Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২০

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২০

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২০
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

তখন রাত বারোটা। মিথির পেটের চামড়ায় কিছুটা ব্যাথা। আজকাল খাবার হজম হতে সমস্যা হয়। রাতের বেলায় আরো বেশিই বোধহয় সমস্যাটা অনুভব হয়। কাজ থেকে ফেরার পথে ও সিঁড়ি বেয়ে উঠতেও কষ্ট লাগছিল। পায়ের মাংসপেশিও কেমন টান পড়ে আছে। গোড়ালিটা ব্যাথা করছে। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। সামনেই পরীক্ষার ডেইট। হিয়াটা এত কষ্ট করছে ওর জন্য, এডমিশন টেস্টের আবেদন গুলো অব্দি ওকে নিয়ে গিয়ে জোর করে করে করিয়েছে। কোন টপিক না বুঝলে তা বুঝিয়ে দিচ্ছে। কোচিং এ কোয়েইশ্চেন গুলো হুবুহু মিথিকে এক্সাম দেওয়ার জন্য বাসায় এসে বানিয়ে দেয়। তারপর ও যদি মিথি ঝিমিয়ে থাকে কিভাবে হবে? মিথি এই দেড়- দুই মাস যথেষ্ট সময় দিয়েছে পড়ালেখার পেছনে। এখনো হিয়ার পাশে বসে প্রশ্ন সলভ করছে। মূলত এই দুয়েক মাস ও বই নিয়ে বসেছেও হিয়ার জন্য। হিয়া জোর করেছে বলেই নিজের মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস রেখে পড়ছে এখনো। মিথির আজকাল নিজেকে নিয়ে হতাশ লাগে না। মনে হয় না পৃৃথিবীতে সে খুব একটা বিপদে ফেঁসে গেছে। বরং মনে হয় যে কোন সমস্যায় অতিক্রম করা যায়। যে কোন কঠিন রাস্তায় পার হওয়া যায়। অতো অসাধ্য কিছুই না।তেমনই এই পরীক্ষার অধ্যায়টাও ও পার করে নিবে কোন মতে। কোন না কোন ভাবে ঠিকই কিছু একটা হয়ে যাবে। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। হাতের কলম রেখে হিয়ার দিকে চাইতেই হিয়া উৎফুল্ল স্বরে শুধাল,

“ চা আনি মিথি?মাথা ঝিমঝিম করছে।তোর ও বোধহয় ঘুম পাচ্ছে।”
এটা ঠিক, মিথির চোখ ছোট ছোট হয়ে এসেছে। ঘুম আসার দরুন কিছুটা লালচেও হয়ে এল। তবে ম্যাথ সলভ করার কারণে তেমন ভাবে ঘুমকে পাত্তা দিচ্ছে না চোখ। মিথি উঠল। হিয়ার দিকে চেয়ে বলল,
“ আমি করে আনি? ”
হিয়া সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর করল,
“ একদমই না। তুই বেলকনি থেকে হেঁটে আয় বরং। আমিই করছি। ”
মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। টেবিল ল্যাম্পের মতো ল্যাম্পটা অফ করে বেলকনির দিকে গেল। রিধি বোধহয় বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। আর ফিজার উপস্থিতি টের পাওয়া গেল বেলকনিতে। ফিসফিস করা কথার স্বরে। মিথি পা ফেলতেই কানে এল ফিসফিস করা স্বর। মিথি তাকাল। বেলকনি দিয়ে রাস্তায় স্পষ্ট দেখা গেল আয়মানের প্রতিচ্ছবি ও। ও হাসল। ফিজা বোধহয় অপ্রস্তুত হয়ে কল রাখল। মিথিকে শুধাল,

“ তোদের দুইজনের পড়ালেখা শেষ নাকি? ”
মিথি হাসল। বলল,
“ হিয়া চা করতে গেল আপু। তোমার জন্যও বলি? ”
ফিজা ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
“ এতরাতে চা? ”
“ ঘুম পাচ্ছিল। তোমার জন্য বলি? ”
“ আচ্ছা বল। ”
মিথি গেল। হিয়াকে চায়ের জল বসাতে দেখাতে বলল,
” ফিজা আপুও জেগে আছে। আপুর জন্যও দে হিয়া। ”
হিয়া তাকাল। আরো এক কাপ চায়ের জল বেশি দিল। অতঃপর বলল,
” রিধি বেয়াদবটা কি করছে? ঘুমোচ্ছে?”
” সাড়াশব্দ নেই। বোধহয় ঘুমোচ্ছেই। ”
“ রিধিটা আর ঘুমাবে কেন ? চড় মেরে তোল ওরে। ”

