানি কোথায় রাখা? নড়াচড়া করতে গিয়েই স্মরণে এলো তার অতিকায় গর্ভের কথা। উন্মুক্ত পেটে কয়েকবার হাত বুলিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসলো সে।
আচমকা কানে ভেসে এলো কোনো নবজাতকের ক্ষীণ, সুক্ষ্ম কান্নার শব্দ। তৎক্ষনাৎ দুহাতে মাথা চেপে ধরলো আনাবিয়া, স্বপ্নটি পিছু ছাড়ছেনা কেন তার? কয়েকবার ঘন শ্বাস ছেড়ে হাত বাড়িয়ে টেবিল ল্যাম্প জ্বালালো। সাইড টেবিলের ওপর থেকে পানির গ্লাস নিয়ে পানি খেলো ঢকঢকিয়ে।
সেই মুহুর্তে আবারও কর্ণগোচর হল ক্রন্দনধ্বনিটি। সজাগ হয়ে উঠলো আনাবিয়া, না— এটা স্বপ্নের রেশ নয়। এবার স্পষ্ট শুনেছে সে।
শরীর টেনে ধীর গতিতে বিছানা থেকে নেমে সে বেরিয়ে এলো কামরা থেকে। বেরোতেই চোখে পড়লো মীরকে! গায়ে রোব জড়াতে জড়াতে দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলেছে সে ফ্লোরের অন্য প্রান্তের কামরার দিকে। প্রায় ছুটে সে ঢুকে পড়লো কামরাটির ভেতর। কান্নার শব্দটা যে ওদিক থেকেই আসছে!
যন্ত্রের ন্যায় সেদিকে এগোলো আনাবিয়া। দরজার নিকট এসে দাঁড়াল ক্ষণিক। থেমে গেছে বাচ্চাটির কান্না, ভেতর থেকে এখন ভেসে আসছে মীরের চাপা ধমকের শব্দ! ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে দেখলো আনাবিয়া।

কপালে ক্রোধের ভাজ মীরের, তাকিয়ে আছে কোলের ভেতর রেশমি কাপড়ে মোড়া কোনো কিছুর দিকে। কোলের বস্তুটি নড়াচড়া করছে, কাপড়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে বস্তটির ছোট্ট ছোট্ট হাত, যেন আড়মোড়া ভাঙছে সে। পরক্ষণেই আবার তারস্বরে কেঁদে উঠলো কোলের বস্তুটি।
আনাবিয়া এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। মীর ব্যতিব্যস্ত হয়ে বাচ্চাটিকে দিয়ে দিল তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকা মেয়েটির কোলে, ভর্ৎসনার স্বরে মেয়েটিকে বকতে শুরু করলো সে আবারও!
এক অবিশ্বাস ছাপানো দৃষ্টি নিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে এলো আনাবিয়া। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে সমস্ত যন্ত্রণা টুকু গিলে ফেলে ধীর পায়ে ফিরে এলো সে বারান্দায়। রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে তাকাল আকাশের দিকে। দাঁতে দাঁত চেপে, মুখখানা শক্ত করে রইল। তবুও ঝলমলে চোখ হতে দুফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল তার চোয়ালে। শিরো মিদোরি জুড়ে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি নামলো তৎক্ষনাৎ, সজীব করে তুললো সবকিছুকে।
চোয়ালে পড়া পানি টুকু মুছে আকাশ হতে দৃষ্টি নামিয়ে ভূতলে তাকাতেই আচমকা ঘুরে উঠলো আনাবিয়ার মাথা! তড়িৎ বেগে দুহাতে রেলিঙ আকড়ে ধরলো সে, শ্বাস পড়তে রইলো ঘন ঘন। অকস্মাৎ খেয়াল হলো ভীষণ রকম ক্ষুধা পেয়েছে তার৷ ক্ষুধার তোপে জ্বালাপোড়া করতে শুরু করেছে পাকস্থলী!

নিজেকে সামলে রেলিঙ ছেড়ে কামরার দিকে এগোতে নিতেই আবারও চক্কর দিল তার মাথার ভেতর! মুহুর্তেই আঁধারে ছেয়ে গেলো চোখের সম্মুখ, যেন এক্ষুনি আছড়ে পড়বে সে শক্ত মেঝেতে! ভীত হয়ে, অসহায় ভঙ্গিতে চতুর্দিকে কোনো অবলম্বন খোঁজার নিমিত্তে হাতড়াতে রইল সে!
আচমকা কেউ এসে ধরলো তাকে, উৎকন্ঠা নিয়ে বলে উঠলো,
“শেহজাদী! আপনি ঠিক আছেন? আপনার শরীর খারাপ লাগছে? একা একা কেন বাইরে এসেছেন! এই অবস্থায় রেলিঙের কাছে কেন গিয়েছিলেন? কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কি হত বলুনতো!”
লিওর কন্ঠস্বর শুনে চমকালো আনাবিয়া। দু’হাতে সজোরে আঁকড়ে ধরলো সে লিওকে। চোখের সামনে এখনো আঁধার! লিও তাকে অবলম্বন দিয়ে এগিয়ে নিয়ে এলো বারান্দায় রাখা সোফার দিকে। ধীরে সুস্থে বসিয়ে দিয়ে উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

“শেহজাদী, খুব খারাপ লাগছে? হেকিমকে খবর দিব?”
“খিদে পেয়েছে আমার, খুব! আমি খাব কিছু। অনেক কিছু!”
হাঁফানো স্বরে বলল আনাবিয়া। লিও আনাবিয়াকে ধরে দাঁড়িয়েই উচ্চস্বরে ডাকতে রইলো মহসিনকে। ঘুমন্ত মহসিন তড়িঘড়ি উঠে কামরা থেকে ছুটে এলো প্রায়, এসেই আনাবিয়াকে জাগ্রত দেখে চমকালো সে, একই সাথে তাকে গ্রাস করলো ভীতি!
তাকে দেখা মাত্রই লিও বলে উঠলো,

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯০ 

“শেহজাদীর খিদে পেয়েছে মহসিন, জলদি খাবারের ব্যাবস্থা করো। যত দ্রুত সম্ভব খাবার দিয়ে যাবে। তার আগে ঝটপট কিছু তৈরি করে দিয়ে যাও।”
“ঠিক আছে, আমি এখনি আসছি লিও ভাইজান!”
বলেই ছুটলো মহসিন। লিও আনাবিয়ার একটা হাত মুঠি করে ধরে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানেই।

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here