মিথি হেসে ফেলল। পা বাড়িয়ে গেল রুমের আলো জ্বালাল। রিধিকে বাচ্চাদের মতো ঘুমোতে দেখে ও আবারও হেসে ফেলল। ঘুমোতে ঘুমোতে প্রায় বিছানা থেকে গড়িয়ে ফ্লোরে চলে এসেছে মেয়েটা। শুধাল,
“ বেচারি কি সুন্দর ঘুমাচ্ছে। চড় মারবি কেন?”
হিয়ার চায়ের জল বসিয়ে দিয়ে নিজেও এল। রিধিকে নাদুস নুদুস বাচ্চার মতো আরামে ঘুমাতে দেখে বলল,
“ তো কি করব? আমরা সবাই জেগে আছি। ওর ঘুমানো অন্যায় না বল? ”
পেছন থেকে ফিজা বলল,
“ ডাকতে থাক,উঠে যাবে। ”
মিথি প্রথমে ডাকল। কাজ হলো না দেখে হিয়া সত্যিই সত্যিই আলতো হাতে চড় মারল গালে। অথচ এতেও উঠল না। মিথি সর্বশেষ উপায় হিসেবে রিধির লম্বার চুলের থেকে দু দুটো চুল টেনে ধরল। মুহুর্তেই রিধি কুঁকড়ে উঠার ন্যায় মাথায় হাত রাখল। মুখ কুঁচকে এল কেমন যেন। চোখজোড়া বহুকষ্টে মেলে ধরে সবাইকে এমন জাগ্রত আর রুমে আলো জ্বলতে দেখে ঘুমঘুম স্বরে শুধাল,

“ সকাল হয়ে গেছে মিথি আপু? ”
মিথি যেন সত্যি কথাই বলছে এমন একটা হাবভাব ধরে শুধাল,
“ অলরেডি দুপুর হয়ে গেছে রিধি। এতোটা সময় কি করে ঘুমালে? তোমার না এক্সাম? ”
বোকা রিধি মুহুর্তেই লাফ মেরে উঠে পড়ল। চোখ কচলে ঘুম সরানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
“ কি বলছো? দুপুর হয়ে গেছে? আমি তো এলার্ম দিয়েছিলাম আপু। ”
মিথি আবারও অবুঝ শিশুর মতো করে বলল,
“ কখন দিয়েছো? বাজে নি তো। সময় দেখো ফোনে। দুপুর বেরিয়ে বিকেল। ”
রিধি প্রায় কেঁদেই দিবে যেন। মোবাইল নিয়ে সময় দেখল ও। বারোটা সাতাশ এইটুকুই দেখল ও। অথচ পি.এম., এ.এম. খেয়ালই করল না। কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল,
“ আমার পরীক্ষা আপু। কি করব এবার? ”
হিয়া পাশ থেকে এসে রিধির পাশে বসল। রিধির মাথায় সজোরে একটা চড় বসিয়ে বলল,
“ রিধি, তোরে কি এমনি এমনি বোকা বলি? সময় দেখ ভালো করে। ”
রিধি আবারও সময় দেখল। আবারও দেখল বারোটা আটাশ। হিয়া এবার কপাল কুঁচকেই বলল,
“ আরে গর্দভ, ভালোভাবে দেখ। ”
রিধি এতক্ষনে খেয়াল করল। অতঃপর মিথির দিকে চেয়ে কেমন ফুঁসে উঠল। শুধাল,
“ মিথি আপু! তুমি আমাকে বোকা বানালে। তোমারে আমি ভালো ভাবতাম। ”
মিথিও হেসে ফেলল। জবাব দিল,
“ সঙ্গদোষে লোহা ভাসে মিথি। তোমাদের সাথে মিশে মিশে হয়ে যাচ্ছি। আমার দোষ কি বলো? ”

মিথির আজকাল অনেক রকমই শারিরীক সমস্যার দেখা মিলছে। রাতে ঘুম হচ্ছে না খুব একটা।চোখের নিচে বিস্তর কালি জমেছে মেয়েটার। খাবার খেয়ে হজম হচ্ছে না, পেট জমে যাচ্ছে। অল্প খেলেও এই সমস্যাটা এখন নিয়মিত হচ্ছে৷ এমনকি পায়ের মাংসপেশিও টানটান হয়ে থাকে। এসব সমস্যার কারণেই হিয়া সহ ডক্টরের কাছে যাবে। কাজ থেকে ছুটি নিয়েছে ও তাই। মিথি আর হিয়া নিচে নামার সময় ওদের সাথে ফিজাও নামল। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতেই দেখা গেল ওপাশ আয়মানও এসেছে। ওদের সাথে হালকা কথোপকোতন সারতেই এবার হিমেলকেও দেখা গেল। একপাশে হাত পা টানটান করে দাঁড়িয়ে আছে। আয়মান কথা শেষ করে হিমেলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। হেসে বলল,

“ তুই আমার বেলায় অলওয়েজ লেইট করিস শা’লা।সময় দেখ। ”
হিমেল গম্ভীর কন্ঠে উত্তর করল,
“ ভালো করেছি। ”
আয়মান ফুঁসে উঠে। হিমেলের পিঠ বরাবর একটা ঘুষি বসিয়ে আবারও ফিজার দিকে গেল। কয়েকটা কথা বলল। হিয়া ওদের কথা বলাও দেখল আবারও হিমেলকেও ওভাবে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। অতঃপর বিরস স্বরে শুধাল,
“ আয়মান ভাই? এই হিমেল নামের মানুষটা কেমন অদ্ভুত না? ”
উত্তর এল,
“ হান্ড্রেড পার্সেন্ট অদ্ভুত! ”
ঠিক তখনই হিমেল এসে আয়মানকে টেনে নিতে লাগল। রিক্সা পেয়ে গেছে। অন্যদিনের মতো ভদ্রতা দেখিয়ে আজ এদের কাউকেই রিক্সা অফার করেনি হিমেল। আয়মানকে টেনে ধরে বলল,
“ দেরি হয়ে যাচ্ছে। রিক্সা পেয়ে গেছি, চলে যাচ্ছি। তুই মেয়েদের মাঝখানে থাকতে চাইলে ছেড়ে যেতে পারি। ”
আয়মান খেঁকিয়ে উঠল। শুধাল,

“ ফিজাকে এভাবে দাঁড় করিয়ে রেখে রিক্সা নিয়ে চলে যাব? এইজন্য মাত্রই হিয়া তোরে অদ্ভুত বলেছে। ”
হিমেল ভ্রু কুঁচকে নিল। ওকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল? তাও মেয়েদের মধ্যে। ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আয়মান আবারও হিয়াকে ইঙ্গিত করে বলে উঠল,
“ এই হিয়া, অদ্ভুত না ও? বলেছো না তুমি? আমি কি মিথ্যে বলছি?আমিও সহমত। কোন প্রেমিককে দেখেছো প্রেমিকাকে রেখে চলে যেতে? ”
“ তাহলে তুই থাক। আমিই যাচ্ছি। ”
“ তোর বন্ধুর প্রিয়তমা। রিক্সাটা পেয়েছিস। এভাবে নিয়ে চলে যেতে বিবেকে বাঁধবে না তোর? ”
“ বাঁধছে না। সবাই তো আর তোর মতো না যে কোনকিছু অফার করলেই লুফে নিবে। যেচে কোনকিছু অফার করে অপমানিত বোধ করতে চাইছি না। ”
হিয়া মিনমিন চোখে দেখে যাচ্ছিল। ঠোঁট আওড়িয়ে বলল,
“ আসলেই অদ্ভুত। ”
মিথি সঙ্গে সঙ্গেই হিয়ার হাতে চড় বসাল। সতর্ক করল যে শুনে নিবে। আসলেই শুনলও হিমেল। হিয়ার দিকে চেয়ে শুধাল,

” ঠিক ধরেছেন মিস হিয়া। অদ্ভুতই। ”
মিথি হিমেলের দিকে তাকিয়ে ছিল। কথাটা শুনছিল। ঠিক তখনই হিমেল সরু চাহনিতে মিথিকে দেখল। অতঃপর চোখমুখের অবস্থা লক্ষ্য করে মিথির পাশে থাকা হিয়াকে জিজ্ঞেস করল,
“ মিস হিয়া, আপনার বান্ধবী খাওয়া দাওয়া করে না ঠিকমতো? উনার চোখমুখের এই ভয়াবহ পরিণতি কেন?”
মিথি হিমেলের দিকে চাইল। ওর নিজের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করাতে ও নিজেই উত্তর দিল,
“হিমেল ভাই, খাওয়া দাওয়া করি আমি ঠিকমতো। ”
হিমেল ভ্রু বাঁকাল। তিক্ত বিরক্ত স্বরে উত্তর করল,
“ তোকে জিজ্ঞেস করেছি? নাকি তোর সাথে কথা বলেছি? ”
মিথি নিরাশ হলো এমন কথায়। শুধু বলল,
“ আপনি অযথায় রাগ করছেন।অথচ আপনার সাথে আমার কোন ঝামেলা হয়নি হিমেল ভাই। ”
হিমেলের মুখ টানটান। গম্ভীর মুখে শুধাল,
“ তোর তো আমার নাম জানার কথা নয় মিথি। আমি তোর অপরিচিত। আমার জন্য ও তুই অপরিচিত। হিসেব কাটকাট। ”
মিথি এবার চুপসে যাওয়া মুখে তাকাল। বলল,

“ আপনিও তো আমার নাম বললেন মাত্র। ”
হিমেল ভ্রু নাচিয়ে শুধাল,
“ নাম জানলে নাম বলব না? ”
“আপনার মুখে নাম শুনে মনে হচ্ছে না আমি আপনার অপরিচিত। ”
হিমেল সরাসরি নজর ফেলল।ছোটশ্বাস টেনে বলল,
“ ওকে, মিথিয়া মাহমুদ।আমি আপনাকে আজ থেকে জানি না।”
এটুকু বলেই ধপধাপ পা ফেলে হিমেল এগিয়ে গিয়ে রিক্সায় বসল।পিছু পিছু দৌড়ে গেল আয়মানও। ফিজার দিকে চেয়ে চোখেমুখে বুঝাল ও অসহায়। অন্যদিকে হিয়া চোখমুখ গোলগোল করে তাকিয়ে মিথিকে শুধাল,
“ কি হলো এটা? ”
মিথি ছোটশ্বাস টেনে উত্তর করে,
“ রিক্সা পাচ্ছিলাম না। দাঁড়িয়ে ছিলাম। উনি রিক্সা অফার করেছিলেন কিন্তু সুযোগ কাজে লাগাই নি তাই বোধহয়। ”
হিয়া কপাল কুঁচকে বলল,

“ তো কাজে লাগালে কি হতো? ছেলেটা ভালো। অন্তত অন্য নজরে তোকে নিশ্চয় রিক্সা অফার করেনি? পরিচিত বলেই করেছে।”
“ জানি। ”
“ কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ছেলেটা তোকে অন্য নজরে দেখলে দেখতেও পারে।নয়তো এমন রাগ দেখাবে কেন? ”
“ পাগল। উনি সবসময়ই আমার সাথে এমন রাগ রাগ বিহেভিয়ারই দেখিয়ে এসেছেন। তবে উনি আমাকে ছোটবোনের মতোই দেখেছেন সবসময়।অন্য নজরে তাকায়নি। শুধু আমি কেন, গ্রামের কোন মেয়েকেই তেমন চাহনিতে দেখে নি উনি। ”
হিয়াও সহমত জানিয়ে শুধাল,
“ তোর মতো আমিও খেয়াল করেছি এই লোক কোন মেয়েকে তেমন বিরক্ত টিরক্ত করে না। তেমন নজরে তাকায় না। তাই বললাম ছেলেটা ভালোই। ”
মিথি এবার হেসে ফেলল। বলল,
“ বিয়ে করে আমার ভাবী হয়ে যা প্লিজ। ”
“ দূররর, বিষয়টা ততটুকুও নয়। আসলে উনার ব্যাক্তিত্ব সুন্দর তাই চোখে পড়েছে। ”

হিয়া আর মিথি হসপিটালে পৌঁছেছে একটু আগেই। তাদের সিরিয়াল ডাকতে দেরি আছে। বাইরেই বসে আছে দুইজন। ওদের থেকে দুই চেয়ার পরেই একজোড়ক দম্পতিকে দেখা গেল। মেয়েটা সম্ভবত সন্তানসম্ভাবা। আর মেয়েটার স্বামী এই কয়েক মিনিটেই মেয়েটাকে একবার জল এগিয়ে দিচ্ছে, একবার ফল এগিয়ে দিচ্ছে। কিছুটা সময় আগে কপালেও হাত রাখল। বোধহয় উত্তাপ পরখ করছে। হিয়া ওদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আজ যদি মিথির স্বামীটা এমন হতো তাহলে মিথিও এই যত্নটা পেত। মিথিও এই ভালোবাসাটা পেত। ওর জানামতে ওর বান্ধবী ছোট থেকেই সহজ সরল, ভালো মনের মেয়ে। তবে বিধাতা এমনটা কেন করল? মিথির ভাগ্যেই কেন এমনটা লিখল? হিয়া বারবার এই দম্পতিকে আড়াল করে মিথির দিক করে বসতে চাইল যাতে মিথি খেয়াল না করে। তা বুঝেই মিথি হেসে বলল,
“ আমি দেখেছি হিয়া। বিষয়টা আসলে সুন্দরই। ”
হিয়া অপ্রস্তুত হাসল। বলল,
“ নতুন মা বাবা হচ্ছে হয়তো দুইজনে।”
মিথিও হাসল। শুধাল,
“ আরেহ ভালোবাসা থাকলে নতুন বাবা মা হতে হয় না। বার কয়েক বাবা মা হলেও একই যত্নই থাকবে, একই ভালোবাসাই থাকবে। ”

মুহুর আজকাল আদ্রর প্রতি ভালোবাসার অনুভূতি কাজ করে কম, বরং বিরক্তিই বেশি কাজ করে। আদ্রর যে যত্নগুলো, ভালোবাসাগুলো ও আগে পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে থাকল সেগুলোকেই আজকাল ওর দমবন্ধ লাগে। অসহ্য লাগে আদ্রকে। তবুও আদ্রকে প্রকাশ করতে পারে না। মুহু ছোটশ্বাস ফেলে। ও নিজেই বিশ্বাস করত আদ্রর উপর থেকে ওর কখনো মন উঠবে না। আদ্রকে আস্ত একটা মুগ্ধতা মনে করত ও। আদ্রকে ফেলেই শান্তি শান্তি লাগল। আদুরে অনুভূতি মন ছুঁয়ে যেত। অথচ আজকাল অনুভূতির পরিবর্তন ঘটেছে। আদ্রর প্রতি ভালোবাসা বদলাচ্ছে। কোথাও একটা সমস্ত অনুভূতি ছিন্নভিন্ন হয়ে এসেছে আদ্রর প্রতি। বাকি যেটুকু মুহু দেখিয়ে যাচ্ছে, কিংবা দেখাচ্ছে তা কেবলই অভিনয়। আগের মতো সত্য নয়। মুহুর আজকাল মুগ্ধতা সব গিয়ে জমেছে মিস্টার এহসানের প্রতি। একটা চতুর, জ্ঞানী লোক এহসান। বয়সে তার চাইতে প্রায় ছয় বছরের বড়। অথচ কাজ কর্মে কতোটা পরিপক্ব, কতোটা চতুর এই লোক। আদ্রর মতো বদমেজাজী, শর্ট টেম্পার আর বোকা নয়। মুহু আজও মিস্টার এহসানের সাথে দেখা করেছে।আদ্রকে জানায়নি। মূলত কোন এক অদৃশ্য টানেই ও বারবার মিস্টার এহসানের সাথে দেখা করছে, মিস্টার এহসান যা বলছে তাই করছে। নিজের এহেন পরিণতি দেখে মুহুর নিজেরই মাঝেমাঝে কেমন লাগে। ও বোধহয় আসক্ত হয়ে যাচ্ছে ছেলেটার প্রতি। অসহ্য রকমের ভালো লাগা নিয়ে আজকাল মরেও যেতে ইচ্ছে করছে। যেমনটা আদ্রর বেলায় শুরুর দিকে মন চাইত। নতুন নতুন প্রেমে পড়ার অনুভূতি। মুহু যখন এহসানকে ভেবে ভেবে সময় নষ্ট করছিল ঠিক তখনই আদ্র কল করল। মুহুর এত এত মুগ্ধতা, ভালো লাগা য় হঠাৎ আদ্রর কল পেয়ে ও কপাল কুঁচকাল। প্রথম দফায় কল না তুললেও দ্বিতীয় দফায় কল তুলল। হেসে শুধাল,

“ কি করছো আদ্র? ”
আদ্র শুনল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ দরজা খুলো। চাবি নেই সাথে। ”
“ এতরাতে কেন এসেছো? কাল সকালে আসলেই হতো। ”
আদ্র আবারও দাঁতে দাঁত চাপে। নিজেকে যথেষ্ট ঠান্ডা রাখার চেষ্টা চালিয়ে বলে,
“ কেন? আসাতে বিরক্ত লাগছে নাকি? আগে লাগত না যখন আমায় কল করে করে উম্মাদের মতো তোর বাসায় নিয়ে আসতি? চালাকি করবি না মুহু, বারবার বলছি আমার সাথে চালাকি করবি না। মে’রে ফেলব আমি। ”
মুহু ছোটশ্বাস ফেলল।আর একটা কথাও না বলে কল রেখে দিল। উঠে গিয়ে দরজা খুলল। অতঃপর আদ্রকে দেখে শুধাল,
“ বারবার এইসব তুইতোকারি আমি নিব না আদ্র। কি ভাবছো নিজেকে তুমি? কোথাকার কি হও তুমি? ”
আদ্র রুমে ডুকল। দরজা লাগিয়ে সোফায় দাঁতে দাঁত চেপে বসল ও৷ চোয়াল শক্ত করে কিছুটা সময় থম মেরে বসে থাকল।অতঃপর হুট করেই মুহুর ড্রয়িং রুমে রাখা কাঁচের টি টেবিলটা লাথি মেরে ভেঙ্গে ফেলল। রাগে চোখমুখ লাল করে শুধাল,

“ আবারও, আবারও ঐ মিস্টার এহসান! তুই গিয়েছিলি না ওই লোকের সাথে দেখা করতে? কেন গিয়েছিলি? বল কেন গিয়েছিলি? আমাকে ভালো লাগছে না আর তাই না? ঐ লোককে ভালো লাগছে তোর জা”নোয়ার? ”
আচমকা বিকট শব্দে মুহু যেমন ভয়ে কেঁপে উঠল ঠিক তেমনই আদ্রর ভয়ানক রূপ দেখেও কাঁপল। ও আদ্রকে শান্ত করার উপায় পায় না। চোখজোড়া লাল টকটকে হয়ে আছে। মুখ অবয়ব ভয়নক। মুহু পিঁছিয়ে যায়। কাঁপে স্বরে বলে,
“ আ্ আদ্র শান্ত হও। শান্ত হও আদ্র। আমি এক্সপ্লেইন করছি। ”
আদ্র হেসে উঠল। মুহু আরো দুয়েক পা পিছাতেই ও বলল,
“ ভয় পাচ্ছিস? এই ভয়টা আগে পাওয়া উচিত ছিল না? ছিল কিনা? আমাকে ভালোবেসেছিলি মুহু, আমাকে। সে আমি বিনা অন্য কেউ তোর মনে থাকলে সোজা মে’রে ফেলতেও হাত কাঁপবে না আমার। ”
মুহু কেঁদে ফেলবে যেন ভয়ে। ঘন ঘন শ্বাস টেনে ও আচমকা আদ্রকে শান্ত করার জন্য জড়িয়ে ধরল। ও জানে, আদ্র ওর জন্য পাগল। ও জানে, আদ্র ওকে ভালোবাসে। সুতারায় প্রিয়তমার জড়িয়ে ধরাতে নিশ্চয় আদ্র শান্ত হবে। অথচ শান্ত হলো। মুহু এবারে ইমোশনাল হয়েই ঠোঁট ছোঁয়াল আদ্রর গলায়। শুধাল,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ১৯

“ আদ্র, শান্ত হও। শান্ত হও আদ্র। ওটা বিজন্যাস এর খাতিরে। আর কিছুই না। তুমি অতিরিক্ত ভাবছো আদ্র। আমার সাথে মিস্টার এহসানের কিছু নেই। কিছুই না। আমি জানি, তুমি আমায় ভালোবাসো। আমিও তোমায় ভালোবাসি আদ্র। আমার মনে শুধু তুমিই আছো। ”
অথচ মুহু নিজেই জানে ওর মন থেকে আদ্র মুঁছে যাচ্ছে। কয়েকদিন পর হয়তো আদ্রর লেশমাত্রও ওর মনে থাকবে না। ও এখন মিস্টার এহসানের প্রতি মুগ্ধ। মিস্টার এহসানের প্রতি দুর্বল। কিন্তু আদ্র? আদ্রর থেকে রেহাই পাবে কি করে ও? আদ্রকে ছেড়ে আসার জন্য ওকে নিশ্চয় পার্ফেক্ট প্ল্যান করতে হবে। ঠান্ডা মাথায়!

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২১